নদীর_ওপারে_সুখ#সিমরান_মিমি#পর্ব_০৪
নওশাদ মাহমুদ চৌধুরী ছিলেন ভীষণ রাগী। লোকমুখে শোনা যায়, তৎকালীন প্রজারা জমিদার ইসহাক মাহমুদের চেয়েও তার পুত্রকে ভয় পেয়ে চলতেন। নারী-পুরুষের অবৈধ সম্পর্ক, যাকে বর্তমান সমাজ প্রেমলীলা হিসেবে চেনে ; সেই প্রণয় ছিলো নওশাদের কাছে গুরুতর অপরাধ। এলাকায় সব যুবক-যুবতী তার ভয়ে তটস্থ ছিলেন। প্রায় কয়েকবার রাতের আধারে দেখা করতে আসা যুগলকে বন্দিও করেছিলেন। তিনি অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত হওয়া যুবককে ন্যাড়া করে জমিদার বাড়ির গেটের সামনে ঝুলিয়ে সারারাত ধরে বেধড়ক পেটাতেন। আর দোষী নারীর মুখে চুনকালি মাখিয়ে, হাত-পা বেঁধে কোমড় সমান পানির মধ্যে সারারাত বসিয়ে রাখতেন। ভোর হলে তাদের বিচার হতো এবং তারপর কাজী অথবা পুরোহিত ডেকে বিয়ে পড়িয়ে দেওয়া হতো। অথচ, একসময় জানতে পারলেন তার আদরের কন্যা’ই অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়েছে। ক্ষোভে ফেটে পড়ে তিনি সায়মা’র গায়ে হাত তোলেন। শিশুকাল থেকেই সায়মা বড্ড আদরের। আত্মসম্মানবোধ, জেদ, তেজ টুকু বোধহয় বাবার থেকেই পেয়েছিলো। সে কারনেই বাবার হাতের থাপ্পড়’টা অত্যন্ত গুরুতর ভাবে দাগ কেটে যায় । সে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে চাইলো। কিন্তু সফল হলো না। বাবা মেয়ের এই আত্ম দাম্ভিকতা মেনে নিতে না পেরে ঘরবন্দী করলেন। সঙ্গে ঠিক করলেন বিয়ে, সায়মার অমতেই। পুরো ঘটনাগুলো সায়মাকে তীব্রভাবে প্রভাবিত করেছিলো। ফলস্বরূপ, জমিদার মহলের প্রতিটা প্রাসাদ যেদিন বিয়ের খুশিতে ঝলমল করছিলো, সায়মা সেদিন সুযোগ পেয়ে পালিয়ে এলো শহরে, আতাউর রহমানের কাছে।
পুরো পরগণার সামনে এতো অপমান, অসম্মান, লান্ছনা সহ্য করতে পারলেন না নওশাদ। ঘৃণা নিয়ে সকলের সামনে ঘোষণা করলেন, মেয়েকে ত্যাগ করেছেন।
নওশাদের দুই পুত্র তখন ইতোমধ্যেই বিবাহিত। বখতিয়ার মাহমুদ এবং জ্যোতির কোলে তখন পাঁচ বছরের অনামিকা। বখতিয়ার মাহমুদ দাদা ইসহাক মাহমুদ এর মতো শান্ত, গম্ভীর, বুদ্ধিমান। সহজে আবেগ প্রকাশ করতে পারেন না। অন্যদিকে ছোট ভাই ইখতিয়ার মাহমুদ পেয়েছেন বাবা নওশাদের স্বভাব। একটুতেই রেগে- মেগে মাথা গরম করে ফেলে। একমাত্র আদরের ছোট বোন কে বাবা ত্যাগ করে দরজা বন্ধ করলেও তারা মায়া ভুলতে পারেনি। লোক লাগিয়ে সে রাতে সারা পরগণা খুঁজতে লাগলো। অবশেষে, যখন খুঁজে পেলো, তখন ইতোমধ্যেই সায়মা এবং আতাউরের বিয়ে হয়ে গেছে। সদ্যই পিরোজপুরের দিকে রওনা দিয়েছে তারা। বখতিয়ার আতাউর কে দেখে হতভম্ব হয়ে গেলেন। এই ছেলে তিনমাস হয়েছে তাদের গোডাউনে কাজ করছে । স্বভাব নষ্ট, চরিত্র ভালো না, এমনকি লোভী। তিনি আর্তনাদ করে উঠলেন, সায়মাকে বোঝালেন। কিন্তু ইখতিয়ার অতো সময় দিলেন না। টগবগে যুবক বোনের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হলেন। এরকম একটা দুশ্চরিত্র ছেলে তার বোনকে ফাঁদে ফেলে বিয়ে করেছে, একথা শুনে তিনি লোক নিয়ে গুরুতর ভাবে পেটালেন।
স্বামীর প্রতি ভাইদের বর্বর আচরণ দেখে স্তব্ধ হয়ে গেলেন সায়মা। ঢাল হয়ে দাঁড়ালেন সামনে। ভাইদের সঙ্গে তো ফিরলেনই না বরং সকলের সামনে অপমান, অপদস্ত করে আতাউরের হাত ধরে পিরোজপুরের গাড়িতে উঠেছিলেন।
বাবা-মেয়ে, ভাই-বোনের সম্পর্কের দূরত্ব এখান থেকেই শুরু হয়েছিলো। বখতিয়ার, ইখতিয়ার বোনকে আর খুঁজতে গেলেন না। এমনকি সায়মার দিক থেকেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি। সমাজের সকলের সামনে অপমানিত, অপদস্ত হয়ে নওশাদ নিজেকে একেবারে ঘরবন্দি করে ফেললেন। এর কিছুমাস পর তিনি মারা যান। ততদিনে সায়মাও আতাউর’কে চিনে ফেলেছেন। বাবা- ভাইদের এতো অপমান করে তিনি ঘর ছেড়েছেন, একথা রোজ তাকে পোড়াতো। লজ্জায়, ঘৃণায় পরিবারের কারোর সামনে দাঁড়ানো তো দূর, যোগাযোগ করারও চেষ্টা করেননি। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, এভাবে দুঃখে -কষ্টে জর্জরিত হয়ে পঁচে-গলে মরে গেলেও পরিবারের কাউকে আর মুখ দেখাবেন না। অন্যদিকে ভাইদের মনে তীব্র ঘৃণার উদয় হলো। সায়মার শোকে বাবা মারা গেছে, অথচ এতোগুলো দিনেও তেজ নিয়ে পরিবারের সঙ্গে বোন যোগাযোগ করেনি বলে তারাও আর বাবার মৃত্যুর সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করলেন না। এমনকি মৃত্যুর পূর্বে নওশাদ বলেও গেছিলো, সে মারা গেলেও যেনো তার মুখ সায়মাকে না দেখানো হয়। এরপর? এরপর এভাবেই কেটে যেতে লাগলো বছর। বাবার মৃত্যুর ছ-মাসের মাথায় বখতিয়ার এবং ইখতিয়ার ঢাকায় এলো। বাবার গড়ে তোলা কারখানা ধীরে ধীরে আরো বড় করতে লাগলো। এর এক বছরের মধ্যে জমিদার বাড়ি ছেড়ে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বাস করতে লাগলেন ঢাকায়। মানুষ অভ্যাসের দাস। তাই সময়ের সাথে সাথে তারা দুঃখকে ভুললো। যদিওবা সিনিওরা মাহমুদ প্রায়শই কাঁদতেন মেয়ের জন্য, বলতেন একটু খোঁজ নিতে। কিন্তু বখতিয়ার তা করেননি। তীব্র অভিমান নিয়ে বলেছেন, সায়মা যদি আমাদের ভুলে থাকতে পারে – তাহলে আমরাও পারবো।
“ সায়মা তোমার মা? ”
নিভি নত মস্তকে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। ইখতিয়ার আপ্লুত হয়ে বিছানায় বসলো, নিভি’র পাশে। দু চোখ ভরে দেখলো ভাগ্নী’কে। অবশ্য সে ওই চেহারার মধ্যে নিজের প্রিয় বোনকে খুঁজছে। নিভি’র নাক, চোখ, কথা বলার ভঙ্গিমা এমনকি গায়ের রঙটাও সায়মার মতো। ইখতিয়ারের ইচ্ছে করছে ভাগ্নীকে একটু বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু নিভি অসস্তি বোধ করতে পারে ভেবে তা করলো না। বললো,
“ মামণি, তোমার নাম কি? ”
“ জি, নিভি রহমান। ”
“ পড়াশোনা করো। ”
“ জি! ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষ। ”
নিভির জড়তা দেখে ইখতিয়ার মৃদু হাসলো। এরপর পরিচয় দিয়ে বললো,
“ আমি তোমার ছোটো মামা হই। চিনেছো? ”
নিভি চিনতে পারলো না। তবুও মাথা নাড়িয়ে বললো,
“ চিনেছি। ”
ধীর পায়ে অনামিকার রুমে প্রবেশ করলেন বখতিয়ার মাহমুদ। অনামিকা বাবাকে দেখে সিঙ্গেল সোফা’টা টেনে বসতে দিলো।
“ আমরা কাল পিরোজপুর যাচ্ছি। সায়মার কবরটা অন্তত জিয়ারত করতে চাই। ”
বলেই দীর্ঘশ্বাস ফেললেন বখতিয়ার মাহমুদ। নিভি চিন্তিত হলো । মামা’রা বাড়ি যেতে চাইছে এর মানে তাকেও যেতে হবে। তবে তারা নিভিকে আবার সেখানে রেখে আসবে। আশ্রয়ের কথা এখনো তো বলাই হয়নি। ভেবেছিলো দু-তিন থাকার পর ধীরে ধীরে খুলে বলা যাবে। বখতিয়ার মাহমুদ নিভির অপ্রস্তুত মুখশ্রী নিমিষেই ধরে ফেললেন। বললেন,
“ তুমি কি নিয়ে এতো দুশ্চিন্তা করছো মা? আমাদের কি ভয় পাচ্ছো? ”
“ না না। ভয় পেলে কি এতোদুর আসতাম, আপনাদের কাছে? ”
“ আচ্ছা, তোমার বাবা কোথায়? আমাদের কাছে আসতে বাঁধা দেয়নি? “
অবশেষে নিভি’র আশ্রয়হীনের কথা স্বীকারোক্তির সময় এসেছে। সে নিচু কন্ঠে বললো,
“ বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। সে আমাদের কাছে থাকে না, চট্রগ্রামে আছে। ”
বখতিয়ার, ইখতিয়ার, অনামিকা প্রত্যেকেই স্তব্ধ চোখে চেয়ে রইলো। ইখতিয়ার হুশ হারিয়ে ফেললেন। চিৎকার করে বললেন,
“ ওইই অমানুষটা যে চরিত্রহীন, তা আমি শুরুতেই বলেছিলাম। সায়মা আমার কথা শুনলো না। অমানুষটার হাত ধরে জাহান্নামে চলে গেলো। ভাইজান, আমি বুঝতে পেরেছিলাম – সায়মা ভালো নেই। ও ভালো থাকলে ঠিকই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতো। আমি চিনি তো আমার বোনকে। যেচে ভুল করেছে বলে লজ্জায় আর আমাদের কাছে ফিরে আসেনি। কত কষ্টই না করেছে। ইয়া আল্লাহ ! কেনো যে খুঁজলাম না?”
বখতিয়ারের সন্দেহ দৃঢ় হচ্ছে। তিনি চোখ বন্ধ করে নিজেকে সামলালেন। নিভি’র উদ্দেশ্যে সরাসরি প্রশ্ন করলেন,
“ নিভি, আমাকে সবটা বলো। তুমি কেনো এতো ঘাবড়ে আছো? ওই অমানুষ’টা কি তোমায় কোনো ভাবে ভয় দেখিয়েছে? হুমকি দিয়েছে? কি নিয়ে এতো দুশ্চিন্তা করছো, তুমি আমায় বলো। ”
এ বাড়িতে আসার পর থেকে নিভি অনুভব করেছে মামারা খারাপ লোক নন। মনে চেপে রাখা তীব্র অভিযোগটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। সে একটু একটু করে সাহস পাচ্ছে। বুকের ভেতর পুষে রাখা অনিশ্চয়তা টুকুকে সম্পূর্ণরুপে তুলে ধরলো মামাদের কাছে। ফুঁপিয়ে উঠে বললো,
“ বাবা বিয়ে করেছেন আট বছর। আমি আর মা জানতাম সে চাকরি করছে চট্টগ্রামে। সেদিন মায়ের অসুস্থতা শুনে বাবা বিরক্ত হয়ে স্বীকার করেছে, সে বিয়ে করেছে। আমাদের কোনো টাকা দিতে পারবে না। এরপর রাতে মা আরো অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সারারাত চোখের সামনে ছটফট করতে করতে ভোররাতের দিকে মারা গেলেন। আমি বুঝতে পারি নি। গত দু বছর ধরেই তো প্রতি রাতে যন্ত্রণায় ছটফট করেন। মায়ের যেদিন মিলাদ হলো, সেদিন আমার মেঝো চাচী বললেন – বাবা নাকি আরো দু তিন বছর আগে ভিটে-মাটি সব তাদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। মা অসুস্থ ছিলো বলে, তারা দয়া করে এতোদিন কিছু বলেনি। এখন আর দয়া করতে পারবে না। ঘর ভেঙে বড় করে নতুন ঘর উঠাবে। আমাকে বললো, অন্য কোথাও চলে যেতে। তারা রাখতে পারবে না। বাবাকে ফোন করেছিলাম, সে সিম বন্ধ করে দিয়েছে। ছোটো চাচার সঙ্গে যোগাযোগ নেই দীর্ঘ আট বছর। মেঝো চাচা আপনার নাম বলে বললো, আপনার কাছে আসতে। তাই লক্ষীপুর গেছিলাম। সেখানে কাউকে পাইনি। দরজায় তালা দেওয়া। এক ভদ্রমহিলার কাছ থেকে আপনাদের ঠিকানা নিলাম। এরপর সেই রাতেই বাসে উঠি। এখন আপনারা আশ্রয় না দিলে কোথায় যাবো, সেটা নিয়েই চিন্তা করছিলাম । “
নিভি হু হু কাঁদছে। দুহাতে ওড়না খামচে ধরে থামার চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে না। কান্নার বেগে থেমে থেমে শরীর কেঁপে উঠছে। অনামিকা ছুটে গিয়ে তার পাশে বসলো। দুহাতে জড়িয়ে ধরে বললো,
“ এইই নিভি, কাঁদছো কেন? কে বলেছে আমরা তোমায় রাখবো না? তুমি আমার কাছে থাকবে। সারাজীবন থাকবে। কেউ কিচ্ছু বলবে না। ”
বখতিয়ার নিঃশ্বাস নিতে পারছেন না। কষ্ট হচ্ছে ভীষণ। তিনি দ্রুত রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। সন্তানদের সামনে কাঁদতে পারবেন না। ইফতেখারও তার পিছনে বেরিয়ে গেলেন। নিজেকে সামলাতে না পেরে আছড়ে পড়লেন কান্নায়। বললেন,
“ ভাইজান, আমি সহ্য করতে পারছি না। আমার মনে হচ্ছে সায়মা কাঁদছে। ”
বখতিয়ার আফসোসে পুড়তে লাগলেন। সায়মা তো তার সন্তানের মতোই ছিলো। তার বড়ছেলে হিমাদ্রি’র বয়স যখন বারো , সায়মা তো তখন ষোলো বছরের মাত্র। এতো বছর পর একটা বোন হয়েছে বলে দু – ভাই কাঁধে তুলে সারা গাঁয়ে ঘুরতেন। অথচ তার এতো দুর্দশা কিভাবে মেনে নেবেন? নিভি’কে দেখে মনে হচ্ছে সেই ষোলো বছরের সায়মা। ইখতিয়ার হঠাৎ ফুঁসে উঠলেন। প্রতিশোধ স্পৃহা নিয়ে বললেন,
“ ওই অমানুষটা এতো নির্যাতন করেছে সায়মাকে। ওকে আমি কেটে টুকরো টুকরো করবো। ”
বখতিয়ার শান্ত হলেন। ভাইকে বুঝিয়ে বললেন,
“ দিনশেষে ওই অমানুষ টাই নিভির বাবা। মেয়েটা সহ্য করতে পারবে না। ওর বিচার আল্লাহ করবে। ”
বখতিয়ার মাহমুদ কিছুক্ষণ চেয়ারে বসে নিজেকে সামলালেন। এরপর ছোট ভাইকে নিয়ে বড় বড় পা ফেলে ড্রয়িংরুমে নামলেন। লিখন এবং পান্না সোফায় বসে গেম খেলতে ব্যস্ত । জ্যোতি, নাতাশা এবং বাড়ির হেল্পিং হ্যান্ড তানজিলা বেগম তখন রান্না ঘরে। ইখতিয়ার হাঁক তুলে প্রত্যেককে ডাকলেন৷ জ্যোতি আঁচলে হাত মুছে এগিয়ে এলেন। তার পিছু বাকিরাও এলো। বখতিয়ার সোফায় বসলেন না। সকলের উদ্দেশ্যে বললেন,
“ নিভি এখন থেকে এ বাড়িতে থাকবে। অনামিকা, পান্নার মতোই মেয়ে হিসেবে থাকবে। কারোর কোনো আপত্তি আছে? ”
সেঁজুতি ভ্রুঁ কুঁচকে ফেললেন। “ এটা কি বললেন ভাইজান? সায়মা আপার মেয়ে আমাদের সঙ্গে থাকবে, এ নিয়ে আপত্তি থাকবে কেন? ”
“ আমি জানি তোমাদের আপত্তি নেই। থাকলেও আমি শুনবো না। তবে মনে রেখো, এ বাড়িতে নিভি যেনো মেয়ে হিসেবেই থাকে। ওর যেনো কখনো নিজেকে এ বাড়ির নাতনি না মনে করে। ”
“ আমারো একই কথা। ”
ইখতিয়ার গলা ছেড়ে বললেন। নিভী ঢোক গিললো। দরজার কাছে এসে সকল কথাপকোথন সে শুনেছে। অস্থির হয়ে অনামিকাকে বললো,
“ আল্লাহ! মামা’রা এমন হাঁক-ডাক করছে কেন? আমাকে যদি মামী’রা খারাপ ভাবে? ”
হেঁসে ফেললো অনামিকা। বললো,
“ তোমার মামা’রা এমনই। এক কাপ চা চাইতে গেলেও পুরো বাড়ি ফাটিয়ে চিৎকার করে ওঠে। জমিদার বংশ তো। গলা বড়! ”
বখতিয়ার পুণরায় তানজিলা বেগমকে ডাকলেন। বললেন,
“ আপনি অনামিকার রুমের পাশের রুম’টা পরিস্কার করে দিন। ওখানে নিভি থাকবে। ”
হতভম্ব হয়ে গেলো নিভি। এতো আথিতেয়তা তার হজম হচ্ছে না। মনে হচ্ছে সবেতে বেশি বেশি। এতো আহ্লাদ দেখালে চাচীদের মতো যদি মামীরাও রেগে যান। তখন শেষ আশ্রয় টাও তাকে হারাতে হবে। তার বলতে ইচ্ছে করলো, সে অনামিকার সাথে ঘুমাবে। পরক্ষণেই মনে পড়লো পান্নার কথা। সকালে মেয়েটা ভীষণ বিরক্ত হয়েছে, নিভি ঘুমাবে শুনে। সত্যিই তো, এক বিছানায় তিনজন থাকলে অনামিকা, পান্না দুজনেরই কষ্ট হবে। যা সে চায় না। নিভির নিস্তব্ধতার মধ্যেই অনামিকা চেঁচিয়ে উঠলো। বাবার উদ্দেশ্যে বললো,
“ একদম না। আলাদা রুম দিলেও, রাতে নিভি আমার সঙ্গে ঘুমাবে। ”
“ না! আমার নাতনি আমার সঙ্গে ঘুমাবে। ”
সিনিওরা ধীর পায়ে হেঁটে ড্রয়িংরুমে এলেন। তার রুম নিচতলায়। বৃদ্ধ বয়সে সিঁড়ি বেয়ে নামতে কষ্ট হয় বলেই তিনি নিচে আছেন। অথচ দোতলা তার পছন্দের। বসন্ত কালে জানালা মেলে দখিনা হাওয়া খেতে কার না ভালো লাগে? তিনি এসে সোফায় বসলেন। দোতলায় অনামিকার রুমের দিকে তাকিয়ে নিভিকে বললেন,
“ এদিকে আসো সায়মা, আমার পাশে বসো। ”
“ মা, ওর নাম নিভি। ”
ইখতিয়ার ভুল ধরিয়ে দিলেন। নিভি ধীর পায়ে অনামিকার সঙ্গে ড্রয়িংরুমে নেমে এলো। মাথার ওড়না আরেকটু টেনে সিনিওরা’ র পাশে এসে দাঁড়ালো।
সিনিওরা নিভি’র হাত ধরে টেনে পাশে বসালেন। হাত, গাল, মুখ ছুঁয়ে হু হু করে কেঁদে বললেন,
“ আমার সায়মার মেয়ে। তুমি নানুর কাছে ঘুমাবে না? ”
“ জি, ঘুমাবো। ”
“ তোমার বাবা নিতে আসলে একদম যাবা না। আমার কাছেই থাকবা। ”
নিভি নত মস্তকে একবার মামাদের দিকে তাকালেন। ইখতিয়ার তৎক্ষনাৎ বললেন,
“ আর একই ভুল করবো না মা। নিভি এখানেই থাকবে। ”
পান্না নাক-মুখ কুঁচকে ফেললো । খেলনা গাড়ির রিমোট লিখনের পেটের উপর ছুড়ে রেগে রেগে বললো,
“ তুমি কেনো বলছো না, নিবি তোমার সঙ্গে ঘুমাবে। সবাই তো টানাটানি করছে। তুমি বাদ যাবে কেন? আমাকে নিয়ে কেউ ঘুমাবে না। অনাপুও শুধু নিভি নিভি করে। ”
লিখন তৎক্ষনাৎ উঠে বসে মুখ চেপে ধরলো ছোটো বোনের। আশেপাশে তাকিয়ে বাকিদের দেখে নিলো। কথার মধ্যে কেউই পান্নার কথা বুঝতে পারেনি। লিখন সস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।
নিভি’র কান গরম হয়ে গেছে। চোখ নামিয়ে বসে রইলো নানুর পাশে। সোফায় বসে থাকায় সে পান্নার কথা শুনে ফেলেছে। মেয়েটার মুখ সেকেন্ড ও জিরায় না। ভাগ্যিস বড় রা কেউ শোনেনি। না হলে তুমুল লজ্জায় পড়তে হতো।
চলমান…….
পাঠক, তবে কি নিভি এবার সুখী হবে? সেকি আদৌ নদীর ওপারে পৌঁছাতে পেরেছে?
সতর্কতা : কেউ গল্প কপি করবেন না। অনুমতি বিহীন তো একদমই নয়।
Share On:
TAGS: নদীর ওপারে সুখ, সিমরান মিমি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE