#যেখানে_প্রেম_নিষিদ্ধ
#পার্ট_৪৮
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে গুটিয়ে নিচ্ছে নিজেকে। পাহাড়ের গা বেয়ে নামা কুয়াশা যেন চারপাশকে আরও নিঃশব্দ করে তুলেছে। রিসোর্টের সামনে কালো রঙের গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে অনেকক্ষণ ধরে। ড্রাইভার বারবার ঘড়ি দেখছে। মনে হচ্ছে, আর একটু দেরি হলেই সে নিজেই এসে দরজায় কড়া নাড়বে। প্রত্যাশা বারান্দার রেলিংয়ে হাত রেখে দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে কোনো বিস্ময় নেই, কোনো আনন্দও নেই। এত সুন্দর দৃশ্যও মানুষের মন ভালো করতে পারে না যদি মনটাই ভালো না থাকে। পেছন থেকে প্রাণ শান্ত গলায় বলল,
“চলো?”
প্রত্যাশা তাকাল না। “আমি কোথাও যাচ্ছি না।”
প্রাণ একটু হেসে বলল, “এখানে সারাজীবন থাকার ইচ্ছে আছে নাকি?”
“থাকলেও আপনার কী?” কথাটা খুব স্বাভাবিক গলায় বলা। প্রাণ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। সে যেন এই নীরবতায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে। গত কয়েকদিনে প্রত্যাশা যতবার কথা বলেছে, প্রায় প্রতিবারই তার কথায় কাঁটার মতো খোঁচা ছিল। “ঢাকায় ফিরতে হবে।”
“আপনি যান।”
“তুমি?”
“আমি কোথায় থাকব, সেটা আমি ঠিক করব।”
প্রাণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “প্রত্যাশা, প্রতিটা কথায় যুদ্ধ করার দরকার নেই।”
“যুদ্ধটা আমি শুরু করিনি।”
প্রাণ ধীরে ধীরে বারান্দার রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়াল। “ঠিক বলেছ। শুরুটা আমি করেছি।”
প্রত্যাশা এবার তাকাল। প্রাণের মুখে কোনো অজুহাত নেই। কোনো ব্যাখ্যাও নেই। “আমি জানি, তুমি আমাকে ক্ষমা করনি।”
“কখনো করবও না।”
“হতে পারে।”
“হতে পারে না। নিশ্চিত।”
প্রাণ মাথা নাড়ল। “ঠিক আছে।” শুধু দুটি শব্দ। এরপর আর কিছু বলল না। প্রত্যাশা যেন আরও বিরক্ত হয়ে উঠল। “এত সহজে ‘ঠিক আছে’ বললেন?”
“তাহলে কী বলব?”
“নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করবেন। বলবেন, সব আমার ভালোর জন্য করেছেন। সিনেমার নায়কদের মতো দু-চারটা সংলাপ বলবেন।”
প্রাণ হালকা হেসে ফেলল। “বাস্তব জীবন সিনেমা না।”
“কিন্তু আপনি তো পরিচালক। নাটক সাজাতে খুব ভালো পারেন।” কথাটা শুনে প্রাণের হাসিটা মিলিয়ে গেল।
অনেকক্ষণ নীরব থাকার পর সে নিচু গলায় বলল, “হয়তো পারি।” আরও কিছুক্ষণ চুপ। তারপর খুব ধীরে বলল, “আচ্ছা… বাদ দাও।”
প্রত্যাশা অবাক হলো। প্রাণ সোজা হয়ে দাঁড়াল।
“ঢাকায় ফিরতে হবে।” কথাটা এমনভাবে বলল, যেন আর কোনো তর্ক করতে চায় না। সে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। প্রত্যাশা কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। মানুষটা এত সহজে হার মানল? নাকি আবার কোনো নতুন খেলা? সে উত্তর পেল না।
শেষ পর্যন্ত ধীর পায়ে গাড়িতে উঠে বসল। গাড়ি পাহাড়ি রাস্তা ছেড়ে মূল সড়কে উঠতেই সন্ধ্যা আরও ঘন হয়ে এল। ড্রাইভার ছাড়া আর কেউ কথা বলছে না। প্রাণ জানালার বাইরে তাকিয়ে। প্রত্যাশাও। দুজন পাশাপাশি বসে থেকেও যেন দুটো ভিন্ন পৃথিবীতে। ঠিক তখনই প্রত্যাশার ফোনটা কেঁপে উঠল। অচেনা নম্বর। এক মুহূর্ত ইতস্তত করে সে কল রিসিভ করল।
“হ্যালো?”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড কোনো শব্দ নেই। তারপর কর্কশ একটা পুরুষকণ্ঠ। “প্রত্যাশা?”
“জি… কে বলছেন?”
“প্রশ্ন কম করো।” প্রত্যাশার বুকের ভেতর কেমন যেন ধক করে উঠল।
লোকটা আবার বলল, “তোমার মা আমাদের কাছে আছে।” তার হাত কেঁপে উঠল।
“কী… কী বলছেন আপনি?”
ওপাশে হালকা একটা হাসি। “বিশ্বাস হচ্ছে না?”
তারপর খুব ক্ষীণ একটা নারীকণ্ঠ ভেসে এলো, “মা… আমাকে বাঁচা…” শব্দটা শেষ হওয়ার আগেই যেন কারো হাত মুখ চেপে ধরল। প্রত্যাশার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। “মা!” সে প্রায় চিৎকার করে উঠল। ওপাশ থেকে শান্ত গলায় লোকটা বলল,
“চিৎকার করবে না।”
“আপনারা কারা? আমার মাকে কেন….?”
“কারণ আছে।”
“প্লিজ… আমার মাকে কিছু করবেন না।”
“করব কি করব না, সেটা তোমার ওপর নির্ভর করছে।”
প্রত্যাশার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল। “কী করতে হবে?”
লোকটা একটি ঠিকানা বলল। “আজ রাত। একা আসবে।”
“আমি… আমি পুলিশে…..”
“পুলিশে গেলে লাশ পাবে।” কথাটা এমন ঠান্ডা স্বরে বলা হলো যে প্রত্যাশার বুকের ভেতরটা জমে গেল।”
প্রত্যাশা বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল।
“একজন মানুষও যদি তোমার সঙ্গে থাকে, তাহলে তোমার মায়ের শেষ রাত হবে আজ।” কল কেটে গেল।
ফোনটা ধীরে ধীরে তার হাত থেকে নিচে নেমে এল।
মুখের সব রং উধাও। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। পাশ থেকে প্রাণ তাকিয়ে বলল,
“কী হয়েছে?”
প্রত্যাশা কোনো উত্তর দিল না। সে মরিয়া হয়ে আবার মায়ের নম্বরে কল করল। ফোন বন্ধ। আরেকবার দিল তাও বন্ধ। তৃতীয়বারও একই উত্তর। তার চোখে পানি এসে গেল। প্রাণ এবার পুরোপুরি তার দিকে ফিরল।
“প্রত্যাশা… কী হয়েছে?” সে ঠোঁট কামড়ে ধরে রইল।
“বলবে? না বলবে না?”
অপরিচিত লোকটার শেষ কথাটা কানে বাজছে। তার বুকের ভেতর একসঙ্গে ভয়, রাগ আর অসহায়তা পাক খেতে লাগল। সে জানে, একা যাওয়া মানে হয়তো ফাঁদে পা দেওয়া। তবু… যদি সত্যিই মায়ের কিছু হয়ে যায়? সে চোখ বন্ধ করল। একটা সিদ্ধান্ত নিতেই হবে।
প্রাণ পাশ ফিরে তাকাল। প্রত্যাশার মুখের রঙ বদলে গেছে দেখে তার কপাল কুঁচকে উঠল। নরম গলায় সে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে বলো?”
প্রত্যাশা একবার তার দিকে তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিল। মনে হলো, কথা বলতে গিয়েও গলা শুকিয়ে গেছে। কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকার পর ফিসফিস করে বলল, “আমার… আমার মাকে অপহরণ করেছে।”
প্রাণের মুখের ভাব মুহূর্তেই বদলে গেল। “কী বলছ?”
“ওরা বলেছে, মাকে বাঁচাতে হলে একটা ঠিকানায় যেতে হবে। আজই… একা যেতে হবে।”
শেষ কথাটা বলতে গিয়ে তার গলা কেঁপে উঠল। চোখের কোণে জমে থাকা জল সে জোর করে আটকে রাখল। কয়েক সেকেন্ড কেউ কোনো কথা বলল না। শুধু গাড়ির ইঞ্জিনের একঘেয়ে শব্দ শোনা যাচ্ছে।
প্রত্যাশা ধীরে ধীরে প্রাণের দিকে ফিরল। তার চোখে প্রথমবারের মতো অসহায়তা স্পষ্ট। খুব নিচু স্বরে বলল, “আমি… আমি কী করব বুঝতে পারছি না।”
প্রাণ স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। সে ধীরে ধীরে বলল, “আমি তো তোমাকে একটা কথাই বারবার বলেছিলাম আমাদের বিয়েটা হয়ে গেছে। যেভাবেই হোক, এটা একদিন মেনে নিতে হবে।”
প্রত্যাশা মাথা নিচু করে রইল। প্রাণের গলাটা একটু শক্ত হয়ে এল।
“একবারও কি আমার কথা শুনেছিলে? একবারও কি বিশ্বাস করেছিলে যে আমি তোমার ক্ষতি চাই না?”
প্রত্যাশা কষ্টে বলল, “এখন এসব বলার সময় নয়, প্রাণ।”
প্রাণ হালকা তিক্ত হাসল। “হয়তো নয়। কিন্তু আমার কথাও তো কখনো সময়মতো শোনোনি তুমি।”
সে একটু থামল। তারপর ধীর স্বরে বলল, “তুমি যখন আমার প্রতিটা কথা অস্বীকার করেছ, প্রতিটা সিদ্ধান্তে আমাকে দূরে ঠেলে দিয়েছ… তখন আজ হঠাৎ আমার ওপর ভরসা করতে চাইছ কেন?”
প্রত্যাশার চোখ ভিজে উঠল। “আমি ভরসা করছি বলেই তো তোমার কাছে সাহায্য চাইলাম।”
প্রাণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর শান্ত গলায় বলল, “সমস্যা হলো, তুমি সাহায্য চাও, কিন্তু মানুষটাকে স্বীকার করো না। এই দ্বন্দ্ব নিয়ে বেশিদূর যাওয়া যায় না।” কথাগুলো প্রত্যাশার বুকের ভেতর ছুরির মতো বিঁধল। সে আর একটি শব্দও বলল না।
রাত তখন প্রায় আড়াইটা। মীর বাড়ির বিশাল অট্টালিকাটা দিনের সমস্ত কোলাহল গিলে নিয়ে গভীর ঘুমে ডুবে আছে। তিনতলার করিডোরে লাগানো হলুদাভ নাইট লাইটগুলো মেঝের ওপর লম্বা লম্বা ছায়া ফেলে রেখেছে। জানালার কাঁচে মাঝে মাঝে বাতাসের ধাক্কা লাগছে, দূরে কোথাও একটা কুকুর ডেকে উঠে আবার চুপ হয়ে যাচ্ছে। বাড়ির এত বড় বড় ঘর, এত মানুষ, এত দরজা তারপরও মাঝরাতে পুরো বাড়িটাকে মনে হচ্ছে যেন কেউ বিশাল একটা চাদর দিয়ে ঢেকে রেখেছে। কিন্তু এই নিস্তব্ধতার মধ্যেই তিনতলার একটা দরজা খুব আস্তে করে খুলল। দরজার ফাঁক দিয়ে প্রথমে একটা মাথা বের হলো, তারপর দুটো চোখ। ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো সাঁঝ। পরনে ঢিলেঢালা একটা টি-শার্ট আর পায়জামা, চুলগুলো এলোমেলো। হাতে একটা ছোট টর্চ। পায়ের শব্দ যেনো না হয়, সেজন্য সে খালি পায়ে হাঁটছে। একবার ডানে তাকাল, একবার বাঁয়ে। তারপর নিজের বুকের ওপর হাত রেখে ফিসফিস করে বলল,
“অপারেশন মধ্যরাত শুরু।”
দুই পা এগিয়ে আবার থামল। “আল্লাহ, আজকে যেন আরযান ভাইয়ার সঙ্গে দেখা না হয়।”
এক সেকেন্ড চুপ থেকে নিজেই আবার বলে উঠল,
“না হলে আমি শেষ!”
সাঁঝের হাতে থাকা টর্চটা আসলে কোনো সাধারণ টর্চ ছিল না, সেটা একটা ছোট ইউভি লাইট। তার মাথায় আজ রাতে একটা “অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা” করার পরিকল্পনা চেপেছে। সমস্যা হলো, সেই বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার জন্য তাকে যেতে হবে মীর বাড়ির পুরোনো স্টোররুমে। আর সেই স্টোররুমটা এমন একটা জায়গা, যেখানে দিনের বেলাতেও কেউ একা যেতে চায় না। সাঁঝ করিডোর ধরে ধীরে ধীরে এগোতে লাগল। হাঁটতে হাঁটতে সে নিজের মনেই বিড়বিড় করল,
“পুরোনো বাড়ি, পুরোনো স্টোররুম, পুরোনো বাক্স আর আমি একটা ইউভি লাইট নিয়ে রাত আড়াইটায় ঘুরছি! এর চেয়ে সুন্দর আত্মহত্যার পরিকল্পনা আর কী হতে পারে!”
হঠাৎ দূর থেকে একটা শব্দ হলো। সাঁঝ জমে গেল। চোখ বড় বড় করে সামনে তাকিয়ে রইল।
“কে?”
কোনো উত্তর নেই। আবার শব্দ হলো। সাঁঝের গলা শুকিয়ে গেল। “আল্লাহ… জিন হলে প্লিজ অন্য কাউকে ধরো।”
ঠিক তখনই একটা ছোট্ট ছায়া তার পায়ের পাশ দিয়ে দ্রুত ছুটে গেল। সাঁঝ এমন একটা চিৎকার দেওয়ার উপক্রম করেও শেষ মুহূর্তে মুখ চেপে ধরল।
“উফফ! ইঁদুর!”
ইঁদুরটা অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। সাঁঝ বুকে হাত রেখে হাঁফ ছাড়ল,
“এই বাড়িতে মানুষের চেয়ে ইঁদুরের সাহস বেশি!”
তারপর আবার হাঁটা শুরু করল। স্টোররুমের সামনে এসে সাঁঝ থামল। পুরোনো কাঠের দরজা, দরজার ওপর ধুলোর পুরু আস্তরণ, একপাশে মাকড়সার জাল। সাঁঝ ধীরে ধীরে দরজার হাতল ধরল।
দরজা খোলার শব্দে সাঁঝ নিজেই চোখ বন্ধ করে ফেলল, “এই দরজাটারও নাটক কম না!”
সে ভেতরে ঢুকল। ঘরের ভেতর পুরোনো কাঠ, বই, কাগজ আর ধুলোর একটা মিশ্র গন্ধ। কয়েকটা বড় ট্রাঙ্ক একটার ওপর একটা রাখা। দেওয়ালের পাশে পুরোনো আসবাবপত্র, একটা কোণায় ভাঙা হারিকেন, আর ছাদের কাছ থেকে ঝুলে থাকা মাকড়সার জাল বাতাসে হালকা দুলছে। সাঁঝ ইউভি লাইটটা জ্বালাল। দেয়ালের দিকে আলো ফেলতেই কিছু পুরোনো দাগ দেখা গেল। সাঁঝের চোখ চকচক করে উঠল,
“আহা!”
সে তাড়াতাড়ি নিজের ফোন বের করল,
“আব্রাজ ভাই ঠিকই বলেছিল!”
দুপুরে আব্রাজ ব্রো তাকে একটা পুরোনো গল্প বলেছিল এই স্টোররুমে নাকি বহু বছর আগে মীর পরিবারের পুরোনো কাগজপত্র রাখা হতো। কিছু কাগজে বিশেষ কালি ব্যবহার করা হতো, যা সাধারণ আলোতে দেখা যায় না। সাঁঝের মাথায় তখনই ভূত চেপেছিল, সেই অদৃশ্য লেখা তাকে খুঁজে বের করতেই হবে! আর সেটাই এখন তার “বৈজ্ঞানিক গবেষণা”।
সে একটার পর একটা বাক্স খুলতে লাগল। পুরোনো ফাইল, পুরোনো ম্যাগাজিন, পুরোনো কাপড়, কিছু পুরোনো ছবি… শেষমেশ একটা ছোট কাঠের বাক্স পেল সে। বাক্সটা খুলতেই ভেতর থেকে একটা পুরোনো কাগজের বান্ডিল বেরিয়ে এলো। সাঁঝের চোখ গোল গোল হয়ে গেল, “পেয়ে গেছি!”
সে আনন্দে এত জোরে বলে ফেলল যে নিজের গলায় নিজেই চমকে গেল। তারপর চারদিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“শান্ত… শান্ত! বিজ্ঞানীর মতো আচরণ কর সাঁঝ।”
সে কাগজগুলো মেঝেতে রেখে ইউভি লাইটের আলো ফেলল। কিন্তু কিছুই হলো না।
“হুম?”
আরেকবার আলো ফেলল। এখনো কিছু নেই। “এটা তো আব্রাজ ব্রো বলেছিল!”
সাঁঝ বিরক্ত হয়ে কাগজটা উল্টেপাল্টে দেখতে লাগল। ঠিক তখনই তার চোখে পড়ল একটা ছোট্ট কাচের বোতল। বোতলের গায়ে পুরোনো ইংরেজি লেখা। সাঁঝ সেটা হাতে তুলে নিল,
“এটা কী?”
বোতলের ঢাকনা খুলতেই হালকা একটা তীব্র গন্ধ বের হলো। সাঁঝ সঙ্গে সঙ্গে নাক কুঁচকে বোতলটা নামিয়ে রাখল,
“উফ! এটা তো কেমিস্ট্রির ল্যাবের মতো গন্ধ!”
তারপর তার মাথায় কী যে বুদ্ধি এলো! সে হঠাৎ দৌড়ে স্টোররুমের পাশের ছোট্ট পুরোনো রান্নাঘরের দিকে গেল। সেখানে একটা পুরোনো গ্যাস স্টোভ ছিল, যা মাঝে মাঝে ছোটখাটো কাজে ব্যবহার করা হতো।
সাঁঝের পরিকল্পনা বোতলের ভেতরের তরলটা কাগজে সামান্য লাগিয়ে গরম করলে লেখা বের হয় কি না দেখা! বিজ্ঞানের ইতিহাসে এর আগে কেউ এমন পাগলামি করেছে কি না জানা নেই, তবে সাঁঝ মীরের ইতিহাসে প্রথম হতে চলেছে। সে ছোট্ট স্টোভটা জ্বালাল। একটু আগুন জ্বলে উঠল। সাঁঝ কাগজটা হাতে নিয়ে বলল,
“এবার দেখা যাক, রহস্যময় মীর পরিবার কী লুকিয়ে রেখেছে!”
সে কাগজটা আগুনের ওপর ধরতেই কাগজের একটা কোণা মুহূর্তেই জ্বলে উঠল! সাঁঝের চোখ কপালে,
“আরে!”
সে তাড়াতাড়ি কাগজটা নিচে ফেলে দিল। কিন্তু ততক্ষণে আগুনটা পাশের একটা পুরোনো কাপড়ে ধরে গেছে।
“ও মা!”
সাঁঝ তাড়াতাড়ি কাপড়টা হাতে নিয়ে ঝাড়তে লাগল,
“নিভ! নিভ! নিভ!”
কিন্তু আগুন আরও একটু ছড়িয়ে গেল। সাঁঝ এবার সত্যিই ভয় পেয়ে গেল,
“আল্লাহ!”
সে একটা পুরোনো কম্বল টেনে এনে আগুনের ওপর চাপা দিল। ধোঁয়া বের হতে লাগল, আর সেই ধোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজতে শুরু করল বাড়ির ফায়ার অ্যালার্ম।
এক মুহূর্তে পুরো বাড়ি কেঁপে উঠল। সাঁঝ একদম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল,
“আমি শেষ…”
দোতলায় প্রথমে তাজের ঘরের আলো জ্বলল, তারপর আব্রাজের, তারপর রাজ আর তেজের। এক মিনিটের মধ্যেই মীর বাড়ির প্রায় সবাই করিডোরে বেরিয়ে এসেছে। কেউ ঘুমজড়ানো চোখে, কেউ চাদর গায়ে দিয়ে, কেউ আবার বুঝতেই পারছে না কী হয়েছে। বড় মা চিৎকার করে বললেন,
“আগুন কোথায়?!”
তেজ দৌড়ে সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, “উপরে ধোঁয়া!”
আব্রাজ চোখ কচলাতে কচলাতে বলল, “ভূমিকম্প নাকি?”
রাজ বলল, “ভূমিকম্প হলে অ্যালার্ম বাজে?”
আব্রাজ একটু ভেবে বলল, “আমাদের বাড়িতে সবই সম্ভব।”
ঠিক তখন চিকুর খাঁচা থেকে বিকট চিৎকার, “আগুন! সাঁঝ! আগুন লাগছে!”
সবাই একসঙ্গে থেমে গেল। তাজ চোখ সরু করল, “সাঁঝ?”
আরযান তখন সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিল। চিকু আবার চেঁচিয়ে উঠল, “সাঁঝ আগুন লাগাইছে!”
আরযান থেমে গেল। তার মুখের ভাব দেখে তাজ আস্তে করে বলল, “তোমার অনুমান ঠিক ছিল।”
আরযান চোখ বন্ধ করল,
“আমি জানতাম।”
কয়েক মিনিট পর স্টোররুমের আগুন পুরোপুরি নিভিয়ে ফেলা হলো। বড় কোনো ক্ষতি হয়নি শুধু একটা পুরোনো কাপড় পুড়েছে, দুটো কাগজের কোণা কালো হয়েছে, আর স্টোররুমের ভেতর ধোঁয়ার গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। সবাই যখন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল, তখন আরযানের চোখ গেল ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা সাঁঝের দিকে। সাঁঝের চুল এলোমেলো, মুখে কালো ধোঁয়ার দাগ, হাতে এখনো সেই ইউভি লাইট। আর তার পাশে পড়ে আছে আধপোড়া কাগজ। আরযান কিছুক্ষণ শুধু অপলক তাকিয়ে রইল, কিছু বলল না। সাঁঝও চুপচাপ। শেষ পর্যন্ত সাঁঝ খুব আস্তে বলল,
“ভাইয়া…”
আরযান হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল, “আমার সঙ্গে আয়।”
সাঁঝের বুক ধক করে উঠল, “এখানেই বলুন না…”
“না।”
“কেন?”
“কারণ এখানে সবাই আছে।”
সাঁঝ বুঝল। বিপদ! বিরাট বিপদ!
আরযান ঘুরে সিঁড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। সাঁঝ অনিচ্ছায় তার পেছনে পেছনে হাঁটতে লাগল। তিনতলার করিডোর তখন আবার নিস্তব্ধ। সবাই নিচে চলে গেছে। আরযান নিজের স্টাডি রুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। সাঁঝ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। আরযান চেয়ারের পাশে গিয়ে দাঁড়াল,
“ভেতরে আয়।”
সাঁঝ ধীরে ধীরে ঢুকল। পেছনে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো। সাঁঝের গলা শুকিয়ে গেল। আরযান কিছু বলছে না, শুধু গম্ভীর মুখে তাকিয়ে আছে।
সাঁঝ একবার মেঝের দিকে তাকায়, একবার জানালার দিকে। তারপর আস্তে করে বলল, “ভাইয়া…”
কোনো উত্তর নেই। আরযান ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো। এক পা… দুই পা… তিন পা… সাঁঝ অজান্তেই পেছাতে লাগল। শেষে তার পিঠ স্টাডি টেবিলের কিনারায় ঠেকে গেল। আরযান তার ঠিক সামনে এসে থামল। সাঁঝ মাথা তুলে তাকাল। আরযানের মুখ ভীষণ শান্ত আর এই শান্ত মুখটাই সাঁঝের সবচেয়ে বেশি ভয় লাগে!
“কী করতে গিয়েছিলি?”
সাঁঝ ঠোঁট কামড়ে বলল, “একটা পরীক্ষা…”
“কী পরীক্ষা?”
“অদৃশ্য লেখা দেখা যায় কি না।”
“রাত আড়াইটায়?”
“বিজ্ঞান সময় দেখে কাজ করে না।”
আরযানের ভ্রু কুঁচকে গেল। সাঁঝ সঙ্গে সঙ্গে ঢোক গিলে বলল,
“মানে… বিজ্ঞানীরা তো সময় দেখে কাজ করে না!”
“তুই বিজ্ঞানী?”
“আজ থেকে হতে চেয়েছিলাম।”
আরযান চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “গ্যাস জ্বালিয়ে পুরোনো কাগজ আগুনে ধরিয়েছিস?”
সাঁঝ মাথা নিচু করল,
“জি।”
“ফায়ার অ্যালার্ম বাজিয়েছিস?”
“জি।”
“পুরো বাড়ির মানুষকে মাঝরাতে ঘুম থেকে তুলেছিস?”
“জি।”
“আর একটা কথা…”
সাঁঝ ভয়ে ভয়ে তাকাল।
“তুই যদি ওই আগুনটা সময়মতো নেভাতে না পারতিস?”
সাঁঝের মুখ এবার সত্যিই ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে কোনো উত্তর দিল না। আরযানের গলা এবার আগের চেয়ে নিচু হলো,
“মজা করতে গিয়ে বাড়ির মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করা যায় না, সাঁঝ।”
সাঁঝ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। কিছুক্ষণ নীরবতার পর সে খুব আস্তে বলল,
“সরি।”
আরযান স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল,
“সরি বললেই শেষ?”
সাঁঝ মাথা নাড়ল,
“না।”
“তাহলে?”
সাঁঝ ভয়ে ভয়ে বলল,
“শাস্তি দেবেন?”
আরযান এবার চেয়ারের দিকে ইশারা করল,
“বস।”
সাঁঝ চুপচাপ বসে পড়ল। আরযান তার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“আগামী সাত দিন তুই রাতে নিজের ঘর থেকে একা বের হবি না।”
সাঁঝ মুখ কুঁচকাল,
“জি।”
“আর আগামীকাল বিকেলে আমার সঙ্গে পুরো স্টোররুম পরিষ্কার করবি।”
“জি।”
“আর ওই ইউভি লাইট?”
সাঁঝ লাইটটা শক্ত করে ধরে বলল,
“এটা?”
“আমার কাছে জমা দিবি।”
সাঁঝের মুখ সঙ্গে সঙ্গে বিষণ্ণ হয়ে গেল,
“কিন্তু এটা তো আমার!”
“এখন আমার।”
“ভাইয়া!”
“আর একটা কথা,” আরযান একটু ঝুঁকে সাঁঝের চোখের সমান হয়ে বলল, “পরেরবার কোনো পরীক্ষা করার আগে একজন বড় মানুষকে জানাবি।”
সাঁঝ মাথা নাড়ল,
“ঠিক আছে।”
“এবার ঘুমাতে যা।”
সাঁঝ উঠে দরজার দিকে গেল। দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে তাকাল,
“ভাইয়া?”
“হুম?”
“আপনি রাগ করেছেন?”
আরযান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,
“রাগ করেছি।”
সাঁঝ মুখটা ছোট করে ফেলল,
“খুব?”
“খুব।”
সাঁঝ মাথা নিচু করল। তারপর আস্তে করে বলল,
“সরি।”
এইবার আরযানের মুখের কঠোরতা খানিকটা নরম হলো,
“যা।”
সাঁঝ বেরিয়ে গেল। দরজা বন্ধ করার আগে আরযান তাকে আবার থামাল,
“আর সাঁঝ?”
সাঁঝ দরজার ফাঁক দিয়ে মুখ বাড়াল,
“জি?”
“আগামীকাল কোনো আকাম-কুকাজ করবি না।”
সাঁঝ খুব নিরীহ মুখ করে বলল,
“আমি কি কখনো করি?”
আরযান স্থির চোখে তাকিয়ে রইল। সাঁঝ নিজেই ভুল স্বীকারের ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে বলল,
“আচ্ছা, করি।”
তারপর দৌড়ে নিজের ঘরে পালাল।
আরযান একা স্টাডি রুমে দাঁড়িয়ে রইল। টেবিলের ওপর রাখা আধপোড়া কাগজটার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বলল,
‘এই মেয়েটাকে মানুষ করা আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন কাজ!’
ঠিক তখনই নিচতলা থেকে চিকুর গলা ভেসে এলো “সাঁঝ আগুন লাগাইছে!”
তারপর আব্রাজের গলা, “চিকু, চুপ কর!”
চিকু আরও জোরে চেঁচিয়ে উঠল, “আরযান সাঁঝরে বকা দিছে!”
আরযান চোখ বন্ধ করল। সিঁড়ির ধারে এসে ওপর “এবার এই পাখিটাকেও শাস্তি দিতে হবে।”
নিচ থেকে আবার চিকুর চিৎকার করল, “আরযান হিটলার!”
আরযান চোখ খুলল। কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে সে খুব শান্ত গলায় বলল, “কাল থেকে পাখিরও পড়াশোনা শুরু।”
চিকু যেন কথাটা শুনতে পেয়েই আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠল, “না! না! অর্গানিক কেমিস্ট্রি না!”
পুরো বাড়ি আবার হাসিতে ভরে গেল। শুধু সাঁঝ নিজের ঘরে বালিশের নিচে মুখ গুঁজে ভাবল,
‘কালকের দিনটা মনে হচ্ছে আরও ভয়ংকর হতে যাচ্ছে!’
শেষ রাতের দিকে তারা ঢাকায় পৌঁছাল। গাড়ি বাড়ির সামনে থামতেই প্রত্যাশা দরজা খুলে নেমে গেল। একবারও পেছনে তাকাল না। নিজের ঘরে ঢুকেই সে দরজা বন্ধ করে দিল। বিছানার ওপর বসে আবার সেই অচেনা নম্বরে ফোন দিল। নম্বর বন্ধ। মায়ের ফোনও বন্ধ। তার বুকের ভেতর আতঙ্ক আরও ঘন হয়ে উঠল। হঠাৎ সে দাঁড়িয়ে গেল। চোখের জল হাতের পিঠ দিয়ে মুছে নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকাল।
খুব ধীর গলায় বলল, “তোমার সাহায্য লাগবে না, প্রাণ। আমি একাই যাব।” তার চোখে শুধু একরাশ জেদ। যদি ফাঁদও হয়, তবু সে যাবে। কারণ একজন মেয়ের কাছে নিজের জীবনের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে মা।
ঘড়ির কাঁটায় তখন সময় ভোর চারটে। প্রাণ সেই যে তাকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে গটগট করে চলে গেল, আর একটা বার খোঁজও নেয়নি! পাষাণ মানুষ একটা! নিজের স্বামীকে মনে মনে একশোটা গালি দিয়ে প্রত্যাশা গায়ে একটা কালো চাদর জড়িয়ে নিল। কিডন্যাপারের পাঠানো মেসেজের ঠিকানাটা ফোনে আবার ভালো করে দেখে নিয়ে সে একা, একদম চুপিচুপি বাড়ি থেকে বের হয়ে পড়ল। নিজের মায়ের জন্য সে আগুনেও ঝাঁপ দিতে প্রস্তুত, এই ভয়ংকর জায়গায় যাওয়া তো কোনো ব্যাপারই না!
এক নিঃসঙ্গ, প্রায় পরিত্যক্ত পুরোনো কারখানার সামনে এসে ট্যাক্সিটা থামল। চারপাশটা যেন ভুতের আড্ডাখানা। শুকনো পাতার খসখস শব্দেও প্রত্যাশার বুকের ভিতর পিঁড়ে পেটার শব্দ হচ্ছে। সে ভয়ে ঢোক গিলে ধীর পায়ে কারখানার মূল দরজার দিকে এগিয়ে গেল। মরিচা ধরা বিশাল লোহার দরজাটা হালকা ধাক্কা দিতেই বিকট এক শব্দে খুলে গেল।ভেতরে ঢুতেই দেখা গেল আবছা লাইটের আলোয় একটা চেয়ারের সাথে দড়ি দিয়ে বাঁধা রয়েছে তার মা! পাশে দুটো কালো পোশাক পরা প্রকাণ্ড আকৃতির লোক মুখ ঢেকে দাঁড়িয়ে আছে। যেন সিনেমার এক নম্বর গুন্ডা!
“মা!” প্রত্যাশা চিৎকার দিয়ে দৌড়ে যেতেই দুটো কিডন্যাপার একযোগে হাত বাড়িয়ে তাকে আটকে দিল। প্রত্যাশার মা গলায় কাপড় বাঁধা অবস্থায় গোঙাতে গোঙাতে চোখ বড় বড় করে আকুতি-মিনতি শুরু করলেন। প্রত্যাশা রাগে-ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “আমার মাকে ছেড়ে দাও! কী চাও তোমরা? টাকা? কত টাকা চাই বলো?”
কিডন্যাপার-১ তার বিশাল মোটা গলায় গম্ভীর স্বরে বলল, “আমরা টাকা চাই না ম্যাডাম! আমাদের বসের অর্ডার কোনো হাউকাউ হবে না।” ঠিক তখনই পেছন থেকে দামি জুতো আর মেঝের ঠকঠক ঘর্ষণের গম্ভীর শব্দ শোনা গেল। অন্ধকারে ধোঁয়া উড়িয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে তাদের ‘বস’। প্রত্যাশা চোখ সরু করে সেদিকে তাকাল। লোকটার পরনে কালো ব্লেজার, চোখে সানগ্লাস। ধোঁয়া কিছুটা কাটতেই লোকটার মুখ স্পষ্ট হলো। প্রত্যাশার হাঁ করা মুখ আর বন্ধ হয় না। চোখ দুটো চড়কগাছ!
“প… প্রাণ?!” প্রত্যাশা তো অবাক!
প্রাণ চোখের সানগ্লাসটা এক আঙুলে নিচে নামিয়ে মৃদু হাসল। “হ্যালো, ডিয়ার ওয়াইফ।”
প্রত্যাশা কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপরই তার মাথার রগ যেন জ্বলে উঠল, “তুমি?! তুমি এই কাজ করেছ? তুমি আমার মাকে কিডন্যাপ করেছ?!”
প্রাণ পকেট থেকে হাত বের করে খুব করুণ একটা মুখ করল। “কী করব বলো? ভালো কথায় তো তোমার কানে জল ঢোকে না। সো, অ্যাজ আ ডিরেক্টর, আমাকে একটু রিয়ালিস্টিক নাটক সাজাতেই হলো!”
প্রত্যাশা মায়ের দিকে তাকাল। তার মা কিন্তু এখন আর মোটেই ভয় পাচ্ছেন না। বরং দড়িতে বাঁধা অবস্থাতেই চোখ উল্টে প্রাণকে কিছু একটা ইশারা করছেন। প্রত্যাশার সন্দেহ হলো। সে দৌড়ে গিয়ে মায়ের মুখের বাঁধনটা খুলতেই তার মা হাপুস হুপুস করে হাঁফ ছেড়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, “আরে ভাইরে ভাই! তোমার গুন্ডা দুটোকে একটু নাস্তা দিতে বলো প্রাণ! সেই রাত থেকে এনে বসিয়ে রেখেছো,, একটু চা ও দিলো না? খিদেয় তো আমার পেট চোঁ চোঁ করছে!”
প্রত্যাশা ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। “মা… মানে? তুমি ভয় পাচ্ছ না? তুমিও জানো এসব?”
মা চোখ নাচিয়ে বললেন, “ভয় পাব কেন? জামাই আমার রাত বারোটায় গাড়িতে করে এসে ড্রয়িংরুম থেকে আদর করে তুলে আনল। বলল, ‘শাশুড়ি মা, চলেন একটু পিকনিক করে আসি, আপনার মেয়েকে লাইনে আনতে হবে।’ তা তোর জামাই তো মিথ্যে বলেনি রে প্রত্যাশা! তুই যা তাড়া করিস ওকে! মানলাম একটু জোর করে বিয়ে করেছে। আমাকেও যখন বলল, আমিও কষ্ট পেলাম। এমন ছেলে কি লাখে পাওয়া যায়? সরাসরি আগে আমার কাছে এলে আমি নিজেই বিয়ে দিতাম তোদের।”
প্রত্যাশা এবার নিজের কপালে নিজে হাত দিল। এ কোন দুনিয়ায় এসেছে সে! কিডন্যাপার-২ এবার কাঁপা কাঁপা গলায় প্রাণকে বলল, “বস… আমাদের পারিশ্রমিকটা? আর শাশুড়ি আম্মার জন্য যে বিরিয়ানি আনতে পাঠাইছিলেন, ডেলিভারি বয় তো বাইরে এসে দাঁড়িয়ে আছে।”
প্রাণ পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে মোটা কয়েকটা নোট গুন্ডার হাতে গুঁজে দিয়ে বলল, “যাও, বিরিয়ানি নিয়ে আসো। আর শাশুড়ি মার দড়িটা খুলে দাও, উনি কি সাজা পেয়েছেন নাকি?”
গুন্ডা তাড়াতাড়ি মায়ের দড়ি খুলে দিল। মা তৎক্ষণাৎ উঠে বসে শাড়ির আঁচল ঝাড়তে ঝাড়তে বললেন, “হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম! তা প্রাণ, বিরিয়ানির সাথে বোরহানি এনেছ তো?”
“অবশ্যই শাশুড়ি মা! সব ব্যবস্থা আছে,” প্রাণ একদম আদর্শ জামাইয়ের মতো হেসে বলল।
প্রত্যাশা এবার চিৎকার করে উঠল, “স্টপ ইট! একদম নাটক বন্ধ করো তোমরা! প্রাণ, তুমি আমার সাথে এই চক্রান্ত করলে?”
প্রাণ মুখটা আচমকা গম্ভীর করে ফেলল। তবে সেই গাম্ভীর্যের আড়ালে হাসির ঝিলিক স্পষ্ট। সে দুই পা এগিয়ে এসে প্রত্যাশার একদম মুখোমুখি দাঁড়াল।
“শোনো প্রত্যাশা,” প্রাণের স্বর এবার ভারী, “অনেক হয়েছে তোমার এই অহেতুক রাগ আর জেদ। সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুল বাঁকাতে হয়। আমার ঠান্ডা মাথায় একটাই প্ল্যান সোজা বাড়ি ফিরবে, আমার বউ হয়ে লক্ষ্মী মেয়ের মতো সংসার করবে, আর আমাকে ‘স্বামী’ বলে মেনে নেবে। কোনো কিন্তু, যদি, অথবা চলবে না!”
প্রত্যাশা রেগে লাল হয়ে বলল, “আর আমি যদি না মানি?”
প্রাণ হাতের ঘড়ির দিকে তাকাল। “না মানলে? খুব সোজা! তোমার প্রিয় আম্মাজানকে আমি এই গুদামঘরে আটকে রাখব। প্রতিদিন তিনবেলা খাসির বিরিয়ানি আর বোরহানি খাওয়াব, যার ফলে উনার কোলেস্টেরল বাড়বে, প্রেশার বাড়বে! আর উনাকে দিয়ে প্রতিদিন ভোর চারটেযই অর্গানিক কেমিস্ট্রির নোট মুখস্থ করাব!”
মায়ের মুখ শুকিয়ে গেল। “ওরে বাবারে! অর্গানিক কেমিস্ট্রি? না না প্রাণ, আমাকে ক্ষমা কর বাবা! প্রত্যাশা, তুই ওকে স্বামী বলে মেনে নে! আমি কেমিস্ট্রি মুখস্থ করতে পারব না!”
প্রত্যাশা নিজের মাকে দেখে হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারল না। “মা! তুমি উনার পক্ষে কথা বলছ?”
“তুই যে কী বলিস!” মা ডানে বামে মাথা নেড়ে বললেন, “ছেলেটা তোকে কতটা ভালোবাসে দেখ, তোর ভালোবাসার জন্য এত টাকা খরচ করে আমাকে কিডন্যাপ করিয়েছে, গুন্ডা ভাড়া করেছে, বিরিয়ানি খাওয়াচ্ছে! এমন জামাই কি সচরাচর পাওয়া যায়?”
কিডন্যাপার-১ ও পাশে দাঁড়িয়ে মাথা নেড়ে সায় দিল, “একদম খাঁটি কথা ম্যাডাম! আজকালকার ছেলেরা তো ডেটিংয়ে গিয়ে বিলই দিতে চায় না, আর উনি আপনার জন্য পুরো গুদামঘর ভাড়া করে ফেলেছেন! লিজেন্ড বস!”
প্রত্যাশা হতবাক হয়ে গুন্ডাটার দিকে তাকাল, “তোমার কোনো কাজ নেই? তুমি কিডন্যাপার না অন্য কিছু?”
গুন্ডা লাজুক হেসে বলল, “আসলে পার্টটাইম করি ম্যাডাম। দিনে আমি থিয়েটার করি।”
প্রত্যাশা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে বুঝল, এই খেলায় সে হেরে গেছে। একদিকে জাঁদরেল বর, অন্যদিকে বিরিয়ানি-লোভী মা, আর সাথে থিয়েটার করা আবেগী কিডন্যাপার! এদের সাথে জেতা অসম্ভব। প্রাণ একটু ঝুঁকে এসে প্রত্যাশার চোখের দিকে তাকাল। মুখে সেই চেনা জয়ীর হাসি। “কী ম্যাডাম? সিদ্ধান্ত কী? সংসার করবেন, নাকি শাশুড়ি মার কেমিস্ট্রি ক্লাস শুরু করব?”
প্রত্যাশা রাগ আর লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “রাজি! আমি বাড়ি ফিরতে রাজি! এবার এই সার্কাস বন্ধ করুন আপনি!”
প্রাণ বিজয়ের শান্ত হাসি হেসে পকেট থেকে ফোন বের করল। “ড্রাইভার, গাড়িটা সামনে নিয়ে এসো। আমাদের ম্যারেজ ট্রিপ শেষ, এখন ফুল টাইম সংসার শুরু!”
মা ততক্ষণে বিরিয়ানির প্যাকেট হাতে নিয়ে সোফায় বসে পড়েছেন। “তোমরা যাও বাবা, আমি বিরিয়ানিটা শেষ করে ড্রাইভারের সাথেই আসছি!”
প্রত্যাশা একরাশ রাগ নিয়ে গটগট করে গাড়ির দিকে হেঁটে গেল। আর প্রাণ তার পেছনে পেছনে সানগ্লাসটা আবার চোখে চড়িয়ে শিস বাজাতে বাজাতে এগোতে লাগল। মন খারাপের মেঘ কেটে গিয়ে এখন শুরু হতে চলেছে তাদের পাগলামিতে ভরা নতুন অধ্যায়!
চলবে? See less
Share On:
TAGS: ইশরাত জাহান জেরিন, যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৩৪
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৮+৯+১০
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪১
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৪৩
-
প্রেমতৃষা পর্ব ২+৩
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৩১
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৩৬
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ১
-
প্রেমতৃষা ৪২ (প্রথম অর্ধেক)
-
প্রেমতৃষা পর্ব ২৭