Golpo romantic golpo প্রেমবসন্ত প্রেমবসন্ত সিজন ১ প্রেমবসন্ত সিজন ২

প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৬৯


#প্রেমবসন্ত_২ ।৬৯।

#হামিদা_আক্তার_ইভা_Hayat

চোখের পলকে কেমন করে যেন সুন্দর মুহূর্ত গুলো কেটে যায়। আজ অর্ণদের ঢাকায় ফিরে যাওয়ার দিন। সবাই গোছ-গাছ করতে ব্যস্ত হয়েছে। কায়নাতের মনটা ভীষণ ভালো। এখানে এসে অনেক জায়গায় ঘুরেছে সে। উঁচু পেটটা নিয়ে টইটই করেছে বাবুর বাবার সাথে। অর্ণ লাকেজে দুজনের জামা-কাপড় ভরছিল। কায়নাত পা দুটো মেলে দিয়ে বালিশে হ্যালান দিয়ে শুয়ে ছিল, হঠাৎ চিৎকার করে উঠল। অর্ণ আতঙ্কিত হয়ে ছুটে গেল ওর কাছে।

“কী হলো? পেটে ব্যথা করছে? চিৎকার করলে কেন?”

কায়নাত শরীরের গোল জামা টেনে উপরে উঠাল। উঁচু পেট টা উন্মুক্ত করতেই অর্ণ দেখল কায়নাতের ছোট্ট পেটে বাচ্চা নড়াচড়া করছে। কায়নাত পেটে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল,

“ও বাবাকে ডাকছে।”

অর্ণ নিজের হাত গুটিয়ে নিল। বলল,

“আমি ছুঁলে ও ব্যথা পাবে।”

কায়নাত কপাল কুঁচকে ফেলল। বলল,

“ব্যথা পাবে কেন? আপনি ধরুন ওকে।”

অর্ণ শুকনো ঢোক গিলল। বাচ্চাটা যেখানে নড়াচড়া করছে সেখানে কম্পিত হাতে স্পর্শ করল। অর্ণর চোখ ছলছল করে উঠল। কায়নাতের উঁচু পেটে খুব যত্ন করে চুমু খেল একবার। সেখানে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“বাবার বুকে আসার জন্য আপনি এত ব্যাকুল? আপনি এমন করলে আমি লোভ সামলাব কী করে বাবা?”

কায়নাত গাল খানা ফুলিয়ে বলল,

“শুধু বাবার বুকে আসবে বলে ব্যাকুল কে বলল শুনি? পেটে ধরেছি আমি, কষ্ট করে জন্মও দেব আমি আর সব সুখ আপনার?”

অর্ণ কায়নাতের পেটে নাক ঘষে বলল,

“আমি না থাকলে পেটে এই পুঁচকে কী করে আসত শুনি?”

“বাজে কথা বলে আমার মেজাজ খারাপ করবেন না। জামা নিচে নামিয়ে দিন।”

অর্ণ কায়নাতের জামা নিচে নামাতে গেলে চোখ যায় কায়নাতের পেটের চারপাশে। চামড়া ফেটে দাগ হয়ে গেছে চারপাশে। অর্ণর চোখে ভেসে উঠল কায়নাতের চিকন ফরসা পেট। সেই আগের শরীর আর এখনকার শরীরের মধ্যে কত তফাৎ। কায়নাতের কষ্ট ভেবে খারাপ লাগল তার। অর্ণ চুপচাপ জামা নামিয়ে দিয়ে কায়নাতের কাপড় বের করে বলল,

“উঁচু পেট নিয়ে হাঁটা-চলা করতে তোমার খুব কষ্ট হয় না? বাড়িতে গিয়ে একদম ঘরের বাইরে বের হবে না।”

বলতে বলতে অর্ণ নিজেই কায়নাতের কাপড় চেঞ্জ করে দিতে শুরু করল। কায়নাত বলল,

“দাদি বলেছে, বেশি বেশি হাঁটা-চলা করতে আর একটু-আধটু কাজও করতে তাহলে শরীর ফিট থাকবে। সারাদিন এত শুয়ে-বসে থাকলে শরীরে পানি আসবে।”

কায়নাত নিজের ফোলা ফোলা হাত দুটো অর্ণর সামনে ধরে বলল,

“এই দেখুন, বেলুনের মতো ফুলে গেছি আমি। আমাকে আদি হাতি বলেছে।”

অর্ণ ততক্ষণে ওর কাপড় চেঞ্জ করে ফেলেছে। মাথার বড় চুল গুলোয় চিরুনি গেঁথে বলল,

“আমার এই চোখে বিশ্বের সব চেয়ে সুন্দরী তুমি। সে তুমি মোটা হও কিংবা চিকন—তুমি পুরোটাই তো অর্ণ চৌধুরীর।”

কায়নাতের গোল গোল গাল লাল হলো একটু। অর্ণ ওকে লজ্জা পেতে দেখে গালে টুপ করে চুমু খেল। কায়নাত লজ্জায় জড়িয়ে ধরল ওর কোমর। হেসে ফেলল অর্ণ। জোর করে ওর মুখ মুখো-মুখী করে বলল,

“এত লজ্জা কোত্থেকে আসে শুনি? এখনো লজ্জা লাগে আপনার? আমার মতো বীরপুরুষ আপনার লজ্জা ভাঙাতে পারিনি?”

“আপনি যা-তা। আমায় লজ্জা কেন দিচ্ছেন?”

“তোমায় ছাড়া আর কাকে লজ্জা দিব? বাইরের মহিলাদের?”

“আপনার মাথা ফাঁ টাব আমি।”

এমন খুনশুটি তাদের লেগেই থাকে সব সময়। স্বামী হিসেবে অর্ণ যেন পারফেক্ট। প্রেগন্যান্সির এখন অব্দি অর্ণ যেভাবে তার যত্ন নিয়েছে তেমন করে আর কেউ কখনো নিয়েছে কিনা তাতে ওর সন্দেহ আছে। মাঝরাতে মাঝে-মধ্যে কায়নাতের ঘুম ভেঙে যায়, তখন অর্ণ বউয়ের সঙ্গ দিতে নিজেও বাকি রাত জেগে থাকে সারাদিন অফিস সামলে। কায়নাতের সব কাজও এখন অর্ণই করে। গোসলের কাপড়টা অব্দি এই লোক ধুইয়ে দেয়। এত ভালোবাসা নিয়ে সে এই দুনিয়ায় থাকতে পারবে? মিলি বেগমের যখন পেটে ব্যথা হলো, কায়নাত দেখেছিল মায়ের কষ্ট। মাকে দেখে মনে হচ্ছিল কেউ তার পাঁজরের হাড় গুলো একটা একটা করে হাতুড়ি দিয়ে ভাঙছে। তার যদি কিছু হয়ে যায়? কায়নাতের ঘাম ছুটে গেল কপাল জুড়ে।

•••

আবার সেই ব্যস্ত শহরের ব্যস্ত জীবনে ফিরে এলো সবাই। সকল আনন্দ, আপন মানুষ ছেড়ে নুসরাত গেল শ্বশুর বাড়ি। অর্ণরা এলো চৌধুরী বাড়ি। বাড়িতে এসে দেখল অর্ণর নানি বেলি বেগম এসেছেন। কায়নাতকে পেয়েই বকা-ঝকা শুরু করেছেন। এই শরীর নিয়ে অমন একটা জায়গায় যাওয়া কত রিস্কের ব্যাপার। কায়নাত চুপচাপ মাথা নিচু করে নানির বকা শুনছে। হাতে ইয়া বড় একটা আচারের বয়ম। কোত্থেকে আয়মান উড়ে এসে ধপ করে বড় ভাবির পাশে বসে কায়নাতের হাতের বয়ম থেকে আচার নিয়ে নানিকে বলল,

“বেশি করে বকে দাও নানি। ভাবি আমাদের একটা কথাও শোনে না, উল্টো সারাদিন আমাকে বকে।”

কায়নাত চোখ রাঙিয়ে বলল,

“আপনি বাজে কথা বলছেন কেন? আমি কখন আপনাকে বকেছি?”

“ভাইয়াকে দিয়ে বকা কে খাইয়েছে?”

“সে তো আপনি বকা খাওয়ার কাজ করেছেন বলে বলেছিলাম একটু আদর দিয়ে বোঝাতে। কে জানত আপনার ভাই আপনাকে ওভাবে ঘরের দরজা আটকে মারতে যাবে।”

“একটুও শরম করছে না ভাবি? আমার মত এত বড় একটা ছেলেকে এভাবে ঘুরতে গিয়ে মার খাইয়ে আবার বড় গলা করে বলছেন এসব!”

কায়নাত আচারের বয়ম সরিয়ে চোখ পাঁকাল।

“আপনি আমার সাথে ঝগড়া করতে এসেছেন? আবার কিন্তু উনাকে বলে মার খাওয়াব!”

নানি বললেন,

“থাম তোরা। এত বড় বড় ছেলে-মেয়ে কিভাবে ঝগড়া করছে দেখো! মানুষ দেখলে কী ভাববে?”

অর্ণ সিঁড়ি দিয়ে তখন নামছিল। নানির কথা কানে এলে বলে,

“ বাড়ির সব বাঁদরদের সাথে থাকতে থাকতে আমার বউটাও একটা বেয়াদব বাঁদর হয়েছে। এদের চিড়িয়া খানায় দিয়ে এলে কেমন হয় বলো তো নানি?”

আয়মান বলল,

“আমাদের কী ভিন্ন গ্রহের প্রাণী মনে হয়?”

“অস্বীকার করছিস?”

বলতে বলতে এগিয়ে এলো সে। কায়নাতের পাশে ওকে বসে থাকতে দেখে দাঁত চেপে বলল,

“আবার ওর কাছে গিয়েছিস? ওঠ ওখান থেকে!”

আয়মান মুখ কালো করে অন্য পাশের সোফায় গিয়ে বসল। কায়নাত তখন আচার রেখে দিয়েছে অর্ণকে দেখে। এত বেশি আচার খেতে বারণ করেছিল অর্ণ। ঘরের মধ্যে পুরো একটা দোকান বানিয়ে ফেলেছে কায়নাত। অর্ণর হয়েছে যত জ্বালা। জীবনে যেসব আচারের নামও শোনেনি ওইসব আচার অনলাইন ঘেঁটে ঘেঁটে অর্ডার করতে হয়।

রান্না ঘর থেকে সাঈমা এসে দুই ভাইকে দুই কাপ কফি দিয়ে গেল আর কায়নাতকে গরম দুধ। এমন সময় কলিং বেল বেজে উঠল। বেলি বেগম সাঈমাকে ডেকে দরজা খুলতে বললেন। সাঈমা দরজা খুলে দেখল পাশের বাড়ির একজন মহিলা এসেছেন তার নাতিকে নিয়ে। সাঈমা মুখ কালো করল মহিলাকে দেখে। মহিলা ভেতরে আসতে না আসতেই বেলি বেগমকে দেখে একগাল হেসে বললেন,

“কেমন আছেন মাওইমা? অনেকদিন পর দেখা হলো।”

বেলি বেগম হেসে উত্তর দিলেন,

“আল্লাহ ভালো রেখেছে। তোমার সঙ্গে এটা কে?”

“আমার নাতি। ছেলের ঘরে এই একটা মাত্র নাতি আমার। চাঁদের টুকরা।”

তিনি এসে বসলেন পাশেই। আয়মান সালাম দিল সঙ্গে কায়নাতও। অর্ণ চুপচাপ বসে রইল। মহিলা মেকি হেসে বলেন,

“বেহরুজ কই? তার সাথেই তো গল্প করতে এলাম।”

“বেহরুজ নিধি আর নিশাকে নিয়ে একটু বাইরে গেছে। চলেই আসবে একটু পর।”

“বেশ ভালো। তা অর্ণর বউয়ের খবর কী? ছেলে হবে নাকি মেয়ে? প্রথম বার ছেলে হওয়াই ভালো। তারপর দু’চারটে মেয়ে হলেও সমস্যা নেই।”

কায়নাত মুখ কালো করল এমন প্রশ্ন শুনে। অর্ণ কপাল কুঁচকে গমগমে গলায় বলল,

“বাচ্চা হলে পেলে দেবেন আপনি?”

“ওমাহ! কী বলছ এসব?”

“ছেলে-মেয়ে যাই হোক সেটা তো আমার ব্যাপার। ছেলে আর মেয়ের মধ্যে পার্থক্য কী?”

“শুধু শুধু রেগে যাচ্ছ তুমি। আজ-কাল কত বড়লোকদের দেখি বউ মেয়ে বাচ্চা জন্ম দিলে গ লা টি পে মেরে ফেলছে। তাই ভাবলা..”

অর্ণ তাকে থামিয়ে দিয়ে আশ্চর্য হয়ে বলল,

“অন্যদের সাথে আমাদের তুলনা কেন করছেন? কিছু সংখ্যক মানুষ অমানুষ বলে সবাই অমানুষ?”

কায়নাত অর্ণর হাতে হাত রেখে বলল,

“চুপ করুন না আপনি!”

বেলি বেগম অর্ণকে চুপ করাতে বললেন,

“কায়নাতকে নিয়ে তুমি বাগানে গিয়ে একটু হেঁটে এসো যাও।”

কায়নাত ভাবল সত্যি অর্ণকে এখান থেকে সরানো উচিত। আয়মান আর অর্ণকে নিয়ে সে একপ্রকার জোর করে বাইরে এলো। বাগানে না গিয়ে বের হলো বাড়ির বাইরে। সূর্য তখন ডুবুডুবু ভাব। কমলা রঙে রঙিন হয়েছে আকাশ। তুলোর মতো মেঘের নিচে উড়ে যাচ্ছে কতরকম পাখি। অর্ণর বিশাল হাতের মুঠোয় কায়নাতের ছোট্ট হাত। আয়মান আর অর্ণর মধ্যখানে সে। আয়মান ছোট একটা ব্যাগে কায়নাতের জন্য পানি আর খাবার নিয়ে ঘুরছে। বড় ভাইয়ের আদেশ না মানলে মেরে একদম মাটির নিচে গেড়ে রাখবে।

ওরা নীরব রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে একটু সামনে এগিয়ে এসেছে। কায়নাত কোমরে হাত দিয়ে বুড়ির মতো গুটি গুটি পায়ে এগোচ্ছে। অর্ণ থামল। কপাল কুঁচকে একবার দেখল ওকে। একদম অর্ণ কায়নাতের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কায়নাত ফ্যালফ্যাল করে তাকাল। অর্ণ হঠাৎ ঝুঁকে এলো ওর দিকে। কপালে গাঢ় একটা ভাঁজ ফেলে বলল,

“মিসেস চৌধুরীর হাঁটতে কী কষ্ট হচ্ছে? কোলে নিয়ে ঘুরব?”

আয়মান খুঁকখুঁক করে কেঁশে উঠল। কায়নাত অর্ণর কপালে হাতের আঙুল ছুঁইয়ে বলল,

“মি.চৌধুরী, আমার কষ্ট হচ্ছে কে বলেছে আপনাকে?”

“আমার মিসেসের পেটের ভেতর থেকে আমার বাচ্চা চিৎকার করে বলছে তাদের মায়ের খুব কষ্ট হচ্ছে।”

কায়নাত হতবাক হয়ে বলল,

“ওর কথা আপনি শুনতে পেয়েছেন?”

“পাব না? রক্ত তো আমারই।”

আয়মান বলল,

“ঠিকই আছে। পাবনার পাগল হলে যা হয় আরকি!”

আয়মানের মনে হলো দূর থেকে কেউ বা কারা যেন তাদের নাম নিয়ে ডাকছে। আয়মান ভ্রু কুঁচকে অর্ণর পেছনে তাকিয়ে দেখল লম্বা চওড়া এক দেহ বাতাসের বেগে দৌড়ে আসছে এদিকে আর ঠিক পেছনে এক রমণী। সে কে? বিলেত ফেরত সেই রমণী? জারা!

(কিশোরী কন্যা বইয়ের কাজ ধরেছি তো তাই একটু ব্যস্ত থাকি। আমি একদিন পর-পর গল্প দিচ্ছি তবু আপনাদের রিচ এত কমে যাচ্ছে কেন? আগামী পর্ব বড় করে দেব। সারপ্রাইস আছে।☹️💔)

#চলবে…?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply