#রাগে_অনুরাগে
#পর্ব_৫৬(প্রথম_অংশ)
#সুহাসিনি_ফাতেহা
কক্সবাজার বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ১২০ কিলোমিটার। বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি আর অন্তহীন সোনালী বালিচরের রূপ ভ্রমণকারীদের মন জুড়িয়ে দেয়। সমুদ্রের বুকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের অপূর্ব দৃশ্য এই অঞ্চলের অন্যতম বড় আকর্ষণ। সমুদ্র সৈকতের পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা সবুজ ঝাউবনের সারি প্রকৃতিকে করেছে আরও সুন্দর। মেরিন ড্রাইভ রোডের একদিকে অন্তহীন সমুদ্র আর অন্যদিকে উঁচু পাহাড়ের মিতালি এক জাদুকরী পরিবেশ তৈরি করে। হিমছড়ির পাহাড়ি ঝরনা আর উঁচু পাহাড়ের চূড়া থেকে সমুদ্রের প্যানোরামিক দৃশ্য দেখার মতো। ইনানী সমুদ্র সৈকতের রূপালী বালি আর অদ্ভুত সুন্দর প্রবাল পাথর পর্যটকদের মুগ্ধ করে। কাছেই থাকা প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের স্বচ্ছ নীল পানি ও জাদুকরী সৌন্দর্য একে স্বর্গীয় রূপ দেয়। রামু ও মহেশখালীর বৌদ্ধ মন্দির ও পাহাড়ি সংস্কৃতি এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে যোগ করেছে আলাদা মাত্রা। সমুদ্রের গর্জনের সাথে মৃদু শীতল হাওয়া মিলে কক্সবাজারকে এক অনন্য শান্ত ও মনোরম পর্যটন স্বর্গ বানিয়েছে।
কক্সবাজারের এই অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করার সখ তিতলির ক্লাস 6 থেকে। আবেগে নেচেকুঁদে বেড়ানোর সময় তখন। সেবার তুষার কলেজের বন্ধু-বান্ধবদের সাথে কক্সবাজার ট্যুরে যাবে। তিতলি তুষারের সাথে যাওয়ার আশায় সারাদিন ঘুরঘুর করেছিল তুষারের পেছন পেছন।পটারোর কোনো কমতি রাখেনি। তাও ভাইকে পটাতে পারেনি বেচারি। বলতে গেলে তুষার তার কথা শোনার প্রয়োজনবোধ পর্যন্ত মনে করেনি পটা তো দূরের বিষয়। লাস্টে তুষারের রুমে গিয়েও প্রায় দুঘন্টা যাবত বসে ছিল। তুষার তো জানে বোনের মতলব কী। তারপরও না জানার ভান ধরে বলল,
“কী বলতে চাস এবার বল দেখি?”
তিতলি যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়ে গেল। অবশেষে! অবশেষে ভাই তাকে নিজ থেকে বলছে সে কি বলতে চাই? এটা কম কিসের? সেতো ভেবেছিল আজকের জন্য ভাইয়ের মুখে ধর্মঘাট লেগেছে। যাক যেহেতু বলেছে সে কি বলতে চাই তাহলে বলে দেখাই যাক। বললে নিশ্চয়ই নিয়েও যাবে। তাই তিতলি উত্তেজিত কন্ঠে সোজাসাপটা জবাব দেয়,
“আমি তোমার সাথে কক্সবাজার যেতে চাই।”
তিতলি যতটা উত্তেজিত হয়ে বলেছিল তুষার ঠিক ততটাই রাগান্বিত হয়ে বলছিল,
“কানের নিচে একটা দিবো। যা এখান থেকে।”
তিতলি কি আর কথা শোনার মেয়ে? সেও ভাইয়ের কথার বিপরীতে শয়তানি হাসি দিয়ে বলল,
“তুমি যদি আমাকে না নিয়ে যাও আমি আব্বুকে একটা কথা বলে দিবো।”
“তা কি বলবি?”
“তুমি কালকে কলেজে একটা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়েছ সেটা।”
তুষার স্টাডি টেবিল থেকে স্ক্রেল হাতে নিলো। বোনকে শায়েস্তা করার দরকার। বেশি পেঁকে গেছে। কখনো বোনের গায়ে একটা ফুলের টোকাও দেয়নি। মার তো দেওয়া তো দূরের বিষয়। কিন্তু এখন এমন ভাব দেখাল যেন সত্যি মারবে। এক্ষুনি মার দিবে দিবে ভাব। তিতলি তো শেষ। কক্সবাজার গোল্লায় যাক! এক দৌড় দিলো দরজার দিকে। তুষার ভয় দেখিয়ে তিতলিকে মারার জন্য দরজার দিকে তেড়ে আসতে আসতে বলল,
“এখন পালাচ্ছিস কেন? দাঁড়া বাটপার।”
তিতলি দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। বিনা দোষে মাইর খেতে চাইনা সে। ভাইকে ব্লেকমেইল করে যদি কোনোভাবে কক্সবাজার যেতে পারতো তাহলে মন্দ কিসের? তাই বানিয়ে বানিয়ে বলেছিল কথাটা। কিন্তু যেতে তো পারলো না উল্টো মাইর খাওয়ার ভয়ে দৌড়ে চলে এসেছে। কথায় আছেনা মাইরকে ভূতেও ভয় পায়। যদিও তুষার তাকে ঢাকার ভেতরে যত জায়গায় ঘুরতে যেত সব জায়গাতেই সাথে করে নিয়ে যেত।
কিন্তু ঢাকার বাইরে বা অন্য কোথাও সাথে নেইনি। কেন নেইনা? তাই তিতলি নিচে এসে আব্বুর কাছে নালিশ করল, “কক্সবাজার যেতে চেয়েছি বলে ভাইয়া আমাকে মারতে চাইছে আব্বু।” তৌসিফ শেখ মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বোঝানোর সুরে বলছিলেন,
“মেয়েদের আসল ঘুরাঘুরি হচ্ছে বিয়ের পর স্বামীর সাথে বুঝছো আম্মু? আর তুষার ছেলেদের সাথে ট্যুরে যাচ্ছে তুমি একা মেয়ে সেখানে যাওয়া ভালো দেখায় বলো?”
তিতলি ঘুরাঘুরি করতে চাই। আল্লাহর সৃষ্টির অপরুপ সৌন্দর্য ঘেরা প্রকৃতিতে দুহাত মেলে প্রাণ ভরে নিশ্বাস নিতে চাই। মন খুলে হাসতে চাই। মুগ্ধ হয়ে প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যেতে চাই। বাবা যেহেতু বলেছে মেয়েদের ঘুরাঘুরি বিয়ের পর স্বামীর সাথে তাই সে তখন বাবাকে বলছিল,
“তাহলে আমাকে বিয়ে দিয়ে দাও আব্বু। আমিও স্বামীর সাথে ঘুরতে চাই।”
তিতলি ছোট থেকেই কাউকে কোনো কথা বলতে কখনো দ্বিধাবোধ করেনি। মুখে, মনে যা আসত ফটফট করে বলে দেওয়াটাই ওর স্বভাব। যেটা এখনো বদলাতে পারেনি। হয়তো সময়ের সাথে সাথে বদলে যাবে এসব স্বভাব। যখন বুঝতে শিখবে বাস্তবতা সম্পর্কে, নিজেকে বুঝবে,আজকের মেয়েটা কোনো এক সময় কোনো কঠিন পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবেলা করতে হয় সেটাও বুঝবে হয়তো। এখনই তো নেচেকুঁদে বেড়ানোর সময়। তিতলির কাছে ঘুরাঘুরি, হাসিখুশি, আর সবার সাথে মিলেমিশে থাকতেই ভীষণ ভালো লাগে। যখন থেকে ধীরেধীরে বুঝতে শিখেছে তখন থেকেই মনেমনে চেয়ে এসেছে, একটা ভালোবাসার মানুষ থাকবে তার। যে তাকে অসম্ভব রকম ভালো বাসবে কখনো বিরক্ত হবে না তার উপর তার কোনো চাওয়া অপূর্ণ রাখবেনা। সবসময় তার পাশে থাকবে তাকে খুশি রাখবে।
★
চার ঘন্টা গাড়ি চলেছে একটানা। অথচ ফারাজ একটা কথাও বলছেনা গাড়িতে। একটা মানুষ এতটা গম্ভীর কীভাবে হতে পারে? নিজ থেকে একটি কথাও বলছে না৷ তিতলি কথা বললে জবাব দিচ্ছে দু’এক শব্দে। চুপচাপ থাকার মেয়ে তো তিতলি নয়। সে জোরপূর্বক আজাইরা বকবক করে এটা সেটা বলছে। একসময় ফারাজ ধমকের সুরে চুপ থাকতে বলেছে। ধমক খেয়ে রাগে অপমানে তিতলি একেবারে চুপ। ফারাজের দিকেও তাকাল না আর। ভেবেই নিয়েছে ওখানে পৌঁছালেও ফারাজের সাথে কথা বলবেনা। তখন ভুলিয়ে বালিয়ে তার কাছে আসার বাহানা করবে। তিতলি একদম কাছে আসতে দিবেনা। হুহ!
কাঁচের জানালা খোলা। বাইর থেকে শো শো করে দক্ষিণা বাতাস উপছে পড়ছে তিতলির মুখে। বাতাসের সাথেসাথে চুল উড়ছে। গাড়ি চলার সাথে সাথে বাইরের প্রকৃতি দেখতে অদ্ভুত শান্তি লাগছে। ভেতরে তো একটা গম্ভীর লোক গাড়ি চালাচ্ছে। তারচেয়ে বরং বাইরে তাকিয়ে থাকায় ভালো। কিছুসময় পাড় হতেই হঠাৎ কানে ভেসে এলো ফারাজের গম্ভীর কন্ঠমুর,
“বাইরের প্রকৃতি দেখা শেষ হলে এবার গাড়ির ভেতরে তাকানো হোক।”
তিতলি নিশ্চুপ! গাড়ির কাঁচে দেখছে ফারাজের নজর পুরোপুরি সামনের দিকে এবং মনেযোগ গাড়ি চালানোতে। আশ্চর্য তার দিকে না তাকিয়েও কীভাবে বুঝল? যেভাবেই বুঝুক তিতলির কি? সে গাড়ির ভেতরে তাকালোই না।
ফারাজ তখন থেকে খেয়াল করছে তিতলি সে যে বাইরে তাকিয়েছে আর গাড়ির ভেতরে নজর দেইনি। রাগ লাগছে তার। মেয়েটার এই সামান্য প্রকৃতি দেখা নিযেও তার হিংসা হচ্ছে। কি আশ্চর্য! এই নারীর পছন্দের সব কিছুর উর্ধ্বে সে থাকতে চাই। ফারাজ যখন দেখল তিতলি তার কথা শুনেও শুনছেনা তখন চোয়াল শক্ত করে স্টিয়ারিং শক্ত বরে চেপে ধরে। তাও গলার সুর নরম শোনালো–,
“ফোকাস অন মি, মিসেস তিতলি।”
তিতলি আগের ন্যায় এবারও নিশ্চুপ। ফারাজকে ইগনোর করতে পেরে বেশ আনন্দ লাগছে। আর তাকে ধমক দিবে হুহ!
তিতলির থেকে কোনরুপ টু শব্দদ না পেয়ে ফারাজের আকাশসম রাগে গাড়ির স্পিড আগের তুলনায় দ্বিগুন বাড়িয়ে দিলো। এতটাই জোড়ে যে তিতলি কাঁচের জানালার সাথে ধাক্কা খেতে খেতে নিজেকে সামলে নিলো। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই হিমশিম খাচ্ছিল। যেন চোখের সামনেই বাইরের সব মিলিয়ে যাচ্ছে। ভয়ে তিতলি শেষ। ফারাজের দিকে তাকিয়ে দেখল লোকটার কানের পাশে রগ গুলো টগবগিয়ে ফুলে উঠেছে। চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে দ্রুতভাবে স্টিয়ারিং ঘুরাচ্ছে। ভয়ার্ত তিতলি আঁকাবাঁকা রাস্তায় গাড়ির ধাক্কার সাশে ফারাজের কাঁধ আকড়ে ধরল। চেঁচিয়ে বলল,
“আরেহ এত জোড়ে গাড়ি চালাবেন না, এক্সিডেন্ট হয়ে যাবে তো।”
ফারাজ চোয়াল শক্ত করে জবাব দেয়,
“হোক।”
“আমার ভয় লাগছে প্লিজ গাড়ি থামান
আমি মরে যাবো তো।”
“ধ্বংস করে ফেলব সব।”
তিতলি ফারাজের কথার মানে বুঝতেই পারছেনা এমুহূর্তে। কি ধ্বংসস করে ফেলবে? সে গাড়ি থামাতে বলছে আর এই লোক কি বলছে? এক্সিডেন্ট করে সব ধ্বংস করে দেওয়ার কথা বলছে না তো? সব তো ঠিক ছিলো হঠাৎ রেগে বোম হয়ে গেল? সে কথার জবাব দেইনি তাই বলে কী? তিতলি ফারাজের সীটে কিছুটা ঝুঁকে গিয়ে ফারাজের গলা জড়িয়ে ধরল হঠাৎ। বলল,
“কি হয়েছে আপনার? গাড়ি ধীরে চালাতে বলছি। কি চান আপনি? যখন কথা বলছিলাম তখন তো ধমক দিয়ে চুপ থাকতে বলছেন আপনি আমাকে কথা ও বলতে দেন না আবার কথা না বললেও রেগে যান।”
তিতলি কথাটা বলতে না বলতেই গাড়ির স্পিড ধীরেধীরে আগের মতো হয়ে গেল। তিতলি ফারাজের সীটে বলতে গেল ফারাজের গলা জড়িয়ে। ফারাজ গাড়ি চালাতে অুসবিধা হচ্ছিল। গমগমে গলায় ফারাজ বলল,
“আমি চুপ থাকতে বলছি বলে তোমাকে একেবারে চুপ হয়ে যেতে বলিনি স্টুপিড।”
“তো কি করবো? আপনি চুপ থাকতে বলছেন তাই চুপ থেকেছি, আপনার কথাও তো শোনা লাগবে তাইনা বলুন?
ফারাজ কোনো জবাব দিলো না। এখন তার মুখে ক
আর কতক্ষণ লাগবে?
দুএক ঘন্টা।’
‘এখনো দু ঘন্টা। আমার কোমর ব্যথা করছে। আমি একটু শুবো। শুই এখানে?”
তিতলি ফারাজের উত্তরের অপেক্ষা না করে ফারাজের উরুর উপর মুখ গুঁজে নিজের সীটে পা মেলে শুয়ে পড়ল। এভাবে এতক্ষণ বসে থাকা যায়? আর কিছুক্ষণ বসে থাকলে দেখা যাবে কক্সবাজার গেলে তখন আর হাঁটতে পারবে না। থাক কক্সবাজার গেলে হাঁটার জন্য বল রাখতে হবে সেকথা ভেবে তিতলি শুয়ে পড়েছে। তিতলি বোধহয় শুয়েও শান্তি পাবেনা। শুতে না শুতেই শুনতে হলো,
“ফুল স্পিডে গাড়ি চালিয়েছি বলে এক্সিডেন্টের ভয় পেয়েছিলে, এখন ধীরে গাড়ি চালিয়েও যদি এক্সিডেন্ট করে ম’রে যাই?’
তিতলি বিস্মিত কন্ঠে বললো,
” এসব কি বলছেন?”
ফারাজ তিতলিকে আরাম করে শুয়ার জন্য সুযোগ করে দিলো। তারপর স্টিয়ারিং হাত রেখে তিতলির মায়বী মুখপানে পূর্ণ দৃষ্টিপাত রেখে ঠোঁট কামড়ে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“এভাবে মুখ গুঁজে দিয়ে আমাকে সি’ডি’উস করার কি খুব দরকার? নিজের কন্ট্রোল হারিয়ে ফেললে হানিমুনে যাওয়ার আগে আমি গাড়িতেই….”
কিছু এটা ভেবে থেমে গেল ফারাজ।
তিতলির ফারাজের শক্তপোক্ত উরুতে চিমটি বসাল। ভুল হয়ে গেছে তার। এই লোক কোনো ভালো মাইন্ডের না সেটা তার আগেই বোঝা উচিত ছিল। একটু উরুতে মুখ গুঁজে শুয়েছে তাতেও মনেহয় শান্তি হবেনা।
★
কক্সবাজার এসে পৌঁছানোর পর সর্বপ্রথম একটা বারোতলা বিশিষ্ট বিশাল ভবনের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে সবাই। তিতলি তাকিয়ে আশেপাশে সব দেখছে। ফারাজ তার একহাত শক্ত করে ধরে রেখেছে। অন্যহাতে ল্যাগেজ। তাদের পাশে আলভী আর শাওন রা দাঁড়িয়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুজন পুুরুষ ওদের দেখেই এগিয়ে এলো। একজনের বয়স ২৬ । চিমচিমে গরমের। শার্ট প্যান্ট পরা। নাম রিংকু অন্যজন একটু মোট্তাজা বয়ম একই। দুজনই এই বিশাল ভবনের ম্যানাজার। সাধারত যারা কক্সবাজার ঘুরতে আসে তারা এখানকার ফ্ল্যাট গুলো ভাড়া নেই। আশেপাশে আরও বেশ কয়েকটা আছে দু তলা তিনতলা পাঁচতলা দশতলা।
“আসলামু আলাইকুম স্যার। আপনাদের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।”
ফারাজ সালামের জবাব নিয়ে গম্ভীর গলায় বললো,
“ওয়ালাইকুম আসসালাম।”
“আসার সময় কোনো সমস্যা হয়নি তো স্যার?”
আলভী টানা ছয়ঘন্টা গাড়ি চালিয়ে আধমরা অবস্থা। জীবনে এতদূর একটানা গাড়ি চালাইনি কখনো। হাত পা সব ব্যথা করছে। সে ফারাজের আগে আগে বলল,
“কি সমস্যা হয়নি সেটা বলেন ভাই? আপনাদের উচিত ছিলো বিমান পাঠিয়ে আমাদের আনতে যাওয়া।”
“কি যে বলেন না ভাই। আমরা বিমান কই পামু?”
আলভী কপালের ঘাম মুছে বলল,
“আসলে সমস্যার কথা বলছেন তো তাই বিমানের কথা বলছি। কিছু মনে করবেন না ভাই।’
তিতলি আলভীর কথা শুনে হঠাৎ বলে উঠল,
“বিমান পাঠালে ভালোই হতো আমার তো কোম…”.
ফারাজ তিতলির হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল। তিতলি হাতে চাপ পেয়ে আড়চোখে ফারাজের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
“হ..হ্যাঁ না মানে কিছু না।”
” সব রেডি স্যার, উপরের পাঁচতলা সব কক্ষ আপনাদের জন্য বরাদ্দ করা রাখা।
সবাই রিংকু আর মিংকুর পেছন পেছন সিঁড়ি বেয়ে ভেতরে গেল। লিফট ব্যবহার করা হয়েছে উপরে উঠার জন্য। সাথে সিঁড়িও রয়েছে যাদের যেটা ভালো মনে হয় তারা সেটাই ব্যবহার করে। ফারাজরা সবাই পাঁচতলা উঠার জন্য লিফট ব্যবহার করল। ফারাজ ম্যানাজার দের সাথে কি নিয়ে কথা বলছিৈ। এই ফাঁকে আলভী তিতলিকে আস্তে করে বলল,
“ভাবি রাতে-বিরেতে সাবধানে থাকবেন। আপনার আশেপাশে মানুষরূপী রাক্ষস ঘুরঘুর করছে। হয়তো সে রাক্ষস আমাদের সাথেই আছে।”
“রেসপন্সের কথা বলব না যার ইচ্ছে লাইক কমেন্ট করো আল্লাহ হাফেজ।”
#রাগে_অনুরাগে
#পর্ব_৫৬_(শেষাংশ)রোমান্টিক এলার্ট
#সুহাসিনি_ফাতেহা
কক্সবাজারের আবহাওয়া মানেই আধুনিক ভাষায় মুড সুইং। শীত, বর্ষা, গরম যেকোনো মৌসুম-ই এখানকার প্রকৃতিকে নতুন নতুন রুপে সাজিয়ে তুলে। আশেপাশের মানুষজন কিংবা বিশেষ করে যারা দূর-দূরান্তর থেকে কক্সবাজারের অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে ছুটে আসে তাদের সকলের মন জুড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
ঘড়ির কাঁটা রাত সাতটা একুশে। টানা ছয়ঘন্টা জার্নি করার ফলে সকলেই বেশ ক্লান্ত। তাই সবাই ভেবেচিন্তে ঠিক করেছে আজকে রাতে আর বাইরে ঘুরাঘুরি করবেনা। তবে বাইরে ঘুরাঘুরি না করলেও বারোতলায় গড়ে উঠা ভবনটার বিশালাকার ছাঁদে জাঁকজমকপূর্ণ পার্টির আয়োজন করা হয়েছে। আলোয় আলোকিত হয়ে আছে চারিপাশ। এছাড়া খোলা আকাশের নিচে মেঘের আড়াল থেকে চাঁদের উঁকিঝুঁকি দেওয়া দৃশ্যটা যেনো ছাঁদের উপর এক দারুণ মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে। পাশাপাশি অদূর থেকে ভেসে আসা সামদ্রিক ঢেউয়ের বিশাল গর্জন আর হালকা ঠান্ডা হাওয়ায় যেনো শীতের আমেজ ধরা দিচ্ছে—মনে হচ্ছে,শীতের আগমনী বার্তা পৌঁছে গেছে সমুদ্রের শহরে।
সম্পুর্ন ছাঁদ জুড়ে মানুষের হাঁটাহাঁটি, হাসাহাসির তীব্র শব্দে মুখরিত হয়ে আছে। ছাঁদের মধ্যেখানে গোলাকার ভঙ্গিতে চেয়ার বসানো হয়েছে। চেয়ার গুলোর মধ্যেস্থানে বড়ো টেবিল। টেবিল জুড়ে রয়েছে নানান প্রকার পছন্দের অপছন্দের খাবার। আলভী আর শাওন সমান তালে খেয়ে চলেছ। আর এটা সেটা নিয়ে তর্কবিতর্ক করছে। শুধু তারা নয় এই ফ্লাটে ভাড়া নেওয়া আরও বেশকিছু কপোত-কপোতি ছাঁদের এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরি করছে। তর্কবিতর্কের মাঝেই হঠাৎ শাওন কিছু একটা মনে করে আলভীকে বলল,
“একটা জিনিস খেয়াল করছিস?”
আলভী শুধালো, “আমিতো অনেক কিছুই খেয়াল করছি কিন্তু তুই কোনটার কথা বলছিস রে?”
“ফারাজ রুমে গেলো আর ফিরে আসলো না বিষয়টার মানে কি বোঝায়? ভাবিও রুমে?”
আলভী চামচ দিয়ে বার্গার খেতে খেতে বলল,
“কী আর বোঝায়? আসতে না আসতেই নাদান শিশুটার সাথে ফষ্টিনষ্টি করা শুরু করছে। এটা আবার খেয়াল করা লাগে নাকি? আমি নিজেও এটাই ভাবছিলাম।”
বলেই আলভী আর শাওন হো হো করে হেসে উঠল। শাওনের পাশে শিফা বসে আছে। শাওনের দিকে তাকিয়ে লাজুক হাসছে মেয়েটা। ভালোবেসে বিয়ে করেছে ওরা দুজন। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো এই প্রথম তারা একসঙ্গে এতদূর এসেছে। এমনকি বিয়ের আগেও কখনো তারা একসঙ্গে ঘুরেনি। এখন তো মানুষজন একটু-আধটু প্রেম হলেই সাপ্তাহে দু’তিন দিন ডেটে যায়। কিন্তু ওদের প্রেম টা একটু অন্যরকম ছিল। ফেসবুক থেকে পরিচয় তারপর ধীরেধীরে বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসা। সামনাসামনি কোনো দেখাদেখি ছাড়া সোজা বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানো এভাবেই পারিবারিক ভাবে ওদের ভালোবাসা পূর্ণতা পেয়েছে। যাকে লাভ ম্যারেজ অর অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ দুটাই বলা যায়। শিফার লাজুক মুখপানে তাকিয়ে শাওনের ঠোঁটে মোলায়েম হাসি ফুটল। শিফাও মুচকি হাসছে। পাশের চেয়ারে বসে থাকা আলভীর চোখে সে দৃশ্যটা নজরে এলো। আলভী ছেলেটার মুখে লাগাম নেই। ভালো খারাপ যা বলার সামনাসামনি বলে দেওয়া-ই ওর স্বভাব। ওদের দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকা দৃশ্যটা দেখে খানিকটা কৌতুক করেই বলে উঠল,
” কী রে! এমন ভাবে দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে আছিস যেমন তুইও ফারাজের মতো অন্তরঙ্গ মুহূর্তে লিপ্ত হবি? “
অপ্রত্যাশিত কথায় ভড়কে গেল শাওন আর শিফা দুজনেই। শিফার লাল গাল দুটো দেখেই বুঝা গেল মেয়েটা বেশ লজ্জা পেয়েছে। বন্ধুরা বুঝি এমন লাগামহীন হয়? শাওনও কম কীসে? সোজাসাপটা বলল,
“চুপ কর শালা। তোর মন চাইলে তুই ওইযে ওখানে…”
শাওনের কথার মাঝেই আলভী দুঃখের সহিত বলে উঠলো,
“মাঝখান দিয়ে আমিই মনে হয় কাবাব মে হাড্ডি।তোর শিফা আছে ফারাজের তিতলি আছে আমার শুধু আমি আছি, হায়রে—কী পোড়া কপাল আমার।”
শাওন মোবাইল হাতে নিয়ে লক খুলে সোজা ডায়ালে গেল। তারপর বাঁকা হেসে বলল,
“তুই যে নিজেকে সিঙ্গেল বলে দাবি করছিস এখন সেটা সুমিকে কল দিয়ে জানানো উচিত।এক বাচ্চার বাপ হয়ে গেছিস তাও এসব ভন্ডামি যায় নি? সুমিকে নিয়ে আসলেই পারতি।”
“ওই কালনাগিনীকে এখানে নিয়ে আসলে এতক্ষণে আমার পকেট খালি হয়ে যেত নিশ্চিত।”
শাওন শিফার দিকে তাকিয়ে থেকে বড় গলায় আলভীকে বলল,
“বউয়ের জন্য পকেট খালি করতে কখনো কিপ্টামি করিস না বুঝলি? বরং এতে টাকা-পয়সায় বরকত বাড়ে। এসব কিপ্টামি ছেড়ে দে দোস্ত।”
আলভী পানির গ্লাস হাতে নিয়ে কপাল কুঁচকায়। পরপর ঠোঁট বাকিয়ে বলে,
“টাকা কি গাছে ধরে নাকি?
শাওনও আলভীর কথা শুনে বলল,
“একটা কাজ করতে পারিস, তারেক রহমানের জুতো পরিষ্কার করার কাজ নে, বা যেখানে টাকা বানায় সেখানে চাকরি কর, টাকা চোখের সামনে দেখবি আর কিসে ধরে সেটাও দেখবি।”
আলভী বলল,” সব সরকার বাটপার! হাসিনা-ই ভালো ছিল নানিটাকে এখনো রাতে ঘুমাতে গেলে খুব মনে পড়ে।”
“যা বুঝলাম তোকে সুমি এমনি এমনি ঝাড়ু নিয়ে কুদায় না। এটাই তার প্রকৃত প্রমাণ শেষ পর্যন্ত হাসু আপাকেও মনে জায়গা দিয়েছিস?”
আলভী চেহারাটা দুঃখী দুঃখী বানিয়ে বলল,
“এই মনে সুমি ছাড়া অন্য কাউকে জায়গা দেওয়া মানেই সুমির হাতে নিজেকে কোরবানি দেওয়া।”
“আচ্ছা বাদ দে। আজকের পার্টির সব টাকা কিন্তু তুই দিবি।”
আলভী মাথা চুলকে বলল,
“কিছুদিন পর সুমি আমারে ফকির, মিসকিন বানাইয়া রাস্তায় থাল নিয়ে নামতে বাধ্য করবে ভিক্কা করবার জন্য। এখন তোরাও চাইছিস নাকি আমি ভিক্কা করি?”
“ভিক্কা করাও একটা কাজ, যারা থাল নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে মানুষের বাড়ি বাড়ি যায় এটাও একটা শ্রম বুঝলি? তবে একটা কথা কী জানিস? ভিক্কা করলে একদিকে লাভ দিনে ১ হাজার করে ফেলে মাসে ৩০ হাজার টাকা কনর্ফাম।”
“একদিন তাহলে আমি আর তুই ফকির সেজে রাস্তায় নামব কি বলিস? দুজনে মিলে ৬০ হাজার পেয়ে যাবো।”
শিফা পাশ থেকে শাওনকে কনুই দিয়ে গুতা মারল। শাওন শিফার দিকে তাকাল। শিফার মুখ দেখে বুঝা যাচ্ছে সে শাওনকে কিছু বলতে চাই। কিন্তু আলভীর থাকায় বলতে দ্বিধা করছে। আলভী হয়তো বুঝল সেটা? হঠাৎ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“আচ্ছা তোরা দুজন কথা বল, আমি যায় ফারাজের রুমের দরজায় গিয়ে রোমান্সের বারোটা বাজিয়ে দিয়ে আসি আমার আবার কারো সুখ সহ্য হয়না।”
শাওন বলল,”তুই সব সময় ফারাজের পেছনে লেগে থাকিস কেন? বলতো?”
আলভী শয়তানি হাসি দিয়ে হাতের ঘড়িতে নজর বুলিয়ে বলল,
“আমার জন্মই তো হয়েছে ফারাজের পেছনে লেগে থাকার জন্য।”
শাওন কিছু একটা মনে করে বলল,
“আমি এখনো ভুলি নি ফারাজ বাসর ঘরে ঢুকার জন্য প্যাকেটে সাদা কাগজ ঢুকিয়ে আমাদের টাকা বলে চালিয়ে দিয়েছে। দেখিস আবার তোকে মেরে বস্তায় ভরে চাল বলে চালিয়ে না দেয় আবার।”
“আমাদের বোকা বানানোর জন্য আমি প্রতিশোধ নিয়েছি। এত কষ্ট করে বাসর ঘর সাজিয়েছি টাকা না নিয়ে ছেড়ে দিবো?”
“কখন কি অকাম করলি তুই আবার?”
“ওর এটিএম কার্ড হাতিয়ে নিয়েছিলাম।”
“তা কত টাকা পেলি?”
“প্রায় ৭০ হাজার ছিল। তুই তো ছিলি আমাদের সাথে তোরও পাওনা ছিল কিন্তু তোর নাম্বারে কল ঢুকেনি তাই তোকে দি নাই।”
“তুই যে কিপ্টার কিপ্টা টাকা দেওয়ার হলে বিকাশে দিতে পারতি। তোর তো মনে ছিলো দিবি না তাই দিসনি এখন কল ঢুকেনি একটা বলে চালিয়ে দিচ্ছিস।”
আলভী শাওনের কথা শুনে কিছু না বলে ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
আলভী চলে যেতেই শাওন শিফার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“তোমার কি ভালো লাগছে না এখানে?”
“আমার ভালো লাগছে। কিন্তু….”
“কিন্তু কি? ঠান্ডা লাগছে জান?”
শিফা মিনমিনে গলায় লাজুক ভঙ্গিতে বললো,
“আমি একটু বাথরুমের যেতে চাই।”
“ওকে জানেমান চলো।”
শাওন মুচকি হেসে শিফার হাত ধরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।
______________
ফারাজ বাইরের খাবার খেতে পারেনা বলতে গেলেই। সে খাবেনা বলে তাই তিতলিকেও খেতে দিবেনা। তাই নিজে রান্না করবে। রান্নাবান্নার যাবতীয় সব জিনিসপত্র ম্যানাজার রিংকুর হাতে আনিয়েছে। রিংকুকে যেন টাকা দিয়ে কিনে নিয়েছে ফারাজ। ফারাজ আদেশ করা মাত্রই সব হাজির। রিংকুর হাবভাব দেখলে মনে হবে সে যেন ফারাজকে কতদিন ধরে চিনে। স্যার স্যার বলে শেষ। রিংকু হাতের সব ব্যাগ কিচেনে রেখে এসেছে। তারপর দরজায় এসে বলল,
“আপনি যা, যা বলেছেন সব নিয়ে এসেছি স্যার।”
“গুড।”
“আর কিছু লাগলে সাথেসাথে জানাবেন স্যার।”
“ওকে।”
“রান্নায় কি কোনো হেল্প করা লাগবে স্যার?
“না।”
রিংকু একটু রুমের ভেতরে উঁকিঝুঁকি দিয়ে বলল,
“ম্যাম কি ঘুমাচ্ছে ?”
ফারাজ রিংকুর উঁকিঝুঁকি লক্ষ্য করে গম্ভীর গলায় খানিকটা শক্ত মুখে বলল,
“আউট!”
“জ্বি স্যার।”
রিংকু চলে গেল। মূলত সে তিতলিকে না দেখেই জিজ্ঞেস করেছে কিন্তু স্যার একথা জিজ্ঞেস করায় আউট বললো কেন? স্যার কি রাগ করলো নাকি? সে তো খারাপ কিছু বলেনি। হয়তো এমনি তাকে চলে যেতে বলেছে। রিংকু চলে যেতেই ফারাজ দরজা লাগিয়ে দিবে দিবে ভাব ঠিক তখনি হুড়মুড়িয়ে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল আলভী। পরপরই অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
“তুই দরজায় দাঁড়িয়ে আছিস? এটাও বিশ্বাস করতে হবে?”
“তাহলে তোর মাথার উপর দাঁড়িয়ে থাকতে বলছিস নাকি?”
“আমি তো ভেবেছি এতক্ষণে খাট আধভাঙা হয়ে গেছে।”
গম্ভীর ফারাজ শক্ত গলায় বলল,
“এসব আজাইরা কথা বাদ দিয়ে ভালো কিছু বলার থাকলে বল।”
আলভীও রুমের ভেতরে উকিঝুঁকি দিলো। মনেমনে ভাবছে ভাবিকে দেখছেনা কেন? মনে হয় রুমের ভেতরে বন্দি করে রেখেছে। তাছাড়া আর কি বা করবে। নয়তো ভাবি এতক্ষণে ছাঁদে যাওয়ার জন্য নাচানাচি করতো। আলভী বলল,
“ভাকিকে কি রুমের ভেতরে রশি দিয়ে বেন্দে রেখেছিস নাকি?”
“রেখেছি তোর সমস্যা? “
“হানিমুনে এনেছিস নাকি রুমের ভেতরে বেন্দে রাখতে ? তুই ছাঁদে যাওয়াও লাগবেনা কিন্তু ভাবিকে পাঠা।”
ফারাজ আলভীর মুখের উপর ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দিলো। সে যাবেনা তার বউকে যেতে দিবে? যখন যাবে তখন সাথে নিয়ে যাবে। ফারাজ সোজা রুমে এলো। পুরো বিছানায় হাত পা ছড়িয়ে দিয়ে তিতলি ঘুমিয়ে। পা একজায়গায় শরীর অন্যজায়গায় হাতদুটো মাথার উপর। জামা কাপড়ের ঠিক নেই। নিষ্পাপ মুখ। তুলতুলে নরম ঠোঁট দুটো উল্টে হাঁ হয়ে আছে। ফারাজ তিতলির ঘুম দেখে শব্দহীন হাসল। অদ্ভুত ইচ্ছে জাগল। অনেকখানি ঝুঁকে আসল। তিতলির নরম ঠোঁটে আঙুল দিয়ে সুড়সুড়ি দিলো। দু’ঠোঁটের ফাঁকে ভেতরে আঙুল ঢুকিয়ে দিলো। জিভ দিয়ে আলতো করে নরম অধরজোড়া চুষে দিয়ে ভিজিয়ে দিলো। তারপর উঠে দাঁড়াল। ঘুম ভাঙাল না। মায়া লাগছে। কালও ঘুমাইনি। এখন ঘুমাক। ফারাজ কিচেনে চলে যেতে যেতে বিড়বিড় করে আওড়ায়,
“এই মেয়ের ঘুমানোর স্টাইল কখনো চেঞ্জ হবেনা?”
তিতলি ফ্ল্যাটে উঠার পরপরই ঘুমিয়ে পড়েছিল। গাড়িতে বসে থাকতে থাকতে কোমর ব্যথা তারপর কাল রাত থেকে উত্তেজনায় ঘুম আসছিল না তার। কখন তারা কক্সবাজার যাবে কি করবে না করবে এসব ভাবতে ভাবতেই তো সকাল হয়ে গেছে। সে রাতের ঘুম এখন তিতলিকে ভালোই ঘায়েল করে নিয়েছে।
———
তিতলির ঘুম ভাঙল গুরুর মাংস রান্নার তীব্র ঘ্রানে। সাথে ইলিশ মাছ ভাঁজার ঘ্রানও আসছিল। তিতলির পছন্দের খাবার কে রান্না করছে এখানে? খিদের জ্বালায় পেটে ইদুর দৌড়াচ্ছ। খিদে লাগলে তখন দুনিয়া অশান্তি লাগে। তিতলি শুয়া থেকে উঠে আস্তে ধীরে বিছানা থেকে নামল। সে এতটাই ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল যে রুম গুলোও দেখা হয়নি। তিতলি রুমগুলো পর্যবেক্ষণ করছে ঘুরে ঘুরে। পাঁচতলায় সর্বমোট চারটা রুম। সবগুলো রুম পরিপাটি করে রাখা। সবই রয়েছে চারিপাশে। টিভি স্যাট করা। সোফা হতে সকল আসবাবপত্র সাজানো গুছানো। প্রতিটা রুমে ওয়াশরুম তো আছেই। ডানদিকে রান্নাবান্না করার জন্য কিচেন রয়েছে। তিতলি পা টিপে টিপে কিচেনের দিকে এগিয়ে গেল। দরজায় দাঁড়াল। ফারাজ রান্না করছে। মুখ দেখা যাচ্ছে না। পেছন থেকে দানবীয় পিঠ দেখা যাচ্ছে। কালো প্যান্ট পরা উপরে উদোম। তিতলি দরজায় দাঁড়িয়ে হা করে তাকিয়ে আছে। দৃশ্যটা দেখতে তিতলির ভীষণ ভালো লাগছে। শুধু এ দৃশ্য নয় ফারাজ যখন গাড়িতে বসে ড্রাইভ করে তিতলির দেখতে ভালো লাগে। এমন আরো কিছু সাধারণ বিষয়ও তিতলির কাছে আকর্ষণীয় লাগে। তিতলির এখন ইচ্ছে করলো দৌড়ে গিয়ে ফারাজের পিঠে চড়তে। কিন্তু তা অসম্ভব। এত লম্বা একটা লোকের পিঠে উঠা যেমন তেমন কোনো ব্যপার নয় যদি ওনি নিজ থেকে না নেয়। সে তো কাঁধের নাগালই পাবেনা। কাঁধে না চড়তে পারলেও জড়িয়ে তো ধরা যায়। তিতলি পা টিপে টিপে কিচেনে ঢুকল। ঠিক ফারাজের পেছনটায় এসে দাঁড়াল। তার উপস্থিতি কি টের পাচ্ছেনা? নাকি পেয়েও চুপ করে আছে? তিতলি নিজের নরম তুলতুলে দুহাতের সাহায্য ফারাজকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল।
ফারাজ ঠাঁই দাঁড়িয়ে। সে আগেই টের পেয়েছে তিতলির উপস্থিতি। ঘাড় ঘুরিয়ে এক পলক তিতলির মুখের দিকে তাকাল। ঘুমঘুম মুখ। চুল এলোমেলো। ঠোঁটের কোণে বিশ্বজয়ী হাসি। ফারাজ এই হাসির কারণ ঠিক বুঝতে পারল না। তিতলির হাসিখুশি চেহারা দেখে ফারাজ নরম গলায় বলল,
“ঘুম ভেঙেছে?”
“হুহ!ঘুম না ভাঙলে আপনার কাছে কি করে এসেছি শুনি?”
“তোমার তো আবার ঘুমের ঘোরে হাঁটার স্বভাব আছে।”
“মিথ্যা কথা। আমি কখনো ঘুমের ঘোরে হাঁটিনি।”
ফারাজ এখন এ বিষয়ে কথা বললে অনেক কথায় বলতে পারে। কিন্তু বলতে গেলে দেখা যাবে তিতলির কথা বলা আর থামানো যাবেনা।
তাই সে প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,
“খিদে পেয়েছে?”
তিতলি জবাব দিলো না। খিদে পেয়েছে কিনা এটা আবার জিজ্ঞেস করছে? কখন খেয়েছে সেটাও তো তিতলি ভুলে গেছে। তার চেয়ে বড় কথা সে তো জানেই না যে ফারাজ রান্নাও করতে জানে আজকে প্রথম দেখছে। জিজ্ঞেস ও করে বসল,
“আপনি রান্না করতে পারেন? তাহলে তো আমার আর কোনো চিন্তা থাকলো না, আমি যখন টুনাটুনিদের আম্মু হবো। তখন আপনি রান্না-বান্না করবেন আর আমি আর মেয়ে শুয়ে শুয়ে কার্টুন দেখব। রান্না হয়ে গেলে আমাদের ডাক দিবেন।”
“ভবিষ্যৎ কি করবে না করবে, তা এখন থেকেই ভেবে রেখেছো নাকি?”
তিতলি ফারাজ কি রান্না করছে দেখছে। গরুর মাংস ইলিশ ভাজা রান্না শেষ। সাথে সালাৎ কিসব ঘাসপাতা দেখা যাচ্ছে। দেখা যাবেই তো ওনি তো এসব ঘাসপাতা খায়। তিতলি বিয়ের প্রথম প্রথম ভাবতো গরু নাকি ওনি?এগুলো কি করে খায়? এসব দেখতে দেখতে তিতলি হেসে বলল,
“আমিতো বিয়ের আগে থেকেই ভবিষ্যৎ এ কি করব না করব সব ভেবে রেখেছি।”
“সিরিয়াল দেখে এসব জেনেছো নিশ্চয়ই ?”
তিতলি দেখল এখানে বেশ কয়েকটা আইসক্রিমের বক্স রাখা। নিশ্চয়ই ফারাজ তার জন্য রেখেছে। কারণ সে ঘুমানোর আগে বলছিল আইসক্রিম খাবে। তিতলি আইসক্রিমের বক্স একটা হাতে নিয়ে ফারাজের পাশে চেয়ার টেনে বসল। তারপর পটানোর সুরে বলল,
“না আমি সিরিয়াল দেখিনা। আমি এমনিতেই জানি এসব। তাছাড়া বউয়ের জন্য রান্না-বান্না করা পাপ নয় বুঝলেন? বউকে খুশি করতে পারলে আল্লাহ খুশি হন। আর বউ খুশি থাকলে সংসারে শান্তি হয়। সংসারে শান্তি চাইলে বউকে খুশি করতে করেন।”
ফারাজ ভ্রু নাচিয়ে তিতলির কথার জবাব দিলো একেবারে নিজের ডঙে,
“ওটা নিয়ে ভাবতে হবে না । তোমাকে খুশির চূড়ান্ত লেভেল অবধি ঘুরিয়ে আনার দায়িত্ব আমার।’
তিতলি মনেমনে বললো,
“হে আল্লাহ! আপনি আমার স্বামীর নেক হায়াত দান করুন। যাতে সারাজীবন রান্না করে আমাকে খুশির চূড়ান্ত লেভেলে ঘুরিয়ে আনতে পারে।” “আমিন।”
ফারাজ রান্না শেষে ডাইনিং টেবিলে খাবার বেড়েছে। তিতলি পেট ভরে তৃপ্তি নিয়ে খেলো। ফারাজের হাতের রান্না। পেট ভরে যাওয়ার পরও না খেতে পারলেও খেয়েছে।
★
হালকা শীতশীত ভাব। বাতাস হচ্ছে। তিতলির পরনে পাতলা কাপড়ের শীতের ডেনিম কূর্তি। ফারাজ আগেই জানতো এখানকার আবহাওয়া ঢাকার থেকেও ঠান্ডা থাকবে। শীত শীত অনুভব হবে তাই তিতলির কথা ভেবে নিয়েছিল আগে। এখন তারা লিফট ব্যবহার করে ছাঁদে উঠছে। তিতলি আসতে চাচ্ছিল না। একটা জিনিস নিয়ে ভয়ে আছে সে। ছাঁদে এসে দাঁড়িয়েছে ওরা সবে। তিতলি ফারাজের হাত খামছে ধরে বলল,
“আমার মনে হয় রাত বিরেতে ছাঁদে আসা ঠিক হয়নি। রুমে চলুন তো।”
ফারাজ থমকে দাঁড়িয়ে ভ্রু কু্ঁচকাল। বিদ্বিষ্ট চাহনি গভীরতা পেল। তিতলির গভীর চিন্তিত মুখপানে চেয়ে কিছু বোঝার চেষ্টা করছে যেমন। পরপর গম্ভীর গলায় বলল,
“কেন?”
আলভীর বলা কথাটা তিতলির মস্তিষ্কে জড়াল ভঙ্গিতে লেপ্টে এলো। সে কথা যদি মানুষরূপী রাক্ষসের শিকার হয় ? কিছু হয়ে যায় তখন? ছাঁদে তো অনেক অনেক মানুষ। সে কীভাবে বুঝবে এখানে কে মানুষরূপী রাক্ষস। তিতলি সেটা ভেবেই ফারাজকে ভয়ার্ত গলায় বলল,
“রাতে নাকি মানুষরূপী রাক্ষস ঘুরঘুর করে।”
“হোয়াট?”
“শুধু তাই নয় সে রাক্ষস নাকি আমাদের সাথেই আছে।”
আলভী পাশ থেকে সে কথা শুনে খুক খুক করে কেশে উঠল। মাথা চুলকাল। মেয়েটা আসলেই একটা নাদান শিশু। সে ভেবেছে রাক্ষস কাকে বলেছে সব বুঝতে পেরেছে। কিন্তু কই বুঝলো? এখন যদি ফারাজকে বলে দেয় সে একথা বলছে। তাহলে তো হয়ছে একটা বিপদ। না কিছুতে তিতলিকে সেকথা বলতে দেওয়া যাবেনা। আলভীর আগেভাগেই সাধু সাজার চেষ্টা,
“আসতাগফিরুল্লাহ, নাউজুবিল্লাহ ভাবি এখানে মানুষরূপী রাক্ষস কোথায় থেকে আসবে? এখানে তো আমরা সবাই তরতাজা জ্যন্ত এবং ভালো মানুষ তাইনা।”
তিতলি হতভম্ব হয়ে আলভীর দিকে তাকিয়ে বলল
“আপনিই তো ….”
আলভী তিতলির বলা কথা কেড়ে নিয়ে বলল,
” হ্যাঁ আমি তো ঠিক কথায় বলছি এখানে মানুষরূপী রাক্ষস বলতে কিছু নেই। মনের ভয় এসক। আসো মজার মজার খাবার খেতে চেয়ার টেনে বসে পড়ো।”
ফারাজ নিজের হাতের মুঠোয় তিতলির হাতটা শক্ত করে ধরে একবার আলভীর দিকে তাকিয়ে আবার তিতলির পানে তাকায়। সুদর্শন মুখখানায় সে-কি সন্দিহান ভাব। যেমন কিছু একটা আন্দাজ করছে
“আলভী কিছু বলছে?”
“না।”
আলভী কানখাড়া করে সেকথা কীভাবে যেন শুনে ফেলল,
“আজব? তোর বউ তুই সাথে নিয়ে নিয়ে হাঁটিস আমরা কিছু বলার সুযোগ পেয়েছি?”
তিতলি এখন বুঝতে পারছে আলভী তার মতোই একটা মিথ্যাবাদী। কিন্তু রাক্ষস বলতে কাকে বুঝিয়েছিল? ফারাজকে বলল,
“আচ্ছা বলুন তো মানুষকে রাক্ষস কখন বলে?”
“কালকে রাতে টের পাবে।”
“কিছু বললেন আমি শুনতে পাইনি।”
“না।”
তিতলি ছাঁদের রেলিং এর এক কোণা দেখিয়ে হাতের ইশারায় ফারাজকে দেখাল,
“ওদিকে যায়?”
তিতলি কথাটা বলে উত্তরের অপেক্ষা করে ফারাজের দিকে তাকাল। ফারাজও তাকিয়ে। গম্ভীর মুখাবয়বে হাসিহাসি ভাব। নরম দৃষ্টি। একদম আদুরে। তিতলির বক্ষস্থলে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। এভাবে তাকিয়ে আছে কেন? তিতলির ইচ্ছো করলো…কত কিছুই ইচ্ছে করছে কিন্তু লাজুক তিতলির দ্বারা এসব অসম্ভব কাজ করা সম্ভব হবে কী? তিতলির অদ্ভুত ইচ্ছা জাগার মাঝে ফারাজের গভীর কন্ঠ শোনা গেল,
“চলো।”
দুজন এসে দাঁড়িয়েছে ছাঁদের এক কোণে। এখানটা বড্ড নিরব। তিতলি ছাঁদের কোণে রেলিঙ ঘেঁষে দাঁড়ালো। ফারাজ তার পাশে দাঁড়াচ্ছে না। কেন? তিতলি চাই ফারাজ তার পাশে এসে দাঁড়াক। ফারাজ তিতলির পেছন দাঁড়িয়ে। গা ঘেষে। পেশিবহুল দু’হাত তিতলির দুপাশে দিয়ে রেলিঙে রাখা। তিতলি আঁড়চোখে পেছন তাকাল। ফারাজ হয়তো তিতলির মনের কথা উপলদ্ধি করতে পারল,
“এভাবে ভালো লাগছে না? পাশে দাঁড়াতো হবে?”
তিতলি এখন বোধহয় কিছু একটা উপলদ্ধি করতে পারল,
“এভাবে ভীষণ ভালো লাগছে।”
বাতাসে তিতলির চুল উড়ছিল। বারোতলা ছাঁদ থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সুমদ্র। সুমদ্রে মেঘের আড়াল থেকে চাঁদের ঝলক। আসমানের প্রতিভাব। দেখা মিলছে উপচে পড়া রূপের। পানির বিশাল ঢেউয়ে সাথে অদ্ভুত সৌন্দর্য তৈরি হচ্ছিল। ল্যামপোস্টের আলোয় সব আলোকিত। তিতলি মুগ্ধ হয়ে সব দেখছিল। ছুটে যেতে ইচ্ছে করছে ওখানে। মোহাচ্ছন্ন কন্ঠে আওড়ালো,
“খুব সুন্দর না? আমার তো এখনই ওখানে যেতে ইচ্ছে করছে।”
“তোমার হাসিমুখ দেখে আমারও অনেককিছু ইচ্ছে করছে।”
তিতলির হাসিখুশি মায়াবী মুখখানার পানে তাকিয়ে বিড়বিড় করল ফারাজ। যেমন চাই মেয়েটা সবসময় এভাবে প্রাণ খুলে হাসুক। শুধু তার জন্য। ফারাজের শক্ত হাত তিতলির কোমরে। জামার ভেতর দিয়ে গিয়েছে সেই হাত। মুঠো করে রাখা।
তার কন্ঠ খুবই নরম শোনাল,তার কন্ঠ খুবই নরম শোনাল,বিক্ষুদ্ধ সমুদ্রের ওপর এক পশলা বৃষ্টি,
“দিনে নিয়ে যাবো। এখন আপাতত এখানে দাঁড়িয়ে থেকেই সৌন্দর্য উপলদ্ধি করো হুম ।”
#চলবে।
আজকে রাতে চেষ্টা করব একটা ছোট হলেও বোনাস পর্ব দিতে। সেখানে দিনের বেলা ওরা কক্সবাজারের সুমদ্র চারদিকে ঘুরবে খুনসুটি করবে ওসব দিবো। তারপর ৫৭ পর্বে তিতলির জন্মদিন। স যারা বাসর বাসর করো ৫৭ পর্বে বাসর কনর্ফাম।
Share On:
TAGS: রাগে অনুরাগে, সুহাসিনি ফাতেহা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ৫৩
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ৩৩
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ৭
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ২৮
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ৯
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ৩৯
-
রাগে অনুরাগে গল্পের লিংক
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ২৩
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ৫৫
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ৪৮(প্রথম অংশ+শেষাংশ)