Golpo romantic golpo নূর এ সাহাবাদ

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২৬ এর শেষাংশ


নূরসাহাবাদ

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

২৬ এর শেষাংশ

সকাল থেকে পুরো মহলে বাইজিদের মেজাজ ভয়ংকর রকম খারাপ। বড় বেগমের কক্ষ থেকে বেরিয়েই সে একের পর এক দাসদের উপর চড়াও হয়েছে। কেউ পানির পেয়ালা দেরিতে দিয়েছে, কেউ ভুল নথি এনেছে তাতেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে। সচরাচর শাহজাদার এমন রুপ দেখে না মহল বাসী।
মেহেরুন্নেসা দূর থেকে দেখছিল। গত রাতের পর আজকের বাইজিদকে যেন আরো অচেনা লাগছে। চোখদুটো লাল, মুখে অদ্ভুত টান। মনে হচ্ছিল সে ভিতরে ভিতরে কোনো কিছু নিয়ে প্রচণ্ড অস্থির। শেষ পর্যন্ত আর থাকতে না পেরে বাইজিদ নিজেই ঘোড়া নিয়ে বেরিয়ে গেল নদীর ঘাটের দিকে। এখানে থাকলে আজ নিশ্চিত কোনো অঘটন ঘটাবে।
মহলের অদূরে বিস্তীর্ণ নদীপাড়ে আজ একটা বড় বাণিজ্যিক জাহাজ ভিড়েছে। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছে উঁচু মাস্তুল, সাদা পাল, আর জাহাজের গায়ে ইংরেজদের চিহ্ন আঁকা। নদীর ধারে অনেক লোক জড়ো হয়েছে। মাহাদি, কাশেম, আর কয়েকজন বিশ্বস্ত প্রহরী আগেই সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল। বাইজিদ ঘোড়া থেকে নামতেই মাহাদি এগিয়ে এলো।
“সালাম শাহজাদা। আপনি এলেন ভালো হলো। বড় বিপদ হয়ে গেছে।”
“এবার আবার কী?”
দাঁত চেপে বললো বাইজিদ। মাহাদি নিচু গলায় বললো,
“গতকাল যাদের সাথে সংঘর্ষ হয়েছিল… তারা আসল ইংরেজ বণিক ছিল না।”
বাইজিদ থেমে গেল।
“ কী বলতে চাইছো?”
“তারা ছদ্মবেশী ছিল। তাদের পোশাক, পতাকা, সব নকল। আসল ইংরেজ বণিকেরা আজ সকালে এসেছে।”
বাইজিদের চোখ সরু হয়ে এলো। সে ধীরে ধীরে নদীর ধারে ভিড়ে থাকা জাহাজটার দিকে তাকালো। ঠিক তখনই জাহাজ থেকে কয়েকজন নামলো। লম্বা, ফর্সা, অদ্ভুত পোশাক পরা লোক। তাদের সাথে দোভাষীও আছে। লোকগুলোর চেহারায় ভয় আর বিরক্তি স্পষ্ট। দোভাষী সামনে এসে কুর্নিশ করলো।
“ এঁরা বলছেন, গতকাল তাঁদের নামে কেউ আগে এসে আপনাদের সাথে দেখা করেছে শুনে তাঁরা বিস্মিত। তাঁরা আজই প্রথম এই অঞ্চলে পৌঁছেছেন।”
বাইজিদের মুখ মুহূর্তে পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল।
“গতকাল যারা এসেছিল, তারা কোথা থেকে এসেছিল?”
দোভাষী মাথা নেড়ে বললো,
“এঁরা কাউকে চেনেন না। তাঁদের লোকও নয়।”
মাহাদি ফিসফিস করে বললো,
“তাহলে কাল যারা ছিল, তারা ইচ্ছে করেই এসেছে। আমাদের ভুল পথে চালানোর জন্য।”
কয়েক মুহূর্ত কেউ কথা বললো না। তারপর বাইজিদ ধীরে ধীরে বললো,
“আর তারা জানত আমরা ইংরেজদের অপেক্ষায় আছি।”
মাহাদির মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
“তাহলে মহলের ভেতর থেকেই কেউ খবর দিয়েছে।”
মাহাদির কপালে চিন্তার ভাজ। মহলে ইংরেজ বণিকদের প্রতি শাহজাদি সুনেহেরার খুবই আগ্রহ ছিল। অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে সংঘর্ষের সময় সেও উপস্থিত হয়েছিল। তবে কি সে আগে থেকেই জানতো তাদের গতিবিধি সম্পর্কে?
নদীর ওপরে হালকা বাতাস বয়ে গেল। জাহাজের পাল দুলে উঠলো।
বাইজিদ খুব ধীরে বললো,
“মহলের ভেতরে কেউ খেলাটা শুরু করেছে। এবার আমি দেখবো, সে কে।”

বণিক দের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বাইজিদ ৩০ জন সেন্য-সিপাহি পাঠানোর কথা দিল বণিক সর্দার কে। কারণ গতকালের ঘটনা শোনার পর তারা প্রত্যেকেই আতঙ্কে আছেন। মাহাদি কে সব ব্যাবস্থার দ্বায়িত্ব দিয়ে বাইজিদ ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেলো বড় পাহাড় টার দিকে। তার কিছুক্ষণ একা থাকা প্রয়োজন।


জমিদারদের পুরোনো বাগানবাড়িটা যেন অন্য এক জগত। মহল থেকে খানিকটা দূরে, বিশাল অশ্বত্থ আর শিরীষ গাছের আড়ালে লুকিয়ে আছে জায়গাটা। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় বহু বছরের পরিত্যক্ত কোনো প্রাসাদ। অথচ কাছে গেলে বোঝা যায়, এখনো কত যত্নে আগলে রাখা হয়েছে।
লাল ইটের তৈরি দোতলা বাড়ি। দেয়ালজুড়ে শ্যাওলা, কোথাও কোথাও বুনো লতা উঠে গেছে বারান্দা পর্যন্ত। চারপাশে ফুলের বাগান। পুরোনো গোলাপ, শিউলি, বকুল, রজনীগন্ধা। সকালের বাতাসে ফুলের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। বাগানের মাঝখান দিয়ে সরু সাদা পাথরের পথ সোজা গিয়ে মিলেছে বাড়ির সিঁড়িতে। একটু দূরে একটা শুকনো ফোয়ারা। তার গায়ে ভাঙা পরীর মূর্তি। আর পেছন দিকে বিশাল আমগাছের বাগান।
সুনেহেরা বারান্দার রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। রোদের আলোয় তার সোনালি চুলগুলো আরো উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। সে অনেকক্ষণ ধরে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে ছিল। তারপর ধীরে ধীরে ঘুরে মাহাদির দিকে তাকালো।
“শুনছেন?”
মাহাদি সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করলো।
“জি শাহজাদি।”
“আমাকে বাগানবাড়িটা ঘুরিয়ে আনবেন?”
মাহাদি চোখ তুলে একবার তার দিকে তাকালো। সুনেহেরার মুখে হালকা হাসি। কিন্তু তার চোখে অন্য কিছু। অদ্ভুত এক কৌতূহল। যেন সে শুধু বাড়িটা দেখতে চায় না, আরো কিছু খুঁজছে।
মাহাদি চুপ করে গেল। সে খুব ভালো কটেই জানে শাহজাদি সুনেহেরা সাধারণ মেয়ে নয়। সে যা বলে, তার পেছনে অন্য মানে থাকে। মহলের সবাই যেখানে কিছু না কিছু লুকিয়ে রাখে, সেখানে সুনেহেরা সবচেয়ে বেশি দেখে, সবচেয়ে কম বলে।
হঠাৎ বাগানবাড়ি ঘুরতে চাওয়া,এটাও নিশ্চয়ই এমনি এমনি নয়।মাহাদি নিচু গলায় বললো,
“বাগানবাড়িতে এখন তেমন কিছু নেই, শাহজাদি। অনেক বছর ধরেই ওদিকটা প্রায় ফাঁকা পড়ে আছে।”
সুনেহেরা মুচকি হাসলো।
“ফাঁকা জায়গায়ই তো সবচেয়ে বেশি রহস্য লুকিয়ে থাকে”
কথাটা শুনে মাহাদির ভেতরটা ধক করে উঠলো।
সে আবার বাড়িটার দিকে তাকালো। সূর্যের উজ্জ্বল আলোয় যতই সুন্দর লাগুক, জায়গাটার মধ্যে কেমন একটা অস্বস্তি আছে। যেন অনেক পুরোনো কোনো গল্প দেয়ালের ভেতর আটকে আছে। দূরে হঠাৎ একটা জানালা শব্দ করে খুলে আবার বন্ধ হয়ে গেল। মাহাদি চমকে তাকালো। দোতলার দক্ষিণ দিকের ঘরটা। কিন্তু ও ঘর তো বহু বছর ধরে বন্ধ। সুনেহেরা ধীরে ধীরে সেই দিকেই তাকালো। তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠলো।
“চলুন, মাহাদি। দেখি, বাগানবাড়ি আসলেই ফাঁকা কিনা।”

ঘোড়াটা ধুলো উড়িয়ে ছুটে চলেছে সরু পথ ধরে। সামনে মাহাদি, তার পেছনে বসে আছে সুনেহেরা। দুপুরের রোদ তখন গাছের ডাল ভেদ করে পথের উপর ছায়া ফেলছে। বাগানবাড়ির দিকে যাওয়ার এই পথটা খুব কম লোকই ব্যবহার করে। চারদিকে এত গাছপালা যে দূর থেকে কিছুই বোঝা যায় না। সুনেহেরা সারা পথ চুপ ছিল। একবারও কিছু বলেনি। শুধু তার চোখদুটো অদ্ভুত শান্ত। যেন সে আগেই জানে সেখানে কী আছে।

বাগানবাড়ির সামনে পৌঁছে মাহাদি ঘোড়া থামালো। বাড়িটা কাছে থেকে আরো ভয়ংকর লাগছে। দোতলার ভাঙা বারান্দা, দেয়ালের গায়ে শ্যাওলা, আর চারদিকে এমন নিস্তব্ধতা যেন বহু বছর কেউ এখানে আসেনি। একসময় এখানে আসর বসতো। অরণ্য শাহ এর ঘাঁটি ছিল এই জায়গাটা। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তা পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে। দরজাটা আধখোলা। মাহাদির কপাল কুঁচকে গেল।
“এখানে কেউ আছে?”
সুনেহেরা ধীরে ধীরে নেমে পড়লো।
“আমি জানি?”
সে সোজা ভেতরে হাঁটতে শুরু করলো। মাহাদি তাড়াতাড়ি তার পেছনে গেল। ভেতরে ঢুকতেই ঠান্ডা স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ এসে লাগলো। বিশাল হলঘর। ছাদ থেকে ঝুলে থাকা পুরোনো ঝাড়বাতি। দেয়ালে ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া ছবির ফ্রেম। আর ঘরের এক কোণে…মাহাদি থমকে দাঁড়ালো।
চার-পাঁচজন ইংরেজ বণিক হাত-পা বাঁধা অবস্থায় মেঝেতে বসে আছে। তাদের মুখ ক্লান্ত, কাপড় এলোমেলো। একজনের কপালে রক্ত শুকিয়ে কালচে হয়ে আছে। আরেকজন আতঙ্কে চারদিকে তাকাচ্ছে।
মাহাদির মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
“এরা… এরা তো নদীর ঘাটে আসা লোকগুলো!”
একজন ইংরেজ মাহাদিকে দেখেই কিছু একটা বলতে শুরু করলো। তার গলায় আতঙ্ক। কিন্তু ভাষা বোঝা গেল না।
সুনেহেরা শান্তভাবে এগিয়ে গিয়ে ধুলোমাখা একটা কাঠের চেয়ারে বসল। যেন এই দৃশ্য তার কাছে একদম স্বাভাবিক।
তারপর খুব ধীরে মাহাদির দিকে তাকালো।
“তুমি বাইরে দাঁড়াও”
মাহাদি অবিশ্বাসের চোখে তাকালো।
“শাহজাদি…”
“বাইরে পাহারা দাও”
সুনেহেরার গলা এমন কঠিন যে আর কোনো কথা বলার সাহস হলো না মাহাদির। সে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। তবু তার বুকের ভেতর কেমন অস্থির লাগছে। সে বুঝতে পারছে না শাহজাদির ভাবান্তর।
ভেতরে সুনেহেরা ধীরে ধীরে একজন ইংরেজ বণিকের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। লোকটা ভয়ে কেঁপে উঠলো। সুনেহেরা নিচু হয়ে তার চোখের দিকে তাকালো। ঠোঁটে মৃদু হাসি।
“এবার বলো…তোমরা কি আমার কাজটা করবে? নাকি সারা জীবনের মতো চলে যাবে দুনিয়া ছেড়ে? সময় অল্প সিদ্ধান্ত খুব তাড়াতাড়ি নিতে হবে”
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এলো। বাইরে দাঁড়িয়ে মাহাদির মনে হলো, এই পুরোনো বাগানবাড়ির দেয়ালের মধ্যে আজ নতুন কোনো রহস্য জন্ম নিচ্ছে। অশথ্ব গাছটার নিচে বসে থাকতে থাকতে মহাদির চিন্তায় চোয়াল ঝুলে পড়ছে। হঠাৎ ঘরের ভেতর থেকে কারো চাপা চিৎকারের শব্দ ভেসে এলো। মাহাদির টনক নাড়লো, চট করে উঠে বসলো। দুহাত ভর্তি রক্ত নিয়ে ভিতর থেকে বেরিয়ে এলো সুনেহেরা। মুখে গলায় এবং শরীরের বিভিন্ন জায়গায় রক্তের ছিটা লেগে আছে তার। মাহাদির চোখ কপালে ওঠার উপক্রম। যদিও সে সৈনিক, রক্তারক্তি দেখার বহু অভ্যাস তার আছে। কিন্তু সুনেহেরাকে এ অবস্থায় সে মোটেও কামনা করেনি। সুনেহেরার চোখ মুখ কেমন হিংস্র লাগছিল, মনে হচ্ছিল কোনো নরখাদক ওর ওপর ভর করেছে। মাহাদি দ্বিতীয় কথা বাড়ালো না। হাটতে লাগলো পিছু পিছু। খানিক দুর যেতে সুনহেরার জুতার ফিতা খুলে হোঁচট খেলো। মাহাদির দিকে তাকাতেই মাহাদি ছুটে গিয়ে বসে পড়লো পায়ের কাছে। তলোয়ার নামিয়ে হাতের মোটা মোজা খুলে সুনেহেরার জুতার ফিতা বেঁধে দিল যত্ন সহকারে। সুনেহেরা বড় বড় পা ফেলে গিয়ে সামনে থাকা বিশাল পুসকুনিটাতে ঝাঁপ দিল। বাগান বাড়ির পাশে করা এই বিশাল ঘাট বাধাপুকুর টা জাবের শাহ করিয়ে ছিলেন। বেশ লম্বা সময় নিয়ে সুনেহেরা সাঁতার কাটলো। তারপর ফের উঠে এলো স্বাভাবিক ভাবমূর্তি নিয়ে।

সাহাবাদে রাত নেমেছে ধীরে ধীরে। বিশাল মহলটা অন্ধকারে ডুবে গেছে, শুধু করিডোরের দেয়ালে ঝোলানো মশালগুলো দপদপ করে জ্বলছে। দূরে প্রহরীদের পায়ের শব্দ, মাঝে মাঝে নিশুতি রাত ভেঙে শোনা যাচ্ছে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।
মহলের পশ্চিম দিকের বড় দপ্তরখানায় এখনো আলো জ্বলছে। বাইজিদ সেখানে বসে আছে কয়েকজন কর্মচারী আর হিসাবরক্ষককে নিয়ে। সামনে বিশাল কাঠের টেবিল, তার উপর ছড়ানো নথি, খাজনার খাতা, সিলমোহর।
বাইজিদের মুখ আজ ভয়ংকর গম্ভীর। একের পর এক হিসাব দেখছে। কোথাও সামান্য ভুল পেলেই কণ্ঠ কঠোর হয়ে যাচ্ছে।
“এই খাতায় তিনশো মুদ্রার হিসাব কম কেন?”
একজন কর্মচারী কাঁপা গলায় কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।
“আমি… আমি দেখে বলছি শাহজাদা…”
বাইজিদ ঠান্ডা চোখে তাকালো।
“এখনই দেখে বলো।”
ঘরের মধ্যে এমন নীরবতা নেমে এলো যে কারো নিঃশ্বাসের শব্দও শোনা যাচ্ছে। সেই সময়, মহলের অন্য প্রান্তে, অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে মেহেরুন্নেসা। আজ সন্ধ্যা থেকেই সে লক্ষ্য করছিল রত্নপ্রভাকে। সারাদিন ধরে রত্নপ্রভা ভাবে থাকলেও রাতের বেলায় এই নারীর ভাব গতির দিক বদল হয়। সন্ধ্যা থেকে কারো সাথে তেমন কথা বলেনি। বারবার নিজের কক্ষের বাইরে তাকিয়েছে। যেন কারো অপেক্ষায় আছে।

তাই রাত গভীর হতেই মেহেরুন্নেসা নিঃশব্দে নিজের কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসে। করিডোরের বাঁকে, বড় স্তম্ভের আড়ালে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
রত্নপ্রভার কক্ষের দরজা তখনো বন্ধ। মেহেরুন্নেসার বুক ধুকপুক করছে। আজকাল তার মনে হচ্ছে এই মহলে সবাই কিছু না কিছু লুকিয়ে রাখে। আর রত্নপ্রভাও তার ব্যতিক্রম নয়।
অনেকক্ষণ পর খুব আস্তে দরজাটা খুললো।
মেহেরুন্নেসা নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে রইলো।
দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলো একজন… কিন্তু প্রথম মুহূর্তে তাকে রত্নপ্রভা বলে মনে হলো না।
কালো পোশাকে পুরো শরীর ঢাকা। কোমরে চামড়ার বেল্ট। মাথার ওড়নাটা শক্ত করে বাঁধা। আর হাতে চকচকে তলোয়ার।

মেহেরুন্নেসার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
রত্নপ্রভা চারপাশে একবার তাকালো। তারপর খুব দ্রুত পায়ে করিডোর পেরিয়ে এগিয়ে যেতে লাগলো। তার হাঁটার ভঙ্গি আর আগের মতো নয়। একদম যোদ্ধাদের মতো। দৃঢ়। দ্রুত। নিঃশব্দ।
মেহেরুন্নেসার বুক কেঁপে উঠলো।
রত্নপ্রভা তলোয়ার নিয়ে কোথায় যাচ্ছে?
এক মুহূর্ত দেরি না করে মেহেরুন্নেসাও চুপচাপ তার পিছু নিল। অন্ধকারে দেয়ালের গা ঘেঁষে এগোতে লাগলো সে। সামনে রত্নপ্রভা দ্রুত এগিয়ে চলেছে মহলের পেছনের পুরোনো অংশের দিকে।
সেই দিকেই যেখানে নদীর ঘাট। আর যেখানে ডালপালার আড়ালে লুকিয়ে আছে সেই রহস্যময় সুরঙ্গ। রত্নপ্রভা সোজা ঘাটের সেই ডালপালায় ঢাকা জায়গাটার দিকে এগিয়ে গেল। চারপাশ এত অন্ধকার যে মেহেরুন্নেসা কয়েকবার প্রায় তাকে চোখের আড়াল করে ফেলছিল। তারপর রত্নপ্রভা ডালপালা সরিয়ে নিচের দিকে নেমে গেল।
মেহেরুন্নেসার বুক ধকধক করতে লাগলো।
এটাই সেই সুরঙ্গ। সে এক মুহূর্ত দ্বিধা করলো। তারপর ধীরে ধীরে সেও নিচে নেমে গেল।
সুরঙ্গের ভেতরটা ঠান্ডা আর স্যাঁতস্যাঁতে। মাথার উপর মাটির ছাদ, দুপাশে ভেজা দেয়াল। কোথাও কোথাও শিকড় বেরিয়ে আছে। সামনে রত্নপ্রভার হাতে ধরা মশালের ক্ষীণ আলো দুলছে। সেই আলো অনুসরণ করেই এগোতে লাগলো মেহেরুন্নেসা।
পায়ের নিচে ভেজা মাটি। কোথাও কোথাও জমে থাকা পানিতে পা পড়ছে। সুরঙ্গটা এত সরু যে দুপাশের দেয়ালে হাত লেগে যাচ্ছে। মেহেরুন্নেসার মনে হচ্ছিল, যেন সে কোনো অজানা অন্ধকারের ভেতর ঢুকে পড়েছে। অনেকটা পথ যাওয়ার পর সামনে হালকা বাতাসের ছোঁয়া পেল সে। তারপরই সুরঙ্গ শেষ হলো।
মেহেরুন্নেসা সাবধানে মাথা বের করে তাকালো।
সামনে গভীর জঙ্গল। চারপাশে বিশাল বিশাল গাছ। রাতের অন্ধকারে গাছগুলোর ছায়া আরো ভয়ংকর লাগছে। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে। রত্নপ্রভা তখন জঙ্গলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। তার হাতে ধরা মশালের আলোয় আশেপাশে হালকা আলো পড়ছে। আর সেই আলোতেই মেহেরুন্নেসা দেখলো, সামনে আরেকজন দাঁড়িয়ে আছে। একজন পুরুষ।
কালো চাদরে ঢাকা। মুখ দেখা যাচ্ছে না। সে গাছের পাশে দাঁড়িয়ে আছে, যেন অনেকক্ষণ ধরেই অপেক্ষা করছে।

রত্নপ্রভা ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে গেল।
মেহেরুন্নেসার কপাল কুঁচকে এলো। কে এই লোক? রত্নপ্রভা মশালটা একটু উঁচু করে ধরতেই আলোটা পুরুষটার মুখে এসে পড়লো।
আর পরের মুহূর্তেই মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল। তার হাত থেকে প্রায় দেয়ালের ভেজা মাটি খসে পড়লো। লোকটা আর কেউ নয়। মাহবুব। তার ভাই। মেহেরুন্নেসা অবিশ্বাসে স্থির হয়ে গেল। চোখ বড় বড় হয়ে উঠেছে। সে যেন নিজের দেখা জিনিসটাকে বিশ্বাসই করতে পারছে না। ভাইজান এখানে?
জঙ্গলের ভেতরটা অন্ধকারে ডুবে আছে। মাথার উপর ঘন গাছের ডালপালা এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে চাঁদের আলোও ঠিকমতো ভেতরে ঢুকতে পারছে না। শুধু রত্নপ্রভার হাতে ধরা মশালটার আগুন দুলছে। সেই কমলা আলোয় কখনো মাহবুবের মুখ দেখা যাচ্ছে, কখনো রত্নপ্রভার হাতে ধরা তলোয়ারটা ঝলসে উঠছে।
মেহেরুন্নেসা একটা মোটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে। এতটাই কাছে যে চাইলে সে ভাইয়ের মুখের প্রতিটা রেখা দেখতে পারে।
মাহবুব নিচু গলায় বললো,
“আপনার এত দেরি কেন হলো?
রত্নপ্রভাও অস্থির চোখে চারপাশে তাকালো।
“কেন কিছু হয়েছে?”
উত্তর আসার আগেই বাম পাশের ঝোপে শব্দ হলো। খসখস। তারপর আরো একবার।
মাহবুবের মুখে কোনো বিস্ময় নেই। যেন সে এই শব্দের অপেক্ষাতেই ছিল। রত্নপ্রভা তলোয়ারটা নামিয়ে ফেললো সামান্য। তার ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠলো। ঝোপের ডালপালা সরিয়ে ধীরে ধীরে সামনে এলো এক কম বয়সী নারী। মেহেরুন্নেসার চোখ বড় হয়ে গেল। মেয়েটার গায়ে সাদা আর কালো ডোরাকাটা পোশাক। কারাগারের কয়েদিদের পোশাক। পোশাকের একপাশ ছিঁড়ে গেছে, হাতে শুকনো রক্তের দাগ। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কাঁধে ছড়িয়ে আছে। অথচ তার হাঁটার ভঙ্গিতে ভয় নেই, তাড়াহুড়ো নেই। যেন সে কোনো কারাগার ভেঙে নয়, নিজের ঘর থেকেই বেরিয়ে এসেছে।
মাহবুব এগিয়ে গেল।
“অবশেষে আসলেন মহারানী।”
মেয়েটা ঠান্ডা গলায় বললো,
“বের হতে সময় লেগেছে। আজ পাহারা বেশি ছিল।”
রত্নপ্রভা মশালটা একটু উঁচু করে ধরলো। আলোটা এবার মেয়েটার মুখে পড়লো। চোখ সরু করে রত্নপ্রভা বলল
“কাল আসলে না কেন মিরান?”

কথাটা কর্ণ কুহরে পৌঁছাতেই বুকের ভেতরটা ধপ করে উঠলো মেহেরুন্নেসার। এই তাহলে মিরান?
সাহাবাদের সবচেয়ে ভয়ংকর নারী বন্দি?
যে একাই ৫৭ জন মানুষকে হত্যা করেছিল? যাকে কারাগারের সবচেয়ে অন্ধকার কক্ষে রাখা হয়? মিরানের চোখদুটো অদ্ভুত। ভয়ংকর রকম শান্ত। যেন সে অনেক কিছু দেখে ফেলেছে। অনেক কিছু হারিয়েছে। তাই এখন আর কিছুতেই ভয় পায় না।
মাহবুব বললো,
“কেউ দেখেনি তো?”
“না। যে দুজন দেখেছিল, তারা এখন আর কিছু বলতে পারবে না।”
মিরান এমনভাবে কথাটা বললো, যেন খুব সাধারণ কিছু বলছে। মেহেরুন্নেসার শরীর কেঁপে উঠলো। ঠিক তখনই জঙ্গলের অন্য প্রান্ত থেকে একটা গমগমে গলা ভেসে এলো
“মিরান?”
শব্দটা শুনে তিনজনেই একসাথে ঘুরে তাকালো।
মিরানের মুখ মুহূর্তেই শক্ত হয়ে গেল। রত্নপ্রভার হাতে ধরা তলোয়ার আবার উঠে এলো। মাহবুব এক পা সামনে এগিয়ে দাঁড়ালো।
আর মেহেরুন্নেসার সেই গলাটা শুনে তার পুরো শরীর হিম হয়ে গেল। ওমন গমগমে গলা কার? ঝোপের ডালপালা ধীরে ধীরে সরতে লাগলো। মশালের আলো অন্ধকার ভেদ করে সামনে পড়লো।
আর পরের মুহূর্তে, সেই মানুষটাকে দেখেই মেহেরুন্নেসার নিঃশ্বাস বুকের মাঝখানে আটকে গেল। বুকের ভেতর ধড়ফড় করতে লাগলো। জাহাজের বগি তে দেখা সেই লোকটা। কিন্তু তার কম্ঠস্বর শুনে বুঝলো সে বাইজিদ না। দেহ গঠন বাইজিদ এর মত হলেও, চেহারা কালো সাদা কোট কাটা কাপড়ে বাধা। ঝোপের আড়াল থেকে আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে দেখার সাহস হলো না মেহেরুন্নেসার । কারা এসেছে, কেন এসেছে সেটা জানার আগ্রহের চেয়েও নিজের প্রাণটা বাঁচানো এখন অনেক বেশি জরুরি।

সে ধীরে ধীরে এক পা পিছিয়ে গেল। তারপর আরেক পা। শুকনো পাতার উপর পা পড়তেই খুব ক্ষীণ একটা শব্দ হলো। খস। মেহেরুন্নেসা নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলো। সামনে মশালের আলোটা একটু দুললো। মনে হলো কেউ যেন এদিকেই তাকিয়েছে। কিন্তু পরমুহূর্তেই আবার ওদের গলার শব্দ ভেসে এলো। তারা অন্য কিছু নিয়েই ব্যস্ত। মেহেরুন্নেসা আর এক মুহূর্তও দেরি করলো না। ঘুরে দৌড় দিল।
অন্ধকারে ডালপালা তার গায়ে আঁচড় কাটছে, কাঁটা তার কাপড়ে আটকে যাচ্ছে, তবুও সে থামলো না। তার শুধু একটাই লক্ষ্য, কোনোভাবে এই জঙ্গল থেকে বের হতে হবে।

কিন্তু কয়েক কদম যাওয়ার পরই সে থমকে দাঁড়ালো। চারপাশে শুধু গাছ। একইরকম গাছ। একইরকম অন্ধকার। কোন দিক দিয়ে সে এসেছিল? কোথায় সেই সরু পথটা? সে তো রত্নপ্রভার পিছু পিছু এসেছিল। তখন প্রভার হাতে মশাল ছিল, সামনে আলো ছিল। আর এখন
এখন চারদিকে শুধু কালো অন্ধকার। মেহেরুন্নেসা দ্রুত ডানে তাকালো, বাঁয়ে তাকালো। কোনো পথ চিনতে পারলো না। তার গলা শুকিয়ে এলো। না, এই দিক দিয়ে আসেনি সে। হয়তো ওই দিক দিয়ে। সে বাঁ পাশের ঝোপ সরিয়ে এগিয়ে গেল। কয়েক পা যাওয়ার পর আচমকা পায়ের নিচে মাটি সরে গেল।
“আহ!”
সে সামনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল নিচু একটা ঢালের উপর। হাতের তালু ঘষে গেল পাথরে। তীব্র ব্যথায় মুখ চেপে ধরলো সে।
কিছুক্ষণ নিঃশ্বাস নিতে নিতে মাটিতে পড়ে রইলো। তারপর মাথা তুলে চারপাশে তাকাতেই বুকের ভেতরটা জমে গেল।
সে যেখানে এসেছে, এটা জঙ্গলের আরেকটা অংশ। এখানে গাছগুলো আরো ঘন। উপরে আকাশও দেখা যাচ্ছে না। বাতাসে একটা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। কোথাও কাছেই যেন পানি জমে আছে।
দূরে কোথাও পেঁচার ডাক ভেসে এলো।
হুঁউউ… মেহেরুন্নেসার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে আবার উঠে দাঁড়ালো। এবার ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলো। চেষ্টা করলো মনে করার— রত্নপ্রভা যখন সামনে হাঁটছিল, তখন ডান দিকে একটা ভাঙা গাছ ছিল? নাকি বাঁ দিকে?
হঠাৎ খচমচ শব্দ হলো একদম তার পেছনে। মেহেরুন্নেসা জমে গেল। ধীরে ধীরে ঘুরে তাকালো। কেউ নেই। শুধু একটা ঝোপ দুলছে। হয়তো কোনো জন্তু। হয়তো বাতাস। নিজেকে সান্ত্বনা দিতে গেলেও তার বুকের কাঁপুনি কমলো না। সে আবার হাঁটতে শুরু করলো। খচমচ। এবারও শব্দটা এলো। আরো কাছে। এবার আর ভুল হওয়ার উপায় নেই। কেউ তার পেছনে আসছে।মেহেরুন্নেসার গলা দিয়ে শব্দ বের হলো না। সে দ্রুত হাঁটতে লাগলো। পেছনের শব্দটাও দ্রুত হলো। সে প্রায় দৌড়াতে শুরু করলো।
হঠাৎ সামনে একটা মোটা শেকড়ে পা আটকে গিয়ে সে আবার পড়ে গেল মাটিতে। কপালটা গিয়ে ঠুকলো শক্ত কিছুর সঙ্গে।
এক মুহূর্তের জন্য সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেল।
তারপর। একটা ছায়া এসে দাঁড়ালো তার সামনে।
লম্বা।অন্ধকারে মুখ দেখা যাচ্ছে না।
শুধু বোঝা যাচ্ছে, লোকটা তার দিকে তাকিয়ে আছে। মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতরটা যেন থেমে গেল। লোকটা ধীরে ধীরে এক পা এগিয়ে এলো।
আর ঠিক তখনই, অন্ধকারের ভেতর থেকে খুব নিচু, ঠান্ডা একটা গলা ভেসে এলো
“এত সুন্দর নারী আমি জিবনেও দেখিনিইইই”

বেশি বেশি রিয়্যাক্ট দিবা সবাই। আর কেমন হলো বলো। গেস করো তো কাহিনি কি হতে পারে 💙🪶

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply