#লেখিকা_সুমি_চৌধুরী
#পর্ব ৬৩
স্টেজের মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে এক তরুণী হাসিমুখে বলল,
“হ্যালো, প্রিয় দর্শকবৃন্দ! সবাইকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। আপনারা সবাই জানেন, আজ আমাদের ক্লাবে দুটি হৃদয় একসূত্রে বাঁধা পড়েছে। সাইফান শুভ্র চৌধুরী এবং তার হবু স্ত্রী তাসনিন রিদি এই সুন্দর জুটিকে আমরা সবাই আগামী দিনের জন্য অনেক অনেক শুভকামনা জানাই। তাদের জীবন ভালোবাসা, হাসি আর সুখে পরিপূর্ণ হোক।”
কথা শেষ হতেই পুরো হলরুম জুড়ে বজ্রধ্বনির মতো হাততালি বেজে উঠল। চারদিকের উচ্ছ্বাস যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল। মেয়েটি একটু অপেক্ষা করে আবার মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“তবে আমি চাই, আজকের এই উদ্যাপনটা আরও একটু বিশেষ হয়ে উঠুক। তাই আমি অনুরোধ করছি সাইফান শুভ্র চৌধুরীকে তার হবু স্ত্রীর জন্য একটি গান গেয়ে আমাদের শোনানোর জন্য। দেখি, আমাদের এই সুন্দর জুটি আজ স্টেজও কাঁপিয়ে দিতে পারে কি না।”
আবারও চারপাশে হাততালির ঝড় উঠল। কেউ শিস দিল, কেউ উল্লাসে চিৎকার করে উঠল। পুরো পরিবেশটা যেন আনন্দ আর উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটতে লাগল।রিদির বুকের ভেতর তখন এক অদ্ভুত অনুভূতির ঢেউ বয়ে যাচ্ছে। এত মানুষের সামনে, এত শুভকামনার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকতে তার কেমন যেন অবিশ্বাস্য লাগছিল। আনন্দে তার হৃদপিণ্ডটা দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছে, ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক টুকরো হাসি লেগে আছে। মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তটা যেন তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলোর একটি।
কিন্তু ঠিক তখনই হঠাৎ চারপাশের সব আলো নিভে গেল।এক নিমিষে পুরো হলরুম অন্ধকারে ডুবে গেল।রিদি বিস্মিত হয়ে চারপাশে তাকাল। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে হাততালি, হাসি আর উল্লাসের শব্দে পরিবেশ মুখর ছিল, সেখানে হঠাৎ করেই এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছে। অন্ধকারে দাঁড়িয়ে তার মনে হলো, চারপাশের সবকিছু যেন মুহূর্তের জন্য থেমে গেছে। সে বিভ্রান্ত চোখে চারদিকে তাকাতে লাগল, বুঝতে চেষ্টা করল হঠাৎ কী ঘটল।
ঠিক তখনই স্টেজের ওপর হালকা আলো জ্বলে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে ভেসে এলো গিটারের সুর, আর তার সঙ্গে মিলেমিশে বেজে উঠল মুগ্ধকর এক মিউজিক। রিদি বিস্মিত চোখে স্টেজের দিকে তাকাল, আর পরের মুহূর্তেই তার হৃদস্পন্দন যেন বুক চিরে বেরিয়ে আসতে চাইল।স্টেজের মাঝখানে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে শুভ্র। তার হাতে গিটার, আঙুলগুলো দক্ষতার সঙ্গে তার ছুঁয়ে সুর তুলছে। ওপর থেকে নেমে আসা লাল এলইডি আলোর আভা তার অবয়বটাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। মাথায় বাঁধা ব্যান্ডানা, পরনে সাদা শার্ট, দূর থেকে তাকে কোনো সাধারণ মানুষ নয়, বরং কোনো মঞ্চ কাঁপানো রকস্টার কিংবা সিনেমার নায়কের মতো লাগছে।
তাকে দেখেই দর্শকদের মাঝে উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ল। চারদিক থেকে শিস, হাততালি আর চিৎকারের শব্দ উঠতে লাগল। ঠিক তখনই হলরুমের সমস্ত আলো জ্বলে উঠল। পুরো পরিবেশ যেন প্রাণ ফিরে পেল।রিদি মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইল স্টেজের দিকে। চোখ সরানোর ক্ষমতাটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছে সে। শুভ্র গিটারের তারে আঙুল বুলাতে বুলাতে সুর তুলল, তারপর গভীর আবেগে গেয়ে উঠল।
“মন তোকে ছাড়া বুঝে না রে”
“মন তোকে ছাড়া বুঝে না রে”
“বুকে লেখা তোরই নাম”
“প্রেম উড়িয়ে দিলাম”
“মন আর কিছু খোঁজে না রে”
তার কণ্ঠ, তার উপস্থিতি, তার আত্মবিশ্বাস সব মিলিয়ে পুরো স্টেজ যেন তার দখলে চলে গেল। দর্শকরা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে, আর রিদি নিচে দাঁড়িয়ে অবিশ্বাসের চোখে দেখছে সেই মানুষটাকে, যাকে সে ভালোবাসে।হঠাৎ শুভ্রের দৃষ্টি এসে থামল রিদির ওপর।এক মুহূর্তের জন্য যেন আশেপাশের শত শত মানুষ হারিয়ে গেল। গিটার বাজাতে বাজাতেই সে সরাসরি রিদির দিকে তাকিয়ে বেসামাল কন্ঠে নেশাতুর চোখে তাকিয়ে গেয়ে উঠল।
“তোকে শুধু গড়ি আমি ভেঙে চুরে নিজে”
“দিবানিশি কাটে তোরই অনুভবে ভিজে”
“বুকে লেখা তোরই নাম”
“প্রেম উড়িয়ে দিলাম”
“মন আর কিছু খোঁজে না রে”
“মন তোকে ছাড়া বুঝে না রে”
“মন তোকে ছাড়া বুঝে না রে”
রিদির মনে হলো তার নিঃশ্বাস আটকে যাচ্ছে। বুকটা এত দ্রুত উঠানামা করছে যে ঠিকমতো শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। চারপাশের শব্দ ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসছে, কানে শুধু শুভ্রর কণ্ঠস্বরই বাজছে।শুভ্র পুরো স্টেজজুড়ে ঘুরে ঘুরে গিটার বাজাচ্ছিল। তারপর আচমকাই চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ এক সুর টানল।
“ইয়ে…… এএএ…… ওহহহ….. ওওও…..”
সুরটা এতটাই আবেগময় আর নেশামাখা ছিল যে দর্শকদের ভেতর থেকে কয়েকজন উচ্ছ্বাসে চিৎকার করে উঠল। পুরো হলরুম আবারও করতালি আর উল্লাসে ফেটে পড়ল।শুভ্র ধীরে ধীরে চোখ খুলল। তার দৃষ্টি আবারও এসে থামল রিদির ওপর। তারপর গভীর অনুভূতিতে ভরা কণ্ঠে গেয়ে উঠল।
“তোর মাঝে খুঁজে ফিরি জীবনের মানে”
“মরে যাবো দূরে গেলে কভু অভিমানে”
“বুকে লেখা তোরই নাম”
“প্রেম উড়িয়ে দিলাম”
“মন আর কিছু খোঁজে না রে”
“মন তোকে ছাড়া বুঝে না রে”
“মন তোকে ছাড়া বুঝে না রে”
_______________
কেটে গেছে কিছুদিন।দূর আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা লন্ডন শহরটা আজও নিজের চিরচেনা ব্যস্ততায় মগ্ন। সারি সারি সুউচ্চ ভবন, ঝকঝকে কাঁচে মোড়া আধুনিক স্থাপত্য আর শতবর্ষের পুরোনো ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো যেন একই শহরে অতীত আর বর্তমানের এক অপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি করেছে। প্রশস্ত রাস্তাগুলোয় অবিরাম ছুটে চলেছে গাড়ির সারি, লাল রঙের ডাবল-ডেকার বাসগুলো শহরের ব্যস্ততার মাঝে আলাদা সৌন্দর্য যোগ করেছে। দূরে টেমস নদীর শান্ত জলরাশি নগরীর কোলাহলের মাঝেও এক টুকরো প্রশান্তির ছোঁয়া এনে দেয়। সন্ধ্যা নামলে হাজারো রঙিন আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে পুরো শহর, যেন নক্ষত্রগুলো আকাশ ছেড়ে নেমে এসেছে লন্ডনের বুকে। পৃথিবীর অন্যতম আধুনিক ও প্রাণচঞ্চল এই শহরটিতে প্রতিটি মুহূর্তই নতুন গল্পের জন্ম দেয়।
লন্ডনের অভিজাত এক এলাকার বহুতল ভবনের সর্বোচ্চ তলার বিশাল অফিসরুমটিতে তখন অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। কাঁচের দেয়ালের ওপারে রাতের লন্ডন আলোয় ঝলমল করছে, কিন্তু সেই সৌন্দর্যের এক বিন্দুও যেন ছুঁতে পারছে না রুমের ভেতরে বসে থাকা মানুষটিকে।
চেয়ারে হেলান দিয়ে মাথা পেছনে ঠেকিয়ে বসে আছে এক সুদর্শন পুরুষ। তার দুই আঙুলের ফাঁকে ধরা জ্বলন্ত সিগারেট থেকে ধীরে ধীরে ধোঁয়া উঠে বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। চোখ দুটো বন্ধ, মাঝে মাঝেই সে গভীর টান দিচ্ছে সিগারেটে। চোখের নিচে স্পষ্ট কালচে দাগ, মুখে ক্লান্তির ছাপ। তাকে দেখলেই মনে হয় বহুদিন ধরে ঠিকমতো ঘুম তার চোখে ধরা দেয়নি। যেন কোনো অদৃশ্য যন্ত্রণা প্রতিদিন একটু একটু করে তাকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে।
ঠিক তখনই দরজাটা ধীরে খুলে ভেতরে প্রবেশ করল একজন। কয়েক পা এগিয়ে এসে সে সম্মানের সঙ্গে পুরুষটির সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“বাংলাদেশ থেকে বড় সাহেব কল দিয়েছিলেন। আপনাকে দেশে ফিরতে বলছেন।”
কথাটা শুনেও পুরুষটির মুখের কোনো পরিবর্তন হলো না। চোখও খুলল না সে। শুধু হাত তুলে ইশারা করল চলে যাওয়ার জন্য।লোকটি আর কিছু না বলে মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেল।রুমে আবারও নেমে এলো নীরবতা।কয়েক মুহূর্ত পর পুরুষটি ধীরে ধীরে চোখ খুলল। তারপর হাত বাড়িয়ে টেবিলের ওপর রাখা ফোনটা তুলে নিল। স্ক্রিনে একই নাম্বার থেকে ছয়টি মিসড কল ভেসে উঠছে।
সে জানত কলগুলো কার।ইচ্ছা করেই ধরেনি।কথা বলার মতো মানসিক অবস্থায় সে ছিল না।একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নাম্বারটিতে কল ব্যাক করল।
দুইবার রিং হতেই ওপাশ থেকে কল রিসিভ হলো। ভেসে এলো এক বয়স্ক পুরুষের গম্ভীর কণ্ঠ।
“এখন দেশে আয়। রাস্তা ক্লিয়ার। তোর কেসটাও আমি সলভ করে ফেলেছি।”
পুরুষটির ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক বিষাক্ত হাসি ফুটে উঠল।
“আর ইউ শিওর?”
ওপাশ থেকে দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর এলো,
“হ্যাঁ। নির্ভান, ফিরে আয়। শুভ্রের বিয়ে ওদের সুখ আমার সহ্য হচ্ছে না।”
এক মুহূর্তে নির্ভানের ঠোঁটের হাসিটা মিলিয়ে গেল।চোখ দুটো স্থির হয়ে এলো।
মনে হলো কেউ যেন হঠাৎ করে বহুদিনের চাপা ক্ষতটাকে আবার ছুরি দিয়ে খুঁচিয়ে দিয়েছে।তার ঠোঁট নড়ল।মাত্র দুটি শব্দ উচ্চারিত হলো।
“রিদি।”
ওপাশ থেকে নাইম খান শান্ত গলায় বললেন,
“হ্যাঁ। তার ফুফাতো বোনের সঙ্গে।”
বুকের গভীরে বহু বছর ধরে চাপা পড়ে থাকা পুরোনো ব্যথাটা আবারও মাথা তুলে দাঁড়াল। কিন্তু নির্ভান চিৎকার করল না, ভাঙল না, কোনো আর্তনাদও বের হলো না তার মুখ দিয়ে।শুধু কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে জানালার ওপারে ছড়িয়ে থাকা আলোঝলমলে শহরটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর সম্পূর্ণ শান্ত কণ্ঠে বলল।
“আমি আসছি।”
কলটা কেটে যেতেই রুমটা যেন আরো নীরব হয়ে গেল। কবরের মতো এক গা ছমছমে নিস্তব্ধতা গ্রাস করল পুরো ঘরকে। নির্ভান চেয়ারে মাথাটা পুনরায় হেলিয়ে দিল। তীব্র মানসিক ক্লান্তিতে অজান্তেই চোখ জোড়া বন্ধ হয়ে এলো তার। বুকটা তখনো কামারের হাঁপরের মতো দ্রুত ওঠানামা করছে, মুখ দিয়ে বের হচ্ছে দীর্ঘ আর তপ্ত নিশ্বাস। বন্ধ চোখের পাতায়, স্মৃতির অন্ধকার পর্দায় হুট করেই ভেসে উঠল এক অষ্টাদশীর মায়াবী মুখ। বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যেতেই সে অবশ গলায় অজান্তেই গুনগুন করে গেয়ে উঠল।
“তোমায় আমি পাইলাম রে”
“তাতে কোনো দুঃখ নাই”
“পাইলো যেজন রাইখো তারে”
“দিয়া সুখ পুরোটাই”
গানটা শেষ হতেই চাবুক খাওয়া পশুর মতো হঠাৎ চোখ খুলল সে। সেই শান্ত চোখ জোড়া মুহূর্তে চরম প্রতিহিংসায় আগুনের মতো জ্বলে উঠল। এতক্ষণের তপ্ত নিশ্বাসগুলো এখন আর কেবল ক্লান্তির জানান দিচ্ছে না, তাকে দেখাচ্ছে খাঁচায় বন্দি কোনো হিংস্র জানোয়ারের মতো।
ভেতরের সেই ভয়াবহ আক্রোশ আর ধরে রাখতে পারল না নির্ভান। বাঘের মতো লাফিয়ে উঠে সামনে থাকা থাই গ্লাসে সজোরে এক ঘুষি মারল। কানফাটানো শব্দে গ্লাসের কাঁচ ফেটে চারদিকে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। ধারালো কাঁচের কিছু টুকরো চামড়া কেটে মাংসের ভেতর ঢুকে গেল গভীর হিংস্রতায়। হাত বেয়ে টপটপ করে তাজা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে মেঝেতে, কিন্তু সেই শারীরিক যন্ত্রণা ছোঁয়ার মতো মানসিক অবস্থা এখন আর তার নেই। সেদিকে সম্পূর্ণ খেয়ালহীন হয়ে, সে সামনের কাঁচের টেবিলটা দুই হাতে খামচে ধরে এক পৈশাচিক আর্তনাদ করে উঠল।
“Fuck this bullshit called love.”
চিৎকারটা শেষ হতেই পুরো টেবিলটা শূন্যে তুলে আছাড় মারল সে। মুহূর্তে টেবিলটা শক্ত মেঝেতে আছাড় খেয়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। পুরো রুমটা এখন ভাঙা কাঁচের এক একটা ধারালো মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। নির্ভান দেয়ালে রক্তাক্ত হাতটা চেপে ধরে, দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে বলল।
“শুভ্র আই এম কামিং! হেসে নে, আনন্দ করে নে। কারণ যত হাসি, তত কান্না। কষ্ট আসলে কী জিনিস, এবার তোকে আমি হাড়ে হাড়ে বোঝাবো।”
__________
চৌধুরী বাড়িতে আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। মানুষের হাসাহাসি আর কোলাহলে পুরো চৌধুরী বাড়িটা মুখরিত হয়ে উঠেছে। আজ শুভ্র আর রিদির গায়ে হলুদ। সকাল থেকেই পুরো বাড়িটাকে একদম নিখুঁতভাবে সাজিয়ে তোলা হয়েছে, এমনকি বাইরের রাস্তাঘাটেও ঝলমলে মরিচ বাতি দেওয়া হয়েছে।
আত্মীয়-স্বজন অনেকেই চলে এসেছে, বাকিরা আসবে কাল। তবে সবচেয়ে কাছের মেহমানগুলো ইতিমধ্যে হাজির। ঠিক সন্ধ্যার সময় তূর্য আর রিফাত তাদের বাবা-মাকে নিয়ে এসে পৌঁছাল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই রিদিদের বাড়িতে হলুদ নিয়ে রওনা হবে। শুভ্রা পাখি মিহি আর তার ফ্রেন্ড চারিদের নিয়ে পাল্লারে গিয়েছে সাজতে,রিদিদের বাড়ি থেকে রিদিকেও পাল্লারে নিয়ে গেছে। এত কিছুর মধ্যেও শুভ্র একেবারে স্বাভাবিক। ও ড্রইংরুমের সোফায় বসে নিজের মতো ফোন টিপছে, গায়ের ওপর জড়ানো একটা নরমাল কালো শার্ট আর পরনে সাদা প্যান্ট।
রিফাতের বাবা আর তূর্যর বাবা, সোহান চৌধুরীর সাথে কুশল বিনিময় করে কথা বলতে থাকলেন,। ইতিমধ্যে ঈশানও সেখানে হাজির হলো। তার গায়ে নীল শার্ট আর সাদা প্যান্ট। সে সোজা শুভ্রের পাশে এসে বসল, তারপর আড়চোখে শুভ্রের দিকে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল।
“বস, আপনার বিয়ে, আর আপনি কীভাবে এত স্বাভাবিক আছেন?”
শুভ্র ফোন থেকে চোখ না সরিয়েই উত্তর দিল।
“সো, হোয়াট? এখন কি আমি লজ্জায় রুমাল ধরে বসে থাকবো?”
ঈশান হালকা হেসে বলল।
“হ্যাঁ, এটাই তো নিয়ম।”
শুভ্র নাক-মুখ কুঁচকে বিরক্তি প্রকাশ করে বলল।
“ফালতু নিয়ম।”
এরিমধ্যে পাশে ধপাস করে বসে তূর্য শুভ্রর কাঁধে হালকা ধাক্কা মারল,। তারপর একেবারে পেশাদার গায়কদের মতো চোখ বুজে, হাত নাচিয়ে শুভ্রকে শুনিয়ে শুনিয়ে গিটকিরি দিয়ে গেয়ে উঠল।
“নৌশা সেজে যাবো আমি বন্ধু তোমার বাড়ি”
“তোমার অঙ্গে সেদিন প্রিয়া থাকবে লাল শাড়ি।”
তূর্যর শেষ লাইনটা শেষ হতে না হতেই সোফার আরেক পাশে বসে পড়ল রিফাত, রিফাত যেন তৈরিই ছিল। শুভ্রকে খেপানোর এমন মোক্ষম সুযোগ সে হাতছাড়া করে কীভাবে? সে তূর্যর পিঠে এক চাপড় বসিয়ে, তার চেয়েও দ্বিগুণ উৎসাহে আর চড়া গলায় তূর্যর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে পরের লাইন দুটো গেয়ে উঠল।
“বিয়ার সাজন সাজিবে”
“আমার পাশে বসিবে”
পুরো ড্রইংরুমে তখন বন্ধুদের অট্টহাসি আর হাততালির রোল। ঈশান তখন চুপচাপ বসে ছিল, কিন্তু ওদের এমন উন্মাদনা দেখে আর চুপ থাকতে পারল না। শুভ্রর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে চরম দুষ্টুমি ভরা একটা হাসি দিল। তারপর বিড়ালের মতো খামচি কাটার ভঙ্গিতে নাকে হাত দিয়ে, অবিকল বাসর ঘরের লাজুক কনের মতো চোখ-মুখ কুঁচকে, রিফাতকে টেক্কা দিয়ে খিলখিলিয়ে গেয়ে উঠল।
“আদর দিমু তোমারে”
“বা’সরে নিয়া।”
পরক্ষণেই তূর্য, রিফাত আর ঈশান তিনজনে একসাথে তাল মিলিয়ে, ড্রইংরুমের ছাদ ফাটানো গলায় কোরাস গেয়ে উঠল।
“ওগো পরানের প্রিয়া আমার ময়না টিয়া”
“বছর শেষে বাড়ি এসে করিবো বিয়া”
Share On:
TAGS: অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায়, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১০
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৫৫( প্রশেষ অংশ রিদির শেষ চিঠি)
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৬
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৪৮
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬১
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৫
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৩৭
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৫৩
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ২৩
-
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৫