Golpo romantic golpo মন বোঝে না

মন বোঝে না পর্ব ১৮


মন বোঝে না পর্ব ১৮

#সানা_শেখ

বাস থেকে নেমে একটা সিএনজি নিলো আবরার। নিজ শহরে ফিরে তার মন খুশি হওয়ার বদলে আরও বেশি বিষণ্ন হয়ে গেছে। উদাস মনে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল এক মনে।

হঠাৎ একটা বেপরোয়া গতির প্রাইভেট কার পেছন থেকে এসে সিএনজিতে ধাক্কা দিয়ে চলে গেল সামনের দিকে। সিএনজি ছিটকে গিয়ে উল্টে পড়ল। আবরার মাথায় আঘাত পেল প্রচণ্ড। ডান হাতটা বোধহয় ভেঙেছে। মানুষের চিৎকার চেঁচামেচি শুনতে পেল সে। পিটপিট করে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে দুর্লভ হাসি ফুটিয়ে বিড়বিড় করল,

“আমার সঙ্গে কীসের শত্রুতারে তোর? ছোটো থেকে এত কিছু কেড়ে নিলি। বড়ো হয়ে এক মেয়েকে ভালোবাসলাম তাকেও আমার হতে দিলি না। তোকে ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় ফোনটা কেড়ে নিলি, আর ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে জানটাও কেড়ে নিতে চাইছিস? তোর বুকে জন্ম নেওয়ার পর থেকেই কী আমাকে তোর শত্রু ভেবে নিয়েছিস নাকি?”

ইট পাথরের শহর কোনো জবাব দিলো না আবরারের কথার। কয়েকজন আবরারকে ডাকতে লাগল হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য, কিন্তু আবরার চোখ মেলে তাকাতেও পারল না। জ্ঞান হারিয়ে সেভাবেই পড়ে রইল।

.

হসপিটালের করিডোরে দাঁড়িয়ে আছে ফারিশ-রা আর আবরারের ভার্সিটি ফ্রেন্ডরা। কেবিনের ভেতর আবরারের সঙ্গে কথা বলছেন আমজাদ খান।

সারাহ চেয়ারে বসে আছে চুপচাপ, কোলে ফাহিম বসে আছে। আবরারের খোঁজ পেতেই সবাই ছুটে এসেছে হসপিটালে। আবরার কোথায় চলে গিয়েছিল কেবিনের বাইরের কেউ এখনো জানে না।

আমজাদ খান ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন পলকহীন। আবরারও বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন মহুয়া কবীর। উনার দুচোখ জলে ভেজা।

আবরার শুকিয়ে গেছে অনেকটা, চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে গেছে।

আমজাদ খান নিজেকে সামলে ধরা গলায় বললেন,

“কাউকে কিছু না বলে কোথায় চলে গিয়েছিলে, আব্বু?”

আবরার মৃদুস্বরে বলল,

“বান্দরবান।”

মহুয়া কবীর জড়ানো গলায় বললেন,

“যাওয়ার আগে একটাবার বলে যাবে না আমাদের?”

“বলে যাইনি?”

“কাকে বলেছো?”

“আপনাকে বলিনি?”

মহুয়া কবীর দুদিকে মাথা নেড়ে বললেন,

“না।”

“চিঠিতেও বলিনি?”

“না।”

আবরার চোখ বন্ধ করে রইল কিছুক্ষন। তখন তার মাথা ঠিকঠাক মতো কাজ করছিল না। সে কী কী বলেছিল, চিঠিতে কী কী লিখেছিল তাড়াহুড়োয় সেসবও ভালোভাবে মনে নেই। তার শুধু মনে আছে সে ঠিকভাবে শ্বাস নিতে পারছিল না, তার বুকের ভেতর ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। তার মনে হচ্ছিল সেই যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে সে ম’রে যাবে।

সে ভেবেছিল সে কোথায় যাচ্ছে এটা বলেছে, কিন্তু সে তো বলেইনি কিছু। আগে কোথাও গেলে বাবা মাকে না বললেও মেইডকে বলে যেত যেন তাকে খোঁজাখুঁজি না করে। আর আমজাদ খান তো কল করে খোঁজ খবর নিতেনই।

আবরার চোখ মেলে বলল,

“তাড়াহুড়োয় বোধহয় বলতে ভুলে গিয়েছিলাম।”

“ফোন হারালে কীভাবে?”

“পকেট থেকে কখন কে নিয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি।”

“কত ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, কোথায় কোথায় না খুঁজেছি তোমাকে।”

“সরি, আব্বু। আর কখনো এমন কিছু করব না।”

এতগুলো বছর পর সামনে থেকে ছেলের মুখে আব্বু ডাক শুনে আবেগে আপ্লুত হলেন আমজাদ খান। মহুয়া কবীর বললেন,

“কেন এমন করেছিলে হুট করে? কী হয়েছিল তোমার?”

“তেমন কিছু না, আম্মু।”

মহুয়া কবীর ছলছল চোখে তাকিয়ে রইলেন আবরারের মুখের দিকে। চোখজোড়া হতে টুপটাপ পানি গড়িয়েও পড়তে লাগল।

আমজাদ খান নিজেকে সামলে আরও অনেকক্ষণ ছেলের সঙ্গে কথা বললেন।

আবরারের ডান হাত ভেঙে গেছে। কপালের ডান পাশে অনেকটা কে’টে গেছে। মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা রয়েছে। শরীরের ডান পাশটায় বেশ আঘাত পেয়েছে। বেশ কয়েক জায়গায় কে’টে গেছে।

বাকিরাও দেখা করল আবরারের সঙ্গে। ফুয়াদ হাসান রাগারাগি করলেন এভাবে কাউকে কিছু না বলে সবাইকে টেনশনে ফেলে ঘুরতে যাওয়ার কারণে। এত বড়ো একটা ছেলে হয়ে এমন একটা কাজ সে কীভাবে করল? তার তো উচিত ছিল কাউকে বলা সে যে ঘুরতে যাচ্ছে। আবরার চুপচাপ বকা শুনেছে শুধু, সে আর কী বলবে? ভুল তো করেছেই। সে একটু ভালো থাকার জন্য চলে গিয়ে সকলের ভালো থাকা কেড়ে নিয়েছিল।

আস্তে আস্তে সবাই বেরিয়ে গেল কেবিন থেকে, শুধু ভেতরে রয়ে গেল ফারিশ আর সারাহ। ফারিশ ভেতর থেকে দরজা লাগিয়ে দিয়ে সারাহকে চোখ দিয়ে ইশারা করে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।

সারাহ আবরারের দিকে তাকিয়ে আছে, আবরার তাকিয়ে আছে উপরের দিকে। কেবিনে প্রবেশ করার পর আবরার দুবার তাকিয়েছিল তার দিকে তারপর থেকে আর তাকাচ্ছে না মনের ভুলেও।

সারাহ বেডের কাছে এগিয়ে এসে দাঁড়াল। মৃদুস্বরে বলল,

“আমার দিকে তাকালে অন্ধ হয়ে যাবেন নাকি?”

আবরার নিঃশব্দে হাসল সারাহর কথা শুনে। সারাহর দিকে না তাকিয়েই বলল,

“অন্ধ হবো কিনা জানি না, তবে তোমার প্রেমে আবার পড়বো এটা শিওর।”

সারাহর বুক কেঁপে উঠল আবরারের গলার আওয়াজ আর কথা শুনে। সে নিজেকে সামলে মাথা নিচু করে বলল,

“আমি ভীষন সরি। আমি ওই কথাগুলো ঐভাবে বলতে চাইনি আপনাকে, জানি না কীভাবে বলে ফেলেছিলাম। মাফ করে দিবেন আমাকে।”

এবার আবরার তাকাল সারাহর মুখের দিকে। সারাহ মাথা নিচু করে রাখলেও আবরার ভালোভাবেই দেখতে পাচ্ছে তার চেহারা। সারাহর ডাগর ডাগর চোখজোড়া গর্তে ঢুকে গেছে। চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। ফোলা ফোলা গাল দুটো আগের মতন নেই। চেহারা বিষণ্নতায় আক্রান্ত। মনে হচ্ছে সারা দুনিয়ার দুঃখ কষ্ট এই চেহারায় জমা হয়ে আছে।

“মায়াবিনী, কী হয়েছে তোমার?”

সারাহ ফট করে মুখ তুলে চাইলো। তার চোখজোড়া পানিতে টইটম্বুর হয়ে রয়েছে। দ্রুত চোখজোড়া মুছে ধরা গলায় বলল,

“আপনাকে কষ্ট দিয়েছিলাম বলে অভিশাপ দিয়েছিলেন?”

“আমার এত বড়ো দুঃসাহস আছে, মায়াবিনী? তোমাকে অভিশাপ দেওয়ার আগে জিব খসে পড়ুক আমার।”

“মাফ করবেন না আমাকে? আমি সত্যিই ইচ্ছে করে মন থেকে ওই কথাগুলো বলিনি আপনাকে।”

“মাফ কেন চাইছো, মায়াবিনী? আমি কিছু মনে করিনি।”

সারাহ অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে রইল। আবরার চোখে চোখ রেখে বলল,

“প্রহর শেষে আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্রমাস,

তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ!”

থেমে শ্বাস নিয়ে আবার বলল,

“এভাবে তাকিও না, খু’ন হয়ে যাব।”

ডুকরে কেঁদে উঠল সারাহ। উল্টো ফিরে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে দরজায় টোকা দিয়ে কেবিনের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। কোনো মতে নিজেকে সামলে চোখজোড়া মুছে লম্বা লম্বা শ্বাস টেনে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। সে এতক্ষণ কেবিনে ছিলই আবরারের কাছে মাফ চাওয়ার জন্য। হসপিটালে আসার পথেই ফারিশকে বলেছিল সে আবরারের কাছে মাফ চাইবে, ফারিশ যেন আলাদা করে কথা বলার সুযোগ করে দেয়। আজকের পর আর কোনোদিন আবরারের সামনে আসবে না সারাহ।

ফারিশ ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে দেখল সারাহ কেবিনে নেই। দরজা খোলা দেখে আবরারের কাছে এগিয়ে এসে বলল,

“সারাহ চলে গেছে?”

“হুম।”

ফারিশ আর কিছু বলল না। আবরার বলল,

“চেরির কী হয়েছে?”

ফারিশ ফোস করে শ্বাস ছেড়ে বলল,

“আমার কলিজাটা পাগলের মতন ভালোবেসে ঠকে যাওয়ার যন্ত্রণায় ভুগছে।”

আবরার বিস্মিত হয়ে বলল,

“মানে?”

“মানে এটাই আবির গত দুই বছর আগে থেকেই বিবাহিত। বিয়ের আগে গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে এক বছর লিভ ইন-এ ছিল।”

“কিহ!”

উত্তেজিত হয়ে উঠল আবরার। ফারিশ বলল,

“হুম। আবির আগে থেকেই বিবাহিত।”

“জানলি কীভাবে?”

সবকিছু খুলে বলল ফারিশ। সব শুনে আবরার কিছু বলার মতন খুঁজে পেল না। ফারিশ লম্বা শ্বাস টেনে আবার বলল,

“সারাহ তোর সঙ্গে বাজে আচরণ করেছে, তোকে আঘাত দিয়ে কথা বলেছে এটা নিয়ে অপরাধ বোধে ভুগছিল সেদিন থেকেই। তোকে বারবার কল করেও পায়নি, তোর ফোন বন্ধ। ভার্সিটিতে গিয়ে তোর খোঁজ করলেও কিছুই জানতে পারে না। তোর কাছে মাফ চেয়ে চিরকুট লিখেছিল, সেটা দিয়েছিল জুনায়েদের কাছে। আবির এটা জানতে পেরে সারাহর সঙ্গে যা-তা ব্যবহার করেছে, বকাবকি করেছে। মাফ করে দিস আমার বোনটাকে, ও না বুঝেই ওভাবে রিঅ্যাক্ট করে ফেলেছিল।”

আবরার শান্ত কন্ঠে বলল,

“তোর বোনকে বিয়ে দিয়ে দে আমার সঙ্গে।”

“সারাহ রাজি না।”

“কেন? তুই তো বললি আবিরের সঙ্গে ওর বিয়ে হচ্ছে না।”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে সমস্যা কোথায়?”

“আমি বলেছিলাম, সারাহ নিষেধ করে দিয়েছে। ওর ধারণা আবিরের সঙ্গে ওর বিয়ে হচ্ছে না বলে তোকে বিয়ে করতে রাজি হলে তুই ভাববি ও আবিরের কাছে ঠকে গিয়ে অপশন হিসেবে তোকে বেছে নিয়েছে। তাই ও তোকেও বিয়ে করবে না।”

“তোর বোন আস্ত একটা মাথা মোটা।”

“আর যাই বলিস আমার বোনকে নিয়ে আমার সামনে এসব কথা বলবি না, সহ্য হয় না আমার।”

মহুয়া কবীর সারাহর দিকে তাকিয়ে আছেন অনেকক্ষণ। সারাহকে তিনি ঠিক চিনে উঠতে পারছেন না। কৌতূহল দমিয়ে রাখতে না পেরে সারাহর কাছে এগিয়ে এসে নিচু কন্ঠে বললেন,

“নাম কী তোমার?”

সারাহ নিজেও নিচু কন্ঠে বলল,

“সারাহ মেহজাবিন চেরি।”

“তোমার বাবার নাম কী?”

“ফুয়াদ হাসান।”

মহুয়া কবীর তড়িৎ গতিতে ফুয়াদ হাসানের দিকে তাকালেন, তারপর আবার তাকালেন সারাহর মুখের দিকে। তিনি বুঝতে পারলেন সারাহ নিতু সুলতানার আগের সংসারের মেয়ে। তিনি আজ প্রথম সারাহকে দেখছেন, তিনি শুনেছিলেন নিতু সুলতানার একটা মেয়ে আছে।

তার মনে হচ্ছে সারাহর পুরো নামটা তিনি আগেও শুনেছেন, কিন্তু কোথায় শুনেছেন ঠিক মনে পড়ছে না। মস্তিষ্কে একটু চাপ প্রয়োগ করতেই মনে পড়ে গেল। আবরারের মুখে শুনেছিলেন।

সারাহকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন। তার এমন চাহনিতে অস্বস্তিতে পড়ল সারাহ। কাচুমাচু ভঙ্গিতে সরে গিয়ে মায়ের গা ঘেঁষে দাঁড়াল। ফুয়াদ হাসান আমজাদ খানের সঙ্গে কথা বলছেন। ফাইয়াজ ফাহিমকে কোলে নিয়ে মোবাইল চাপতে ব্যস্ত। আবরারের বন্ধুরা চলে গেছে।

ফাইয়াজ কেবিনের দরজায় দাঁড়িয়ে বলল,

“ভাইয়া, বাড়িতে যাবে না?”

“হ্যাঁ। আসছি।”

ঘাড় ঘুরিয়ে আবার আবরারের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আসছি ভালো থাকিস। আর এভাবে কাউকে কিছু না বলে গায়েব হয়ে যাস না।”

“তোর বোনকে দিয়ে দে, দেখবি রুম থেকেও বের হবো না।”

ফারিশ সরু চোখে তাকিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।

মামা মামির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজের পরিবারকে নিয়ে চলে গেল লিফটের দিকে।

মহুয়া কবীর স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে বললেন,

“ফারিশের বোনকে দেখেছো?”

“হ্যাঁ। ভীষণ মিষ্টি মেয়েটা।”

“আবরার একবার তোমাকে বলেছিল না ও বিয়ে করবে?”

“হ্যাঁ।”

“ও বলেছিল মেয়েটার নাম সারাহ মেহজাবিন চেরি। আর ফারিশের বোনের নামও সারাহ মেহজাবিন চেরি। আমার মনে হচ্ছে আবরার এই মেয়েকেই বিয়ে করার কথা বলেছিল।”

আমজাদ খান ফারিশদের চলে যাওয়ার পথে তাকালেন।

চলবে………

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply