Golpo romantic golpo যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ

যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৫২


#যেখানে_প্রেম_নিষিদ্ধ
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
#পর্ব_৫২
সকালের সোনালী রোদ কেবল মীর বাড়ির বিশাল উঠানে এসে পড়েছে। দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিজের ধবধবে সাদা পাঞ্জাবির হাতা গুটাতে গুটাতে আয়নার সামনে নিজেকে আরেকবার দেখে নিল মীর আরভিদ তেজ। বিয়ের পর এই প্রথম বউকে নিয়ে বাপের বাড়ি অর্থাৎ শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছে সে। তবে ভয়ও কাজ করছে। কারণ আর কিছুই নয় তার শ্বশুরমশাই জনাব আলাউদ্দিন তালুকদার! এলাকার মানুষ তাকে চেনে এক নামে, তবে ভালো কোনো কারণে নয়। তালুকদার সাহেবের পরিচিতি তাঁর বিপুল ধনসম্পদের জন্য যতটা না, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি তাঁর বিশ্বখ্যাত ‘কৃপণতা’ আর অনবদ্য ‘ছ্যাঁচড়ামি’র জন্য! সিঁড়ি দিয়ে খটখট শব্দ করে নিচে নেমে এলো তেজের অর্ধাঙ্গিনী আর্যা। পরনে নতুন লাল টুকটুকে শাড়ি, হাতভর্তি কাঁচের চুড়ি, মুখে লজ্জার হাসি। কিন্তু তেজের দিকে তাকাতেই তার হাসিটা একটু মলিন হয়ে গেল। “তেজ… তুমি সত্যি সত্যি যাবে তো? মানে… আব্বুর ব্যাপারে তো তোমাকে আগেই বলেছি। এখনো সময় আছে, শরীর খারাপের অজুহাত দিয়ে যাত্রা ক্যানসেল করতে পারো!” আর্যা বেশ চিন্তিত গলায় ফিসফিস করে বলল।
তেজ চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে হেসে উঠল, “বলো কী আর্যা! মীর বাড়ির ছেলের এত ভয়? শ্বশুরবাড়ি যাব, খাতির-যত্ন পাব, শাশুড়ির হাতের গরম রাজকীয় খাসির রেজালা খাব আর আমি পিছিয়ে যাব? আলাউদ্দিন তালুকদার সাহেব যতই কিপ্টা হন না কেন, জামাই তো প্রথমবার যাচ্ছে! এটলিস্ট জামাই আদর বলে তো একটা কথা আছে!”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আব্রাজ কফির কাপে শেষ চুমুক দিয়ে হসে উঠল, “তেজ! শুভকামনা রইল। তবে যাওয়ার আগে হেলমেট আর বডি গার্ড সাথে নিয়ে যাস। কারণ আলাউদ্দিন তালুকদার সাহেবের ছ্যাঁচড়ামির যে লেভেল, তাতে খাসির রোজালা দূরে থাক, বাতি নিভিয়ে ঠান্ডা পানি খাওয়ালেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না!”
তেজ আবরাজের কথায় কান দিল না। ধবধবে নতুন প্রাইভেট কারের পেছনের সিটে দামি মিষ্টির ফলমূলের ঝুড়ি তুলে দিয়ে সে আর্যাকে নিয়ে রওনা হলো তালুকদার ভিলার উদ্দেশে।
গাড়ি যখন তালুকদার বাড়ির বিশাল পুরোনো গেটের সামনে গিয়ে থামল, তখন সকাল পৌনে এগারোটা। গেটে কোনো দারোয়ান নেই। কারণ আলাউদ্দিন সাহেবের মতে, দারোয়ান রাখা মানে মাসে মাসে অহেতুক টাকা জলে ফেলা, গেট তো মানুষ হাত দিয়েই খুলতে পারে!’ গাড়ি থামার বিকট শব্দে বাড়ি থেকে দৌড়ে বের হয়ে এলো আর্যার ছোট ভাই, অর্থাৎ তেজের একমাত্র ছোট শালা। বয়স সতেরো-আঠারো হবে। পরনে হাঁটুর ওপর তোলা পুরোনো থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট আর ছেঁড়া গেঞ্জি। ছেলেটা গাড়ি দেখে চেঁচিয়ে উঠল, “ও আম্মা! ও আব্বু! আপা আর বড় দুলাভাই আইসা পড়ছে! জলদি বাতি নেভাও, কারেন্ট বিল উঠতাছে!”
তেজের ড্রাইভার গাড়ির ট্রাঙ্ক থেকে দামি মিষ্টির বড় বড় দুটো কার্টন আর ফলমূলের ঝুড়ি বের করে দরজায় রাখতেই তুহিনের চোখ চকচক করে উঠল। সে দুলাভাইকে সালাম দেওয়া দূরে থাক, সোজা গিয়ে মিষ্টির কার্টনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। “ওরে বাবারে! প্রিমিয়াম সুইটস! দুলাভাই, এইটা কি আমার জন্য আনছেন?” বলতে বলতে তুহিন একটা কার্টন তুলে নিয়ে ভেতরের দিকে দৌড় দিল।
তেজ আর আর্যা ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই দেখা গেল শ্বশুর আলাউদ্দিন তালুকদার সোফায় বসে আছেন। পরনে একখানা শত তালি দেওয়া পুরোনো লুঙ্গি আর ময়লা ফতুয়া। চোখে সস্তার চশমা। তেজের মতো সুপুরুষ, সুপ্রসিদ্ধ মীর পরিবারের জামাইকে দেখেও তাঁর মুখে বিশেষ কোনো ভাবের পরিবর্তন হলো না। তিনি চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে একটা হুংকার দিলেন।
“আরে তেজ বাবাজি যে! এসে গেছ? ভালো ভালো। তা গাড়িটা যে আনলে, এতদূর থেকে আসতে কত টাকার পেট্রোল লাগল বলো তো? গাড়ি না এনে লোকাল বাসে আসলে তো দেশের জ্বালানি সম্পদ বাঁচত, তোমার পকেটের টাকাও বাঁচত!”
তেজ অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। প্রথম সাক্ষাতেই শ্বশুরমশাই পেট্রোল বিলের হিসাব চাইছেন! আর্যা লজ্জায় কপাল চেপে ধরল। এমন সময় পর্দা ঠেলে প্রবেশ করলেন শাশুড়ি মা আমেনা বেগম। দেখতে বেশ স্বাস্থ্যবতী, কিন্তু মুখে এক ফোটা হাসির চিহ্ন নেই। তিনি হাতে একটা ট্রে নিয়ে এলেন।
“নাও জামাই, মুখটা মিষ্টি করো। এত দূর জার্নি করে এসেছ।” শাশুড়ি মা ট্রে-টা তেজের সামনে ধরলেন।
তেজ ভাবল, হয়তো স্পেশাল কোনো ফলের শরবত বা শাহী কোনো পানীয়। কিন্তু কাঁচের গ্লাসের দিকে তাকাতেই তেজের চোখ চড়কগাছ! গ্লাসের পানিটা ঘোলাটে, হালকা নীল বর্ণ ধারণ করে আছে, আর ওপর থেকে বুদ্বুদ উঠছে!
“শাশুড়ি মা… এটা কিসের শরবত?” তেজ একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল।
শাশুড়ি মা অত্যন্ত গর্বের সাথে বললেন, “আরে বাবাজি! বাজারে এখন ট্যাং আর লেবুর যা দাম! তা ভাবলাম ঘরে তো ওরস্যালাইন আর একটু সুজি পড়ে ছিল, সাথে অল্প এক ফোঁটা নীল ফুড কালার মিশিয়ে দিয়েছি! একবারে স্যালাইনের কাজও করবে, শরবতের স্বাদও দেবে! খাও খাও, একদম এনার্জি চলে আসবে!”
তেজ চশমা খুলে চোখ কপালে তুলল। ওডিআরের স্যালাইনের সাথে নীল রঙ মিশিয়ে শরবত?!
আর্যা অমনি চিল চিৎকার দিল, “আম্মা! তুমি ওকে স্যালাইন গুলিয়ে দিচ্ছ?!”
আলাউদ্দিন তালুকদার হাঁ হাঁ করে উঠলেন, “আহা! চিল্লাচ্ছিস কেন আর্যা? শরীর ঠান্ডা রাখতে স্যালাইনের ওপর কিছু আছে নাকি? আর নীল রঙ দেওয়াতে দেখতে কত চমৎকার লাগছে! একদম ফাইভ স্টার হোটেলের ওয়েলকাম ড্রিংকসের মতো! খাও তেজ বাবাজি, এক চুমুকে শেষ করে ফেলো, ফেলার নিয়ম নেই কিন্তু!”

তেজ নিজের কান্না চেপে ধরে কোনোমতে গ্লাসে ঠোঁট ছোঁয়ানোর ভঙ্গি করে গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে রাখল। মনে মনে বলল, ‘আব্রাজ ভাই! তোমার কথাই ঠিক ছিল। এই বাড়িতে একদিন থাকলে আমার কিডনি নষ্ট হওয়া নিশ্চিত!’

দুপুর দুটো বাজতেই তেজ ভাবল, যাই হোক, দুপুরের খাবারে নিশ্চয়ই কিছু ভালো আয়োজন থাকবে। প্রথম জামাই বলে কথা! খাবারের টেবিলে সবাইকে ডাকা হলো। বিশাল টেবিল, কিন্তু আয়োজনের বহর দেখে তেজের মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। টেবিলের মাঝখানে একটা বড় ডিশে সামান্য কিছু ভাত, এক বাটি পাতলা ডাল যা দেখে মনে হচ্ছে এক বালতি পানিতে একটা মসুর ডাল সাঁতার কাটছে, আর এক বাটি তরকারি রাখা। আলাউদ্দিন তালুকদার নিজ হাতে জামাইয়ের পাতে এক চামচ ভাত তুলে দিয়ে বললেন, “নাও তেজ! আজকে তোমার শাশুড়ি নিজের হাতে খাসির মাংস রান্না করেছে! একদম খাঁটি জিনিস!”
তেজের মুখে সামান্য স্বস্তি ফিরে এলো। যাক, অন্তত খাসির মাংস তো আছে! সে বাটির দিকে তাকাল। বাটিতে ঝোল বলতে কিছু কালো লালচে পানি, আর তার ভেতর ভেসে আছে দুটো মাংসের হাড্ডি আর এক প্রকাণ্ড সাইজের আলুর টুকরো! তেজ চামচ দিয়ে একটা হাড্ডি তুলে নিজের পাতে নিল। কিন্তু হাড্ডিটাতে না আছে কোনো মাংস, না আছে কোনো চর্বি! একদম পরিষ্কার, সাদা চাঁচাছোলা হাড্ডি!
“শ্বশুরমশাই… মাংস কই?” তেজ নিরীহ মুখে জিজ্ঞেস করল।
ছোট শালা তুহিন ততক্ষণে নিজের পাতে তিনটে বড় মাংসের টুকরো তুলে নিয়ে চাবাতে চাবাতে বলল, “দুলাভাই! মাংস তো আমি আর আব্বু সকালে বাজার থেকে এনেই অর্ধেক সিদ্ধ করে খেয়ে ফেলছি! আপনার জন্য তো স্পেশাল ‘নলি’ রাখা হয়েছে! হাড্ডির ভেতরের ক্যালসিয়াম চুষে খাবেন, ব্যাপক টেস্ট!”
আলাউদ্দিন তালুকদার চোখ বড় বড় করে তুহিনকে একটা ধমক দিলেন, “আরে ছ্যাঁচড়া! সত্যি কথাটা মুখে বলতে হয়? জামাইকে বুঝতে দিবি তো!”
তারপর তেজের দিকে ফিরে অতি মিষ্টি হেসে বললেন, “বুঝলে তেজ বাবাজি, ডাক্তাররা বলেছে খাসির চর্বিযুক্ত মাংস খেলে নাকি হার্ট অ্যাটাক হয়! আমি কি চাই আমার এত সুন্দর জামাইয়ের হার্টের ক্ষতি হোক? তাই সব মাংস আমরা খেয়ে নিয়েছি, তোমার জন্য একদম খাঁটি, কোলেস্টেরল-মুক্ত নলি রেখেছি! হাড্ডি চোষো, শরীর ভালো থাকবে!”
তেজের ইচ্ছে করছিল নিজের মাথাটা থালাতেই ঠুকে দিতে! কোলেস্টেরল-মুক্ত নলি?! মানে মাংস নিজেরা খেয়ে জামাইকে ফাঁকা হাড্ডি চুষতে দেওয়া হচ্ছে!
আর্যা রাগে লাল হয়ে বলল, “আব্বু! তোমরা জামাইকে এসব খাওয়াচ্ছ? বাড়ি থেকে মিষ্টি এনেছে দুটো বড় বক্স, ওগুলো কই?”
শাশুড়ি মা মুখ বেকিয়ে বললেন, “আরে ওই মিষ্টি তো অনেক দামি! এত দামি মিষ্টি এখন খেলে নষ্ট হয়ে যাবে না? আমি পাশের বাড়ির খালাম্মাকে অর্ধেকের বেশি বেচে দিয়েছি! আর বাকিটা ফ্রিজে তালা মেরে রেখে দিয়েছি, ঈদ আসলে খাওয়া যাবে!”
তেজ এবার সত্যিই বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। জামাইয়ের আনা মিষ্টি পাশের বাড়িতে বেচে দেওয়া হয়েছে?!

দুপুরের কোনোমতে ‘হাড্ডি চোষা’ আর ‘ডাল-পানি’ খাওয়া শেষ করে তেজ নিজের রুমে গিয়ে এসি চালু করার জন্য রিমোট খুঁজছিল। রুমটি বেশ গরম। কিন্তু দেওয়ালে সুইচবোর্ডের দিকে তাকাতেই তেজের চোখ ছানাবড়া! সুইচের ওপর মস্ত বড় বড় অক্ষরে লেখা, ‘অন করা নিষেধ! কারেন্ট বিল আসে!’
আর সিলিং ফ্যানটার দিকে তাকাতেই দেখা গেল, ফ্যানের পাখাগুলো একটা শক্ত দড়ি দিয়ে জানালার সাথে বাঁধা! তেজ ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে রুমে বসে আছে। ঠিক তখন শ্বশুর আলাউদ্দিন তালুকদার হাতে একখানা তালপাতার পাখা নিয়ে রুমে ঢুকলেন।
“কী তেজ বাবাজি? গরম লাগছে?”
“শ্বশুরমশাই, ফ্যানটা দড়ি দিয়ে বাঁধা কেন? আর এসি চালাব কীভাবে?” তেজ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।
আলাউদ্দিন সাহেব সোফায় বসে পাখা দিয়ে নিজেকে বাতাস করতে করতে বললেন, “আরে বাবাজি, এসির বাতাস হলো একদম কৃত্রিম! ওই বাতাসে শরীরের চামড়া কুঁচকে যায়। আর ফ্যান? ইলেকট্রিক ফ্যান ঘুরলে ঘরের মধ্যকার পজিটিভ এনার্জি নষ্ট হয়ে যায়! তাই ওটা বেঁধে রেখেছি। এই যে নাও, তালপাতার পাখা! নিজের হাতে বাতাস করবে, হাতের ব্যায়ামও হবে, আবার পকেটের টাকাও বাঁচবে!”
বলতে বলতে আলাউদ্দিন সাহেব নিজের হাতের পাখাটা তেজের দিকে বাড়িয়ে দিলেন, কিন্তু ছাড়লেন না! “তবে শোনো বাবাজি, এই পাখাটা কিন্তু আমার দাদাশ্বশুরের আমলের স্মৃতি! বেশি জোরে নাড়াবে না, পাখা ফেটে গেলে কিন্তু পঁচাত্তর টাকা জরিমানা দিতে হবে!”
তেজের মনে হলো সে শ্বশুরবাড়িতে আসেনি, কোনো চরমপন্থী টর্চার সেলে এসে আটকা পড়েছে! সন্ধ্যা নামতেই ঘটল আরেক চরম কাণ্ড। তেজ বাথরুমে ঢুকে গোসল করার জন্য সাবান খুঁজছিল। সাবানদানিতে রাখা আছে একটা এতটুকু ছোট নীল রঙের কাপড় কাচা সাবানের টুকরো, যা আঙুলের ডগায় ধরে রাখাই কঠিন! তেজ শার্ট খুলে বাথরুমের দরজায় দিয়ে বাইরে মুখ বাড়িয়ে হাঁকল, “তুহিন! শ্যাম্পু বা নতুন সাবান হবে?”
শালা তুহিন দৌড়ে এসে পকেট থেকে একটা ছোট্ট প্লাস্টিকের বোতল বের করে দিল। “এই নিন দুলাভাই! আম্মার স্পেশাল শ্যাম্পু!”
তেজ বোতলটা হাতে নিয়ে দেখল, ভেতরে সবুজ রঙের কী যেন তরল। “এটা কিসের শ্যাম্পু?”
তুহিন ফিসফিস করে বলল, “দুলাভাই, সত্যি কথা বলি? বাজারে শ্যাম্পুর দাম অনেক। তাই আম্মা থালাবাসন ধোয়ার ভিম লিকুইডের সাথে একটু নারিকেল তেল মিশিয়ে এই শ্যাম্পু বানাইছে! একদম ফেনায় ফেনা হয়ে যাবে, মাথা চকচক করবে!”
তেজ বাথরুমের দরজা বন্ধ করে তোয়ালে দিয়ে মুখ ঢেকে কান্না করার অভিনয় করতে লাগল। ‘হে মীর পরিবার! তোমরা কোথায়? আমাকে বাঁচাও!’

পরদিন বিকেল ঠিক চারটে। মীর বাড়ির ড্রয়িংরুম যেন কোনো রাজকীয় অনুষ্ঠানের জন্য সেজে উঠেছে।
বুড়ো দাদাজানের নির্দেশে গতকালের সেই ব্যারিষ্টার পাত্রী আর তার পরিবারকে আজ সরাসরি বাড়িতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। পাত্রীর বাবা একজন অবসরপ্রাপ্ত জাজ, আর মা নামকরা সমাজসেবিকা। পাত্রী নিজে রক্তবর্ণের একখানা দামি জামদানি শাড়ি পরে সোফায় একদম পুতুলের মতো সোজা হয়ে বসে আছে। ড্রয়িংরুমে এলাহী কারবার! টেবিলের ওপর রকমারি পিঠা, ফল, কাচ্চি বিরিয়ানি আর ফিরিনির বাটি সাজানো। বড় কর্তা আফজাল শাহরিয়ার আর মেজো কর্তা আয়মান হোসেন পাত্রীর বাবার সাথে গম্ভীর রাজনৈতিক আলোচনায় ব্যস্ত। নাজিরা ওয়ালেদ আর সাইরা শেখ পাত্রীর মায়ের সাথে বিয়ের সাজগোজ নিয়ে কথা বলছেন। ঠিক সেই সময় সাঁঝ ট্রে হাতে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করল। তার পরনে হালকা গোলাপি রঙের একটা থ্রি-পিস, চুলগুলো পিঠের ওপর সুন্দর করে মেলানো। তবে তার মুখটা বেশ থমথমে। সে ট্রে থেকে চায়ের কাপগুলো একে একে সবার সামনে রাখছে। আরযান তখন দোতলার সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছে। পরনে তার হালকা ছাই রঙের শার্ট আর কালো ট্রাউজার। তাকে দেখে পাত্রীর মা সোজা হয়ে বসলেন, “আহা! ছেলে তো ছবির চেয়েও বাস্তবে অনেক বেশি গম্ভীর আর সুপুরুষ!”
ঘটক জসিম এক পাশে দাঁড়িয়ে গর্বে বুক ফুলিয়ে বলল, “আমি তো আগেই বলেছিলাম আম্মা! মীর বাড়ির বড় ছেলের মতো পাত্র পুরো ঢাকা শহরে দ্বিতীয়টি পাবেন না!”
আরযান এসে অত্যন্ত সৌজন্যতার সাথে সবাইকে সালাম দিল এবং বুড়ো দাদাজানের পাশের এক একক সোফায় গিয়ে বসল। পাত্রী লজ্জা মেখে আরযানের দিকে এক নজর তাকাল। আরযানও অত্যন্ত শীতল চোখে একবার পাত্রীর দিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিল। ঠিক তখনই ঘটে গেল সেই অবিশ্বাস্য ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি! ড্রয়িংরুমের বাইরের বারান্দা থেকে বিকট শব্দে ডানার ঝাপটানি শোনা গেল। আর পর মুহূর্তেই ঘরের উন্মুক্ত জানালা দিয়ে ঝড়ের বেগে ভেতরে ঢুকল আমাদের পরম প্রিয় ‘চিকু’ এবং তার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী ‘চিকা’! চিকুর পায়ে বাঁধা ছিল আবরাজের সেই লাল রঙের টিস্যু-ফিতা, আর চিকার মাথায় সেই পুঁচকে হিজাব! সবাই কিছু বুঝে ওঠার আগেই, চিকু সোজা গিয়ে নামল পাত্রীর বাবার মাথা কামড়ানো দামি স্যুটের কাঁধের ওপর! আর চিকা পাখিটা সোজা গিয়ে ডাইভ দিল টেবিলের ওপর রাখা সেই গরম কফির কাপে! কফির গরম তরল ছিটকে গিয়ে সোজা লাগল পাত্রীর বাবার ধবধবে সাদা শার্টের ওপর!
“ওরে বাবারে! এটা কী পাখি?!” পাত্রীর বাবা চিৎকার দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন।
পাত্রী ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে সোফা থেকে লাফিয়ে উঠল, “পাপা! বার্ড! এ্যাটাক!”
কিন্তু আসল ধামাকা এখনো বাকি ছিল! চিকু পাত্রীর বাবার কাঁধে বসে নিজের ডানা দুটো কায়দা করে ছড়িয়ে, ঠোঁট ফাঁক করে পুরো ড্রয়িংরুম কাঁপিয়ে চিৎকার করতে শুরু করল, “আরযানের বউ সাঁঝ! আরযানের বউ সাঁঝ! চিকা পালা! চিকা পালা! আরযান হিটলার! সাঁঝ বউ!”
চিকুর সেই স্পষ্ট আর বিকট চিৎকার ড্রয়িংরুমের রাজকীয় নিস্তব্ধতাকে চুরমার করে দিল! “আরযানের বউ সাঁঝ! আরযানের বউ সাঁঝ!” চিকু ডানা ঝাপটে আবার চেঁচাল!
পুরো ড্রয়িংরুমে যেন এক মুহূর্তের জন্য সময় থমকে গেল! পাত্রীর বাবা শার্টের কফি মুছতে মুছতে হা হয়ে গেলেন। পাত্রীর মা চোখ গোল গোল করে বুড়ো দাদাজানের দিকে তাকালেন। ঘটক জসিমের মুখের রঙের সমস্ত লাল-নীল উবে গিয়ে এক লহমায় সাদা হয়ে গেল! আব্রাজ সোফার পেছনে মুখ লুকিয়ে হাসতে হাসতে মাটিতে বসে পড়ল। তাজ আর তেজ নিজেদের কাশি সামলাতে না পেরে বাইরে চলে গেল।
নাজিরা ওয়ালেদ আর সাইরা শেখ স্তম্ভিত হয়ে সাঁঝের দিকে তাকালেন। সাঁঝের হাতের চায়ের খালি ট্রে-টা হাত থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো! সে লজ্জায়, ভয়ে আর আতঙ্কে মুখ লাল করে ওড়না দিয়ে নিজেকে ঢাকার চেষ্টা করল। বুড়ো দাদাজান হাতের লাঠিটা শক্ত করে ধরে জহিরুল ইসলামের মতো চোখ দুটো ছোট ছোট করে আরযানের দিকে তাকালেন, “এসব কী শুনছি আমি জসিম?! পাখি এসব কী বলছে?!”
ঘটক জসিম হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “আমি… আমি কিছু জানি না দাদাজান! পাখি তো পাগল হয়ে গেছে!” ঠিক সেই মুহূর্তে, আরযান অত্যন্ত ধীরস্থিরে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। সে নিজের শার্টের হাতা দুটো সামান্য ঠিক করে নিল। তারপর এক পা এক পা করে হেঁটে গিয়ে সাঁঝের একদম পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
সবাই নিঃশ্বাস আটকে আরযানের দিকে তাকিয়ে আছে। আরযান সবার সামনে, কোনো প্রকার দ্বিধা বা ভয় ছাড়া, সাঁঝের কাঁপতে থাকা হাতটা নিজের শক্ত, চওড়া হাতের মুঠোয় পুরে নিল। তারপর বুড়ো দাদাজান এবং পাত্রীপক্ষের দিকে তাকিয়ে, তার সেই বিখ্যাত, জয়ী আর শীতল মুচকি হাসিটা ঝুলিয়ে শান্ত কিন্তু সুদৃঢ় গলায় বলল, “আমার জন্য মেয়ে দেখা লাগবে না দাদাজান। মনে যাকে ধরবে আমার সে যে কেউ হোক না কেন আমার বউ তাকে করেই ছাড়ব। দুঃখ কষ্ট দেওয়ার জন্য। আমি উঠলাম।”

রাত তখন আটটা। পুরো বাড়ি হঠাৎ অন্ধকার হয়ে গেল। লোডশেডিং! তেজ অন্ধকারের মধ্যে মোমবাতি খোঁজার চেষ্টা করছিল। ঠিক তখনই ঘরের এক কোণা থেকে ফুসফুস শব্দ আর খসখস আওয়াজ ভেসে এলো! তুহিন একটা পেন্সিল টর্চ নিয়ে দৌড়ে রুমে ঢুকল, “দুলাভাই! সাবধান! নড়বেন না!”
“কী হয়েছে তুহিন?” তেজ ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করল।
“আরে কিছু না! আমাদের ঘরের খাটের নিচে দুটো গোখরো সাপের বাচ্চা থাকে তো! কারেন্ট গেলে ওরা একটু বাইরে ঘুরতে বের হয়! আপনি সোফার ওপর পা তুলে বসুন, গায়ে কামড় দিলে কিন্তু বিশ হাজার টাকার অ্যান্টিভেনম ইনজেকশন দেওয়া লাগবে! আব্বু কিন্তু ইনজেকশনের টাকা দেবে না, আপনাকেই দিতে হবে!”
তেজ লাফ দিয়ে সোফার ওপর উঠে দু’হাত বুকে জড়িয়ে বসল।
“তোমরা বিষাক্ত সাপের বাচ্চা ঘরে পুষে রেখেছ?!” তেজ চিৎকার করে উঠল।
আলাউদ্দিন তালুকদার অন্ধকারের ভেতর দিয়ে হেঁটে এসে বললেন, “আহা তেজ! চিল্লাচ্ছ কেন? সাপের বাচ্চা থাকলে ঘরে ইঁদুর আসে না! এক খরচে দুই কাজ! কত টাকা বাঁচে বলো তো?”

মেঘের বুক চিরে বোয়িং ৭৭৭ বিমানটি মসৃণ গতিতে এগিয়ে চলেছে। বাইরের আকাশটা গাঢ় নীল, আর বিমানের ভেতরে যাত্রীরা যার যার মতো ঘুমে বিভোর কিংবা চলচ্চিত্রে মগ্ন। ক্যাবিনের সুসজ্জিত করিডোর দিয়ে ট্রলি ঠেলে হেঁটে আসছে মীর পরিবারের বউ ভয়ে থাকা বউ সিয়া। লাল-কালো এয়ারলাইন্সের সুনির্দিষ্ট এয়ারহোস্টেসের ইউনিফর্মে তাকে দেখতে রূপকথার পরীর মতোই লাগছে। কিন্তু তার মুখের অভিব্যক্তিতে সৌন্দর্যের চেয়ে ভয়ের ছাপটাই বেশি স্পষ্ট! কারণ আর কিছুই নয় আজকের এই ফ্লাইটের চিফ ক্যাপ্টেন আর কেউ নয়, স্বয়ং তার স্বামী তার!
বিয়ের পর এতগুলো দিন কেটে গেছে, কিন্তু তাজের ভয়ে সিয়া এখনো কেঁপে অস্থির! তাজ ছেলেটা গম্ভীর, সুপুরুষ আর অতিরিক্তমাত্রায় পারফেক্টশনিস্ট। বিয়ের পর বাসর তো দূরের কথা, তাজ সিয়াকে কাছে দেখলেই চশমার ওপাশ থেকে এমন গম্ভীর চোখে তাকায় যে সিয়ার মনে হয় ককপিটে কোনো ভুল বোতাম চেপে সে বোধহয় বিমান ক্র্যাশ করিয়ে দিতে চলেছে! তাজ খালি ভয়ই দেখিয়েছে। “সিয়া, চায়ের কাপটা ডান দিকে রাখো,” “সিয়া, ইউনিফর্মের বোতামটা ঢিলে কেন?” এসব কড়া শাসনে সিয়ার বাসর রাতের স্বপ্ন আকাশে উড়ে গেছে!
এমন সময় আরেকজন এয়ারহোস্টেস রূপা দৌড়ে এলো, “সিয়া! ককপিট থেকে ক্যাপ্টেন তাজ স্যার ডেকেছেন! ইমার্জেন্সি প্যাসেঞ্জার লিস্টের সিগনেচার লাগবে।”
সিয়া শিউরে উঠল, “আ-আমি যাব? তুই যা না রূপা!”
রূপা চোখ বাঁকাল, “পাগল নাকি? তোর বর ককপিটে বসে এমনভাবে তাকায় যেন আমি বিনা টিকেটে প্লেনে উঠছি! তুই-ই যা।”
সিয়া কাঁপা হাতে ফাইলটা বুকে জড়িয়ে ককপিটের দিকে পা বাড়াল। মনে মনে বলতে লাগল, ‘হে আল্লাহ! আজ যেন কোনো ফায়ার অ্যালার্ম না বাজে আর তাজের রাগ যেন আমার ওপর না পড়ে!’
ককপিটের ভারী সিকিউরিটি দরজার কোড চেপে সিয়া ভেতরে ঢুকল। ভেতরে আধুনিক সব সুইচে ঝলমল করছে ড্যাশবোর্ড। চিফ ক্যাপ্টেনের সিটে রোদচশমা কপালে তুলে খুব গম্ভীর মুখে বসে আছে তাজ। তার পাশে কো-পাইলট হিসেবে আছে তরুণ ক্যাপ্টেন ফারহান। তাজ সিয়ার পায়ের শব্দ পেয়েও ঘাড় ফেরাল না। তার চোখ সামনের বিশাল ককপিটের গ্লাসের বাইরে মেঘের দিকে।
“ক্যাপ্টেন স্যার… এই যে ইমার্জেন্সি ফাইল।” সিয়া ভীতু গলায় ফাইলটা বাড়িয়ে দিল। তাজ ধীরেসুস্থে ঘুরে তাকাল। তার নেভি ব্লু পাইলট ইউনিফর্ম, কাঁধে চারটে গোল্ডেন স্ট্রাইপ আর চোখে সেই চেনা, মোহিত করা ধারালো দৃষ্টি। সিয়া ভয়ে এক পা পিছিয়ে গেল।
“সিয়া।” তাজের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ককপিটে প্রতিধ্বনি তৈরি করল, “ফাইল জমা দেওয়ার নিয়ম কী? তিন ইঞ্চি দূর থেকে দিতে হয়, না একদম কানের কাছে এসে বলতে হয়?”
সিয়া ঢোক গিলে বলল, “স-সরি ক্যাপ্টেন স্যার! মানে… তাজ ভাইয়া… আই মিন…”
তাজ চোখ ছোট ছোট করে তাকাল, “তাজ ভাইয়া? বিয়ের পর আমি কি তোমার আপন ভাই হয়ে গেলাম, সিয়া? নাকি প্লেনের ভেতর নতুন কোনো রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস চালু করেছো?”
কো-পাইলট ফারহান মুখ চেপে হাসি সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। সিয়া লজ্জায় ও ভয়ে লাল হয়ে বলল, “না মানে… তাজ… আপনি ফাইলটায় সাইন করে দেন, যাত্রীরা নাস্তার জন্য অপেক্ষা করছে।”
তাজ কলমটা হাতে নিয়ে ফাইলটায় সাইন করল, কিন্তু ফাইলটা সিয়ার হাতে ফেরত দিল না। সে সিয়ার থরথর করে কাঁপা আঙুলগুলোর দিকে তাকাল। তাজের ঠোঁটের কোণে হঠাৎ এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। তিন হাজার ফুট উঁচুতে এই মেঘের রাজ্যেই যদি বিয়ের অসম্পূর্ণ হিসাব চুকানো যায়, তবে মন্দ কী?
তাজ হঠাৎ পাশ ফিরে কো-পাইলট ফারহানের দিকে তাকাল।
“ফারহান,” তাজের কণ্ঠ একদম প্রফেশনাল।
“ইয়েস, ক্যাপ্টেন?”
“প্লেন এখন অটো-পাইলটে আছে। আবহাওয়া একদম পরিষ্কার। আগামী আধঘণ্টা তোমার ককপিটে কোনো কাজ নেই।”
ফারহান অবাক, “মানে স্যার? আমি কোথায় যাব?”
তাজ পকেট থেকে নিজের স্পেশাল গোল্ডেন ক্রেডিট কার্ডটা বের করে ফারহানের দিকে ছুঁড়ে দিল, “ফার্স্ট ক্লাসের খালি সিটে গিয়ে রেস্ট নাও। আর বিজনেস ক্লাসের স্পেশাল কোল্ড কফি অর্ডার করে খাও। আমার কার্ড থেকে বিল কাটা হবে। কিন্তু শর্ত একটা আগামী আধঘণ্টা এই ককপিটের দরজার ধারেকাছেও আসবে না!”
ফারহান চট করে ক্রেডিট কার্ডটা ধরে নিল। তার মুখে বিশ্বজয়ের হাসি! সে সিয়া আর তাজের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় এক মুচকি হাসি দিয়ে বলল, “আন্ডারস্টুড, স্যার! থ্যাঙ্ক ইউ স্যার! আমি পুরো এক ঘণ্টাও বাইরে থাকতে পারি!”
সিয়ার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল! “ফারহান স্যার! আপনি যাচ্ছেন কোথায়?! প্লেন কে চালাবে?!”
ফারহান সিয়াকে এক প্রকার এড়িয়ে গিয়ে তড়িঘড়ি করে ককপিট থেকে বের হয়ে দরজায় ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ আর রেড সিগন্যাল অন করে লক করে দিল! ককপিটের ভারী দরজা বন্ধ হওয়ার বিকট শব্দে সিয়ার বুকের ভেতর তুফান উঠে গেল! এখন এই বিশাল বিমানের ককপিটে কেবল দুজন মানুষ স্বয়ং স্বয়ংসম্পূর্ণ ‘হিটলার’ ক্যাপ্টেন তাজ, আর তার ভয়ে আধমরা হয়ে যাওয়া বিমানবালা বউ সিয়া!
তাজ ধীরেসুস্থে নিজের ক্যাপ্টেনের সিট থেকে উঠে দাঁড়াল। তার বিশাল চওড়া শরীরটা সিয়ার পুঁচকে চেহারার ওপর এক প্রকাণ্ড ছায়া ফেলল। সিয়া দুই পা পিছিয়ে ককপিটের বন্ধ দরজার সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দিল। “তাজ… আপনি… আপনি সিট ছেড়ে উঠছেন কেন? প্লেন পড়ে যাবে তো!”
তাজ এক পা এক পা করে এগিয়ে এলো।
“প্লেন অটো-পাইলটে আছে, ম্যাডাম সিয়া। কিন্তু আমার জীবনের পাইলট যে এতদিন ধরে ভয় পেয়ে দূরে দূরে পালিয়ে বেড়াচ্ছে, তার কী হবে?”
“ম-আমি কোথায় পালালাম?” সিয়া হাত দুটো বুকের সামনে আড়কোলে রেখে বলল, “আপনিই তো খালি ভয় দেখান! বিয়ের পরদিন আপনি আমাকে বললেন, ‘সিয়া, ফ্লাইটের রুলস জানো না?’ বাসর রাতে আপনি আমাকে এয়ারলাইন্সের নিয়ম শেখাতে চেয়েছিলে!”
তাজ সিয়ার একদম কাছে চলে এলো। নিজের দুটো শক্ত হাত সিয়ার মাথার দু’পাশে দরজায় রেখে তাকে পুরোপুরি নিজের দেহের খাঁচায় আটকে ফেলল। তাজ নিচু স্বরে, সিয়ার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, “আমি ভয় দেখাচ্ছিলাম না, বোকা মেয়ে! তুমি ভয়ে এমন গোল গোল চোখ করে তাকাচ্ছিলে যে আমার তোমাকে একটু খ্যাপাতে খুব ভালো লাগছিল। কিন্তু তুমি তো সেটাকে সত্যি ধরে নিয়ে বাসর রাতটাই ক্যানসেল করে দিলে!”
“তাই বলে প্লেনের ককপিটে?!” সিয়া চিল চিৎকার দিতে চাইল, কিন্তু তাজের তপ্ত নিঃশ্বাস তার গালে লাগতেই তার গলা দিয়ে শব্দ বের হলো না।
“হ্যাঁ! মেঘের ওপর ককপিটেই হবে আমাদের বাসর!” তাজ কড়া গলায় বলল, “আজ আর কোনো অজুহাত চলবে না। নিচে থাকলে তো বুড়ো দাদাজানের ঘটক মিশন, আব্রাজের ফালতু কথা আর চিকা পাখির চেঁচামেচি থাকত! এখানে আকাশ ছাড়া আর কেউ নেই।”
সিয়া কাঁপতে কাঁপতে বলল, “কন্ট্রোল রুম থেকে যদি রেডিওতে কল আসে?!”
তাজ হাত বাড়িয়ে রেডিওর স্পিকারের ভলিউম একদম জিরো করে দিল! “নিন ম্যাডাম, আপনার রেডিও কলও বন্ধ!”
সিয়া চোখ বড় বড় করে বলল, “যদি প্যাসেঞ্জাররা চ্যাঁচায়?!”
তাজ ঝুঁকে এসে সিয়ার ভেজা, গোলাপি ঠোঁটের ঠিক এক ইঞ্চি দূরত্বে থামল। সে হালকা হেসে বলল, “প্যাসেঞ্জাররা এখন কফি খাচ্ছে। আর তাদের ক্যাপ্টেন এখন নিজের বউয়ের সাথে হিসাব মেটাতে ব্যস্ত!”
সিয়া মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল, “তাজ… প্লিজ! আমি চাকরি ছেড়ে দেব!”
“চাকরি ছাড়ার দরকার নেই,” তাজ এক ঝটকায় সিয়ার কোমর ধরে তাকে টেনে নিজের বুকে জড়িয়ে নিল! সিয়ার পিঠ গিয়ে লাগল তাজের চওড়া বুকে। সিয়ার শ্বাসের গতি এখন বিমানে থাকা টারবাইন ইঞ্জিনের চেয়েও দ্রুত চলছে! তাজ সিয়ার থুতনি ধরে নিজের দিকে ফেরাল। তারপর গভীর, মাদকতাময় চোখে তাকিয়ে বলল, “বিয়ের পর অনেক ভয় দেখিয়েছি, তাই না? আজ আর ভয় দেখাব না, সিয়া। আজ শুধু ভালোবাসা দেব।”
সিয়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাজ তার ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে গভীর আর মাতাল করা চুমু এঁকে দিল! সিয়ার পুরো শরীর যেন নীল আকাশের মেঘের মতো হালকা হয়ে ভেসে যেতে লাগল। এতদিন তাজের প্রতি তার মনে যে ভয়ের পাহাড়টা জমে ছিল, তাজের এই এক চরম ভালোবাসার স্পর্শে সেই বরফ গলে পানি হয়ে গেল! সিয়া অজান্তেই তাজের শার্টের কলার শক্ত করে চেপে ধরল। ককপিটের ড্যাশবোর্ডের হাজারটা বাতির আলো আর বাইরের নীল মেঘের মাঝে তাজ আর সিয়া একে অপরের মাঝে হারিয়ে গেল। তিন হাজার ফুট উঁচুতে ভেসে থাকা বিমানে সম্পন্ন হতে চলল তাদের বাসর রাত!
ঠিক আধঘণ্টা পর… ককপিটের সিকিউরিটি বেল বাজতে শুরু করল। ফারহান বাইরে থেকে সংকেত দিচ্ছে। তাজ ধীরেসুস্থে সিয়াকে নিজের বাঁধন থেকে আলগা করল। সিয়ার চুলগুলো সামান্য এলোমেলো, গাল দুটো রাগে-লজ্জায় টকটকে লাল আপেলের মতো হয়ে আছে! সে ইউনিফর্ম ঠিক করতে করতে তাজের বুকে একটা কিল মারল। ” আপনি এক নম্বরের বদমাইশ! আমি আর কোনোদিন আপনার সাথে একই ফ্লাইটে ডিউটি করব না!”
তাজ চশমাটা চোখে লাগিয়ে অত্যন্ত হ্যান্ডসাম একটা হাসি দিয়ে বলল, “হোয়াই ম্যাডাম? আজকের ফ্লাইটটা কি আপনার জীবনের সবচেয়ে ‘স্মুথ ল্যান্ডিং’ ছিল না?”
সিয়া লজ্জায় মুখ ঢেকে ককপিটের এক কোণায় গিয়ে দাঁড়াল। তাজ দরজা লক খুলে দিতেই ফারহান হাতে কফির কাপ নিয়ে ভেতরে ঢুকল। ফারহানের চোখেমুখে হাসি।
“ক্যাপ্টেন স্যার! ফ্লাইট একদম স্ট্যাবল আছে তো? নাকি ককপিটে কোনো ভয়াবহ টার্বুলেন্স বা ঝড় হয়েছিল?” ফারহান ফিসফিস করে শুধাল।
তাজ খুব গম্ভীর মুখে কো-পাইলটের সিটে গিয়ে বসল। তারপর সিয়ার দিকে এক নজর তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, “টার্বুলেন্স হয়েছিল ফারহান, তবে সেটা মেঘের নয়… সেটা ছিল হৃদয়ের! আর আমরা সাকসেসফুলি ল্যান্ড করেছি!”
সিয়া আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে ট্রে হাতে নিয়ে ককপিটের বাইরে দৌড়ে পালাল! বাইরে এসে সে দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে বুক ভরে শ্বাস নিল। তার ঠোঁটের কোণে এখন ভয়ের বদলে ফুটে উঠেছে এক অনাবিল হাসি।
চলবে? See less

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply