প্রণয়ের_মায়াতৃষ্ণা ||৩৯||
ফারজানারহমানসেতু
রাতের শেষ প্রহর। বৃষ্টির তোড়জোরে এখনো টিনের চালে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ হয়ে পড়ছে। নিস্তব্ধতায়, শুধু মাঝেমধ্যে দূরে বজ্রের মৃদু গর্জন হচ্ছে । বজ্রপাতের শব্দে রোজা ঘুমের ঘোরেই নড়ে উঠছে। গভীর, নির্ভার এক ঘুম। যেন বহুদিন পর কোনো নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছে।
তূর্জান ঘুমায়েছিলো একটু, আবার সজাগ হয়ে গেছে। মোস্তফা নেওয়াজ ফোন করে জানিয়েছে রোজা বজ্রপাত ভয় পায়। তূর্জান আর ঘুমায়নি।
রাতের শেষ প্রহর তন্দ্রা ছাড়াই কাটিয়ে দিচ্ছে। রোজার দিকে তাকাতেই দেখল রোজা গুটিসুটি হয়ে যাচ্ছে। এই বর্ষা অদ্ভুত এক ঋতু, যেখানে শীত গ্ৰীষ্মের অনুভূতি একসাথে অনুভূত হয়। হয়তে রোজারও শীত লাগছে এই ভারী বর্ষনে। তূর্জান নিজের ভাগের কাথাটাও রোজার গায়ে দিয়ে দিল।
তারপর আবার যথাস্থানে এসে শুয়ে পড়ল। মাঝে শাড়িটা এখনো দেয়াল হয়ে আছে। তূর্জান আস্তে করে রোজার হাতে হাত রাখল, যেন ভয় না পায়। রোজার চুলের গোছা উড়ে এসে তূর্জানের হাতে ছুঁয়ে দিচ্ছে । তূর্জান থমকে গেল,আস্তে করে হাত বাড়িয়ে চুলটা সরিয়ে দিল। একটু ঘুমোনোর চেষ্টা করল, কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই বারবার ভেসে উঠছে আজকের সেই মুহূর্ত,রোজার চোখভরা ভয়, কাঁপতে কাঁপতে বলা “আমি রাজি…”
তূর্জান মুচকি হেসে উঠল। যেন বিশ্ব জয় করে ফেলেছে। ছেলেদের হাসিও এত সুন্দর হয়? তা তূর্জান নেওয়াজের আজকের হাসি না দেখলে বোঝাই যেত না। হঠাৎ কাছে কোথাও বজ্রপাত হওয়ায় রোজা ধপ করে উঠে বসল। যেন জান যায় যায় অবস্থা। এতজোরে বিদ্যুৎ চমকিয়েছে যে ঘরশুদ্ধ আলোকিত হয়ে গেছে। ভাগ্যিস পাশে তূর্জানের হাত পেয়েছে, ওটাই এখন একমাত্র ভরসা। রোজা একটু তূর্জানের দিকে এগিয়ে বসলো।
তূর্জানের হাত শক্ত করে ধরে বলল, “ তুবা জেগে আছিস?”
তূর্জানের থেকে বিপরীত কোনো কথা এলো না। রোজা আরেকটু হাত ঝাকিয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগেই হাত ছেড়ে আগের জায়গায় গিয়ে বসল। ইস, সে তো ভুলেই গেছিলো, সে এখন অন্য একটা বাড়িতে তূর্জানের পাশে শুয়ে আছে। তূর্জান জেগে থেকেও কোনো কথা বললো না। কি অদ্ভুত? জেগে থেকেও পাশে থাকা প্রেয়সীর ভয় উপভোগ করছে। তার মাঝে কোনো ভাবাবেগ নেই।
অথচ রোজা এমনি দিন ভয় না পেলেও আজকে ভীষণ ভয় করছে। করবেই না কেন? বাড়িতে সবার সাথে থাকা, তুবাকে আকড়ে ধরে বজ্রপাতের ভারী বর্ষণ পার করা, আর এই একা একটা ঘরে থেকে বর্ষণ পার করা কি এক নাকি? হয়তো একা নেই, কিন্তু পাশে যে আছে, তূর্জান নেওয়াজ। সেও তো থেকে নেই। রোজা একলা জেগে ভয় পাচ্ছে অথচ পাশে থাকা তূ্র্জান নেওয়াজ বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। একবার ভাবলো ডেকে উঠাবে, পরক্ষনেই কি ভেবে ডাকলো না। যে ঘুমাচ্ছে ঘুমাক। রোজার কি? রোজা ভয়ে মরে গেলেও তার কিছু যায় আসে না? এদিকে বিকট শব্দে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।
রোজা ভয়ে আরেকটু গুটিয়ে নিজের জেদ ভেঙে তূর্জানের হাত ধরে ঝাকালো। মিনমিনিয়ে বলল, “
তূর্জান ভাই, শুনছেন? তূর্জান ভাই!”
তূর্জানের মধ্যে তাও কোনো পরিবর্তন নেই। ওভাবেই শুয়ে আছে। রোজার ভয় আরো বাড়তে লাগলো। একলা বাড়িতে কিভাবে মানুষ থাকে? আর ওই আপুই বা কিভাবে? আপুর কথা ভাবতেই তূর্জানের হাত ছেড়ে দিলো। ওই আপুর কাছে যাওয়াই উত্তম। ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে আস্তে করে উঠে গেল, রাবেয়া আপুর রুমের দিকে। ভারী বর্ষণে কিছু শোনা যাচ্ছে না। কত ডেকেও রাবেয়া আপু উঠলো না। রোজার মনে হচ্ছে পিছনে কেউ দাড়িয়ে, অথচ পিছন ফিরে দেখবে সেই সাহস পর্যন্ত পাচ্ছে না।
এবার জোরেই ফুফিয়ে কেদে উঠল রোজা। কাদতে কাদতে বলল, “ বাবা – আম্মু, প্লিজ আমাকে এসে নিয়ে যাও। আমার ভীষণ ভয় করছে, ভয়ে মরে যাবো আমি। “
ভয়ে শরীর জমে ঠান্ডা। এখন ঘরে ফিরে তূর্জানকে ডেকে উঠাবে সেই শক্তি ও নেই। মনে হচ্ছে পা ভেঙে পড়ছে। এখন হালকা বিদ্যুৎ চমকানোর আলোতেও কি ভয় অনুভূত হচ্ছে। জোরে বজ্রপাত হতেই রোজা কানে হাত দিয়ে চেচিয়ে উঠল। সাথে সাথে কেউ দৌড়ে এসে তার বলিষ্ঠ বাহুডোরে আটকে নিলো। সেই পছন্দের চিরচেনা Roja Perfums Haute Luax পারফিউমের তীব্র গন্ধ বলে দিচ্ছে কার বাহুডোরে আবদ্ধ হলো রোজা। তূর্জান নেওয়াজ। রোজাও ভয়ে জমে গিয়েছে। তবে ছোটার জন্য, নড়াচড়া করা শুরু করল। চায়না রোজা এই নিরাপত্তা। রোজার মনে হচ্ছিলো সে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে গেছে। সময় মতো তো আসেনি, তাহলে এখন এই তীব্র ভয়ের সময় এসে কি হবে?
রোজা তূর্জানের থেকে ছোটার জন্য, তূর্জানের বাহুতে, বুকে একভাবে নিজের হাত দিয়ে আঘাত করতে থাকলো, অভিমানী কণ্ঠে বলল, “ ছাড়ুন আমাকে, আমার কাউকে চাই না। আমি মরে গেলেই তো শান্তি পেতেন, তাইতো বেঘোরে ঘুমাচ্ছিলেন। আপনি গিয়ে ঘুমান, আমি একাই থাকতে পারবো। “
তূর্জান রোজাকে আরেকটু শক্ত করে নিজের বক্ষপিঞ্জরে চেপে ধরল। তারপর অনুশোচনা নিয়ে বলল, “ সরি বউ, সরি, আ’ম এক্সটেমলি সরি। আমি বুঝতে পারিনি তুমি এতো ভয় পেয়ে যাবে। আমি আবারও সরি। “
রোজা তূর্জানের বলিষ্ঠ বাহু থেকে ছাড়া না পেয়ে, ওভাবেই বক্ষপিঞ্জরে নেতিয়ে পড়ে রইলো। এখনো ফুফিয়ে উঠছে। বৃষ্টির ছিটেফোঁটা এসে দুজনের গায়ে পড়ছে। তূর্জান কিছু না ভেবেই রোজাকে কোলে তুলে নিলো। তারপর বিছানায় নামিয়ে দিয়ে পরম আবেশে রোজার কপালে আদুরে করে ঠোঁট ছোঁয়ালো। রোজা তখন নিজের ধ্যানে নেই। সেই এক বাক্যে পরে আছে, তূর্জানের প্রতি তীব্র অভিমান জমা বেধেছে বোঝাই যাচ্ছে। তূর্জান ছেড়ে দিতেই রোজা বালিশে মুখ গুজে শুয়ে পড়ল। কথা বলবেই না। তূর্জানও আর কথা বলল না, শুধু নিরব হয়ে বসে রইলো রোজার পাশে।
মাঝেমধ্যে হালকা পাতলা ভঙ্গিতে বোঝালো সে এখানে এখনও সজাগ আছে। যাতে নিশ্চিন্তে থাকতে পারে প্রেয়সী।
হঠাৎ ভোরের ওই সূর্য রশ্মি টিনের চাল ভেদ করে রোজার চোখেমুখে ছিটকে পড়তেই রোজা চোখ কুচকে নিলো।ভোর থেকেই বৃষ্টি থেমে গেছে।
মাটির গন্ধে ভরে গেছে চারপাশ। পাখিরা ডাকছে, যেন নতুন একটা দিনের সূচনা। সাথে সাথেই নাকের রন্ধ্রে প্রবেশ করল, তূর্জানের সেই পরফিউম। আরেকটু নাক ঘষে, টেনে নিল গন্ধটা। রোজার তো এই পারফিউম খেতে মন চায়। এত্তো মিষ্টি গন্ধ। খানিকক্ষণ ওভাবেই পরে রইলো। তবে নিজেকে কেমন বন্দি মনে হলো। তড়িৎ বেগে তাকাতেই দেখল, তূর্জানের বুকে মাথা দিয়ে এতক্ষন ঘুমিয়েছে। কথাটা মাথায় আসতেই, তূর্জানকে কটু বাক্য শোনাতে উদ্দত হলো।
কিন্তু কথা হলো, তূর্জান তো নিজের জায়গাতেই আছে। রোজা কি তাহলে ঘুমের ঘোরে তুবা ভেবে, আর ভাবতে পারল না। তূর্জানের বুক থেকে উঠে বিছানায় ঝিম মেরে বসল। রোজা উঠতেই তূর্জানও উঠে বসল। তাহলে কি তূর্জান জেগে ছিলো। রোজা যে ঘুমের ঘোরে পাগলামো করছিলো।
তূর্জান হয়তো রোজার অসস্থি বুঝল। কাল রাতে রোজা ঘুমানোর পর, অতি যত্নে রোজাকে এনে নিজের বুকে স্থান দিয়েছিলো। যত্ন করে লুকিয়ে নিয়েছিলো নিজের বাহুডোরে। যদিও সে নিজের জায়গাতে ছিল, তাই রোজার ধারণা অনুযায়ী সেই গিয়ে তূর্জানের বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়েছে। কিন্তু তূর্জান তো ওমনটা করেছিল,যেন বউ তার ভয় না পায়, একটা মেয়ে হাসিখুশি পরিবার ছেড়ে হঠাৎ এমন পরিবেশে আসলে এমন ভয় হওয়া স্বাভাবিক।
তূর্জান নিজের খুলে রাখা ঘড়ি হাতে নিয়ে বলল, “ এত সকাল হয়ে গেছে! তুই আগে উঠেছিস তো আমাকে ডাক দেসনি কেন? নাকি রাতের রাগ এখনো কমেনি?”
রোজা নিশ্বাস ফেললো। যাক তূর্জান কিছু বোঝেনি, আর ঠিক ও পায়নি। তাই বাইরে যেতে যেতে বলল, “ ওটা জীবনেও কমবে না। “
“ হাহহ, যত কষ্ট এই তূর্জান নেওয়াজের।স্বামীর প্রতি একটু দয়াশীল হও বউ। যত রাগ, অভিমান সব কেন আমার উপর ঢালো। একটু ভালোবাসাও তো দিতে পারো। তোমার বর ভালোবাসার সংকটেই সংকটিত হয়ে যাবে।”
রোজা যদিও তূর্জানের কথা শোনেনি, তার আগেই রুম ছেড়েছে। সকালের খাবার না খেয়েই, রাবেয়া আপুকে কিছু টাকা দিয়ে তূর্জানরা বের হয়েছে। যদিও তিনি নিতে চায়নি, আত্মসম্মান সবারই আছে। রোজা জোর করে ধরিয়ে দিয়েছে।
তূর্জানের টাকা বলে কথা, হয়তো প্রথম প্রতিশোধ এই টাকা দিয়েই তুললো, না জানি ভবিষ্যতে কি করে। যদিও তূর্জান নিজে থেকেই অনেক টাকা দিয়েছিলো।
হঠাৎ বাইক ব্রেক কষলো তূর্জান, রোজা কটমটিয়ে বলল, “ আপনি হঠাৎ হঠাৎ ছাড়া কিছুই পারেন না? “
“ আমি হঠাৎ হঠাৎ কি করলাম? “
“ বাইকের ব্রেক কেউ এভাবে করে? এক্ষুনি জান বেরিয়ে যাচ্ছিলো। বাইকের ব্রেক থামানোর আগে বলা যায় না।“
“ সরি বউ আর এমন হবে না। “
রোজা তার দিকে কটমট করে তাকালো, “ এভাবে আমাকে বউ বলবেন না। “
“ঠিক আছে, আমার বউ যা বলে তাই।”
“ বললাম তো,আমাকে বউ বলবেন না!”
“তাহলে কি বলবো? মিসেস নেওয়াজ? মিসেস তূর্জান নেওয়াজ, আমরা বাড়ি চলে এসেছি। এবার নামুন।”
রোজা এবার আর সহ্য করতে পারল না। দেখলো সত্যিই বাড়ি চলে এসেছে। চুপচাপ নেমে দাঁড়ালো বাইক থেকে । তূর্জান নিচু স্বরে হেসে ফেলল।
আকাশ পরিষ্কার। বৃষ্টির পর রাস্তায় কাদা, কিন্তু বাতাসে এক ধরনের সতেজতা। তার মধ্যে রোজা হেটে চলছে, যেন কোনো অপ্সরা থেকে কম নেই। প্রথম দেখাতে মাশ-আল্লাহ বলতেই হয়।
বাইকে থেকে নেমে তূর্জান রোজার পাশাপাশি হাটতে লাগল।রোজা থেমে গেল তূর্জানের দিকে চেয়ে । তূর্জান হেসে বলল, “ তা এখন বাড়িতে গিয়ে কি জানাবো,? মিসেস নেওয়াজ। “
“ আমি কি জানি? আপনার ইচ্ছে, আপনি তো…
থেমে আবার বলল,“একটা কথা বলবো?”
তূর্জান অবাক,“ হুমম,বল।”
কথা বলতে গিয়ে গলা কেঁপে গেল রোজার, কি বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি। কাপা গলায় বলল,“কাল যেমনটা করেছেন,ওমন আর কখনো করবেন না।”
“তূর্জান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, “ কেন? আমি মরে গেলে তোর কি?“
রোজা চোখ বড় করে তাকালো,“আপনি কখনো বদলাবেন না, তাই না? বিরক্তকর লোক! সরুন তো।”
তূর্জান হালকা হেসে বলল, “ ওকে, আর ওমন করবো না। আমি কাভিয়ার আম্মুর জন্য সব বদলাতে পারি, শুধু অভ্যাস না আর অনেক কিছু,…
বলেই রোজার হাত ধরে বাড়িতে ঢুকল। রোজা এখনো পুরো বাক্য বোঝেনি, তাইতো চুপ আছে। নয়তো এতক্ষনে তূর্জানের মাথা ফাটাতো নিশ্চিত।
বাড়িতে পা রাখার পর থেকেই যেন অদ্ভুত এক পরিবেশ। সবাই জানে,তূর্জান আর রোজার বিয়ে হয়ে গেছে। কিন্তু কেউ মুখে কিছু বলছে না। না কোনো অতিরিক্ত আগ্রহ, না কোনো প্রশ্ন,সবকিছু স্বাভাবিকের মতোই। অথচ এই স্বাভাবিকতাই যেন সবচেয়ে বেশি অস্বাভাবিক।রোজা বাড়িতে যেতেই রাফিয়া আর তুবা একপ্রকার দৌড়ে আসল। “ তুই ঠিক আছিস রোজা? “
“ কেন? আমার কি হবে? “
“ না তুই তো ঝড়ে ভয় পাস। তাই বললাম। “
তূর্জান ততক্ষনে সিড়ি বেয়ে উঠতে গিয়ে রাহেলা নেওয়াজের সাথে দেখা হলো। তিনি ভ্রু কুচকে তূর্জানের দিকে তাকিয়ে আছে। তূর্জান ভ্রু কুচকে বলল “ কি? “
“ এদিকে আয়। “
“ ক্লান্ত আমি, যা বলার ফাস্ট বলো। “
“ মানে তুই,,,
“ ওহ গ্ৰানি, উল্টো পাল্টা একদম ভাববে না। আমি ওতটাও অধৈয্য নই। কি বলবা তাই বলো?”
“ কি আর বলবো? এক বউকে দুই দুইবার বিয়ে করেও, কিচ্ছু করতে পারলি না। আর কি বলার আছে? আচ্ছা বিয়ে কি তুই সত্যিই করেছিস? “
তূর্জান জানে, এখন রাহেলা নেওয়াজ তাকে খোচাখুচি করবে। এ তার অনেক আগের অভ্যাস।
তাই তূর্জান সিড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে বলল,
“ কিছু করবো কিভাবে? আগেও তো তুমি ছিলে,এখনো তুমি। তুমি থাকাকালীন আবার আমি কি করবো? “
রোজা নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে। তুবা, রাফিয়া সবার সাথে আগের মতোই কথা বলছে, হাসছে, কিন্তু কোথাও একটা অদৃশ্য দেয়াল তুলে দিয়েছে তূর্জান নেওয়াজ । যেহেতু তূর্জানের আজ ভার্সিটি আছে সেহেতু এখন নাস্তা করে ভার্সিটি যাবে। নাস্তার টেবিলে তূর্জানের দিকে তাকালেই চোখ সরিয়ে নিচ্ছে রোজা । তূর্জান অবশ্য এসব খুব ভালোই বুঝছে। তাই সেও চুপ আছে। কিন্তু বাড়িতে বিচ্ছুবাহিনীর কমতি নেই।
মাঝে মাঝে ইচ্ছে করেই সামনে রাখা খাবারের বলে টুংটাং শব্দ করছে, কিছু বলছে মিরান ,শুধু রোজার প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য। কিন্তু রোজা যেন আজ একেবারেই অনড়। মিরান মনে মনেই বলল, “ এই বনুটাও না। বিয়ে করেছিস, তুই। একটু তো হাসিহাসি থাক। পেচার মতো মুখ কেন করে রেখেছিস? অদ্ভুত!আমি হলে দৌড়ে বেড়াতাম। “
ডাইনিং টেবিলে সবাই মিটিমিটি হাসছে। তাজারুল নেওয়াজ কোনো কথা না বলে উঠেই যাচ্ছিলেন, তার ফিরে এসে বললেন, “ ভার্সিটি থেকে ফিরে আমার সাথে দেখা করো। আশা রাখছি হতাশ করবে না। “
বলেই তিনি ডাইনিং হল ছাড়লেন। রোজাও উঠে গেছে, অনেকক্ষন হলো। মোস্তফা নেওয়াজকে খোচা দিয়ে তূর্জান বলল, “ বুঝলেন, শশুরমশাই। আপনার মেয়ে যে এতটা ত্যাড়া, আগেই আপনাকে দেখে সন্দেহ হয়েছিলো। “
মোস্তফা নেওয়াজ কম কিসে? সেও বলল,
“ এবার পাট্রিক্যালি দেখেছো জামাই? এখন বিয়ে যেহেতু করেই ফেলেছো, শুধু দেখ আমার মেয়ে কিভাবে তোমার জীবন ভেজে খায়। “
“ না খাইয়ে মানুষ করলে তো, আমাকে ভেজে খাবেই। কিপ্টা শশুর। “
বলেই ডাইনিং হল থেকে নিজের রুমে চলে গেল তূর্জান। মোস্তফা নেওয়াজ ও চলে গেলেন। তূর্জান রোজা নেই যেহেতু, এখন সবাই আরিয়ানকে উদ্দেশ্য করে তুবাকে পচাতে লাগল। তানিয়া নেওয়াজ, রেহেনা নেওয়াজ ও মাঝে মাঝে একদুইটা বাক্য ছুড়তে ভুললেন না।
দুপুর গড়াতেই তূর্জান রেডি হতে লাগলো ভার্সিটির জন্য। শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল। পেছন থেকে মিরান বলে উঠল
“বউ বাড়িতে রেখে বাইরে যাওয়া ঠিক হচ্ছে না,কিন্তু কাজ তো আর তা মানে না…”
তূর্জান ভ্রু কুচকে বলল,“কাকে বলছিস?”
“ তোমাকে। “
“ তোর বোন হয়, একটু তো লজ্জা পা। “
“ হাহ লজ্জা। তুমি জানো আমি কত খুশি, ফাইনালি, রোজার বিয়ে কম্পিলিট, তুবারও হয়ে যাবে। তারপর আমি।”
“ হাইরে বাংলাদেশ, তোর মতো লজ্জাহীন পুরুষের জন্যই বাংলাদেশ আজ পিছিয়ে। “
বলেই হাটা ধরল তূর্জান। মিরান প্রথমে কথা বুঝতে পারলো না। পরে কথা বুঝতেই বড় চোখ করে তাকালো তূর্জানের দিকে। মানে মিরান তো শুধু বিয়ের কথা বলেছে। এখানে অতিরিক্ত জনসংখ্যার কথা আসলো কেন?
তূর্জান নিচে নেমে এসে রাহেলা নেওয়াজকে উদ্দেশ্য করে বলল,” গ্ৰানি আসছি। “
রাহেলা নেওয়াজ, ইশারায় বোঝালো, যাকে বলে যেতে চাস তাকে বলে যা। অন্যের বরের অপেক্ষা আমরা নিশ্চয় করবো না।রোজা পাশেই ছিল, কিন্তু চোখ উপরে তুললোই না। যেন বিজ্ঞানী ফ্লোর পরীক্ষা করছে, অনুবিক্ষন যন্ত্র ছাড়া চোখ দিয়ে। কোনো প্রতিক্রিয়াও দেখাল না। তূর্জান বের হওয়ার আগে একবার তাকাল ওর দিকে,কিন্তু রোজা যেন ইচ্ছে করেই অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখল।
তূর্জান যেতে যেতে বলল, ”ভার্সিটি থেকে এসে আপনাকে বোঝাচ্ছি sweetness rose.
ইনশাআল্লাহ চলমান…..
হাহ সবাইকে ওই বজ্রপাত আর বৃষ্টির মধ্যে একা রেখে আসবো। পরবর্তী পর্ব রাত দশটায় গ্ৰুপে পেয়ে যাবেন। তারজন্য শুধু একটু বড় বড় করে মন্তব্য করে ফেলুন।
Share On:
TAGS: প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা, ফারজানা রহমান সেতু
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১৬
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৩৭
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৬
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ২৬
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১৩
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১৪
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ২৭
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৩০
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ২০
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ২৯