#অ্যাঞ্জেল_অ্যাঞ্জেলিনা
[পর্ব ৬২]
#লেখিকা_ফারহানা_নিঝুম
( দূর্বল হৃদয়ের পাঠকদের জন্য গল্পটা একদম নয়)
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)
(রিসার্চ সেন্টার _হল রুম ০২)
গভীর নৈঃশব্দ্যে আচ্ছন্ন কেবিনজুড়ে ছড়িয়ে ছিল নির্বাক উত্তেজনা। সাদা ফ্লোরোসেন্ট আলোর কৃত্রিম দীপ্তি দেয়ালের উপর নিষ্প্রাণ আভা ফেলে রেখেছে, যেন এ ঘরে অনুভূতির প্রবেশ নিষিদ্ধ। কাঁচঘেরা জানালার ওপাশে গবেষণাগারের যন্ত্রপাতিগুলো নিরবচ্ছিন্ন শব্দে চলমান, অথচ সেই শব্দও যেন কেবিনের ভেতরের ভারী আবহ ভেদ করতে পারছিল না।
চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে আফরিদ এহসান। দৃষ্টিতে অদ্ভুত প্রশান্তি, ঠোঁটের কোণে অস্পষ্ট ব্যঙ্গরেখা। তার বিপরীতে বসা ইদ্রানকে দেখাচ্ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত বিক্ষুব্ধ, ক্ষুব্ধ এবং চরম উৎকণ্ঠাগ্রস্ত। কপালের শিরাগুলো টানটান হয়ে উঠেছে, আঙুলের গিঁট শক্ত হয়ে আছে রাগ দমনের চেষ্টায়।
হঠাৎই ইদ্রান বিরক্তি মিশ্রিত কর্কশ স্বরে বলে উঠল,
“আমি সত্যিই বিরক্ত, আফরিদ! ইস্ক্রিয়াস রাইসাকে ধরে ফেলেছে! ডু ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড হোয়াট আই অ্যাম সেইং?”
কথাগুলোর প্রতিটি বর্ণ যেন দহন ছড়াচ্ছিল কক্ষজুড়ে। কিন্তু আফরিদের মধ্যে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। সে কেবল ধীর ভঙ্গিতে মাথা দোলাল। গাঢ় স্বরে বলল,
“হুঁ। ডোন্ট ওয়ারি। রাইসা কিছু বলবে না।”
তার স্বরভঙ্গির অবিচল স্থিরতা ইদ্রানের ভেতরের ক্রোধকে যেন আরও উসকে দিল। সে কয়েক মুহূর্ত নীরবে আফরিদের দিকে তাকিয়ে রইল। দৃষ্টিতে জমাট অসন্তোষ। অতঃপর দাঁত চেপে পুনরায় উচ্চারণ করল,
“রাইসার ব্যাপারটা না হয় বাদই দিলাম। কিন্তু ইলহাম? সে উঠেপড়ে লেগেছে তোকে খুঁজে বের করতে, আফরিদ! সে এই ট্যাটুর ব্যাপারেও জানতে চেয়েছে।”
নিজের ঘাড়ের বাম পাশে আঙুল ঠেকিয়ে ইশারা করল ইদ্রান। সেখানে কালো কালি দিয়ে উৎকীর্ণ রহস্যময় প্রতীকটি যেন অদৃশ্য আতঙ্কের সাক্ষী হয়ে আছে।
আফরিদ ধীরেসুস্থে তাকাল ট্যাটুটির দিকে। তারপর ওষ্ঠ বাঁকিয়ে এমন এক হাসি হাসল, যেটাতে অবজ্ঞা, উপহাস আর দুর্বোধ্য আত্মবিশ্বাস একসাথে মিশে আছে।
সেই হাসিই যেন ইদ্রানের ধৈর্যের শেষ প্রান্ত ভেঙে দিল।
ধপ করে সজোরে টেবিলের উপর আঘাত করল সে। টেবিলের কাঁচ কেঁপে উঠল মুহূর্তেই।
ইদ্রানের কণ্ঠে এবার ক্ষোভের পাশাপাশি স্পষ্ট আতঙ্ক।
“তুই হাসছিস? সিরিয়াসলি? তোর কারণেই এই ট্যাটু বানাতে হয়েছে! তুই জোর করেছিলি বলেই এটা করেছি। আর এখন বুঝতে পারছি আমাকে টার্গেট করার জন্যই এত নাটক সাজানো হয়েছে!”
কথাগুলো শেষ করে ভারী শ্বাস ফেলল ইদ্রান। তার চোখেমুখে জমে থাকা উৎকণ্ঠা স্পষ্ট বলে দিচ্ছিল পরিস্থিতি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
অথচ আফরিদ? সে তখনও ভীষণ স্বাভাবিক।
চেয়ারের সাথে শরীর আরও হেলিয়ে দিয়ে দু’হাত জড়িয়ে নিল বুকে। চোখের গভীরে ধূসর রহস্যের ছায়া নেমে এলো। অতঃপর নিম্নস্বরে, প্রায় ফিসফিসে সুরে বলল,
“কুল ডাউন, ম্যান। এত প্যানিক করছিস কেন?”
একটু থেমে ঠোঁটের কোণে ধীর, বিপজ্জনক হাসি টেনে আবার বলল,
“আমার সাদাসিধে বউটা খুব খাটছে। ওকে ওর মতো কাজ করতে দে, রিল্যাক্স কর।”
______________
শহরের গোধূলিবেলাটা তখন ধীরে ধীরে নীয়ন আলোর কৃত্রিম বিভায় নিমজ্জিত হচ্ছে। আকাশের শেষ প্রান্তে রক্তিম সূর্যাস্তের আবছা আভা মিলিয়ে যেতে না যেতেই বহুতল অট্টালিকাগুলোর কাঁচঘেরা প্রাচীরে প্রতিফলিত হতে শুরু করেছে বৈদ্যুতিক আলোকচ্ছটা। সেই ব্যস্ত নাগরিক কোলাহলের মাঝেই প্রস্তুত হয়ে নিচে অবতরণ করল স্মাইলি ও ন্যান্সি।
এখানে আসার পর থেকে একবারের জন্যও বাইরে যাওয়া হয়নি স্মাইলির। সকাল থেকেই একপ্রকার শিশুসুলভ অনুরোধে অটল ছিল সে আজ তাকে শপিংয়ে যেতেই হবে। ন্যান্সি বহুবার অনীহা প্রকাশ করলেও শেষাবধি মেয়েটার আবদারের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হলো।
সিলভার বর্ণের ওভারসাইজ টি-শার্টের সঙ্গে গাঢ় নীল ডেনিম জিন্স পরিধান করেছিল ন্যান্সি। উন্মুক্ত কেশরাশি কাঁধ ছুঁয়ে নেমে এসেছে, অথচ তার মুখাবয়বে স্থির হয়ে আছে অনুচ্চারিত ক্লান্তির রেখা। বাহ্যিক প্রশান্তির আড়ালেও দৃষ্টির গভীরে যেন সুপ্ত কোনো অস্থিরতা ঘনীভূত।
সিঁড়ি বেয়ে নিম্নতলায় অবতরণ করতেই সম্মুখীন হলো নীলাদ্রির।
দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার চাহনিতে চিরচেনা তীক্ষ্ণ বিদ্রুপের ছাপ। তাদের দেখামাত্র ওষ্ঠ বক্র করে কটাক্ষপূর্ণ স্বরে উচ্চারণ করল,
“কোথায় যাচ্ছেন ভাবিজান?”
ন্যান্সি ক্ষণিক থামল। তারপর ওষ্ঠপ্রান্তে বাঁকা হাসি টেনে বলল,
“আপনার ভাইয়ের অর্থ অপচয় করতে শপিংয়ে যাচ্ছি।”
নীলাদ্রির চোখে উপহাসের ঝিলিক দপ করে জ্বলে উঠল। অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সহিত বলল,
“সেটাই তো পারবেন, ভাবিজান।”
বাক্যটি যেন পরিহাসের বি’ষমাখা শলাকার ন্যায় ছুটে এলো। কিন্তু ন্যান্সি বিন্দুমাত্র প্রতিক্রিয়া দেখাল না। নির্বিকার ভঙ্গিতে তাকে পাশ কাটিয়ে প্রস্থান করল।
অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা তিতলি সম্পূর্ণ ঘটনাটি গভীর মনোযোগে পর্যবেক্ষণ করছিল। মুহূর্ত বিলম্ব না করে দ্রুত ফোন বের করে কল করল ঈশানকে। কারণ ঈশান বারংবার কড়া নির্দেশ দিয়েছিল,
“ন্যান্সির উপর নজর রাখবে।”
কিছুক্ষণ পর গাড়িটি এসে থামল সুবিশাল শপিং মহলের সম্মুখে। ঝলমলে আলোকসজ্জায় স্থানটি যেন এক কৃত্রিম স্বপ্নরাজ্যে পরিণত হয়েছে। কাঁচঘেরা প্রবেশপথের ওপারে স্টাইলিশ ড্রেস, পারফিউম আর গয়নার জৌলুস মিলে সৃষ্টি করেছে বিভ্রমময় পরিবেশ।
স্মাইলি প্রায় ছুটে ভেতরে প্রবেশ করল। ন্যান্সিও ধীর পদক্ষেপে অনুসরণ করল তাকে।
চারপাশের দোকানগুলো পর্যবেক্ষণ করতে করতেই হঠাৎ একটি শাড়ির শোরুমের সামনে থেমে উৎসুক কণ্ঠে স্মাইলি বলল,
“এখানকার বিশেষ পোশাক তো শাড়ি, তাই না ইলহাম?”
ন্যান্সি ওষ্ঠ বাঁকিয়ে মৃদু হাসল। সেই হাসিতে ছিল অদ্ভুত এক বিষণ্ন কোমলতা।
“হ্যাঁ, তা ঠিক। তবে জীবনে মাত্র দু’বার শাড়ি পরেছি আমি।”
স্মাইলির বিস্মিত দৃষ্টি তার মুখে স্থির হলো।
“প্রথমবার যেদিন পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছিল।”
স্বল্প বিরতির পর নিম্নস্বরে পুনরায় বলল,
“আর দ্বিতীয়বার, গতকাল।”
শেষ বাক্যটি উচ্চারণের সময় তার কণ্ঠে এমন এক আবছা আবেগ মিশে ছিল, যেন কোনো সুপ্ত স্মৃতি তাকে নিঃশব্দে স্পর্শ করে গেল। দু’জনে বিভিন্ন দোকান ঘুরে নিজেদের পছন্দমতো পোশাক নির্বাচন করতে লাগল। পরিবেশ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছিল। হাসি-ঠাট্টায় কে’টে যাচ্ছিল সময়।
হঠাৎই একটি সফেদ বর্ণের পাঞ্জাবিতে গিয়ে থমকে গেল ন্যান্সির দৃষ্টি।
অকারণেই মস্তিষ্কে ভেসে উঠল আফরিদ এহসানের মুখাবয়ব। লোকটিকে সে সর্বদা দেখেছে শার্ট-প্যান্ট, ট্রাউজার কিংবা টি-শার্টে। অথচ কখনোই পাঞ্জাবিতে নয়।
কেমন লাগবে তাকে পাঞ্জাবিতে?
চিন্তাটি আসতেই অন্তর্গত কোথাও এক অদ্ভুত কৌতূহল দোলা দিল। অবচেতন আকর্ষণে পাঞ্জাবিটি হাতে তুলে নিল সে।
স্মাইলি বিস্ময়ভরা কণ্ঠে প্রশ্ন করল,
“এটা কার জন্য? আর এটা কি?”
ন্যান্সির ওষ্ঠপ্রান্তে মৃদু হাসি প্রস্ফুটিত হলো।
“এটা পাঞ্জাবি, একজন নষ্ট পুরুষের জন্য।”
বাক্যটি উচ্চারণের সময় তার দৃষ্টিতে এমন এক অপ্রকাশ্য স্নিগ্ধতা ছিল, যা সে নিজেও হয়তো অনুধাবন করতে পারেনি।
শপিং সমাপ্ত করে দু’জনে বেরিয়ে এলো মল থেকে।
পার্কিং লটে তাদের গাড়ি অপেক্ষমাণ। কিন্তু বাইরে পা রাখতেই ন্যান্সির সমগ্র সত্তাজুড়ে হঠাৎ এক অকারণ শীতলতা নেমে এলো। চারপাশ অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ। কেউ যেন তাদের নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
তার পদচারণা মন্থর হয়ে গেল। স্মাইলি কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করল,
“কি হলো ইলহাম? থেমে গেলে কেন?”
ন্যান্সি উত্তর দিল না। তীক্ষ্ণ সতর্ক দৃষ্টিতে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করল। তারপরই দৃষ্টি স্থির হলো অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি কালো রঙের গাড়ির উপর।
পরক্ষণেই গাড়ি থেকে নেমে এলো কয়েকজন মুখোশধারী ব্যক্তি। তাদের গতিবিধি অস্বাভাবিক রকম সংগঠিত।
আর তারা সরাসরি এগিয়ে আসছে ন্যান্সিদের দিকেই।
স্মাইলির কণ্ঠ আতঙ্কে কেঁপে উঠল।
“ইলহাম, ওরা কারা? আমাদের দিকে আসছে কেন? আমরা কি করব?”
ন্যান্সির মস্তিষ্ক মুহূর্তেই বিপদ সংকেত উপলব্ধি করল। শরীরের প্রতিটি স্নায়ু সতর্ক হয়ে উঠল। ঠিক তখনই মুখোশধারীদের একজনের কানের ব্লুটুথ ডিভাইস থেকে ভেসে এলো শীতল নির্দেশ,
“তুলে নে।”
বাক্যটি শোনা মাত্রই সবকিছু যেন আকস্মিক সহিংসতায় বিস্ফোরিত হলো। লোকগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ল তাদের উপর। ন্যান্সি এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে স্মাইলিকে নিজের আড়ালে সরিয়ে দিল। সদ্য অর্জিত ফাইটিং স্কিল এবং বহু পূর্বে আয়ত্ত করা কুংফুর নিপুণতা একত্রে বিস্ফোরিত হলো তার দেহভঙ্গিতে। প্রথম ব্যক্তিটির কবজি মোচড় দিয়ে ভেঙে ফেলার উপক্রম করল সে। দ্বিতীয়জনকে প্রবল লাথিতে ছিটকে দিল গাড়ির গায়ে।
আক্রমণাত্মক ক্ষিপ্রতায় কয়েক মুহূর্তের জন্য পুরো পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছিল ন্যান্সি।
কিন্তু পিছু ফিরতেই ডান দিক থেকে অতর্কিতে এসে কেউ ভোঁতা ভারী কিছু দিয়ে সজোরে আ’ঘাত করল তার মস্তকে। মুহূর্তের মধ্যে ঝাপসা হয়ে এলো দৃষ্টি।
চারপাশ দুলে উঠল। শরীরের ভারসাম্য ভেঙে পড়তেই স্মাইলি আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল,
“ইলহাম! ইলহাম! কি হয়েছে তোমার? হেল্প! সামবডি হেল্প!”
কিন্তু পার্কিং লটের কোলাহল তাদের আর্তনাদকে যেন নির্বিকারভাবে গ্রাস করল। মুখোশধারীরা স্মাইলিকে স্পর্শ পর্যন্ত করল না। বরং অচেতনপ্রায় ন্যান্সিকে নির্মমভাবে টেনে তুলে গাড়ির ভেতর নিক্ষেপ করল।
গাড়ির দরজা সশব্দে বন্ধ হয়ে যেতেই মুহূর্তের মধ্যে স্থানটি পুনরায় নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
আর স্মাইলি? সে থরথরিয়ে কাঁপতে কাঁপতে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। চোখের সামনে পুরো ঘটনাটি ঘটে গেল অথচ সে কিছুই করতে পারল না।
কাঁপা হাতেই ফোন বের করে কল লাগলো ইদ্রানের নাম্বারে। রিসার্চ সেন্টারে তখনো ইদ্রান আর আফরিদ বসে আছে।
***************
কক্ষজুড়ে তখন এক অস্বস্তিকর স্তব্ধতা ঘনীভূত। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাতাসের মধ্যেও র’ক্তের ধাতব গন্ধ যেন ভারী হয়ে ঝুলে আছে চারপাশে। ম্লান আলোর প্রতিফলনে আফরিদ এহসানের অবয়বটাকে মানবসত্তার চেয়ে অধিক কোনো দুর্বোধ্য অন্ধকারের ন্যায় প্রতিভাত হচ্ছিল। তার ডানহাতে ধরা ক্লিভারের ধারালো ফলক বেয়ে ধীরে ধীরে র’ক্ত গড়িয়ে পড়ছে, আর সেই লালচে তরল মেঝের উপর ছোপ ছোপ বিভীষিকার জন্ম দিচ্ছে।
সম্মুখে হাঁটু গেড়ে পড়ে আছে মিস্টার রাইয়ান।
ইদ্রানের আপন আঙ্কেল। সেই ব্যক্তি, যে বিশ্বাসঘাতকতার নিখুঁত পরিকল্পনায় লন্ড্রি থেকে আনা পোশাকে বিশেষ রাসায়নিক স্প্রে করেছিল, যার ফলস্বরূপ স্পেনের Collserola Natural Park-এর জঙ্গলে হিংস্র পশুর উন্মত্ত আক্রমণের মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাদের।
আফরিদের ওষ্ঠপ্রান্ত ধীরে ধীরে বক্র হলো। সেই হাসিতে মানবিকতার লেশমাত্র ছিল না বরং ছিল সুপ্ত উন্মাদনা, দহন আর প্রতিহিংসার ঘনীভূত অন্ধকার। আফরিদের কণ্ঠ অস্বাভাবিকভাবে নিম্ন ও শীতল।
“ডিয়ার আঙ্কেল! আপনি যদি ইদ্রানকে মে’রে ফেলতেন, হয়তো আপনাকে ছেড়ে দিতাম। কিন্তু আমার পরাণের দিকে হাত বাড়িয়ে সবচেয়ে ভয়ংকর ভুলটা করেছেন।”
ইদ্রান নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে গিয়ে কাউচে বসল। মুখাবয়বে কোনো বিস্ময় নেই, কোনো দ্বিধা নেই যেন সামনে ঘটে যাওয়া দৃশ্য বহুবার প্রত্যক্ষ করা কোনো পরিচিত অধ্যায়। অন্যদিকে মিস্টার রাইয়ানের সমগ্র শরীর কাঁপছে আতঙ্কে। শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী হয়ে এসেছে। চোখদুটো র’ক্তশূন্য ভয়ে বিস্ফারিত।
“আ,,আমাকে ক্ষমা করে দাও আফরিদ!”
কাঁপা স্বরে উচ্চারণ করলেন তিনি।
“ইদ্রান,আমি তো তোমার আঙ্কেল,প্লিজ,,,,
কথাগুলো সমাপ্ত হওয়ার পূর্বেই আফরিদ ও ইদ্রান একত্রে হেসে উঠল। সেই হাসি ছিল ভয়ংকর। নিঃশব্দ মৃত্যুঘণ্টার মতো। ইদ্রান পা তুলে আরাম করে বসে বলল,
“ইশ্ আঙ্কেল, আপনাকে মা’রতে সত্যিই খারাপ লাগছে। তবে ভালো চাইলে অন্তত বলে ফেলুন এমনটা করলেন কেন?”
কিন্তু আফরিদ অপেক্ষা করার মানুষ নয়। ধৈর্য তার স্বভাবের সবচেয়ে দুর্বল অংশ। পরবর্তী মুহূর্তেই ঝড়ের বেগে ক্লিভারটা নেমে এলো। ভারী আঘাতে কক্ষ কেঁপে উঠল। মিস্টার রাইয়ানের আ’র্তচিৎকার ছিন্নভিন্ন করে দিল স্তব্ধতা। র’ক্ত ছিটকে পড়ল দেয়ালে, মেঝেতে, আফরিদের শার্টে। লোকটা যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগল।
অথচ আফরিদের মুখাবয়ব ক্রমেই স্থির হয়ে উঠছিল।
অস্বাভাবিকভাবে স্থির। যেন প্রতিটি আ’ঘাতের সঙ্গে সঙ্গে তার ভেতরের বিকারগ্রস্ত ক্রোধ প্রশমিত হচ্ছে।
ইদ্রান বিরক্ত কণ্ঠে বলে উঠল,
“হোয়াট দ্য হেল, আফরিদ? অন্তত কথা বলতে দিতে!”
আফরিদ ধীরে ধীরে মুখ তুলল। তার চোখদুটো তখন শিকারি জন্তুর ন্যায় তীক্ষ্ণ। তার কণ্ঠে বরফশীতল নিষ্ঠুরতা।
“টাইম নেই। আমার পরাণ ভয় পেয়েছিল। ওরও তো ভয় পাওয়া উচিত ছিল।”
পরবর্তী কয়েক মিনিট কক্ষজুড়ে কেবল আর্ত’নাদ, ধাতব আ’ঘাতের বিকট শব্দ আর মৃ’ত্যুযন্ত্রণার ছটফটানি প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। মিস্টার রাইয়ানের দেহ যন্ত্রণায় মোচড়াচ্ছিল, অথচ আফরিদের চোখে কোনো দয়া জন্মাল না। বরং প্রতিটি মুহূর্তে সে আরও নৃশং’স, আরও বিকৃত হয়ে উঠছিল। শেষপর্যন্ত লোকটার কণ্ঠ ক্ষীণ হয়ে এলো। ছটফটানি স্তিমিত হলো। আর কক্ষজুড়ে নেমে এলো ভৌতিক নৈঃশব্দ্য। আফরিদ ধীরে ধীরে র’ক্তমাখা হাত মুছল। এই মূহুর্তে ইলহাম ন্যান্সি অ্যাঞ্জেলিনা তার হাতে র’ক্ত দেখলে কখনো ছুঁতে দেবে না। ঠিক তখনই কর্কশ শব্দে বেজে উঠল ইদ্রানের ফোন। ইদ্রান অন্যমনস্কভাবে কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো স্মাইলির কান্নাভেজা আর্তস্বরে চিৎকার,
“চার্ম,চার্ম,,,ইলহামকে ওরা ধরে নিয়ে গেছে, প্লিজ ওকে বাঁচাও।”
বাক্যটি শোনামাত্র ইদ্রান সটান দাঁড়িয়ে গেল। তার চোখেমুখে প্রথমবারের মতো আতঙ্কের ছায়া স্পষ্ট হয়ে উঠল।
“হোয়াট?”
প্রায় গর্জে উঠল সে।
“ইলহামকে কারা নিয়ে গেছে?”
‘ইলহাম’ নামটি কর্ণগোচর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আফরিদের সমগ্র অস্তিত্ব পরিবর্তিত হয়ে গেল। তার দৃষ্টি মুহূর্তেই ভয়ংকর তীক্ষ্ণতায় দীপ্ত হয়ে উঠল।
যেন সুপ্ত কোনো ধ্বংসযজ্ঞ জেগে উঠেছে অন্তরালে।
______________
সমগ্র ঢাকা শহর তখন তোলপাড়। ট্রাকভর্তি পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, বিশেষ বাহিনী সবাই একযোগে খুঁজে বেড়াচ্ছে ইলহাম ন্যান্সি অ্যাঞ্জেলিনাকে। কারণ নিখোঁজ হয়েছে আফরিদ এহসানের স্ত্রী। আর আফরিদ এহসান কেবল ব্যবসায়ী নয় সে এমন এক প্রভাবশালী শক্তি, যার ক্রোধ বহু রাষ্ট্রের ক্ষমতাকাঠামো পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিতে সক্ষম। মল থেকে শুরু করে আশেপাশের সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ একে একে এনে রাখা হয়েছে তার সামনে ল্যাপটপের স্ক্রিনে বারবার ভেসে উঠছে
কালো রঙের একটা গাড়ি। মুখোশধারী লোক।
আর তার অ্যাঞ্জেলিনার উপর নির্মম আ’ঘাত।
আফরিদের কপালের রগ ফুলে উঠেছে। মুষ্টিবদ্ধ হাতে শিরাগুলো স্পষ্ট হয়ে আছে। অন্যদিকে স্মাইলি কাঁদতেই আছে। আতঙ্কে তার অবস্থা প্রায় উন্মাদপ্রায়। ইদ্রান বারবার শান্ত করার চেষ্টা করছে, কিন্তু কোনো ফল হচ্ছে না। ঠিক তখনই নতুন এক আর্মি অফিসার টুটুল এসে দাঁড়াল আফরিদের সামনে।
“হ্যালো স্যার!”
বাক্য সমাপ্ত হওয়ার আগেই আফরিদ সজোরে ল্যাপটপটা ছুড়ে মারল মেঝেতে। চূর্ণবিচূর্ণ শব্দে কেঁপে উঠল পুরো কক্ষ। দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠল সে,
“বা’*** হ্যালো! আমার বউ কই? কই আমার বউ?”
তার বজ্রকঠোর গর্জনে উপস্থিত প্রত্যেকটি মানুষ সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল। ঠিক তখনই দৌড়ে এলো ঈশান।
হাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ফোন। ওপাশে থাকা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিদ্দিকি সাহেবের কণ্ঠ পর্যন্ত কাঁপছে আতঙ্কে। কারণ তিনি জানেন আফরিদ এহসানকে ক্রুদ্ধ করা মানে নিজের ধ্বংস নিজেই ডেকে আনা। দেশের অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, প্রভাবশালী মহলের গোপন সংযোগ সব মিলিয়ে লোকটা কেবল ব্যবসায়ী নয়, চলমান বিপর্যয়। তাছাড়া এই লোকটার হাত ঠিক কতটুকু লম্বা সেটাও জানেন উনি! এই আফরিদ এহসানের মুখোশের পেছনে ঠিক কার মুখাবয়ব লুকানো তা কিছু হলেও আন্দাজ করেছে। ঈশান কাঁপা গলায় বলল,
“বস, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী!”
আফরিদ প্রায় ছিনিয়ে নিল ফোনটা।তার কণ্ঠে উন্মত্ত গর্জন।
“তুই ওখানে বসে কি করিস হ্যাঁ? আমার বউয়ের যদি কিছু হয় এই দেশ জ্বা’লিয়ে দিতে এক মিনিটও লাগবে না আমার!”
ওপাশে সিদ্দিকি সাহেবের নিশ্বাস ভারী হয়ে এলো।কাঁপা স্বরে বললেন তিনি।
“আমি ফোর্স পাঠিয়েছি, আপনি বলুন, আর কি করতে হবে?”
আফরিদ পুনরায় স্ক্রিনের দিকে তাকাল। কালো গাড়িটা শহর ছাড়ার চেষ্টা করছে।
সম্ভবত বেরিয়েও গেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেই এলাকায় কোনো সিসিটিভি ফুটেজ নেই। পরক্ষণেই আফরিদ রুষ্ট, হিমশীতল কণ্ঠে আদেশ দিল,
“কারফিউ জারি কর। রাইট নাউ।”
একটু থেমে দাঁতে দাঁত চেপে পুনরায় বলল,
“গাড়িটা যেন কোনোভাবেই শহর ছাড়তে না পারে। আর যদি বের হয়… মাইন্ড ইট!”
_____________
মস্তিষ্কের পিছনেরভাগে প্রচণ্ড আঘা’তের অভিঘাতে ঠিক কতক্ষণ অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিল তার কোনো স্পষ্ট ধারণাই নেই ন্যান্সির। সময় যেন অস্তিত্ব হারিয়েছে। ধীরে ধীরে ভারাক্রান্ত চোখের পাতা কাঁপতে কাঁপতে উন্মীলিত হতেই দৃষ্টিপটে ভেসে উঠল অস্পষ্ট, ধোঁয়াটে এক পরিবেশ। চারপাশ যেন ঘন কুয়াশায় আবৃত ঝাপসা, বিভ্রান্তিকর, অস্বস্তিকর।
কয়েক সেকেন্ড পর উপলব্ধি হলো সে একটি চলমান গাড়ির ভেতরে অবস্থান করছে। গাড়ির অভ্যন্তর অন্ধকারাচ্ছন্ন। কেবল সামনের ক্ষীণ আলোয় অস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান দু’টি অপরিচিত অবয়ব। তাদের উপস্থিতি মুহূর্তেই ন্যান্সির অন্তর্গত সমস্ত স্নায়ুকে সতর্ক করে তুলল। উঠে বসার চেষ্টা করতেই শরীরের ভেতর শীতল আতঙ্ক নেমে এলো। তার হাতদ্বয় শক্ত রশিতে আবদ্ধ। পা বাঁধা। এমনকি মুখটিও মোটা কাপড়ে শক্তভাবে চেপে বাঁধা হয়েছে, ফলে স্বাভাবিকভাবে কথা বলাও অসম্ভব। বুকের ভেতর দ্রুত তালে ধকধক করতে লাগল হৃদস্পন্দন। পরবর্তী মুহূর্তেই স্মৃতির বিচ্ছিন্ন খণ্ডচিত্র বিদ্যুৎচমকের মতো ফিরে এলো মস্তিষ্কে শপিং মল। মুখোশধারী লোক। হঠাৎ আক্রমণ।
মাথায় আ’ঘাত। আর তারপর অন্ধকার। সমস্ত সত্য এক নিমিষে স্পষ্ট হয়ে উঠতেই আতঙ্ক যেন হিমশীতল স্রোতের মতো বয়ে গেল তার শিরা-উপশিরায়। তাকে অপহরণ করা হয়েছে। গাড়ির বাইরে কেবল দ্রুতগামী চাকার কর্কশ শব্দ। মাঝে মাঝে রাস্তার ধাক্কায় পুরো গাড়ি কেঁপে উঠছে। জানালার বাইরের অন্ধকারে কিছুই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না।
“উমম, উমম!”
আবদ্ধ মুখে অস্ফুট গোঙানি বেরিয়ে এলো ন্যান্সির।
পাশে বসে থাকা লোকদুটোর একজন বিরক্ত কণ্ঠে গর্জে উঠল,
“এই! চুপচাপ বসে থাক! আর একবার নড়াচড়া করলে এখানেই শেষ করে দেব!”
লোকটার কর্কশ কণ্ঠে ঘৃণ্য হিংস্র’তা মিশে ছিল। ন্যান্সির বুকের ভেতর দাউদাউ করে জ্বলে উঠল অপমান আর ক্ষোভ। যদি একবার হাতের বাঁধন খুলে যেত তাহলে ঠিক কে কাকে শেষ করত, সেটা সে দেখিয়ে দিত। কিন্তু এই মুহূর্তে সে অসহায়। সম্পূর্ণ বন্দি।গাড়িটা কোথায় যাচ্ছে, কত দূরে এসেছে কিছুই বুঝতে পারছে না সে।
মস্তিষ্কের ভেতর একটাই প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খেতে লাগল আফরিদ কি জেনেছে? সে কি বুঝতে পেরেছে ন্যান্সিকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে? তাহলে এখনো কেন আসছে না? চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ল। ঠিক তখনই ডানপাশে বসে থাকা আরেকজনের দিকে চোখ পড়তেই সমগ্র শরীর শীতল হয়ে এলো তার। লোকটার চোখদুটো
অস্বাভাবিকভাবে স্থির। লালসায় দগ্ধ। তার দৃষ্টি নিবদ্ধ ন্যান্সির বুকের দিকে নোংরা, লেলুপ, পিশাচসুলভ দৃষ্টিতে। ন্যান্সির গা ঘিনঘিন করে উঠল। অপমান, ভয়, বিতৃষ্ণা সব মিলিয়ে তার চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে লাগল আরও দ্রুত।
ধীরে ধীরে লোকটা হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করল তার অনাবৃত গলদেশ। মুহূর্তেই চোখদুটো শক্ত করে বন্ধ করে নিল ন্যান্সি। তার ভেতরকার সমস্ত শক্তি যেন ক্ষোভে কেঁপে উঠছে। আফরিদ এবারও কি তুমি আমাকে বাঁচাবে না?
“উমম!”
আবার অস্ফুট গোঙানি বেরিয়ে এলো তার গলা থেকে।
লোকটার হাত ধীরে ধীরে আরও নিচে নামতে উদ্যত
ঠিক তখনই প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে কেঁপে উঠল পুরো গাড়ি।
হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে ছিটকে দূরে সরে গেল লোকটা। গাড়ির ভেতর মুহূর্তেই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলো।
চলবে……….।
Share On:
TAGS: অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা, ফারহানা নিঝুম
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ২০
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ১৩
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৫৫ শেষ অর্ধেক
-
রেড রোজ সকল পর্বের লিংক
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৬
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ১২
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৩৬(প্রথমাংশ +শেষাংশ +বোনাস)
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৪
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৪৩
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৫৮