প্রণয়ের_রূপকথা (৮৮)
মেয়েটির এই মারাত্মক রূপ যেন দীপ্রর সহ্যই হয় না। ও বসে আছে কুহুর পাশটায়। অথচ ওর মন চাচ্ছে এক্ষুনি জড়িয়ে, বুকের সাথে মিশিয়ে ফেলতে। হয়তো ফেলতোও। তবে বড়োরা থাকায় ও নিজের লাগাম টানল। অরণ্য বোধহয়, বুঝতে পারল। তাই খোঁচাটা দিয়েই ফেলল।
“ভাই, জ্বালাপোড়া করছে?”
দীপ্র কনুই দিয়ে, একটা ধাক্কা দিতেই, অরণ্য বলে ওঠল,”শালা, বদদোয়া দিব তোকে।”
“শকুনের দোয়ায়, গোরু ম রে না বেয়াদব। পারলে সবাইকে সরিয়ে দেয়। আই নিড টু হাগ, হার।”
অরণ্যর পেটটা তখনো ব্যথা করছে। ও ব্যথার জায়গাটা মালিশ করতে করতে ও বলে,”শুধু তোর বিশেষ দিন বলে। না হলে, জীবনেও হেল্প করতাম না।”
দীপ্র কিছু বলে না। উসখুস করতে থাকে। কুহু বেশ অনেকক্ষণ ধরেই, দীপ্র ভাইয়ের এমন হালত দেখছিল। এবার কিছুটা এগিয়ে, ছোট সুরে শুধাল,”আপনার কি কিছু হয়েছে?”
“হু।”
ছোট করে জবাব এলো। কুহু ফের বলল,”কী হয়েছে? শরীর খারাপ লাগছে? ঘরে যাবেন?”
বলতে বলতে, চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেল। একদম ঘুটঘুটে আঁধার। কুহু কিছু বুঝে ওঠে কিছু বলবে, ওমনি শক্তপোক্ত বাঁধনে আটকে গেল। দীপ্র ওকে একদম বুকে মিশিয়ে নিয়েছে। গভীর, আদুরে ভাবে বলে ওঠে,”এটা প্রয়োজন ছিল জানপাখি। তোকে বুকে না নিতে পেরে, আমি ম রে যাচ্ছিলাম।”
কুহু হতবাক। ওর ভেতরটা নানান অনুভূতিতে মিশে যাচ্ছে। ভালো লাগা, আবার খানিকটা ভয় ও কাজ করছে। যদি আলো জ্বলে ওঠে। দীপ্র বলে,”কুহু, তুই জানিস, তুই জানিস, আমার বুকটা কতটা শান্ত হলো? এতক্ষণ মনে হচ্ছিল, দম বন্ধ হয়ে আসছে। ঝড় চলছে। এখন শান্তি সব। সব শান্তি।”
বলতে, বলতে চারপাশে বাতি জ্বলে ওঠে। কুহুর ভয়টাই সত্যি হয়। দীপ্র তখনো কুহুকে জড়িয়ে। ওদিকে অরণ্যর মাথায় হাত। সে ভুল করে, ভুল বাটনে প্রেস করে ফেলেছে।
চারপাশে চাপা হাসির গুঞ্জন শুরু হয়েছে। বড়োরা সব, ওঠে গিয়েছেন। দবীর বিহ্বল ছেলের কাহিনী দেখে। এদিকে কুহুটা কি আচরণ করবে, তাই ভুলে গেছে। দীপ্র মেয়েটিকে ছেড়ে নেমে আসে অরণ্যর নিকটে। অরণ্য ওকে দেখেই, দৌড়ে পালাতে থাকে। পুরো বিষয়টা রাত্রির মাথার ওপর দিয়ে যায়। ও কুহুর কাছে এসে বলে,”এটা কী হলো রে।”
কুহু মাথা নামায়। মিনমিনে সুরে বলে,”কিজানি কি হলো। আমি তো বুঝতেই পারিনি রাত্রিপু।”
রাত্রি মিটমিটিয়ে হাসে। বলে,”তুই শেষ কুহু। তুই শেষ। তোর বরের ধৈর্য দেখছি একদমই নেই।”
“উফ, রাত্রিপু।”
“উম, এখন উফ রাত্রিপু বলা হচ্ছে। তবে দীপ্র ভাই ও…
বলতে বলতে অরণ্য লাফিয়ে এসে রাত্রির পেছনে লুকায়। দীপ্র চোখ রাঙাতেই, অরণ্য বলে,” ভাই, আমি কী ইচ্ছে করে করেছি। সে যাই হোক, তোর কাজটা তো হয়েছে। আমায় কেন মা র ছিস?”
এতক্ষণে জল পরিষ্কার হয়। এই আলো চলে যাওয়া তবে দুজনের প্ল্যানে ঘটেছে। দীপ্র চোখ মুখ শক্ত করে। এই অরণ্য, কোনো কাজ যদি ঠিক মতন করে!
বড়ো’রা হলুদ ছুঁইয়েই চলে গিয়েছেন। এ ছেলেকে বিশ্বাস নেই। আবার কি করে বসে। এবার গানের আসর শুরু হয়েছে। বাচ্চা পার্টিও সাথে আছে। ওরা হৈ হৈ করে নাচতে শুরু করেছে।
ওদিকে পুরো অনুষ্ঠানে, কোথাও কণা নেই। বিষয়টা কুহুর খেয়াল হলো মাত্র। ও বলল,”কণাকে তো দেখি না।”
সবার আসর ভাঙল। রাত্রি বলল,”হবে আশেপাশে।”
“সন্ধ্যা থেকেই দেখিনি রাত্রিপু। আমি মাত্র খেয়াল করলাম এটা। তোমরা দেখেছ?”
“না। আচ্ছা, আমি দেখছি।”
বলে রাত্রি ওঠে যায়। কুহুর মনটা এদিকেই পরে থাকে। আশেপাশে খোঁজ করে, বাড়ির পেছনের অংশের, কৃষ্ণচূড়ার গাছের নিচে পাওয়া যায় কণাকে। উদাস হয়ে বসে আছে। দৃষ্টি সামনের দিকে।
“কণা।”
মেয়েটির ধ্যান ফেরে না। অদূর থেকে, সামনের দিকে অগ্রসর হয় রাত্রি। আসতে আসতে ডাকতে থাকে। তবু, তবু মেয়েটির ধ্যান নেই। রাত্রি এবার একদম কাছে চলে আসে। হাত দিয়ে, বাহু ছোঁয়। এতে ওর ধ্যান ভাঙে। চোখ দুটো কেমন যেন হয়ে আছে। ওর শরীর কেঁপে ওঠে। রাত্রি ফের ডাকে,”কণা।”
এবার আর কণা নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। “রাত্রিপু।” বলে, একদম মেয়েটির বুকের সাথে মিশে যায়। রাত্রির ভেতরটা কেমন নড়েচড়ে ওঠে। ও অশান্ত হয়।
“অ্যাই বোন, কী হয়েছে? কী হয়েছে সোনা? সব, সব ঠিক আছে? ঠিক আছে?”
অশান্ত রাত্রি। ও ছোট থেকেই এমন। এই সব গুলো বাচ্চাই ওর যে বড্ড আপন। একদম বুকে নিয়ে বড়ো করেছে। ওর এহেন, অশান্ত, ছটফটে আচরণের বিপরীতে কণা জবাব ই দিতে পারছে না। শুধু কাঁদছে। কাঁদছে, অবিরতভাবে। রাত্রি ওর পিঠে হাত বুলায় ক্রমাগত। শান্ত করার চেষ্টা করে। প্রশ্ন করে সমানতালে। খানিক বাদে, কণা বলে,”আমার, আমার কিচ্ছু ঠিক নেই রাত্রিপু। আমার কিচ্ছু ঠিক নেই।”
হ্যাঁ, রাগীব এসেছিল। এসেছিল সে। এসে মেয়েটিকে আরো একবার ভেঙেচুরে দিয়েছে। কণা যখন, নির্দিষ্ট জায়গায় এসে পৌঁছাল। একটি বড়ো শক্ত পোক্ত হাত, ওর ছোট্ট হাতটা ছুঁয়ে নিল। এই ছোঁয়াতেই, কণা যা বোঝার বুঝে ছিল। অশান্ত হয়ে নিজেকে ছাড়াতেই, রাগীব বলল,”শুনে যাও প্লিজ।”
ও শুনবে না। শুনবে না বলে, পালাতে চাইল। তবে পারল না। হাতটা ফের টেনে ধরল ওকে। এই পর্যায়ে, কণা চ্যাঁচিয়ে ওঠল।
“আপনার সাহস কী করে হয়, আমায় ছোঁয়ার?”
রাগীব কী আহত হলো? হলো বোধহয়। হওয়ারই কথা। ও হাতটা ছাড়ল। বলল,”আর ছুঁবো না। তুমি শুধু আমার কথাটা শোনো।”
মায়া, মায়া এমন এক জিনিস যা এত সহজে ছাড়া যায় না। সেই মায়া থেকেই কণা দাঁড়িয়ে গেল। খানিক সময় গেল। রাগীব বোধহয় অশান্ত। খানিকটা বিভ্রান্ত ও।
“গতকাল আমার বিয়ে ছিল, কণা।”
কণা শুনেছিল সে খবর। শুনেছিল, মেনেও নিয়েছিল। ও ঢোক গিলল। তবে চোখ দুটো কেমন যেন করতেও লাগল।
“কিছু বলবে না?”
“কেন এসেছেন এখানে?”
“একটা গল্প শোনাতে।”
“আমি শুনতে চাই না।”
“শুনে যাও, প্লিজ। একটিবারের জন্য।”
কণা কান্না গিলে নেয়। এই লোকটা নিজের বাসর রাতের গল্প শোনাবে নাকি? শোনাবে, কীভাবে বউকে আদর করেছে? কীভাবে, ভালোবেসেছে? ওর এত কষ্ট লাগে। এত বেশি কষ্ট লাগে। ও আকাশপানে চায়। শক্ত হয়। রাগীব বলে,”তোমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। তুমি এত ছোট। তার ওপর রাত্রির বোন। আমি আসলে চাইনি তুমি কষ্ট পাও।”
কণা কান্নাটা গিলে নেয়। ঠোঁট কামড়ে বলে,”কিন্তু, আপনি কষ্ট দিয়েছেন। অনেক বেশি কষ্ট দিয়েছেন।”
“জানি। তাই যতই মাফ চাইব, কম হয়ে যাবে।”
“মাফ চেয়েও লাভ নেই। আমি মাফ করব না।”
রাগীব শুকনো ভাবে হাসে। বলে,”জানি। করার কথাও না। আমি কোথাও না, কোথাও তোমায় প্রশ্রয় দিয়েছিলাম।”
“আপনার বলা শেষ?”
“উহু। বলছি, তোমার কি খুব তাড়া?”
“জি, আমার বোনের হলুদের অনুষ্ঠান।”
“ওহ, ভুলেই গিয়েছিলাম। কী বলো তো, আজকাল মাথা এত কম কাজ করছে।”
লোকটা চাচ্ছে কী? চাচ্ছে কী সে? কাল তার বিয়ে হয়ে থাকলে, আজ তো বউভাত। তবে? তবে সে এখানে কেন? কণা আর পারে না। পারে না ও। ও অশান্ত হয়।
“আপনি দ্রুত কথা শেষ করেন। আপনার তো বউভাত আজ। এখানে কেন এসেছেন?”
রাগীব জবাব দেয় না। কণাও আর পারে না। শুনতে চায় না গল্প। ও চলে যেতে নেয়। সহসাই রাগীব বলে ওঠে,”বিয়েটা আমি করতে পারিনি কণা। পারিনি কবুল পড়তে। জানো, শেষেও, তোমার কথা ভীষণ মনে পড়েছে। তোমার মুখটা চোখের সামনে ভেসেছে। মনে তোমায় রেখে, কীভাবে কবুল পড়তাম বলো?”
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪৪
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪০
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫৯
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৭১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫৩
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১০
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪৯