Golpo romantic golpo বাঁধন রূপের অধিকারী

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ১৪


বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ১৪

#লেখিকা_সুমি_চৌধুরী [১৪]

[••• অনুমতি ব্যতীত কপি করে নিষিদ্ধ•••]

মেয়েটি দ্রুতপদে এসে বাঁধনের সামনে দাঁড়াল। বাঁধনের হাতের ক্ষত থেকে তখনো গলগল করে রক্ত ঝরছে, যা দেখে মেয়েটির দুশ্চিন্তাচ্ছন্ন চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। সে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে উঠল।

“ইয়া আল্লাহ, আপনার তো গুলি লেগেছে, অনেক রক্ত বের হচ্ছে।”

কথাটা বলেই মেয়েটা তড়িঘড়ি করে বাঁধনের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। চারপাশের ঘন জঙ্গল এখন একদম নিস্তব্ধ, শুধু বাঁধনের যন্ত্রণাকাতর ভারী নিঃশ্বাস আর ঘাসের ওপর রক্ত পড়ার শব্দ যেন চারপাশের নিস্তব্ধতাকে আরও গাঢ় করে দিচ্ছে। গাছের গায়ে হেলান দিয়ে থাকা বাঁধন ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছিল, তবুও অসীম কষ্টে চোখ তুলে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল।

“কে তুমি, আর এই বিষাক্ত জঙ্গলে একা কী করছো?”

মেয়েটা তার কোনো কথার জবাব দিল না। তার চোখে তখন এক অদ্ভুত দৃঢ়তা আর অজানা ভয় খেলা করছে। সে নিজের পোশাকের আড়াল থেকে একটা ছোট তীক্ষ্ণ ছুরি বের করল। এক মুহূর্ত দেরি না করে সে বাঁধনের হাতের ক্ষতস্থানে ছুরিটা ছোঁয়ালো। ধাতব ফলার স্পর্শ লাগতেই বাঁধন যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠল।

“ওহহহ, শিট, আহহ, নো, নো, আহহহ।”

মেয়েটা তবুও থামল না। দাঁত চেপে, অত্যন্ত সাবধানে কিন্তু কাঁপা হাতে মাংসের ভেতরে ঢুকে যাওয়া গুলির মাথাটা খুঁজে বের করল। তারপর হঠাৎ করেই সজোরে একটা টান দিল।

“আহহহহহহ।”

বাঁধন সজোরে আর্তনাদ করে উঠল। যন্ত্রণার তীব্রতা সইতে না পেরে সে অবচেতনভাবেই মেয়েটাকে নিজের দিকে হ্যাঁচকা টানে টেনে নিল এবং শক্ত করে নিজের বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরল। সেই মুহূর্তে যেন পুরো পৃথিবীটা থমকে গেল। চারপাশের জঙ্গল, বাতাসের শব্দ, সব যেন মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেল। শুধু শোনা যাচ্ছিল বাঁধনের বুকের ভেতর ধুকপুক করা পাগলাটে হৃদস্পন্দন।

মেয়েটা একদম পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল। বাঁধনের বুকের এত কাছে থাকা অবস্থায় সে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল তার হৃৎপিণ্ডের প্রতিটি আঘাত। মেয়েটির নিজের শরীর কাঁপতে লাগল, নিঃশ্বাস হয়ে এলোমেলো। এই অদ্ভুত স্পর্শ তার ভেতরের চেনা জগতটাকে মুহূর্তেই তছনছ করে দিচ্ছে।

হঠাৎ করেই সংবিত ফিরল মেয়েটির। সে ছিটকে নিজেকে সরিয়ে নিল। এক মুহূর্তও আর সেখানে দাঁড়াল না, পেছনে ফিরে না তাকিয়েই তীরের বেগে দৌড়ে হারিয়ে গেল ঘন জঙ্গলের গহীন অন্ধকারে। বাঁধন ঝাপসা চোখে অপলক তাকিয়ে রইল তার চলে যাওয়ার পথের দিকে। প্রচণ্ড ব্যথার মাঝেও তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। সে কাঁপা গলায় বিড়বিড় করে বলল।

“তুমি যেই হও, তোমাকে একদিন আমার সামনে আসতেই হবে। আমি তোমাকে খুঁজে বের করবই।”

কথাটুকু উচ্চারণ করার শক্তিটুকুও যেন নিভে গেল, বাঁধন ওখানেই নিথর হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।

__________

পুরো ময়মনসিংহ শহর জুড়ে এখন যেন এক স্বস্তির নিঃশ্বাস বইছে। শহরের সব থেকে কুখ্যাত পাপিষ্ঠ আসামী কেভিন ধরা পড়েছে, আর এই খুশিতে চারদিকে রীতিমতো বিজয়ী উল্লাস চলছে। কাল রাতেই বিশাল পুলিশ বাহিনী জঙ্গল ঘিরে ফেলে কেভিনকে খাঁচায় বন্দি করে নিয়ে গেছে, আর ক্ষতবিক্ষত বাঁধনকে দ্রুত হাসপাতালে সরিয়ে নেওয়া হয়। রহমান পরিবারের সবাই হাসপাতালে ভিড় জমিয়েছিল, শুধু রূপা ছাড়া। সে কোনো এক অজানা কারণে নিজেকে বাড়িতেই বন্দি করে রেখেছে।

বিকেলের মিঠে রোদে বাঁধনকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ দিয়ে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। আকাশ অত্যন্ত সাবধানে নিজের কাঁধে ভর দিয়ে বাঁধনকে তার রুমে নিয়ে আসল। বিছানায় আধশোয়া করে বসিয়ে দিয়ে আকাশ পরম মমতায় বলল।

“তুই এখন একটু জিরিয়ে নে, শরীরটা অনেক ধকল গিয়েছে, এখন বিশ্রাম নিলে ভালো লাগবে।”

বাঁধন ফ্যাকাশে মুখে আকাশের দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ স্বরে জিজ্ঞেস করল।

“শান্তা ঠিক আছে?”

“হ্যাঁ ও একদম ঠিক আছে, কাল রাতেই অখিল নামের ওসি সাহেব নিজে দায়িত্ব নিয়ে ওকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে গেছেন।”

বাঁধন আর কথা বাড়াল না। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসছে। সে চুপচাপ বিছানের বালিশে মাথা হেলিয়ে চোখ বন্ধ করল। কিন্তু চোখ বন্ধ করতেই রাতের সেই ঘুটঘুটে অন্ধকার জঙ্গল আর রহস্যময়ী মেয়েটির উজ্জ্বল চোখ জোড়া বিদ্যুতের মতো তার মনের পর্দায় ভেসে উঠল। বাঁধন মুহূর্তেই চোখ খুলে আবার বন্ধ করল। তার বুকের ভেতর একটা অজানা কৌতূহল তোলপাড় শুরু করেছে। কেন জানি ওই মায়াবী চোখ জোড়া তার বড্ড চেনা লাগছে, যেন কোনো এক হারানো স্মৃতির পাতায় এই দৃষ্টি সে আগে থেকেই চেনে। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও সেই চেনা মুখটা সে মনে করতে পারছে না।

অস্থিরতায় আর যন্ত্রণায় বাঁধন নিজের মাথায় হাত দিয়ে চেপে ধরল। আকাশ তাকে কুঁকড়ে যেতে দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে বলল।

“খুব মাথা ব্যথা করছে, টিপে দেবো কি?”

বাঁধন সামান্য মাথা নেড়ে না করল। তারপর অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে একটু গম্ভীর স্বরে বলল।

“তুই এখন যা আকাশ, আমি কিছুক্ষণ একা থাকতে চাই।”

আকাশ আর জোর করল না, নিঃশব্দে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। জানালার পর্দা ভেদ করে আসা বিকেলের মরা আলোয় বাঁধন একা পড়ে রইল তার একরাশ রহস্য আর সেই অদ্ভুত ভালোলাগার অনুভূতি নিয়ে। ওই মেয়েটি আসলে কে ছিল, কোনো অদৃশ্য রাণী, নাকি রক্তমাংসের কোনো মানুষ।

রূপার মনে আজ একদম শান্তি নেই, রুমে একা দম বন্ধ লাগছিল দেখে সে ক্যান্ডি কে কোলে নিয়ে ধীরপায়ে ছাদে উঠে এল। রেলিং ধরে আনমনে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল সে, বুকের ভেতরটা কেন জানি অজানাই এক অস্থিরতায় দুলছে।

ঠিক সেই মুহূর্তে রহমান বাড়ির সামনে একটা দামি গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে নামলেন দীর্ঘদেহী এক গম্ভীর বয়স্ক মানুষ, নাম তার হায়দার শেখ। তার ঠিক পিছন পিছন নেমে এল এক সুন্দরী তরুণী, মেয়েটি আর কেউ না, রূপার প্রিয় বন্ধু বৃষ্টি। বৃষ্টি ছাদে রূপাকে দেখতে পেয়ে নিচ থেকেই হাত নেড়ে হাই দিল, রূপাও ম্লান হেসে পাল্টা সাড়া দিল। বৃষ্টি তার বাবা হায়দার শেখের সাথে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল।

ড্রয়িং রুমে তখন হাজি রহমান আর আহসান রহমান বসে টিভি দেখছিলেন আর সাম্প্রতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলেন। হায়দার শেখ ঘরে ঢুকে সবার সাথে কুশল বিনিময় করলেন, বৃষ্টিও বড়দের সালাম দিয়ে মিষ্টি করে কথা বলল। হায়দার শেখ কিছুক্ষণ ইতস্তত করে হাজি রহমান আর আহসানের দিকে তাকিয়ে বললেন।

“আসলে আমি একটা বিপদে পড়ে আপনাদের কাছে এসেছি, যদি একটু সাহায্য করতেন?”

আহসান রহমান সোৎসাহে বললেন।

“অবশ্যই বলুন ভাইসাব, কী সাহায্য করতে পারি আমরা?”

হায়দার শেখ বৃষ্টির মাথায় হাত রেখে একটু চিন্তিত স্বরে বললেন।

“আসলে হুট করে সিলেটে আমার একটা বড় বিজনেস ডিল পড়েছে। আমাকে কিছুদিনের জন্য সেখানে যেতেই হবে। আপনারা তো জানেনই ওর মা নেই, বাড়িতে ও একদম একা। তাই আমি চাইছিলাম আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত ও আপনাদের বাড়িতে থাকুক, যদি আপনাদের আপত্তি না থাকে।”

হাজি রহমান হেসে উঠে বললেন।

“আরে হায়দার, এটা কেমন কথা, তোমার মেয়ে কি আমাদের বাড়ির মেয়ে না, ও তো আমার নাতনির মতোই। এর জন্য আবার অনুমতি নিতে হয় নাকি।”

আহসান রহমান চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে স্নেহের সুরে বললেন।

“বৃষ্টির যতদিন ইচ্ছে ততদিন এখানে থাকবে, দরকার পড়লে সারা জীবন থাকবে। কারণ ও আমারই মেয়ের মতো।”

কথাবার্তার মাঝেই হায়দার শেখকে নাস্তা দেওয়া হলো। তিনি কিছুক্ষণ গল্প করে বৃষ্টির মাথায় হাত বুলিয়ে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। বৃষ্টি তখন রূপার কাছে যাওয়ার জন্য সিঁড়ি দিয়ে তরতরিয়ে উঠতে লাগল। ঠিক সেই মুহূর্তেই আকাশ ফ্রেশ হয়ে, ফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিল। বৃষ্টি উত্তেজনায় ওপরের দিকে তাকাতেই ভুলে গেছে, তাই কেউ কাউকেই খেয়াল করল না।

হঠাৎ সিঁড়ির বাঁকে বৃষ্টি সজোরে আকাশের সাথে ধাক্কা খেল। ধাক্কার চোটে সে ভারসাম্য হারিয়ে পিছন দিকে হেলে পড়ে যেতেই নিল। আকাশ চোখের পলকে বৃষ্টির কোমর জড়িয়ে ধরে পতন থেকে রক্ষা করল। বৃষ্টি ভয়ে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল, আর আকাশ মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর বৃষ্টিকে সোজা করে দাঁড় করিয়ে একটু বিরক্ত স্বরে বলল।

“চোখ কি পকেটে থাকে, দেখে চলতে পারো না।”

পরিচিত পুরুষালি কণ্ঠস্বরে বৃষ্টির বন্ধ চোখের পাতা কাঁপল। চোখ মেলে সামনে আকাশকে দেখে সে এক ঝটকায় দুই পা পিছিয়ে গেল। বৃষ্টির বুকের হার্টবিট আবার ধকধক করে বাড়তে শুরু করেছে। তাকে চুপ করে থাকতে দেখে আকাশ বৃষ্টির চোখের সামনে তুড়ি বাজিয়ে বাঁকা হেসে বলল।

“ওহ হ্যালো, এই যে মিস, শুনছেন, চোখ নামান, ওভাবে চেয়ে থাকলে মাছি ঢুকে যাবে তো।”

বৃষ্টি চমকে উঠে ঘোর থেকে বের হলো। তারপর আমতা আমতা করে নিচু স্বরে সালাম দিল।

“আসসালামু আলাইকুম স্যার, আসলে সরি, আমি একদম খেয়াল করি নাই।”

আকাশ হালকা একটু গম্ভীর হয়ে বলল।

“ইট’স ওকে, তবে নেক্সট টাইম থেকে দেখে চলবে, মনে থাকবে।”

বৃষ্টি শুধু নিচু হয়ে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। আকাশ আর কোনো কথা না বাড়িয়ে ফোন স্ক্রল করতে করতে নিচ তলায় নেমে গেল। বৃষ্টি বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ধকধক করতে থাকা বুকটাকে শান্ত করার চেষ্টা করল, তারপর সিঁড়ি ভেঙে ছাদে উঠে এল। রূপা তখনো রেলিং ধরে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিল। বৃষ্টি পা টিপে টিপে একদম পিছনে এসে রূপার চোখ দুটো হাত দিয়ে চেপে ধরল।

রূপা মোটেও চমকাল না, বরং ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল।

“হয়েছে, আর চোখ ধরতে হবে না, আমি ভালো করেই জানি এইটা আমার মেঘ থেকে নেমে আসা বৃষ্টিই হবে।”

বৃষ্টি হাত ছেড়ে দিয়ে রূপার পাশে গিয়ে দাঁড়াল এবং একটু অভিমানের সুরে বলল।

“আমাকে দেখেও তুই নিচে নামলি না কেন রে।”

রূপা শান্ত গলায় উত্তর দিল।

“কারণ আমি জানতাম যে তুই নিজে থেকেই এখানে আসবি।”

বৃষ্টি এবার হাসিমুখে বলল।

“তোর জন্য একটা বড় সারপ্রাইজ আছে রূপা।”

“কী সারপ্রাইজ।” রূপা কৌতূহলী চোখে তাকাল।

“আমি কিছুদিন তোদের বাসাতেই তোর সাথে থাকব।”

“সত্যি বলছিস।”

“একদম সত্যি, সত্যি সত্যি তিন সত্যি।”

রূপা খুশিতে আত্মহারা হয়ে বৃষ্টিকে জড়িয়ে ধরে বলল।

“উফ, দারুণ হবে, আমরা অনেক অনেক গল্প করব।”

বৃষ্টি রূপার আলিঙ্গন থেকে নিজেকে একটু ছাড়িয়ে নিয়ে রহস্য করে বলল।

“গল্প তো অবশ্যই করব, তবে তার আগে আমি তোর ওই অহংকারী ভাইকে একটু দেখব।”

রূপা অবাক হয়ে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলল।

“অহংকারী ভাই মানে, তুই কার কথা বলছিস।”

বৃষ্টি ঠোঁট উল্টে উত্তর দিল।

“আর কার আবার, আমি বাঁধন ভাইয়ার কথা বলছি।”

#চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply