Golpo কষ্টের গল্প পরগাছা

পরগাছা পর্ব ২৭


পরগাছা |২৭|

ইসরাত_তন্বী

(অনুমতি বিহীন কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ)

পরোক্ষভাবে অদিতির করা তীব্র অপমান সয়ে চৌধুরীরা শেখ বাড়ি ত্যাগ করেছে। অবস্থান করেনি বেশিক্ষণ। মুখে তোলেনি একদানা অন্ন। তাদের প্রবল আত্মসম্মানে বড়ো আঘাত লেগেছিল বৈকি। যেখানে দুআনার সম্মান নেই সেখানে পদযুগল রাখা আর নিজের গালে পাদুকা দিয়ে বাড়ি দেওয়া একই। অদিতি যখন লাবণ্য চৌধুরীর জন্য চিঠি দিতে চৈতন্য এর কাছে গিয়েছিল তখন দেখেছিল আহনাফ এর লজ্জিত মুখটা। ছেলেটা তার বাবা-মায়ের করা এরকম অদ্ভুত কাজের জন্য ভীষণ কুণ্ঠিত। মুখ তুলে তাকানোর সাহস অবধি করেনি। যখন সদর দরজা পেরোবে তখন কেবল একপলক তাকিয়েছিল আহনাফ। অদূরে দাঁড়ানো অদিতি হেসেছিল। চোখের ইশারায় আশ্বস্ত করেছিল। বুঝিয়ে ছিল অপরপক্ষকে স্বাভাবিক হতে। এইসব নিয়ে না ভাবতে। তার নতুন জীবনের জন্য শুভকামনা। আহনাফ কৃতজ্ঞতার সাথে মাথা নেড়ে মৃদু হেসেছিল।

সেই খবর অবশ্য রোকেয়া শেখের কানে পৌঁছাতে সময় লাগেনি। হয়ত কোনো কাজের খালা পাচার করেছে তাঁর কাছে। নিজ কক্ষে পালঙ্কে আধশোয়া হয়ে বসে আছেন রোকেয়া শেখ। মেয়ের করা বাড়াবাড়িতে ফ্যাচ ফ্যাচ করে কাঁদছেন তিনি। পোড়া ভাগ্যটা একটু খুলছিল সেটাও স্বেচ্ছায় বন্ধ করে দিল ওই মেয়ে। বলে নাকি কখনো বিয়ে করবে না। সে সমাজের তোয়াক্কা করে না। সবকিছু বুঝি এতই সহজ? মেয়েরা সারাজীবন একাকী থাকতে পারে না। পারে না সমাজের বিরুদ্ধে যেয়ে একটা পদক্ষেপ নিতে। পারে না আড়চোখে দেখা মানুষদের কটুকথা হজম করে জীবন পার করতে। যদি পারত তাহলে আজ রোকেয়া শেখ এখানে থাকতেন না। দুটো সন্তান জন্ম দিতেন না এই শেখ বংশে। গুঞ্জর মতো নিজেকে মুক্তি দিয়ে সুন্দর একটা জীবন পার করতেন। বিয়ের পরের জীবনের সেই দূর্বিষহ ঘটনা মনে পড়লে এখনো অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। আর নবনীতা! ছোট বোন সমতূল্য বোনটার সাথে আয়েশা শেখ এই এক জীবনে সবচেয়ে অবিচারটাই করেছে।

রোকেয়া শেখের আকাশ কুসুম ভাবনার মাঝেই অদিতি পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তিনি অবশ্য খেয়াল করেননি। মায়ের অশ্রুসিক্ত নয়ন, ম্লান বদনে একদৃষ্টে চেয়ে আছে অদিতি। এই পর্যায়ে আস্তে করে ডাকল,
“আম্মা?”
রোকেয়া শেখ অন্যমনস্ক ছিলেন। অদিতির ডাকে চমকে পাশ ফিরে তাকালেন। কিছুক্ষণ মেয়ের মুখটা দেখলেন। অভিযোগের সুরে বললেন,
“নিজের ভাগ্য নিজে পোড়াচ্ছিস। এর দায়ভার কে নেবে? এই বয়সে এসে আর কত সহ্য করব বলতো?”
মায়ের মুখ থেকে উচ্চারিত শব্দ গুচ্ছের আড়ালে লুকায়িত অভিমানটা খুব করে বুঝল অদিতি। তবে এইসব এখন আর হৃদয় ছুঁতে পারে না। মুখের সামনে ভাবীজানের নিষ্পাপ আননখানা বারবার ভেসে ওঠে। এতদিনে সাহস হয়নি ভাবীজানের সামনে যেয়ে দাঁড়ানোর। কোন মুখ নিয়ে দাঁড়াবে? যেই পোড়া ক্ষততে মলম লাগাতে পারবে না সেই ক্ষত তরতাজা করার অধিকার ও নেই। দাদীর কান ভাঙানোতে এমন কোনো অবিচার নেই যেটা ওই মেয়েটার সাথে করেনি আম্মা। জবাবে অদিতি মুচকি হাসল,
“আমার জীবনের দায়ভার কেবল আমার। ভাবীজানের সাথে করা পাপেই এই অবস্থা তোমার। এখন যদি আমার দায়ভার টুকুও তোমাকে নিতে হয় তাহলে বাঁচতে পারবে না, আম্মা।”

রোকেয়া শেখ অবিশ্বাস্য নেত্রে তাকিয়ে রইলেন। মেয়ের মুখনিঃসৃত কথাগুলো সুঁচের মতো বিঁধল মস্তিষ্কে। অতি বিস্ময়ে মুখ ফুটে কিছুই বলতে পারলেন না তৎক্ষণাৎ। সময় পেরোল নীরবে নিভৃতে। অদিতি তখনো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। রোকেয়া শেখ নিজেকে একটু ধাতস্থ করলেন। রয়ে সয়ে বললেন,
“আমি যখন বিয়ে হয়ে এবাড়িতে আসি তখন আমার বয়স মাত্র ১৪ বছর। আল্লাহ প্রদত্ত রুপ থাকার জন্য আব্বা শান্তিতে থাকতে পারতেন না। কখন কার কুনজরে পড়ে যাই তার তো ঠিক নাই। তাই তিনি আমাকে অল্প বয়সেই বিয়ে দিয়ে দেন। আব্বা তো বিয়ে দিয়েই খালাস। তোর দাদী ছিলেন ভীষণ রাগী। পান থেকে চুন খসলেই সবসময় গালিগালাজ করতেন। একবার তো রান্নাতে লবণ বেশি হওয়ায় আমার কোমরে গরম খুন্তি ধরে পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। এত অবিচার মুখ বুজে সহ্য করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। কখনো তোর বাবাকে জানানোর দুঃসাহস হয়নি। কারণ আমাকে সংসার বাঁচাতে হবে। পড়াশোনার ইচ্ছে থাকলেও তোর দাদীর জন্য করা হয়ে ওঠেনি। আমি চাইলেও এই শেকল ছেড়ে বেরোতে পারিনি। মুক্ত আসমানে উড়তে পারিনি। আরুষ হওয়ার পরে তোর দাদীর চোখের মণি হয়ে উঠলাম আমি। কারণ আমি শেখ বংশের পরবর্তী বংশধর জন্ম দিয়েছি। আমি কম বয়সে মা হয়ে তোর দাদীর ছায়ায় বড়ো হলাম। আমার মস্তিষ্কে একটা শব্দ গেঁথে দেওয়া হলো, শাশুড়ি হতে হবে কঠিন। বউমাকে মাথায় তুললে উলটো আমাকে ঘুরিয়ে নাচাবে। পরের মেয়ে কখনো আপন হয় না। আমি নিজেও এটার ভুক্তভোগী ছিলাম। আমার আর তোর ফুপুর মধ্যে যেই দেওয়ালটা ছিল সেটা বুঝতাম। তার পাতে মাছের বড়ো মাথা আর আমার পাতে মাছের কাঁটা। সেই থেকে অবলা আমিটার পরিবর্তন হলো। ন্যায় অন্যায় বোঝার শক্তি কমে গেল। অথচ হঠাৎ গুঞ্জর প্রস্থান আমাকে স্মরণ করিয়ে দিল আমি একজন নারী হিসেবে ব্যর্থ।”

একদমে কথাগুলো বলে থামলেন রোকেয়া শেখ। পাশের টেবিল থেকে কাঁপা কাঁপা হাতে পানির পাত্র তুলে নিয়ে ঠোঁট ছোয়ালেন সেখানে। অদিতি উপলব্ধি করল মায়ের অনুশোচনাটুকু। সবে তো শুরু। পাপ কখনো অন্তরে স্বস্তি দেয় না। অধরযুগল বাঁকিয়ে হাসল মেয়েটা,
“আম্মা, তোমার উচিত সবসময় জায়নামাজে বসে কান্নাকাটি করা। তোমার পাপের ক্ষমা স্বয়ং আল্লাহ ছাড়া কেউ করবে না। দাদীর প্ররোচনায় একটা নিষ্পাপ প্রাণ হত্যা করেছ তুমি। আমি সবটা জানি। প্রশ্ন করবে না কীভাবে জেনেছি। আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করো ঠিক তোমার ছেলের মতোই। এতে যদি সাময়িক শান্তিটুকু মেলে।”

কথাগুলো বলে আর দাঁড়াল না অদিতি। দরজার দিকে অগ্রসর হলো। রোকেয়া শেখ সবটা শুনলেন। বড়ো একটা শ্বাস ফেলে পিছন থেকে বলে উঠলেন,
“আমার সময় বোধহয় শেষ। বিছানা থেকে আর মুক্তি মিলবে না। বাইরের জগত আর দেখা হবে না। তুমি অন্তত ক্ষমা করিও আমাকে।”
সিক্ত কণ্ঠস্বর রোকেয়া শেখের। অদিতি থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। একমাত্র অভিমান চেপেই অদিতিকে তুমি সম্বোধন করেন রোকেয়া শেখ। বুকটা যন্ত্রনায় মোচড় দিয়ে উঠল অদিতির। শত হলেও জন্মদাত্রী মা। যেই মানুষটা কখনো অদিতির শরীরে ধুলোর স্পর্শ অবধি লাগতে দেয়নি। দাদীর অপছন্দের দৃষ্টি থেকে হেফাজতে রেখেছে। তাকে ঘৃণা করলেও একেবারে ফেলে দিতে পারে না। ঘৃণার পারদ ও হয়ত আকাশছোঁয়া নয়। অদিতির চোখের কোণে পানি জমল। তবুও শক্ত গলায় বলল,
“আজ বিকেলে আমরা বাগানে হাঁটব, আম্মা। হরেক রকমের ফুল ফুটেছে বাগানে। তাদের সান্নিধ্য পেলে আশাকরি ভালো লাগবে তোমার।”
অদিতি কথাগুলো বলেই আর দাঁড়াল না। বড়ো বড়ো পা ফেলে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল। রোকেয়া শেখের গাল বেয়ে বারিধারা নামল। নির্বাক তটিনীর মতো শান্ত হয়ে বসে রইলেন। কি-ই বা বলার আছে আর?
.

আজ আয়েশা শেখের কাছে চন্দ্রা আছে। অদিতির মন-মানসিকতা ভালো না থাকাই একাকী নিজের কক্ষে আছে। সঙ্গী ওই রাজা-রানী। চন্দ্রা নিজেও আর জোর করেনি। মেয়েটা যেই সময় পার করছে সেখানে নিজেকে সময় দেওয়ার বিকল্প আর কিছু নেই। এতেই যদি খানিকটা ভালো থাকা যায়। আয়েশা শেখ গভীর তন্দ্রাচ্ছন্ন। ওনার পাশেই শুয়ে আছে চন্দ্রা। দুজনের মাঝে বেশখানিকটা দুরত্ব আছে। চন্দ্রা চোখদুটো বুজে স্থির হয়ে আছে। পাশে শুয়ে থাকা মানুষটাকে একদমই সহ্য হচ্ছে না চন্দ্রার। সবগুলো জীবন নষ্টের মূল তিনিই। ওর নিষ্পাপ গুঞ্জকেও মানুষটা একটুও ভালো থাকতে দেয়নি। আর রইল বাকি নিজের জীবন। হাহ্! মানসপটে ভাসল সেই বিভীষিকাময় রাতটার মর্মান্তিক ঘটনাগুলো। যা কখনোই চন্দ্রাকে ভালো থাকতে দেয় না।

সেদিন মধ্যরাত পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় আলোকিত। গ্রামের মেঠোপথ চন্দ্রের স্নিগ্ধ দ্যুতিতে স্পষ্ট। প্রকৃতি জুড়ে শীতল ঝিরিঝিরি হাওয়া বয়ে চলেছে। নিজের কথামতো সত্যিই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় তাইমুর। পিছু পিছু গুঞ্জরিকাও আসে। গ্রামের বটগাছের নিচে চন্দ্রা যখন পৌঁছায় তখন গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে ভূমি স্পর্শ করা শশীর আলোয় চোখের পর্দায় ভাসে এই পৃথিবীর সবচেয়ে দুটো কাছের মানুষের মুখমণ্ডল। তাইমুর আর গুঞ্জরিকাকে দেখতেই চন্দ্রা দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায়। গুঞ্জরিকাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দেয়। তাইমুরের মুখটা শুকিয়ে একটুখানি হয়ে আছে। হাতে সময় কম। নদীর ঘাট থেকে নাও নিয়ে বড়ো ঘাটে পৌঁছাতে হবে। সেখান থেকে লঞ্চে করে নগরে যাবে। ভোররাতে একটা লঞ্চ আছে। সেটাই ধরবে তাইমুর। আজ খোঁজখবর নিয়ে জেনেছে সবটা। এই পর্যায়ে তাইমুর তাড়া দিল,
“সময় কম চন্দ্রাবতী। আপনজন, গ্রামের মায়া ছেড়ে সঙ্গ দিতে পারলে তবেও হাত ধরো আমার, নয়ত নয়।”
চন্দ্রার কান্নার বেগ বাড়ে। ক্রন্দনের তোড়ে ঠিকঠাকভাবে কথাটাও বলতে পারে না। গুঞ্জরিকা এতক্ষণ মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিল। এই পর্যায়ে ডান হাতটা তুলে চন্দ্রার পিঠের উপর রাখে। ধীর গলায় বলে,
“জীবন একটাই তাই তোকে বাধা দেওয়ার কাজটা আমার দ্বারা হবে না। আব্বা-মাকে আমি সামলিয়ে নেব। তুই আমার ভাইজানের সাথে ভালো থাক চন্দ্রা। আর দেরি করিস না।”
চন্দ্রা ফুঁপিয়ে কাঁদছে। গুঞ্জর কাঁধ থেকে মাথা তুলে চায়। সিক্ত গলায় বলে,
“আমাকে ক্ষমা করিস গুঞ্জ।”

গুজরিকা আর কিছু বলে না। চন্দ্রা নিঃশব্দে তাইমুরের দিকে এগিয়ে যায়। তাইমুর গুঞ্জরিকার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে। একটা অদৃশ্য বাঁধা ছেলেটাকে কিছু বলতে দিচ্ছে না। নেত্র যুগল ছলছল। অন্ধকারের মাঝেও ভাইজানের দৃষ্টি দিব্যি অনুভব করতে পারে গুঞ্জরিকা। কেবল নির্লিপ্ত রয়। বোনের থেকে কোনো হেলদোল না পেয়ে তাইমুর উলটো ঘুরে হাঁটা ধরে। পিছনে হাটে চন্দ্রা। বেশখানিকটা দূরে এগিয়ে যায়। ঠিক তৎক্ষণাৎ পিছন থেকে ডেকে ওঠে গুঞ্জরিকা,
“ভাইজান!”
ক্রন্দনরত কণ্ঠস্বর গুঞ্জরিকার। তাইমুর পদযুগল থামিয়ে ফেলে। গুঞ্জরিকা আঁধার ঠেলে দৌড়ে যেয়ে ভাইজানকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে। ঠোঁট ভেঙে কেঁদে দেয়,
“ভাইজান তোমাকে না দেখে আমি কীভাবে থাকব? আমাকে কে শাসন করবে? কে আমার আবদার রাখবে?”
একটু থেমে শুধায়,
“আমাদের আবার কবে দেখা হবে ভাইজান?”
তাইমুর পিছনে ঘুরে দাঁড়ায়। কলিজার টুকরো বোনকে বুকের মাঝে আঁকড়ে ধরে,
“শিঘ্রই দেখা হবে, শাকচুন্নী। কাঁদিস না দয়া করে। তুই কাঁদলে আমি যেতে পারব না।”
গুঞ্জরিকা সন্তর্পণে চোখের পানি মুছে নেয়। মৃদু হাসার চেষ্টা করে,
“তুমি যাও ভাইজান। ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে খুশি থাকো। আর দেরি কোরো না।”
সত্যিই অনেকখানি সময় পেরিয়ে গেছে। লঞ্চ ধরতে না পারলে সব শেষ হয়ে যাবে। তাইমুর আর দাঁড়ায় না। চন্দ্রাকে নিয়ে নতুন জীবনের আশায় পা বাড়ায়। গুঞ্জরিকা কিছু সময় দাঁড়িয়ে থেকে ভাইজানের প্রস্থান দেখে। মন চায় আরও একবার ডেকে শুধাতে,
“সত্যিই আবার আমাদের দেখা হবে তো ভাইজান? তুমি কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিলে না তো? নগর অবধি আদৌও যেতে পারবে তোমরা?”
গুঞ্জরিকার আর প্রশ্নগুলো করা হয় না। চোখের জলকে সঙ্গী করে নিজেও বাড়িতে ফিরে আসে।

নদীর ঘাটে পৌঁছে তাইমুর দেখে শুধু একটাই নৌকা বাঁধা আছে। মাঝি বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। চন্দ্রার কোমল আঁখি দুটো আজ অজানা শঙ্কায় ডুবে আছে। মুখটা ফ্যাকাসে। ব্যথিত শরীরের যন্ত্রণা দাঁতে দাঁত চেপে সয়ে নিচ্ছে। তাইমুর চন্দ্রার দিকে ফিরে আদেশ করে,
“মুখটা ওড়না দিয়ে সুন্দর করে বেঁধে নাও। যেন তোমাকে চেনা না যায়।”
চন্দ্রা মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়। তাইমুর দুই পা এগিয়ে যেয়ে মাঝিকে ডাকে,
“চাচা শুনছেন?”
এক ডাকেই কাজ হয়। মাঝি চোখ মেলে তাকায়,
“কন, কই যাবেন?”
তাইমুর একটু ঝুঁকে বলে,
“বড়ো নদীর ঘাঁটে।‌ ভোরের লঞ্চ ধরতে হবে। ভাড়ার দ্বিগুণ দেব। যাবেন?”
মাঝি শোয়া থেকে উঠে বসে। হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলেন,
“অবশ্যই যামু। আসেন আপনারা।”
তাইমুর চন্দ্রাকে নিয়ে নৌকাতে উঠে বসে। মাঝি পাড়ে বাঁধা নৌকার দড়ি খুলে ফেলে। বৈঠা হাতে তুলে নেয়। ঠিক সেই সময়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে একদল মানুষ। সম্মুখে থাকা একজনের কোলে ছোট্ট একটা বাচ্চা। যার মুখ দিয়ে রক্ত পড়ছে। গুরুতর অসুস্থ বাচ্চাটা। একজন তোড়ের সাথে বলে,
“নদীর ওপাড়ে যাইতে হবে। ভাড়া চার গুণ পাইবা। তাড়াতাড়ি চলো মাঝি। আমার মেয়ের অবস্থা ভালো নয়।”

মানুষ টাকার দাস। যেখানে বেশি টাকা পাবে সেখানেই তো আগে যাবে। এটাই মানুষের ধর্ম। মাঝির ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হলো না। ওনাদের উদ্দেশে বলেন,
“খাড়ান, যাইতাছি।”
মাঝি নৌকার ছাউনির ভেতরে বসে থাকা তাইমুরের কাছে যায়,
“আপনারা নামুন ভাই। একজন অসুস্থ বাচ্চা আইয়াছে। তাকে নিয়া যাইমু। তারে নিয়া না গেলে আল্লাহ নারাজ হইব।”
ছাউনির ভেতরে বসে সবটাই শুনেছে তাইমুর আর চন্দ্রা। চন্দ্রা অবাক না হয়ে পারে না। বাচ্চাটাকে নিয়ে যাওয়া আবশ্যক। আবার তারা নৌকা থেকে নামলে যে আর যাওয়া হবে না নিজেদের গন্তব্যে। তাইমুর হঠাৎ করেই রেগে যায়,
“আমি আপনাকে আগে বলেছি। টাকাও বেশি দিতে চেয়েছি। আপনি রাজি হলেন। এখন আবার ফাজলামি করছেন মিয়া?”
মাঝি বেজায় বিরক্ত হলেন,
“আরে নামেন আপনেরা। ওনারা তাড়া দিচ্ছে। আপনে পাঁচগুণ ভাড়া দিলে আপনারেই নিয়ে যাচ্ছি। পারবেন দিতে?”
তাইমুর নরম হয়ে যায়। একপলক চন্দ্রার দিকে তাকায়। মেয়েটা ভয়ে গুটিয়ে আছে। ওতগুলো মানুষের সামনে দিয়ে যাওয়াটা একটু ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু এখন তো কিছু করার ও নেই। হাতে টাকা স্বল্প। গুঞ্জরিকা নিজের গোছানো সবগুলো টাকা দিয়ে দিয়েছে। সেই টাকা এভাবে নষ্ট করতে পারে না। বাকিটা পথ তো এখনো পড়েই আছে। অগত্যা তাইমুর আর চন্দ্রাকে নৌকা থেকে নেমে যেতে হয়। তাইমুর কথা বাড়ানোর সাহস করে না। পাছে কেউ যদি ধরে ফেলে ওদের। কোনোরকমে চোখ লুকিয়ে নেমে মানুষগুলোর পাশ কাটিয়ে যেতে নেয়। ঠিক তৎক্ষণাৎ একজন বলে ওঠে,
“ওইডা মোখলেছুর রহমানের ভাগ্নি না?”
এইটার ভয়েই ছিল চন্দ্রা। আসন্ন বিপদ উপলব্ধি করতেই থরথর করে কেঁপে ওঠে সম্পূর্ণ কায়া। চারপাশে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। কেউ যেন কানের কাছে ফিসফিস করে বলে যায়,
‘তোদের আর একসাথে থাকা হলো না অভাগী চন্দ্রা।’
মুহুর্তেই নীরব নিস্তব্ধ জায়গাটা কোলাহলপূর্ণ হয়ে ওঠে। অর্ধেক মানুষ বাচ্চাটাকে নিয়ে নৌকায় ওঠে আর অর্ধেক মানুষ ছুটে আসে ওদের দিকে। পালানোর সময়টুকুও দুজন পায় না। চোখের পলকে সবটা কেমন যেন ঘটে যায়। জোরপূর্বক খুলে ফেলা হয় চন্দ্রার মুখের ওড়নাটা। তাদের সন্দেহ ঠিক হওয়াতে পৈশাচিক হাসে তারা। মোখলেছুর রহমানের মুখের বড়ো বড়ো বুলি এইবার ধূলিসাৎ হবে। কোথায় যাবে কঠিন আত্মসম্মান? তাইমুর পুরো তাজ্জব বনে গেছে। এতক্ষণে টনক নড়েছে। মস্তিষ্কে শুধু পরিবারের সদস্যদের মুখগুলোই ভাসছে। এত অসম্মানের ভার কীভাবে বইবে তারা? আব্বার সামনে কীভাবে দাঁড়াবে তাইমুর! আব্বার সব স্বপ্ন এভাবেই মাটিতে মিশিয়ে দিল সে! ওদের দুজনকে জোরপূর্বক টেনে গ্রামের মোড়লের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। খবর পাঠানো হয় দুই পরিবারের নিকট।

ভোরবেলা তাইমুর আর চন্দ্রাকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে নিয়ে যাওয়া হয় বিচারের জন্য। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই সম্পূর্ণ গ্রামজুড়ে হইহই পড়ে যায়। তাইমুরের মতো ছেলে এইকাজ করেছে শুনে সবার কৌতূহল বেড়েছে। গ্রামের ভালো ছেলেদের তালিকায় সবার শীর্ষে তাইমুর। যার ব্যক্তিত্ব, কথাবার্তা, চাল চলন ভিন্ন। সে সুচরিত্রের অধিকারী। পড়াশোনা ব্যতীত আর কোনোদিকে তার মন থাকে না। হাঁটার সময় সবসময় দৃষ্টি নুইয়ে হাঁটে। মানুষ তাকে ভীষণ পছন্দ করে। প্রতিটা বাড়ি থেকে মানুষ ছুটে আসে মাঠে। ইতোমধ্যে উপস্থিত হয়েছে দুজনের পরিবার। গুঞ্জরিকা যখন এই সংবাদ শোনে তখন পায়ের নিচে মাটি ছিল না। তার আশংকা এভাবে সত্য হয়ে যাবে ভাবতেও পারেনি। সেদিন বিচার সভায় গ্রামের মোড়ল জিজ্ঞাসা করেন তাইমুরকে,
“ওই মেয়েকে ভালোবাসো তুমি?”
তাইমুর এক ঝলক পরিবারের দিকে তাকায়। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে চন্দ্রাকে। কিছু একটা ভাবে। সময় বিলম্ব না করে একবাক্যে বলে,
“জি, ভালোবাসি।”
মোড়ল তাইমুরের বক্তব্য শুনে চন্দ্রার থেকে একই কথা জানতে চান। চন্দ্রার সম্মুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন মোখলেছুর রহমান। সেই দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই চন্দ্রা মিইয়ে যায়। আর সাহস হয়নি সত্যটা বলার। সময় নিয়ে এক জীবনের সবচেয়ে বড়ো মিথ্যাটা সেদিন বলে চন্দ্রা,
“ভালোবাসিনা, আমাকে হুমকি দিয়ে জোরপূর্বক নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।”
তাইমুর চকিতে পাশ ফিরে তাকায়। দুজন দুরত্ব রেখে পাশাপাশিই দাঁড়িয়ে ছিল। নিজের কান দুটোকে বিশ্বাস করতে পারছে না ছেলেটা। এইভাবেও বুঝি মিথ্যা বলা যায়? গুঞ্জরিকা তাচ্ছিল্য হাসে। জানত সে এমনই কিছু হবে। মোড়ল ফের প্রশ্ন করেন চন্দ্রাকে,
“তাহলে কাউকে কিছু জানাওনি কেন?”
চন্দ্রা মুখ নুইয়েছে ততক্ষণে। চোখ তুলে তাকানোর সাহস হয়নি আর। উত্তরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে,
“আমার সম্মান হানির কথা বলেছিল ওই ছেলে তাই কাউকে জানানোর সাহস হয়নি।”
ব্যস! সব দোষ হয় তাইমুরের। সত্য-মিথ্যা অবধি আর কেউ যায় না। ভাগ্নিকে মানুষের অত্যাচার থেকে আগলে বাড়িতে নিয়ে চলে যান মোখলেছুর রহমান। যা হবে বাড়িতে হবে। মোখলেছুর রহমান বিত্তশালী হওয়ায় গ্রামের মোড়লের সাথে তাঁর সখ্যতা আছে। এদিকে মানুষের ক্রোধের শিকার হয় নিরপরাধ তাইমুর। নিরপরাধ নয়ত কী? দোষী হলে দুজনই হতো। মানুষ পায়ের চটি থেকে শুরু করে ইটের টুকরো অবধি ছোঁড়ে ছেলেটার দিকে। কেউ একটাবার ভাবে না তাইমুরের মতো ছেলেকে দিয়ে কাউকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়া সম্ভব নয়। জাব্বার আলীকে সময় দেওয়া হয় এক সপ্তাহ। এর মধ্যেই গ্রাম থেকে চলে যেতে হবে তাদের। ব্যস! বিচার সভার সমাপ্তি হয়।

চন্দ্রাকে বাড়িতে এনে ঘরবন্দি করা হয়। মেয়েটা মামার পা ধরে খুব কাঁদে তাইমুরদের গ্রামছাড়া না করার জন্য। কিন্তু এতে মোখলেছুর রহমান ছিলেন উদাসীন। মামী নাসিমা বেগম আবারও হাত তোলেন চন্দ্রার গায়ে। মেয়েটা জ্ঞান হারিয়ে পড়ে থাকে নিজের কক্ষে। অপরদিকে সেইরাতের পরে আর কেউ দেখেনি তাইমুরকে। সেই ঘটনার একদিন বাদে চন্দ্রা ছোট মামাতো বোনের সাহায্যে লোকচক্ষুর অন্তরালে গুঞ্জরিকার কাছে আসে। কিন্তু গুঞ্জরিকা ফিরেও তাকায় না। ফিরিয়ে দেয় চন্দ্রাকে। শেষবারের মতো ক্ষমা চাওয়ার সুযোগটুকুও পায় না চন্দ্রা। মাটির কক্ষের জানালার ফাঁক দিয়ে একজোড়া নির্লিপ্ত চোখ সম্পূর্ণ ঘটনা দেখে। সেদিন রাতেই গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে তাইমুর। ছোট্ট একটা ভুলের জন্য একজন মেধাবী ছাত্রের জীবনটা শেষ হয়ে যায়। ওই দুটো দিন নাওয়া, খাওয়া ছিল না তাইমুরের। কক্ষ থেকে প্রাকৃতিক প্রয়োজন ব্যতীত একটা বারের জন্যও বের হয়নি ছেলেটা। নিজের সাথে একপ্রকার যুদ্ধ করে এই জীবনের ইতি টানে। সোনার টুকরো ছেলে হারানোর শোক জাব্বার আলী আর সুফিয়া বেগম সইতে পারেন না। নিজেদের জীবনের ও সমাপ্তি টানেন। সঙ্গে মানুষের বিষাক্ত বাণ তো ছিলই। হাসিখুশি একটা পরিবার এক দমকা ঝড়ে শেষ হয়ে যায়। নিয়তি বড়ো নিষ্ঠুর ছিল তাদের জন্য।

অতীত স্মরণ করে বালিশ ভিজিয়ে চলেছে চন্দ্রা। ফুঁপিয়ে উঠল মেয়েটা। বিড়বিড় করে আওড়াল,
“সেই যে নিজেকে হারাইলাম আর খুঁজে পেলাম না।”
ঠিক সেই সময় কর্ণগোচর হলো আয়েশা শেখের কণ্ঠস্বর,
“কাঁদছিস নাত বৌ?”
চন্দ্রা কাঁদতে কাঁদতেই হাসল। পাশ ফিরে আয়েশা শেখের দিকে ঘুরল। কিয়ৎসময় নিশ্চুপ থেকে বলল,
“আমার জীবন ধ্বংসের একমাত্র কারিগর আপনি দাদী। আপনার কোনো ক্ষমা নেই।”
আয়েশা শেখ শুনলেন কথাগুলো। শুধালেন,
“নবনীতার লগে তোর কী সর্ম্পক আছিল? মুই যেইডা ভাবছি সেডাই নাকি?”
চন্দ্রা মলিন বদন, ভেজা চোখেই মৃদু আওয়াজে হেসে উঠল। জবাব দিল না কোনো। আয়েশা শেখ একটু ভীত হলেন। এই মেয়ে পাগল হলো নাকি? ওনাকে মেরে টেরে ফেলবে কি? চন্দ্রা হাসি থামাল। বুঝল অপরপক্ষের মনোভাব। বলল,
“ভয় নেই দাদী। আমি আপনাকে হাতে মারব না। আপনি আমার উপস্থিতিতে এমনিতেই নিঃশেষ হয়ে যাবেন। আপনার হাতে হয়ত বড়ো জোর একটা মাস সময় আছে। চেয়েছিলাম শেখ বংশের পরবর্তী বংশধরের হাত ধরে আপনার ধ্বংস উল্লাস করব কিন্তু আপাতত সেটার ও‌ প্রয়োজন নেই। পথের কাঁটা তো চলে গেছে। আপনি নিজে তাড়িয়েছেন।”

চলবে

(রিচেক নেই। লিখেই পোস্ট করেছি। ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। প্রিয় পাঠক আপনাদের সকলের রেসপন্স ও গঠনমূলক মন্তব্যের আশা রাখি।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply