Golpo romantic golpo কাছে আসার মৌসুম

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮১


#কাছে_আসার_মৌসুম!

#নুসরাত_সুলতানা_সেঁজুতি

(৮১)

সমুদ্রের পাড়ে তখন গোধূলি! সন্ধ্যে ঘনিয়ে আসার জোগাড়। অথচ পাটায়ার ঝলমলে ব্যস্ত শহরে এক ফোঁটা ভাটা পড়েনি কিছুর। উলটে চারিদিক আরো রঙিন হয়ে উঠল । লক্ষ্য লক্ষ্য তারার ভিড়ে উড়ে যেতে শুরু করল হাজার খানেক ফানুস। বিচের পাড়ে মানুষদের হাঁটাহাঁটি বাড়ছিল। সমুদ্রের ঢেউ উত্তাল গতিতে ছুটে এসে লুটিয়ে পড়ছে পায়ের তলায়।

ইউশা সামনে থেকে কোনোদিন সমুদ্র দেখেনি। তাই খুব বিস্ময় আর অভিভূতি নিয়ে চেয়ে রইল ঐ নীলাভ জলরাশি পানে। কী স্বচ্ছ জল! কী সুন্দর! প্রচণ্ড বাতাস এখানে।

ইউশার গলার স্কার্ফ উড়ে উড়ে যাচ্ছে। পরনের লম্বা ফ্রকটা উঠে আসছে হাঁটু সমান।

ও বারবার টেনেটুনে ঠিক করছিল দেখে

অয়ন বলল

“ এত টানিস না!”

“ উড়ে যাচ্ছে তো।”

“ কেউ তাকাবে না। এখানে এত সময় নেই।”

আর একটু উঠলে কী হবে?

ওদিকে দ্যাখ!”

ভ্রু দিয়ে দেখানো দিকটায় তাকাল ইউশা।

কয়েকজন ফরেইনার মেয়ে পর্যটকদের গ্যাং চাদর বিছিয়ে বসেছে বালির ওপর। সবার পরনে ছোটো ছোটো জামা। বুক,পিঠ,পা দেখা যাচ্ছে। অয়ন বিড়বিড় করে বলল,

“ ওদের দশজনের গায়ে যা,তোর একার গায়ে তাই। উড়ে গেলেও, ওদের মতো লাগবে না।”

ইউশা হতভম্ব হয়ে বলল,

“ তুমি এমন কথাও জানো?”

“ বেশি বোল্ড হয়ে গেছে?”

“ আগে তো শুনিনি।”

“ আগে তো বিয়ে টিয়ে হয়নি। বিয়ের পর কেমন যেন পালটে যাচ্ছি।”

ইউশার এই কথায় লজ্জা লাগল। কানের পিঠে চুলটা গুঁজল চিবুক নুইয়ে। দৃশ্যটুকু অয়নের কাছে আহামরি সুন্দর লাগে আজ। চেয়ে রয় শান্ত, সূক্ষ্ণ নজর মিশিয়ে। প্যান্টের পকেটে ঢোকানো হাতের পাশ ফিরিয়ে বলে,

“ হাঁটি,চল।”

ইউশা বিভ্রান্ত হয়ে চেয়ে থাকে। অয়ন ভাই কি বাহুতে বাহু গলিয়ে হাঁটার কথা বলছে?

মেয়েটার এই প্রকট বিভ্রমে ডোবা চাউনি দেখে অয়ন তাড়া দিয়ে বলল,

“ কী,ধর!”

ইউশা খুব ব্যস্ত ভাবে হাতটা ঢুকিয়ে দিলো ওর বাহুতে। যেন এই সুযোগ তার কাছে আসা বহু কাঙ্খিত, প্রতিক্ষীত!

অয়ন হাঁটা শুরু করল। ইউশা চেয়ে চেয়ে দেখছিল বিচের পাড়ে বসা একেকটা দোকান। বারবিকিউ আর ভাজাভুজির ভ্যানে চেয়েই গা গুলিয়ে উঠল ওর। অমনি মুখ কুঁচকে বলল,

“ অয়ন ভাই.. আমি..”

অয়ন আটকে দেয়,

“ আবার ভাই!”

“ তুমিও তো এতক্ষণ তুই তুই করে বললে!”

“ আমি যা করব,তুমি তাই করবে?”

ইউশা আশ্চর্য হয়ে বলল,

“ এত তাড়াতাড়ি মুভ করো কীভাবে?”

“ এর চেয়েও তাড়াতাড়ি তোকে বিয়ে করেছিলাম!”

ইউশা ঠোঁট দুটো ফোলাল।

“ কথাটা শুনলেই না।”

“ কী?”

“ এখানে সবাই কীসব খাচ্ছে! আমি কিন্তু রাতে ভর্তা আর ডাল খাব।”

অয়ন দাঁড়িয়ে গেল।

“কীহ!

ইউশা এটা ব্যাংকক। ভর্তা তো আমি পকেটে করে আনিনি। পাব কোথায়?”

“ খুঁজলে নিশ্চয়ই পাব।”

“ কে খুঁজবে?”

“ তুমি।”

“ আমার আর কাজ নেই?”

“ ছিহ, বউয়ের জন্যে এটুকু পারবে না?”

“ বউ আমার জন্যে কী পারবে?”

“ বলো তো, সমুদ্রে ঝাঁপ দিই?”

“ দে।”

ইউশার হাতটা আলগা হলো অয়নের বাহুর ভেতর থেকে। অয়ন বলল,

“ কী,যা?”

ইউশা নাক ফুলিয়ে হাঁটা ধরল সত্যি। যেন এক্ষুনি এক ঝটকায় সমুদ্রের মধ্যে ফেলে দেবে নিজেকে। দু পা হাঁটতেই অয়ন হেসে হাত টেনে ধরল।

ইউশা কপট রাগ দেখিয়ে বলল,

“ কী? হাত ধরেছ কেন, যাই?”

অয়নের চোখেমুখে দুষ্টুমি। জিগেস করল,

“ স্মুদি খাবি? মাথা ঠান্ডা হবে।”

ইউশা থমথমে চেহারা আরেকদিক ফিরিয়ে রাখে। পাশ কাটানো হাওয়ায় মেয়েটার চুল উড়ে মুখ ঢেকে দেয়। অয়ন জিভে ঠোঁট ভেজাল। একটা বড়ো শ্বাস নিলো।

তারপর হাতটা বাড়িয়ে সেই চুল নিয়ে গুঁজে দিলো কানে। অপ্রত্যাশিত, হঠাৎ এই স্পর্শে ইউশার শরীর যে কাঁপল এক চোট,টের পেলো সে। ফিরল খুব অবাক হয়ে। অয়ন তাতে টলে না। স্বাভাবিক, সাবলীল থেকে শুধায়,

“ খাবে?”

ইউশার রাগ পড়ে গেল৷ বরং কুণ্ঠায় সংকুচিত হয়ে এলো চোখমুখ। অল্প ঘাড় নাড়তেই,

অয়ন বলল,

“ এখানেই থেকো। আসছি!”

মানুষটা দ্রুতপায়ে চলে যায়। অথচ ইউশার মুখখানা শুকিয়ে বসে একটু। অয়ন হুটহাট তুই থেকে তুমিতে চলে যায় কীভাবে? কারণ সে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে ইউশাকে মেনে নেয়ার জন্যে। জোর খাটাচ্ছে মনের ওপর,মাথার ওপর,নিজের ওপর। ইউশা এই জোরাজোরি তো চায় না। মন থেকে ভালোবেসে আসুক না তুমিটুকুন! অয়ন ভাই এমন অস্বস্তি অস্বস্তি ভাব করে তুমি না বলে,ভালোবেসে খুব মোলায়েম করে ডাকুক না ইউশাকে।

ইউশা সাগরের ওপরে চেয়ে রইল। ঝাঁক বেঁধে উড়ে যাওয়া ফানুসগুলোকে দেখল মলিন চোখে। হঠাৎ ভায়োলিনের সুর ভেসে এলো কানে। পাশ ফিরে চাইল সে। অদূরে বসে থাকা সেই মেয়েদের আড্ডায় বসে বাজাচ্ছে একজন। পাশেরজন গান গাইছে কোরিয়ান ভাষায়। এত মিষ্টি সুর! ইউশার এমনিও ভায়োলিন খুব ভালো লাগে! নিঃশব্দে এগিয়ে গেল ও৷ কাউকে চেনে না,জানে না,আলাপ নেই,তাও এসে ভিড়ল ওদের পাশে। মনোযোগ দিয়ে গান শুনছিল ইউশা। হাত তালিতে ভাঙল সেটুকু। একজনের চোখ পড়ল ওর দিকে। অমনি

বলল,

“ হেই!”

ইউশা হাসল। বলল,

“ ক্যান আই সীট?”

“ অফকোর্স।” একজন সরে জায়গা দিতেই চাদরে পা গুটিয়ে বসল ও।

হাত বাড়িয়ে বলল,

“ আমি ইউশা,বাংলাদেশ থেকে এসছি।”

বাকিরা হাত মেলায়। পরিচিত হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার ওরা,পিকনিকে এসেছে। কথায় কথায় যখন শুনলো,ইউশা হানিমুনে এসছে খুব মজা নিতে শুরু করল। বড়োদের মতো মজা! একজন বলেই ফেলল,

“ নতুন বিয়ে? কোথাও তো লাভ বাইট দেখছি না।” একেকটা খোলামেলা কথায় ইউশার লজ্জা পাওয়া উচিত ছিল বোধ হয়। অথচ ভেতরটা কেন যেন ভীষণ ব্যথায় গুমড়ে উঠল ওর।

স্বামীর আদর? ও তো তার মানেই জানে না। এটা তো নামে মাত্র হানিমুন! আদৌ কি ওসব আছে কপালে? অয়ন ভাই না কখনো তুশিকে ভুলবেন,আর না কখনো কাছে টানবেন ওকে! কিন্তু মুখে কখনো স্বীকার করবেন না। দেখাতে চাইবেন,সব ভুলে গেছে। ভালো আছে ওকে নিয়ে। কিন্তু আদৌ তা হবে না,ইউশা জানে। এটুকু বোঝে ও।

ইউশার উদাস চোখ ছিল ভায়োলিনের ওপর। এমনিই! কারণ নেই। একজন খেয়াল করতেই এগিয়ে দিয়ে বলল – বাজাবে?”

নড়ে উঠল ও। বাড়িয়ে দেয়ায়,দোনামনা করে নিলো হাতে। কয়েকবার ইউটিউবে টিউটোরিয়াল দেখেছিল। এখন পারবে বাজাতে?

দুটো অরেঞ্জ স্মুদি নিয়ে ফিরে আসতে আসতে অয়ন খেয়াল করল ইউশা জায়গায় নেই। ঘাবড়ে গেল ও। অচেনা জায়গা,সামনে সমুদ্র! উদ্ভ্রান্তের ন্যায় অয়ন এদিক ওদিক চাইল। তক্ষুনি চোখ পড়ল সুদূরে। সেই মেয়েলি জটলায় ইউশার হলদে ফ্রক,আর স্কার্ফ দেখে পেছন থেকেই চিনে ফেলল সে। ঠোঁট টেনে হাসল অয়ন। ইউশা ছোটো থেকেই ভীষণ মিশুক। যেখানে যায়,বন্ধু বানিয়ে নেয়।

ততক্ষণে ভায়োলিন কাঁধে নিয়েছে মেয়েটা। অয়ন দুই ভ্রু উঁচাল। ইউশা ভায়োলিন বাজাতে পারে? গিটারটাই না ও সেদিন শেখাল?

অয়ন এগিয়ে আসতে নেয়৷ লম্বা লম্বা পায়ের গতিতে দুজনের আর কিঞ্চিৎ দুরুত্ব। সেই সময় ভায়োলিনের বুকে বো দিয়ে ঘষে ঘষে সুর তুলল মেয়েটা। মিষ্টি,মিহি স্বর ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো কটা লাইন,

“ Kuch tum bhi kore ho,

kuch hum bhi saare hain

Ik aasmaan par hum, do chaand aadhe hain.

Kam hai zameen bhi

thodi, Kam aasmaan hai

Lagta adhoora, tum bin har jahaan hai!

Apni har kami me hum

ab tujhe hi paate hain

Khud ko tere pass hi chhod aate hain…

অয়নের পা দুটো ওখানেই থমকাল। এত মায়া,এত আবেগ আর এত অর্থপূর্ণ গান ইউশা কেন ধরল না বোঝার মতো ছোটো সে নয়। বুকটা কাঁপল অজান্তে। হয়ত কোনো হাহাকার বা ব্যর্থতায়? ইউশার এক পাশের গাল দেখা যাচ্ছে। অয়ন গোধূলির ছোঁয়ায় স্পষ্ট দেখল,মেয়েটার চোখের কার্নিশ ছুঁয়ে বেয়ে আসা জল। এই জলে অভিযোগ অনেক! অনেক না পাওয়া! অনেক অভিমান! যার অভিশাপে অয়ন টালমাটাল হয়ে পড়ল খুব। আর এক মূহুর্ত দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। শুনতে পারল না পুরো গান। সঙ্গে সঙ্গে উল্টোঘুরে কোথাও একটা হেঁটে গেল সে।

****

সার্থ ঘেমে একশা। কালো টিশার্ট ভিজে চুপচুপে। পরনের ট্রাউজার নেমে গেছে একটু। কপালের রগ দপদপ করছে ভীষণ রাগে। একটা প্রস্তর মুখ আর রক্তাভ চোখ নিয়ে সেল থেকে বাইরে আসার মাঝে,একবার থেমে পেছনে চাইল ও। মেঝেতে তিন তিনজন গোঙাচ্ছে ব্যথায়। একেকটার চোখমুখ ফাঁটা,কাটা একেক জায়গায়। সার্থ ঝুঁকে বেরিয়ে আসতেই,শরিফ ঢোক গিললেন। লাঠিটা ফেটে ছেচে গেছে!

সেদিকে এক পল দেখে আবার সার্থর ঘর্মাক্ত, হলদে মুখায়ব দেখলেন তিনি।

ভয়ে ভয়ে শুধালেন,

“ কোনো,কোনো সমস্যা হবে না তো স্যার?”

সার্থ এমন ভাবে চাইল,যেন এক্ষুনি গিলে খেয়ে ফেলবে। শরিফ মিনমিন করে বললেন,

“ ইয়ে মানে স্যার, রিমান্ডের অর্ডার ছাড়াই যা ঘা দিলেন! উঠে দাঁড়াতে পারলে হয়।”

“ আমার কাজ শেষ হয়নি। লাঠি ভেঙেছে তাই থেমেছি।”

পরপরই চিড়বিড় করে সেলের দিকে দেখল ও। মেঝেতে লেপ্টে থেকে ছটফট করা একটার নাম সালেখ। সেটার দিকে চেয়ে দাঁত খিচিয়ে বলল,

“ জানোয়ারের বাচ্চা, আমার কলার ধরেছে। আমার বাপ তুলে গালি দিয়েছে! ওকে আমি দোযখ ঘুরিয়ে আনব।”

ভাঙা লাঠিটা ছুড়ে ফেলল সে। লাঠি আরেকটা হাতে নিতেই শরিফের গলা শুকায়। থানায় আসামি কোর্টের অনুমতি ছাড়া আহত করা নিয়মের বাইরে। স্যার তো রাগে সব ভুলে গেছেন। এখন এগুলো হেঁটে হেঁটে কোর্টে না তুলতে পারলে,ওপর থেকে চাপ আসবে না?

এক পল পিছু ফিরে বাকি পুলিশদের দেখলেন তিনি। সব শুকনো মুখে চেয়ে। যার অর্থ,

সার্থ যা করছে তাদের বলার কিছু নেই। হঠাৎ ওর ফোন বাজল। একজন এসে বলল,

“ স্যার, আপনার বাড়ি থেকে কল এসেছে। বলছে জরুরি!”

সার্থ থামল এইবার। তুশির কথাই মাথায় এলো চট করে। লাঠিটা অমনি নূরাইনের দিকে ছুড়ে দিয়ে বলল,

“ কন্টিনিউ!”

নূরাইন খপ করে লাঠি ক্যাচ ধরে। গাট্টাগোট্টা দেহে বুক ফুলিয়ে ঢুকে যায় সেলে। শরিফ একটু কষ্ট পেলেন! তিনি ছিপছিপে দেখে স্যার মারতে দিলেন না? নাকি ভরসা পেলেন না? নিজের আধিপত্য ধরে রাখতে নূরাইনের পেছনে এলেন তিনিও।

সার্থ কেবিনে ঢুকল। ঘাম মুছতে মুছতে পানির বোতল তুলল এক হাতে। অন্য হাতে ফোনে কল যাচ্ছে দিদুনের নম্বরে। তিনিই কল দিয়েছিলেন। রিসিভ করতেই সার্থ শশব্যস্ত শুধায়,

“ হ্যালো,তুশির কী খবর?”

জয়নব স্বভাবসুলভ ধীরে-সুস্থে বললেন,

“ আশেপাশে চেয়ার আছে দাদুভাই? বসো একটু। শ্বাস নাও। যা বলব,তাতে বসতে ভুলে যেতেও পারো!”

সার্থ না বসলেও,ওর চোখমুখ বসে গেল।

“ কী হ-হয়েছে দিদুন? আমার তুশি ঠিক আছে তো?”

“ তা আছে। কিন্তু তুমি ঠিক থাকবে না আমি এটুকু বলতে পারি!”

তুশি ঠিক আছে? এর মানে দুনিয়া গোল্লায় যাক এখন। সার্থ স্বস্তি নিয়ে বসল চেয়ারে। টিস্যু তুলে কপাল মুছতে মুছতে বলল,

“ হয়েছেটা কী? হাতিঘোড়া মরেছে কারো?”

“ না,মরেনি।

তবে…. জয়নব ইচ্ছে করেই থামলেন এখানে। নাতির ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছেন যেন। বললেন চট করে,

“ তুমি বাবা হচ্ছো দাদুভাই!”

কপালের হাতটা থামল সার্থর। থামল তার চোখ জোড়া। উঠে দাঁড়িয়ে গেল তড়াক করে।

জয়নব যেন বুঝে ফেললেন। হেসে বললেন,

“ কী? বসতে ভুলে গেলে তাহলে?”

নূরাইন বেধরম পেটাচ্ছে,সাথে যোগ দিয়েছেন সুমনও। শরিফ হাত দিয়ে দেখাচ্ছেন,ওখানে মারো! এখানে মারো!

তিন তিনটে বাঘা লোক এমনিই কুপোকাত মারে,আর বোধ হয় জো নেই দাঁড়ানোর। কেন যে সার্থর সাথে বেয়াদবি করতে গেছিল,কেন যে গালি দিলো,এই আফসোস মনে হয় না ওদের আর কোনোদিন যাবে!

সার্থ তক্ষুনি কেবিন থেকে ছুটে বেরিয়ে এলো। হন্তদন্ত, কিছুটা অস্থির-অশান্তের মতো। নার্ভাসনেস তার চেহারায়।

ডাকলও এলোমেলো ভাবে,

“ শ-শরিফ,শরিফ…”

শরিফ সামনে হাজির হলেন ত্রস্ত।

“ হ্যাঁ স্যার?”

সার্থ ওর দুই বাহু ধরে ঘুরিয়ে ফেলল। বাচ্চাদের মতো স্ফূর্ত গলায় বলল,

“ আম গোয়িং টু বি আ ড্যাড সুন শরিফ… আম গোয়িং টু বি আ ড্যাড!”

শরিফের সময় লাগল বুঝতে। প্রত্যেকেই গোমড়া,মেজাজি,পাথুরে এ-এসপি সার্থর হঠাৎ এই প্রফুল্লতায় ভড়কে চেয়ে রইলেন। শরিফ ব্যাপারটা আয়ত্ব করতেই লাফিয়ে উঠলেন আনন্দে,

“ সত্যি স্যার? কংগ্রাচুলেশনস,স্যার কংগ্রাচুলেশনস!”

নেহা থেকে প্রত্যেকে সার্থকে অভিনন্দন জানাল। সে চটপট মানিব্যাগ থেকে কিছু নোট বের করে শরিফের হাতে গুঁজে দিয়ে বলল,

“ মিষ্টি আনাও। সবাইকে দেবে।”

সেলের ভেতর থেকে আসামীরা তাকিয়ে ছিল। যে গ্যাংটা ধরা পড়েছে আজ,তার মধ্যে তিনজন মার খাচ্ছিল। সার্থর চ্যাঁচামেচিতে ব্যথা ভুলে ওরাও চেয়ে ছিল এদিকে। সার্থ ওদের দেখিয়ে বলল,

“ এদেরকেও মিষ্টি দেবে,

দু মিনিট রেস্ট,

তারপর আবার মারবে।

আমি আসি!”

ওরা হাঁ হয়ে গেল। ব্যাক্কলের মতো দেখল একে অন্যকে।

সালেখ বিড়বিড় করে বলল,

“ ভাবলাম বাপ হওয়ার খুশিতে মারতে মানা করবে! শালা বাইঞ্চোদ পুলিশ!”

নূরাইন শুনতে পেয়ে কিড়মিড়িয়ে উঠল,

“ কী কইলি?”

তারপর সালেখের মুখে কষিয়ে এক ডজন লাঠির বাড়ি পড়ল। যন্ত্রণার তোড়ে ওদের চ্যাঁচানোতে ভরল সারা থানা। শরিফ মিষ্টি আনতে লোক পাঠালেন। মাঝে ফোনে খবর দিলেন স্ত্রীকেও। লাইনটা কাটতে কাটতে আফসোসও করলেন কিছু। সার্থ তিন মাস আগে বিয়ে করে,বাবা হয়ে গেল! আর উনি? হাহ!

রাত অনেক!

সবে খাবার শেষ করে হোটেলের রুফটপে ইউশাকে নিয়ে বসেছে অয়ন।

রুফটপ সারারাত জমজমাট থাকে। এটাই পাটায়ার সিজন বলে,হোটেলও ঘুমোয় না ।

এক পাশে বার, মাঝে লেবেল স্টেজ। সেখানে একজন গান গাইছেন। এ পাশে ভায়োলিন,ড্রাম বাজছে। সেই সাথে নির্মল বাতাস এসে ছুঁয়ে দিচ্ছে শরীর। ইউশার এত ভালো লাগছিল! আবার একটু একটু অস্বস্তি হচ্ছিল এখানকার মেয়েগুলোকে দেখে।

কী ছোটো ছোটো জামাকাপড় পরেছে। লজ্জাও লাগে না? সব তো দেখাই যাচ্ছে। কয়েকজনের ক্লিভেজের এমন বাজে অবস্থা,ইউশার ইচ্ছে করছিল গলা থেকে স্কার্ফ খুলে দিয়ে আসতে। আচ্ছা,অয়ন ভাই কি এসব মেয়েদের দেখেন? লক্ষ্য করেন?

ও আড়চোখে অয়নের দিকে চাইল। মানুষটা স্টেজে সেই পুরুষ শিল্পীতে চেয়ে। খুব মনোযোগ গানে। সামনে অসং্খ্য মেয়েদের রেখেও,স্বামীর চোখ এক পুরুষে আটকে? গর্বে হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো আনন্দ হলো ইউশার। হাসল মেয়েটা। তক্ষুনি গান শেষ হয়। করোতালি বাজে। কিছুক্ষণ বাদে সাথে দুজন লোক নিয়ে হোটেলের ম্যানেজার আসেন। হাসিহাসি মুখে দুহাত তুলে সবাইকে শান্ত হতে বোঝালে, তালি বাজানো থামাল সকলে। ভদ্রলোক বৈদেশিক ভাষায় বললেন,

“ এখানে আপনারা অলমোস্ট সবাই হানিমুন কাপল। আপনাদের হানিমুনের সময়টাকে আরো উপভোগ্য বা মজাদার করতে আমরা একটা গেইমের আয়োজন করেছি। সবাই অংশ নেবেন,নিশ্চয়ই?”

স্ফূর্ত লোকজন সবাই ইয়েস ইয়েস বলে শোরগোল তুলল। ভদ্রলোক বা হাতে একটা কাচের জার দেখিয়ে বললেন,

“ এখানে চিরকুট আছে। প্রতিটাতে কিছু না কিছু লেখা। কাপলদের মধ্যে থেকে একজন করে তুলবেন,যা পরবে তাকে সেটা করতে হবে। আর করতে না পারলে কিছু সুইটেস্ট শাস্তি পেতে হবে,যা পড়ে দেখাব।”

আরো একবার উচ্ছ্বাসে জায়গা ফেটে পড়ল। ইউশা বলল,

“ বাহ,মজার খেলা তো! তাই না?”

অয়ন অন্যমনস্ক ছিল। নড়ে চড়ে বলল,

“ হু? হুম!”

ভদ্রলোক সবাইকে বিনয়ের সাথে স্টেজের কাছে ডাকলেন। চপল পায়ে গিয়ে ভিড়ল সকলে। ইউশা তাকাল অয়নের পানে। যাবে কিনা!

মেয়েটার দৃষ্টিতে পরিষ্কার, যেতে চায়। অয়ন তাই মানা করল না। ঠোঁটে হাসি টেনে উঠে দাঁড়াল। ইউশা খুব খুশি হয়ে সঙ্গ নিলো তার৷

স্টেজের কাছে ইতোমধ্যে বড়ো জটলা বেঁধেছে। জুটি জুটি করে দাঁড়িয়েছে সবাই।

ইউশাও অয়নের বাহু ধরে দাঁড়াল। প্রথমে এক নাইজেরিয়ান দম্পতিকে চিরকুট তুলতে বলা হলো। পুরুষ লোকটি তুলে ম্যানেজারের হাতে দিলেন। ভাঁজ মেলে তিনি পড়লেন,

“ আ রোমান্টিক কাপল ডান্স ফর টু মিনিটস!”

সবাই হইহই করে হাত তালি দিলো। দুজন দুজনের দিক চেয়ে হাসল মিষ্টি করে। পুরুষ লোকটি হাত বাড়াতেই সেই হাত ধরল মেয়েটা। সাউন্ডসিস্টেমে গান পরিবর্তন হলো। একটুখানি জায়গা ফাঁকা হতেই,গলা -কোমর জড়িয়ে নাচল দুজন। তিন মিনিট পর আবার আরেকজনের পালা আসে। এভাবে এক এক দম্পতি এক এক লেখা পায়। কারো এলো, বেলুন দিয়ে ইউনিক ভাবে প্রপোজ করে দেখানো, কারো এলো স্ত্রীকে ডেডিকেট করে গান গেয়ে শোনানো,কারো পড়ল এক সেকেন্ডে স্বামীর শার্টের সব বোতাম খুলতে হবে,কারো এলো প্রথম দেখা হওয়ার মূহুর্ত অভিনয়ের মাধ্যমে দেখানো,কারো এলো একে অন্যের দিকে ৫ মিনিট চোখের পাতা না ফেলে তাকিয়ে থাকা!

একটা সময় পালা এলো ইউশাদের। ম্যানেজার যখন ওদের দুজন থেকে একজনকে ডাকলেন,ইউশা মুখ তুলে আস্তে করে বলল,

“ তুমি যাও না! ”

অয়ন মানা করল না।

এগিয়ে গেল। না ঘেটেই একটা কাগজ তুলল সে। ম্যানেজার নিলেন। ভাঁজ মেলতেই ঠোঁটের হাসিটা বেড়ে গেল তার। একটু চিৎকার করে বললেন,

“ কিস ইচ আদার লিপ্স ফর ওয়ান মিনিটস!”

অয়ন হতভম্ব, স্তব্ধ!

বাকরুদ্ধ ইউশাও। রুফটপের রেশ বদলে গেল, হোওওও বলে চ্যাঁচিয়ে উঠল সকলে। অথচ বজ্রের মতো চমকে, থমকে দুজন দুজনের দিকে চেয়ে রইল ওরা!

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply