Golpo romantic golpo অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা

অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৮৫


#অ্যাঞ্জেল_অ্যাঞ্জেলিনা
[পর্ব ৮৫]
#লেখিকা_ফারহানা_নিঝুম
(
দূর্বল হৃদয়ের পাঠকদের জন্য গল্পটা একদম নয়।)
(
কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)
[দ্বিতীয় খন্ড]
টিকটিক শব্দে ঘড়ির কাঁটা ঘুরে চলেছে। জুতোর প্রতিটি ধাপ নীরবতার বুক চিরে অশুভ সংকেত ছড়াচ্ছে। বেসমেন্টের স্যাঁতসেঁতে করিডোর জুড়ে সেই শব্দের প্রতিধ্বনি এক অদ্ভুত ভয়ের আবহ তৈরি করতে ব্যস্ত। যেন দেয়ালগুলোও শ্বাসরুদ্ধ হয়ে অপেক্ষা করছে কোনো অনিবার্য ঘটনার।
আফরিদের চোখদুটি অন্ধকারে আরও ধারালো হয়ে উঠেছে। তার দৃষ্টিতে অদ্ভুত হিসেবি শীতলতা এক ধরনের নির্মম নিশ্চয়তা। লোহার দরজার সামনে এসে সে থামল, আঙুলের হালকা চাপে তালার শব্দ ভেঙে গেল নীরবতার গায়ে। দরজা খুলতেই এক গুমোট গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল, এ যেনো বহুদিনের বন্দিত্ব আর পচে যাওয়া সময়ের মিশ্রণ।
ঘরের ভেতরে ঝুলন্ত হলদেটে বাল্বটা কাঁপতে কাঁপতে আলো ছড়াচ্ছে ধীরে ধীরে।সেই আলোয় ধরা পড়ল আলিয়াজের মুখমণ্ডল। মানুষের মতো নয় , মুখটা কেমন কালচে হয়ে আছে। দু’হাতে ভারী শিকল, পায়েও বাঁধা লোহার বন্ধন। শরীর জুড়ে ক্ষতচিহ্ন, শুকিয়ে যাওয়া র’ক্তের দাগ যেন অতীতের প্রতিটি নির্যাতনের সাক্ষী হয়ে আছে। বহুদিন ধরে পানির স্পর্শ না পাওয়া দেহটা থেকে বাজে গন্ধ বেরুচ্ছে।
তীক্ষ্ণ তার দৃষ্টি। তার চোখ সেই চোখে আগু’ন এখনো নিভে যায়নি।
আফরিদ ঠোঁটের কোণে ধীর, রহস্যময় হাসি টেনে সামনে রাখা চেয়ারটা টেনে বসলো। তার হাতে থাকা ছোট্ট প্যাকেটটা টেবিলের ওপর রাখতেই হালকা ঠক্ করে শব্দ হলো যেন কোনো গোপন খেলার সূচনা সংকেত।
আলিয়াজ তাকিয়ে রইল। তার দৃষ্টি রক্তা’ক্ত, তীব্র, আর ভীষণ ক্লান্ত। বহু বছরের অন্ধকার তাকে ভেঙে দিয়েছে, কিন্তু শেষ করে দিতে পারেনি। তার বুকের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ যেন প্রতিটি নিঃশ্বাসে ধুকপুক করে উঠছে।
এই ঘর এই চার দেয়াল তার কাছে শুধু বন্দিত্ব নয়, ধীরে ধীরে মৃ’ত্যুর এক দীর্ঘ যন্ত্রণা। সময় এখানে থেমে গেছে, অথচ কষ্ট থামেনি এক মুহূর্তের জন্যও। বাইরের পৃথিবী কি তাকে ভুলে গেছে? তার নাম, তার অস্তিত্ব সবকিছু কি মুছে ফেলেছে আফরিদ?
নাকি এই অন্ধকারেই প্রতিশোধ জন্ম নিচ্ছে?
আফরিদ সামান্য ঝুঁকে এল, কণ্ঠস্বর নিচু কিন্তু ছুরির মতো ঠান্ডা,
“কেমন আছো, আলিয়াজ?”
প্রশ্নটা ছিল সরল, কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে ছিল অসংখ্য অমীমাংসিত রহস্য। বাল্বটা আবার কেঁপে উঠল। আফরিদ হালকা হাসলো। আলিয়াজ হাত নাড়তেই শিকলের শব্দ হলো।
“আমাকে এবার মুক্তি দে আফরিদ। তোর প্রতিশোধ কি পূর্ণ হয়নি এখনো?”
আলিয়াজের কথায় নির্মম হাসি ফুটে উঠে ওষ্ঠো পুটে। মাথা ঝাঁকিয়ে অদ্ভুত ভঙিতে বলল,
“তোদের মতো মানুষগুলোর শাস্তি কখনো ফোড়ায় না রে! কখনো না!”
আলিয়াজ তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে বলে,
“তুই কি নিজেকে পবিত্র বলে দাবী করছিস আফরিদ? আমার থেকেও বড় পাপী তুই!”
আফরিদ কপালের একপাশ ঘষে বলে,
“উঁহু,আমি মোটেও ভালো মানুষ নই। আমিও পাপী।”
আলিয়াজ তাকালো আফরিদের হাতের প্যাকেটের দিকে। আফরিদ প্যাকেট খুলে তাজা মাংস গুলো তার দিকে ছুড়ে দিলো। প্রসন্নচিত্তে আওড়ে,
“যাইহোক, তোকে একটা খবর দেই? আমার বউ ইলহাম ন্যান্সি অ্যাঞ্জেলিনা প্রেগন্যান্ট। আমার বাচ্চার মা হতে চলেছে।”
আলিয়াজ আফরিদের দেওয়ার মাংসের উপর হামলে পড়েছিল রীতিমতো। এহেন সময় এমন একটা কথা শুনে বরফের ন্যায় জমে গেল। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। প্রশ্নবিদ্ধ নয়নে আফরিদের দিকে তাকালে সে হেসে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
“ইয়েস। আমার স্ত্রী প্রেগন্যান্ট। আমি বাবা হতে চলেছি। এখন থেকে মনদিয়ে বউয়ের সাথে সংসারও করব।”
চোখের সামনে সিনেমার পর্দায় যেভাবে প্রতিটি দৃশ্য একের পর এক রিপিট দেখানো হয় ঠিক সেভাবেই আলিয়াজের চোখের সামনে অতীতের কিছু তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ভেসে এলো। মস্তিষ্ক এলোমেলো হয়ে গেল সেকেন্ডের মধ্যে। উন্মাদের ন্যায় চেষ্টা করে চলেছে শিকল থেকে মুক্তি পাওয়ার।
“তুই বাবা হতে পারিস না। পারিস না তুই বাবা হতে। তুই একটা জানোয়ার রে। আমার সন্তানকে শেষ করে কিভাবে বাবা হোস তুই?”
আফরিদ গা দুলিয়ে হেসে উঠলো। স্তিমিত হয়ে বলল,
“তাই নাকি? আমি বলেছিলাম নিজের মেয়েকে খেয়ে ফেল?”
আলিয়াজ হিসহিসিয়ে বলল,
“না তুই শেষ করতে বাধ্য করেছিস! আমি চাইনি খেতে।তুই বাধ্য করেছিস!”
আফরিদ তপ্ত নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
“রিভেঞ্জ। মনে আছে অতীতের গল্প? মানুষের অতীত তার বর্তমান তৈরি করে। তোর অতীত তোর বর্তমান এই আফরিদের হাতে মৃ’ত্যু লিখেছে। খুব শীঘ্রই সব গল্প শেষ করব। তারপর ইলহামের সাথে…
হাত উঠিয়ে প্লেন উড়ে যাওয়ার মতো করে দেখিয়ে বলল,
“ফুড়ুৎ। উড়ে যাবো।”
আলিয়াজ তাচ্ছিল্যের সুর টেনে হিমশীতল টুনে আফরিদের উদ্দেশ্যে সতর্ক বাণী ছাড়ল,
“এতটাও কল্পনা করিস না আফরিদ। ইলহাম যখন সবটা জানতে পারবে তখন তুই নিঃস্ব!”
আফরিদ যেতে যেতে স্থূল দৃষ্টিতে চেয়ে বলে,
“ওকে আমিই জানিয়ে দেব সব। সময় হয়ে এসেছে, আমার সন্তান পৃথিবীর আলো দেখা মাত্রই সব সত্যি ওর সামনে উন্মুক্ত হবে।”
আলিয়াজ স্তম্ভিত হয়ে বসে রইল। আবারো তাকে অন্ধকার ওই বেসমেন্টে ফেলে চলে গেল।
সত্যি কি আফরিদ এহসান এতদিন যেভাবে আড়ালে আবডালে আ’গুন্তক সেজে ন্যান্সিকে সবটা জানিয়ে এসেছে,ঠিক সেইভাবে সামনাসামনি ধোঁয়াশা সরিয়ে আলোয় নিয়ে আসতে পারবে সেই সত্য? প্রিয় স্ত্রী কি মেনে নেবে তার এই অপরাধী,পাপী সত্তাকে? গ্রহণ করবে স্বামী স্বরূপ?
বড্ড দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে মনস্টার মাফিয়া! আজকাল ইলহাম ন্যান্সি অ্যাঞ্জেলিনা নামক নারী ব্যতিত থাকা কল্পনা করা দুস্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে কি হতে চলেছে তার ধারণা করতে সক্ষম নয় মনস্ট মাফিয়া। বড় ভয় হয় খ্রিস্টান রমণীকে হারিয়ে ফেলার ভয়। তীব্র এই অনুরাগ সবটাই কি তবে বৃথা যাবে?


স্পেন বার্সেলোনা…
এই সাত সকালে রাইসাকে ডেকে পাঠিয়েছে ইস্ক্রিয়াস। কেন ডেকেছে জানা নেই মেয়েটার। ইস্ক্রিয়াসের মুখোমুখি হতে ভীষণ লজ্জা অনুভব করছে কন্যা। করবেই তো! যে লোকটাকে বিশ্বাস করে অতীতের সত্যিটুকু আচ্ছাদিত করে সেই লোকটা বলা নেই কওয়া নেই হুট করে তাকে ফেলে চলে যায়।
অবশ্য প্রথম থেকেই এমন কিছু আন্দাজ করেছিল সে,তবে কেন হৃদয় তা মেনে নিতে নারাজ ছিলো? হৃদমঞ্জিলে একটুখানি আশার আলো জেগেছিল। হয়তো এটুকু আশা করেছিল ইস্ক্রিয়াসের কাছে সে তাকে ফেলে যাবেনা। কিন্তু দুনিয়া যে বড় নিষ্ঠুর, সব কিছু এই স্বার্থপর মানুষদেরও দ্বারা সম্ভব তা ভুলেই বসেছিল কন্যা।
তাই তো দু’টো দিন দুরত্ব বজায় রেখেছে।না দেখা করেছে আর না ফোনালাপ! এই দুটো দিনে নিজেকে অনেক বুঝিয়েছে রাইসা। নিষ্ঠুর এই সমাজ,এই পৃথিবী চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বলেছে,
“দেখ, তোদের মতো মেয়েদের এই সমাজের কেউ আপন করে নিতে পারেনা।তোরা এক একজন শুধু ভোগের বস্তু!”
মাঝরাতে হৃদয়টা হুহু করে কেদে উঠে। বুকের ভেতর হাহাকার! আহ্ ভালোবাসা হারিয়ে ফেলার কষ্ট।
রাইসা চাইলেই তো সবটুকু সত্য গোপন করে ছোট্ট একটি সংসার বাঁধতে পারতো। কিন্তু মন যে সায় দেয়নি!
তপ্ত নিঃশ্বাস ছেড়ে পরণে ঢিলাঢালা টপস্ আর একটা টাইস স্ক্রিন জিন্স পরে বেরিয়েছে একত্রে।গলায় স্কাফ জড়িয়ে ফোনটা নিয়ে শেষবারের মতো আয়নায় নিজেকে দেখে তপ্ত নিঃশ্বাস ছেড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে।
এটা তার নতুন বাড়ি, স্পেনে ফেরার পর ইদ্রান ব্যবস্থা করে দিয়েছে।
অবশ্য ইস্ক্রিয়াস তা সম্পর্কে অজ্ঞাত!
খোলা আকাশের নিচে পার্কের একটি বেঞ্চে বসে আছে রাইসা। দৃষ্টি তার নিজের পায়ের দিকে। ক্লান্ত লাগছে। মিনিট দশেক হলো বসে আছে কিন্তু যার জন্য বসে আছে সে এখনো পৌঁছায়নি। তপ্ত নিঃশ্বাস ছেড়ে তবুও অপেক্ষার প্রহর গুনছে মেয়েটা।
আরো কয়েক মিনিট পেরুতেই পিছন থেকে কেউ ধীর গলায় বলল,
“পুতুলের মতো লাগছে।”
ফ্যাকাশে মুখটার বিস্ময়ে খানিকটা চমকে ওঠার মতো ফিরে তাকালো। ইস্ক্রিয়াস দাঁড়িয়ে আছে। পরণে ফর্মাল ড্রেসআপ!
“ওহ্, তুমি?”
ইস্ক্রিয়াস এগিয়ে এলো, রাইসার দিকে তাকিয়ে অগোচরে মুচকি হাসলো। রাইসা নত মস্তকে বসে আছে। রাইসার ঠিক পাশেই বসল ইস্ক্রিয়াস। ফুরফুরে মেজাজ তার। রাইসা টু শব্দটি করছে না। শুধু শুকনো ঢোক গিলে।
“অনেকক্ষণ অপেক্ষা করিয়েছি তাই না?”
“ন.. না,খুব একটা নয়!”
কথা বলতে গিয়ে রাইসা অনুধাবন করতে পারছে আড়ষ্টতা।আগের মতো খোলামেলা হতে পারছে না তার সাথে।
ইস্ক্রিয়াস মেয়েটার আড়ষ্টতা ধরে ফেলল সেকেন্ডের মধ্যে। অধরষ্টো কাঁপছে তার। সবটাই দেখছে। তার কাছে তো এই রমণীর।
“চলো।”
কথা নেই বার্তা নেই হাত টেনে রাইসাকে দাঁড় করিয়ে দিলো ইস্ক্রিয়াস। ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকিয়ে গেল রাইসা।
“কো.. কোথায় যাবো?”
রাইসা এতক্ষন ধরে এটাই ভাবছে ইস্ক্রিয়াস কেন তাকে এখনো খোলা ছেড়ে রেখেছে? লোকটা চাইলেই তো তাকে অ্যারেস্ট করে ফেলতে পারতো?
ইস্ক্রিয়াস কোনো রকম প্রত্যুত্তর ছাড়া রাইসাকে নিয়ে যাচ্ছে। একটা গাড়িতে গিয়ে উঠে বসলো। রাইসা প্রশ্ন করতেও ভয় পাচ্ছে!
ইস্ক্রিয়াসের ওই কঠিন মুখাবয়ব দেখে অন্তরে সাহস হচ্ছে না প্রশ্ন করার।
“কী?”
ওপর পাশের লোকটা প্রশ্ন করে বিভ্রান্তে ফেলে দিচ্ছে তাকে!
“আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
দ্বিতীয় দফায় একই প্রশ্ন করেছে মেয়েটা! পাল্টা জবাবে স্থূল দৃষ্টিতে তাকালো ইস্ক্রিয়াস, অকস্মাৎ গ্রীবা ঘঁষে হিসহিসিয়ে বলল।
“বিয়ে করতে।”


রাতের নীরবতায় ন্যান্সি প্রেগন্যান্ট এই সত্যটা কোনো মতেই বিশ্বাস করতে পারছে না আফরিদ। মনের কোনো এক গোপন কোণে সংশয়ের কাঁটা এখনো বিঁধে আছে। তাই নিজেকে বোঝানোর অদম্য প্রচেষ্টায় দিনের অর্ধেকটা সময় কাটিয়েছে অফিসে, আর বাকি সময়টা পার করেছে তার নিজস্ব রিসার্চ সেন্টারে। যেন যুক্তি, তথ্য আর পরীক্ষার স্তূপের মাঝখান থেকে সে নিজের জীবনের এই অকল্পনীয় সত্যটার কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা খুঁজে বের করতে চায়।
অবশেষে গভীর রাতে ফিরল সে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে আছে সমগ্র বাড়ি। মনে হচ্ছে, রজনী নিজেই যেন তার কৃষ্ণবর্ণ চাদর মেলে প্রতিটি প্রান্ত ঢেকে দিয়েছে। চারপাশে নিস্তব্ধতার এমন নিবিড় আবরণ, যেন সমগ্র পৃথিবীই নিদ্রার অতল গহ্বরে তলিয়ে গেছে।
সেই নৈঃশব্দ্য ভেদ করে ধীর পায়ে এগিয়ে এলো আফরিদ। তার পদক্ষেপে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। বরং প্রতিটি পদক্ষেপে যেন অদৃশ্য কোনো ভার বহন করছে সে অজস্র প্রশ্ন, অপ্রকাশিত অনুভূতি আর এক নতুন পরিচয়ের অস্বস্তিকর উত্তে’জনা।
নিজের কক্ষের সামনে এসে দরজাটা নিঃশব্দে খুলে ভেতরে প্রবেশ করল। অতঃপর অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দরজাটা বন্ধ করে দিল।
ডিম লাইটের মৃদু আলোয় ঘরটা আবছা হয়ে আছে।
আর সেই আবছা আলোতেই বিছানার ওপর শান্ত, নির্ভার ঘুমে আচ্ছন্ন ন্যান্সিকে দেখা গেল।
হালকা কম্ফোর্টে আচ্ছাদিত শরীর। মুখশ্রীতে গভীর প্রশান্তি। এলোমেলো চুল কয়েকগুচ্ছ এসে পড়েছে কপালের ওপর। মনে হচ্ছে, পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি থেকে নিজেকে সরিয়ে সে আশ্রয় নিয়েছে এক নিরাপদ, নিরুপদ্রব ঘুমের রাজ্যে।
দরজার কাছে দাঁড়িয়েই স্থির হয়ে গেল আফরিদ।দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইল। চোখে বিস্ময়মনে অবিশ্বাস আর সেই সমস্ত অনুভূতির গভীরে এমন এক কোমলতা, যা এই দুর্ধর্ষ মানুষটির সঙ্গে যেন একেবারেই বেমানান।
সে বাবা হতে চলেছে। এই একটি সত্য এখনো তার মস্তিষ্ক পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারছে না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে অবশেষে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল আফরিদ।
প্রায় আধঘণ্টা পর বেরিয়ে এলো সে। ভেজা চুল, সতেজ মুখশ্রী, অথচ চোখেমুখে সেই একই অস্থিরতা।দৃষ্টি আবারও গিয়ে থামল ন্যান্সির ওপর। এবার আর দূরত্ব বজায় রাখল না। ধীর পায়ে বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে থেকে নিচু হয়ে তার মুখের দিকে চেয়ে রইল।
নরম আলোয় ন্যান্সিকে আজ আরও অপার্থিব লাগছে।আফরিদের অধরে ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল।অতি নিম্ন, গভীর স্বরে বলল,
“ঘোর অমানিশায় ডুবে থাকা এই কলঙ্কিত সত্তাটাকে তুমি যে নিজের অন্দরমহলে আশ্রয় দিয়েছো, তার প্রতিদান দেওয়ার মতো কিছুই আমার নেই, অ্যাঞ্জেলিনা।”
কিছুক্ষণ থামল সে। ন্যান্সির ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে আবার বলল,
“তবু এই জীবনটা, এই নিঃশ্বাসগুলো সবটুকু তোকে উৎসর্গ করলাম।”
আঙুলের ডগায় আলতো করে ন্যান্সির কপালে পড়ে থাকা চুল সরিয়ে দিল। স্পর্শটুকুতেও যেন অদ্ভুত সতর্কতা।
“তুই জানিস না, তুই ঠিক কতটা অলৌকিক। আমার অন্ধকারে ডুবে থাকা জীবনের একমাত্র আলো, একমাত্র প্রশান্তি।”
ন্যান্সি নিশ্চুপ। ঘুমের গভীরে তলিয়ে থাকা মুখশ্রীতে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।
আফরিদ ধীরে ধীরে বিছানার কিনারায় বসে পড়ল।কয়েক মুহূর্ত নীরবে তাকিয়ে থেকে হঠাৎই যেন তার মাথায় নতুন কোনো দুষ্টুমি চেপে বসল। পরক্ষণেই ন্যান্সির কাঁধ ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল,
“এই রক্তচোষা ডাইনি! ওঠ!ওঠ বলছি।”
ন্যান্সি ধড়ফড় করে উঠে বসল। চোখেমুখে নিদ্রার ঘোর। এলোমেলো চুল। বিস্মিত দৃষ্টিতে সামনে বসে থাকা মানুষটার দিকে তাকিয়ে রইল।
আফরিদ গম্ভীর মুখে প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
“তুই প্রেগন্যান্ট হলি কী করে?”
ন্যান্সি কয়েক সেকেন্ড তার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। ঘুমজড়ানো মস্তিষ্ক যেন প্রশ্নটার অর্থই খুঁজে পাচ্ছে না। অবশেষে বিরক্ত কণ্ঠে বলল,
“কী হলো? বল, তুই প্রেগন্যান্ট হলি কী করে?”
ন্যান্সি চোখ কচলাতে কচলাতে নির্লিপ্ত স্বরে বলল,
“নাচতে নাচতে।”
আফরিদের মুখের পেশি শক্ত হয়ে গেল।
“এক থাপ্পড় দেব, বেয়াদব!”
ন্যান্সি ঠোঁট ফুলিয়ে পাশ ফিরে বলল,
“আমার স্বামী আছে, তাই প্রেগন্যান্ট হয়েছি। আপনার না জানলেও চলবে। যত্তসব!”
এক মূহুর্ত থেমে ফের বলল,
“আপনার স্বামী থাকলে আপনিও প্রেগন্যান্ট হন।”
আফরিদ মুহূর্তেই তার কব্জি ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। চোখ সরু করে তাকিয়ে বলল,
“যতদূর জানি, তুই আমাকে ভালোবাসিস না। তাহলে আমার বাচ্চা এল কী করে তোর এই ছোট্ট পেটে?”
ন্যান্সির চোখ তখন আবার বন্ধ হয়ে আসছে। এ মুহূর্তে তর্ক করার মতো সামান্য শক্তিটুকুও তার নেই। তার ঘুমজড়ানো মুখখানি দেখে আফরিদের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
ন্যান্সি মাথাটা সামনের দিকে এলিয়ে দিতেই তা এসে ঠেকল আফরিদের প্রশস্ত বক্ষে। অতি ক্ষীণ স্বরে বলল,
“ঘুমোতে চাই।”
আফরিদ আর কিছু বলল না। একহাতে আলতো করে তার কোমর জড়িয়ে নিল। সন্তর্পণে নিজের বুকের কাছে টেনে এনে বিছানায় হেলান দিয়ে বসল সে। ন্যান্সিকে নিজের বুকে আগলে রাখল এমনভাবে, যেন তার বাহুবন্ধনের বাইরে পৃথিবীর কোনো বিপদই পৌঁছাতে পারবে না।
কিছুক্ষণ পর মৃদুস্বরে বলল,
“সকালে হিসেব নেব।”
তারপর ন্যান্সির মাথার ওপর থুতনি রেখে গম্ভীর ভঙ্গিতে যোগ করল,
“বান্দির বাচ্চা! তুই আর আমার বাচ্চা দু’জন মিলে আমার সাথেই গাদ্দারি করেছিস।”
চোখ বন্ধ করেই ন্যান্সির পাতলা ওষ্ঠদ্বয়ের কোণে ক্ষীণ এক হাসি ফুটে উঠল। ঘুমের অতলে তলিয়ে যাওয়ার আগমুহূর্তে সে শুধু আরও একটু গভীরভাবে আশ্রয় নিল আফরিদের বুকে।
আফরিদ কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে রইল ন্যান্সির ঘুমন্ত মুখশ্রীর দিকে। এতক্ষণকার দুষ্টুমি যেন মুহূর্তেই কোথায় মিলিয়ে গেল। তার দৃষ্টিতে নেমে এলো গভীর মমতা।
আলতো করে ন্যান্সির কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
“আমার বউটা!”
ফিসফিস করে বলা কথাটুকু যেন রাতের নিস্তব্ধতায় হারিয়ে গেল।
আঙুলের ডগায় ন্যান্সির কপাল ছুঁয়ে ধীরে ধীরে চুলগুলো সরিয়ে দিল সে। তারপর গালে হাত রেখে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল। ঘুমন্ত ন্যান্সি সামান্য নড়েচড়ে আরও নিবিড়ভাবে তার বুকে সেঁধিয়ে গেল।
আফরিদের বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।
“এতদিন তোকে শুধু নিজের মানুষ ভেবেছি!”
কণ্ঠটা অদ্ভুত কোমল হয়ে এলো।
“আজ বুঝছি, তুই একা আর আমার নস। তোর ভেতরেও আমার একটা পৃথিবী বেড়ে উঠছে।”
ন্যান্সির চুলের ভাঁজে আবারও চুমু আঁকল সে।
“কী করে এতটা ভাগ্যবান হলাম বল তো, অ্যাঞ্জেলিনা?”
কোনো উত্তর এলো না। আফরিদ মৃদু হেসে ন্যান্সির গালটা আলতো করে চেপে দিল।
“ঘুমা। এখন আর জ্বালাব না।”
ন্যান্সি ঘুমের ঘোরেই অস্পষ্টভাবে কিছু একটা বিড়বিড় করল। আফরিদ হেসে তার কপালে শেষবারের মতো চুমু দিয়ে কম্ফোর্টটা ভালো করে টেনে দিল দু’জনের ওপর।
তারপর ন্যান্সিকে আরও সাবধানে বুকের মধ্যে আগলে নিয়ে চোখ বুজল। বহু বছর পর, নিজের অন্ধকার জীবনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আফরিদের মনে হলো এই রাতটা যেন তার জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল রাত।
চলবে………….।
তারপর বলো প্রচ্ছদটা কেমন? আমি এডিট করলাম!
(
মাইনষের সুখ সহ্য হয় না। মন চাইছে ন্যান্সির গলাটা টিপে দেই
আচ্ছা যদি আলিয়াজ আর আগুন্তক নারীর বিয়ে দেই তাহলে কেমন হবে জুটি?
)
আমার আইডি Farhana Nijum See less

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply