Golpo কষ্টের গল্প রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র

রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৬৭


রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৬৭

#পর্ব_৬৭

#নিলুফা_নাজমিন_নীলা

★★★

স্কুলের বিশাল হলরুমটা আজ চমৎকার ভাবে সাজানো হয়েছে। চারদিকে একটা উৎসবমুখর পরিবেশ। আজ স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার দিন। হলরুমের সামনের দিকের সারির বেঞ্চগুলো পেরিয়ে কিছুটা পেছনের দিকে বসে আছে তূর্ণা। সেই ছোটবেলার চঞ্চল তূর্ণা আর আগের মতো এতটুকু নেই, দেখতে দেখতে তার বয়স এখন বারো বছর। আজ ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে সপ্তম শ্রেণীতে ওঠার চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হবে। হলরুমের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি শিক্ষার্থীর সাথে তাদের মা কিংবা বাবা উপস্থিত আছেন। কিন্তু তূর্ণার পাশের জায়গাটা একদম খালি। তার কোনো অভিভাবক এখনো এসে পৌঁছাননি। আর ঠিক এই কারণেই সকাল থেকে মেয়েটার মনটা বড্ড খারাপ হয়ে আছে।

​মঞ্চের মাইক্রোফোনে প্রধান শিক্ষক একে একে সবার নাম ঘোষণা করছেন এবং উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের হাতে ডায়েরি ও কলম তুলে দেওয়া হচ্ছে। মেহরাব দেওয়ানের আজ এই অনুষ্ঠানে আসার কথা ছিল, তিনি তূর্ণাকে কথাও দিয়েছিলেন। কিন্তু এখনো ওনার দেখা নেই। ওনার এই দেরির কারণে তূর্ণার ভেতরের অভিমানটা যেন আরও চাড়া দিয়ে উঠছে।

​হঠাৎ করেই হলরুমের স্পিকারে মিসের কণ্ঠস্বর গমগম করে উঠল

“এবার ঘোষণা করছি আমাদের ষষ্ঠ শ্রেণীর চূড়ান্ত ফলাফল। এই বছর আমাদের পুরো স্কুলের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেছে… তূর্ণা মেহরাব!”

​মুহূর্তের মধ্যে পুরো হলরুম জুড়ে করতালির জোয়ার বয়ে গেল। শিক্ষকেরা হাসিমুখে তূর্ণার দিকে তাকালেন। কিন্তু এত বড় সাফল্যেও তূর্ণার মুখে তেমন কোনো হাসির রেখা ফুটল না। কারণ প্রতি বছরই ক্লাসে সে প্রথম হয়, এটা তার কাছে নতুন কিছু নয়। তার আসল আনন্দ তো লুকিয়ে ছিল বাবার উপস্থিতিতে, যা আজ এখনো অপূর্ণ।

​তূর্ণা যখন সিট ছেড়ে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন তার ঠিক পেছনের বেঞ্চে বসা মেয়েটি যে এই বছর দ্বিতীয় হয়েছে সে তূর্ণার দিকে চরম ঈর্ষা আর তীক্ষ্ণ নজরে তাকিয়ে রইল। মাইকে আবারও ঘোষণা করা হলো তূর্ণাকে মঞ্চে আসার জন্য, কারণ মেধা তালিকায় শ্রেষ্ঠত্বের বড় প্রাইজটি তার হাতেই তুলে দেওয়া হবে।

​তূর্ণা পা বাড়াতেই পাশের সেই মেয়েটি কটূক্তি করে বলে উঠল,

“এবারও প্রথম হয়েছিস বলে এত অহংকার দেখানোর কিছু হয়নি, বুঝলি?”

​তূর্ণা থমকে দাঁড়াল। পেছনে ফিরে শান্ত কিন্তু অনমনীয় কণ্ঠে জবাব দিল,

“আমি কোনো অহংকার করছি না। বরং তুই প্রথম হতে পারিসনি বলে আমাকে হিংসা করছিস।”

​কথাটা বলেই সে মঞ্চের দিকে যেতে চাইল, কিন্তু মেয়েটি এবার আরও বিষাক্ত তীর ছুঁড়ে দিল,

“তা তোর এত সফলতা পেয়ে লাভটা কী হলো শুনি? তোর নিজের মা-বাবাই তো আজ তোর এই আনন্দের দিনে পাশে আসেনি!”

​মেয়েটার এই একটি কথা তূর্ণার বুকে তীরের মতো বিঁধল। সে থমকে দাঁড়িয়ে পুরো হলরুমটার দিকে একবার চোখ বোলাল। সত্যিই তো, পুরো হল জুড়ে প্রতিটি সন্তানের পাশে তাদের বাবা-মায়েরা গর্বিত মুখে বসে আছেন, শুধু সে-ই আজ বড্ড একা। তূর্ণা আর কোনো কথা বাড়াল না, এক বুক কষ্ট আর বাবার ওপর একরাশ অভিমান চেপে সে ধীর পায়ে মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেল।

​প্রধান শিক্ষক অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে স্বর্ণাক্ষরে তূর্ণা মেহরাবের নাম লেখা একটি চকচকে ক্রেস্ট এবং উপহারের প্যাকেট তার হাতে তুলে দিলেন। চারদিকে তখনো হাততালির শব্দ। ক্রেস্টটা হাতে নিয়ে তূর্ণা যখন দর্শকদের দিকে তাকাল, ঠিক তখনই তার নজর গেল হলরুমের পেছনের ওই বড় দরজাটার দিকে।

​দেখা গেল, তীব্র গতিতে ছুটতে ছুটতে হলরুমে প্রবেশ করছেন মেহরাব দেওয়ান। ওনার পরনের শার্টটা কিছুটা এলোমেলো, কপালে ঘামের বিন্দু বোঝাই যাচ্ছে অফিস থেকে সব কাজ ফেলে এক প্রকার দৌড়ে এসেছেন তিনি। মঞ্চের ওপর নিজের ছোট্ট মেয়েটাকে রাজকন্যার মতো ক্রেস্ট হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই মেহরাব দেওয়ানের মলিন মুখে এক পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ হাসি ফুটে উঠল। তিনি দুই হাত উঁচিয়ে সশব্দে তালি বাজাতে লাগলেন এবং আঙুল দিয়ে ইশারা করে বুঝিয়ে দিলেন ‘অভিনন্দন আমার সোনা মামণি!’

​বাবার ওই একটি ইশারা আর মুখের চেনা হাসিটা দেখামাত্রই তূর্ণার মনের সব মেঘ, সব অভিমান এক পলকে উধাও হয়ে গেল। তার ফর্সা মিষ্টি মুখে এতক্ষণে এক চমৎকার, স্বর্গীয় হাসির বন্যা বয়ে গেল। সে আর এক মুহূর্তও মঞ্চে দাঁড়িয়ে রইল না; ক্রেস্টটা শক্ত করে বুকে চেপে ধরে মঞ্চের সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নেমে এক দৌড়ে গিয়ে বাবাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

তূর্ণা মেহরাব দেওয়ানের বুকের ভেতর মুখ লুকিয়েই অত্যন্ত অভিমানী আর কান্নামিশ্রিত স্বরে বলে উঠল,

“তুমি সবসময় দেরি করো পাপা! প্রতিবার তুমি এমন করো।”

​মেহরাব দেওয়ান আদরমাখা কণ্ঠে বললেন,

“কোথায় দেরি করলাম মামণি? এই তো একদম ঠিক সময়েই চলে এলাম, আমার সোনা মা-টা পুরস্কার নেওয়ার পরপরই তো আসলাম, তাই না? এভাবে মুখ কালো করে অভিমান করে থাকলে কিন্তু পাপার খুব কষ্ট হয়। পাপা তার তূর্ণাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে না?”

​বাবার এই আশ্বাসে তূর্ণা কেবল নিজের চোখের জলটা মুছে একটু সোজা হয়ে দাঁড়াল। ঠিক তখনই হলরুমের মাইকে প্রধান শিক্ষকের পরবর্তী ঘোষণাটি ভেসে এল,

“আজকের এই বিশেষ দিনে আমাদের স্কুলের পক্ষ থেকে আপনাদের আরও একটি আনন্দের খবর দেওয়ার আছে। আমাদের স্কুলে আজ একজন নতুন শিক্ষিকা জয়েন করেছেন। চলুন, আজ এই মঞ্চেই ওনার সাথে আপনাদের সবার পরিচয় করিয়ে দেওয়া যাক। মিস রিনি… আপনি দয়া করে স্টেজে আসুন।”

​স্পিকারে ‘রিনি’ নামটা উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথেই যেন পুরো হলরুমের বাতাস ভারী হয়ে গেল। এক মুহূর্তের জন্য মেহরাব দেওয়ান এবং তূর্ণা দুজনেই পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে গেল। মাত্র এক সেকেন্ডের ব্যবধানে তূর্ণার ছোট্ট মাথায় রিনির সাথে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটা আদর আর শেষ বিকেলের সেই চলে যাওয়ার স্মৃতি ঝড়ের গতিতে এসে আছড়ে পড়ল। তূর্ণার বুকের ভেতরটা তীব্র এক আশায় আর আশঙ্কায় দুলতে লাগল, তার নিঃশ্বাস দ্রুত হতে শুরু করল। সে একরাশ ঝাপসা চোখ নিয়ে, বুকভরা আকুলতা বুকে চেপে চট করে স্টেজের দিকে তাকাল। মেহরাব দেওয়ানও ওনার চিরচেনা গম্ভীর চাউনি নিয়ে পলকহীন দৃষ্টিতে তাকালেন মঞ্চের প্রবেশপথের দিকে। ওনাদের দুজনেরই মনে তখন একটাই প্রশ্ন তবে কি রিনি ফিরে এসেছে?

​কিন্তু তূর্ণা যে বুকভরা আশা আর আকুতি নিয়ে মঞ্চের দিকে তাকিয়েছিল, পরের মুহূর্তেই সেই আশা কর্পূরের মতো মিলিয়ে গেল। মঞ্চে যে চশমা পরা তরুণীটি এসে দাঁড়িয়েছেন, তিনি ওনার পরিচিত রিনি নন, তার ভালোবাসার ‘আম্মু’ নন। সে অন্য এক অচেনা রিনি।

​মুহূর্তের মধ্যে তূর্ণার ফর্সা মিষ্টি মুখটা চুন হয়ে একদম ফ্যাকাশে হয়ে গেল। এক চরম হতাশা আর শূন্যতা এসে তাকে গ্রাস করল। সে আর একটা মুহূর্তও সেই কোলাহলপূর্ণ হলরুমে দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি পেল না। বাবার শার্টের হাতাটা শক্ত করে টেনে ধরে ধরা গলায় বলল, “পাপা… চলো, আমরা বাসায় চলে যাই।”

​বলেই তূর্ণা ক্রেস্টটা হাতে নিয়ে হনহন করে দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করল। মেহরাব দেওয়ান মেয়ের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে বুকের গভীর থেকে এক দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলেন। রিনি দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর প্রথম কয়েকটা মাস এই মেয়েটা রিনির জন্য একপ্রকার পাগলামি করত, দিনরাত কাঁদত। তারপর সময়ের নিয়মে ধীরে ধীরে সবকিছু একটা স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে এসেছিল, তূর্ণা নিজেকে সামলাতে শিখেছিল। কিন্তু আজ… আজ এতদিন পর হঠাৎ এই ‘রিনি’ নামটা আবারও ওনার মেয়ের ভেতরের ঘুমিয়ে থাকা সব সুপ্ত স্মৃতি, সব অধিকার আর চাপা কান্নাকে এক নিমেষে জাগিয়ে তুলে দিয়ে গেল।

★★★

প্যারিসের চার্লস দ্য গল বিমানবন্দরের ব্যস্ত লাউঞ্জে বসে আছে রিনি। আজ সে তার শিকড়ে ফিরবে, তার আপন মানুষদের কাছে ফিরবে। দীর্ঘ তিন বছরের নির্বাসন কাটিয়ে আজ তার এই ফেরা। রিনির ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসির রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠলেও, তার চোখের কোণ আর মলিন মুখাবয়ব এক গভীর, অব্যক্ত বিষণ্নতার চাদরে ঢাকা।

​তার ঠিক পাশেই বসে আছে লুসি। মেয়েটার মুখটা আজ বড্ড মনমরা, মেঘলা আকাশের মতো থমথমে। এয়ারপোর্টের টিকিট কাটা থেকে শুরু করে বোর্ডিং পাসের সমস্ত প্রসেসিং লুসি নিজেই একা হাতে করছে, কারণ রিনির বর্তমান শারীরিক অবস্থা এতটাই দুর্বল যে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিটুকুও তার শরীরে নেই। লুসি রিনির হাতটা ধরে খুব মনোযোগ দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছে কোন ওষুধটা কখন খাবে।

রিনি কোনো কথা বলছে না, সে শুধু অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লুসির দিকে। এই তিনটে বছর বিদেশের এই অচেনা, যান্ত্রিক শহরে এই ফরাসি মেয়েটার কাছ থেকে সে যে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর আশ্রয় পেয়েছে, তা হয়তো কোনো রক্তের সম্পর্কের চেয়ে কম ছিল না।

​ফ্লাইট ছাড়ার এখনো পাক্কা দুই ঘণ্টা বাকি। এই এক-একটি মিনিট রিনির কাছে যেন এক-একটি দীর্ঘ যুগের মতো ভারী মনে হচ্ছে। রিনিকে এভাবে পাথরের মতো চুপ করে থাকতে দেখে লুসি তার হাতটা একটু চেপে ধরে ফরাসি ভাষায় বলল,

“এভাবে মনমরা হয়ে থেকো না তো রিনি,একটু হাসো না, প্লিজ!”

​লুসির এই ব্যাকুল অনুরোধে রিনি এক বাধ্য মেয়ের মতোই ঠোঁট প্রসারিত করে হাসল। কিন্তু সেই কৃত্রিম হাসি যেন তার মুখের ফ্যাকাশে ভাবটাকে আরও করুণভাবে ফুটিয়ে তুলল। একসময় যে মেয়েটার রূপের ছটায় চারপাশ আলো হয়ে থাকত, আজ সেই সুন্দর চেহারার অধিকারী মেয়েটার শরীরে যেন শুধু হাড্ডি ক’খানা অবশিষ্ট আছে। এক মরণব্যাধি ভেতর থেকে তার সমস্ত রক্ত শুষে নিয়েছে।

​লুসির সাথে কথা বলার মাঝেই রিনি টের পেল তার নাকের ভেতরটা আবার উষ্ণ হয়ে উঠছে। এক ফোঁটা লাল রক্ত তার ঠোঁটের ওপর গড়িয়ে পড়ার আগেই সে খুব চটজলদি ওড়নার খুঁট দিয়ে তা মুছে নিল, যেন লুসি কোনোভাবেই দেখতে না পায়। লুসি দেখলে আবার উন্মাদের মতো উতলা হয়ে পড়বে, হয়তো ফ্লাইট বাতিল করে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য জেদ ধরবে।

কিন্তু রিনির আজ আর হাসপাতালে যাওয়ার সময় নেই, তার যে আজ বাড়ি ফিরতেই হবে! অথচ আজ সকাল থেকেই এই রক্তের ধারা যেন আর কোনো বাঁধ মানছে না, বারবার তার শরীর ভেঙে উপচে পড়ছে।

​ঘড়ির কাঁটা যেন আজ বড্ড অলস। সন্ধ্যা ঠিক ৬টায় তার ফ্লাইট আকাশে উড়াল দেবে। রিনি হঠাৎ জানালার ওপাশে রানওয়ের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বলে উঠল,

“ফ্লাইটটা আকাশে উড়তে আজ বড্ড দেরি করছে।”

লুসি মলিন মুখে একটু হেসে বলল,

“তুমি বড্ড মজা করতে পারো রিনি! সময় হলেই ফ্লাইট ছাড়বে, একটু ধৈর্য ধরো।”

​রিনি এবার লুসির দিকে মুখ ফেরাল। তার চোখ দুটো নোনা জলে ছলছল করে উঠল। সে অত্যন্ত আর্দ্র কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

“লুসি… এই যে আমি চিরকালের মতো চলে যাচ্ছি, তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে না?”

​লুসির চোখের কোণটাও এবার ভিজে এল। সে নিজের কান্না লুকিয়ে রিনির কাঁধে মাথা রেখে ফিসফিস করে বলল,

“কষ্ট তো হচ্ছেই। কিন্তু আমি জানি, নিজের দেশে ফিরলে তুমি খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে। আর আমাদের তো নিয়মিত কলে যোগাযোগ হবেই, তাই না? আমি তোমাকে প্রতিদিন কল করব। নিয়ম করে আমার কল ধরবে বুঝলে?”

​রিনি আর কোনো উত্তর দিল না।

রিনি লুসির হাতটা নিজের দুর্বল হাতের মুঠোয় নিয়ে অত্যন্ত আর্দ্র কণ্ঠে বলল,

“লুসি, তুমি না ভীষণ ভালো একটা মেয়ে।”

​লুসি মিষ্টি করে হেসে ফরাসি ভাষায় জানাল,

“তার চেয়েও তুমি অনেক বেশি ভালো, রিনি।”

​রিনির ঠোঁটের কোণে এক ম্লান, করুণ হাসির রেখা ফুটে উঠল।

“যাক, এই পুরো পৃথিবীতে অন্তত একটা মানুষ তো বলল আমি ভালো! যদিও আমি জানি লুসি, তুমি বড্ড মায়ায় পড়ে এই মিথ্যাটা বললে।”

​“আমি একটা শব্দও মিথ্যা বলিনি রিনি,” লুসি রিনির হাতটা নিজের দুই হাতের মাঝে চেপে ধরে আবেগী কণ্ঠে বলল, “এই পুরো নিস শহরে আমার আপন বলতে কেউ নেই, তা তো তুমি জানো। মা-বাবা তো সেই কত বছর আগেই আমাকে একা ফেলে মারা গেছেন। তারপর এই একাকীত্বের মাঝে তুমি আমার জীবনে এসেছিলে, ঠিক আমার নিজের একটা বোন হয়ে।”

​‘বোন’ শব্দটা কানে আসতেই রিনির অবশ মস্তিষ্কে তড়িৎপ্রবাহের মতো ভেসে উঠল তৃণার মুখটা। কত বছর হয়ে গেল সে তার বোনের মায়াবী মুখটা দেখেনি! রিনি একটা বড় করে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করে ম্লান হেসে বলল,

“জানো লুসি, দেশে ফিরেই আমি সবার আগে তৃণাকে শক্ত করে একটু জড়িয়ে ধরব। আচ্ছা লুসি… তৃণা কি আমাকে এত বছর পর হঠাৎ দেখে আমাকে জড়িয়ে ধরে খুশিতে কেঁদে উঠবে?”

​লুসি রিনির চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, “হয়তো উঠবে। আচ্ছা, তুমি কি সবাইকে জানিয়েছ যে তুমি আজ ফিরছ?”

​রিনি সে বলল, “না, কাউকে জানাইনি। সবাইকে হঠাৎ করেই উপস্থিত হয়ে সারপ্রাইজ দিব।

​কথা বলতে বলতে রিনির আচমকা মনে হলো চারপাশের ঝলমলে আলোটা যেন কেমন ফিকে হয়ে আসছে, তার চোখ দুটো বড্ড ঝাপসা ঠেকতে লাগল। লুসি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

“তুমি একটু এখানে লক্ষ্মী মেয়ের মতো বোসো রিনি। বোর্ডিং পাসের কয়েকটা ফর্ম পূরণ করা বাকি আছে, আমি ওগুলো একটু ডেস্ক থেকে নিয়ে আসছি।”

​লুসি যেই না পেছন ফিরে দু-কদম এগিয়েছে, রিনি হঠাৎ এক অজানা আতঙ্কে ধড়ফড় করে লুসির হাতটা পেছন থেকে শক্ত করে টেনে ধরল যেন এই হাত ছেড়ে দিলে সে আর কোনোদিন এই পৃথিবীর কাউকে ছুঁতে পারবে না। লুসি থমকে দাঁড়িয়ে পেছনে তাকাল। রিনির ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

“কী হলো? কিছু লাগবে তোমার? পানি খাবে?”

​রিনি আর কথা বলার শক্তি পেল না। সে আস্তে করে লুসির হাতটা ছেড়ে দিল। অত্যন্ত দুর্বলভাবে দুই পাশে মাথা নাড়াল, যার অর্থ না, কিছু লাগবে না, তুমি যাও। লুসি আশ্বস্ত হয়ে ফরমগুলো আনতে লাউঞ্জের ভিড়ের মাঝে মিলিয়ে গেল।

​লুসি চলে যেতেই রিনির পুরো শরীরটা যেন অবশ হয়ে ভেঙে পড়তে চাইল। তার নাক দিয়ে এবার অবিরত, অবিরাম ধারায় তপ্ত লাল রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল। চোখের সামনে চারপাশের এয়ারপোর্টের ব্যস্ত কোলাহল, আলোর রোশনাই সবকিছু ধীরে ধীরে এক ঘন অন্ধকারের চাদরে ঢেকে যেতে লাগল। সোজা হয়ে বসে থাকার নূন্যতম ক্ষমতাটুকুও তার অবাধ্য শরীর হারিয়ে ফেলল। রিনি এবার ধীর লয়ে লাউঞ্জের ওই ঠান্ডা মেটালিক বেঞ্চটার ওপর একপাশে কাত হয়ে শুয়ে পড়ল।

​চোখের পাতা দুটো এক চরম ক্লান্তিতে বন্ধ হয়ে আসছে। বুকের ভেতরটা যেন কেউ এক মস্ত বড় পাথর দিয়ে চেপে ধরেছে, দম নিতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু এই তীব্র যন্ত্রণার মাঝেও তার ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত, অলৌকিক আনন্দের হাসি ফুটে উঠল। রিনি চোখ বন্ধ অবস্থাতেই তীব্রভাবে অনুভব করল, তার এই জরাজীর্ণ বেঞ্চটার ঠিক পাশে এসে বিশাল আকৃতির এক ছায়ামূর্তি এসে দাঁড়ালো। কিন্তু সেদিকে তার ধ্যান নেই।

​তার নিস্তেজ বন্ধ চোখের পর্দায় এবার একে একে ভেসে উঠতে লাগল ফেলে আসা দেশের সমস্ত মধুর স্মৃতি। সে তার জীবনের সমস্ত কালো, কলঙ্কিত দিনগুলোকে এক ঝটকায় মুছে ফেলে কেবল খুঁজে খুঁজে সুন্দরতম স্মৃতিগুলোকে আঁকড়ে ধরল। তার চোখের সামনে সবার আগে ভেসে উঠল এগারো বা বারো বছর বয়সী তূর্ণার সেই ডাগর চোখের নিষ্পাপ মুখটা। রিনির মনে হলো, মেয়েটার চেহারা আগের চেয়েও কত বেশি মায়াবী আর সুন্দর হয়েছে! তূর্ণার থেকে বিদায় না নিয়ে আসার কারণে কি সে রিনির উপর রেগে আছে? চোখের সামনে ভেসে উঠলেন উমর হাওলাদার ওনার মাথার চুল আর দাড়িগুলো এখন কেমন ধবধবে সাদা হয়ে গেছে, চোখে এক পৃথিবীর অপেক্ষা।

​রিনির অবশ শরীরটা ফ্রান্সের এই অচেনা বিমানবন্দরে পড়ে থাকলেও, তার শেষ মুহূর্তের জাগ্রত মস্তিষ্ক যেন ততক্ষণে সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে বাংলাদেশের মাটিতে ফিরে গেছে। সে দেখতে পেল মেহরাব দেওয়ান সেই আগের মতোই গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছেন, শুধু ওনার দাড়িগুলো আগের চেয়ে একটু বড় হয়েছে। দূর থেকে স্নিগ্ধ মুখে চিলতে হেসে এগিয়ে এলেন রৌশনারা বেগম।

​আর ঠিক তখনই, সেই আলো-আঁধারির গোলকধাঁধা পেরিয়ে রিনির খুব কাছে হেঁটে এল তূর্ণা। সেই ছোট্ট পিচ্ছি মেয়েটা। তূর্ণা এসে পরম মমতায়, এক মায়াভরা অলৌকিক কণ্ঠে রিনির রক্তে ভেজা ফ্যাকাশে মুখটা নিজের দু-হাতে ছুঁয়ে দিয়ে ডেকে উঠল “আম্মু!”

​দীর্ঘ তিন বছরের তৃষ্ণার্ত চাতকের মতো এই একটা শব্দ শোনার জন্যই যেন রিনি বেঁচে ছিল। তার নিথর হয়ে আসা ঠোঁটের কোণ বেয়ে এক স্বর্গীয় হাসি উপচে পড়ল। সব কষ্ট, সব অপরাধবোধের অবসান ঘটিয়ে, এক বুক অতলান্ত খুশিতে এয়ারপোর্টের সেই ঠান্ডা বেঞ্চে শুয়েই চিরকালের মতো হেসে উঠল মেয়েটা। আর সেই হাসির রেশটুকু ঠোঁটে মেখেই, ওড়ার অপেক্ষায় থাকা বিমানের আগেই রিনির আত্মা এক নতুন, মুক্ত নীল আকাশে ডানা মেলে দিল।

​★★★

ফরমগুলো পূরণ করে এক বুক স্বস্তি নিয়ে লাউঞ্জের ভিড় ঠেলে ফিরে এল লুসি। আর মাত্র কিছুক্ষণের অপেক্ষা, তারপরই রিনি তার বহু কাঙ্ক্ষিত ফ্লাইটে উঠবে। লুসি এসে শয্যাশায়ী রিনির ঠিক পাশে দাঁড়াল। দেখল, রিনি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে বেঞ্চের ওপর একপাশে কাত হয়ে শুয়ে আছে। লুসি তার হাতের ব্যাগটা একপাশে রেখে মৃদু হেসে ডেকে উঠল,

“রিনি, ওঠো! বোর্ডিং শুরু হয়ে গেছে, এবার না উঠলে ফ্লাইটটা কিন্তু সত্যিই ছেড়ে দেবে। অনেক তো হলো, এবার প্লেনে উঠে বসো। বাংলাদেশ গিয়ে যত ইচ্ছে শান্তির ঘুম ঘুমিও, কেমন?”

​রিনি উঠল না। তার শরীর থেকে নূন্যতম কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। লুসি এবার একটু অবাক হয়ে রিনির কাঁধে হাত দিয়ে আলতো করে নাড়া দিল। আর সাথে সাথেই রিনির নিথর, অবশ শরীরটা একপাশে হেলে-দুলে উঠল। কোনো প্রাণস্পন্দন নেই, কোনো উষ্ণতা নেই একেবারে বরফের মতো ঠান্ডা।

​লুসি মুহূর্তের মধ্যে হতবিহ্বল হয়ে গেল। তার চারপাশের সমস্ত পৃথিবী যেন এক নিমিষে স্তব্ধ হয়ে গেল। সে কাঁপতে কাঁপতে মেঝেতে হাঁটু গেঁড়ে বসে রিনির হাত দুটো নিজের বুকের মাঝে চেপে ধরে বারবার ডাকতে লাগল। কিন্তু রিনি উঠছে না। লুসি এবার বুক ফাটানো চিৎকার করে উঠল,

“হেই রিনি! ওঠো বলছি! রসিকতা বন্ধ করো রিনি, চোখ মেলো! কথা বলো আমার সাথে! তুমি না বলেছিলে দেশে ফিরবে? প্রিয় মানুষদের সারপ্রাইজ দেবে? তবে এত তাড়াতাড়ি আমাদের সবাইকে এভাবে একা ফেলে তুমি কী করে চলে যেতে পারো? ওঠো প্লিজ, আর একবারটি চোখ মেলো! তুমি না বলেছিলে তূর্ণাকে মন ভরে দেখবে। তেমার বোনকে জড়িয়ে ধরবে। তাহলে এভাবে ঘুমিয়ে আছো কেন? উঠো। প্লিজ উঠো। ”

​কিন্তু রিনি আর উঠল না। এয়ারপোর্টের সেই ব্যস্ত, কোলাহলময় লাউঞ্জে লুসির এমন উন্মাদপ্রায় চিৎকার আর বুক ফাটানো কান্নায় চারপাশের অনেক মানুষ ছুটে এসে ভিড় জমাল। সিকিউরিটি আর মেডিকেল টিমের লোকজন ছুটে এল। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। রিনি আর কোনোদিন উঠবে না, কোনোদিনও না। তার আর প্রিয় মানুষদের কাছে ফিরে যাওয়া হলো না। নিজের চেনা মাতৃভূমিতে পা রেখে, বোন তৃণার হাতটা ধরে আকুল হয়ে একটা বার ‘ক্ষমা’ চাওয়া হলো না তার। আজ সব অপরাধবোধ, সব অভিমান আর দীর্ঘশ্বাসের অবসান ঘটিয়ে তথাকথিত সেই খারাপ মেয়েটা নিস শহরের সীমানা পেরিয়ে এক নীল গগন আকাশে চিরকালের জন্য ডানা মেলে দিল।

রিনির মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে কি তৃণা একটুও কাঁদবে? সব পুরোনো ক্ষোভ, সব ক্ষত ভুলে তৃণা কি একটা বারও আকাশের দিকে তাকিয়ে বলবে, “আপু, বড্ড ভালোবাসি তোমায়, ফিরে এসো!”

​তূর্ণা কি আজও রিনির মৃতদেহ দেখে অভিমান করে থাকবে, কেন তাকে ফেলে সে বিদেশে চলে গিয়েছিল সেই ভেবে? নাকি বাচ্চাটা শেষবারের মতো আম্মু ডেকে হাউমাউ করে কেঁদে উঠবে? রৌশনারা বেগম কি আজও সেই পাষাণই আছেন, নাকি নিজের নাড়িছেঁড়া ধনের মৃতদেহটা দেখে সামান্য কাঁদবেন!

​মেহরাব দেওয়ান, যিনি রিনির শূন্যতা আর অন্যায়ের মাঝে একচিলতে পাথর হয়ে বেঁচে ছিলেন, তিনি কি এই অভাগী মেয়েটার কফিনবন্দি মৃতদেহটা দেখে নিজের ভেতরের সব গাম্ভীর্য হারিয়ে শিশুর মতো ডুকরে কেঁদে উঠবেন? উমর হাওলাদার কি সৎ মেয়ের জন্য কষ্ট পাবেন? কাঁদবেন?

​ছেঁড়া মানচিত্র আর কিছু অনুচ্চারিত কান্নার হাহাকার, যা হয়তো সবগুলো মানুষের জীবনে এক অলিখিত শোকগাথা হয়ে আজীবন প্রতিধ্বনিত হবে।

#চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply