#অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন (৭৬)
#সোফিয়া_সাফা
সকাল নয়টা।
হসপিটালের ওটির সামনে এক বুক উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এস্টেটের সকলে। অনির কপাল মিনিটে মিনিটে ঘেমে যাচ্ছে। তার ভেতরের ছটফটানি এতটাই তীব্র যে, সে অনবরত করিডোর জুড়ে অস্থির পায়ে পায়চারি করে চলেছে। লুহান আর রিদম তার দুপাশে হেঁটে তাকে বারবার সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু অনির মন যেন কিছুতেই শান্ত হতে চাইছে না।
ঠিক কয়েক মুহূর্ত পরেই ওটির ওপরের লাল বাতিটা নিভে গেল এবং প্রধান ডাক্তার অত্যন্ত ধীরস্থির পায়ে ওটি থেকে বের হয়ে এলেন। মুখের সার্জিক্যাল মাস্কটা এক টানে থুতনিতে নামিয়ে, মৃদু হেসে স্প্যানিশ ভাষায় বললেন, “ফেলিসিদাদেস! ছেলে হয়েছে। মা এবং বেবি দুজনেই ভালো আছে।”
ডাক্তারের মুখ থেকে কাঙ্ক্ষিত সুখবরটা শোনা মাত্রই যেন অনির বুকের ওপর চেপে থাকা ভারী পাথরটা নেমে গেল। তার চোখ দুটো আনন্দের জলরাশিতে চিকচিক করে উঠল। সবাইকে পেছনে ফেলে অনি প্রায় দৌড়ে চলে গেল তার সদ্যোজাত ছেলেকে একনজর দেখতে। এরপর একে একে পালাক্রমে লুহান, রিদম, মেলো, উর্বী সবাই গিয়ে সেই ফুটফুটে ছোট্ট প্রাণটাকে দেখে এল; শুধু একজন বাদে।
তেহজিব খানজাদা ওরফে উদ্যান!
সে তখন হসপিটালের করিডোরের শেষ প্রান্তে থাকা একটা চেয়ারে বসে ছিল। তার পুরো মনোযোগ নিবদ্ধ ফোনের স্ক্রিনে। সে ওয়ালপেপারে থাকা ফুলের হাসিমুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে; যেন এই মুহূর্তে এর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ আর দ্বিতীয়টি নেই।
উদ্যান গ্যালারিতে ঢুকে ফুলের ছবিগুলো জুম করে দেখতে লাগল। ভাগ্যিস, ছবিগুলো সে ডিলিট করেনি!
ফুলের সাথে নিজের কাপল পিকগুলো দেখে তার ঠোঁটের কোণে দুর্লভ হাসির রেখা ফুটে উঠল। ঠিক তখনই ঘোরের মাঝে ছন্দপতন ঘটিয়ে রিদম এসে ধপ করে বসল তার পাশের খালি চেয়ারটায়। রিদমের উপস্থিতি টের পাওয়া মাত্রই উদ্যান অত্যন্ত আলগোছে ফোনটা লক করে পকেটে ঢুকিয়ে রাখল; যেন সে কিছুই করছিল না।
রিদম উদ্যানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী রে তেহ, তুই এখানে বসে আছিস কেন? অভ্রনীলকে দেখতে যাবি না?”
উদ্যান ভ্রু কুঁচকে প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকাল, “কে অভ্রনীল?”
রিদম মৃদু হেসে বলল, “আরে, অনির ছেলের নাম অভ্রনীল। ছেলেকে দেখেই অনি ওর নাম ঠিক করে ফেলেছে।”
“ওহ, তাই বল।”
“দেখতে যাবি না?”
উদ্যান এবার চেয়ারে হেলান দিয়ে বাহু টানটান করে বলল, “যাবে তো এস্টেটেই, আমাদের সাথেই থাকবে। হম্বিতম্বি করে দেখতে যাওয়ার কী আছে?”
রিদমের মুখের হাসিটুকু এক নিমেষে মিলিয়ে গেল। বেশ ক্ষোভের সাথে সে বলল, “তুই কি কোনোদিনও ব্রেন দিয়ে না ভেবে মন দিয়ে ভাবতে পারবি না তেহ?”
“মন দিয়ে আবার ভাবা যায় নাকি? ওটা তো একটা কথার কথা। সাইন্স বলে, মানুষ সবসময় ব্রেন দিয়েই ভাবে। হার্ট তো জাস্ট রক্ত পাম্প করার একটা যন্ত্র মাত্র।”
রিদম বুঝতে পারল, উদ্যানের সঙ্গে বেহুদা তর্কে জড়িয়ে লাভ নেই। এই দানবের মাঝে আদৌ হার্ট আছে নাকি, তারই তো কোনো ঠিক নেই! হার্টলেস মনস্টার একটা। সে কীভাবে বুঝবে পৃথিবীতে আবেগ-অনুভূতি বলেও কিছু এক্সিস্ট করে!
কিছুক্ষণ পর অনি নিজেই ছেলেকে নিয়ে উদ্যানের পাশে এসে বসল। উদ্যান আড়চোখে আড়ষ্ট ভঙ্গিতে তাকিয়ে দেখল, অনির কোলে ধবধবে সাদা তোয়ালেতে মোড়ানো এক অতি ক্ষুদ্র অস্তিত্ব। তুলতুলে ছোট্ট দুটো হাত আর পা বাতাসে অনবরত ছোড়াছুড়ি করছে।
দৃশ্যটা দেখা মাত্রই উদ্যানের গলাটা কেমন যেন শুকিয়ে এল। সে একটা ফাঁকা ঢোক গিলে দৃষ্টি সরিয়ে অনর্থক অন্যদিকে চেয়ে রইল। আচ্ছা, সে কি কোনোদিনও সেই দৃশ্যটা ভুলতে পারবে না, যেদিন তার বোনকেও সে ঠিক এমনই অবস্থায় দেখেছিল? কিন্তু তার মধ্যে কোনো নড়নচড়ন ছিল না। সেই ভয়ঙ্কর অতীত কি কোনোদিনও তার পিছু ছাড়বে না?
অনি বাচ্চার দিকে তাকিয়ে পরম তৃপ্তিতে বলল, “এই তেহ, তুই তো অভ্রকে দেখতে যাসনি। এই দেখ, ও নিজেই বাবার কোলে চড়ে তোকে দেখতে চলে এসেছে।”
উদ্যান মাথা থেকে বোনের চিন্তা ঝেড়ে ফেলতে চাইল। অভ্রনীলকে দেখেও কেন তার বোনের কথাই মনে পড়বে? দ্যাটস আনফেয়ার! টু মাচ আনফেয়ার।
সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনির কোলে থাকা ছোট্ট বাচ্চাটার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। বাচ্চাটা তখনো চোখ দুটো বন্ধ রেখে নিজের নরম হাত-পা নাড়ছিল। তার গাল দুটো, ঠোঁট আর ছোট্ট নাকটা অসম্ভব রকমের লালচে আভায় ভরে আছে; যেন হালকা ছোঁয়াতেই ফেটে যাবে। উদ্যানের চাউনি নরম হলো। পরমুহূর্তেই অনির দিকে সরু চোখে তাকিয়ে বলল, “একেবারে তোর মতো হয়েছে।”
অনির ঠোঁটের কোণ প্রসারিত হলো। ছেলের কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলল, “বাপ কা বেটা বলে কথা! আমার ছেলে তো আমার মতোই হবে।”
উদ্যান দেখাদেখির পাঠ চুকিয়ে পকেটে হাত গুঁজে এস্টেটে ফেরার উদ্দেশ্যে করিডোর বেয়ে দ্রুত পায়ে হাঁটা ধরল।
,
,
,
দেখতে দেখতেই যেন ক্যালেন্ডারের কয়েকটা পাতা টপাটপ উলটে গেল। আজ নভেম্বরের প্রথম দিন।
উদ্যান তার ঘরের বিশালাকৃতির ড্রেসিং টেবিলের সামনে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আয়নার কাচে নিজের প্রতিবিম্ব; গায়ে জড়ানো ডার্ক চকলেট কালারের ব্লেজার, পায়ে কালো জুতো, আর বাঁ কবজিতে ব্ল্যাক বেল্টের দামি হাতঘড়ি। গালে হালকা খোঁচা-খোঁচা দাড়ি।
সেই কখন থেকে সে নিজের চুলগুলো নিখুঁতভাবে সেট করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কিছুতেই মনমতো হচ্ছে না। একপর্যায়ে চরম বিরক্তিতে চিরুনিটা টেবিলে ছুড়ে ফেলে সে ফোনটা হাতে তুলে নিল। স্ক্রিনে আঙুল চালিয়ে দ্রুত কাউকে কল করল।
পরপরই তার পাশে এসে দাঁড়াল ফ্লোরা। তাকে যেন কোনো জীবন্ত পুতুলের মতো দেখাচ্ছে; একেবারে ফুলের পুতুল ভার্সন! তার পরনে একটা সুন্দর গোল ঘেরের ফ্রক, বাদামি সিল্কি চুলগুলো একপাশে টেনে বেণি করে রাখা। উদ্যান আয়নায় নিজের চুল ঠিক করতে করতেই ফ্লোরার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল, “আচ্ছা… আমি যদি চুলগুলো এভাবে সেট করি, তাহলে কি ফ্লাওয়ারের দেখতে ভালো লাগবে? তুই মেমোরি ডেটা ঘেঁটে দেখ তো।”
ফ্লোরা সূক্ষ্ম চোখে উদ্যানের দিকে তাকিয়ে হাত বাড়াতেই উদ্যান পেছনে হেলে পড়ল, “ওই, টাচ করতে নিষেধ করেছি না? একবার যেই কথাটা বলব, ভালোভাবে মেমোরিতে ঢুকিয়ে নিবি। ফ্লাওয়ার এসব পছন্দ করে না।”
ফ্লোরা ঠোঁট উলটে বলল, “ওহ হো তেহজিব, আমি আপনাকে টাচ করতে যাচ্ছিলাম না। শুধু চুলগুলো ফুলের যেভাবে ভালো লাগবে, তেমন ভাবে সেট করে দিতে চাইছিলাম।”
“তাও দিতে হবে না। তোকে আমি শুধু চোখ দিয়ে দেখে জাজ করতে বলেছি। চুলেও হাত দেওয়ার অনুমতি নেই, ক্লিয়ার?”
ফ্লোরা যান্ত্রিকভাবে হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। উদ্যান পুরোপুরি রেডি হয়ে ফ্লোরাকে সাথে নিয়ে লিভিং রুমে চলে এল। সেখানে লাগেজ নিয়ে অলরেডি অপেক্ষা করছিল এস্টেটের বাকিরা। আজ উদ্যান তাদের সবাইকে নিয়ে বাংলাদেশে ফিরছে।
দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর জার্নি শেষে পরদিন সকালে তারা বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখল।
নভেম্বরের হালকা কুয়াশা ভেদ করে এয়ারপোর্টের বাইরে আসতেই অনির ব্যস্ততা বেড়ে গেল। সে বারবার অনিলার কোলে থাকা অভ্রনীলের গায়ে জড়িয়ে রাখা নরম বেবি র্যাপারটা ঠিকঠাক করে দিচ্ছিল। বাংলাদেশে এখন বেশ ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে। ছেলেটা এত দিন মেক্সিকোর আবহাওয়াতে ছিল, এখানে এসে তার যাতে কোনোভাবেই ঠান্ডা লেগে না যায়; সেই জন্য দফায় দফায় সে অনিলাকে সতর্ক করে চলেছে।
তারা এয়ারপোর্ট থেকে সোজা চলে এল সোলার এস্টেটে। এত দিন জনমানবহীন থাকায় সোলার এস্টেটের সর্বত্র ধুলোময়লা জমেছে। সার্ভেন্টরা এসেই সেগুলো পরিষ্কার করার কাজে লেগে পড়েছে। এখানে আসা মাত্রই উদ্যান আরও বেশি ফাঁকা ফাঁকা অনুভব করতে লাগল। ইদানীং তার ‘ভালো না লাগা’র অসুখটা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। সে শত চেষ্টা করেও কোনো কিছুকেই নিজের ভালো লাগাতে পরিণত করতে পারছে না। যদিও ফুলকে ফেলে রেখে যাওয়ার পর থেকেই তার অবস্থা এমন, তবুও সোলার এস্টেট যেন আজ নির্দিষ্ট কারো অনুপস্থিতির নালিশ তুলছে। চারপাশটা যেন হাহাকার করে বলছে, সেই ফুলের মতো দেখতে মেয়েটা কোথায়? সবাইকে দেখা যাচ্ছে, কেবল তাকে কেন দেখতে পাচ্ছে না!
এখন গভীর রাত।
ডিনার অনেক আগেই শেষ হয়েছে। সোলার এস্টেটের প্রত্যেকে যে যার রুমে বিশ্রাম নিচ্ছে।
সেই কখন থেকে অভ্রনীল কেঁদেই চলেছে। অনিলা কপালে হাত দিয়ে খাটের ওপর বসে আছে। ছেলেকে কোলে নিয়ে রুমের মধ্যেই গোলগোল ঘুরছে অনি। কতভাবে যে দোল খাওয়াচ্ছে, তবুও কান্নার থামার নামগন্ধও নেই। অনিলা আর সহ্য করতে না পেরে উঠে গিয়ে ছেলেকে নিজের কোলে নিয়ে নিল।
অনি স্ত্রীর ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে খানিকটা অসহায় সুরে বলল, “তোমার তো মাথা ব্যথা করছিল। উঠে এলে কেন?”
অনিলা বাচ্চার কপালে চুমু খেয়ে বলল, “ছেলে এভাবে কাঁদলে আমি চুপচাপ বসে থাকব কী করে বলো তো!”
বলতে বলতেই অনিলা অভ্রনীলকে নিয়ে খাটে গিয়ে বসল। তারপর ব্রেস্টফিডিং করানোর উদ্দেশ্যে কাপড় সরাতেই অনি বলল, “আমি জানি তুমি এটা করতে কম্ফোর্ট ফিল করো না, তবুও কেন করো?”
অনিলা হালকা হেসে ছেলেটাকে ফিডিং করাতে করাতে বলল, “ওর ভালোর জন্য এই আনকম্ফোর্টেবল কাজটুকু হাসিমুখেই করে নিতে পারি আমি।”
অনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে অনিলার পাশে এসে বসল। রোমন্থন ভরা গলায় বলল, “সময় কত তাড়াতাড়ি চলে গেল, তাই না নিলা? তেহুর আর ফুলবানুর বিয়েরও দুবছর হয়ে যাবে তিন দিন পর।”
অনিলা বাচ্চার দিকে তাকিয়ে রইল। অনি ফের বলল, “আমাদের মাঝে সবকিছু স্বাভাবিক হওয়ার আগপর্যন্ত আমার মনে হতো সময় খুব ধীরগতিতে চলে।”
“সময় আসলে আপন গতিতেই বয়ে যায় অনি। মানুষ যখন তীব্র মানসিক কষ্টে বা একাকীত্বে থাকে, তখন কেবল তার কাছেই মনে হয় যে সময় থমকে আছে, খুব ধীরগতিতে যাচ্ছে।”
“হ্যাঁ, আমিও সেটা উপলব্ধি করতে পেরেছি। কাকে দেখে করেছি জানো?”
অনিলা ভণিতা ছাড়াই বলল, “তেহকে দেখে?”
অনি জোরে জোরে মাথা নেড়ে সায় দিল, “হ্যাঁ! এই প্রথম নিজের জন্মদিন ছাড়াও তেহ আরও একটা বিশেষ দিনের কথা মনে রেখেছে। আর সেটা হলো ওর ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি।”
“তাহলে ভাবো, ওর জন্য দিনগুলোর দৈর্ঘ্য কেমন ছিল!”
“এটুকু শাস্তি ওর প্রাপ্য ছিল নিলা। আমি মনে করি এটা খুবই সামান্য শাস্তি। ও যেমন ব্যবহার ফুলবানুর সাথে করেছে, এরপর যদি ফুলবানু ওকে ক্ষমা নাও করে, তবুও আমি অবাক হব না।”
অনিলা নিজের মাথাটা অনির বুকে এলিয়ে দিল, “ফুলকে যেটুকু চিনেছি, ও খুব সহজেই ভুলে যাবে ওর সাথে হওয়া সব অন্যায়ের কথা।”
অনি একটু ঠাট্টা করেই বলল, “সেটা হলে একদমই মজা হবে না। আমি তেহুর ভাই হলেও চাইব না ফুলবানু ওকে খুব সহজেই ক্ষমা করে দিক। কারণ তেহ এখনো মেয়েটাকে ভালোবাসে না, মেয়েটা শুধুমাত্র ওর অবসেশনে পরিণত হয়েছে। জাস্ট প্রয়োজন বলেই ওকে নিজের অধীনে রাখতে চাইছে; যা ফুলবানুর জন্য মোটেও সম্মানজনক হবে না।”
,
,
,
গেমিং রুমে বসে আর্কেড মেশিনে গেম খেলছে রিদম আর উর্বী। বেশ কয়েক রাউন্ড খেলার পর রিদমের কণ্ঠস্বরে খেলাধুলার আমেজ পেরিয়ে ক্লান্তি আর আকুলতা প্রকাশ পেল, “উর্বশী, তুমি জিতে গেছ। আমি হার মেনে নিচ্ছি। প্লিজ, এবার চলো রুমে যাই।”
উর্বীর আঙুলগুলো ক্ষিপ্র গতিতে বোতাম চেপে চলেছে। সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই বলল, “এবারই লাস্ট রিদম, তারপর পাক্কা চলে যাব।”
রিদম কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে পেছন থেকে বউকে জড়িয়ে ধরল। সঙ্গে সঙ্গে উর্বীর রেসিং কারটা কন্ট্রোল হারিয়ে অ্যাক্সিডেন্ট করল। গেম ওভারের লাল আলোটা উর্বীর চোখেমুখে এসে পড়তেই সে ঘাড় বাঁকিয়ে কটমট চোখে তাকাল। রিদম তার ঘাড়ে মুখ গুঁজে দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, “সরি উর্বশী। আসলে তোমার এই রাউন্ড শেষ হতে হতে ঘণ্টা পেরিয়ে যেত, তাই আমিই তোমাকে গেমটা তাড়াতাড়ি শেষ করতে হেল্প করলাম।”
উর্বীর রাগ উঠলেও সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলে নিল। আর্কেড মেশিনের চেয়ার ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “ওকে, থ্যাংকস ফর দ্য হেল্প! চলো এবার।”
উর্বী যেই না দরজার দিকে পা বাড়াল, রিদম পেছন থেকে খপ করে তার ওড়নার আঁচলটা টেনে ধরল। এক পা-ও এগোতে না পেরে উর্বী পেছনে তাকিয়ে দেখল, রিদম খুব চেনা এক আবদার নিয়ে ওড়নাটা আঙুলে পেঁচিয়ে ধরে আছে। তার এই বাচ্চাসুলভ আচরণে উর্বীর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল, “কী হলো, যাবে না?”
রিদম মাথা নেড়ে পা বাড়াল। করিডোর ধরে হাঁটার সময় রিদম বলল, “তোমার মনটা কি ভালো আছে উর্বশী? আর মাত্র দুদিন পরেই তো তোমার ফ্রেন্ড চলে আসবে।”
উর্বী হালকা গলায় বলল, “হুম, ভালোই আছে। কিন্তু তোমার তেহকে সাবধান করে দিও, ও যেন ফুলকে কষ্ট দেওয়ার কথা স্বপ্নেও না ভাবে।”
রিদমের চোখ দুটো মেঝেতে নেমে গেল, “তেহ তো নিজের মুখেই বলল, ও আর বোকাফুলকে কষ্ট দিতে চায় না।”
“চায় না বলেছে, দেবে না সেটা তো বলেনি।”
রিদম নিজের চুলগুলো হাত দিয়ে টেনে একটু অবিন্যস্ত করে ফেলল, “হুম, ও আসলে বোকাফুলকে ছাড়া আর থাকতে পারছে না। এখন যদি বোকাফুল ওর কাছে ফিরতে না চায়, তাহলে ও না চাইতেও মেয়েটাকে কষ্ট দিয়ে ফেলবে। জোর করে আটকে রাখবে নিজের কাছে।”
“তাতেও কিন্তু ফুল কষ্টই পাবে রিদম। তুমিই বলো, ফুল কি আদৌ এত কষ্ট ডিজার্ভ করে?”
“একদমই করে না।”
“তাহলে কেন তোমার তেহ ওকে কষ্ট দেবে? কেন ওকে নিজের মতো থাকতে দেবে না?”
রিদমের মুখটা চুপসে গেল, “তুমি না হয় তোমার বন্ধুকে বুঝিয়ে বলবে, ও যেন কষ্ট না পায়।”
উর্বীর হাঁটার গতি থেমে গেল। পিছু ফিরে বলল, “বুঝিয়ে বললেই কি কষ্ট পাবে না?”
“কেন কষ্ট পাবে? ওর উচিত কষ্ট না পেয়ে শক্ত হওয়া। তেহকে শাস্তি দেওয়ার সুযোগ আছে ওর কাছে।”
“কী বলতে চাইছ?”
রিদম একগাল হেসে বলল, “ও তেহকে মারুক-কাটুক, যা ইচ্ছা করুক, তেহ কিছুই বলবে না। জাস্ট ও ফিরে এলেই হবে। ও যেভাবে চাইবে তেহকে শাস্তি দিতে পারবে।”
উর্বী একটু ভেবে মাথা নাড়ল, “তা ঠিক বলেছ। আমি ওকে অবশ্যই এটা বুঝিয়ে বলব যাতে ও নিজে কষ্ট না পেয়ে তেহকে একটা উচিত শিক্ষা দেয়।”
রিদমের বুকটা ভারী হয়ে এল, “তা দিক, বাট ফিরে আসুক ওর কাছে। তেহ ওকে ফিরিয়ে আনবে বলে দিন গুনছে। ও ফিরে আসতে না চাইলে মনস্টারটাকে সামলানো যাবে না। এত বেশি ধ্বংসাত্মক আচরণ করবে যে লণ্ডভণ্ড করে ফেলবে সবকিছু।”
উর্বী থমকে গেল পুরোদস্তুর। রিদম তার মুখোমুখি এসে দাঁড়াল, “তোর কি মনে হয়, বোকাফুলকে জোর করে আটকে রেখে তেহ খুব আনন্দ পাবে? উঁহু, একদমই না। বোকাফুলকে কষ্ট দিয়ে তেহ নিজেও ভালো থাকতে পারবে না। তুমি বুঝতেই পারছ পরিস্থিতি কতটা বিভৎস হয়ে যাবে।”
পরিস্থিতির জটিলতা অনুধাবন করে উর্বী নিশ্চুপ হয়ে গেল। ফুল ফিরতে না চাওয়াটা যেমন যুক্তিসম্মত, আবার উদ্যানকেও বা সে কী বলবে! লোকটা তো মনস্টার!
,
,
,
ব্যালকনিতে বসে বসে ড্রিংকস করছিল মেলো আর লুহান। মেলো হাতের শূন্য গ্লাসটা আলতো শব্দে কাচের টেবিলে নামিয়ে রাখল, তারপর চটুল ইশারায় লুহানকে আরও কিছুটা ওয়াইন ঢেলে দিতে বলল। লুহান ক্ষণিকের জন্য একটু দ্বিধায় পড়লেও, বিনাবাক্যে বোতলটা তুলে লালচে তরল ঢেলে দিল তার গ্লাসে। লুহান নিজে কেবল এক গ্লাস খেয়েছে; দুজনেই একসাথে মাতাল হয়ে পড়তে চায়নি, সেই জন্যই সে আর নেয়নি।
“এটাই এই সপ্তাহের শেষ গ্লাস মেলো। তারপর আর চাইবি না কিন্তু।”
মেলো মাথা নেড়ে সায় দিল, তারপর গ্লাসে ঠোঁট ডুবিয়ে এক বড় চুমুক লাগাল। কিন্তু এই গ্লাসটি শেষ হতেই অ্যালকোহলের তীব্রতা তার স্নায়ুগুলোকে পুরোপুরি গ্রাস করে নিল। সে পা টাল খেয়ে কোনোমতে চেয়ার ছেড়ে উঠে ব্যালকনির রেলিংয়ের দিকে এগিয়ে গেল। লুহানও তার পিছু পিছু গেল। ঠিক তখনই তাকে অবাক করে দিয়ে মেলো নিজের গায়ের ভারী জ্যাকেটটা এক ঝটকায় খুলে ব্যালকনি গলিয়ে নিচে ছুড়ে ফেলে দিল!
লুহান চমকে উঠে চট করে মেলোকে নিজের দিকে টেনে আনল। চোখে চোখ রেখে কড়া গলায় শাসিয়ে বলল, “ওটা ফেলে দিলি কেন?”
মেলো নিজের গায়ের স্লিভলেস টপসটা দুহাতে খামচে ধরে অস্বস্তিতে ছটফট করে উঠল, “আহ্ লুহান! গরম লাগছে, খুব গরম লাগছে আমার।”
লুহান সরু চোখে তার লালচে হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকাল, “এই শীতের মধ্যে তোর গরম লাগছে? হোয়াটস রং উইথ ইউ?”
আচমকা মেলো লুহানের জ্যাকেটের কলার শক্ত করে টেনে ধরল, তারপর নিজের মুখটা লুহানের ঠোঁটের একদম কাছাকাছি নিয়ে গিয়ে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল, “তখন অনি যখন ঠাট্টা করল, তুই কিছু বলিসনি কেন?”
মেলোর তপ্ত নিঃশ্বাস সরাসরি নিজের ঠোঁটে এসে লাগতেই লুহানের মতো শক্তপোক্ত যুবকও ভেতরে ভেতরে কেমন যেন কেঁপে উঠল। সে আমতা আমতা করে তোতলাতে লাগল, “ক… কখন?”
“ওই যে মিটিংয়ের সময় ও যে তোকে আর রিদমকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘তোদের আমার কাছ থেকে শেখা উচিত কিছু। বয়সে ছোট হয়েও কেমন তোদের আগে বাপ হয়ে বসে আছি! লুহান, বিশেষ করে তুই এবার অন্তত একটু লজ্জা পা। বিয়ের চার মাস তো পেরিয়েই গেছে।’ এই কথার বিপরীতে তুই কিছু বললি না কেন?”
লুহানের কপালে এতক্ষণে বলিরেখা ফুটে উঠল, “আরে ও তো মজা করে বলেছে। দেখিসনি, রিদমও কিছুই মনে করেনি। সবচেয়ে বড় কথা, সেখানে তেহুও ছিল। কথাটা তো ওর গায়েও লেগেছে, তাই না? যেখানে ও চুপ ছিল, সেখানে আমিই বা কী বলতাম?”
মেলো মাথা নেড়ে তার কলারটা আরও জোরে মুচড়ে ধরল, “কথাটা ও তেহকে নয়, তোকে আর রিদমকে বলেছে। তেহুর তো বউই কাছে নেই, তাই ওর গায়ে কথাটা লাগেনি।”
“আরে বাদ দে না। এমন কত কথাই তো আমরা একে অপরকে বলি। সব কথা ধরে বসে থাকলে হয়? ওকেও তো আমরা খোঁচা মেরে কত কিছু বলি। ও কি কখনো রিয়্যাক্ট করে?”
মেলো আর কথা বাড়াল না। লুহানকে ছেড়ে দিয়ে অভিমানী চোখে সামনের দিকে তাকিয়ে রইল। লুহান নিজ উদ্যোগেই বলল, “সরি মেলোডি। তুই মন খারাপ করিস না। আমি অনিকে বকে দেব। ও আর কখনো এই ধরনের কথা বলবে না।”
“তুই সত্যি বকে দিবি?”
“হুম, সত্যিই অনেক বকে দেব।”
আবারও নিস্তব্ধতা নেমে এল। লুহান ডাকল তাকে, “মার্শমেলো!”
“হুম, বল।”
“তোর কি মনে হয় ফুলপরী তেহুর কাছে ফিরে আসতে রাজি হবে?”
মেলো দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “ও তো তেহুর জন্য পাগল। যদি এসে পড়ে, আমি খুব একটা অবাক হব না। উল্টো আসতে না চাইলেই অবাক হব।”
“হুম, কিন্তু তেহ তো জোর করে হলেও ওকে নিয়েই আসবে। সেটা কি বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে না?”
“হবে। তবুও আমি দিনশেষে চাইব ওরা সব মিটমাট করে নিয়ে ভালো থাকুক।”
,
,
,
সোহম বিছানায় শুয়ে ছিল। তার পুরো রুমটা ডুবে আছে নিশ্ছিদ্র, জমাট বাঁধা অন্ধকারে। কোথাও আলোর সামান্যতম উৎস নেই।
কিছুক্ষণ পরেই সে বালিশের নিচ থেকে নিজের ফোনটা বের করে স্ক্রিনটা অন করল। নীলচে ডিসপ্লের তীব্র আলো এসে আছড়ে পড়ল তার নির্ঘুম ফ্যাকাশে মুখে।
এখন ঘড়ির কাঁটায় রাত ঠিক তিনটা; তবুও দুচোখের পাতা এক করতে পারছে না সে। চোখ বন্ধ করলেই কেমন যেন দম আটকে আসছে, বুকটা ভারী হয়ে উঠছে। মনে হচ্ছে বুকের ঠিক মাঝখানে তীক্ষ্ণ, সূচালো কিছু একটা বিঁধে আছে, যা প্রতিটা সেকেন্ডে আরও গভীরে ঢুকে রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে।
সময়টা দেখে নিয়ে ফোনটা লক করে রেখে দিতে গিয়েও কেন যেন পারল না সোহম। এক অবাধ্য আকর্ষণে সে আনমনেই গ্যালারিতে ঢুকে পুরনো ছবিগুলো স্ক্রোল করতে লাগল। ঠিক তখনই স্ক্রিনের ওপর ভেসে উঠল ফুলের একটা ছবি।
ছবিতে মেয়েটার পরনে লাল আর কালোর মিশ্রণে তৈরি একটা সিল্কি ড্রেস। ছবিটা সে তুলেছিল আজ থেকে দুই বছর আগের সেই পার্টির দিনে, যেদিন নিরুপায় হয়ে ফুল গেস্টদের সামনে নেচেছিল। যদিও সোহম তখন বলেছিল ছবিটা ডিলিট করে দেবে, কিন্তু আজও তা করা হয়নি। চার্লস যখন ফুলের মাস্কটা খুলে ফেলে হাত চেপে ধরেছিল, তখন মেয়েটাকে এতটাই সুন্দর আর নিষ্পাপ দেখাচ্ছিল যে, সোহম ছবি না তুলে থাকতে পারেনি। মেয়েটার সেই অসহায়, অবিশ্বাস্য চাউনি আজও তার বুকের ভেতরটা এক তীব্র কাঁপনে ওলটপালট করে দেয়।
হঠাৎ করেই সোহমের মনে হলো; সে যা করছে, তা মোটেও ঠিক হচ্ছে না। এক তীব্র অপরাধবোধে তার শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট দুটো নড়ে উঠল, “আমি ইচ্ছা করে ওকে দেখছি না তেহ, জাস্ট গ্যালারির অন্যান্য ছবিগুলো দেখতে দেখতে এই ছবিটাও প্রতিদিন চোখের সামনে চলে আসে। তুই কি আমাকে পানিশ করবি ছবিটা ডিলিট না করার জন্য?”
সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “আমি ডিলিট করার অনেক চেষ্টা করেছি তেহ, বাট পারিনি। তুই রাগ করিস না। আমি ওকে কখনো খারাপ নজরে দেখি না। আমার শুধু মায়া হয় ওর জন্য। কী করে তুই ওর মতো একটা মেয়েকে দিনের পর দিন ইগনোর করে গেলি? কষ্ট দিয়ে গেলি নির্দ্বিধায়? ওর সাথে এতটা খারাপ করার পরেও তুই ওকে পেয়ে যাবি; সেটা কি অবিচার হবে না তেহ?”
সোহম ফোনটা বুক কাঁপানো অপরাধবোধ নিয়ে আবারও বালিশের নিচে গুঁজে রাখল। চোখ দুটো বুজে ফিসফিসিয়ে বলল, “আমি চাই এই অবিচারটাই হয়ে যাক তেহ। তুই পেয়ে যা তোর প্রিমরোজকে।”
সে জোর করে একটু হাসল, “দু-একটা অবিচার হয়ে গেলে নিশ্চয়ই পৃথিবী উল্টে যাবে না? আমরা তো সবাই তোকে সুখী দেখতে চাই তেহ। তোর সুখের জন্য আমি নিজের সেই অনুভূতিটাকেও আবদ্ধ করে রেখেছি।”
বলতে বলতেই সোহমের চোখ দুটো এবার কানায় কানায় ভরে উঠল। অন্ধকারের মাঝেই নোনাজল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। সে বালিশে মুখ গুঁজে অভিমানী সুরে বলল, “দোষটা তো আমারই। নইলে কেন ওর প্রতি আমার অনুভূতি জন্মাবে? আমি কি জানতাম না ও পুরোপুরি নিষিদ্ধ? জানতাম তো! আমার লজ্জা হয় তেহ, আমি এতটাই লজ্জিত যে নিজের সেই অনুভূতিগুলোকে কখনো কোনো নাম দিতে পারিনি।”
তার কান্নার বেগ এবার আরেকটু বাড়ল। সে ফুঁপিয়ে উঠল, “আমার অনুভূতিগুলো এমন যে, তোর প্রিমরোজ কোনো কষ্ট পেলে সেটা আমিও অনুভব করতে পারি। শুরু থেকেই এমনটা ছিল না। যখন জানতে পারলাম তুই ওকে ভালোবাসিস না, শুধুমাত্র আত্মতুষ্টির জন্যই ওর সাথে ভালোবাসার অভিনয় করেছিস, তখন থেকেই আমি এমন কিছু উপলব্ধি করতে পারছি, যা আগে কখনো করিনি। আমি যেমন তোকে কষ্ট পেতে দেখতে পারব না, ঠিক তেমনি ওর কষ্টও আমাকে যন্ত্রণা দেবে। আমি কী করব তেহ? মেলো তো তোর ওপর থেকে মুভ অন করতে পেরেছে, আমি কেন পারছি না? যেই অনুভূতিগুলোকে নাম দেওয়ার মতো সাহস আমার হৃদয়ে নেই, সেই অনুভূতিগুলোর জন্মই বা হলো কেন?”
,
,
,
উদ্যান নিজের রুম থেকে বেরিয়ে ধীরপায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল। চারপাশটায় একবার চোখ বুলিয়ে দেখল সে, কোথাও কেউ নেই। পুরো সোলার এস্টেট যেন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সে দ্রুত অথচ নিঃশব্দ পায়ে এগিয়ে গিয়ে ফুলের ঘরের বন্ধ দরজার সামনে এসে থামল।
এই রুমে সে কাউকেই ঢুকতে দেয়নি। সার্ভেন্টরা পরিষ্কার করতে চাইলেও উদ্যান অনুমতি দেয়নি। দরজার হাতলটা ঘুরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই তার নাসিকারন্ধ্রে এক চেনা সুবাস ধাক্কা দিল। সে চোখ বুজে একটা লম্বা শ্বাস টানল। ঘরের লাইট না জ্বালিয়েই সে এগিয়ে গেল জানালার দিকে। জানালার পর্দা একপাশে সরিয়ে কপাট দুটো দুই দিকে মেলে দিতেই, চাঁদের রুপোলি আলো জানালার ফাঁক গলে উদ্যানের গায়ে ঢলে পড়ল।
“তুই ঠিক এখানেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা চুপচাপ বসে থাকতি ফ্লাওয়ার। তুই কি তখন আমার কথাই ভাবতি? দেখ না, আমিও আজ এখানেই দাঁড়িয়ে তোর কথা ভাবছি।”
উদ্যান পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করল। লাইটারের মৃদু আলোয় সেটা জ্বালিয়ে, ঠোঁটে শক্ত করে চেপে ধরে সে আকাশের পানে চাইল।
“তুই বলেছিলি না তোর অবর্তমানে আমার সব শান্তি অশান্তিতে পরিণত হবে? সেটাই হয়েছে দেখ। তোকে ছাড়া আমি বড্ড অশান্তিতে আছি রে।”
উদ্যান জানালার বাইরে ধোঁয়া ছেড়ে দিয়ে জ্বলন্ত সিগারেটের দিকে তাকাল, “তুই একবার জিজ্ঞেস করেছিলি না, আমার সিগারেট চাই নাকি ফুল চাই? আমি সেদিন উত্তর দিইনি; আজ দিচ্ছি। আমার শুধু ফ্লাওয়ারকে চাই। তাকে পাওয়ার বিনিময়ে আমি জাগতিক সব নেশা ত্যাগ করতেও রাজি।”
হঠাৎ করেই উদ্যানের মনে হতে লাগল, এক বিশাল শূন্যতা চারপাশ থেকে ধেয়ে এসে তাকে গ্রাস করে ফেলতে চাইছে। সে সহ্য করতে না পেরে জানালার গ্রিলের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেটে আরও একটা লম্বা টান দিল। তারপর বুকের ভেতর জমা হওয়া ধোঁয়াটুকু অন্ধকারের মাঝে উড়িয়ে দিয়ে, একদম শান্ত গলায় গুনগুন করে গেয়ে উঠল:
“একা দিন, ফাঁকা রাত… নিভেছে আলো।
তুই নেই, কেউ নেই… লাগছে না ভালো।
তোর নাম না জানা অভিমানে
কত দূরে ভাসা যায়?
আমি চাইছি তবু পারছি না তো
থামাতে আমায়।
একা দিন, ফাঁকা রাত… নিভেছে আলো।
তুই নেই, কেউ নেই… লাগছে না ভালো।”
তার খসখসে কণ্ঠের গানটা ঘরের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে এক অদ্ভুত গুমোট পরিবেশ তৈরি করল। সিগারেটে শেষ টান দিয়ে উদ্যান দেয়ালের সুইচ চেপে রুমের লাইট জ্বালালো।
চারদিকের সবকিছু পরিপাটি রূপে গোছানো থাকলেও প্রতিটি আসবাবপত্রের ওপর ধুলোর এক পুরু আস্তরণ জমেছে। উদ্যান শার্টের হাতা কিছুটা গুটিয়ে বিছানার চাদরটা ঝেড়ে রাখল, তারপর কোণা থেকে একটা ঝাড়ু তুলে নিয়ে ঘরটা পরিষ্কার করতে শুরু করল।
হঠাৎই মেঝের ধুলো ঝাড়তে গিয়ে তার চোখ পড়ল বেডসাইড টেবিলের ওপর পড়ে থাকা একটা চকচকে বস্তুর দিকে। বস্তুটা হলো অর্ধচন্দ্র আকৃতির ফুলের সেই পেন্ডেন্টটা, যেটা উদ্যান তাকে দিয়েছিল।
উদ্যান ঝাড়ুটা একপাশে রেখে পেন্ডেন্টটা হাতের মুঠোয় তুলে নিল। তার দুই ভ্রু কুঁচকে সরু হয়ে এল, “তোর তো এটা খুব প্রিয় ছিল, রেখে গেলি কেন? নাকি বুঝে গিয়েছিলি এটায় ট্র্যাকিং ডিভাইস আছে?”
উদ্যান ফুলের ব্যবহৃত আরও কিছু খুঁজে পাওয়ার আশায় ড্রয়ার খুলতেই একটা গোলাপি রঙের ডায়েরি নজরে এল। উদ্যান চমকে উঠল, ফুলের আগের ডায়েরিটা তো তার কাছে, তবে এটা আবার কোন ডায়েরি?
সে উৎসুক হয়ে ডায়েরিটা ওপরে তুলতেই, তার ঠিক নিচে তিনটি ওষুধের পাতা চোখে পড়ল। উদ্যান খুব একটা খেয়াল না করে ডায়েরির পাতা উল্টাতে যাবে, ঠিক তখনই তার দৃষ্টি আবারও আটকে গেল ওষুধগুলোর ওপর। একটা পাতা খালি হলেও বাকি দুটো পাতা একেবারে অক্ষত!
উদ্যান ডায়েরিটা পাশে রেখে ওষুধের পাতাগুলো হাতে তুলে নিল। সেগুলোর গায়ে লেখা নাম নজরে আসতেই তার চোখ দুটো চড়কগাছ হয়ে গেল, “এগুলো তো… এগুলো তো বার্থ কন্ট্রোল পিল! ডাক্তার তো ওকে নিয়মিত খাওয়ার জন্য তিনটি পাতা তিন মাসের জন্যই দিয়েছিল। তাহলে বাকি দুটো পাতা এমন আনটাচড রয়ে গেল কী করে? তার মানে ও এগুলো স্কিপ করেছে?”
উদ্যান আর কিছুই বলতে পারল না। সমস্ত চিন্তাভাবনা যেন এক নিমেষে জট পাকিয়ে গেছে। মেয়েটা কতটা কেয়ারলেস হলে এত গুরুত্বপূর্ণ একটা কোর্স মাঝপথে স্কিপ করতে পারে, সে ভেবেই পেল না। তবে উদ্যান এই মুহূর্তে অতটা গভীরে গিয়ে চিন্তা করল না, কারণ তারা শেষবার ঘনিষ্ঠ হওয়ার দিন ফুল নিজেই বলেছিল; তিন দিন আগেই তার পিরিয়ড শেষ হয়েছে।
সে ওষুধের পাতাগুলো আগের জায়গায় রেখে ডায়েরিটার প্রথম পাতা ওল্টাল। দু-পৃষ্ঠা ওল্টানোর পরই রঙিন জেল কলম দিয়ে লেখা ফুলের কাঁচা হাতের লেখাগুলো নজরে এল:
“অনিলা আপুকে কথায় কথায় একদিন বলেছিলাম আমার ডায়েরি লেখার শখ আছে, তাই সে এই ডায়েরিটা গিফট করেছে। আর উর্বী আপু গিফট করেছে রঙবেরঙের কলম। ভাবলাম কী লেখা যায় এগুলো দিয়ে। ভাবতে ভাবতেই আজ আলসেমি কাটিয়ে লিখতে বসে পড়লাম। কিন্তু কেন যেন কিছুই লিখতে মন চাইছে না। বুঝতে পারলাম আমার ডায়েরি লেখার ইচ্ছাটাই ম`রে গেছে। আমি অবাক হলাম না একটুও। তবুও জিনিসগুলো ব্যবহার করতে মন চাইল। থ্যাংক ইউ অনিলা আপু আর উর্বী আপুকে এত সুন্দর গিফট দেওয়ার জন্য।”
উদ্যান ডায়েরির পাতাগুলো একের পর এক দ্রুত ওল্টাতে লাগল। কিন্তু না, পুরো ডায়েরিতে আর কোথাও কিছুই লেখা ছিল না।
চলবে,,,
শব্দসংখ্যা: ৩৮০০+
(বি:দ্র— এই পর্বে হয়তো আপনারা ফুলকে আশা করেছিলেন। আমি শুধু বলতে চাই আমরা শেষ পৃষ্ঠার খুব কাছাকাছি চলে এসেছি। তাই শেষ বারের মতো প্রতিটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রকে দেখানো জরুরি ছিল। পরের পর্বটা সবাই উপভোগ করবেন আশা করি।
Share On:
TAGS: অবাধ্য হৃৎস্পন্দন, সোফিয়া সাফা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৭
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩২
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৬৪
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪২
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৬
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৭
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৫
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৯
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩০
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৪