Golpo romantic golpo প্রেমবসন্ত প্রেমবসন্ত সিজন ১ প্রেমবসন্ত সিজন ২

প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৬৭


#হামিদা_আক্তার_ইভা_Hayat

জানুয়ারির ভোরে সাজেক যেন এক রূপবতী তুষারশুভ্র রাজকন্যা, যে মেঘের চাদর গায়ে জড়িয়ে পাহাড়ের কোলে ঘুমিয়ে আছে। রুইলুই পাড়ার নির্জন বারান্দায় দাঁড়ালে মনে হয়, পায়ের নিচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে সাদা তুলোর এক অনন্ত নদী। পাহাড়ের চূড়াগুলো সেই মেঘ-সমুদ্রে ভাসমান নিঃসঙ্গ দ্বীপের মতো জেগে থাকে। ভোরের প্রথম আলো যখন কংলাক পাহাড়ের মাথায় এসে পড়ে, তখন কুয়াশা আর মেঘের লুকোচুরি খেলায় এক মায়াবী আবছায়ার সৃষ্টি হয়।বেলা বাড়ার সাথে সাথে যখন রোদের ঝিলিক পাহাড়ের গায়ে লাগে, তখন সেই হিমশীতল প্রকৃতি যেন প্রাণ ফিরে পায়। কিন্তু সন্ধ্যার সাজেক আবার অন্যরকম। যখন পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে কমলা রঙের সূর্যটা হারিয়ে যায়, তখন আকাশের নীলচে ক্যানভাসে হাজারো তারার মেলা বসে। কনকনে ঠান্ডায় আগুনের ওমে বসে আকাশের ওই নক্ষত্রপুঞ্জ দেখলে মনে হয়, মহাবিশ্বের কোনো এক আদিম নির্জনতায় পথ হারিয়ে ফেলেছি।

খানিকক্ষণ আগে কায়নাতরা এসে পৌঁছিয়েছে সাজেক। সাজেক ভ্যালির ‘মেঘপল্লী রিসোর্ট’-এ উঠেছে একেবারে। নিশাদের আসতে আসতে প্রায় বিকেল হবে আর এখন দুপুর। কায়নাত গাল ফুলিয়ে বিছানায় বসে আছে হাত-পা গুটিয়ে। কেউ তাদের সাথে আসেনি আদি ছাড়া। অর্ণ ওয়াশরুমে গেছে গোসল সারতে। এখন দুপুর ২টোর বেশি বাজে। ওয়াশরুমের ভেতরে আদিও আছে। মামু আর ভাগ্নে মিলে যুদ্ধ শুরু করেছে যেন। অর্ণ ওর মাথায় শ্যাম্পু দিয়ে মাথায় পানি ঢালতেই আদি চিৎকার করে উঠল। মামুর কোমর জড়িয়ে ধরে গলা ফা টিয়ে বলল,

“তুমি আমায় মে*রে ফেলতে চাইছ মামু? এত ঠান্ডা পানি দিয়ে আমায় গোসল কেন করাচ্ছ?”

অর্ণ গমগমে গলায় বলল,

“তোমার বাবা বলেছে তুমি গোসল করো না তিন দিনের বেশি হয়েছে। এখানে এসেও নোংরা হয়ে থাকবে? এমন করলে কিন্তু তোমাকে আমার মেয়ের জামাই বানাব না।”

ছোট্ট আদি মুখ কুঁচকে ফেলল।

“তোমার মেয়েকে মে*রে পানিতে চু’বিয়ে মা’রব আমি।”

“কত বড় সাহস! মেয়ে আমার দুনিয়ায় এখনও আসেইনি তার আগেই এমন হুমকি?”

“আমার বউ নিয়ে টানাটানি কেন করছ? তোমার বউ নিয়ে কিছু বলেছি আমি?”

“এই, তুমি বিয়ের কী বোঝো? এই বয়সে এত বউ পাগল হলে কী করে? সব স্বার্থর কাজ না?”

বিনিময়ে আদি মুখ বাঁকাল।

রিসোর্টটি ইকো-ফ্রেন্ডলি কাঠে তৈরি ত্রিকোণাকার কটেজের জন্য পরিচিত। রুমের ভেতরে পাহাড়ের আমেজ ধরে রাখতে বাঁশ ও কাঠের আসবাবপত্র ব্যবহার করা হয়েছে। জানালার ভারী পর্দা সরালেই আদিগন্ত পাহাড় চোখে পড়ে। রুমের সাথে থাকা কাঠের প্রশস্ত ব্যালকনিতে দাঁড়ালে সরাসরি মিজোরামের পাহাড়গুলো দেখা যায়। জানুয়ারি মাসে এখান থেকেই দেখা যায় মেঘের সমুদ্র, যা অনেকটা সাদা তুলোর সমুদ্রের মতো নিচ দিয়ে বয়ে যায়। মেঘপল্লীর অন্যতম আকর্ষণ হলো এর ইনফিনিটি সুইমিং পুল। পাহাড়ের কিনারে অবস্থিত এই পুলে নামলে মনে হয় নীল আকাশ আর মেঘের সাথে মিশে যাওয়া যাচ্ছে।

কায়নাত ঘরে বসে বসে সব লক্ষ্য করছিল। ওয়াশরুম থেকে দুজনকে বের হতে দেখে বলল,

“আর কতক্ষণ একা বসে থাকব আমি? আপুরা সবাই কখন আসবে?”

অর্ণ আদিকে বিছানায় দাঁড় করিয়ে বলল,

“ওরা বাসে আসছে, একটু তো সময় লাগবে বলো?”

কায়নাত ঠোঁট চওকা করে বলল,

“ও আচ্ছা। কিন্তু এখন আমার খেতে ইচ্ছে করছে। আপনি আমায় না খাইয়ে রেখেছেন কেন?”

আদি তাল মিলিয়ে বলল,

“তুমি যে গরিব সেটা আমি আগেই জানতাম। বাবাকে কল করে বলো টাকা পাঠাতে। আমার বাবা বড়লোক।”

অর্ণ রাগ দেখাল খানিক। কিছু সময়ের মধ্যেই খাবার এলো ঘরে। নিশাদের সাজেক পৌঁছাতে বিকেল হলো। কায়নাত উঁচু পেট নিয়ে উকি মারল নিশার ঘরে। নিশা সবে ফ্রেশ হয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েছে, এমন সময় কায়নাতকে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল,

“অমন করে দাঁড়িয়ে আছো কেন? ভেতরে এসো না?”

কায়নাত গুটি গুটি পায়ে ভেতরে প্রবেশ করে বলল,

“প্রেম কেন এলো না? নিধি আপু তো খুব খুশি হয়েছিল ঘুরতে আসার কথা শুনে।”

“ভাইয়ার ছুটি হবে না। হসপিটালে নাকি খুব চাপ আর নিধিও ভাইয়াকে ছাড়া আসবে না।”

“আমি তো সবার কথা ভেবে এই সময়ে আসতে রাজি হলাম। আজ আসার সময় কেন আমাকে বলল না?”

নিশা দুপা এগিয়ে আসে। কায়নাতের গাল দুটো টেনে দেয় খুব আদুরে হাতে।

“ভাইয়া জানে তুমি এসব জানলে নিজেও আসবে না। তাই আগে থেকে কিছু বলেনি। তবে হ্যা, ভিডিও কল করতে বলেছে।”

কায়নাত বিছানায় বসল। খুব সাবধানে পা গুটিয়ে আরাম করে পেটে হাত রাখল। সেথায় আঙুলের নরম স্পর্শ ছুঁয়ে বলল,

“স্বার্থ ভাইয়া যে আসবে আমি তো জানতাম না। সে কী সব জানে?”

নিশার প্রেমিকা বুকে চাপ লাগল খানিক। খুব তাড়াহুড়ো করে বলল,

“এসব কথা একদম মুখে আনবে না কায়নাত। ও জানতে পারলে যুদ্ধ লেগে যাবে ভাইয়াদের সাথে। বড় ভাইয়া এসব একদম সহ্য করবে না তোমার সামনে।”

“তাই বলে একটা মানুষকে এভাবে ঠকাবে? মানুষটা যে তোমায় ভালোবাসে।”

“আমি কী বাসি না?”

“আমি সেভাবে বলতে চাইনি। আদাল এসেছে মানে একাই গড়গড় করে সব উনার কানের কাছে গিয়ে গুনগুন করবে। ঝামেলা হলে আমার কাছে আসবে, আমি সামলে নেব।”

মেঘপল্লী রিসোর্টে নিজস্ব ইন-হাউস রেস্তোরাঁ এবং বারবিকিউ করার সুব্যবস্থা রয়েছে। রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে বললে তারা রাতে খোলা আকাশের নিচে বা নির্দিষ্ট জোনে আগুন জ্বালিয়ে ক্যাম্পফায়ারের বসার ব্যবস্থা করে দেয়। এই রিসোর্টটি পাহাড়ের একদম প্রান্তে অবস্থিত, যেখান থেকে মিজোরাম পাহাড়ের দুর্দান্ত প্যানোরামিক ভিউ পাওয়া যায়। রাতে চারপাশ যখন নিঝুম হয়ে আসে, তখন আগুনের মৃদু আলোয় দূরের পাহাড়ের অবয়ব আর মাথার ওপর খোলা আকাশ দেখা যায়।

কায়নাতের দেহটা অর্ণর শরীরে লেপ্টে আছে শীতের এক মোটা চাদরের ভেতর। স্বার্থ আর আদালের মধ্যখানে বসে আছে নিশা। শেহের আর নুসরাতের মাঝে আদি। আয়মান বেচারা একা একা জুস খাচ্ছে আর কাণ্ড দেখছে। শেহের উঠে গিয়ে মাংসের পিস গুলো উল্টে দিতে গেল। অর্ণও উঠে গেল কিছু সময় পর। স্বার্থ নিজের ফোনের ক্যামেরা অন করে কায়নাতের হাতে ধরিয়ে বলল,

“আমাদের কয়েকটা কাপল পিক তুলে দাও তো সোনা ভাবি। ছবি সুন্দর হলে তোমায় চকলেট কিনে খাওয়াব।”

কায়নাত কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,

“আমাকে কী বাবু মনে হয়? আমি চকলেট খাই না।”

“তাহলে আরেকটা বিয়ে করিয়ে দিব। ওই জামাই তোমার এই জামাইয়ের মতো গম্ভীর হবে না। সে নিশ্চয়ই খুব ঠান্ডা মেজাজের হ…”

বাকি টুকু উচ্চারণ করার আগে মুখের উপর একটা শুকনো স্যান্ডেল এসে পড়ল। অর্ণ তেরে আসছে তার দিকে। হাতে গরম রড উঁচিয়ে বলছে,

“তোর পাছার ছাল উঠাব আজ।”

স্বার্থ মুহূর্তেই লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। খালি পায়ে উলটো পাশে দৌঁড়ে গিয়ে চিৎকার করে বলল,

“প্যান্টের সাথে বেল্ট নেই সোনা। এভাবে দৌড়ানি দিলে প্যান্ট খুলে পড়ে যাবে।”

“তোকে আজ ল্যাংটা করেই পিটিয়ে ছাল তুলব আমি। পালাচ্ছিস কোথায়?”

আয়মান হাসতে হাসতে মাটিতে গড়াগড়ি শুরু করেছে। কায়নাত কপাল কুঁচকে ওদের অন্ধকারে ছোটা-ছুটি দেখছে। কিছুক্ষণের মধ্যে দুজন অদৃশ্য হলো। অর্ণ ওকে তাড়া করে কোন জায়গায় এসেছে নিজেও বলতে পারবে না। আশেপাশে কেউ নেই। এখান থেকে নীরব স্থানের পুরো চারপাশ দেখা যাচ্ছে। টিমটিম করে আলো জ্বলছে জায়গায় জায়গায়। স্বার্থ আশেপাশে একবার দৃষ্টি বুলিয়ে পকেট থেকে সিগারেট বের করল। অর্ণ জোরে জোরে শ্বাস ফেলছে। দুজন দুটো চেয়ার দখন করে বসল। অর্ণ ঘেমে যাওয়া চুল গুলো পেছন দিকে ঠেলে দিয়ে স্বার্থর হাত থেকে সিগারেট নিয়ে ঠোঁটের ভাঁজে গুঁজল। স্বার্থ আরেকটায় আগুন জ্বালিয়ে বলল,

“আবার খাওয়া শুরু করেছিস?”

“উহুম। ও পছন্দ করে না এসব।”

“এখন নিলি কেন?”

“অনেকদিন ধরে ছুঁয়ে দেখা হয় না। বাই দ্য ওয়ে, জায়গা টা বেশ সুন্দর। মনে আছে, রাহাকে নিয়ে কী হয়েছিল গতবার?”

“ওসব ভোলা সম্ভব? কলেজ লাইফটা খুব মিস করছি আমি। আমাদের গ্যাং কলেজের বেস্ট টিম ছিল ইয়ার। আফসোস হচ্ছে বয়স হওয়ায়।”

সে অনেক আগের কাহিনী এসব। অর্ণরা তখন এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেবার ঠিক করা হলো সব বন্ধু মিলে তিন দিনের ট্যুরে আসবে সাজেক। কথা মতো এসেওছিল এখানে। রাহা ছিল ওদের টিমের সব চেয়ে সুন্দরী মেয়ে। স্বার্থ বলতে পাগল সে। মজা করে কে যেন বলেছিল স্বার্থ তাকে ভালোবাসে আর এই কথার জের ধরেই রাহা প্রপোজ করার জন্য বিশাল আয়োজন করেছিল রিসোর্টে। সবাই যখন উপস্থিত হয় তখন সে নিজের মনের কথা জানায় স্বার্থকে। কিন্তু স্বার্থ মুখের উপর বারণ করে দেয়ায় জেদ ধরে একগাদা ঔষধ খেয়ে সুই*সাইড করার ট্রাই করে সে। পরে যখন সুস্থ হয় খানিক, ওর বাবা ওকে ঘর-জামাই হওয়ার প্রস্তাব দেয়। ওসব ভাবলেও ভীষণ হাসি পায় স্বার্থর। আজ নাকি রাহার তিনটা সন্তান। বিয়ে করে নিয়েছিল দুঃখ ভুলতে। অবশ্য পরিবার থেকেই নাকি মেয়ের পাগলামি দেখে ভালো ঘর দেখে বিয়ে দিয়ে দেয়। রাহার ভালোবাসা সত্য ছিল সেটা সবার জানা—তবে স্বার্থর সত্যিই কিছু করার ছিল না।

পুরনো কথা ভেবে স্বার্থ দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ওরা ফিরে যায় নিজেদের গন্তব্যে। ততক্ষণে বারবিকিউ হয়ে গেছে। ওরা সবাই একসাথে বসল। খাওয়া-দাওয়ার মাঝেই আড্ডা জমে উঠল। আদি বাবার বুকে বুক ঠেকিয়ে ঘাড়ে মুখ গুঁজে গভীর নিশ্বাস ফেলছে। ওরা ট্রুথ এন্ড ডেয়ার খেলবে বলে ঠিক করল। সাদা রঙের ছোট একটা কাচের বোতল নিয়ে এলো আয়মান। সেটা মাঝখানে ঘুরিয়ে দিলে প্রথমেই নিশার দিকে গিয়ে থামল। কায়নাত খুব আগ্রহ নিয়ে বলল,

“আমি দেব তোমায়। বলো কী নেবে?”

নিশা খুব ভেবে ডেয়ার নিল। কায়নাত দুষ্টু হেসে নিজের দু পা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“সালাম করো। সালামি দেব মোটা টাকার।”

শেহের হায়হায় করে বলল,

“ভুলেও এটা করো না। এই রাক্ষসী গত সপ্তাহে আমার ব্যাংক খালি করেছে।”

নিশা ওর কথা পাত্তা না দিয়ে চোখ টিপ মারল কায়নাতকে। সে এখানে আসার আগে থেকেই অর্ণর কাছে টাকা চাচ্ছিল কিন্তু অর্ণ দিতে নারাজ। তাই কায়নাত ওকে টাকা দেয়ার জন্য এমন বুদ্ধি করেছে। অর্ণ মুখ কালো করল। বউটা খুব চালাক। নিশাকে টাকা দেয়া মানে ২০ এর নিচে নামবেই না। নিশা এক প্রকার ঝাঁপিয়ে পড়ল কায়নাতের পায়ের কাছে। সালাম করলে কায়নাত ঘাড়টা উঁচু করে স্বামীর মুখটা দেখে। অর্ণ ইচ্ছে করে অন্য দিকে তাকিয়ে আছে। কায়নাত ওর পেটে গুতো মেরে বলে,

“শুনছ? তোমার ফোনটা একটু দেবে? বিকাশ থেকে আপুকে সালামি দেব।”

অর্ণ দাঁত চাপে। পটানোর জন্য আবার আদর করে ‘তুমি’ বলে ডাকা হচ্ছে। ও ফোন দিচ্ছে না বলে কায়নাত ফের বলে,

“দাও না! আমার বিকাশে টাকা শেষ। তুমি মাস শেষে টাকা পেলে আমি তোমায় তোমার টাকা ফেরত দিয়ে দেব।”

অর্ণ দাঁত কটমটিয়ে বলল,

“আর যে টাকা আমাকে ব্যাক দেবে সে টাকা কোত্থেকে পাবে তুমি?”

“কেন, তুমি দেবে। তোমার টাকা মানেই তো আমার টাকা।”

নুসরাত ঠোঁট টিপে হাসি আটকে রেখেছে। অর্ণ বাধ্য হয়ে ফোনটা কায়নাতের হাতে দিল। কায়নাত নিশার বিকাশে টাকা পাঠিয়ে বলল,

“এমন ভাবি পুরো দুনিয়া খুঁজলেও পাবে না, বুঝলে?”

নিশা খিলখিল করে হেসে উঠল। ফের বোতল ঘোরানো হলো। এবার অর্ণর সামনে গিয়ে থামল। স্বার্থ হৈহৈ করে বলল,

“তোকে আজ বাঘে পেয়েছি। বল কী নিবি?”

অর্ণ একটু ভাবল। কী যেন ভেবে ট্রুথ নিল। স্বার্থ বলল,

“বন্ধু মহলে কম বেশি সবাই কলেজ লাইফে প্রেম করেছে। তোর কলেজ লাইফের ক্রাশের নাম কী ছিল?”

অর্ণ খানিকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। কায়নাত খুব আগ্রহ নিয়ে তাকাল ওর দিকে। নিশা বলল,

“ভাইয়ার ক্রাশও ছিল নাকি? বাবা! কে সেই লাকি গার্ল?”

অর্ণ কায়নাতের দিকে আর তাকাল না। খুব নিচু স্বরে বলল,

“ক্রাশ বলতে কেউ ছিল না তবে বহু বছর আগে একটা বাচ্চা মেয়ের প্রেমে পড়েছিলাম। লম্বা কালো কেশ সেই মেয়ের আর দুধে আলতা গায়ের রঙ।”

শেহের কপাল কুঁচকে বলল,

“বাচ্চা মেয়ে? এই কাণ্ড আবার কবে ঘটল?”

“সে অনেক পুরনো কথা।”

কায়নাত মুখটা ভার করে ফেলল। খেলায় ব্যঘাত ঘটল তার উঠে পড়া দেখে। কায়নাত কষ্ট করে উঠে দাঁড়াল। কোমরে হাত রেখে হাঁটা শুরু করল ঘরের দিকটায়। আদাল বলল,

“ভাবি বোধহয় রাগ করেছে।”

অর্ণ কিছু বলল না। সেখানেই সমাপ্তি ঘটল খেলার। অর্ণ একটু দেরি করেই ঘরের সামনে এলো। মাঝে কেটেছে প্রায় ঘণ্টা খানিক। দরজায় শব্দ করলে কায়নাত ভেতর থেকে সাড়া দেয় না। ভয় পায় অর্ণ। উন্মাদের ন্যায় দরজায় জোরে শব্দ করে বলে,

“কায়নাত? দরজা খুলছ না কেন? এই মেয়ে, সাড়া দাও!”

প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে যায়। অর্ণ বুক ভরে শ্বাস নেয়। ঘরে ঢুকে বিস্মিত দৃষ্টি জোড়া স্থির হয় সামনে। কায়নাত কুচকুচে সবুজ রঙের একটা শাড়ি পরেছে। লম্বা চুল গুলো ছেড়ে দিয়েছে পিঠে। ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক আর চোখে গাঢ় কাজল। অর্ণর ডান হাত বুকের উপর উঠে আসে। সেথায় হাত ডলে বলে,

“মাশাআল্লাহ। পাগল হয়ে যাব মিসেস অর্ণ।”

কায়নাত মুখ বাঁকিয়ে পিছু ঘুরে। অর্ণ পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে ওর ছোট্ট শরীর। ঘাড়ে নাক ডলে বলে,

“শাড়ি পরেছ কেন এই ঠাণ্ডায়?”

কায়নাত আয়নায় অর্ণর বিশাল শরীরে নজর বুলায়।

“আপনি সিগারেট খেয়েছেন?”

অর্ণ ধরা পড়া চোরের মতো মিনমিন করে বলে,

“একটা টান দিয়েছিলাম।”

“ছাড়ুন আমায়।”

“সরি না?”

“আপনার শরীর থেকে গন্ধ আসছে।”

অর্ণ দৌঁড়ে যায় ওয়াশরুমে। ফ্রেশ হয়ে এসে দেখে কায়নাত ঘরে নেই। ছেলেটা তাড়াতাড়ি বারান্দায় যায়। সেখানে তীব্র ঠান্ডা বাতাসের মধ্যে কায়নাত দাঁড়িয়ে আছে এক কোণায়। ঠান্ডা লেগে যাবার ভয়ে অর্ণ তাড়াতাড়ি ছুটে যায়।

“এই ঠাণ্ডায় বাইরে বের হয়েছ কেন? ঘরে এসো।”

“ওই মেয়েটা কে ছিল?”

“কোন মেয়ে?”

“যার প্রেমে পড়েছিলেন।”

অর্ণ চেয়ে থাকে বধূর অভিমানী মুখের দিকে। জেলাস ফীল হয়েই তাহলে এই সাজ বউয়ের? অর্ণ দুপা এগোয়। ওর মুখো-মুখী হয়ে দাঁড়ায়। থুতমি খানা উচিয়ে নয়নে নয়ন মেলায়।

“সেই কিশোরী আমার প্রথম প্রণয়ের ঝড়। বেগুনি রঙের শাড়িতে তাকে প্রথম দেখেছিলাম চৌধুরী বাড়ির বাগানে। মাটিতে আমার বোনদের নিয়ে খেলছিল সেই কিশোরী। সে ভালোবেসে আমার নাম রেখেছিল শহরের লাটসাহেব।”

কায়নাত চোখ বড় বড় করে ফেলে মুহূর্তেই। নিষ্পলক চোখে দেখে স্বামীকে। তাহলে অর্ণ কী তার কথাই বলছিল তখন? কায়নাত নার্ভাস হয়ে তুতলিয়ে বলে,

“তা..তাহলে আপনি আমার কথা বলছিলেন?”

অর্ণ উত্তর দেয় না। কায়নাত অর্ণর মতো করেই বুকের বাঁ পাশে হাত ডলে। বিড়বিড় করে বলে,

“বুকে ব্যথা হচ্ছে।”

“তোমার বুকে কী হয়েছে?”

“খুব ব্যথা হচ্ছে। কে যেন এখানে সংসার গেড়েছে।”

অর্ণ ভ্রু কুঁচকে বলল,

“হু? কে সংসার গাড়ল?”

কায়নাত অর্ণর গাল দুই হাতের মুঠোয় নিয়ে চোখে চোখ রাখল। খুব আদুরে গলায় বলল,

“আমার বাচ্চার বাবা, চৌধুরী বাড়ির বড় ছেলে, আমার দাঁমড়া দেবরের বড় ভাই আর কায়নাত সুবাহর লাটসাহেব।”

অর্ণ ঠায় কায়নাতের চোখে ডুবে আছে। কায়নাত বাচ্চাদের মতো করে শব্দ করে চুমু খেল স্বামীর ললাটে। তারপর বুকে জড়িয়ে নিল সুঠাম দেহী পুরুষের অঙ্গ। কানের পিঠে ফিসফিসি গলায় বলল,

“তুমি, তুমি, তুমি আর তুমি। আমার এই অসুখের নাম তুমি। সকল ভালোবাসার নাম তুমি।”

(কেমন আছো পাখিরা? সবার শরীর ভালো তো? পাহাড় সম্পর্কে এত ধারণা নেই আমার। গুগল সার্চ করে যতটুকু পেরেছি লিখেছি। ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)

#চলবে…?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply