কিস অফ বিট্রেয়াল
#পর্ব_৩৪
#লামিয়া_রহমান_মেঘলা
[ কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ ]
সেরিনের খবর শুনে শিমুল যেন আরও ভেঙে পড়ল। সে অবিরাম মা-বাবাকে নানা কথা শুনিয়ে চলেছে।
ঘরের এক কোণায় বসে মুখে আঁচল চেপে নিঃশব্দে কাঁদছেন। রাগের মাথায় তিনি মেয়েটার ওপর এমন নির্দয় অত্যাচার করেছিলেন যে আজ তার এই করুণ পরিণতি। সেই ভারী দরজার আড়বাড়িটাও সেরিনের পিঠে আঘাত লেগে যেন দু’টুকরো হয়ে গিয়েছিল। হয়তো সে সময় কাকলি বেগম ঘরে এসে না পড়লে মেয়েটা সেখানেই প্রাণ হারাত।
সেরিনকে মেরেছেন ঠিকই, কিন্তু একবারও ভাবেননি,সেরিন তো তাঁর আপন মেয়ে নয়। আর সেরিন নিজেও জানে না এই ভয়ংকর সত্য।
তবু কঠোর স্বভাবের আড়ালে মেয়েটাকে ভীষণ ভালোবাসেন। সেরিন এবং শিমুলের ভেতর কখনো কোন পার্থক্য করেন নি নূরবানু সিকদার বা আবু সুফিয়ান। সব সময় তারা দু মেয়েকেই আদর করেছেন সমান ভাবে।
এ কথা শিমুলও ভালো করেই জানে। কিন্তু সেদিন রাগের বশে সে মাকে অনেক বেশি কথা শুনিয়ে ফেলেছিল।
———-
হসপিটালে থেকেই সকাল হলো।
কায়ান সেরিনের পাশেই ঘুমিয়ে গেছিলো।
সেরিন একটু নড়েচড়ে উঠলে কায়ানের ঘুম ভেঙে যায়৷
সে মাথা উঠিয়ে সেরিনের দিকে তাকায়।
সেরিন চোখ খুলে তাকায়। মেয়েটার মায়াবী চোখ দু’টো কায়ানের দিকে স্থির হয়৷ মুখশ্রীতে অসুস্থতার বহিঃপ্রকাশ।
কায়ান এগিয়ে গিয়ে সেরিনের মাথায় হাত রাখে,
“জান, কষ্ট হচ্ছে কোথাও?”
সেরিন শুধু তাকিয়ে থাকে কায়ানের মুখপানে। কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলে,
“না। হচ্ছে না কষ্ট।”
কায়ান, সেরিনের কপালে চুমু খায়। সেরিন চোখ জোড়া বুঁজে নেয়।
কিন্তু নিজের হাত নাড়াতে গিয়ে সেরিন বুঝতে পারে তার শরীর অবশ হয়ে গিয়েছে। সে কিছু অনুভব করতে পারছে না৷
সেরিন আরও চেষ্টা করে কিন্তু না সে নিজের শরীর নড়াচড়া করতে পারছে না।
সেরিন, কায়ানের দিকে চায়৷ তার চোখে মুখে প্রশ্ন। কায়ান সেরিনের কপালে চুমু খায় ফের।
“রিলাক্স সেরিন আমার কথাটা শুনো মনোযোগ দিয়ে৷”
“ক কি কথা?”
সেরিনের কন্ঠে স্পষ্ট আতঙ্ক।
কায়ান, সেরিনের হাত দুটো আলতো করে ধরে নিজের দিকে ফেরায়৷
“তোমার একটা ছোট্ট সমস্যা হয়েছে মেরুদণ্ডের হাড়ে। ডক্টর অপারেশন করেছে। কিন্তু সাইড ইফেক্ট হয়েছে সেরিন৷
জান আমার, আমি আছিত ভয় পেও না। তুমি সুস্থ হয়ে যাবে। শুধু আমাকে একটু সময় দাও। আমি আছি তোমার পাশে৷”
কায়ান যদিও তাকে ভয় দেবার মত কিছুই বলেনি কিন্তু সেরিন ঠিকই বুঝতে পেরেছে তার সাথে কি হয়েছে।
সেরিনের চোখ বেয়ে টুপ টুপ করে পানি বালিশে গড়িয়ে পড়ে।
কায়ান নিজের দু হাতে সেরিনের চোখের পানি মুছিয়ে দেয়।
“কেঁদো না৷ তুমি কাঁদলে আমি যে সইতে পারব না৷”
সেরিন চোখ বন্ধ করে নেয়,
“আপনি চাইলে আমাকে বাবার বাড়িতে রেখে দিতে পারেন। আমি আপনাকে জোড় করব না কায়ান।
আমার জন্য নিজের জীবন নষ্ট….. “
সম্পূর্ণ কথা শেষ করতে পারলোনা সেরিন তার আগেই গালে পড়লো চড়৷
সেরিন ভড় পেয়ে যায়। এদিকে হাত পাও অবশ।
কায়ানের যে চোখ দুটোতে এতক্ষণ ছিলো দুঃখ আর মায়া সেই চোখ দু’টোই হটাৎ করে হিংস্র হয়ে উঠলো।
সেরিনের কাছে গিয়ে কায়ান ওর গাল দু’টো চেপে ধরে নিজের দিকে ফেরায়,
“আর একবার বলিস এসব কথা। যতটা সুস্থ আছিস ওতটাও অবশ করে দিব মেরে।
বেয়াদব মেয়ে। আমি এখানে তোর চিন্তায় মরে যাচ্ছি আর তুই কিনা জীবন অজীবনের কথা ভাবছিস? তুই জানিস আমার কি অবস্থা? খাওয়া নেই গোসল নেই তোর জন্য আমি কি করে বেড়াচ্ছি?
বেয়াদব আর একবার বল এসব কথা তোর কবর আমি নিজে দেব।”
সেরিন চুপ হয়ে যায়৷ ভয়ও পেয়েছে সে।
কায়ান হুট করেই সেরিনের ওষ্ঠদ্বয় আঁকড়ে ধরে। সেরিন চুপ হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর কায়ান নিজেকে শান্ত করে সেরিনের থেকে একটু সরে আসে,
“সরি জান তোমাকে মারতে চাইনি কিন্তু তুমি আমাকে রাগিও না প্লিজ৷”
সেরিন চুপচাপ থাকে।
কায়ান সেরিনের পাজকোলে তুলে ওয়াসরুমে নিয়ে যায়।
সেরিনকে ফ্রেশ করিয়ে সে রুমে নিয়ে আসে।
ততক্ষণে ডক্টর উপস্থিত হয়৷
তিনি সেরিনকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে।
এরপর সেরিনকে একটা ইনজেকশন দিয়ে দেয়।
“কিছুক্ষণ পর উনি নিজের হাত, শহ বুকের নিচ থেকে পেট পর্যন্ত সচল অনুভব করবে। অর্থাৎ উনি কোমড়ের নিচ থেকে অবশ থাকবে কিন্তু উপরের টুকুন কাজ করবে।
আশা করছি এই ক্ষতটা ঠিক হলে নিয়মিত এক্সারসাইজ করলে ভালো রেসপন্স পাব।
আর পেসেন্ট কে সব সময় খুশি রাখবেন মিস্টার মাহবুব৷ কারণ এসব পেসেন্টের বডি রেসপন্স করে তার বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষার উপর।
উনি যত চাইবেন বেঁচে থাকতে তত ওনার ইচ্চা শক্তি ওনাকে সেরে উঠতে সাহায্য করবে।”
কায়ান ডক্টরের প্রতিটা কথা শুনলো।
এবং সে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো।
ডক্টর বেরিয়ে গেলে কায়ান ফের সেরিনের পাশে গিয়ে বসল।
সেরিন ঘুমিয়ে আছে।
নূরবানু সিকদার ততক্ষণে খাবার নিয়ে এসেছেন।
তিনি বাড়িতে গিয়েছিলেন রাতে।
খাবার নিয়ে সকালে এলেন।
কায়ানকে বসে থাকতে দেখে তিনি কায়ানের দিকে এগিয়ে গেলেন
“আব্বা যাও বাড়িতে গিয়ে রেস্ট নিয়ে আসো। ততক্ষণ আমি আছি৷”
“না আম্মা বেগম, আমি বিকালে ওকে নিয়ে একবারে বাড়িতে যাব। তুমি আহিক এবং জেবরানকে বলো আমার বউ বাড়িতে যাবে। তার জন্য যেন আয়োজনে করা হয়৷”
বানু মির্জা ছেলের কথা শুনে চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না৷
পুরুষ মানুষ এত ভালোবাসতে জানে।
তিনি ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন।
“আব্বা আমি জানি একদিন তোমাদের অনেক সুন্দর সংসার হবে। মায়ের দোয়া কখনো আল্লাহ ফেরত দেয়না৷”
———-
চট্টগ্রামের বিকেল যেন পাহাড়, নদী আর শহুরে ব্যস্ততার মিলিত এক অনুপম কাব্য। পশ্চিম আকাশে সূর্য ঢলে পড়তেই সোনালি আলো এসে ছুঁয়ে যায় শহরের পাহাড়ি ঢাল, উঁচুনিচু পথ আর পুরোনো ভবনের দেয়াল। দূরে র বুকে আলো ঝিলমিল করে ওঠে, যেন জলের উপর ছড়িয়ে আছে গলিত সোনা।
রাস্তার দু’ধারে মানুষের ব্যস্ততা তখনও থামে না। কোথাও দোকানপাটে ভিড়, কোথাও চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছে, কোথাও আবার দিনের ক্লান্তি মুছে নিতে আড্ডায় মেতে উঠেছে মানুষ। পাহাড়ি পথ বেয়ে নেমে আসা হালকা বাতাসে লবণাক্ত সমুদ্রের গন্ধ মিশে থাকে, যা কে অন্য সব শহর থেকে আলাদা করে তোলে।
আজানের ধ্বনি যখন চারদিকের কোলাহল ছাপিয়ে ভেসে আসে, তখন বিকেল ধীরে ধীরে সন্ধ্যার কোলে ঢলে পড়ে। আকাশে কমলা, বেগুনি আর নীলের মিশ্র রঙ ছড়িয়ে যায়, আর তখন এক শান্ত, মায়াময় রূপে নিজেকে মেলে ধরে।
সিকদার নিবাস আজ সেজেছে ফুল এবং লাইটে।
জেবরান, আহি এবং শিমুল মিলে সব কিছু আয়োজন করেছে।
আশেপাশে সবাই জেনে গেছে কায়ান বিয়ে করেছে।
তবে কাকে বিয়ে করেছে এটা কেউ জানেনা।
শিমুল আজ ভীষণ খুশি।
নূরবানু সিকদার এবং আবু সুফিয়ানও এসেছেন। তবে তারা হসপিটালে যায়নি।
শিমুল যেতে দেয়নি। প্রথমত সেরিনকে বিকালে বাড়িতে আনা হবে। আর দ্বিতীয়ত কায়ানের রাগ সম্পর্কে শিমুল অবগত। সে চাইছে না মা বাবাকে কোন প্রকার কথা শোনাক কায়ান।
ওরা বাড়িতে ফিরুক এরপর দেখা যাবে সব।
——-
হসপিটালে,
সেরিনের সম্পূর্ণ পোশাক কায়ান একে একে বদলে দিয়েছে। সেরিন ভীষণ লজ্জা পাচ্ছে। লোকটা এভাবেই সবটা দেখে ফেললো।
কায়ান, নিজেকে সংযত করে সেরিনের সামনে বসে।
সেরিন আপাততঃ একটা হুইল চেয়ারে বসে। ওর পরনে লাল রঙা একটা জামদানী শাড়ি৷
গলায়, হাতে কানে কিছু সোনার গহনা৷
যেগুলো বানু মির্জা দিয়েছে।
বানু মির্জা সেরিনকে হালকা মেকাপ করিয়ে দিলেন।
সেরিনকে পুরো বউ বউ দেখাচ্ছে।
কায়ান মৃদু হেসে তার সদ্য বিবাহিত বউকে কোলে তুলে নিলো।
“চলো সেরিন। তোমার শ্বশুর বাড়িতে৷”
সেরিন খানিকটা লজ্জায় কায়ানের বুকে মুখ লুকায়।
চলবে?
Share On:
TAGS: কিস অফ বিট্রেয়াল, লামিয়া রহমান মেঘলা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
জেন্টাল মনস্টার পর্ব ৫৫
-
কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ১৯
-
কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ২৮
-
কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৩৮
-
কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ২০
-
জেন্টাল মনস্টার পর্ব ৬৪
-
জেন্টাল মনস্টার পর্ব ৫৪
-
জেন্টাল মনস্টার পর্ব ৩৮
-
জেন্টাল মনস্টার পর্ব ৫৯
-
জেন্টাল মনস্টার পর্ব ৪৯