#মূল্য |০৪|
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
—নিজের শখ পূরণ করছো সেই তো আমার টাকা দিয়েই। কই আমাকে কখনো দেখেছো, তোমার থেকে টাকা নিয়ে নিজের শখ পূরণ করতে?
কথাটা বলে অরিত্র নিজেই স্তব্ধ হয়ে যায়। কি বলে ফেলল সে এটা? শেষমেষ সে নীলাকে টাকার খোঁটা দিলো? স্ত্রী হয়ে স্বামীর টাকায় নিজের শখ পূরণ করবে না তো, কার টাকায় করবে? অরিত্রের বিবেকই তাকে এই প্রশ্ন গুলো করে। বিবেকের কাঠগড়ায় সে আজ চরম লজ্জিত এক অপরাধী।
অন্যদিকে অরিত্রের কথাটি নীলার কোমল মনে বাজেভাবে আঘাত করে। সেই সাথে তার আত্মসম্মানকেও। নীলা আস্তে-ধীরে কাত হয়ে অরিত্রের দিকে পিঠ দিয়ে শোয়।
অরিত্র নিজের ভুলের জন্য কিছু বলতে চায়। কিন্তু সে কিছু বলার আগেই নীলাই বলে–
—না আগে তোমার টাকা দিয়ে নিজের শখ পূরণ করেছি আর নাই বা আজকের পর থেকে করার কথা চিন্তা করব। এতদিন আমার শখের জন্য খরচ করা টাকাগুলো একান্তই আমার ছিল। বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও ঈদে আত্মীয়-স্বজনদের থেকে পাওয়া সালামি, আমার দেনমোহর। দেনমোহর তুমি দিলেও, সেটার উপর তোমার কোন অধিকার বা দাবী নেই। নাকি সেটার উপরও দাবী রাখতে চাচ্ছো?
—আ’ম সরি নীলা। আমি ওমন ভাবে কথাটা বলতে চাই নি। সরি ফর হার্টিং ইউ।
অরিত্রের কণ্ঠে আকুতি, আফসোস, অপরাধবোধ। কিন্তু নীলা পাত্তা দেয় না তেমন তার কথায়। চোখ বন্ধ করে নিয়ে ক্ষীণ গলায় বলে–
—ঘুমাও। ঘুম পাচ্ছে আমার। সকালে অফিস আছে তোমারও।
অরিত্র নিজের বালিশে এসে শুয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ আগে যার চোখ ঘুমে আপনা-আপনিই বন্ধ হয়ে আসছিল, এখন সেই ব্যক্তিটিই ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেয় নির্ঘুম। নীলাকে বাজে কথাটা বলার পর থেকে বুকের ভেতরটা কেমন অশান্ত হয়ে রয়েছে। একজন শিক্ষিত, উন্নত মন-মানসিকতার লোক হয়ে সে কি করে নিজের স্ত্রীকে টাকার খোঁটা দিলে তার নিজেরই বুঝে আসছে না।
তাহলে সে কি সমাজের আর পাঁচটা অসুস্থ মন-মানসিকতার স্বামীদের একজন, যারা নিজের স্ত্রীকে জীবনসঙ্গী নয়, বরং নিজের উপার্জনের বিনিময়ে কেনা কোনো দায়িত্বহীন সম্পত্তি বলে মনে করে?
ভাবনাটা মাথায় আসতেই অরিত্রর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে।
না, সে তো কখনো এমন মানুষ হতে চায়নি। বরং ছোটবেলা থেকেই সে ঘৃণা করত সেই পুরুষদের, যারা নিজের উপার্জনের অহংকারে স্ত্রীকে ছোট করে, কথায় কথায় টাকার হিসাব কষে। অথচ আজ রাগের মাথায় সে নিজেই ঠিক সেই কাজটাই করে বসল।
মানুষ আসলে নিজের চরিত্রকে নয়, নিজের রাগকেই সবচেয়ে কম চেনে— কথাটা আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে অরিত্র।
সে ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে নীলার দিকে তাকায়। মেয়েটা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছে, নাকি নিজের কান্নাটা লুকোতে চোখ বন্ধ করে রেখেছে— সেটা বোঝার উপায় নেই। তবে একটা বিষয় অরিত্র খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে; তার বলা কথাগুলো নীলার মনে এমন এক ক্ষত তৈরি করেছে, যেটা হয়তো ক্ষমা চাইলেই মুছে যাবে না।
আজ প্রথমবার তার উপলব্ধি হয়, সংসারে সবচেয়ে ভয়ংকর অভাব টাকার অভাব নয়; সম্মানের অভাব। টাকা কম থাকলে দু’জন মানুষ একসঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু সম্মান একবার ভেঙে গেলে, একই ছাদের নিচে থেকেও দু’জন মানুষের মাঝখানে অদৃশ্য এক দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়।
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে অরিত্রর বুক চিরে।
এই মেয়েটা কোনো দিন তার কাছে দামি গয়না চায়নি, অরিত্রের সাধ্যের বাহিরে পড়ে এমন জীবনের আবদার করেনি। বরং অরিত্র তাকে যেমনটা চালিয়েছে, যেমনভাবে চলতে বলেছে একজন সুযোগ্য স্ত্রী হিসেবে তেমনটাই করেছে সে।
বিয়ের এতগুলো বছরে তো নীলা কখনো মুখ ফুটে তেমন একটা কিছু আবদার করেনি তার কাছে। আর নাই বা দামি কোন শখ পূরণ করেছে অরিত্রের মাধ্যমে। আর সেই মানুষটাকেই আজ সে বুঝিয়ে দিল— তার শখেরও একটা মূল্য আছে, যা পূরণ করার জন্য মূল্যটা অরিত্র চুকাতে পারবে না। ছিঃ!
রাত যতই গভীর হয়, অরিত্রের ভাবনার ডানা পালাও ততই প্রসারিত হতে থাকে। অরিত্ররা চার ভাই-বোন। সেই সবার বড়। তার পরে দুই বোন আর এক ভাই রয়েছে। তার ছোট বোনটি নীলার সমবয়সী। তারা সব ভাই-বোনই সেটেল্ড নিজেদের জীবনে। তার ছোট ভাই ঢাকার একটা কলেজের লেকচারার, ছোট ভাইয়ের স্ত্রী অনলাইনে ফ্রিল্যান্সিং করে। এ নিয়ে তার মায়ের গর্বের শেষ নেই। ছোট পুত্র বধূর যোগ্যতার ভাড়ে বড় পুত্রবধূকে বারবার নুইয়ে দেন ভদ্রমহিলা। অথচ যোগ্যতার পাল্লা মাপা হলে দেখা যাবে, নীলার যোগ্যতার তাদের চার ভাই-বোনকেও ছাড়িয়ে যাবে।
অরিত্রের ছোট বোনটি স্বামীর সাথে গতবছরই এব্রোড শিফট করেছে। বিদেশে সবকিছুরই খরচ বেশি, তাই তার বোনও একটা জব করে।
বড় বোনটি দেশেই আছে। সেও একটি নারী উন্নয়ন সংস্থায় ভালো বেতনে কাজ করছে। কই তার বোনদের শ্বশুর বাড়ি থেকে তো কখনোই তাদের বাহিরে কাজ করা নিয়ে নালিশ করেছে তাদের কাছে। যদি করা হতো তাহলে তার কানে ঠিকই পৌঁছাত। কিন্তু এমন কিছুই তার কানে আসেনি। তার বোনের স্বামীরা, তার ছোট ভাই সানন্দে নিজেদের বউদের ইনকাম করা মেনে নিয়েছে। তাহলে তার সমস্যা হচ্ছে কোথায়? অরিত্র যেন নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে ওঠে। কিন্তু উত্তর হিসেবে তো যুক্তিযুক্ত কোন কথাই পায় না তার মন।
এর পরের দিন থেকে নীলা আর তার সম্পর্কের শীতলতা আরো বাড়তে থাকে। নীলা যেন একটু একটু করে নিজেকে অরিত্রের সকল মায়া থেকে ছাড়িয়ে নিতে থাকে। চুপচাপ নীলা আরও চুপচাপ হয়ে যেতে থাকে। এখন সে নিজেকে নিজেই সময় দেয়, নিজের ছোট ছোট ইচ্ছে নিজের অর্জিত টাকাতেই পূরণ করে। নিজের আলাদা একটি পৃথিবী গড়তে শুরু করে।
নীলার কখনোই ইচ্ছে ছিল না অরিত্রের থেকে এতটা দূরত্ব তৈরি করার। স্ত্রী হয়ে সে কেনোই বা স্বামীর সাথে দূরত্বের কথা চিন্তা করবে, যদি না বিপরীত পাশের ব্যক্তিটি তাকে অবমূল্যায়ন না করে। সে হ্যান্ড ব্লক প্রিন্টের কাজ নিতান্তই শখের থেকেই শুরু করেছিল। ভেবেছিল টুকটাক নিজের জন্য তৈরি করবে আর আত্মীয়-স্বজনদের জন্য করবে। যেমনটা সে আগে করত। এতে তার অবসরের সময়টুকুও কেটে যাবে। অরিত্রকে নিয়ে অতিরিক্ত ভাবনাও মাথায় খেলবে না।
নিজের আলাদা ইনকামের কথা সে কখনোই ভাবে নি। তার বিজনেস পেইজটাও সে তেমন একটা গুরুত্ব দিয়ে চালাত না। তার ছোট ছোট রিলস দেখেই দুয়েকটা কাস্টমার অর্ডার করত এই যা।
তবে অরিত্রের টাকার নিয়ে বলা কথাটার পর থেকে সে দৃঢ়ভাবে নিজের কাজটাকে আঁকড়ে ধরে। সে বুঝে গিয়েছে, তার পায়ের নিচের মাটি নরম বলে, তার ইনকাম নেই বলেই তার স্বামী আজ তাঁকে এতটা অবমূল্যায়ন করছে। সে ঠিক করে আর কাউকে নিজের অবমূল্যায়ন করতে দিবে না। হোক সে ব্যক্তিটি তার স্বামী।
নীলা তার বিজনেসটাকে বড় করার মনোভাব পোষণ করে। আগের থেকেও বেশি নিষ্ঠা দিয়ে কাজ করতে থাকে। তার নিখুঁত কাজ ও ইউনিক সব ডিজাইনের কারণে নীলার দুয়েকটা অর্ডার দিন শেষে গিয়ে ভালো সংখ্যক অর্ডারে পরিণত হয়।
এখন এমনও মাস আসে যখন কিনা সে একটা নির্দিষ্ট দিনের পর ড্রেসের অর্ডার নেওয়া বন্ধ করে দেয়। তার একার পক্ষে সব সামলানো কষ্ট কর হয়ে যায় যদিও, তারপরও সে তার কাস্টমারদেরকে নিখুঁত ও সুন্দর কাজের প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে সময় বাড়িয়ে চায় কাজ শেষ করতে। নীলার কাজগুলোয় মুগ্ধ হয়ে কাস্টমাররা সময়ের কন্সিডার করে তাকে।
বিজনেসের চাপ বেড়েছে বলে যে নীলা সংসারকে অবহেলা করছে তা কিন্তু নয়। সে এখনও পুরো দস্তুর গৃহিণী। সকালে অরিত্রের জন্য নাস্তা বানিয়ে তার সাথে খায়। খেতে খেতেই কয়েকবার উঠে লাঞ্চের জন্য দৌড়াদৌড়ি করে। অরিত্র নিশ্চুপ হয়ে তার ছুটোছুটি দেখে। তার স্বভাব আগের মতোই রয়ে গিয়েছে। সে আগের মতোই সবসময় হাত গুটিয়ে বসে থাকে বাসায়। তার মনের দোলাচাল অবস্থা নিয়ে সে নিজেই কেমন বিভ্রান্ত।
ইতিমধ্যে নীলার বিজনেসের কথা একটু একটু করে তার অফিসের সকলে জানতে পারছে। কীভাবে? খুবই সহজ বিষয়। নীলার আইডিতে অরিত্রের কয়েকজন অফিস কলিগের স্ত্রীরা এড রয়েছে। নীলা যখন তার পেইজের কোন পোস্ট নিজের টাইম লাইনে শেয়ার করে তখন তাদের কাছেও পৌঁছায় সেই পোস্টগুলো।
তাদের পরিবারের অনেকেই জেনেছে নীলার বিজনেসের কথা। শুধু তার বাবা-মা সোশ্যাল মিডিয়ায় কানেক্টেড নয় বলে তারা হয়ত জানতে পারেনি।
কেটে গিয়েছে আরো দু’টো মাস। মাসের শুরুতেই অরিত্র হাজার টাকার দশটা নোট নীলাকে ধরিয়ে দেয়। সংসার খরচের জন্য নয়। নীলার হাত খরচের জন্য। নীলা টাকাটা চুপচাপ নেয় ঠিকই, কিন্তু পরের দিন টাকাটা অরিত্র নিজের ওয়ালেটের নিচেই ফেরত পায়। গত দু’মাসে এমনটাই হয়ে এসেছে। টাকা নিয়ে খোটা দেওয়ার জন্য এবার অরিত্র অনেকবার মাফ চেয়েছে, প্রতিত্তোরে নীলা বিষয়টাকে সবসময় এড়িয়ে গিয়েছে নাহয় হালকাভাবে নিয়েছে। কিন্তু সত্যি এটাই যে, নীলা তার টাকা দিয়ে নিজের জন্য এই দু’মাসে কিচ্ছু কেনে নি। একটা চকলেট অব্দি না।
চলতি মাসের পনেরো তারিখ নীলা আর অরিত্রের বিয়ের ষষ্ঠ বছর পূর্ণ হবে। অরিত্র ঠিক করে সেই দিনটায় সে তাদের সম্পর্কে সকল ফাঁকফোকড় গুলো মিটিয়ে নিবে। যেই দূরত্ব তার হাত ধরে শুরু হয়েছে, সেটার সমাপ্তিও সেই করবে। কিন্তু অরিত্র হয়ত জানে না, ভবিষ্যতের আশায় কাজ জমিয়ে রাখতে নেই। এতে করে কাজের গুরুত্ব দিনকে দিন কমতে কমতে একসময় গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। ভুল গুলো যত দ্রুত সম্ভব ঠিক করে নিতে হয়। নাহয় ছোট ছোট ভুল গুলোও বিচ্ছেদের মতো বড় শাস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন। ]
#চলবে?
[নেক্সট, পরবর্তী পর্ব এসব কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করার চেষ্টা করবেন সকলে। পরবর্তী পর্ব তাড়াতাড়িই দেওয়া হবে ইনশা আল্লাহ।
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স। ]
Share On:
TAGS: মূল্য, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৬১.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫৩.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩০
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৮.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৩
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫৮.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৪
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৬.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫১.৩
-
মূল্য পর্ব ৩