প্রবাস থেকে ফিরে শুনলাম, স্ত্রীর অবহেলায় আমার মেয়েটা মারা গেছে, আর আমার রাগের ভয়ে স্ত্রী নাকি পালিয়ে গেছে। পাগলের মতো সারা দেশ খুঁজেও তার কোনো হদিস পেলাম না। তারপর তিন বছর পর ব্রিজের কাছে তাকে পেলাম অজ্ঞান অবস্থায়, আর তার পাশে এমন একটা মেয়ে, যাকে আমি জীবনে কখনো দেখিনি! এরপর যা জানলাম, তা শুনে সেদিন আমি দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছিলাম!!!
আমার জীবনটা ছিল শান্ত, সুন্দর। বিয়ে করেছিলাম যাকে, সেই দানিয়াকে আমি প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসতাম, সেও আমাকে তেমনই ভালোবাসত। আল্লাহ আমাদের কোল জুড়ে দিয়েছিলেন ফুটফুটে একটা মেয়ে, হানিন। তখন ওর বয়স ছয় বছর। ও ছিল আমাদের চোখের মণি, পুরো বাড়ির আলো।
সব বদলে গেল সেদিন, যেদিন আমার এক বন্ধু সৌদি আরবে একটা দারুণ চাকরির খবর নিয়ে এল। এমন সুযোগ জীবনে বারবার আসে না। ভেবেছিলাম, মেয়েটার ভবিষ্যৎ গড়ব, দুটো পয়সা জমাব। অনেক ভাবলাম, যেতে মন চাইছিল না। কিন্তু দানিয়াই আমাকে সাহস দিল। চোখ মুছে হেসে বলল, “যাও গো, এটা তো আমাদের ভালোর জন্যই, হানিনের ভালোর জন্যই। আমি তো তোমার আম্মার কাছেই থাকব। বাড়ির সবাই আছে, ওনাদের নজর তো আমাদের ওপর থাকবেই।”
বুকের ভেতরটা ওদের কাছে রেখেই আমি প্লেনে উঠলাম। প্রতিদিন ভিডিও কল করতাম। হানিনের খিলখিল হাসি শুনে সারাদিনের ক্লান্তি ভুলে যেতাম, দানিয়ার মুখ দেখে মনটা শান্ত হতো। দিনগুলো ভালোই কাটছিল।
কিন্তু ছয় মাস পর থেকে কেমন একটা অস্বস্তি টের পেতে লাগলাম, যার কোনো কারণ বুঝতে পারছিলাম না। দানিয়া প্রতিবার ফোনে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করত, “বলো না গো, তুমি কবে আসবে? ঠিক বলছো তো, দেরি করবে না?”
আমি হেসে উড়িয়ে দিতাম। “আরে পাগলি, এত ভয় পাচ্ছো কেন? চিন্তা কোরো না, আমি বেশিদিন থাকব না।”
একটা বছর পার হয়ে গেল। সেদিনও অভ্যাসমতো দানিয়াকে ফোন দিলাম। ফোন বন্ধ। ভাবলাম, হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে, নয়তো চার্জ নেই। পরের দিনও বন্ধ, তার পরের দিনও। কেউ ধরছে না।
শেষে আম্মাকে ফোন দিলাম। আম্মার গলাটা কেমন যেন এলোমেলো শোনাল। বললেন, “ও একটু অসুস্থ রে, তাই ফোন ধরতে পারছে না।”
কিন্তু আমি তো দানিয়াকে চিনি। যত অসুস্থই হোক, আমাকে এভাবে দুশ্চিন্তায় ফেলে রাখার মেয়ে ও নয়। বুকটা মুচড়ে উঠল। মনে হলো, নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে, আর সবাই আমার কাছ থেকে লুকাচ্ছে। হয়তো মেয়েটার কিছু হয়েছে, আর কেউ ফোনে বলে আমাকে চিন্তায় ফেলতে চাইছে না। এক মুহূর্ত দেরি না করে ছুটি নিয়ে নিলাম। কাউকে কিছু জানালাম না, সোজা দেশের টিকিট কেটে ফেললাম।
গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ঢুকলাম। দানিয়া কোথাও নেই! আম্মাকে আর বাড়ির সবাইকে অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “দানিয়া কই? আমার হানিন কই?”
আম্মা ডুকরে কেঁদে উঠলেন। কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, “বাবা… শক্ত হ। তোর হানিন আর নেই। কয়েক মাস হলো মারা গেছে। ফোনে তোকে বলার সাহস পাইনি।”
আমার চারপাশের দুনিয়াটা ঘুরতে শুরু করল। যেন সবকিছু ভেঙে পড়ছে আমার সামনে। চিৎকার করে উঠলাম, “কী বলছো তোমরা! আমার মেয়ে মরল কীভাবে? দানিয়া কোথায়?”
আম্মা ভেঙে পড়া গলায় বললেন, “তোর বউ মেয়েটাকে একা ঘরে রেখে বাইরে গিয়েছিল। আমরা কেউ তখন বাড়িতে ছিলাম না। মেয়েটা একা বেরিয়ে রাস্তায় চলে গিয়েছিল, আর একটা গাড়ি এসে… সঙ্গে সঙ্গেই সব শেষ।”
মনে হলো আমার আত্মাটাই শরীর ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। পা দুটো আর ভার নিচ্ছিল না। কতক্ষণ পর নিজের ভেতর ফিরে এসেছিলাম জানি না। কোনোমতে জিজ্ঞেস করলাম, “আর দানিয়া? ও কোথায়?”
সবাই মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। আম্মা আস্তে করে বললেন, “তোর বউ তোকে আর তোর রাগকে ভয় পেয়েছিল। তুই তো যাওয়ার আগে বারবার মেয়েটার কথা বলে যেতিস, ওকে চোখে চোখে রাখতে বলতিস। দুর্ঘটনার পরই সে পালিয়ে গেছে। কোথায় গেছে, কেউ জানে না।”
সেদিন বুকের ভেতর যেন আগুন জ্বলে উঠল। আমি পাগলের মতো ছুটে বেড়ালাম। সারা বাংলাদেশ চষে ফেললাম, তার আত্মীয়দের বাড়ি, সম্ভাব্য প্রতিটা জায়গা। কোথাও কোনো চিহ্ন নেই। যেন বাতাসে মিলিয়ে গেছে। পুরো একটা বছর এভাবে কাটল। আমি ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছিলাম। ভাবতেই পারছিলাম না, চোখের পলকে আমার সংসার, আমার জীবন সব হারিয়ে ফেলেছি।
শেষে পরিবারের অনেক চাপাচাপিতে, আর কোনো উপায় না থাকায়, আবার সৌদিতে ফিরে গেলাম। সেখানে পড়ে থাকলাম একটা প্রাণহীন শরীর নিয়ে, যার ভেতরে শুধু শেষ না হওয়া যন্ত্রণা।
আরও দুই বছর পর দেশে ফিরলাম। প্রথম যে কাজটা করলাম, তা হলো আমার মেয়ের কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো। হানিনকে আমি ভুলতে পারিনি, দানিয়াকেও না। তার মুখটা আমার চোখের সামনে থেকে কখনো সরেনি। কিন্তু মনকে বুঝিয়েছিলাম, ওর সঙ্গে আমার গল্প শেষ। আর কোনোদিন ওকে দেখব না।
তারপর একদিন, আমি খুব তাড়ায় ছিলাম। জরুরি একটা কাজে যেতে হবে। পথে একটা পেট্রোল পাম্পে গাড়ি থামালাম তেল নিতে। গাড়িতে বসেই কর্মচারীদের তাড়া দিচ্ছিলাম, “জলদি করো ভাই, আমি দেরি করে ফেলছি।”
হঠাৎ দেখি আমার গাড়ির জানালার পাশে একটা ছোট্ট মেয়ে দাঁড়িয়ে। বয়স পাঁচের মতো হবে, জামাকাপড় এলোমেলো, ছেঁড়া। সে ভাঙা গলায় কান্না করতে করতে বলল:
“চাচা, আপনাকে ধরে বলছি, আমাকে সাহায্য করুন… আমার মাকে গাড়িতে করে হাসপাতালে নিয়ে চলুন। আমার মা মরে যাচ্ছে চাচা, প্লিজ!”
বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। মেয়েটার চেহারা দেখে এত মায়া লাগল যে আমি কোথায় যাচ্ছিলাম, সব ভুলে গেলাম। বললাম, “আচ্ছা মা, শান্ত হও, শান্ত হও। তোমার মা কোথায়? আমাকে দেখাও।”
আমাকে তাড়াহুড়ো করে গাড়ি থেকে নামতে দেখে সে হাত তুলে কাছের ব্রিজটার দিকে ইশারা করল। ওখানে অনেক মানুষ জড়ো হয়েছে। আমি তার সঙ্গে ছুটলাম। গিয়ে দেখি, মাটিতে একজন নারী পড়ে আছেন, কাপড়চোপড় এলোমেলো, চারপাশে লোকজন দাঁড়িয়ে বলছে, “ইন্না লিল্লাহ… মহিলাটা অজ্ঞান হয়ে গেছে।”
ছোট্ট মেয়েটা দৌড়ে গিয়ে নারীর পাশে বসে পড়ল। কেঁদে কেঁদে চিৎকার করে বলল, “ইনি আমার মা! চাচা, আল্লাহর দোহাই, আমার মাকে বাঁচান, উনি আমার মা!”
আমি এগিয়ে গেলাম, ওনাকে তুলে প্রাথমিক সাহায্য করব, বাচ্চাটাকে সান্ত্বনা দেব। আর তখনই মাটিতে পড়ে থাকা সেই মুখটার দিকে আমার চোখ পড়ল…
সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো, আমার শরীরে আর একটা হাড়ও নেই দাঁড়িয়ে থাকার মতো। আমি প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিলাম। যা দেখলাম, তার ধাক্কায় পৃথিবীটাই যেন টলে উঠল।
এ যে সে-ই! দানিয়া! আমার স্ত্রী! যাকে খুঁজতে আমি একটা পুরো বছর দুনিয়া উল্টে দিয়েছিলাম! আর এরপর যা জানলাম, তা শুনে সত্যিই আমি আর নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারছিলাম না!!!!
চলবে…
#শিশিরের_সুর
[লেখক #গল্প_ঘর #MIRAZ_HOSSAIN]
প্রথম পর্ব
#কপি_করা_নিষেধ
গল্পটির দ্বিতীয় পর্ব পোস্ট করার সাথে সাথে যেন আপনার নিউজফিডে চলে যায়, তাই এখনই পেজটি ফলো করে রাখুন! আপনার মন্তব্য জানান কমেন্ট অপশনে, আর প্রিয়জনদের সাথে গল্পটি শেয়ার করতে ভুলবেন না।
Share On:
TAGS: শিশিরের সুর
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE