#কাছে_আসার_মৌসুম__(৮০)
#নুসরাত_সুলতানা_সেঁজুতি
গুণে গুণে আজ পাঁচদিনে পড়ল, সার্থর কোনো খবর পাওয়া যায়নি। এর মাঝে সাইফুল একবার থানায় চক্কর কেটে এসেছেন,মতিঝিলের আশেপাশেও ও নেই। কেউই কিছু বলল না। সার্থর কড়া নিষেধ ছিল এখানে,তা সাইফুল জানেন। তাই আর জোরাজোরি করেননি।
সময়টা তখন মধ্য দুপুর। ঘড়িতে বারোটা বাজে হয়ত।
বিছানায় দুই হাঁটু ভাঁজ করে তাতে থুতনি ঠেকিয়ে বসে আছে তুশি। মুখটা বিষণ্ণ খুব! খাটের কোণে রাখা চার পায়ার ছোটো টেবিলটা ফল দিয়ে ভরতি। কিছু কেটে সাজিয়ে রাখা পিরিচে। বাকি একটা বাটিতে দুটো সেদ্ধ ডিম হাফ করে কাটা। পাশেই দুধের গ্লাসটা পড়ে আছে। অথচ মেয়েটা যদি একটু কিছু মুখে তুলে খায়! স্বামীর জন্যে চিন্তায় বুক শুকনো মরুভূমি যার,
তার গলা দিয়ে খাবার নামে কখনো?
আজ পাঁচ দিনের বেশি ও মানুষটাকে দেখেনি,তার গলার স্বর শোনেনি, বুকে মাথা রাখেনি। কেউ ধমকে ডাকেনি – অ্যাই চোর!
তুশির কাছে এখন নিঃশ্বাস নেয়াই দুঃসাধ্য ভীষণ। তার উদাস চিত্তে বসে থাকার মাঝে হঠাৎ মাথায় হাতের ছোঁয়া পড়ল। চমকে উঠল ও। উচ্ছ্বাস নিয়ে বলতে গেল,
“ আপনি এসেছে…”
তবে ঘুরে চাইতেই হাসিটা আর টিকলো না। মিলিয়ে গেল, তনিমাকে দেখে মুখখানা শুকিয়ে এলো ফের। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“ ওহ,বড়ো মা!”
তনিমা নীরস চোখে দেখলেন তুশির সামনে রাখা খাবার গুলো।
“ এখনো খাসনি?”
ও অনীহায় মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
“ না,গা গুলোচ্ছে!”
“ এই সময় এরকম তো একটু হবেই। তাই বলে কি খাবি না?”
“ উনি কখন আসবেন, বড়ো মা?”
তুশির ছলছলে চোখ আর ভেজা গলার প্রশ্নে, তনিমা ভারি আপ্লুত হয়ে পড়লেন! এই দুনিয়ায় তার ছেলেটাকে তার মতো করে আরেকজন ভালোবাসছে তাহলে? হেসে বললেন,
“ আসবে, চলে আসবে।”
তুশি এই কথায় শান্ত হতে পারে না। ঠোঁট ভেঙে যাচ্ছিল কান্নায়,জোরসে চেপে রাখল। তনিমা ব্যস্ত হয়ে বললেন,
“ তুশি,এমন করলে হবে না মা। তুই পুলিশ অফিসারের স্ত্রী! এদের শক্ত পাথর হতে হয়। স্বামীকে সব সময় দেশের জন্যে উৎসর্গ করার মানসিকতা থাকতে হয়।”
উৎসর্গ শব্দ শুনেই তুশির বুক কেঁপে উঠল। ফ্যাসফ্যাস করে তনিমার হাত চেপে বলল,
“ নায়ায়ায়া…আমি,আমি পারব না।”
“ বোকা মেয়ে! এটুকুতেই কেমন করছে দ্যাখো। আর তোর বাবা,সে তো আর্মি ক্যাম্প থেকে বছর দুবার আসতো। আমার কী হতো তখন?”
তুশির আর ভালো লাগছে না। এই দুনিয়া বিষাদ,বিপন্ন। ফের হাঁটুতে নামিয়ে নিলো কপাল। তনিমা হতাশ হলেন। জিজ্ঞেস করলেন,
“ অন্য কিছু খাবি?”
“ না।”
“ একটু স্যুপ খা?”
“ উহু!”
“ এরকম করছিস,তোর বাবা জানলে রাগ করবে না? এখন কি আর শুধু নিজের কথা ভাবলে হবে,আরেকজনের কথা ভাববি না? সে তো না খেয়ে আছে। ”
এই কথায় তুশির মন গলল। চোখ মুছল আলগোছে। মৃদু হেসে খাবার ফের সামনে দিলেন তনিমা। তুশি ডিমের কাটা হাফ পিসটা তুলে মুখে দিলো। চিবোনোর মাঝেই ডোরবেল বাজল হঠাৎ। বাড়িতে দুই মা, দুই বৃদ্ধা ছাড়া আর কেউ নেই। মিন্তু স্কুলে,চাচা-বাবা কাজে বেরিয়েছেন। অয়ন সেই সুদূর থাইল্যান্ডে। এখন তো কারোর ফেরার সময় নয়! এর মানে?
তুশির মেরুদণ্ড সোজা হয়ে গেল। এক লাফে দাঁড়িয়ে বলল,
“ উনি, উনি এসছেন..!”
বলতে বলতেই অস্থির পায়ে ছুটল ঘরের বাইরে। তনিমা হায়হায় করে চ্যাঁচালেন,
“ তুশি সামলে, এই সময় এত জোরে দৌড়াতে নেই। তুশির রে আস্তে…
তুশি কোনো কথা শুনল না। একদম হাওয়া, বাতাসের মত সব ডিঙিয়ে সিঁড়ি থেকে ছুট্টে নেমে এলো। আসমা দরজা খুলতে গিয়ে ভড়কে গেল পেছনে পায়ের শব্দ শুনে। তুশি যেভাবে ছুটে আসছে হকচকিয়ে চেয়ে রইল মেয়েটা। তুশি এক নিঃশ্বাসে দরজার ছিটকিনি টেনে নামাল। বুকের ভেতর সহ ধক করে কেঁপে উঠল অমনি। সার্থ! হ্যাঁ, ওর মনের মধ্যিখানে রাখা সেই পুরুষ এসেছে আজ। ইস্ত্রী করা ইউনিফর্মটা আজ অগোছালো গায়ে,হলদে মুখ ক্লান্ত খুব। সব সময় পরিপাটি করে আঁচড়ে রাখা চুলগুলো মেসি হয়ে কপালে পড়ে আছে। ঠোঁটের এক পাশ অল্প কাঁটা। অথচ
তুশিকে দেখতেই নিয়নের মতো হাসল সে। সেই হাসির মাঝেই কপালে ভাঁজ বসে গেল।
এক পা ভেতরে এসে বলল –
“ এমন লাগছে কেন তোমাকে?”
তুশির নিশ্বাস গলায় এসে ঝুলছে। বিশ্বাস হচ্ছে না সার্থ কিনা! আবার সেদিনের মতো স্বপ্ন নয় তো? ওই স্বপ্ন ভেবেই ও আঁতকে উঠল আরেকবার। ধড়ফড়িয়ে সার্থর গায়ে বুকে হাত বুলিয়ে বলল,
“ আপনি, আপনিই তো?”
“ তোমার চেহারা…
সার্থর কথা শেষ হয়নি,পূর্বেই শরীর ভেঙে তুশি ভক করে বমি করে দিলো। বুক থেকে পেট অবধি এক শেষ হয়ে গেল সার্থর।
কিছু হতভম্ব হয়ে পড়ল ছেলেটা। ভালো করে তাকানোর আগেই, গায়ে ঢলে পড়ল তুশি।
চোখ বুজতে বুজতেও বিড়বিড় করল,
“ আপনিই এসেছেন তো?”
*****
পাটায়ার সময় বাংলাদেশ থেকে এক ঘন্টা এগিয়ে। এখানে দুপুর একটা বেজে দশ মিনিট এখন।
অথচ ইউশা দেদারসে ঘুমোচ্ছে। কাল জার্নির এত ধকল পড়েছে মেয়েটার? নাকি হোটেল রুমের বিলাশবহুল টপারের নিচে তলিয়ে ফেকেছে নিজেকে! অয়ন গোসল সেরে বেরিয়ে এলো। নিজের মতো তৈরি হল,বুকিং দিলো লাঞ্চের! রুমেই কফি বানাল নিজের জন্যে। ফোনটা হাতে নিয়ে ঢুকল ওদের মেডিকেলের ফ্রেন্ডসদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে। এইতো,যা ভেবেছিল তাই! কথার টপিকই ও। ওকে মেনশান দিয়ে প্রায় প্রত্যেককেই কিছু না কিছু লিখেছে। একজন লিখেছে – ভাই আমার জন্যে এক ডজন ডাভ সাবান,আর দুটো ইয়ো ইয়ো ব্রান্ডেড আনিস। ইয়ো ইয়ো বুঝেছিস তো?
দ্বিতীয় জন লিখেছে – একটা বউয়ের অভাবে পাটায়া যেতে পারছি না! কতবার বললাম,বিয়ে দিচ্ছে না কেউ। মেয়ে একটা ধরে ভেগে গেলে বুঝবে।
ভাই,আমি তো বিয়ে করেও যেতে পারলাম না। হানিমুন প্ল্যানের আগেই টের পেলাম বাবা হতে যাচ্ছি।
অয়ন হেসে ফেলল এটা পড়ে। পরপরই মুখটা থমথমে হয়ে গেল লজ্জায়। সেই ম্যাসেজের জের ধরে একজন ওকে মেনশান করে লিখেছে,
“ অয়ন,তুই কিন্তু আবার উত্তেজনায় এই ভুল করিস না। ওটিতে ঢুকলে সবার আগে যেমন গ্লাভস পরতে হয় তেমনই বউকে আদ…”
অয়ন ধাপ করে ফোনের স্ক্রিন বন্ধ করে দিলো।
পরেরটুকু পড়তে ওর রুচির সাহস হলো না। এত্ত অসভ্য আর খোলামেলা এগুলো! অস্বস্তি কমাতে এদিক-ওদিক তাকাল সে। চোখটা তুরন্ত গিয়ে পড়ল সাদা ধবধবে বিছানার ঠিক এক কোণে আদুরে পায়রার মতো গুটিশুটি মেরে শুয়ে থাকা ইউশার ওপর। গালের নিচে দুইহাত রেখে কী আরামের ঘুম দিয়েছে! এক ফোঁটা নড়ছেও না। অর্ধেক বেলা ঘুমিয়ে কাটালে,ঘুরবে কখন এ? অয়ন গলা ঝেরে সব বিব্রত বোধ কাটিয়ে উঠতে চাইল। কণ্ঠ চড়িয়ে ডাকল,
“ ইউশা? ইউশা? কটা বাজে? ওঠ।”
মেয়েটা সাড়া দিলো না। বসা থেকে উঠে এলো অয়ন। ঝুঁকে ডাকতে গেল,থমকাল নজর।
ইউশার নিদ্রিত চেহারায় দৃষ্টিজোড়া বিঁধল আজ প্রথম বারের মতো। কী নিশ্চিন্ত, শান্ত হয়ে ঘুমোচ্ছে মেয়েটা! যেন পৃথিবীর কোথাও ওর কোনো চিন্তা নেই। এলোমেলো চুলের কয়েক গোছা গাল ছুঁয়ে আছে, শ্বাসের সাথে খুব ধীরে উঠানামা করছে বুক। অয়ন কী অনুভূতিতে ভুগল বুঝতে পারল না। শুধু আবিষ্কার করল ইউশাকে ওর দেখতে ভালো লাগছে!
মূহুর্তে চেয়ারটা টেনে বিছানার পাশে বসল অয়ন। সূক্ষ্ণ নজরে মাপল ওর মুখশ্রী। খেয়াল করল,ইউশার জোড়া ভ্রু! দুই গালে অল্প অল্প লোম আছে। ফরসা মুখটায় এত মায়া! অয়নের ওকে দেখলেই মায়া মায়া লাগার কারণটা কি এজন্যে? ঠোঁট দুটো পুরন্ত,তুলিতে আঁকা আঁকা ছবির মতো ঠিক ! চোখের পাপড়ি ঘন,গালের ওপর ছায়া পড়ে। একটা ভি শেপের মুখ। সব মিলিয়ে সুন্দর,বেশ সুন্দর। অয়ন নড়ে উঠল আবার। চোখ ফেরাল থতমত ভাব করে। এভাবে দেখা ঠিক হচ্ছে? কোত্থেকে কে যেন বলল,
“ কেন হচ্ছে না? ও তো তোমার বিয়ে করা বউ। বউকে এভাবে না আরও অনেক ভাবে দেখা যায়!”
বুকে যেন বল পেলো অয়ন। আবার তাকাল ঘুরে। মাথার ভার হাতে ছেড়ে বিছানায় ঠেস দিলো। মনে পড়ল ছোটোবেলা থেকে ইউশাকে নিয়ে ওর কাটানো সব মূহুর্তদের। অয়ন প্রথম যেদিন মেডিকেলে চান্স পায়,খুশিতে আত্মহারা হয়ে ইউশাকে কোমর ধরে উঁচুতে তুলে ফেলে। ঘোরায় চারিদিক। আর তারপর যেদিন ইউশার এইচ এস সিতে এ-প্লাস আসে, মেয়েটাকে বুকে নিয়ে চুমু দেয় মাথায়। সেদিন ও কিছু ফিল করেনি,কিচ্ছু না। অথচ আজ ওসব ভেবেই অয়নের দুনিয়াদারি কেমন অস্থির হয়ে উঠল! কীসের জন্যে? বিয়ের পর থেকেই ইউশাকে অন্যরকম চোখে ভাবতে চাইছে বলে? দুজনের মাঝে বারবার স্বামী-স্ত্রী শব্দটা আসছে বলে? এজন্যেই বুঝি বলা হয়, কবুলের অনেক জোর! অনেক শক্তি! এই শব্দের মতো অনন্য কিছু নেই। এ কীভাবে, কখন,কাকে কার ওপর মায়ায় বেঁধে ফেলবে সেটা স্বয়ং সেই মানুষটাই জানে না। অয়নেরও কি তাই হচ্ছে? নাহলে এত অস্থিরতা কেন? কেন ইচ্ছে করছে এই সময়টাকে থামিয়ে রাখার জন্যে? যেন সময় ফুরালেও, ইউশার ঘুম আর শেষ নাহয়! বাইরে হয়তো শহর জেগে উঠছে, গাড়ির শব্দ বাড়ছে, মানুষ ব্যস্ত হচ্ছে, অথচ তাদের ছোট্ট ঘরে এই নরম নিস্তব্ধতা আজীবন থাকুক।
ও খুব আস্তে হাত বাড়িয়ে ইউশার কপালের উপর পড়ে থাকা চুল সরিয়ে দিল। সুড়সুড়ি লাগল ইউশার। চ সূচক শব্দ করে বিড়বিড় করল,
“ উম মিন্তু,এক চড় মারব ভাগ এখান থেকে।”
অয়ন মজা পেয়ে গেল। চুলের গোছা ভাঁজ করে ওর কানের মধ্যে নাড়তেই,মেয়েটা ভয়াবহ রেগে বলল
“ যেতে বলেছি,ধরলে কিন্তু খবর আছে।”
“ আচ্ছা? কী খবর?”
চটক কাটার ন্যায় চোখ মেলে চাইল ইউশা।
অয়ন ভ্রু নাঁচিয়ে বলল
“ কী খবর? আর কোথায় ধরবি?”
ইউশা তড়াক করে উঠে বসে চারপাশ দেখল এক পল। জিভ কেটে বলল,
“ আমি ভুলেই গেছিলাম,আমি বাড়িতে নেই! আসলে মিন্তুটা প্রায়ই সকালে এসে জ্বালাতন করতো,তুমি কিছু মনে করো না!”
অয়ন গম্ভীর মুখে বলল,
“ কেন করব না?
স্বামীর স্পর্শ চিনিস না, কেমন বউ তুই?”
ইউশা চিবুক নুইয়ে বিড়বিড় করল,
“ স্পর্শ না পেলে,চিনব কী করে?”
অয়ন ভেবেছিল,ইউশা খুব দুঃখ পাবে। সরি টরি বলবে! অথচ উত্তরটা শুনে নিজেই থতমত খেল। পিঠটা সোজা করে চেয়ে রইল আশ্চর্য চোখে। জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে চিত্তচাঞ্চিল্যে রাশ টেনে বলল,
“ তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হ! ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ সব এখন একসাথে সারতে হবে। সময় নেই।”
***
তুশি জ্ঞান হারিয়েছে। সার্থ কোনোরকম চোখের পলকে ফ্রেশ হয়ে এলো। এত দ্রুত তার গতি! যেন উড়ে উড়ে আসা। ততক্ষণে তুশির কাপড় পালটে দিয়েছেন রেহণুমা! সার্থ ইউনিফর্ম বিনে ছুড়ে ফেলেই এসে রেহনূমাকে বলল,
“ ওঠো তো।”
ভদ্রমহিলা মেয়ের মাথার কাছ থেকে উঠে দাঁড়াতেই, সার্থ বসল সেখানে। স্ত্রীর নরম চুলে হাত বুলিয়ে ডাকল,
“ তুশি,এই? শুনছো? অ্যাই চোর? আমি এসেছি তো। ওঠো।”
রেহণূমা ভারি চিন্তিত হয়ে বললেন,
“ মেয়েটা এরকম জ্ঞান কেন হারাল! নাজমা আপা তো বলেছিল চিন্তার কিছু নেই।”
ঘাড় ঘুরিয়ে চাইল সার্থ। কপাল গুছিয়ে বলল,
“ নাজমা আন্টি এসছিলেন?”
“ হ্যাঁ। ওই..”
ও কথা টেনে নেয়,
“ মানে কী,তুশি কখন থেকে অসুস্থ?”
“ এইত কা..”
আবার কথা টানলো,
“ বাড়িতে এত লোক থাকতে ও অসুস্থ হলো কী করে? আমার বউয়ের এই অবস্থা হয় কী করে,ছোটো মা? পাঁচটা দিন বাইরে ছিলাম তাতেই চোখের নিচে কালি,চেহারা ডেবে গেছে। করেছ কী তোমরা? ওর খেয়াল রাখতে পারোনি?”
তনিমা তেল গরম করে ভেতরেই এসেছেন। কথাটা শুনতে পেয়ে বললেন,
“ ওরে বাবা,
এমন করছিস কেন? আমরা তো দেখেই রেখেছিলাম। ওতো অসুস্থ অন্য কার…”
সার্থ বলতে দিলো না,ফের কথা কেড়ে বলল,
“ মা,অজুহাত দিয়ো না।
তোমরা ওর কী খেয়াল রেখেছ সেটা ওর মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে। আমি সুস্থ বউ রেখে গিয়েছিলাম। অসুস্থ বানিয়েছ!”
রেহণূমা হাঁ করে বললেন,
“ আমরা অসুস্থ বানিয়েছি?”
তারপর জায়ের সাথে একবার মুখ দেখাদেখি করে বললেন,
“ আমরা আবার কী করলাম?”
সার্থ চটে বলল,
“ আবার জিজ্ঞেস করছো? তোমরা না করলে কারা করেছে? কার জন্যে অসুস্থ হয়েছে ও?
দুই মা আবার দুজনের মুখ দেখলেন।
এখন মা নাহলে একটা কথা বলতেনই উত্তরে। কার জন্যে যে অসুস্থ তুশি, দিতেন জবাবটা। শুধু ছেলে বলে পারলেন না!
সার্থ রেগে রেগে বলল,
“ আমার কিন্তু মেজাজ খারাপ হচ্ছে! অস্থির লাগছে,মা। হাসপাতালে নিতে চাইলাম দিচ্ছো না। জ্ঞানও ফিরছে না! আমি কি ওকে এভাবে দেখব বলে সব ফেলে এসেছি? ক্রিমিনালগুলোকে কোনোরকম জিপে ভরে দিয়ে, বাইক ঘুড়িয়ে বাড়ি এসেছি এইজন্য?”
তনিমা বলতে গেলেন,
“ সার্থ, তুশি তো মা…”
“ মা কথা বলো না। আগে আমার বউয়ের জ্ঞান ফেরাও। কী এনেছ? লাগাও এটা।”
তনিমা শ্বাস ফেলে তুশির কোমরের কাছে বসলেন। গরম তেল হাতের তালুতে ঘষতে শুরু করার মাঝেই,রেহণূমা রয়েসয়ে বললেন,
“ তুই কি একটু কফি খাবি সার্থ?”
সার্থ ভয়ানক চটে বলল,
“ তুমি কি তুশির সৎ মা?”
“ ওমা না! কেন?”
“ মেয়ে এভাবে পড়ে আছে,আর তুমি কফির কথা বলছো। আশ্চর্য!”
রেহণূমা মিনমিন করে বললেন,
“ সরি বাবা!”
তনিমা নিচের দিকে চেয়ে ঠোঁট চেপে হাসলেন। সার্থর চোখে পড়ল সেটা। এইবার মায়ের ওপর ক্ষেপল সে। চ্যাঁচিয়ে বলল,
“ বাড়ির সবার কি এক সাথে মাথা খারাপ হয়ে গেছে? আমার বউ অসুস্থ,তা নিয়ে কারো কোনো চিন্তা নেই। একজন কফি খাওয়াচ্ছে,আরেকজন হাসছে।”
তনিমা নিষ্পাপ গলায় বললেন,
“ আমি কই হাসলাম?”
সার্থ ভ্রু কুঁচকে চোখমুখ পাথর করে বসে রইল। হাতটা তখনো তুশির চুলে একইরকম বোলাচ্ছে। রেহণূমা জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে ডাকলেন,
“ সার্থ, শোন না
একটা খুশির খবর আছে।”
ও খ্যাক করে বলল,
“ শুনব না আমি। ফর গড শেইক তোমরা হয় নিজেদের কাজ করো,নাহলে যাও এখান থেকে।”
কথার শেষেই ওর ফোন বাজল। চ সূচক শব্দ করল সার্থ। ধরবে না ভাবলেও,রেহণূমা দাঁড়িয়ে থাকায় স্ক্রিন দেখে বললেন – শরিফ!
অগত্যা উঠে এলো সার্থ। টেবিল থেকে তুলে ফোন কানে ধরতেই শরিফ হড়বড়িয়ে বললেন
“ স্যার, ঝামেলা হয়ে গেছে। একটু তাড়াতাড়ি আসলে ভালো হয়। প্লিজ স্যার…”
ও বলল,
“আচ্ছা ঘন্টাখানেক পরে বের হচ্ছি!”
“ না স্যার,এক্ষুনি লাগবে। প্লিজ স্যার…”
সার্থ ভাবল কেউ পালিয়েছে! কিংবা কোনো বাঁঘা তেতুল এসেছে কিনা গ্যাংয়ের পক্ষ নিয়ে। আবার তুশির এই অবস্থা, ফেলে যেতেও ইচ্ছে করছে না। এক পল দোটানা নিয়ে স্ত্রীর মলিন মুখটায় দেখল ও। পাঁচদিনে কী অবস্থা! মেয়েটা কি ওকে বেশি মিস করেছে? সেও তো করেছে। প্রতি প্রহর, প্রতি মূহুর্ত। ফিরে এসে সব বিরহ আজ সব পুষিয়ে দেবে নাহয়! কিন্তু তার আগে চোখটা তো মেলুক,একবার দেখুক ওকে। বলুক কিছু!
সার্থকে থম ধরে তুশির দিকে চেয়ে থাকতে দেখে রেহনূমা আগ বাড়িয়ে বললেন,
“ কাজ পড়লে যা সার্থ। তুশিকে নিয়ে চিন্তা করিস না,আমরা আছি তো।”
সার্থ স্পষ্ট গলায় বিড়বিড় করল,
“ সেটাই বেশি চিন্তার। কী আছো, উদাহরণ তো দেখলাম।”
রেহণূমা বাচ্চাদের মতো ঠোঁট উলটে জায়ের দিকে চাইলেন। তনিমা হাসি আটকাতে বারবার ঠোঁট টিপে এদিক ওদিক দেখছেন।
সার্থ ফোনটা রেখে, কাবার্ডের দিকে এগিয়ে যায়। ব্যস্ত গলায় বলে,
“ বাধ্য হয়ে যাচ্ছি। কথায় কাজে মিল থাকে যেন! দেখো ওকে, আমি যাব আর আসব।” তারপর কালো ট্রাউজারের ওপর কালো শার্ট চড়িয়েই ছুটল চাবি তুলে।
রেহণুমা আক্ষেপ করে বললেন,
“ যাহ,আসল কথাই বলতে পারলাম না।”
চলবে।।
Share On:
TAGS: কাছে আসার মৌসুম, নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬৫
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪৯
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪৮
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫০(প্রথমাংশ+ শেষাংশ)
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪৪
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৭ ক
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬৯.২
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫১
-
হেই সুইটহার্ট পর্ব ১