অসম্ভবরকমভালোবাসি_তোমায়
লেখিকাসুমিচৌধুরী
পর্ব ৫৪
অতীত,,,,
কেটে গেছে দীর্ঘ দুই মাস। এই দুই মাসে রিদি এক জীবন্ত কঙ্কালে পরিণত হয়েছে। শরীরের সবটুকু শক্তি যেন কোনো এক অদৃশ্য দহন শুষে নিয়েছে। গুনে গুনে ৯ বার পাত্র পক্ষ তাকে দেখতে এসেছে আর প্রতিবারই রিদি কোনো না কোনোভাবে পাগলামি করে তাদের তাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে শুভ্রের কোনো হদিস মেলেনি। ফোন দিলেই সেই যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ভেসে আসে “আপনার কাঙ্ক্ষিত নম্বরটি এই মুহূর্তে বন্ধ আছে”।
মেয়ের এই অবাধ্যতায় ইকবাল এহসান আজ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন। ধৈর্য তার সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। আজ সকালে তিনি উন্মত্তের মতো রিদির রুমে ঢুকলেন। তার এক হাতে ধারালো একটা ছুরি। রিদি কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি নিজের গলার কাছে ছুরিটা চেপে ধরলেন। রক্তিম চোখে রিদির দিকে তাকিয়ে কাঁপাকাঁপা গলায় বললেন।
“আজ শেষবারের মতো তোকে দেখতে আসবে। যদি আজকের পর কোনো রকম পাগলামি করিস তবে আমি নিজেই এই ছুরিটা নিজের গলায় চালিয়ে দেব। তখন বাবার লাশের ওপর দিয়ে তুই শুভ্রের কাছে চলে যাস। দেখি তোর কাছে এখন কে বড়। যে জন্ম দিয়ে তিল তিল করে বড় করেছে সেই পিতা বড় নাকি দুদিনের ভালোবাসা শুভ্র বড়।”
বাবার এই ভয়াবহ রূপ দেখে রিদির পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। তার মনে হলো মাথায় এক প্রচণ্ড বজ্রপাত হয়েছে। সে একদম নিথর হয়ে গেল। কোনো শব্দ তার মুখ দিয়ে সরল না। ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরে কাজী সাহেবকে নিয়ে ঢুকলেন সোহান চৌধুরী। তার পেছনে কাজী সাহেব রিদির সামনে একটি ডিভোর্স লেটার আর কলম এগিয়ে দিয়ে নিচু স্বরে বললেন।
“মা এই কাগজে একটা সই করো।”
রিদি দুই মাস ধরে লড়ে যাওয়া সবটুকু শক্তি হারিয়ে ফেলল। সে কাঁপা হাতে কাগজের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
“এইটা কিসের কাগজ?”
ইকবাল এহসান ছুরিটা গলায় আরও জোরে চেপে ধরে গর্জে উঠলেন।
“ডিভোর্সের কাগজ। শুভ্রের সাথে আজই তোর সব সম্পর্ক ছিন্ন হচ্ছে।”
কথাটা শোনামাত্র রিদি দুই কানে হাত দিয়ে পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল। তার আর্তনাদে যেন ঘরের আসবাবপত্রগুলোও কেঁপে উঠল।
“নাহহ! নাহহ! নাহহ! আমি মরে যাব! সরাও এই কাগজ তোমরা! আমি সই করব না। তোমরা আমাকে মেরে ফেলো কিন্তু শুভ্র ভাইয়ের থেকে আলাদা করো না।”
সোহান চৌধুরী রিদির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললেন।
“পাগলামি করিস না রিদি। আমরা তোর ভালোর জন্যই করছি। সই করে দে মা। শুভ্রের চেয়েও বড় রাজপুত্রের সাথে তোকে বিয়ে দেব। যে শুভ্রের চেয়েও সুন্দর হ্যান্ডসাম। দেখবি তুই অনেক সুখী হবি মা।”
রিদি ভালোবাসার এমন এক চরমে পৌঁছেছে যে সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। সে সোহান চৌধুরীকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে আর্তনাদ করে উঠল।
“না না। আমার কোনো সুন্দর হ্যান্ডসাম ছেলে চাই না। আমার শুধু আমার শুভ্র ভাইকেই চাই। মরে যাব তবু আমি কাউকে বিয়ে করব না। মামা তুমি এই কাগজ নিয়ে চলে যাও। এই কাগজে আমি কখনো সই করব না।”
ইকবাল এহসান এবার রিদির দিকে তাকিয়ে মরণপণ চোখে তাকালেন। তিনি দাঁতে দাঁত চেপে বললেন।
“সই করবি না তো। ঠিক আছে। তাহলে বাবার মরা মুখই দেখ তুই।”
বলেই ইকবাল এহসান নিজের গলায় ছুরি চালাতে উদ্যত হলেন। সোহান চৌধুরী দ্রুত তার হাত টেনে ধরলেন। ইকবাল এহসান তখনো উন্মত্তের মতো চিৎকার করছেন।
“ছেড়ে দিন ভাইসাব। আমাকে মরতে দিন। আমি আর এই কলঙ্ক সহ্য করতে পারছি না। এর চেয়ে আমার মরে যাওয়াই ভালো।”
ঠিক সেই মুহূর্তে রাবেয়া এহসান ঘরে ঢুকলেন। এই বীভৎস দৃশ্য দেখে তিনি রিদির কাঁধ ধরে সজোরে ঝাঁকাতে লাগলেন। তিনি তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন।
“তুই কি তোর বাবাকে মেরে ফেলতে চাস। এখন তোর কাছে কি তোর ভালোবাসাই সব হয়ে গেল। যে মানুষটা এত কষ্ট করে তোকে তিল তিল করে বড় করল সেই বাবাকেই তুই তোর ভালোবাসার জন্য শেষ করে দিবি। তোর জন্মদাতার চেয়ে তোর ওই দুদিনের ভালোবাসা বড় হয়ে গেল।”
রিদির মাথাটা বনবন করে ঘুরতে লাগল। সারা শরীর প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে এল তার। সে বুঝতে পারছে সে তার শুভ্র ভাইকে হারাতে চলেছে। এই পরিবার তাকে অন্য কারো হাতে তুলে না দেওয়া পর্যন্ত শান্ত হবে না। রিদি কোনোমতে বিছানার কোণা আঁকড়ে ধরল। তার বুকের ভেতরটা যেন খাঁ খাঁ করছে। সে মনে মনে ডুকরে কেঁদে উঠল।
“শুভ্র ভাই কেন আমাকে এভাবে একা ফেলে গেলেন। কী অপরাধ ছিল আমার। আমি যে আর লড়তে পারছি না শুভ্র ভাই। আমি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছি। আমার মনে হচ্ছে আমি আর বেশি দিন বাঁচব না। একবার ফিরে আসেন আপনি। সবাইকে বোঝান আমি আপনার জন্য কতটা পাগল। সবাইকে বলেন আমি আপনাকে ছাড়া বাঁচব না। ফিরে আসেন শুভ্র ভাই। আমি আর পারছি না।”
হঠাৎ রিদির মুখে এক অদ্ভুত বিষাদ মাখা হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসিতে কোনো প্রাণ ছিল না, ছিল কেবল এক গভীর শূন্যতা। সে ধীর পায়ে হাতে কাগজটা টেনে নিল এবং কোনো দ্বিধা ছাড়াই সুন্দর করে সই করে দিল। সই শেষ করে সে বিছানা থেকে নেমে ইকবাল এহসানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল।
“আমাকে ক্ষমা করে দাও বাবা। অনেক কষ্ট দিয়েছি তোমাদের। আর কখনো দেব না। এবার একদম চিরতরে মুক্তি দিয়ে চলে যাব। আর আজ পাত্রপক্ষের সামনে আমি কোনো পাগলামি করব না। একদম ভদ্র মেয়ের মতো হয়ে থাকব, কথা দিলাম।”
রিদির এই আকস্মিক পরিবর্তনে ঘরের সবাই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। ইকবাল এহসান সাথে সাথে হাতের ছুরিটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে রিদিকে জাপটে ধরে বুকে টেনে নিলেন। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে পরম মমতায় বললেন।
“আমি তোর বাবা রিদি। বাবা কখনো তার মেয়ের খারাপ চায় না রে মা। বাবারা যেমন আদরে বিড়াল হতে পারে, তেমনি মেয়ের মঙ্গলের জন্য কঠোর হতেও জানে। বাবা-মায়ের ভালোবাসা তুই এখন বুঝবি না, যখন নিজে মা হবি তখন বুঝবি।”
সোহান চৌধুরীও মনে মনে বেশ খুশি হলেন। তিনি ভাবলেন, ইকবাল এহসানের আত্মহত্যার হুমকি কাজ দিয়েছে রিদি ভয়ে নিজেকে বুঝিয়ে নিয়েছে।
বিকেল হতে না হতেই রিদিদের বাড়িতে নতুন আমেজ। এটা ছিল দশ নম্বর সম্বন্ধ। বরাবরের মতোই শুভ্রা রিদিকে যত্ন করে সাজিয়ে নিচে নিয়ে এল। কিন্তু আজ রিদির চোখে কোনো পানি নেই, বরং এক ধরণের শীতল স্থিরতা। সে ড্রয়িংরুমে ঢুকে সবাইকে বিনম্রভাবে সালাম দিল।
“আসসালামু আলাইকুম।”
পাত্রপক্ষের সবাই হাসিমুখে সালামের উত্তর নিলেন। রিদিকে সবার মাঝে বসানো হলো। পাত্রের নাম সাদ সে বেশ শান্তশিষ্ট। সে মাথা নিচু করে থাকলেও আড়চোখে বারবার রিদিকে দেখছিল। বড়রা রিদিকে যা যা প্রশ্ন করলেন, সে একদম আদর্শ মেয়ের মতো গুছিয়ে জবাব দিল। কোনো প্রতিবাদ নেই, কোনো শুভ্রর নাম নেওয়া নেই।সবশেষে ছেলেপক্ষ জানাল, রিদিকে তাদের ভীষণ পছন্দ হয়েছে। বিশেষ করে ছেলের বাবা মুগ্ধ হয়ে ছেলের কানে কানে বললেন।
“আমার এই মেয়েকেই বউমা হিসেবে চাই রে সাদ।”
অবশেষে দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর রিদির বিয়ে ঠিক হলো। আজ মঙ্গলবার। ছেলেপক্ষ প্রস্তাব দিল আগামী শুক্রবারই ফাইনাল ডেট। দুই পরিবারের সম্মতিতে সেই তারিখেই বিয়ের মোহর লাগানো হলো। সবাই যখন খুশিতে আত্মহারা, রিদি তখনো সেই ম্লান হাসি মুখে নিয়ে পাথরের মতো বসে রইল। কেউ টেরও পেল না, এই হাসির আড়ালে রিদি আসলে কোনো অমোঘ পরিণতির দিকে হেঁটে যাচ্ছে।
দুদিন পর রিদি আর আগের মতো পাগলামি করে না। সে এখন সময়মতো খাওয়া-দাওয়া করে, ইমনের সাথে বসে আড্ডা দেয়, এমনকি লুডুও খেলে। বাড়িতে বিয়ের ধুম লেগেছে, আত্মীয়-স্বজনের আনাগোনা বাড়ছে। রিদির মুখে হাসি দেখে রাবেয়া এহসান আর ইকবাল এহসান যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। অবশেষে মেয়েটা স্বাভাবিক হতে শিখেছে। কিন্তু রিদির এই অতি স্বাভাবিক আচরণ কিছুতেই মানতে পারছেন না সাহেরা চৌধুরী। যে মেয়েটা শুভ্রকে ছাড়া নিশ্বাস নিতে পারছিল না, সে এত তাড়াতাড়ি সব ভুলে কীভাবে এত হাসিখুশি হয়ে গেল? সাহেরা চৌধুরীর বুকের ভেতরটা কু ডাকছে।
আজ বৃহস্পতিবার, রিদির গায়ে হলুদ। পুরো বাড়ি ঝলমলে আলোকসজ্জায় সাজানো হয়েছে। সদর দরজা থেকে রাস্তা পর্যন্ত মরিচ বাতি দিয়ে বর্ণিল করে তোলা হয়েছে। রিদি ড্রয়িংরুমে এসে তার বাবার সামনে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় বলল।
“আব্বু, আমি একটু মার্কেটে যেতে চাই। আমার নিজের পছন্দের কিছু জিনিস কেনার আছে।”
ইকবাল এহসান মেয়ের আবদারে খুশি হয়ে বললেন।
“ঠিক আছে মা, তুই রেডি হয়ে আয়। আমি নিজেই তোকে নিয়ে যাচ্ছি।”
রিদি তৈরি হয়ে আসলো। শুভ্রাও সাথে নিল। ইমনও নাছোড়বান্দা, সেও যাবে। শেষমেশ ইকবাল এহসান রিদি, শুভ্রা আর ইমনকে নিয়ে বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্স-এ আসলেন। মার্কেটে ঢোকার পর রিদি আর ইমন যখন অন্য দোকানে ব্যস্ত, শুভ্রা তখন সুযোগ খুঁজতে লাগল। সে অন্য একটা মার্কেটের ছুতো দিয়ে একটু আড়ালে সরে আসলো। একটি দোকানের কর্মচারীকে লক্ষ্য করে সে বিনীতভাবে বলল।
“ভাইয়া, আপনার ফোনটা একটু দেওয়া যাবে? জাস্ট দুই মিনিটের জন্য একটা আর্জেন্ট কল দিতাম।”
কর্মচারী সানন্দে ফোন বাড়িয়ে দিলেন। শুভ্রা বুক ধকপকানি নিয়ে চারদিকে একবার তাকিয়ে শুভ্রের সেই বিদেশী নাম্বারে ডায়াল করল। কিন্তু ওপাশ থেকে সেই চিরচেনা যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ফোন বন্ধ। আর কেউ না জানুক, শুভ্রা মনে মনে নিশ্চিত যে রিদি বড় কোনো নাটক করছে। কারণ ভালোবাসা এত সহজে মুছে ফেলে নতুন জীবন সাজানো যায় না। শুভ্রার প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে নিজের ভাইটার ওপর। কেউ কি এভাবে নিরুদ্দেশ হয়ে ফোন বন্ধ করে রাখে।
হঠাৎ শুভ্রার মাথায় ঈশানের কথা খেলে গেল। এত কিছু হয়ে গেল অথচ ঈশানকে কিছুই জানানো হয়নি। সোহান চৌধুরী তাকে বাড়ির বাইরে এক কদমও বের হতে দেননি, এমনকি ফোনটাও কেড়ে নিয়েছে। শুভ্রা চট করে ঈশানের মুখস্থ নাম্বারটা ডায়াল করল। কয়েকবার রিং হতেই ওপাশ থেকে রিসিভ হলো। শুভ্রা অস্থির হয়ে ফিসফিস করে বলল।
“ঈশান ভাইয়া, আমি শুভ্রা। আপনি কোথায়?”
ঈশান অবাক হয়ে বলল।
“আরে শুভ্রা! কেমন আছো? তোমার ফোন বন্ধ ছিল কেন এতদিন?”
শুভ্রা কান্নারত গলায় বলল।
“সব কথা পরে বলা যাবে ভাইয়া। আপনি আগে বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্স-এ আসেন।
শুভ্রার কথা শুনে ঈশান অস্থির হয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যেই শপিং কমপ্লেক্সের সামনে চলে আসলো। শুভ্রা আগে থেকেই রাস্তার এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল। ঈশানকে দেখা মাত্রই সে এগিয়ে গিয়ে তার হাত ধরে টেনে মার্কেটের পাশের একটা নির্জন গলির চিপায় নিয়ে গেল। শুভ্রাকে এতটা বিধ্বস্ত আর আতঙ্কিত দেখে ঈশান কপালে ভাঁজ ফেলে বলল।
“কী হয়েছে শুভ্রা? তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?।”
শুভ্রা কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল।
“ভাইয়া, সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। রিদির বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। কালই ওর বিয়ে!”
ঈশান চোখ কপালে তুলে চিৎকার করে উঠল।
“হোয়াট! শুভ্রা, তুমি কি আমার সাথে মজা করছো?”
“আমি একটুও মজা করছি না ভাইয়া, একদম সিরিয়াস। কাল রিদির বিয়ে। গত দু-মাসে এখানে যা যা হয়ে গেছে আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না।”
শুভ্রা শুরু থেকে সবটুকু শুভ্রের ফোন বন্ধ থাকা, ইকবাল এহসানের গলায় ছুরি ধরা আর শেষ পর্যন্ত রিদির ওই ডিভোর্স পেপারে সই করা সবকিছু খুলে বলল। সব শুনে ঈশান মাথায় হাত দিয়ে পাগলের মতো অস্থির হয়ে হাত কচলাতে কচলাতে বলল।
“শুভ্রা, তোমরা জানো না কী হচ্ছে! বসের জীবন নিয়ে খেলছে তোমাদের এই দুই পরিবার। রিদির বিয়ে হয়ে গেলে বস জ্যান্ত পাগল হয়ে যাবে। আমি তো জানি বস রিদিকে কতটা পাগলের মতো ভালোবাসে। যেভাবেই হোক এই বিয়ে থামাতে হবে আমাদের।”
শুভ্রা অসহায় গলায় বলল।
“কিন্তু কীভাবে? ভাইয়াও তো দেশে নেই, আর ভাইয়ার ফোনটাও সেই যে বন্ধ হয়েছে এখন পর্যন্ত খোলেনি।”
ঈশান এবার রাগে ফেটে পড়ল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল।
“বসের এই জিনিসটা আমার একদম ভালো লাগে না। কোথাও গেলেই ফোনটা বন্ধ করে রাখবে! আরে ফোনটা অন্তত খোলা রাখ, কারণ বিপদ তো আর সময় মেপে বা বলে-কয়ে আসে না। এখন এই মুহূর্তে উনাকে না পেলে পরিস্থিতি একদম হাতের বাইরে চলে যাবে।”
ঈশান পকেট থেকে নিজের ফোন বের করে আবার পাগলের মতো শুভ্রের নাম্বারে ট্রাই করতে লাগল। ওপাশ থেকে সেই একই যান্ত্রিক স্বর বারবার ভেসে আসছে। ঈশান দেওয়ালের ওপর একটা লাথি মেরে বলল।
“শুভ্রা, তুমি রিদির কাছে যাও। ও যে হুট করে সই করে দিয়ে শান্ত হয়ে গেছে, এটা মোটেও ভালো লক্ষণ না। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে ও ভেতরে ভেতরে বড় কোনো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। তুমি ওকে এক মুহূর্তের জন্য চোখের আড়াল করো না। আমি আমার শেষ চেষ্টাটুকু করছি বসের কোনো হদিস পাওয়ার জন্য। দরকার হলে আমি এয়ারপোর্টে খবর নিচ্ছি উনি ফিরছেন কি না।”
শুভ্রা মাথা নেড়ে আবার মার্কেটের ভিড়ের মাঝে মিশে গেল। তার বুকের ভেতরটা দুরুদুরু কাঁপছে। কালকের সূর্য ওঠার আগেই যদি শুভ্র না ফেরে,তাহলে বড় অঘটন ঘটে যাবে।
ইকবাল এহসানের ফোনে হঠাৎ একটা জরুরি কল আসায় তিনি কথা বলার জন্য ইমন আর রিদিকে একটু দাঁড়াতে বলে কিছুটা নিরিবিলি জায়গায় সরে গেলেন। রিদি চাতক পাখির মতো এই সুযোগটার অপেক্ষায় ছিল। সে ইমনের হাত শক্ত করে ধরে দ্রুত পা চালিয়ে পাশের একটা ফার্মেসির দোকানে চলে আসলো। রিদির চোখেমুখে এক ধরণের অস্বাভাবিক ক্ষিপ্রতা। সে ফার্মেসিতে গিয়ে নিচু স্বরে কিছু একটা চাইল। দোকানদার কয়েকটা প্যাকেট বের করে দিতেই রিদি ক্ষিপ্র হাতে সেগুলো ব্যাগে পুরে নিল। পুরো কাজটা সে এত দ্রুত করল যে ছোট ইমন কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। রিদি যখন আবার মার্কেটের ভিড়ের মাঝে ফিরে আসলো, তখন তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিষাদমাখা হাসির রেখা ফুটে উঠল ঠিক যেন কোনো যুদ্ধে জয়ী হওয়ার পর এক পরাজিত সৈনিকের শেষ হাসি।
ঈশান এয়ারপোর্টে গিয়ে পাগলের মতো প্রতিটি টার্মিনাল আর ফ্লাইটের লিস্ট চেক করল, কিন্তু কোনো আশার আলো দেখতে পেল না। আজকে শুভ্রের কোনো ফ্লাইট এখানে ল্যান্ড করার কথা নেই। ঈশানের মনে হলো পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। সব কিছু শেষ হয়ে যাচ্ছে, আর তার সাথে শুভ্রের ওপর একটা তীব্র অভিমান আর রাগ দানা বাঁধছে কোথায় হারিয়ে গেল লোকটা যখন তার গোটা জগতটা ছারখার হয়ে যাচ্ছে?
ঈশান আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ট্যাক্সি নিয়ে সোজা রিদিদের বাড়িতে ছুটে এল। তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। দূর থেকেই কানে ভেসে আসছে উৎসবের উচ্চ শব্দ। পুরো বাড়িটা লতানো আলোকসজ্জায় এমনভাবে সেজেছে যে দেখে মনে হচ্ছে কোনো রাজপুরী। রাস্তাঘাট জুড়ে সেই ঝিকমিক আলো দেখে ঈশানের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। এই আলোকসজ্জা কি উৎসবের জন্য, নাকি শুভ্রের হৃদপিণ্ডটা অন্য কারো হাতে তুলে দেওয়ার শেষ আয়োজন?
ভিতরে তখন সাজ সাজ রব। রিদিকে হলুদ রঙের এক মায়াবী শাড়িতে সাজিয়ে স্টেজে বসানো হয়েছে। চারদিকে গগনবিদারী মিউজিক আর নাচ-গানে মাতোয়ারা সবাই। পাখি, মিহি আর বাড়ির বাকি মেয়েরা গানের তালে তালে নাচছে। শুভ্রা রিদির ঠিক পাশেই বসে ছিল। ভিড়ের মাঝে হঠাৎ তার চোখ পড়ল ঈশানের ওপর। ঈশানকে দেখা মাত্রই শুভ্রা নিঃশব্দে স্টেজ থেকে নেমে এল এবং সবার চোখ এড়িয়ে ঈশানকে টেনে বাড়ির পিছনের নির্জন বাগানটার দিকে নিয়ে গেল।
সেখানে আবছা আলোয় ঈশান যখন শুভ্রার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল, তার নিশ্বাস যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য আটকে গেল। শুভ্রার পরনে কাঁচা হলুদ রঙের এক জমকালো লেহেঙ্গা, যা তার গায়ের দুধে-আলতা গায়ের রঙের সাথে মিশে এক অপার্থিব আভা তৈরি করেছে। তার সারা শরীর জুড়ে গাদা ফুলের গয়না গলায়, কানে আর হাতে হলদেটে সেই ফুলের স্নিগ্ধ ছোঁয়া। মাথায় আর চুলে ছোট ছোট সাদা আর লাল গোলাপ এমনভাবে গেঁথে দেওয়া হয়েছে যেন কোনো স্বর্গীয় উদ্যান থেকে সে নেমে এসেছে। হলুদের স্নিগ্ধতা আর ফুলের ঘ্রাণে শুভ্রাকে এক জীবন্ত পরীর মতো মনে হচ্ছে। তার টানা টানা চোখ দুটোতে লেগে আছে গভীর উৎকণ্ঠা, আর কাজলমাখা সেই দৃষ্টি যেন এই উৎসবের মাঝেও এক অব্যক্ত বেদনার গল্প বলছে। ঈশান কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে রইল। এই রণক্ষেত্রে এমন এক স্বর্গীয় সৌন্দর্য যেন বেমানান, কিন্তু শুভ্রার এই রূপ দেখে ঈশানের পাথর হয়ে যাওয়া মনটাও মুহূর্তের জন্য টলে উঠল।
শুভ্রা ঈশানের হাত ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ঈশান ভাইয়া, ভাইয়ার কোনো খবর পেলেন? কিছু একটা বলুন প্লিজ!”
ঈশান নিজেকে সামলে নিয়ে এক বুক হাহাকার নিয়ে মাথা নিচু করল। তার নীরবতাই জানিয়ে দিল শুভ্রের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।সে মাথা নাড়াতে নাড়াতে এক বুক হাহাকার নিয়ে বলল।
“না শুভ্রা, বসের কোনো খবর নেই। পরিস্থিতি হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। রিদির বিয়েটা যদি একবার হয়ে যায়, তবে বসের সাজানো জগতটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। সব শেষ হয়ে যাবে শুভ্রা।”
তাদের দুজনের এই রুদ্ধশ্বাস কথোপকথনের মাঝেই ছায়ার মতো হাজির হলেন সোহান চৌধুরী। শুভ্রার সাথে ঈশানকে এখানে নির্জনে কথা বলতে দেখে তার চোখমুখ কঠিন হয়ে উঠল। বাবাকে দেখে শুভ্রার রক্ত হিম হয়ে গেল, সে ভয়ে কাঁপতে শুরু করল। ঈশান অবশ্য বিচলিত হলো না।সে নিজের জায়গায় পাহাড়ের মতো অটল দাঁড়িয়ে রইল। শুভ্রা কাঁপা কাঁপা গলায় আত্মপক্ষ সমর্থন করার চেষ্টা করে বলল।
“আ-আব্বু, আমি… আমি শুধু…।”
সোহান চৌধুরী হাত উঁচু করে তাকে থামিয়ে দিলেন। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ঈশানের দিকে স্থির। তিনি গম্ভীর গলায় বললেন। “দেখো ঈশান, আমি জানি তুমি আমাকে সম্মান করো। তাই মুরুব্বি হিসেবে বলছি, শুভ্র যাতে কোনোভাবে এই বিয়ের খবর না পায়। তুমি বিয়েতে এসেছ ভালো কথা, আনন্দ করো, খাওয়া-দাওয়া করো কিন্তু নিজের সীমার মধ্যে থাকবে।”
শুভ্রা এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। চোখের কোণে পানি নিয়ে সাহস সঞ্চয় করে বাবার দিকে তাকিয়ে আর্জি জানাল।
“আব্বু প্লিজ! এই বিয়েটা আটকাও। ভাইয়া জানলে পাগল হয়ে যাবে,বুঝতে পারছ না কেন তুমি?।”
সোহান চৌধুরী মেয়ের দিকে ফিরে ধমকের সুরে বললেন, “হোক পাগল! আত্মীয়তার মধ্যে আত্মীয়তা আমি পছন্দ করি না, সেটা কি সে জানে না? জেনেও সে রিদিকে বিয়ে করল কীভাবে? যা হচ্ছে মঙ্গলের জন্যই হচ্ছে। এসব প্রেম-ভালোবাসা দুদিনের মোহ, সময় হলে সব কেটে যাবে। সাদ অনেক ভালো আর ভদ্র ছেলে, ও রিদিকে অনেক সুখে রাখবে।”
সোহান চৌধুরীর কথা শুনে ঈশানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তেতো হাসি ফুটে উঠল। সে বিনয়ের মুখোশ পরলেও তার কণ্ঠে ছিল দৃঢ় এক সত্য। সে সরাসরি সোহান চৌধুরীর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল।
“বেয়াদবি মাফ করবেন আঙ্কেল, ছোট মুখে বড় কথা বলছি। আসলে বস এই পৃথিবীতে আপনি আর আন্টিকে ছাড়া যদি কাউকে সব থেকে বেশি ভালোবেসে থাকে, তবে সেটা রিদিকে। What I believe, আমি আপনাকে বিয়ে আটকাতে বলব না। শুধু এইটুকু বলব নিজের হাতে নিজেই নিজের সন্তানকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। I’m telling the truth, বস জানলে আক্ষরিক অর্থেই পাগল হয়ে যাবে। তাকে সামলানোর ক্ষমতা তখন কারো থাকবে না।”
রানিং…!
Share On:
TAGS: অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায়, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮৯(সমাপ্ত)
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬০
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ২৮
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৬
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৯
-
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৬
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৮
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৩৭