#রাগে_অনুরাগে
#পর্ব_৫৭
#সুহাসিনি_ফাতেহা
ফকফকে পরিষ্কার আকাশ আর রোদ্রজ্জল দিনের আগমনী বার্তা নিয়ে সূচনা হয়েছে একটি সুন্দর সকালের। আজ কক্সবাজারের আবহাওয়াটা প্রান জুড়ানোর মতোই সুন্দর। চারদিকে তাকালেই কেমন মন ভালো হয়ে যায়। পূর্ব আকাশের কোল ঘেঁষে উঁকি দেওয়া কুসুম গরম সূর্যের কীরণ আলতো করে এসে পড়েছে সমুদ্রের শান্ত নীল জলরাশিতে। সৈকতের ভেজা বালুকা বেলায় ঢেউগুলো যেন ফিসফিসিয়ে কোনো এক অজানা গল্প বলে যাচ্ছে, আর সেই সুরে সুর মিলিয়ে ডানা মেলছে গাঙচিলের দল। ঝাউবনের পাতার ফাঁক গলে আসা ভোরের প্রথম আলো আর সাগরের এই শান্ত, স্নিগ্ধ রূপ চারপাশকে এক অদ্ভুত শান্তিময় ও রোমান্টিক আবহ দিয়ে জড়িয়ে রেখেছে, আর সকালের এই অপরুপ সৌন্দর্য প্রাণ ভরে দেখে মন ভরে অনুভব করার প্রয়াসে ঘুম থেকে উঠেই বেলকনিতে ছুটে এসেছে চঞ্চলা রমণী। দৃষ্টি তার অদূরের সুমদ্রের পানে। মায়াবী মুখখানাতে তার সে-কি আনন্দের ভাবস্রোত। কিন্তু সে আনন্দ বেশিক্ষণ টিকলো না।
ডাইনিং থেকে ফারাজ ডাকছে। তিতলি বলে নাম ধরে। তিতলি চুপটি মেরে মুগ্ধ হয়ে শুনছে সে ডাক। ফারাজ যখন তিতলি বলে নাম ধরে ডাকে তখন তিতলি আসমানে ভাসে। যদিও মাঝেমধ্যে হঠাৎ ডাকে কিন্তু এই হঠাৎ ডাকাটাই তিতলির কাছে আসমানের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো। লোকটা কি জানে ওনার কন্ঠে তার নাম ধরে ডাকাটা ঠিক কতটা আকর্ষণীয় আর মধুর শোনায়?
তিতলির অযাচিত ভাবনার মাঝেই ডয়িংরুম থেকে ফারাজের গম্ভীর গলার আদেশ এলো,
“নাস্তা খেতে আসো।”
“আপনি খান। আমি পরে খাব।’
“এক্ষুনি খেতে আসা হোক।”
“এক্ষুনি না খেলে কি হবে শুনি?”
ফারাজের গম্ভীর স্বর এবার আরও গম্ভীরে পরিনত হলো,
“তোমাকে একা রেখেই বাইরে ঘুরতে চলে যাবো? এখন তুমি খেতে আসবে নাকি একা ঘরে থাকবে সেটা সম্পূর্ণ তোমার ব্যাপার, ডিপেন্ডস এন্ড ইউ।”
ফারাজের বলতে দেরি পরপর তিতলির বেলকনি থেকে ছুটে আসতে দেরি হয়নি। মুখশ্রী অন্ধকার করে এসেছে। তার জন্য কক্সবাজার এসেছে অথচ হুমকি দিয়ে বলছে তাকেই বাইরে নিবেনা। এটা বলা তো ঘোর অন্যায় হয়েছে। যদি পাশে শাওন, শিফা, আলভী না থাকত তাহলে এতক্ষণে তিতলি এটা নিয়ে একটা বড়সড় কান্ড ঘটাত। ফারাজ, তিতলি, শাওন, শিফা আলভী সহ সবাই একসাথে নাস্তা করতে বসেছে। কিছুক্ষণ পরই বাইরে ঘুরতে বেরোবা তারা।
★
তিতলি এমব্রয়ডারি হালকা কারুকাজ করা ল্যাভেন্ডার রঙা গ্রাউন পড়েছে। গলা থেকে পা পর্যন্ত সে গাউনের উচ্চতা। গলায় ওড়না ঝুলানো। চোখে সানগ্লাস। ঠোঁটে হালকা লিপিস্টিক। এতেই ওকে ভীষণ মিষ্টি লাগছে দেখতে। ফারাজের পরনেও সেম ল্যাভেন্ডার রঙা শার্ট সাথে কালো জিন্স প্যান্ট। চোখে সানগ্লাস। ফারাজ সচারচর চোখে গ্লাস পড়েনা। বাইরে যখন রোদের তাপ অতিরিক্ত বেশি হয় ঠিক তখন পড়ে। এখনও ঠিক সে কারষেই পরেছে। সব মিলিয়ে তাকে মারাত্মক সুদর্শন লাগছে।
শাওন শিফা ও মেসিং মেসিং জামাকাপড় পরেছে। আলভী ফারাজ আর শাওনের শার্টের ডিজাইনের সাথে মেসিং করে দুকালারের সংমিশ্রনের শার্ট পরেছে। সবাই রেডি হয়ে লিফটে করে সোজা পাঁচতলা থেকে নিচে নামল। তিতলি শিফার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। চারিপাশে চোখ বুলিয়ে দেখছে। এখানে সাধারণ কিছুও চোখ ধাঁধানো সুন্দর।
ফারাজ ম্যানাজারের সাথে কি নিয়ে যেন কথা বলছে। শিফা টুকটাক কথা বলছে তিতলির সাথে। এখন আবার কথার কথায় বলল,
“তোমাকে দেখলে মনেই হয়না যে তোমার বিয়ে হয়ে গেছে। তুমি পুরোই বাচ্চা মেয়ে একটা তিতলি।”
শাওন ফোন রেখে এগিয়ে আসলো, বলল,
“বিয়ে হয়ে অলরেডি বাসরও কমপ্লিট ওদের! আর তোমার মনে হচ্ছে বিয়েই হয়নি। তুমিও না অদ্ভুত চিন্তা ভাবনা করছো শিফা।”
আলভীও তাল মিলালো,
“আমাদের ফারাজ চাচা এত ধৈর্যশীল নারে। তুই ঠিকই বলেছিস যা ঘটার সব বাসর রাতেই ঘটে গেছে।”
তিতলি লজ্জায় হতভম্ব। মাথা নত করে নিজের লজ্জা লুকানোর চেষ্টা করছে। এভাবে বললে তার লজ্জা লাগেনা বুঝি? মুখের সামনে কেউ বলে এভাবে! মনেমনে বিড়বিড় করে বলে,
‘দূর তিতলি এরাও তো ওই ঠোঁটকাটা লোকের চাচাতো ভাই আর বন্ধু সবাই একই নৌকার মাঝি।”
পাশ থেকে শিফা মুচকি হেসে তিতলির নরম গাল টেনে ধরে বলল,
“থাক আর লজ্জা পেতে হবেনা।”
শাওন তিতলির উদ্দেশ্য বলল
“ভাবি আজকে রা…”
আলভী শাওনকে হালকা ধাক্কা দিয়ে কানে কানে বলল,
“চুপ চুপ ভাল্লুক আইতেসে।”
ফারাজ ম্যানাজারের সাথে কথা বলা শেষ করে এগিয়ে আসল। আলভী আর শাওন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। যেন কিছুই হয়নি। সব স্বাভাবিক। ফারাজ তিতলির হাত ধরল। তিতলির মুখ দেখে তার আর বুঝতে বাকি থাকেনা যে ওই বেয়াদব গুলো আবারও কিছু বলছে।
______
আজকে কক্সবাজার সুমদ্র সৈকত হাজার হাজার পর্যটকদের আনাগোনায় মুখরিত হয়ে উঠেছে। হুড়হুড়ে মৃদু বাতাস বইছে। বাতাসের সঙ্গে সুমদ্রের ঢেউগুলোও যেমন আরও গভীর হয়ে উঠেছে। এত মানুষের ভীড়ে ফারাজ তিতলির হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে নিজের সঙ্গে। এদিক-সেদিক ঘুরাঘুরি করে ওরা সুমদ্রের পানির দিকে এগিয়ে আসল। সবাই পানিতে পা ভিজিয়ে ছবি তুলছে কাপল ভিডিও করছে। ঢেউয়ের পানি নিচে নেমে যাওয়ার পরপর কেউ কেউ নরম বালুতে লাভ একে নামের অক্ষর লিখছে।
তিতলির অনেকদিনের সখ কক্সবাজারের সমুদ্রের পানিতে পা ভেজানো এবং বালুকাময় সৈকতে হেঁটে বেড়ানো প্রশান্তিময় এবং জাদুকরী অনুভূতি উপভোগ করা। হাত দিয়ে পানি ধরবে। ঢেউ আসার মুহূর্ত উপভোগ করবে। সবার দেখাদেখি তিতলি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। পা ভিজাবে বললে ফারাজ ধমক দিবে কী? এই লোকের তো আবার কথায় কথায় ধমক দেবার অভ্যাস। তিতলি অবশেষে ফারাজের পিঠের শার্ট একটু খামছে ধরল। ফারাজ তাকাল। চশমার আড়ালে চোখের দৃষ্টি বুঝা গেল না। সেমুহূর্তে তিতলি শব্দ করে বললো,
“আমি পানিতে পা ভিজাতে চাই প্লিজইই।”
“ঢেউ অনেক বেশি এখন।”
তিতলি কিছুই শুনতে পেলো না। এত এত মানুষ। খোলামেলা হাসাহাসির শব্দ। ঢেউয়ের শব্দ। তিতলি উত্তেজনায় জুতো জোড়া খুলে ফেলল। তারপর চড়ুইয়ের মতো চঞ্চল পদচারণায় নরম ও ভেজা বালুর ওপর দিয়ে হেঁটে পানির দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করল। তখন ধেয়ে আসা প্রথম ঢেউটি এক ঝটকায় তিতলির পা সহ গ্রাউনের অনেকটুকু ভিজিয়ে দিলো। আহ কি অদ্ভুত অনুভূতি। এ অনুভূতির কোনো তুলনা হয়না। ঢেউয়ের প্রভাবে তিতলি পড়ে যেতে যেতে নিজেকে সামলে নিলো।
পেছনে তাকাল। তার খুলে রাখা জুতো জোড়া এখন ফারাজের হাতে ঠাই পেয়েছে। কি আশ্চর্য! তিতলি এমনটা ভাবেনি। ভীষণ ভালো লাগলো তার। তিতলি আদুরে ভঙ্গিতে ফারাজকে ডাকল,
“আসেন।”
ফারাজের সুদর্শন মুখাবয়বে গম্ভীর ভাব নিয়ে কয়েক কদম এগিয়ে এসে তিতলির থেকে দুহাত দূরে দাঁড়াল। প্যান্ট হাটু পর্যন্ত ভাঁজ করেছে।
রক্ষণশীল গলায় হুকুম ছেড়ে দিলো,
“তুমি এরচেয়ে বেশি দূরে যাবে না। আমি এখানে দাঁড়িয়ে দেখছি।”
তিতলির হালকা মন খারাপ হলো। ফারাজ কেন তার সাথে পা ভিজাতে আসছেনা? সে চাই ফারাজ আসুক। পরক্ষণেই মনেমনে বিড়বিড় করে বললো,
“চারদিকে অন্যঅন্য কাপলরা কত সুন্দর সুন্দর ভিডিও করে ছবি তুলে কিন্তু এই লোক তো আস্ত একটা গম্ভীরের ডেরম। দূর! তিতলি তুই কার কাছে কি আশা করছিস?”
মুখ বাঁকিয়ে নিজেনিজে আবার আনন্দে মেতে উঠল। বারবার ঢেউ আসছিল আর তিতলি ভিজে যাচ্ছিল। প্রাণ খুলে হাসছিল। উড়ছিল তার কোমর সমান খোলা চুল। মুগ্ধ চোখে নীল সমুদ্রে চেয়ে মোহাচ্ছন্ন কণ্ঠে আওড়াল, “কত সুন্দর এখানকার সবকিছুই।”
তিতলিকে দেখতে দেখতেই অভিব্যক্তি পাল্টে গেলো ফারাজের। গম্ভীরতা ছাপিয়ে দু’চোখে জড়ো হলো অপার মুগ্ধতা। তার ব্যক্তিগত পৃথিবীর হাস্যোজ্বল মুখ দেখছিল মোহাবিষ্ট নয়নে। হ্যাজেল চোখের মণিতে ভাসছিল সুন্দর একটি মুখ। আশেপাশের সব শব্দ ভুলে কানে বাজছিল রিনরিনে কণ্ঠের প্রাণবন্ত হাসির আওয়াজ। তিতলি হঠাৎ নিজের পেছনে কারো উপস্থিতি অনুভব করল। চমকে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে ধড়ফড়িয়ে উঠে পেছনে ঘুরলো তিতলি। সময় ক্ষেপণ করলো না ফারাজ। টালমাটাল রমণীকে নিজের অস্তিত্ব জানান দিতে একটানে নিয়ে এলো বুকের কাছে। দীর্ঘদেহী ইস্পাত কঠিন বুকের ভাজে পাখির পালকের মতো লেপ্টে গিয়ে দম নিলো তিতলি। খুশিতে মন জড়িয়ে গেল। কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকবে বলে কেন এলো এখন? ক্ষীণ আওয়াজ তুলে আওড়াল,
“আপনি এখন কেন এসেছেন?”
ফারাজের কণ্ঠ সমুদ্রের থেকেও গভীর শোনাল –
“তোমার এই আনন্দ উল্লাসে সঙ্গ দিতে এলাম।”
” ও তাই বুঝি?”
“হুমম।”
তিতলির মাথায় হঠাৎ দুষ্ট বদ্ধি চেপে বসল।
একটু নিচু হয়ে হাতের মুঠোয় পানি নিয়ে আবার ফেলে দেওয়ার ভান করে ফারাজের দিকে ছুড়ে মারল। ফারাজের মুখে কোনো রাগ নেই। তিতলিকে থামতে বলছেনা। তিতলির সাহস বেড়ে গেল। পরপর আবার পানি ছুড়ল। ঢেউয়ের সাথে ফারাজের প্যান্ট সহ উপরের দিকে অনেকটা ভিজে গেল। ফারাজ তিতলিকে ধরতে চাইল। তিতলি টুপ করে দৌড় দিলো। সামনে নরম বালুময় মাটির উপর দৌড়াতো শুরু করল।
ফারাজের এবার রাগ বাড়লো। যদি পড়ে যায়? তখন? ফারাজ তিতলির পেছনে না দৌড়ে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে শক্ত গলায় বলল,
“দাঁড়াও বলছি।”
“আগে ধরে দেখান।”
তিতলি হাতে বালুময় মাটি নিয়ে ফারাজের দিকে ছুড়ে মারল। চতুর ফারাজ সরে গেল। চোয়াল শক্ত হয়ে আসছে ক্রমশ। তিতলিকে ধরতে পারলে কি যে করবে। গলার আওয়াজ তুলে বলল,
“তোমার এসব ছেলেমানুষি আমার পছন্দ নয়।”
তিতলি মুখ ভেংচি কাটল,
“যেটা আপনার পছন্দ না সেটা বারবার করতে পছন্দ করি আমি।”
ফারাজ যতই ধরতে ধরতে চাইছে তিতলি ততই দৌড়ের গতি বাড়াচ্ছে। এমন না যে ফারাজ ধরতে পারছেনা। ফারাজ ইচ্ছে করে তিতলিকে ধরছেনা। দেখতে চাই এই মেয়ে কতটুকু দৌড়াতে পারে।
“আমাকে জ্বালাতে খুব মজা লাগছে না? আমি ধরতে পারলে কাঁচা চিবিয়ে খাবো তোমায়।”
“ধরতে পারলেই তো খাবেন।”
বলেই তিতলি আরও জোড়ে দৌড়াতে শুরু করল। ফারাজও নিজের ধৈর্য হারাল যেমন। সে তিতলিকে ধরার জন্য পেছন পেছন লম্বা কদম ফেলল। সুযোগ সন্ধানি ফারাজ সুযোগ বুঝে বউকে হাতেনাতে ধরবে।
কিছুটা দূরে মেয়ে কয়টা একসাথে দাঁড়ানো। তাদের দেখছে। ফারাজকে চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে। একজন চশমা ঠিক করে বলল,
“আরে শিউলি দেখ না ছেলেটা কি হ্যান্ডসাম।”
অন্যজন বলল,
“ঠিক বলেছিস আমিতো এক দেখাতেই ক্রাশ খেয়ে ফেলছি।”
কিন্তু এই মেয়েটার পেছন পেছন আসছে কেন রে?”
“মনে হয় ছোট বোন হবে।”
শিউলি নামে মেয়েটা তিতলিকে তাদের পাশ দিয়ে দৌড়াতে দেখে ডাকল,
“এই মেয়ে এদিকে আসো।”
তিতলি দৌড়াতে দৌড়াতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে প্রায়। বড়বড় নিশ্বাস নিচ্ছে। এত দৌড়ালো ফারাজ তাকে ধরতে পারল না। তিতলি দৌড়ে সবসময় ফাস্ট হয়। সেটা ফারাজকে দেখিয়ে দিলো। তিতলিকে হাঁফাতে দেখে শিউলি তাদের বোতলের পানি এগিয়ে দিলো,
“নেও পানি খাও।”
“তিতলি ঢকঢক কর সব পানি খেয়ে নিলো।
তারপর হাসিমুখে বলল,
“ধন্যবাদ আপু। কিছু বলবেন নাকি?”
“হ্যাঁ, তোমার সাথে ওই হ্যান্ডসাম ছেলেকে কে? নিশ্চয়ই তোমার ভাই।”
তিতলির নজর চলে গেলো সোজা মেয়েটার আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া সেই যুবকটার দিকে। ফারাজ এগিয়ে আসছে তিতলিকে ধরার জন্য। তিতলি এদিকে এসেছে দেখে ফারাজও এগিয়ে আসছে। তিতলি একবার মেয়ে গুলোর দৃষ্টি দেখে আবার ফারাজের দিকে তাকায়। যা বুঝলো তাতে হাসি মুখ মুহূর্তে রাগে ফেটে পড়ল।
ইচ্ছে করলো মেয়েগুলোর চুলোর মুঠি ধরে বলতে,
অন্যের স্বামীর দিকে নজর দিতে লজ্জা করেনা বেয়াদব মহিলা? কতবড় সাহস তার স্বামীর দিকে নজর দেয় এরা?
মেয়েটা আবার বলে উঠল,
“কি হলো বললে না তো তোমার কি হয়?”
তিতলি যখন টের পেলো ফারাজ তার কাছাকাছি চলে এসেছে ঠিক তখনি তিতলি একটু আওয়াজ করেই বলে উঠলো,
“আমার খাওয়া মাল।”
“কিহহ।”
“জ্বি যা বলছি ঠিক তাই শুনছেন।”
ফারাজ হঠাৎ সবার মাঝে তিতলির হাত ধরে ফেলল। তার পূর্ণ দৃষ্টি সরাসরি তিতলির উপর। আশেপাশে কোথাও নেই। তিতলিকে টেনে নিয়ে যেতে শুরু করল একপ্রকার। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“কি ভেবেছিলে ধরতে পারব না তোমায়?”
তিতলি নিজের হাত ছাড়িয়ে নিলো। কিছু বলল না।সোজা ব্যাগ থেকে লিপস্টিক বের করে ফারাজের সামনে দাঁড়িয়ে আন্দাজে ঠোঁটে লিপিস্টিক দিলো, ফারাজের কাছে এগিয়ে এলো। ফারাজের শার্টে বুকের কাছটায় চুমু দিয়ে লিপস্টিকের দাগ বসিয়ে দিয়ে মেয়েগুলোর দিকে তাকাল। মেয়ে গুলো বড়বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে। তিতলি একটা শয়তানি হাসি দিল। হতবিহ্বল ফারাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এটা কী করলে স্টুপিড?”
তিতলি চোখ পিটপিট করল,
“সিল মেরে দিলাম। কেউ যেন আর আপনার দিকে নজর দিতে না পারে। আপনি শুধু আমার।”
ফারাজ ঠোঁট কামড়ে ভ্রু নাচাতে নাচাতে বলল,
“পোড়া পোড়া গন্ধ পাচ্ছি ম্যাডাম।”
তিতলি ঘাবড়ে বলল,
“আগুন লেগেছে।”
★
শাওন আর শিফা একসঙ্গে সেরা মুহূর্ত কাটাল গত দুঘন্টা যাবত। শাওন তখনো শিফাকেই দেখছিল। এই মূহুর্তে তার চোখদুটো কেবল এই মুখটা ছাড়া আশেপাশের সবকিছুই যেন অর্থহীন, অপ্রয়জনীয়। শিফা চোখ নামিয়ে দৃষ্টি রাখলো শাওনের ফর্সা পুরুষালী পায়ের পাতায়। তবে বেশিক্ষণ এই ল’জ্জামিশ্রিত মুখটাকে লুকিয়ে রাখার সুযোগ পেলোনা। তার আগেই শাওন ওর চোয়াল ধরে মুখটা উপরে তুলল। করে বসল একটা কান্ড। ঠোঁট আকস্মাৎ চুমু বসিয়ে দিলো। গাঢ় চুমু। তারপর অতি সংবেদনশীল ভাবে পরপর কপালে চুমু একে দিলো। শিফা থরথর করে কেঁপে উঠল। শরীর হিম হয়ে এলো।
শাওন থরথর করে কেঁ’পে উঠা রমণীর পানে পূর্ণ দৃষ্টিপাত করে পুরো সুমদ্রকে সাক্ষী রেখে গভীর স্বরে বলল,
“অনেক বেশি ভালোবাসি তোমায় জান।”
“কীরে মেতর, মেতরনি।”
হঠাৎ এমন একটা কথা শুনে ওরা দুজনেই ছিটকে দূরে সরে গেল। শিফা লজ্জায় শেষ। শাওন আলভীর দিকে তাকিয়ে রাগী হওয়ার চেষ্টায় তেড়ে গেলো,
“তুই মেতর।”
আলভী শাওনকে চেতানোর জন্য বলল,
“তুকে বাথরুমের টাঙ্গি পরিষ্কার করা মেতরের মতো লাগছিল।যেমন ভাব নিস যেন তুই সুদর্শন পুরুষ এডলফ খান।”
“দাঁড়া শালা বউতো আনিস নি এখন অন্যের ভালোবাসা দেখে জ্বলে? কোথায় জ্বলে একটু দেখা বরফ লাগিয়ে দিতেছি।”
আলভী দৌড়ে চলে যেতে যেতে স্পর্শকতার জায়গায় হাত দিয়ে বলল,
“না বাবা আমার বউ ছাড়া এই জায়গায় হাত দেওয়ার অধিকার কারো নেই।”
★
তিতলি শামুকের মালা মুক্তার মালা,কানের দুল,চুড়ি হতে নুপুর হতে আরো কত কি কিনেছে হিসেব নেই। তার মাথায় একটা কথায় ঘুরছে।
আর সেটা যদি না বলে তাহলে বোধহয় মরেই যাবে। ফারাজ তো জানেও না বিষয়টা। তাই জানিয়ে দেওয়া দরকার। কিন্তু কিভাবে জানাবে? ফারাজ কথায় বলছেনা। এত গম্ভীর উফফ! সে এত কথা বলছে আর ওনি শুধু হু,হা করছে। তিতলি এত বোরিং মানুষকে ভালেবেসেছে। তার মতো একটা বাচাল, চঞ্চল,অবাধ্য মেয়ে একটা গম্ভীর স্যারকে ভালেবেসেছে। বিয়ে করেছে। যে রাত হলেই উন্মাদ আর সাইকো হয়ে যায়। আসল রুপ বেরিয়ে আসে। আর দিনে সবার মাঝে গম্ভীর সাজার ভং ধরে। তিতলি আইসক্রিম খেতে খেতে মুখ ফুলিয়ে বলল,
“দেখুন মিস্টার গম্ভীর হাসবেন্ড! আজকের রাতটা হতে যাচ্ছে আমার কাছে বিশেষ দিন। আর এখন আপনার সাথে ঝগড়া করে ঝামেলা করতে চাইনা আমি। আমার জন্মদিনের গিফট রেডি করতে প্রস্তুত থাকুন।”
এপর্যায়ে কপালের ভাঁজ আরও গাঢ় হলো ফারাজের। দৃষ্টি তুলে একবার তাকালো তিতলির মায়াবী মুখখানার পানে। মনেযোগ দিয়ে আইসক্রিম খাচ্ছে আর তাকে এটা সেটা বলে উসকে দিচ্ছে মেয়েটা কখন থেকে। সে ভেবেছিল তিতলিকে জন্মদিনের উইশ করে হঠাৎ চমকে দিবে। কিন্তু এই মেয়ে দেখছি সবকিছুতেই আগে ফাস্ট ফাস্ট। নিজের জন্মদিনের গিফট নিজেই চেয়ে নিচ্ছে। আশ্চর্য! গম্ভীর মুখো মানব এবার কেমন ভরাট কণ্ঠে আওড়াল,
“সেটা তুমি না বললেও আমি দিতাম। বাই দ্যা ওয়্যে, জন্মদিনের গিফট কেউ বলে বলে নিতে পারে সেটা তো আমার জানা ছিলো না মিসেস তিতলি।”
“কিন্তু আমি বলে বলে নিবো কারণ আমি যে গিফট চাইবো সে গিফট আপনার থেকে বলে বলেই নিতে হবে নয়তো আপনি দিবেন না।”
“তো আপনার কেমন গিফট লাগবে শুনি ম্যাডাম?”
তিতলি দুঢোক গিলে নিলো। আইসক্রিম খাওয়া থেকে মনেযোগ সরিয়ে সরাসরি ফারাজের মুখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টায়। পরপর মুচকি মুচকি হেসে বলল,
“আমার ডজন ডজন বাচ্চা লাগবে।”
হতবিহ্বল ফারাজ। থমকে গেল তার চলন্ত পাজোড়া। কি বলে এই মেয়ে? একটু আদর করতে গেলে যে মেয়ে জ্ঞান হারানোর পথে চলে যায় তার আবার ডজন ডজন বাচ্চা চাই এত অদ্ভুত চিন্তা ভাবনা মাথায় আসে কীভাবে? ফারাজ হঠাৎ ঠোঁট কামড়ে হাসল। তিতলির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করল,
“ডজন ডজন বাচ্চা একটু কম হয়ে গেলো না?”
তিতলি নিজের কথায় দৃঢ়,
“আমি এতকথা শুনতে চাই না। আমার ডজন ডজন বাচ্চা চাই আর এটাই ফাইনাল।”
“এটাই যদি তোমার ফাইনাল কথা হয় তাহলে তোমার সাথে যে আমার একটা শর্ত ছিল সেটার কি হবে হুমম?”
“কি শর্ত ছিল শুনি?”
“মনে করে দেখো।”
“স্যরি এইমুহূর্তে আমার মন ব্লক হয়ে গেছে, তাই কিছু মনে পড়ছেনা।”
ফারাজ কিয়ৎক্ষণ চোখ ছোট করে রেখে, ঠোঁট কামড়ে হাসল। অতঃপর পাতলা অধর নেড়েচেড়ে বলল,
” দশ-বিশটা টা বাচ্চা নেওয়ার কথা ছিল রাইট?”
তিতলি চোখদুটো রসগোল্লার ন্যায় বড়বড় হয়ে গেল। হাত থেকে আইসক্রিম ফসকে পড়ে গেল। পেলব ঝাপটে নিলো। ফারাজের বলা কথাটা শোনা মাত্রই তার মস্তিষ্কে সর্বপ্রথম একটা কথায় ভেসে উঠল,
“তা আপনি কয়টা বাচ্চা নিতে পারবেন ম্যাডাম! আমার তো আবার কম দিয়ে পোষাবে না। আফটার অল, দশ– বিশ টা বাচ্চা নেওয়ার কথা ভেবেছি, এতবার আমাকে সামলাতে পারবেন তো?”
তিতলি নিজেকে স্বাভাবিক করায় চেষ্টা করল। কাচুমাচু করছে। হঠাৎ এ কথা? এটা তো ফারাজ মেসেজে বলেছে অনেক আগে। তার ফেক আইডির কথা কি জেনে গেলো নাকি? শুধু এ ভয়ে সে ফেক আইডি নষ্ট করে ফেলেছে। যাতে কখনো ফারাজের কাছে ধরা পড়ে গেলেও ফেক আইডির কোনো অস্তিত্ব না থাকে। আহ-হায় ধরা পড়ে গেলে তো আর রক্ষা নেই। তিতলি চোরাচোখে ফারাজের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
“কককখন…কখন কখন বলছেন একথা?”
ফারাজের ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও গাঢ় হয়েছে। কিছুক্ষণ নীরব থেকে তিতলির এইটুকুন হয়ে যাওয়া মুখের পানে চেয়ে বাঁকা হাসল। তবে তা ন্যানোসেকেন্ডের বিরতিতে মিলিয়ে গেল। পরপর সময় নিয়ে জবাব দিলো,
“কেউ একজনকে বলেছিলাম।”
তিতলি শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টায় কপোকাত। সে কেউ একজন নিশ্চয়ই সে ছাড়া আর কেউনা। ফারাজ তাকেই বলেছিল। এখন সেটা স্বীকার করবে? নাকি করবেনা? এখন কি করবে? ভেবেচিন্তে রাগ করার চেষ্টা করে বলল,
“কিহহ আপনি অন্য কাউকে বাচ্চা নেওয়ার কথা বলছেন? এত বড় সাহস?
ফারাজের জবাব এলো সাথেসাথেই,
” হুমম, সাহস আছে বলেই বলেছি। তোমার প্রবলেম?”
“অবশ্যই প্রবলেম।”
“কেন?”
তিতলি নাক মুখ ফুলিয়ে ফেলল। কান্না করে দিবে দিবে ভাব,
আপনি…..”
তিতলি কান্নাকান্না মুখশ্রী বানিয়ে একা একা সামনে হাঁটা ধরল। বেশি এক্টিং করতে গেলে পরে দেখা যাবে তার এতক্ষণ করা অভিনয় টা বিফলে যাবে। তারচেয়ে কথা না বাড়ানোই ভালো। সামনে কত সুন্দর সুন্দর কাপল যাচ্ছে। জড়িয়ে ধরে ধরে। মিষ্টি মিষ্টি কথা বলছে। রোমান্টিক কথা বলছে। তিতলি হঠাৎ তার সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়া কাপলকে বলল,
“আপনারা কি আমাদের মতো হানিমুনে এসেছেন?”
চিমচাম গরনের ছেলেটা তিতলির মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বোঝার চেষ্টা করে। তারপর মেয়েটার ঠিক পেছনে একজন যুবককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। হয়তো মেয়েটার হাসবেন্ডই হবে। তারপর বলল,
“আপনারা হানিমুনে এসেছেন এখন আমাদের টা আপনি যদি ভাবেন হানিমুন, তাহলে হানিমুন।’
তিতলি মেকি হেসে বলল,
“জ্বি ভাইয়া, আমরা হানিমুনে এসেছি কিন্তু আমরা অন্যদের মতো অশ্লীল হানিমুনে আসিনি আমরা ভালো হানিমুনে এসেছি।”
ফারাজ ঠিক তিতলির পেছনে দাঁড়িয়ে সব কথা শুনল। সহসা কোনোরূপ ওয়ার্নিং ছাড়াই সবার মাঝেই তুলোর সমেত তিতলিকে কোলে তোলে নিলো। তিতলি কিছু বুঝার আগেই ফ্ল্যাটের উদ্দেশ্য পা চালালো। তিতলি ছটফট করে করল নামার জন্য।তর্ক করল। ফারাজ ছাড়ল না। বিন্দুমাত্র প্রতিক্রিয়া দেখাল না। তার বাদামি ঠোঁটজোড়া বিড়বিড়ালো,
“তুমি কেমন হানিমুনে এসেছো সেটা আজকে রাতেই টের পাবে সোনা।”
#চলবে।
বাসর চাই নাকি? যদি বাসর চাও সবাই রেসপন্স করো নয়তো এ জন্মে আর বাসর হবেনা।
Share On:
TAGS: রাগে অনুরাগে, সুহাসিনি ফাতেহা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ৫৯
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ৩৫
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ৩৬
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ৪০(প্রথম অংশ+শেষাংশ)
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ৫৮
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ৩২
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ১২
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ৭
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ৩০
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ৩৭(প্রথম অংশ+শেষাংশ)