Golpo romantic golpo অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা

অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৭৪


অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৭৪

[পর্ব ৭৪]

#লেখিকা_ফারহানা_নিঝুম

(🚫 দূর্বল হৃদয়ের পাঠকদের জন্য গল্পটা একদম নয়।)

(🚫কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

(দ্বিতীয় খন্ড)

রাইসার বুকের ভেতর জমে থাকা যন্ত্রণা আর সংযমের বাঁধ মানল না। রুদ্ধ কণ্ঠে, তীব্র ক্ষোভ আর অসহায়তায় কাঁপতে কাঁপতে সে বলে উঠল,

“হোয়াই? হোয়াই, ভাইয়া? হোয়াই ডিড ইউ ডু দিস? হোয়াই? ইউ নো, ইন্সপেক্টর গট শট হি ইজ ইনজার্ড!”

প্রতিটি শব্দ যেন তার বক্ষ বিদীর্ণ করে বেরিয়ে এলো।

কিছুক্ষণ আগেই সে বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছে। বারবার নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করছে ইস্ক্রিয়াস বেঁচে আছে, তার চিকিৎসা চলছে, সে নিশ্চয়ই সুস্থ হয়ে উঠবে। তবু হৃদয়ের অন্তঃস্থলে জমে থাকা অপরাধবোধ তাকে এক মুহূর্তের জন্যও স্বস্তি দিচ্ছে না।

জীবনে প্রথমবার কেউ তাকে নিঃশর্তভাবে ভালোবেসেছিল, তার ভাঙাচোরা অস্তিত্বকে আপন করে নিতে চেয়েছিল। অথচ সেই মানুষটিকেও নিজের অন্ধকার অতীতের ছায়ায় টেনে এনে আজ র’ক্তাক্ত পরিণতির মুখোমুখি করেছে সে।

ইদ্রান স্থির, নির্মোহ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রাইসার দিকে। মেয়েটি নিম্নঠোঁট দাঁতের আড়ালে চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তার সজল চোখদুটি মনের সমস্ত গোপন আর্তনাদ স্পষ্ট করে দিচ্ছে।

কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে ইদ্রান দৃষ্টি নামিয়ে আনল মার্বেলের মেঝেতে। দীর্ঘ, তপ্ত এক নিঃশ্বাস ত্যাগ করে গম্ভীর, অনুরণিত কণ্ঠে বলল,

“জাস্ট ওয়েট। হি ইজ কামিং ইন অ্যা হোয়াইল। আফটার দ্যাট, এভরিথিং উইল বি ক্লিয়ার।”

রাইসার বুকের ভেতর যেন আবারও হাহাকার জেগে উঠল। সে নতদৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে রইল।

চারপাশে সশস্ত্র প্রহরীদের সতর্ক উপস্থিতি। আপাতত তারা অবস্থান করছে রেড সাইলেন্ট ম্যানরের অভ্যন্তরে একটি সুরক্ষিত, অথচ ভয়ংকর নিস্তব্ধতার আবরণে ঢাকা স্থানে।

ইদ্রান আবার বলল,

“গো অ্যান্ড ফ্রেশেন আপ। হি উইল টক টু ইউ হিমসেলফ হোয়েন হি অ্যারাইভস।”

কিন্তু রাইসা কোনো উত্তর দিল না।সে প্রত্যুষের মতোই নির্বাক, স্থাণুর মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আর কিছু না বলে দ্রুত পদক্ষেপে কক্ষ ত্যাগ করল ইদ্রান।

তবে ইভান রয়ে গেল।ইদ্রানের স্পষ্ট নির্দেশেই। রাইসার সুরক্ষা এখন সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। এদিকে ইদ্রান ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইস্ক্রিয়াসের বর্তমান অবস্থার খবর সংগ্রহ করতে। জানা গেছে, তার হাতে ও বাহুতে গু’লি বিদ্ধ হয়েছে। চিকিৎসা চলছে, অবস্থা আপাতত নিয়ন্ত্রণে।

কিন্তু ইদ্রান খুব ভালো করেই জানে ইস্ক্রিয়াস সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যখন জানতে পারবে যে রাইসা তার নাগালের বাইরে চলে গেছে, তখন তার প্রতিক্রিয়া হবে ভয়ংকর।

প্রচণ্ড, বিধ্বংসী এক তাণ্ডব হয়তো তখন অনিবার্য হয়ে উঠবে।

🌿
🌿

দূর-প্রসারী নগর-অট্টালিকার অন্তঃস্থলে অবস্থিত সেই সুবিশাল শপিং মলটি আজ সম্পূর্ণরূপে বুক করা হয়েছে এহসান মঞ্জিলের সকলের জন্য। কারণও বিশেষ তিতলি ও ঈশানের শুভ পরিণয়ের কেনাকাটা বলে কথা।

হাতে ধরা ঝলমলে লেহেঙ্গাটির দিকে তাকিয়ে ন্যান্সি কোমল স্বরে বলল,

“এই শাড়িটা ভীষণ সুন্দর দেখাচ্ছে। এটাই নাও।”

তিতলি মৃদু ভ্রুকুঞ্চন করে তার দিকে চাইল। অতঃপর সংকোচভরা কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে বলল,

“না ইলহাম আপি, আমি বরং কালো রঙের কিছু নেব।”

কথাটুকু শুনে যেন ন্যান্সির মস্তিষ্কে ক্ষুদ্রাকৃতির বজ্রপাত সংঘটিত হলো। বিস্ফারিত নয়নে সে তিতলির দিকে তাকিয়ে রইল।বিয়ের দিন কালো পোশাক?এ কেমন চিন্তাধারা! ঠিক তখনই পিছনের দিক হতে কর্কশ, ধারালো এক পুরুষকণ্ঠ ভেসে এলো।

“আমি জানতাম, এই মেয়েটা আমার জন্য অশুভ!”

ঈশানের চোখেমুখে বিরক্তির সুস্পষ্ট ছাপআড়াআড়িভাবে ভ্রু কুঁচকে সে ন্যান্সির উদ্দেশে বলে উঠল,

“আপনি নিজেই দেখুন ম্যাম! এই মেয়েটার ইচ্ছেটা কী! বিয়ের দিন নাকি কালো পোশাক পরবে!”

ন্যান্সি এবার সম্পূর্ণ মনোযোগ তিতলির দিকে নিবদ্ধ করল। তার চাহনি শান্ত, তবে সেখানে মৃদু শাসনের আভাস। একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে বলল,

“এসব কী তিতলি? বিয়ের দিন কেউ কালো পরে?”

তিতলি কোনো উত্তর দিল না। অধোবদনে দাঁড়িয়ে রইল।

অবশেষে ন্যান্সি নিজেই একটি লালাভ আভাযুক্ত মনোরম লেহেঙ্গা বেছে নিল। অধরের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলল,

“এটা ট্রায়াল দিয়ে এসো।”

তিতলি নীরবে সম্মতি জানিয়ে মুচকি হাসল। অতঃপর ধীর পদক্ষেপে ট্রায়াল রুমের দিকে এগিয়ে গেল।

তাকে যেতে দেখে ন্যান্সি এবার ঈশানের দিকে ফিরল।

“ভাইয়া, একটু মানাতে শিখুন, মানিয়ে নিতেও শিখুন। ও কিন্তু ভীষণ সহজ-সরল একটা মেয়ে।”

ঈশান বাইরে থেকে গম্ভীর থাকলেও অন্তরেকৌতুকমিশ্রিত এক হাসি ফুটে উঠল। মনে মনে বলল,

“রংপুরের মাইয়া, বাসর রাতে তোকে ঠিক দেখে নেব। আমাকে এত জ্বা’লানোর ফল পেতেই হবে!”

অন্যদিকে, অদূরে রাখা রাজকীয় সোফায় আরামদায়ক ভঙ্গিতে বসে আছে আফরিদ এহসান। তার সমগ্র অবয়বে এক অদ্ভুত বিরক্তির ছায়া।

ন্যান্সির দৃষ্টি অন্যমনস্কভাবে তার দিকে পড়তেই কপাল কুঁচকে উঠল।কী হয়েছে লোকটার? দেখে তো মনে হচ্ছে যেন কেউ তার পকেট থেকে সদ্য কড়কড়ে পঞ্চাশ হাজার টাকা চুরি করে নিয়ে গেছে!

যেহেতু পুরো শপিং মলটাই বুকড, তাই সবাই নির্ভাবনায় এদিক-সেদিক ঘুরে নিজেদের পছন্দমতো পোশাক বাছাই করছে। আর ন্যান্সি একাই সবার জন্য যত্ন করে পোশাক নির্বাচন করে চলেছে।

অবশেষে আফরিদকে এভাবে বসে থাকতে দেখে বিরক্তি চেপে রাখতে পারল না সে।দ্রুত এগিয়ে গিয়ে বলল,

“কী সমস্যা? বসে আছেন কেন?”

আফরিদ পায়ের নিচে সিগারেটের শেষাংশটুকু পিষে ফেলে নির্বিকার স্বরে বলল,

“তা কী করব? তোদের শপিং শেষ?”

ন্যান্সি চোখ বড় বড় করে তাকাল।

“এটা একটা বিয়ে, আফরিদ! আপনি কি বিয়েতে কিছু পরবেন না নাকি,,,

বাকিটুকু বলতে বলতেই তার মুখশ্রী বিকৃত হয়ে গেল। নাক-মুখ কুঁচকে উঠল বিরক্তিতে।আফরিদ তেরছা দৃষ্টিতে সেই মুখখানি পর্যবেক্ষণ করল।অতঃপর হঠাৎ ঘাড় সামান্য বাঁকিয়ে নিচু, কর্কশ কণ্ঠে বলল,

“তুই তো আমাকে সবভাবেই দেখেছিস, বান্দি তাহলে এখন নাক-মুখ কুঁচকে কী লাভ?”

ন্যান্সির ক্ষীণ বাহুদ্বয় আকস্মিক টানে নিজের দিকে টেনে নিল আফরিদ। আচমকা স্পর্শে লজ্জায় রীতিমতো নাজেহাল হয়ে পড়ল রমণী। অধর কেঁপে উঠল, গালদুটো রক্তিম আভায় রঞ্জিত হয়ে উঠল। এমন নির্লজ্জ, বেহায়া এবং নির্ভীক পুরুষ সে জীবনে দ্বিতীয়টি দেখেনি।

ঠোঁট ফুলিয়ে ক্ষীণ বিরক্তির সুরে বলল,

“ছাড়ুন তো! সবসময় যেখানে-সেখানে শুরু হয়ে যান কেন?”

আফরিদ কোনো উত্তর দিল না। কেবল গভীর, নিগূঢ় দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তার মুখখানি নিরীক্ষণ করল। তারপর ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে গিয়ে একের পর এক শাড়ি দেখতে লাগল। হঠাৎই তার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল একটি কৃষ্ণবর্ণ শাড়ির ওপর। শাড়িটি হাতে তুলে নিতেই অদ্ভুত এক অনুভূতি ছুঁয়ে গেল তাকে। মনে হলো, যেন এই কালো রেশমখণ্ডটি বিশেষভাবে নির্মিত হয়েছে কেবল তার অ্যাঞ্জেলিনার জন্য। নিঃশব্দে সেটিই আলাদা করে রাখল সে। শুধু সেটাই নয়, আরও দু’টি শাড়িও বেছে নিল ন্যান্সির জন্য। কিন্তু কৃষ্ণবর্ণ শাড়িটির প্রতি তার আকর্ষণ যেন অন্যরকম।

প্রথমবারের মতো আফরিদের উচাটন, অস্থির মন এক অদ্ভুত আকাঙ্ক্ষায় ছটফট করে উঠল।

সে তার পরাণকে দেখতে চায় এই কৃষ্ণবর্ণ শাড়িতে, রাতের মতো গভীর, রহস্যময় আর অপরূপ রূপসী হয়ে।

🌿

“আমি এসব কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না, মম! ভাইয়া,,,ভাইয়া ওই মেয়েটাকে ছেড়ে দিল? এভাবে ছেড়ে দিল? যে মেয়েটা নীলাদ্রি ভাইয়াকে শেষ করে দিয়েছে, তাকে বিনা শাস্তিতে ছেড়ে দিল?”

সাব্বিরের ক্রুদ্ধ, উন্মত্ত অবস্থা দেখে মাইমুনা এহসান ধীর কণ্ঠে বলে উঠলেন,

“শান্ত হও, সাব্বির। এসব কী আচরণ? নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখো। তাছাড়া, ইলহামেরই বা কী দোষ? সত্যিই কি সে,,

“অবশ্যই সে-ই করেছে এসব!”

মায়ের কথার মাঝখানেই গর্জে উঠল সাব্বির।

“তুমি আর আমি দু’জনেই জানি, এসব কিছুর জন্য ইলহামই দায়ী!”

মাইমুনা এহসান আর কিছু বলতে পারলেন না। ধীরে দৃষ্টি নামিয়ে আনলেন মেঝের দিকে। বুকের গহীনে জমে থাকা আহত দীর্ঘশ্বাসটুকু নিঃশব্দে গিলে ফেললেন।

সাব্বির দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“আমি ওকে জীবিত ছাড়ব না, মম। তুমি দেখে নিও।”

কথা শেষ করেই প্রচণ্ড ক্রোধে ফুঁসতে ফুঁসতে কক্ষ ত্যাগ করল সে।মাইমুনা এহসান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনিও এখন দুশ্চিন্তায় আচ্ছন্ন। আসলে ঘটছেটা কী? এতকিছু কীভাবে হলো?কিছুক্ষণ পর দ্রুত নিচে নেমে এলেন তিনি। ততক্ষণে সাব্বির বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে।

ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই দেখলেন সবাই নিজেদের কেনা পোশাক নিয়ে ব্যস্ত। হাসি, গল্প আর উচ্ছ্বাসে সরগরম চারপাশ।

ন্যান্সি তাকে দেখামাত্র সেন্টার টেবিলের ওপর রাখা একটি প্যাকেট হাতে তুলে নিয়ে এগিয়ে এল।

মুখভরা হাসি নিয়ে বলল,

“আপনি তো আমাদের সঙ্গে গেলেন না, মা। তাই আপনার জন্য এটা এনেছি।”

মাইমুনা এহসান একপলক প্যাকেটটির দিকে তাকালেন। তারপর সৌজন্যমূলক মৃদু হাসি ফুটিয়ে সেটি গ্রহণ করলেন।

কিন্তু ঠিক পরক্ষণেই তিনি এমন কিছু বললেন, যা শুনে ন্যান্সির সমগ্র অস্তিত্ব যেন মুহূর্তে বরফশীতল হয়ে গেল।

তিনি সামান্য ঝুঁকে ন্যান্সির কানের কাছে মৃদুস্বরে বললেন,

“একজন মায়ের বুক থেকে তার সন্তানকে কেড়ে নিয়ে ভালো করোনি তুমি, ইলহাম। মা যতই পথভ্রষ্ট হোক, যতই ছন্নছাড়া হোক, দিনশেষে তার প্রতিটি সন্তানই তার প্রাণ। আর তুমি সেই মায়ের একজন সন্তানকে কেড়ে নিয়েছ। এর শাস্তি তোমাকে একদিন পেতেই হবে।”

কথাগুলো যেন বজ্রাঘাত হয়ে আছড়ে পড়ল ন্যান্সির ওপর।সে অনুভব করল, তার পদতলের জমিন বুঝি হঠাৎ করেই সরে গেছে। তাহলে মাইমুনা এহসান সব জানেন?

তিনি জানেন যে নীলাদ্রির মৃ’ত্যুর পেছনে ন্যান্সি জড়িত?

বিস্ফারিত নয়নে তাকিয়ে রইল সে।

অথচ আশ্চর্যের বিষয়, মাইমুনা এহসান কথাগুলো বললেন এতটাই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, যেন কিছুই ঘটেনি। তারপর ধীর পদক্ষেপে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেলেন।

পেছনে ফেলে গেলেন হাজারো প্রশ্ন, অসংখ্য সংশয়।

“কী হয়েছে তোর?”

আফরিদের কণ্ঠস্বর শুনে চমকে উঠল ন্যান্সি।

মনে হলো বুকের ভেতর কেউ নিরবচ্ছিন্নভাবে হাতুড়ি চালিয়ে যাচ্ছে। আফরিদ গভীর দৃষ্টিতে তার মুখখানি নিরীক্ষণ করল। ন্যান্সির কপালে ঘাম জমেছে, মুখমণ্ডল বিবর্ণ। ভ্রুকুটি করে আবারও জিজ্ঞেস করল,

“কী হয়েছে তোর?”

কিন্তু ন্যান্সির ঠোঁট নড়ল না। শব্দ যেন গলায় আটকে গেছে। আফরিদ হাত বাড়িয়ে তার কপালে স্পর্শ করল।

জ্বর এসেছে কি? না শরীর সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। কিন্তু তার এই অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতা? এক মুহূর্তও দেরি করল না আফরিদ। আলতো করে তাকে কোলে তুলে নিল।

ন্যান্সি নিস্তেজ, নিরুত্তাপ। তার আঙুলগুলো শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছে আফরিদের শার্ট। অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে তার সমগ্র শরীর। মাইমুনা এহসানের সেই কয়েকটি বাক্য যেন বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে মস্তিষ্কে।

🌿
🌿

স্পেন…

দিগন্তজোড়া নিশীথের নিস্তব্ধতা ভেদ করে স্পেনের বার্সেলোনায় নগরী আজ অস্বাভাবিক রকমের নীরব। কাচঘেরা বিশাল কক্ষে দাঁড়িয়ে আছে ইস্ক্রিয়াস। সম্মুখে বিস্তৃত থাইগ্লাসের ওপারে শহরের আলোকরেখা জ্বলজ্বল করছে, অথচ তার চোখে সেই আলো পৌঁছোচ্ছে না।

নিদ্রাহীন অসংখ্য প্রহরের সাক্ষী হয়ে তার তীক্ষ্ণ নয়নযুগল র’ক্তাভ বর্ণ ধারণ করেছে। কপালের মধ্যভাগে উদ্বেগের গভীর ভাঁজ, চোয়াল শক্ত, সমগ্র অবয়ব জুড়ে ক্লান্ত অথচ বিপজ্জনক এক নীরবতা।

সে ছুটেছে আজীবন কখনো মানুষের ঘৃণা থেকে, কখনো নিজের অতীতের র’ক্তা’ক্ত স্মৃতি থেকে, কখনো বা জীবন নামক নিষ্ঠুর বাস্তবতা থেকে। এমনকি জীবন থেকেও পালিয়ে যেতে চেয়েছিল সে। কিন্তু ভাগ্য তাকে পালাতে দেয়নি।

বরং তার শুষ্ক, অনুর্বর বক্ষভূমিতে একদিন আকস্মিক বর্ষাধারার মতো আগমন ঘটেছিল রাইসা নামক এক রমণীর।

সে বুঝেছিল তাকে, আগলে রেখেছিল, তার নীরব ক্ষতগুলোর ভাষা পড়তে শিখেছিল। অথচ নিয়তির নির্মম পরিহাসে সেও চলে গেছে দূরে। ইস্ক্রিয়াস চোখ বুজে ফেলে।

ভাবলেই বুকের ভেতর অদ্ভুত ব্যথা দোলা দিয়ে ওঠে। মস্তিষ্কের প্রতিটি স্নায়ুকোষে যেন যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ে।

সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারে না তার কিউটিপাই তার কাছে নেই। ঠিক তখনই টক, টক,দরজায় করাঘাতের শব্দ।

“মে আই কাম ইন, স্যার?”

দিবাংয়ের কণ্ঠে সম্বিত ফিরে পেল ইস্ক্রিয়াস।

লোকটা ভেতরে প্রবেশ করতেই ইস্ক্রিয়াস গভীর স্বরে বলল,

“কম ইন।”

দিবাং একপলক তার মুখাবয়ব পর্যবেক্ষণ করল। তারপর স্প্যানিশ ভাষায় মৃদুস্বরে বলল,

“হাউ আর ইউ, স্যার?”

ইস্ক্রিয়াস দীর্ঘ, তপ্ত এক নিঃশ্বাস ছাড়ল।

“আই অ্যাম ফাইন।”

দিবাংয়ের দৃষ্টি গিয়ে থামল তার বাহুর ব্যান্ডেজের ওপর। ক্ষত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি। সে কণ্ঠ পরিষ্কার করে বলল,

“স্যার… একটা খবর আছে।”

ইস্ক্রিয়াসের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যেন আগেই সব বুঝে ফেলেছিল।

স্থির দৃষ্টিতে জানালার দিকে তাকিয়েই বলল,

“রাইসা আর স্পেনে নেই তাই তো?”

দিবাং প্রায় চমকে উঠল।

“ইয়েস স্যার।কিন্তু এটাই একমাত্র খবর নয়।”

এবার সে প্যান্টের পকেট থেকে একটি পেনড্রাইভ বের করল।

“এটা আপনার নামে পার্সেল এসেছে। প্রথমে সন্দেহ করেছিলাম। বোম্ব স্কোয়াডও পরীক্ষা করেছে। ভেতরে শুধু এটা আর একটা ফুলদানী ছিল।”

ইস্ক্রিয়াস কপাল কুঁচকাল।

“ল্যাপটপে লাগাও।”

দিবাং আর এক মুহূর্ত দেরি করল না।কিছুক্ষণের মধ্যেই ল্যাপটপ তার সামনে এনে রাখা হলো।ইস্ক্রিয়াস নিজ হাতে ডিভাইস অন করল। একটি ভিডিও ফাইল চোখে পড়তেই সেটি চালু করল।আর পরমুহূর্তেই তার দৃষ্টি সামান্য কেঁপে উঠল।

স্ক্রিনে ভেসে উঠল ইদ্রান।ঠোঁটের কোণে কুটিল হাসি।

“হ্যালো অফিসার! ডু ইউ রিকগনাইজ মি?”

ইস্ক্রিয়াস নির্বাক। ইদ্রান মৃদু হেসে বলল,

“আই নো, ইউ আর সারপ্রাইজড। কিন্তু আজকে তোমাকে অবাক করার জন্যই এই ছোট্ট গিফট।”

সে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল।

“অফিসার, আমি তো বলেছিলাম, আমাকে আটকে রাখা সম্ভব নয়। এখন বুঝতে পারছো?”

তার ঠোঁটে বিদ্রূপের রেখা আরও গাঢ় হলো।

“ইউ নো তুমি এতদিন ধরে মাস্টারমাইন্ডকে খুঁজে বেড়াচ্ছ। কিন্তু ফলাফল? জিরো।”

সে সামান্য ঝুঁকে এলো।

“বাট ডোন্ট ওরি, আজ আমি তোমাকে তার সঙ্গেই দেখা করাব।”

ইস্ক্রিয়াসের শিরদাঁড়া বেয়ে অদ্ভুত শীতলতা নেমে গেল।

ইদ্রান ক্যামেরা হাতে উঠে দাঁড়াল।দীর্ঘ করিডোর অতিক্রম করে একটি ছাদের দিকে এগিয়ে গেল।

তারপর ক্যামেরা সামনে ঘুরতেই একজোড়া নীলাভ চোখ।অস্বাভাবিক ধারালো।অস্বাভাবিক শীতল।ইস্ক্রিয়াস স্থবির হয়ে গেল।দিবাংয়ের মুখ থেকেও র’ক্ত সরে গেল।

অবিশ্বাস্য!আগন্তুকটি ছাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে।

উচ্চদেহী, সুগঠিত অবয়ব।পরণে কুচকুচে কৃষ্ণবর্ণ লেদার জ্যাকেট, যার কাঁধজুড়ে সূক্ষ্ম রূপালি নকশা খোদাই করা। ভিতরে কালো টার্টলনেক, গলদেশ পর্যন্ত আবৃত। গাঢ় নীল ডেনিম প্যান্ট তার দীর্ঘদেহকে আরও তীক্ষ্ণ করে তুলেছে।হাতে কালো চামড়ার গ্লাভস।পায়ে ভারী কমব্যাট বুট। মুখমণ্ডল সম্পূর্ণ আবৃত এক ম্যাট ব্ল্যাক মাস্কে, যার ফলে কেবল নীলাক্ষী জোড়াই দৃশ্যমান।

আর সেই চোখ সেগুলোতে কোনো আবেগ নেই।

না ক্রোধ,না দয়া,না ভয়। শুধু এক অদ্ভুত কর্তৃত্ব।

এক শীতল মৃত্যুবার্তা। হঠাৎ লোকটি ক্যামেরার দিকে তাকাল। ধীর গতিতে হাত তুলল। হ্যালো জানানোর ভঙ্গি।

ঠিক তখনই ইস্ক্রিয়াসের শ্বাস যেন থেমে গেল।

তার অনামিকায় জ্বলজ্বল করছে এক অদ্ভুত আংটি।

একটি ঈগল। ডানা মেলে থাকা র’ক্তলোলুপ ঈগল।

দিবাংও বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইল।

এটাই! এটাই সেই চিহ্ন! প্রতিটি হ’ত্যাকা’ণ্ডের পর মৃতদেহের কাঁধে যে ঈগলের প্রতীক আঁকা থাকত তার প্রকৃত উৎস এই মানুষটি! ভিডিও শেষ হয়ে গেল।

কক্ষজুড়ে নেমে এল গাঢ় নীরবতা। ইস্ক্রিয়াস স্থির হয়ে বসে রইল। তার দৃষ্টি ল্যাপটপের অন্ধকার স্ক্রিনে নিবদ্ধ।

অবশেষে সে জেনে গেল মাস্টারমাইন্ড বাস্তব।

এবং সে বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান করছে।

তার ঠোঁট শক্ত হয়ে এলো।যে করেই হোক এই মানুষটিকে তাকে ধরতেই হবে।কিন্তু রাইসা? তার কিউটিপাই? তাকে নিয়ে এখন কী করবে ইস্ক্রিয়াস?

প্রথমবারের মতো, এক দুর্ধর্ষ ইন্সপেক্টর নিজেকে সম্পূর্ণ অসহায় মনে করল।

🌿
🌿

সূর্যাস্তের পূর্বমুহূর্তের ন্যায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আফরিদ এহসান। চোয়াল শক্ত, নীলাভ নয়নদ্বয় ক্রোধে গাঢ় হয়ে উঠেছে। তার সমগ্র সত্তা যেন একটিমাত্র বিষয়েই অনড় ন্যান্সি, তার অ্যাঞ্জেলিনা, তার পরাণের কাছে কোনো সত্য উন্মোচিত হবে না। সে নিষ্পাপ, কলঙ্কহীন এক সত্তা; পৃথিবীর সমস্ত অন্ধকার থেকে যাকে আড়াল করে রাখার দায় যেন একান্তই আফরিদের।

গভীর, গম্ভীর স্বরে সে উচ্চারণ করল,

“আমি তো আপনাকে নিষেধ করেছিলাম, মম। তারপরও কেন আপনি অ্যাঞ্জেলিনাকে হুমকি দিলেন?”

ছেলের কণ্ঠের আগ্নেয়গিরিসম উত্তাপ বুঝতে মোটেও সময় লাগল না মাইমুনা এহসানের। তবে তিনিও সহজে পিছু হটার মানুষ নন। ক্ষুব্ধ নিশ্বাস ফেলে দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠলেন,

“তুমি ভুলে যাচ্ছ, আফরিদ! সে আমার সন্তানকে খু’ন করেছে। আমার সন্তান তোমার ভাই ছিল সে!”

আফরিদের ওষ্ঠদ্বয় বিদ্রূপে বাঁকা হয়ে উঠল। চোখের গভীরে জমাট বাঁধল বহু বছরের ক্ষোভ।

“ভাই?”

শব্দটি এমনভাবে উচ্চারণ করল, যেন সেটাই পৃথিবীর সবচেয়ে তিক্ত উপহাস।

অতঃপর এক পা এগিয়ে এসে শীতল অথচ ধারালো স্বরে বলল,

“ও আমার ভাই হলে কখনোই আমার চরম শত্রুর সঙ্গে হাত মেলাত না। কখনোই ইলহামের পরিবারকে ধ্বংস করার পরিকল্পনা করত না। যে মানুষ নিজের র’ক্তের সম্পর্ককে পদদলিত করে প্রতিহিংসার নোংরা খেলায় মেতে ওঠে, তাকে আমি ভাই বলে স্বীকার করি না, মম। তাছাড়া যাকে তুমি আমার ভাই বলছো সে যে আমার র’ক্তের কেউই নয় তা প্রমাণ করে দিয়েছে।ও হচ্ছে সেই মানুষটার সন্তান যে,,,

শেষ বাক্যটি যেন শিলাখণ্ডের ন্যায় গিয়ে আ’ঘাত করল মাইমুনা এহসানের অন্তরে।

তিনি কিছুক্ষণ নির্বাক রইলেন। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ছেলের মুখপানে গভীর দৃষ্টিতে তাকালেন। সেই দৃষ্টিতে ছিল প্রশ্ন, সংশয়, আর একরাশ অজানা যন্ত্রণা।

অবশেষে ভ্রু সামান্য উঁচিয়ে মৃদু অথচ গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন,

“তোমার কি সত্যিই মনে হয়, আফরিদ নীলাদ্রি এসব করেছে?”

আফরিদ এহসান নির্বিকার। তার মুখমণ্ডলে কোনো বিস্ময় নেই, নেই কোনো দ্বিধা। শুধু নীরবতা। কিন্তু সেই নীরবতাই যেন হাজারো অপ্রকাশিত সত্যের ভার বহন করে দাঁড়িয়ে আছে। তার নীলাভ চোখদুটি ধীরে ধীরে মায়ের দিকে উঠল, অথচ সেখানে উত্তর নেই।

চলবে………।🌿

(📌বড় করে দেওয়ার চেষ্টা করছি। আমি চাইলেই এক লাফে যেতে পারছি না তবুও চেষ্টা করছি একটা জায়গায় শেষ করার যাতে পাঠক বলতে না পারে কিছুই ক্লিয়ার করিনি। যত দ্রুত সম্ভব গল্পটা শেষ করব। সবাই একটু রেসপন্স করবেন।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply