#নূর_এ_সাহাবাদ
#jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব – ৫৯
সাহাবাদের সৈন্যরা সদ্য বিজয়ের উল্লাসে ফেটে পড়তে যাচ্ছিল। সেই উল্লাস চূড়ান্ত হতে দিল না খোদ নিয়তি। সামনে যারা দাঁড়িয়ে আছে, তাদের সাথে যুদ্ধ করা আর আত্মহত্যা করা প্রায় একই কথা। যেচে পড়ে মৃত্যু ডেকে আনা যাকে বলে।
দিগন্ত জুড়ে শুধু সৈন্য। সারির পর সারি সৈন্য।
যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই অচেনা পতাকা,
অচেনা বর্ম, অচেনা অস্ত্র ধারী সব সৈন্য। চতুর্দোলার সামনে এসে দাঁড়ালো অঙ্কুর। পাঁচ বছর আগের সেই মানুষটার সাথে আজকের অঙ্কুরের পার্থক্য অনেক।
তার পোশাক হয়েছে রাজকীয় আরও সমৃদ্ধ। কাঁধে অদ্ভুত নকশার ভারী আলখাল্লা। যেন বড় কোনো সম্রাট এসেছেন স্বয়ং। প্রতয়েকটা আঙুলে ঝলমলে পাথর বসানো আংটি। মুখে সেই শয়তানি হাসি। পরিবর্তন হয়েছে কেবল পোষাক এর। সবকিছু তার পরিকল্পনামতোই ঘটেছে।
চারপাশে তাকিয়ে হাত দুটো প্রসারিত করলো।
“সাহাবাদ…”
মনে হলো বহুদিন পর নিজের কাঙ্ক্ষিত সম্পদ ফিরে পেয়েছে সে। বাইজিদ স্থির চোখে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করল। তার যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বিশাল। বুঝল এখানে লড়াইয়ের কোনো অর্থ নেই। তাদের সৈন্য ক্লান্ত। সদ্য যুদ্ধ শেষ করেছে। আর অঙ্কুরের বাহিনী সম্পূর্ণ সতেজ। সংখ্যাতেও কয়েকগুণ বেশি। আজ যুদ্ধ হলে শুধু সৈন্য নয় মেহেরুন্নেসা, সুনেহেরা, আবিদ, চন্দ্রা, এমনকি রাজ্যের ভবিষ্যৎও ধ্বংস হয়ে যাবে।
মেহেরুন্নেসা ফিসফিস করে বলল
“শা…শাহজাদা! কি করবো এখন?”
বাইজিদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর নিজের তলোয়ারটা নিচে নামিয়ে আনলো। সুনেহেরা অবাক হয়ে তাকালো।
“ভাইজান?”
বাইজিদ শান্ত গলায় বলল
“এই যুদ্ধ আজ জিততে পারব না আমরা। এখানে বুদ্ধিমান এর পরিচয় দাও প্রত্যেকে। সামান্য বোকামির মাশুল কিন্তু গোটা রাজ্য কে দিতে হবে”
বাইজিদ এর অস্ত্র নিচু হতে দেখে অঙ্কুর দূর থেকেই হাসলো। তারপর হাত তুলতেই তার বাহিনী ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে শুরু করলো।
অদ্ভুত ব্যাপার তারা আক্রমণ করলো না। তলোয়ারও চালালো না। প্রশিক্ষিত ভাবে চারদিক ঘিরে ফেললো। যেন আগে থেকেই জানতো কী হবে। এক এক করে সাহাবাদের সৈন্যদের নিরস্ত্র করা হলো। তাদের অস্ত্র জমা নেওয়া হলো। বর্ম খুলে নেওয়া হলো। হাত বেঁধে ফেলা ফেলল প্রত্যেকের। তবুও কেউ প্রতিরোধ করলো না।
এখন প্রতিরোধ মানে নিরর্থক মৃত্যু। এই বিশৃঙ্খলার মাঝেই একটা ঘটনা কারও নজরে এলো না। পেছনের দিকে অবস্থান করা শেষ দুর্গের কিছু নারী সৈন্য ধীরে ধীরে অন্ধকারের মধ্যে সরে গেল। অঙ্কুরের বিশাল বাহিনীর চোখ এড়িয়ে তারা মিলিয়ে গেল রাতের অন্ধকারে।
কেউ টেরও পেল না। বাইজিদ খেয়াল করেছে বিষয়টা। তাদের বুদ্ধির তারিফ করলো মনে মনে।
এরপর শুরু হলো বন্দি কর্যক্রম। সাধারণ সৈন্য অশ্বারোহী, দাস, সেনা-দাস সবাইকে আলাদা করা হলো। লোহার শিকল পরানো হলো। তারপর দীর্ঘ সারি করে নিয়ে যাওয়া হলো কারাগারের দিকে।
আবিদের মুখ শক্ত, চোখে রাগ। কিন্তু কিছু বলছে না। মেহেরুন্নেসা দুই মুঠি শক্ত করে দাঁড়িয়ে।
চন্দ্রা নিজের ধনুক নিচে রাখলো। সুনেহেরা হারতে নারাজ। মরে যাবে প্রয়োজনে। একবার আকাশের দিকে তাকালো। মাহাদির কোনো দেখা নেই।
মারজানেরও না।
অঙ্কুর তাদের দিলে এগিয়ে এলো। দৃষ্টি গিয়ে থামলো বাইজিদের ওপর। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে হাসলো।
“অবশেষে। এত বছর পর আমাদের আবার দেখা হলো বন্ধু”
বাইজিদ কোনো উত্তর দিল না। অঙ্কুর আবার বলল
“তোমাদের কারাগারে পাঠালে মজা হবে না। তোমরা তো আর কোনো সাধারণ বন্দি নও।”
তার চোখ এবার মেহেরুন্নেসার দিকে গেল।
“তেমরা হলে গিয়ে আমার নিজের লোক। তোমাদের জায়গা মহলে। চলো চলো”
রাত গভীর হওয়ার আগেই তাদের নিয়ে যাওয়া হলো সাহাবাদ প্রাসাদে। যে প্রাসাদ তাদের নিজের ছিল। আজ সেখানে তারা বন্দি। প্রাসাদের বিশাল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মেহেরুন্নেসার বুকটা হুহু করে উঠলো। দূরে সিংহাসন কক্ষের দিকে তাকিয়ে অঙ্কুরের ঠোঁটে পিশাচ হাসি ফুটে উঠলো।
একে একে সকলকে এক কক্ষে ঢোকানো হলো। তার আগে যাচাই করা হলো সাথে কোনো অস্ত্র আছে কিনা। অঙ্কুর দাঁড়িয়ে থেকে তাদের তল্লাশি দেখছিলো। নারী দাসি টা সুনেহেরা কে ধরতে ভয় পাচ্ছে তল্লাশির জন্য। কোথ থেকে আচমকা ছুরি বের করে মেরে দিবে। এ মেয়ের যা তেজ। হলোও তাই। মহিলা সাহস করে হাত বাড়াতেই কোমড়ে গুজে রাখা বাঁকানো ছুরিনটা ঝড়ের বেগে গেঁথে দিল অঙ্কুরের সঙ্গী দাসীর ঘাড়ে। অঙ্কুর ছিটকে দু পা সরে গিয়ে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো।
“একদম ঠিক করেছো বেগমজান। চুমু তোমাকে। এবার ভালো মতো যাও নয়তো তোমার বাবা কিন্ত…”
অঙ্কুরের কথা শেষ হওয়ার আগে সুনেহেরা ছুরি টা মেঝেতে ছুরে ফেলে রাগে গজগজ করতে করতে ভিতরে ঢুকলো। তাদের পোষাক দিল অঙ্কুর। সেগুলো পরিয়ে দরবার খানায় আনা হলো তাদের। সকলেই প্রহরীদের বেষ্টনীর মধ্যে দাঁড়িয়ে। সিংহাসনে বসে আছে অঙ্কুর। তার মুখে সেই অস্বস্তিকর হাসি। যা দেখলে একজন সাধারণ মানুষের গা গুলিয়ে উঠবে।
কিছুক্ষণ সবাইকে পর্যবেক্ষণ করার পর অঙ্কুর উঠে দাঁড়ালো। তার দৃষ্টি গিয়ে থামলো মেহেরুন্নেসার ওপর।
“তোমাকে একটা প্রস্তাব দিতে চাই।”
মেহেরুন্নেসার ভ্রু কুঁচকে গেল।
“আমার আপনার কোনো প্রস্তাব শোনার আগ্রহ নেই।”
অঙ্কুর যেন শুনেও শুনলো না। সে বলল,
“সাহাবাদ এখন আমার। সিংহাসন আমার। ক্ষমতা আমার। তুমি চাইলে এই সবকিছুর অংশ হতে পারো।”
বাইজিদের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো।
অঙ্কুরের পরের কথাটা শোনার আগেই সে বুঝে গেল মানুষটা কী বলতে যাচ্ছে। অঙ্কুর ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“আমাকে বিয়ে করো মেহেরুন্নেসা। তোমার মেয়েদের আমি রাখতে পারবো না যদিও। কারণ বড়টা তোমার মত ঠান্ডা মাথার খুনী হবে। আর ছোট টা হবে এই তেজী মহিলার মত ধারালো। তার চাইতে ভালো বাইজিদ এর মেয়ে বাইজিদ নিয়ে যাক, তুমি আমার বুকে আসো”
বাইজিদ এক ঝটকায় সামনে এগিয়ে আসতেই চারপাশের সৈন্যরা সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্র তাক করলো।
“অঙ্কুর!”
তার কণ্ঠ গর্জে উঠলো।
“তোর সাহস হলো কীভাবে আমার স্ত্রী কে করপ্রস্তাব দেওয়ার?”
অঙ্কুর হাসলো।
“সাহস? ক্ষমতাবানদের সাহস লাগে না, বাইজিদ। তারা শুধু সিদ্ধান্ত নেয়। তা তুই জানিস ইইইই বন্ধুউউ”
মেহেরুন্নেসার চোখে তখন ঘৃণা। ঘৃণিত কন্ঠে বলল
“ তোর মত পুরুষের মুখে থুহহহ”
অঙ্কুরের মুখের হাসি কিছুটা মিলিয়ে গেল।
“দুঃখজনক। নূর দুঃখজনক। বাকি জীবন টা তাহলে এই সাবেক শাহজাদার সাথে কারাগারে কাটাও”
এরপর বন্দিদের আলাদা কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো। প্রহরী বাড়িয়ে দেওয়া হলো চারপাশে।
কেউ কারও সাথে দেখা করতে পারবে না।
রাত গভীর। হঠাৎ কয়েকজন প্রহরী দেখতে পেল অঙ্কুর দ্রুত পায়ে মেহেরুন্নেসার কক্ষের দিকে যাচ্ছে। তার মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে মেজাজ ভালো না। প্রহরীরা কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেল না। ভারী দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকে গেল সে। তারপর দরজা বন্ধ করে দিলো ভিতর থেকে।
ভেতর থেকে একটা ধাতব শব্দ এলো খুব জোরে।
কেউ যেন ভারি কোনো কিছু ফেলে দিয়েছে। প্রহরীরা একে অন্যের দিকে তাকালো। কিন্তু ভেতরে ঢোকার সাহস পেল না। হঠাৎ দরজার নিচ দিয়ে কিছু একটা গড়িয়ে বের হতে শুরু করলো। কেউ বুঝতে পারেনি প্রথমে বিষয় টা।
একজন প্রহরী ফিসফিস করে বলল,
“রক্ত…”
সবাই স্তব্ধ। সত্যিই দরজার নিচ দিয়ে ধীরে ধীরে লাল রক্ত বের হয়ে আসছে।
পরক্ষণেই দড়াম করে দরজাটা ভেতর থেকে খুলে গেল। প্রহরীরা চমকে উঠলো। সামনে দাঁড়িয়ে আছে মেহেরুন্নেসা। এলোমেলো চুল। দ্রুত শ্বাস নিচ্ছে। চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলছে।
তার হাতে রক্তমাখা একটা ছোট ছুরি। কক্ষের ভেতরে মাটিতে পরে আছে অঙ্কুর। তার কাঁধ থেকে রক্ত ঝরছে। মনে হচ্ছে ধারালো অস্ত্রের আঘাত লেগেছে। সে এক হাতে ক্ষত চেপে ধরে আছে। আর অন্য হাতে মাটির ভর নিয়ে উঠতে চেষ্টা করছে। মেহেরুন্নেসা ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো। তার কণ্ঠ ঠান্ডা। অস্বাভাবিক ঠান্ডা।
“পরের বার আমার কক্ষে ঢোকার আগে মনে রাখবি। এবার ধর টা আলাদা করলাম না দেহ থেকে। পরের বার করে দিব।”
দেখে মনে হচ্ছে না অঙ্কুর বাচবে। তবুও প্রহরী রা তাকে ধরাধরি করে বৈদ্যের ঘরে নিয়ে গেল। চিকিৎসক তো সাথেই। শুরু হলো তাকে বাঁচানোর তোরজোর।
****
কারাগারের ভারী লোহার দরজাটা ধপ করে বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে চারপাশ অন্ধকারে ডুবে গেল।
শুধু দেয়ালে ঝোলানো একটা মশালের ক্ষীণ আলো দপদপ করছে। অঙ্কুরের কাঁধে আঘাত করার মূল্য খুব দ্রুতই দিতে হলো সবাইকে।
ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল অঙ্কুর। আহত অবস্থায় ও নির্দেশ দিল সবাইকে কারাগারে নিক্ষেপ করার। পুরো জমিদার পরিবারকে বন্দি করা হোক।
অতঃপর বাইজিদ, মেহেরুন্নেসা, সুনেহেরা, আবিদ, চন্দ্রা সকলকে একসাথে বন্দি করা হলো প্রাসাদের পুরোনো ভূগর্ভস্থ কারাগারে। যেখানে সূর্যের আলো পর্যন্ত পৌঁছায় না। সবাই নিজ নিজ চিন্তায় ডুবে আছে। অবশেষে নীরবতা ভাঙলো মেহেরুন্নেসা। তার কণ্ঠ কাঁপছে।
“ইয়া আল্লাহ! আমার মেয়েদের হেফাজতে রেখো”
সুনেহেরা দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে বসেছিল।
সে চোখ বন্ধ করলো। মেয়েদের কথা ভেবে আসলেই চিন্তা হচ্ছে। আদৌ কী নারী সৈন্য রা সেখানে আছে? নাকি বাচ্চা তিনটা কে ফেলে রেখে চলে গেছে প্রাণের ভয়ে। চন্দ্রার বড্ড কষ্ট হচ্ছে, আবিদ থাকতে বলল। সে থাকলে আজ মেয়েগুলো কে যে করেই হোক রক্ষা করত।
মুহূর্তেই যেন সবার বুকের ভেতর একই ভয় চেপে বসল। মাত্র পাঁচজন নারী সৈনিকের দায়িত্বে মেয়ে রা। মেহেরুন্নেসার চোখ ভিজে উঠলো।
“ওরা ঠিকমতো খেয়াল রাখবে তো? সাহারা তো রাতে আমাকে ছাড়া ঘুমায় না। কাঁদলে কে ওকে শান্ত করবে?”
চন্দ্রার বুকটাও হাহাকার করে উঠলো। ছোট্ট মেয়েটা মায়ের আঁচল ছাড়া থাকতেই পারে না।
ঘুম থেকে উঠেই প্রথমে মাকে খোঁজে। এখন যদি কাঁদতে কাঁদতে জেগে ওঠে? আবিদ মাথা নিচু করে বসে আছে। জীবনে বহু বিপদ দেখেছে। কিন্তু আজ নিজেকে অসহায় লাগছে। নিজের সন্তানের জন্য কিছুই করতে পারছে না। সবচেয়ে অস্থির হয়ে উঠলো সুনেহেরা। হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে লোহার শিক ধরে ঝাঁকাতে লাগলো।
“ধুর! ধুর! ধুর!”
তার চোখ লাল হয়ে উঠেছে।
“অঙ্কুর কালই উত্তরের প্রাসাদ দখল করবে। তারপর? তারপর মেয়েগুলোর কী হবে?”
কেউ উত্তর দিতে পারলো না। প্রশ্নটা সবার মাথাতেই ঘুরছে। বাইজিদ এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল। হঠাৎ বলল
“অ্যাই শান্ত হও তো তোমরা।”
সুনেহেরা ঘুরে তাকালো।
“কিভাবে শান্ত হবো ভাইজান? ওদের কিছু হয়ে গেলে?”
বাইজিদের চোখেও দুশ্চিন্তা স্পষ্ট। তবুও নিজেকে শক্ত রাখলো।
“শেষ দুর্গের নারী সৈন্যরা এতটাও অকৃতজ্ঞ না। ওদের আমি চিনি। জিবন দিয়ে হলেও আমার মেয়েদের রক্ষা করবে ওরা”
তবুও বুকের ভয় কমলো না কারও। আর একটা বিষয় সবাইকে আরও বেশি ভাবাচ্ছে। এত কিছু হয়ে গেল। যুদ্ধ হলো, বন্দি হলো সবাই অথচ মাহাদির কোনো খোঁজ নেই। মেহেরুন্নেসা নিচু স্বরে বলল,
“আচ্ছা মাহাদি কোথায়?”
সুনেহেরা চোখ নামিয়ে ফেললো। অনেকক্ষণ পর বলল,
“আমি আর কিছু বুঝতে পারছি না। লোকটা কি আদৌ আমাদের পক্ষে? নাকি বিপক্ষে? নাকি অন্য কোনো খেলা খেলছে?”
মেহেরুন্নেসা দুই হাত জোড়া করে দোয়া পড়তে লাগলো।সুনেহেরা মাথা নিচু করে বসে পড়লো।
***
উত্তরের প্রাসাদ থেকে বের হওয়ার সময় চরম বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে নারী সেনা রা। যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা তাদের বলে দিয়েছিল উত্তরের প্রাসাদও বেশিক্ষণ নিরাপদ থাকবে না।
অঙ্কুর যদি সাহাবাদ দখল করে থাকে, তাহলে তার পরবর্তী লক্ষ্য হবে উত্তরের প্রাসাদ। আর সেখানে আছে রাজপরিবারের সবচেয়ে মূল্যবান তিনজন সদস্য। রাতেই পাঁচজন নারী সৈনিক তিন শিশুকে নিয়ে জঙ্গলের পথ ধরেছিল।
ঘন বৃক্ষের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সরু রাস্তা।
কাঁটাঝোপ, শুকনো খাল,পাহাড়ি ঢাল সবকিছু পেরিয়ে বহু দূরে এক গোপন প্রশিক্ষণ দুর্গ। এখানে শেষ দুর্গের নারী যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। মেহেরুন্নেসা দীর্ঘ সময় এখানে থেকেছে।
বাচ্চারা বুঝতে পারছে না কী ঘটেছে। এখানে তাদের মা নেই বাবা নেই পরিচিত কেউ নেই।
চারপাশে অচেনা মুখ অচেনা জায়গা অচেনা ঘর। গভীর রাত থেকে একনাগাড়ে কাঁদতে শুরু করলো সাহারা। ছোট্ট মেয়েটার কান্না শুনে সবার বুক হাহাকার করে উঠছিল। কান্না দমাতে সৈনিক রা একে একে কোলে নিতে লাগল। কার কোলে গেলে থামবে। খেলনা এনে দিল কত। কিন্তু কিছুতেই কাজ হলো না। সাহারা শুধু কাঁদছেই।
শাখা অবশ্য তুলনামূলক শান্ত। সে কোণের দিকে বসে আছে। দুই হাঁটু জড়িয়ে। বড় বড় চোখে সবকিছু দেখছে। মাঝেমধ্যে সাহারার দিকে তাকাচ্ছে। কিন্তু খুব একটা কথা বলছে না। চঞ্চল মেয়েটাও চুপসে গেছে একদম। সবচেয়ে বেশি হিমশিম খাচ্ছিল জান্নাত। সে নিজেও তো শিশু।
তবুও নিজেকে বড় ভাবার প্রবল শখ। সাহারার কান্না থামাতে কোলে নিয়ে হাঁটছে কক্ষ জুড়ে।
মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। বারবার বলছে,
“কাঁদিস না বোন। আম্মা আসবে, বাবাও আসবে। দেখিস।”
কিন্তু সাহারা কিছুতেই শুনছে না।কান্না করতে করতে হাঁপিয়ে উঠলো। শুধু ফোঁপাচ্ছে এখন।
জান্নাত ভয় পেয়ে গেল।
“এই! এই বেন। তোর তো শ্বাস আটকে যাবে!”
তার নিজেরই চোখে পানি। তবুও সাহারাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। একজন নারী সৈনিক কোথ থেকে সামান্য গরুর দুধ জোগাড় করলো। এনে একটা পাত্রে গরম করলো। ছোট্ট পাত্রে করে নিয়ে এলো। জান্নাত নিজেই সেটা হাতে নিল। যেন খুব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। মায়ের পর বড় বোন ই তো মায়ের দ্বায়িত্ব পালন করে। সে সাহারা কে কোলে নিল যেমন করে মেহের নিতোব। গলায় রুমাল দিয়ে চামচে করে বাটি থেকে দুধ তুলে মুখে দিলো।
“দেখ, একটু খা।”
সাহারা মুখ ঘুরিয়ে নিল। কেঁদেই চলেছে সে। কিছুতেই মুখ খুলছে না। শেষ পর্যন্ত অনেক বুঝিয়ে, অনেক আদর করে, নিজের চোখও মুছতে মুছতে জান্নাত সাহারাকে অল্প কিছু দুধ খাওয়াতে পারলো। দুধ খাওয়ার পর সাহারার কান্না কিছুটা কমলো।
চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে। বারবার ঢুলে পড়ছে।
জান্নাত তাকে বুকে জড়িয়ে বসে রইলো।
নিজেও ঘুমে কাহিল। তবুও ছাড়ছে না। মনে হচ্ছে ছাড়লেই আবার কাঁদতে শুরু করবে। সাহারা ছোট্ট হাতে জান্নাতের জামা শক্ত করে চেপে ধরলো। তারপর ফিসফিস করে বলল
“আপি…”
“হুম?”
“আমা… মা আমা”
জান্নাত বোনকে বুকের সাথে চেপো ধরলো। তার নিজেরও খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে। সাহারার কপালে চুমু খেয়ে বলল
“আসবে। আসবে। আসবে আমার সোনা বনু”
বোনের বুকে মা মা অনুভূতি পাচ্ছিল সাহারা। চোখ বুজে এলো। অবশেষে ঘুমিয়ে পড়লো সে।
অনেক কান্না, অনেক কষ্টের পর। সাহারা কে ডেকে জান্নাত নিজের পাশে শোয়ালো। শাখা দেয়ালের পাশে জান্নাতের কাছে গুটিসুটি মেরে ঘুমাচ্ছে। সাহারা জান্নাতকে আঁকড়ে ধরে আছে জান্নাত নিজেও ঘুমিয়ে পড়েছে বসা অবস্থাতেই।
এক হাত এখনো শক্ত করে রাখা ছোট্ট বোনটার গায়ের ওপর। যেন ঘুমের মধ্যেও তাকে আগলে রাখছে।
রাতটা যেন এক যুগের সমান দীর্ঘ ছিল। সারা রাত সাহারাকে সামলাতে সামলাতে জান্নাত যেন হুট করেই বড় হয়ে গেছে। মাত্র সাত বছরের একটা মেয়ে দুই বোনের অভিভাবক হয়েছে। রাতের প্রায় শেষ দিকে সাহারা আর শাখা ঘুমিয়ে ছিল। জান্নাত অনেকক্ষণ জেগে ছিল ঘুমন্ত দুই বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে। কেউ যেন ওদের নিয়ে যেতে না পারে।
সকালে সূর্যের আলো জানালা দিয়ে ঢুকতেই সবার আগে ঘুম ভাঙলো জান্নাতের। ঘুম ভাঙার পরও কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ বসে রইলো। হয়তো ভুলে গিয়েছিল কোথায় আছে। সব টা মনে পড়তেই মুখটা মলিন হয়ে গেল। তবুও কান্না করলো না। চুপচাপ উঠে দাঁড়ালো।
কিছুক্ষণ পর দুর্গের এক নারী সৈনিক গরম পানি নিয়ে এলো। জান্নাত নিজেই দুই বোনকে ডেকে তুললো। শাখা চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসল। সাহারা ঘুম ভাঙতেই চারদিকে তাকালো।
তারপর প্রথম প্রশ্ন
“আম্মি…আপি,আম্মি কই?”
জান্নাতের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠছে বোনের ব্যাথিত গলায়। তবুও মুখে হাসি আনার চেষ্টা করলো।
“আম্মু পরে আসবে।”
সাহারা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। ঠোঁট কাঁপতে লাগলো ছোট্ট মেয়েটার। জান্নাত দ্রুত তার মুখ ধুয়ে দিল। হাত ধুয়ে দিল। চুলগুলোও একটু গুছিয়ে দিল। শাখাও চুপচাপ বসে সব করিয়ে নিল। খাবার নিয়ে এলো দাসীরা। গরম রুটি,দুধ, কিছু ফল।
সাহারা খেতে চাইছিল না। উঠানে প্রজাপতি, পাখি কত কি দেখিয়ে জান্নাত খাওয়ালো তাকে। খেতে খেতেই চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগলো। ফুপিয়ে উঠলো সে। জান্নাত কিছু বললো না। নিজের চোখও ভিজে উঠেছে। কিন্তু সে কাঁদছে না। বড় বোব কাঁদলে সাহারা আরও ভয় পাবে।
কিন্তু এই দৃশ্যটা সহ্য করা বড়ই কঠিন। একটা সাত বছরের মেয়ে নিজের শৈশব ভুলে গিয়ে মায়ের মতো আচরণ করছে। আর দুইটা ছোট্ট বোন তার ওপর নির্ভর করে আছে।
জান্নাত সাহারার মুখ মুছিয়ে দিলো। শাখার হাতে পানির পাত্র ধরিয়ে দিলো। দুই বোন কে খাইয়ে কক্ষে চুপটি করে বসে রইল গুটিশুটি মেরে। দুজন ভয়ে বোনের বুকে চুপটি করে আছে। অসহায়ের মত টলমল করছে সাহারার সবুজাভ ডাগর ডাগর চোখ জোড়া। জান্নাত বোন দের বুকে নিয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদছে।
“আম্মা, মনি মা, বাবা কই তোমরা। আমাদের নিয়ে যাওওওওও”
প্রত্যেক টা পর্ব আমি ডক’স এ লিখে রাখি। যেখানে পান্ডুলিপি লেখা হয় আরকি। কালকে কি হইছিলো আমি ঢুকতেই পারছিলাম না ডকসে। অনেকটা লেখার পর এমন হইছিল। অবশেষে আজ দুপুরে তা ঠিক হলো। তারপী লিখলাম। কেমন হইছে জানাইয়েন সবাই। বাচ্চাদের লিখতে গিয়ে আমারই চোখে পানি আসছিলো
ইদানীং আমার পাঠক সীমিত। ফেসবুক কন্টেন্ট অন্যান্য ইউজার দের ফিডে পৌঁছাচ্ছে না। গল্প দোওয়ার পরেও অনেকে বলে আপু গল্প পাচ্ছি না কেন। তাই ননফলোয়ার দের বলি, গল্প হারিয়ে না ফেলতে ফলো দিয়ে রাখুন। ভালোবাসা সবাইকে
Share On:
TAGS: জান্নাতুল ফেরদৌস, নূর এ সাহাবাদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৭
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২১ এর শেষাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল অন্তিম পর্ব
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৩২ এর প্রথমাংশ
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৪০
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৭
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫১
-
নূর এ সাহাবাদ ২২ এর প্রথমাংশ
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২
-
নূর এ সাহাবাদ ২৭ এর প্রথমাংশ