Golpo romantic golpo যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ

যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৪৪


যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ

ইশরাতজাহানজেরিন

পর্ব_৪৪

জরিনা ফ্লোরে সেন্সলেস হয়ে পড়ে থাকার পর শ্বশুরবাড়ির বেডরুমে যে তুলকালাম কাণ্ড শুরু হলো, তা মীর আব্রাজ রোদের পুরো রাজনৈতিক জীবনে কখনো ঘটেনি! আব্রাজ তড়িঘড়ি করে লুঙ্গির গিঁটটা শক্ত করে বেঁধে কোনোমতে এক পাশে দাঁড়াল, আর নৈশি খাটের ওপর পেটে হাত দিয়ে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ঠিক তখনই বাইরে থেকে বিকট চিৎকারের শব্দ শুনে নৈশির আম্মা, সোহরাব সাহেব আর সিয়াম দৌড়ে ঘরে ঢুকল। কি এমন হলো? ভেতরে তো বিশেষ বস্ত্র পড়াই ছিল তাও আজকাল আম জনতা দিনে-দুপুরে এমন ভাবে জ্ঞান হারাচ্ছে?
ফ্লোরে কাঁচের গ্লাস ভাঙা, রুহ-আফজা ছড়ানো, কাঁচাগোল্লা চ্যাপ্টা হয়ে পড়ে আছে আর জরিনা চোখ উল্টে অজ্ঞান! নৈশির আম্মা বুক চাপড়ে উঠে বললেন, “ওমা! জরিনা ফ্লোরে পইড়া আছে ক্যা? কী হইছে রে নৈশি?”
নৈশি হাসির চোটে কথা বলতে পারছিল না। সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “আ… আম্মা! তোমার জামাইয়ের… পলিটিক্যাল ক্ষমতার তেজ সহ্য করতে না পেরে জরিনা একবারে শহীদ হয়ে গেছে!”
আব্রাজ ততক্ষণে অতিমাত্রায় ভদ্র ও নিষ্পাপ চেহারা বানিয়ে ফেলেছে। সে সোহরাব সাহেবের দিকে তাকিয়ে বড্ড অমায়িক গলায় বলল, “আরে না আব্বু, ওনাকে মনে হয় এয়ারকন্ডিশনের অতিরিক্ত ঠান্ডা বাতাসটা সহ্য হয়নি। আমি তো কেবল শরবতটা নেওয়ার জন্য এগোচ্ছিলাম, হঠাৎই বেচারী ‘ও মাগো’ বলে একদম সেন্সলেস! তা সিয়াম ভাই, একটু পানি ছিটিয়ে ফ্যানটা ছেড়ে দাও তো।”
সিয়াম জরিনার মুখে পানি ছিটাতে ছিটাতে বিড়বিড় করল, “দুলাভাই, পলিটিক্স করে অপজিশন অজ্ঞান করা তো শুনছি, কিন্তু বাড়িতে এসে কাজের মেয়েকেও এক ঝলকে সেন্সলেস করে দেওয়া… ভাই তুমি সত্যিই ডায়নামিক লিডার!”
আব্রাজ সিয়ামের পিঠ চাপড়ে দাঁত কেলালো, “তুই তো ভাই আমার রিয়েল রত্ন! আগামী ইলেকশনে তোকে আমার পিএস বানাব। এবার এই ভোটকিরে উঠাতে সাহায্য কর চান্দু।”
জরিনার জ্ঞান ফিরতেই সে আবরাজের দিকে এক পলক তাকিয়েই ভয়ে হাত-পা কাঁপিয়ে চিল্লিয়ে উঠল, “ও খালাম্মা! এমপি স্যারের পরনে… পরনে…”
আব্রাজ এক কদম এগিয়ে এসে কড়া চোখে জরিনার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর এমপি মার্কা গলায় বলল, “জরিনা! স্ট্রোক করার আগে মানুষের মাথায় অনেক রকম হ্যালুসিনেশন বা ভুল দৃশ্য ভেসে ওঠে। তুমি যা দেখেছ, তা পুরোপুরি পলিটিক্যাল রিউমার বা অপপ্রচার! এ নিয়ে একটা শব্দও বাপের জন্মে মুখে আনলে তোমার বিরুদ্ধে সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টে কেস ঠুকে দেব, বুঝেছ?”
জরিনা ভয়ে থরথর করে কেঁপে উঠে সোজা মাথা নেড়ে দিল। নৈশি হাসতে হাসতে আবরাজের ধবধবে সাদা পাঞ্জাবির কলারটা চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল, “নিজের জামানত বাঁচাতে এখন কাজের মেয়েকেও আইনি হুমকি দেওয়া হচ্ছে, এমপি সাহেব?”

আব্রাজ নৈশির কোমরটা বড্ড চতুরভাবে চেপে ধরে কানের কাছে মুখ এনে বলল, “নিজের ইজ্জত আর সরকারি দলের সম্মান বাঁচাতে সব বৈধ-অবৈধ রাস্তা খোলা থাকে, নেত্রী!”

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত ৮টা। গুলশানের শ্বশুরবাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে আবার ধানমণ্ডির মীর বাড়িতে ফিরে এল আব্রাজ আর নৈশি। ধানমণ্ডির বাড়ির পরিবেশ তখন একদম থমথমে। ড্রয়িংরুমে আফাজাল হোসেন গম্ভীর মুখে বসে আছেন। তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে আছে ক্যাপ্টেন তাজ, প্রাণ আর আরযান। আজকে সকালে বাড়িতে বড় রকমের ঝামেলা হয়েছে। তাজ বিয়ে করে বউ নিয়ে এসেছে। এসব নিয়ে বাড়িতে অনেক কাহিনি হয়ে গেছে। সিয়ার বাড়ির থেকে মানুষ এসেছে। এখনো ঝামেলা কিছুই শেষ হয়নি। আব্রাজকে ঘটনা ফোন করে জানানো হয়েছিল কিন্তু আব্রাজ তখন বউয়ের সাথে জরুরি মিটিং এ ব্যস্ত থাকায় ফিরতে পারেনি। কিন্তু পুরো ঘটনা অবশ্য জানা হয়ে গেছে। সে ড্রয়িং রুমে আসতেই দেখল তাজও সেখানে গম্ভীর হয়ে বসে আছে। আব্রাজ আর নৈশি ঘরে ঢুকতেই তাজ তাচ্ছিল্যের এক চিলতে হাসি দিল, “কী রে আব্রাজ ? শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে একদম জামাই-আদর খেয়ে পলিটিক্যাল মিশন শেষ করে ফিরলি?”
আব্রাজ কায়দা করে পাঞ্জাবির হাতা গুটাতে গুটাতে বলল, “ক্যাপ্টেন সাহেব, আকাশে ৩৫ হাজার ফুট উঁচুতে কাজী ডেকে ক্রুকে বিয়ে করার চেয়ে আমার শ্বশুরবাড়ির অধিবেশন অনেক বেশি রোমাঞ্চকর ছিল!”
সিয়া আর প্রত্যাশা ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে ফিসফিস করে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। তাজের এমন অন্যায় আর বেপরোয়া আচরণের ওপর সিয়ার রাগ এখনো নামেনি। ঠিক তখনই আরযান তার পকেট থেকে দুটো ফাইল বের করে বড় আব্বুর সামনে টেবিলের ওপর রাখল।
“বড় আব্বু, সিলেটের স্টেডিয়ামের সেই স্পন্সরের কমপ্লেন আর সিসিটিভি ফুটেজের কেসটা আমি অফিশিয়ালি ক্লোজ করে দিয়েছি। ক্লাবের সাব-ডিরেক্টর আর নীলিমার বাবা আমাদের বিরুদ্ধে আর কোনো অ্যাকশনে যেতে পারবে না।”
আফজাল মীর চশমার ওপর দিয়ে আরযানের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখ দুটোতে বংশের কড়া শাসনের ছাপ। “আর সাঁঝের ব্যাপারটা? তুই তো ওকে কাল পুরো পরিবারের সামনে ‘মীর বাড়ির মেয়ে’ বলে নিজের ছায়ায় এনেছিস, আরযান। এর শেষ কোথায়?”
আরযান এক মুহূর্তের জন্য থামল। তার সেই বাউন্সার ক্যাপ্টেনের মতো শক্ত চোয়াল দুটো আরো দৃঢ় হয়ে উঠল। সে সোজা দাঁড়িয়ে বড্ড স্পষ্ট গলায় বলল, “এর শেষ একটাই বড় আব্বু। মীর আরযান শান যা নিজের বলে দাবি করে, তা সারাজীবনের জন্যই তার থাকে। সাঁঝকে কুড়িগ্রাম পাঠানোর প্রশ্নই ওঠে না, ও এই বাড়িতেই থাকবে।”

দূর থেকে দাঁড়িয়ে থাকা সাঁঝের বুকটা এক নিমেষে দোলাচলো কেঁপে উঠল।

সাউন্ডপ্রুফ মিউজিক স্টুডিওর আলো আঁধারি পরিবেশে একাই বসে আছে রাত। তার পরনে কালো স্লিভলেস টি-শার্ট, কোঁকড়ানো চুলগুলো কপালে এসে পড়েছে। হাতে তার ইলেকট্রিক গিটার। সুহানার রেস ট্র্যাকিংয়ের সেই বেপরোয়া ভাঙা হাত আর গালে লেগে থাকা কাঁচা রক্তের দাগগুলোর দৃশ্য এখনো রাতের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। হঠাৎই স্টুডিওর কাঁচের ভারী দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল সুহানা। তার এক হাত এখনো প্লাস্টার করা, পরনে রাতেরই দেওয়া ওভারসাইজড একটা ঢিলেঢালা হুডি। সুহানা থমথমে মুখে রাতের সামনে এসে দাঁড়িয়ে হাতের সেই লাল রুমালটা রাতের দিকে ছুঁড়ে মারল। “তোমার এই রুমাল আর ডেসিংয়ের দেনা শোধ করতে এসেছি রাত! রেস ট্র্যাকিংয়ে সুহানা কারও দয়ায় বাঁচে না।”
রাত গিটারের কর্ডে এক তীব্র সুর তুলে বাদ্যযন্ত্রটা একপাশে সরিয়ে রাখল। সে ধীরপায়ে উঠে এসে সুহানার একদম মুখোমুখি দাঁড়াল। রাতের চোখের সেই নেশাতুর, বাউন্ডুলে দৃষ্টি সুহানাকে এক নিমেষে থামিয়ে দিল।
“দেনা শোধ করতে এসেছ স্পিড কুইন?” রাত ভারী গলায় বলল। সে বড্ড চতুর ভঙ্গিতে সুহানার প্লাস্টার করা হাতের ওপর নিজের গরম হাতটা আলতো করে রাখল। সুহানা কেঁপে উঠে হাতটা সরাতে চাইল, কিন্তু রাত তাকে এক ঝটকায় স্টুডিওর মিউজিক কনসোলের সাথে চেপে ধরল। রাতের ভেজা নিশ্বাস সুহানার ঠোঁটের কোণে গিয়ে আছড়ে পড়ল।
“হাইওয়েতে ওই ব্যান্ডেজটা বেঁধে আমি তোমার ওপর ঋণ জমাইনি সুহানা,” রাত বড্ড মাদকতাময় গলায় কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “আমি শুধু আমার হবু বউয়ের অহংকারী ডানা দুটো একটু মেপে নিচ্ছিলাম। রেস ট্র্যাকিংয়ের ট্র্যাকে তুমি যতই গতি দেখাও না কেন, রাতের মিউজিকের এই জালে কিন্তু তুমি অলরেডি লকড হয়ে গেছ!”
সুহানা লজ্জায় আর রাগে হাঁপাতে হাঁপাতে রাতের বুক ঠেলে বলল, “তুমি একটা আস্ত একগুঁয়ে রকস্টার রাত! আমি কোনো জালে আটকাব না!”

রাত এক চিলতে বাউন্ডুলে হাসি হেসে সুহানার গালে কড়া একটা চুমু বসিয়ে দিয়ে বলল, “আটকাবে কুইন, খুব তাড়াতাড়ি আটকাবে!”

রাত ১টা। স্টাডি রুমে বসে আছে রাজ। অবনী হাতে এক কাপ গরম গ্রিন টি নিয়ে আড়ষ্ট পায়ে স্টাডি রুমে ঢুকল। রাজ আর অবনীর বিয়েটা অনেক হিসাব-নিকাশের মধ্য দিয়ে হলেও, রাজের এই চরম গাম্ভীর্যের সামনে অবনী এখনো কিছুটা ভয়ে ভয়ে থাকে।
“রাজ… আপনার চা,” অবনী কাঁপাকাঁপা গলায় বলল।
রাজ চশমাটা খুলে কাঠের ডেস্কে রাখল। সে অপলক চোখে অবনীর দিকে তাকাল। সূতি শাড়িতে অবনীকে বড্ড স্নিগ্ধ আর নিষ্পাপ লাগছে। রাজ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে অবনীর খুব কাছে এসে থামল।
“চা তো আনলে অবনী, কিন্তু তোমার চোখের এই ভয়টা আর দূরত্বটা কখন সরাবে?”
অবনী থতমত খেয়ে চোখ নিচু করে ফেলল, “আমি… আমি তো ভয় পাচ্ছি না।”
রাজ তার দীর্ঘ, ফর্সা হাত বাড়িয়ে অবনীর ওড়নার আঁচলটা আলতো করে ধরে নিজের দিকে একটু টানল। সে অবনীর থুতনিটা ওপরে তুলে তার শান্ত চোখে চোখ রেখে বলল, “মীর বাড়ির বাকি ভাইদের মতো আমি বেপরোয়া নই অবনী। কিন্তু আমার এই নীরব ভালোবাসার গভীরতা মাপতে গেলে তুমি খৈ হারিয়ে ফেলবে। বউ হিসেবে মীর বাড়িতে তোমার স্থান অলরেডি পাকা, এবার আমার বুকের ভেতরের খালি ক্যানভাসটাও নিজের করে নাও।”

অবনী রাজের চওড়া বুকে মাথা রাখল। রাজের শক্ত বাহু দুটো পরম মমতায় অবনীকে আগলে নিল।

রাত তখন প্রায় পৌনে দুইটা। বাড়ি জুড়ে ঝুম বৃষ্টি নামলেও মীর বাড়ির পরিবেশ থমথমে। সাঁঝের মনটা সকাল থেকে মোটেও শান্ত নেই। আরযান ভাইয়া তাকে ‘গ্রাম পাঠানোর ভয়’ দেখিয়ে আর বড় আব্বুর সামনে এমন সাধু সেজে নিজের জালে লক করে ফেলেছে যে, সে এখন রীতিমতো বন্দি! কিন্তু সাঁঝও তো সহজে হার মানার পাত্রী নয়। তার মনে পড়ে গেল, কাল বিকেলে আরযান ভাইয়ার ঘর থেকে যখন সে আসছিল, তখন আরযানের পড়ার টেবিলে সেই সিক্রেট ব্ল্যাক ডায়েরিটা সে দেখতে পেয়েছিল। যেখানে আরযান নাকি ক্লাবের চুক্তি আর নিজের ব্যক্তিগত অনেক হাবিজাবি লিখে রাখে। সাঁঝের দৃঢ় বিশ্বাস ওই ডায়েরিতেই আরযান তার ব্যাপারে নিশ্চয়ই কোনো খতরনাক ব্ল্যাকমেলিং প্ল্যান লিখে রেখেছে!
সাঁঝ একটা গাঢ় নীল রঙের ঢিলেঢালা সুতির থ্রি-পিস পরেছে। চুলগুলো মাথার ওপর কায়দা করে হাতখোঁপা করা। সে নিজের ঘরের দরজা সামান্য ফাঁক করে চারিদিকে চোরের মতো নজর বুলাল। সবাই ঘুমে কাদা। “আজ যদি আরযান ভাইয়ার ওই সিক্রেট ডায়েরিটা চুরি করে সিসিটিভি ফুটেজের সব সত্যি বের করতে না পারি, তবে আমার নামও সাঁঝ না!” সাঁঝ বিড়বিড় করে নিজেকে সাহস দিল।
সাঁঝ একবারে বিড়ালের মতো নিঃশব্দে হেঁটে আরযানের রুমের সামনে এসে দাঁড়াল। আরযানের বেডরুমের দরজাটা ভাগ্যক্রমে এক ইঞ্চি ফাঁক করা ছিল। ভেতরে সব আলো নেভানো, শুধু জানালার ওপাশ থেকে আষাঢ়ের বিজলির আলো মাঝে মাঝে চকচক করে উঠছে। সাঁঝ এক নিঃশ্বাসে দরজাটা একটু ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ল। রুমের ভেতর এসি জ্বলছে কড়া তাপমাত্রায়। আরযান মস্ত বড় কিং সাইজ খাটে শুয়ে আছে। তার গায়ে একখানা ধূসর কম্বল টানা, চেহারাটা উল্টো দিকে ফেরানো। তার সেই চওড়া পিঠ আর নিশ্বাসের স্বাভাবিক ওঠানামা দেখে সাঁঝ একশ ভাগ নিশ্চিত হলো, ‘বাউন্সার ক্যাপ্টেন এখন গভীর ঘুমে অচেতন!’
সাঁঝ মনে মনে বিজয়ের হাসি হাসল। “হুম! বড় প্লেয়ার হওয়া সহজ, কিন্তু সাঁঝের মতো গোয়েন্দাকে টেক্কা দেওয়া অসম্ভব!”
সে টিপটিপ পায়ে এগোতে শুরু করল আরযানের পড়ার টেবিলের দিকে। কিন্তু পথেই ঘটল প্রথম বিপত্তি। অন্ধকারে মেঝেতে রাখা আরযানের সেই ভারী লেদার স্পোর্টস সু-টার সাথে সাঁঝের বাঁ পা এমনভাবে আটকে গেল যে, সে সোজা আছড়ে পড়তে যাচ্ছিল রিভলভিং চেয়ারটার ওপর!
“উফফ… আউচ!” সাঁঝ কোনোমতে একটা হাত টেবিলের কোণায় চেপে ধরে নিজের ভারসাম্য সামলাল। কিন্তু তার হাতের ধাক্কায় টেবিলের ওপর রাখা পেনস্ট্যান্ডটা ঠকঠক শব্দ করে উল্টে যেতে যেতে বেঁচে গেল। সাঁঝ এক সেকেন্ডের জন্য দম বন্ধ করে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। বুকটা তখন অলরেডি মিনিটে ২০০ স্পিডে ড্রাম বাজাচ্ছে! সে আস্তে করে ঘাড় ঘুরিয়ে খাটের দিকে তাকাল। আরযান নড়েনি।
“আলহামদুলিল্লাহ! এই বাউন্সারটা মনে হয় ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়েছে!” সাঁঝ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।
এবার সে টেবিলের ওপর থেকে হাতড়ে হাতড়ে সেই কাঙ্ক্ষিত কালো ডায়েরিটা খুঁজে পেল। আনন্দে তার চোখ চকচক করে উঠল। কিন্তু ডায়েরিটা বগলে চেপে ধরে যেমনই সে পেছনের দিকে ঘুরে পা বাড়াতে যাবে, তখনই ঘটল মূল ট্র্যাজেডি! অন্ধকারে সে খেয়াল করেনি যে, আরযানের অ্যাশ রঙের ডাম্বেলটা ফ্লোরের মাঝখানেই রাখা ছিল। সাঁঝের পা সোজা গিয়ে লাগল সেই ১০ কেজির লোহার ডাম্বেলে!
“ও মাগোওওও! আমার পা!”
তীব্র ব্যথায় সাঁঝের চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। ব্যথার চোটে ভারসাম্য হারিয়ে সে আর নিজের পা ধরে রাখতে পারল না। ডায়েরিটা বাতাস উ উড়িয়ে সোজা গিয়ে পড়ল খাটের ঠিক মাঝখানে, আর সাঁঝ নিজেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ধপাস করে আছড়ে পড়ল সোজা খাটের ওপর রাখা লোকটার ঠিক বুকের ওপর! সাঁঝের পুরো শরীরের ওজন গিয়ে পড়ল আরযানের ফর্সা, কড়া বুকের খাঁচায়! ঘরের ভেতর এক মুহূর্তের জন্য শ্মশানের নীরবতা নেমে এল। সাঁঝ ব্যথায় চোখ বুজে আরযানের বুকের জামাটা দুই হাতে শক্ত করে খামচে ধরে পড়ে ছিল। সে ভাবছিল, ধাক্কা খেয়ে আরযান বোধহয় এখন ঘুম ভাঙার নাটক করবে বা চিল্লাবে।
কিন্তু না! কোনো চিল্লাচিল্লি হলো না। বরং সাঁঝের কানের ঠিক ওপরে ভেসে এলো গভীর ফিসফিসানি,
“চুরিটা কি শেষ হলো? নাকি আমার বুকের ওপর এসে ল্যান্ড করার কোনো বিশেষ ট্রেনিং চলছে?”
সাঁঝের গায়ের লোম এক নিমেষে খাড়া হয়ে গেল! সে ভয়ে ভয়ে চোখ খুলে ওপরে তাকাল। কোথায় ঘুম? মীর আরযান শান মোটেও ঘুমাচ্ছিল না! সে খাটে আধা-হেলান দিয়ে আরাম করে বসেছিল, তার দুই চোখ অন্ধকারেও বাঘের মতো জলজল করছে! আর সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো আরযানের একখানা বিশাল, শক্ত হাত অলরেডি সাঁঝের ফর্সা কোমরের ওপর এমনভাবে লক হয়ে গেছে যে, সেখান থেকে সাঁঝের পালানোর কোনো উপায়ই নেই! সাঁঝ ধড়ফড় করে উঠে বসতে গেল, “আ… আরযান ভাইয়া! আপনি… আপনি জেগে ছিলেন?”
আরযান এক চিলতে বাঁকা হাসি দিল। সে সাঁঝকে এক ঝটকায় আরও একটু টেনে নিজের একদম বুকের সাথে আটকে ফেলল। সাঁঝের গাল দুটো আরযানের তপ্ত বুকে ঠেকে গেল।
“আমার রুমে পা রাখার সাথে সাথেই তো তোর এই নূপুর ছাড়া পায়ের শব্দ পাচ্ছিলাম সাঁঝ,” আরযান বড্ড মন্থর, কড়া গলায় বলল। “তা রাত দুইটায় জাতীয় দলের ক্যাপ্টেনের বেডরুমে অনুপ্রবেশ করে কী খোঁজা হচ্ছিল? সিসিটিভি ফুটেজের ব্যাকআপ, নাকি আমার এই ডায়েরি?”
সাঁঝের মুখ শুকিয়ে একদম কাঠ! সে তো ভেবেছিল চুরি করে বীরদর্পে বের হয়ে যাবে, আর এখন নিজেই চোরের মতো ধরা খেয়ে শত্রুর বুকের ওপর বন্দি!
সে তোতলাতে তোতলাতে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, “মানে.. আমি তো চুরি করতে আসিনি! আপনার টেবিলের ওপর ওই ল্যাম্পটা খোলা ছিল, তাই বন্ধ করতে এসেছিলাম। ছাড়ুন আমাকে! আমি নিজের রুমে যাব!”
আরযান সাঁঝের থুতনিটা নিজের আঙুল দিয়ে ধরে ওপরে তুলল। “ল্যাম্প বন্ধ করতে এসেছিস?” আরযান সাঁঝের কানের লতির একদম কাছে নিজের মুখটা নিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল, “তা ল্যাম্প বন্ধ করার বাহানায় আমার বুকের ওপর এভাবে আছড়ে পড়ার অফিশিয়াল পারমিশন তোকে কে দিল, শুনি? আব্বুর সামনে তোকে আমার ইজ্জত বাড়ানোর পর থেকে তোর সাহস তো দেখছি বড্ড বেড়ে গেছে!”
“আমি মোটেই ইচ্ছা করে পড়িনি!” সাঁঝ লজ্জায় আর রাগে একদম লাল হয়ে মুখ লুকিয়ে ফিসফিস করে চিল্লিয়ে উঠল, “ওই ডাম্বেলটা ফ্লোরে রেখেছিল কে? আপনার পায়ে তো কোনো আক্কেল নাই! ছাড়ুন বলছি, নইলে কিন্তু আমি চেঁচাব!”
“চেঁচাও,” আরযান একদম নির্ভার মুখে বাঁকা হাসল। ” আব্বু, আব্রাজ আর তাজ সবাই জাগুক। এসে দেখুক মীর বাড়ির ছোট মেয়ে মাঝরাতে আরযান শানের বেডরুমে ডায়েরি চুরি করতে এসে তার বুকের ওপর আটকে গেছে। এতে কিন্তু তোর গ্রামের টিকেটটা বাতিল হয়ে সোজা কাজি অফিসের ডেট পাকা হয়ে যাবে! আর কার সাথে বিয়ে দিবে জানিস? একটা কালুয়া, আক্কাস আলীর সাথে। দেখ তোর জামাই যদি আমাদের দাদার বয়সী হয় তাহলে বিষয়টা কেমন লাগবে? সাঁঝ এক লহমায় নিজের মুখ বন্ধ করে ফেলল! এই পুরুষটা সত্যি বড্ড মারাত্মক! মানে মারাত্মক শয়তান। সাঁঝ আরযানের টি-শার্টের কলারটা দুই হাতে আঁকড়ে ধরে করুণ মুখে বলল, “আপনি একটা আস্ত ধড়িবাজ রাক্ষস আরযান ভাইয়া! আমার পা-টা ব্যথায় ভেঙে যাচ্ছে, আর আপনি আমাকে ধরে রাখছেন?”
সাঁঝের চোখে সত্যি সত্যি দুই ফোঁটা ব্যথার জল দেখে আরযানের সেই পাথুরে চিবুকটা মুহূর্তের জন্য নরম হয়ে এল। আরযান ধীর গতিতে সাঁঝের কোমর থেকে হাত সরালো, কিন্তু তাকে ছাড়ল না। সে সাঁঝের ডান পা-টা টেনে নিজের কোলের ওপর তুলে নিল। সাঁঝ শিউরে উঠে পিছাতে চাইল, কিন্তু আরযানের ফর্সা, শক্ত হাত দুটো অলরেডি সাঁঝের পায়ের পাতার সেই ব্যথার জায়গায় আলতো করে চেপে ধরে মেসেজ করতে শুরু করেছে।
“বড় বড় গোয়েন্দাগিরি করতে গেলে পা-টা সামলে চলতে হয়, সাঁঝ,” আরযান নিচু, ভারী গলায় বলল। তার হাতের সেই কুসুম-গরম স্পর্শে সাঁঝের শরীরের ভেতর দিয়ে যেন একটা বিদ্যুতের তরঙ্গ বয়ে গেল।
সাঁঝের সব রাগ, সব অভিমান এক সেকেন্ডে কোথায় যেন হারিয়ে গেল। সে আরযানের কড়া চোখের দিকে তাকিয়ে বড্ড নিচু গলায় বলল, “আপনি এত কড়া কেন, আরযান ভাইয়া?”
আরযান সাঁঝের পায়ের ব্যথাটা কমে আসতেই তাকে এক টানে নিজের আরও কাছে এনে বলল,
“তোর এই অবাধ্য মনটাকে লাইনে রাখার জন্য কড়া হওয়াই লাগে সাঁঝ,” আরযান মিষ্টি এক চিলতে হেসে ডায়েরিটা সাঁঝের হাতে গুঁজে দিল। “নে, ডায়েরি নিয়ে যা। ভেতরে শুধু একটা কথাই লেখা আছে ‘সাঁঝ শুধুই মীর আরযান শানের পাখি। তোকে চাইলেই কেউ নিজের খাঁচায় পোষা তো দূরে থাক, কল্পনাও করতে পারবে না। এবার সোজা নিজের রুমে গিয়া ঘুমা, নইলে কিন্তু সকালের আগেই তোকে এই রুমে পারমানেন্ট কয়েদি বানিয়ে দেব!”
সাঁঝ ডায়েরিটা বুকের সাথে চেপে ধরে লাল টুকটুকে মুখ নিয়ে এক দৌড়ে আরযানের রুম থেকে পালিয়ে নিজের রুমে এসে ঢুকাল। দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে তার বুকের স্পন্দন তখন যেন কোনো বড় ম্যাচ জয়ের গতির চেয়েও বেশি জোরে বাজছিল! এমন কেন হচ্ছে হায় আল্লাহ!
চলবে?
( ১ হাজার রিয়েক্ট করে দিয়েন। তাহলে পরের পর্ব জলদি দিব….) See less

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply