রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র
পর্ব_৫৫
নিলুফানাজমিননীলা
★★★
ফজরের আজানের পবিত্র ধ্বনি মির্জা বাড়ির প্রতিটি কোণে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। জানলার পাশ দিয়ে ভোরের স্নিগ্ধ বাতাস এসে ঘরের পর্দাগুলোকে আলতো করে দুলিয়ে দিচ্ছে। তৃণা বিছানায় শুয়ে অনুভব করল এক অদ্ভুত প্রশান্তি। চোখ মেলতেই দেখল সে আরিয়ানের বলিষ্ঠ বুকের মাঝে পরম আশ্রয়ে মিশে আছে। আরিয়ানের নিয়মিত নিশ্বাসের শব্দ আর ভোরের এই স্তব্ধতা মিলেমিশে একাকার।
তৃণা আলতো করে আরিয়ানের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ঘুমের ঘোরে তাকে কতই না মাসুম দেখাচ্ছে! নিজের অজান্তেই তৃণার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। সে বিছানা থেকে উঠে বসার আগে আর সামলাতে পারল না, অতি সন্তর্পণে ঝুকে পড়ে আরিয়ানের ললাটে নিজের উষ্ণ ওষ্ঠের স্পর্শ এঁকে দিল।
নামাজের জন্য অজু করে এসে তৃণা আরিয়ানকে আলতো করে নাড়া দিল। কোমল স্বরে ডাকল,
“এই যে রাগী সাহেব, অনেক হয়েছে। এবার উঠুন তো!”
আরিয়ান ঘুমের ঘোরে শুধু একটা অস্ফুট শব্দ করল, “হুঁহ…”
তৃণা এবার ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে একটু জেদ করেই বলল,
“উঠুন না! আজান হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। নামাজ পড়বেন না?”
ভোরবেলার গভীর ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায় আরিয়ান অবচেতন মনেই কিছুটা রুক্ষ হয়ে উঠল। সে ভ্রু কুঁচকে ওপাশ ফিরে শুয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“উফ! বিরক্ত কোরো না তো। যাও এখান থেকে!”
আরিয়ানের সেই পুরোনো রাগী কণ্ঠস্বর! কিছুদিন আগে থেকে মানুষটা তৃণার কাছে এতটাই নরম হয়ে ছিল যে, আজ হঠাৎ এই সামান্য কর্কশ স্বরে তৃণার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। অভিমানে তার ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল। সে আর দ্বিতীয়বার ডাকল না। জায়নামাজ হাতে না নিয়ে ধীর পায়ে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াল।
বাইরে ভোরের আকাশটা তখনো নীলাভ হয়ে আছে। পাখিদের কিচিরমিচির শুরু হয়েছে কেবল। তৃণা রেলিং ধরে দূরে তাকিয়ে রইল। ব্যালকনির রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ভোরের ঝাপসা অন্ধকার অনেকটা ফিকে হয়ে এসেছে। সতেজ বাতাসের ঝাপটা তৃণার মনকে শান্ত করতে চাইলেও আরিয়ানের সেই বিরক্তিমাখা কণ্ঠস্বর মনের কোণে কাঁটার মতো বিঁধে ছিল। অভিমান বুকে নিয়ে আরও কিছুক্ষণ বাইরে কাটিয়ে যখন সে পা টিপে টিপে রুমে ফিরে এল, তখন দরজার কাছেই থমকে গেল সে।
ঘরের দৃশ্যটা দেখে তৃণার চোখের পলক নড়ল না। আরিয়ান ফ্লোরে জায়নামাজ বিছাচ্ছে। পরনে শার্ট-প্যান্ট হলেও প্যান্টের নিচের অংশটুকু টাকনুর ওপরে ভাজ করা। মাথায় ধবধবে সাদা একটা টুপি। যে মানুষটা একটু আগে ডাকার কারণে বিরক্ত হয়ে ওপাশ ফিরে শুয়েছিল, সে এখন শান্ত মনে নামাজের প্রস্তুতি নিচ্ছে!
তৃণাকে দেখেই আরিয়ানের ঠোঁটের কোণে মায়াবী এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে খুব কোমল স্বরে বলল,
“আসো, আজ জামাতের সাথেই নামাজটা আদায় করে নিই।”
তৃণার বুকের ভেতর জমে থাকা সবটুকু অভিমান যেন মুহূর্তেই এক পশলা বৃষ্টিতে ধুয়ে গেল। সে এসে আরিয়ানের ঠিক এক কদম পেছনে দাঁড়িয়ে গেল। ঘরের নিস্তব্ধতায় আরিয়ানের সুমধুর তিলাওয়াত আর ভোরের স্নিগ্ধতা মিলে এক আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি করল।
নামাজ শেষ করে তৃণা আরিয়ানের উরুতে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। ঘরের আধো-আলো ছায়ার মাঝে আরিয়ান পরম মমতায় তৃণার মাথায় বিলি কেটে দিচ্ছিল। সেই স্পর্শে এক অদ্ভুত নির্ভরতা ছিল। তৃণা হঠাৎ আদুরে গলায় বলে উঠল,
“জানেন, দিন যত যাচ্ছে, আপনাকে হারিয়ে ফেলার ভয়টা কেন জানি তত বাড়ছে আমার।”
আরিয়ান তৃণার কথায় মৃদু হাসল। স্ত্রীর ললাটে এক গভীর ভালোবাসার চুম্বন এঁকে দিয়ে বলল,
“পাগলি মেয়ে! আমি কোথাও হারাব না। আমি তো তোমারই আছি। কিন্তু তুমি? তুমি কখনো আমায় ছেড়ে যাবে না তো শ্যামলিনী?”
তৃণা চট করে উঠে বসল। আরিয়ানের চোখের মণি দুটোর দিকে তাকিয়ে স্থির কণ্ঠে বলল,
“আমার শেষ পরিচয় হোক আমি আপনার স্ত্রী। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এই নামটাই যেন আমার পাশে থাকে। যেদিন মসজিদের মাইকে ঘোষণা হবে আমার নাম, সেদিন যেন বলা হয় আরিয়ান মির্জার সহধর্মিণী আজ ইন্তেকাল করেছেন।”
মৃত্যুর এমন চরম সত্য আর ভালোবাসার এমন প্রগাঢ় উচ্চারণ শুনে আরিয়ানের বুকটা হু হু করে উঠল। সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না, দুই হাত দিয়ে তৃণাকে জাপটে ধরে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে নিল। যেন এই আলিঙ্গনেই সে সময়কে থামিয়ে দিতে চায়। বাইরের ভোরের সূর্য তখন মির্জা বাড়ির আঙিনায় নতুন এক আলোর রেখা টেনে দিচ্ছে, আর ভেতরে এক জোড়া প্রাণ একে অপরের মাঝে খুঁজে পাচ্ছে বেঁচে থাকার পূর্ণতা।
★★★
মির্জা বাড়ির সকালটা আজ অন্যরকম স্নিগ্ধ। গতকালের সেই টানটান উত্তেজনা আর বিয়ের ধকল শেষে আজ সবার চোখেমুখে প্রশান্তির ছাপ। বাড়ির বড় গিন্নিরা, মায়মুনা, রাহি আর ফারহানা বেগম ড্রয়িংরুমে বসে খোশগল্প করছেন। তৃণা, মিতু আর নুসরাত মিলে কিচেনের হাল ধরেছে। বাড়ির বড়দের আজ সকাল সকাল কোনো কাজই করতে দিচ্ছে না তারা, তিনজন মিলে নাস্তা বানানোর ফাঁকে হাসি-ঠাট্টায় মেতে আছে।
ঠিক তখনই সিঁড়িতে পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল। সবার নজর স্থির হলো ওপর থেকে নেমে আসা নৌশির ওপর। পরনে লালচে রঙের একটা জামদানি শাড়ি, কপালে ছোট একটা টিপ আর চোখেমুখে নতুন জীবনের আভা। নৌশিকে শাড়িতে এতটা স্নিগ্ধ আর পরিণত দেখাচ্ছে যে, রাহি বেগম নিজের মেয়ের দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলেন। যে মেয়েটা কাল পর্যন্ত চঞ্চল পায়ে সারা বাড়ি মাথায় করে বেড়াত, আজ এক দিনেই সে যেন কতটা গম্ভীর আর মায়াবী হয়ে উঠেছে!
মায়মুনা বেগম হাসিমুখে এগিয়ে গেলেন। নৌশিকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত খুঁটিয়ে দেখে আহ্লাদী গলায় বললেন,
“মাশাআল্লাহ! আমার ছোট বউমাকে তো একদম রাজরানির মতো লাগছে!”
নৌশি মেজো মায়ের মুখে ‘বউমা’ ডাক শুনেই লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সে দ্রুত মায়মুনা বেগমকে জড়িয়ে ধরে তাঁর কাঁধে মুখ লুকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,
“বউমা বললে কেমন কেমন লজ্জা লাগছে!”
ওর এমন বাচ্চাসুলভ কথা শুনে ড্রয়িংরুমে হাসির রোল পড়ে গেল। মায়মুনা বেগম কৌতুক করে বললেন,
“তা এই যে এক রাতেই শাড়ি পরা শিখে গেলি, শাড়ি তো তুই ধরতেই পারতিস না। আজ একা একাই পরলি??”
নৌশি একদম সরল মনে চট করে উত্তর দিল,
“না না, একা পরিনি তো! তোমার ছেলে পরিয়ে দিল।”
কথাটা মুখ দিয়ে বেরোতেই নৌশি বুঝতে পারল সে কী বলে ফেলেছে! ওদিকে তৃণা আর মিতু কিচেন থেকে উঁকি দিয়ে মুখ টিপে হাসছে, আর বড় মায়েরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় হাসাহাসি করছেন। নৌশি লজ্জায় নিজের জিভে কামড় দিল। আর এক মুহূর্ত সেখানে না দাঁড়িয়ে সোজা দৌড়ে কিচেনে গিয়ে তৃণা আর মিতুর পেছনে লুকাল।
মায়মুনা বেগম নিজের হাসিটা বহু কষ্টে চেপে রেখে আবার জা-দের পাশে বসলেন।
নৌশি কিচেনে ঢুকতেই তিনজনে একই স্বরে বলল,
“এক রাতে এত কিছু শিখে গিয়েছো?”
নৌশি গাল ফুলিয়ে অভিমানে মুখ হাঁড়ি করে বলল,
“ধ্যাৎ! তোমরা এমনভাবে আচরণ করছো যেন আমি সত্যিই কোনো অচেনা শ্বশুরবাড়ি চলে এসেছি। ভুলে যেও না, এটা আমারও বাড়ি!”
তৃণা নৌশির কাঁধে হাত রেখে মিটিমিটি হেসে বলল,
“তা তো বটেই! কিন্তু এখন থেকে তো পরিচয় বদলে গেছে। আগে ছিলে এই বাড়ির মেয়ে, এখন এই বাড়ির ছোট বউমা। তা নিজেকে কি এখনো বাপের বাড়িতেই মনে হচ্ছে?”
নৌশি কোনো যুতসই উত্তর খুঁজে পেল না। তর্কে না পেরে প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে গম্ভীর গলায় ঘোষণা করল,
“আজ আমি সবার জন্য নিজ হাতে পায়েস বানাব।”
নৌশির মুখে রান্নার কথা শুনে সবাই থমকে গেল। নুসরাত আর মিতু একে অপরের দিকে তাকাল। কারণ, যে নৌশি পানি গরম করতে গিয়েও হাত পুড়িয়ে ফেলে, সে আজ পায়েস বানাবে! মিতু কুণ্ঠাভরে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে, আমরা তাহলে তোমায়একটু সাহায্য করি? চিনি-দুধটা অন্তত মেপে দিই?”
“না না, একদম দরকার নেই!” নৌশি হাত নেড়ে ওদের থামিয়ে দিল। “আমি একাই পারব। আমি আজ সকালেই ঘুম থেকে উঠে ইউটিউব দেখে পুরো রেসিপি মুখস্থ করেছি। তোমরা কেউ আমার রান্নার এলাকায় ঢুকবে না বলে দিলাম।”
কেউ আর ওকে বাধা দেওয়ার সাহস পেল না। নৌশি বেশ কোমর বেঁধে কাজে লেগে পড়ল। দুধের হাঁড়ি বসিয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে ইউটিউব টিউটোরিয়াল দেখছে আর একটা একটা করে উপকরণ মেশাচ্ছে।
আদনান ড্রয়িংরুমের কোণ থেকে আড়চোখে কিচেনের এই মহাযজ্ঞ দেখছিল আর মনে মনে ভাবছিল, পায়েসটা শেষ পর্যন্ত খাওয়ার যোগ্য হবে, নাকি আবারও কোনো ‘নাদান’ কাজ করে বসবে নৌশি!
★★★
ব্রেকফাস্ট টেবিল তখন সাজানো গোছানো প্রায় শেষ। মিতু আর নৌশি প্লেট সাজাচ্ছে, বড়রা সবাই হাত-মুখ ধুয়ে টেবিলের দিকে আসছেন। এমন সময় দোতলার করিডোর থেকে আরিয়ানের মেঘমন্দ্র কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
“ও শ্যামলিনী!”
পুরো ডাইনিং হল মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সবার সাথে তৃণা নিজেও ওপরের দিকে তাকাল। আরিয়ান যেন কারো উপস্থিতির পরোয়া করছে না, সে আবারও একটু জোরালো গলায় ডাকল,
“বউ, একবার ওপরে আসো তো!”
তৃণা আড়চোখে দেখল নৌশি আর মিতু একে অপরের গায়ে চিমটি কাটছে, আর মেজ মা-বড় মায়েরা আঁচলে মুখ ঢেকে হাসছেন। তৃণা লজ্জায় যেন মাটির সাথে মিশে যাচ্ছিল। সে মনে মনে প্রার্থনা করছিল আরিয়ান যেন আর না ডাকে, কিন্তু আরিয়ান নাছোড়বান্দা! সে এবার রীতিমতো হুমকি দিয়ে বসল,
“কী হলো? ওপরে আসবে নাকি নিচে গিয়ে টেনে নিয়ে আসতে হবে?”
তৃণা আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালো না। বাড়ির বড়দের সামনে এই অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে বাঁচতে সে রীতিমতো দৌড়ে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে গেল। তৃণা চোখের আড়াল হতেই নিচ থেকে সবার সম্মিলিত হাসির শব্দ শোনা গেল।
রুমে ঢুকেই দেখল আরিয়ান আয়নার সামনে শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। তৃণা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
“সমস্যা কী আপনার? সকাল সকাল আস্ত বাড়িটা মাথায় তুলেছেন কেন? সবার সামনে ওভাবে কী নামে ডাকছেন? লজ্জা-শরম কি বাজারে কেজি দরে বিক্রি করে দিয়েছেন?”
আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে তৃণার দিকে ফিরে তাকাল। খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
“দরকারে ডেকেছি, বিনা কারণে চিল্লাইনি।”
“কী এমন দরকার যে সম্মানটাই খোয়াতে বসলেন?”
আরিয়ান নিজের পরনের হালকা নীল শার্টের বুক পকেটের দিকের একটা ঝুলন্ত সুতোর দিকে ইশারা করল।
“দেখো, বোতামটা লাগাতে গিয়ে ছিঁড়ে আমার হাতে চলে এসেছে।”
তৃণা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“তো আমি কী করব এখন? আলমারিতে কি শার্টের আকাল পড়েছে? অন্য একটা পরে নিন, এটা রেখে দিন পরে ঠিক করে দেব।”
“আমি যে তোমাকে নব্বই শতকের মতো ভালোবাসতে চাই শ্যামলিনী।”
আরিয়ানের মুখে নব্বই দশকের ভালোবাসার কথা শুনে তৃণার বুকের ভেতরটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সেই সময়কার সাদা-কালো ছবির মতো এক অদ্ভুত মায়া খেলা করে গেল তার চোখে। আরিয়ান তৃণার আরও কাছে ঝুঁকে এসে আবারও গম্ভীর কিন্তু নরম গলায় বলল,
“শার্টের অভাব না পড়লেও তোমার স্পর্শের অভাব পড়েছে শ্যামলিনী। বেশি কথা বলো না তো, নাও সেলাই করে দাও। আমার দেরি হচ্ছে।”
তৃণা বুঝল, এই মানুষের জেদের কাছে হার মানাই শ্রেয়। সে আলমারি থেকে সুঁই-সুতা বের করে আরিয়ানের সামনে এসে দাঁড়াল। আরিয়ান পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল, আর তৃণা খুব মনোযোগ দিয়ে তার বুকের কাছের ছেঁড়া বোতামটা লাগাতে শুরু করল। আরিয়ানের উষ্ণ নিশ্বাস তৃণার কপালে এসে আছড়ে পড়ছে। সে আড়চোখে দেখল, আরিয়ান একদৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত প্রশান্তির হাসি।
সেলাই প্রায় শেষ। তৃণা আলতো করে আরিয়ানের বুকের সাথে নিজের বুক মিশিয়ে সুতাটা দাঁত দিয়ে কেটে দিল। ঠিক সেই মুহূর্তে আরিয়ান দুহাতে তৃণার মুখটা আগলে ধরল। নিচু স্বরে বলল,
“ভীষণ সুন্দর লাগছে তোমায় আজ।”
তৃণা একটু লজ্জা পেয়ে চোখ সরিয়ে নিল। ম্লান হেসে বলল,
“এটা তো আপনি প্রতিদিনই বলেন। নতুন কিছু কি আর নেই?”
আরিয়ান আবারও হাসল। তৃণার কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে বলল,
“পুরোনো কথাগুলোই তো নব্বই দশকের মতো বারবার বলতে ইচ্ছে করে। সৌন্দর্য কি আর প্রতিদিন নতুন হয়? তোমার এই রূপ তো আমার অভ্যাসে মিশে গেছে শ্যামলিনী।”
তৃণা আরিয়ানের শার্টের কলারটা ঠিক করে দিয়ে বলল, “হয়েছে, এবার নিচে চলুন। সবাই ডাইনিং টেবিলে অপেক্ষা করছে। আর ওদিকে নৌশি আজ পায়েস বানিয়েছে, খেয়ে কিন্তু ভালো বলতেই হবে। মেয়েটা অনেক আশা করে বানিয়েছে।”
★★★
ডাইনিং টেবিলে তখন উৎসবের আমেজ। মির্জা বাড়ির পুরুষরা আড্ডায় মেতেছেন, আর বউয়েরা গরম গরম নাস্তা পরিবেশন করছেন। ঠিক সেই সময় ডাইনিং হলের প্রবেশপথে নৌশিকে দেখা গেল হাতে একটা বড় কাঁচের বাটি, যাতে ধোঁয়া ওঠা গরম পায়েস।
পায়েসের বাটিটা টেবিলের মাঝখানে সগৌরবে রেখে নৌশি সবার দিকে তাকিয়ে একটা বিজয়ী হাসি দিল। আদনান আড়চোখে বাটিটার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“বাহ্! শেষ পর্যন্ত নাদানের বাচ্চা পায়েস বানিয়েই ছাড়ল? কে জানে, আজ কি এই পায়েস খেয়েই ইহলোক ত্যাগ করতে হয় কি না!”
শেষের কথাটা আদনান এতই নিচু স্বরে বলেছিল যে নৌশি ঠিক শুনতে পেল না। সে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“কী বললি তুই? বিড়বিড় করছিস কেন?”
আদনান গলা ঝেড়ে বলল,
“কিছু না। বলছিলাম যে, একবার তো কেক বানাতে গিয়ে তুই কেকের বারবিকিউ বানিয়ে ফেলেছিলি! তো আজ সেই অভিজ্ঞতায় পায়েসটা যে কী রূপ নিয়েছে, সেটা ভেবেই শিউরে উঠছি।”
নৌশি এবার আদনানের কানের কাছে মুখ নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিসিয়ে হুমকি দিল,
“মনে রাখিস, আমি এখন শুধু তোর ছোটবেলার খেলার সাথি নই, আমি তোর বিয়ে করা বউ! যদি খাবার খেয়ে সবার সামনে তেরিংবেরিং কিছু বলিস, তবে তোর সম্পত্তির আল্লাহু আকবর’ করে দেব। বুঝেছিস?”
আদনান বড় বড় চোখ করে তাকাল। মনে মনে ভাবল বাপরে! এই মেয়ে তো বিয়ের পর দেখি আরও ডেঞ্জারাস হয়ে উঠেছে!
আরিয়ান মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করল,
“তা হঠাৎ আজ তুই রান্নাঘরে ঢুকতে গেলি কেন নৌশি?”
নৌশি অমনি ঠোঁট উল্টে অভিযোগের সুরে বলল, “দাদাভাই, তোমার এই বদমাইশ ভাই কাল রাতে বলল যে বউ হয়ে লাভ কী যদি রান্না না পারিস? সে তো রীতিমতো হুকুম দিয়েছে আজ থেকে যেন বাড়ির সব কাজ আমিই করি। তাই ভাবলাম আজ পায়েস দিয়েই শুরু করি।”
নৌশির কথা শেষ হতে না হতেই ডাইনিং টেবিলের সব কটা চোখ আদনানের ওপর গিয়ে স্থির হলো। আদনানের অবস্থা এখন ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’। সবার চোখেমুখে তখন আদনানের ওপর মৃদু ধমকের আভাস।
এবার আহাদ মির্জা নিজের ছেলের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর হওয়ার ভান করে বললেন,
“ও আচ্ছা, এই ব্যাপার! আদনান যখন এতই উৎসাহী, তবে সবার আগে এই বদমাইশটাকেই এক বাটি পায়েস দে। ও খেয়ে যদি সুস্থভাবে বেঁচে থাকে, তবে না হয় আমরা বাকিরা খেয়ে দেখব।”
আদনান অসহায় হয়ে বাবার দিকে তাকাল।
“আব্বু, তুমি নিজের ছেলেকে এভাবে মৃ’ত্যুর মুখে পাঠাচ্ছ কেন?”
এনামুল মির্জা এবার হেসে উঠে বললেন,
“কেন পাঠাবে না? বউটা তো তোরই! তার রান্নার প্রথম স্বাদ তো তোকেই নিতে হবে।”
ছোট বাবার কথায় ডাইনিং টেবিলে হাসির রোল পড়ে গেল।
নৌশি গদগদ মুখে বাটিটা একদম আদনানের নাকের ডগায় ধরল। আদনান অনেকটা ফাঁ’সির মঞ্চে যাওয়ার মতো চেহারা করে এক চামচ পায়েস মুখে তুলল। মুখে দেওয়া মাত্রই তার কপালে ভাঁজ পড়ল, চোখ দুটো খিঁচিয়ে বন্ধ হয়ে এল। এ কী! নৌশি কি ভুল করে চিনির বয়ামের বদলে লবণের বয়াম উপুড় করে দিয়েছে? পুরো মুখটা নোনা বিস্বাদে ভরে গেল।
আদনান যখন সেটা উগরে দিতে যাবে, তখনই দেখল টেবিলের সবাই চাতক পাখির মতো তার প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় তাকিয়ে আছে। আর নৌশি? সে ডাগর ডাগর চোখে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করছে, যার অর্থ পরিষ্কার, ‘খবরদার! উগরে দিলেই তের সম্পত্তি আল্লাহ আকবর!’
আদনান বড় একটা ঢোক গিলে মিথ্যে হাসির আড়ালে সবটুকু বিষাদ গিলে ফেলল। তারপর গলার স্বর যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রেখে বলল,
“আহা! রান্না তো না, যেন অমৃত! তোমরা বসে আছো কেন? সবাই তাড়াতাড়ি খেয়ে দেখো, এমন পায়েস জীবনে খাওনি!”
আদনানের অভিনয়ের গুণে সবাই বিশ্বাস করে এক এক চামচ মুখে তুলল। আর পরক্ষণেই পুরো ডাইনিং টেবিল যেন এক জীবন্ত পাথরের মূর্তির প্রদর্শনীতে পরিণত হলো। সবার চিবুক শক্ত হয়ে গেছে। না পারছে গিলতে, না পারছে নৌশির সামনে সেটা থুথু করে ফেলতে। নৌশি তখন খুশিতে ডগমগ হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কী হলো? কথা বলছো না কেন কেউ?”
রোহান কোনোমতে নোনা জলটুকু গলায় নামিয়ে বমি আটকে বলল,
“বাহ! বাহ! আমি তো বোন তোর ওপর গর্বে একদম গর্ভবতী হয়ে যাচ্ছি! তুই আমার মায়ের পেটের বোন হয়েও এমন নোনা… থুড়ি, এত ভালো পায়েস বানালি? আমি তো থমকে গেছি!”
নৌশি প্রশংসায় আটখানা। তবে মিতু, তৃণা আর নুসরাত অভিজ্ঞ রাঁধুনি, তারা আড়চোখে একে অপরের দিকে তাকিয়েই রহস্যটা ধরে ফেলেছে। নৌশি নিজে চেখে দেখার আগেই নুসরাত পরিস্থিতি সামাল দিতে বুদ্ধি খাটাল। সে নৌশির হাত ধরে বলল,
“চল নৌশি, তোর বিয়ের গিফট বক্সগুলো এখনো খোলা হয়নি। ওগুলো গিয়ে দেখি চল।”
নৌশি অবাক হয়ে বলল,
“আরে সবাই তো খাচ্ছে, আমি বরং দেখি কার কেমন লাগছে। পরে খুলি?”
নুসরাত একপ্রকার জোর করে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলল,
“না না, এখনই চল। একটু পর তো আমি নিজের বাড়ি চলে যাব, তখন কে দেখাবে আমায়?”
নৌশি সিঁড়ির আড়ালে চলে যেতেই যেন ডাইনিং টেবিলে সাইরেন বেজে উঠল! বাড়ির সব পুরুষ সদস্য একযোগে চেয়ার ছেড়ে বেসিনের দিকে দৌড় লাগালেন। কেউ মুখ ধুচ্ছে, কেউ গ্লাসের পর গ্লাস পানি গিলছে। ওদিকে মিতু আর তৃণা হাসতে হাসতে প্রায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ার দশা।
★★★
স্কুল মাঠের পাশে রাখা বেঞ্চটাতে ছোট তূর্ণা বসে আছে। একা বসে থাকা ছোট্ট তূর্ণার অবয়বটা দেখে যে কারও বুক ফেটে যাবে। চারপাশে কত হইহুল্লোড়, কত আনন্দ! মায়েরা আঁচল দিয়ে সন্তানদের মুখ মুছিয়ে দিচ্ছে, পরম মমতায় টিফিন খাইয়ে দিচ্ছে। এই দৃশ্যটা তূর্ণার ছোট মনে এক গভীর ক্ষতের মতো বিঁধছে। তার তো মা নেই, দুপুরের এই রোদে কারোর আঁচল তো তার কপালে ছায়া হয়ে আসবে না। মেহরাব দেওয়ান ব্যস্ত মানুষ, পেশার তাগিদে সকালেই যা খাবার দিয়ে যান তা এতক্ষণে শীতল হয়ে গেছে।
তূর্ণার টলটলে চোখ দিয়ে যখন নোনা জল গাল বেয়ে নিচে পড়ছিল, ঠিক তখনই মাথার ওপর এক জোড়া শীতল হাতের স্পর্শ অনুভব করল সে। কানে এল সেই চিরচেনা মায়াবী ডাক
, “তূর্ণা মামনি!”
তূর্ণা চোখ মুছে তাকিয়েই যেন মেঘের আড়ালে সূর্য দেখতে পেল। খুশিতে আত্মহারা হয়ে রিনিকে জড়িয়ে ধরল সে। রিনিও স্তব্ধ হয়ে রইল কিছুক্ষণ। তার ছন্নছাড়া, উদ্দেশ্যহীন জীবনে এই ছোট্ট তূর্ণা যেন এক ফালি স্নিগ্ধ চাঁদ, যে অন্ধকার দূর করতে জানে। রিনি তূর্ণাকে বুক থেকে ছাড়িয়ে ওর চোখের জল মুছে দিয়ে শুধাল,
“কী হয়েছে মামনি? কাঁদছিলে কেন?”
তূর্ণা ধরা গলায় আঙুল দিয়ে মাঠের অন্য বাচ্চাদের দেখিয়ে বলল,
“ওই দেখো, আমার ফ্রেন্ডদের আম্মুরা তাদের কত আদর করে খাইয়ে দিচ্ছে। কিন্তু আমার আম্মু তো আমাকে আদর করতে আসে না। তুমিই তো আমার আম্মু হতে পারতে, কিন্তু পাপা বলেছে তোমাকে যেন আম্মু না ডাকি। ডাকলে পাপা খুব বকা দিবে।”
মেহরাব দেওয়ানের এমন কঠোর নিষেধের কথা শুনে রিনির বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। রিনি তূর্ণার চিবুক ছুঁয়ে দৃঢ় স্বরে বলল,
“তোমার পাপা বকা দিবে না মামনি। আজ থেকে তুমি আমাকে আম্মু বলেই ডাকবে, কেমন?”
তূর্ণার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল বিস্ময়ে।
“সত্যি? পাপা রাগ করবে না তো?”
রিনি হাসল, তবে সেই হাসিতে কিছুটা বিষাদ মিশে ছিল। সে তূর্ণার নাকে নাক ঘষে বলল,
“হুম, সত্যি। একদম তিন সত্যি!”
তূর্ণা আবারও রিনিকে জাপটে ধরল। কে জানত, বিধাতা রিনিকে এই স্কুলের শিক্ষিকা হিসেবে পাঠাবেন কেবল তূর্ণার শূন্য ঘরটা পূর্ণ করার জন্য! গত কয়েক দিনেই এই মিষ্টি মেয়েটা রিনির পাথরে বাঁধানো হৃদয়ের এক কোণে নিজের একটা ছোট্ট রাজ্য বানিয়ে নিয়েছে। রিনি বুঝতে পারল, মেহরাব দেওয়ান যতই শাসন করুক না কেন, এই অবুঝ মনের আর্তি মেটানোর শক্তি কারোর নেই।
চলবে…
(গল্প ভালো না লাগলে বলবেন, তাহলে খুব তাড়াতাড়ি সমাপ্ত করে দিব। আর যদি আপনাদের ভালো লাগে তাহলে গল্পটা আমার কল্পনা অনুযায়ী সাজিয়ে গুছিয়েই সমাপ্ত করব। কিন্তু আপনাদের রেসপন্সের যা অবস্থা!😑)
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা, রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪৮
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৪
-
রোদ্দুরের ছেড়া মানচিত্র পর্ব ৩৪
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫৮ (১)
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫৪ (প্রথমাংশ)
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১১
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫২ (বর্ধিতাংশ)
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪৪