Golpo romantic golpo কিস অফ বিট্রেয়াল

কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৩৬


#কিস_অফ_বিট্রেয়াল

#পর্ব_৩৬

#লামিয়া_রহমান_মেঘলা

[ 🚫কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ ]

সিকদার নিবাসের প্রশস্ত ছাদের এক কোণায় নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল কায়ান। তার আঙুলের ফাঁকে ধরা জ্বলন্ত সিগারেটের আগুন অন্ধকারে ক্ষীণ লাল আভা ছড়িয়ে দিচ্ছিল। রাতের পাহাড়ি হাওয়া কেমন শীতল কোমল ছোঁয়ায় চারপাশ ভরিয়ে রেখেছে। দূরের পাহাড়ের উপর শহরটা মিট মিট আলোতে আলোকিত, যেন প্রকৃতির আঁকা কোনো নিঃশব্দ চিত্র। তবে আহামরি কোন কোলাহল নেই, সময় সময় দু একটা গাড়ির শব্দ। আশেপাশে বেশ নীরবতা আর শান্তি বিরাজমান। খোলা আকাশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা গোটা কয়েক তারা মিটমিট করে জ্বলছে। পাহাড়ি অঞ্চলের আকাশ সবসময়ই এমন নির্মল থাকে। শহরের কোলাহল, আলোক দূষণ আর ধোঁয়াটে বাতাসের স্পর্শ এখানে পৌঁছাতে পারে না। চারদিকে এক ধরনের গভীর প্রশান্তি বিরাজ করছে, অথচ সেই প্রশান্তির মাঝেও কায়ানের মন যেন ভারী হয়ে আছে অজস্র অপ্রকাশিত অনুভূতিতে।

নিজের ভাবনায় ডুবে থাকা কায়ান হঠাৎ কাঁধে কারো স্পর্শ অনুভব করে পেছনে ফিরে তাকালো। পাশে এসে দাঁড়িয়েছে জেবরান। ঠান্ডা বাতাসে তার চুলগুলো হালকা উড়ছে।

“কি দেখছেন ভাইয়া?”

কায়ান ধীরে ধীরে হাতের সিগারেটটা মাটিতে ফেলে পায়ের নিচে পিষে দিল। তারপর দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,

“নাথিং, জাস্ট এবাউট হার।

আমি ওর জীবনে না আসলে এমন কঠিন পরিস্থিতিতে ওকে পড়তে হত না। কেন জানি না, নিজেকে সেরিনের অপরাধী লাগছে জেবরান। আমার জীবনের সবকিছুই এলোমেলো ছিল। একটু সাজাতে গিয়ে ওকে এত বড় দুর্ঘটনার মুখোমুখি করলাম।”

জেবরান কায়ানের চোখের গভীরে জমে থাকা অপরাধবোধ স্পষ্ট বুঝতে পারলো। সে ধীরে কায়ানের কাঁধে হাত রেখে তাকে জড়িয়ে ধরল।

“ভাইয়া, কখনো এটা ভাববে না। সেরিনকে তুমি তখন ভালোবেসেছিলে, যখন তোমার একটু ভালোবাসার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল। সবকিছু ঘটার পেছনে হয়তো ভালো কিছু লুকিয়ে থাকে। নিজেকে দোষী ভেবো না ভাইয়া। তুমি অনেক কিছু করেছ আমার জন্য, আম্মা বেগমের জন্য। আমি শুধু চাই তোমার জীবনে সুখ আসুক ভাইয়া।”

জেবরানের কথায় কায়ানের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। ঠিক তখনই ছাদের নীরবতা ভেঙে সেখানে উপস্থিত হলো হিমেল। তার মুখে প্রশস্ত হাসি।

“কংগ্রাচুলেশনস ব্রো। বিয়েটা হয়েই গেল।”

কায়ান হাত বাড়িয়ে দিতেই হিমেল তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

“তোকে ছাড়া সম্ভব ছিল না।”

হিমেল হেসে বলল,

“আরে ভাই, এতটুকু না পারলে কিসের বন্ধু হলাম। আর হ্যাঁ, আরেকটা গুড নিউজ আছে।”

“কি?”

হিমেলের চোখেমুখে আনন্দ ঝলমল করে উঠল।

“আমি বাবা হবো রে।”

কথাটা শোনামাত্র কায়ান আর জেবরানের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল আনন্দে। তারা দুজনই হিমেলকে অভিনন্দন জানালো।

“ভাই, তোর লাইফটা গুছিয়ে দিতে পেরে খুব ভালো লাগছে। তোর কষ্ট চোখের সামনে সহ্য হত না আমার।”

কায়ানের চোখে আবারও এক ঝলক বিষণ্নতা নেমে এলো।

“নিজের সুখ পেতে গিয়ে সেরিনকে কষ্ট দিয়ে ফেললাম রে।”

হিমেল এবার গম্ভীর স্বরে বলল,

“ওসব ভাবিস না। শোন, সেরিন আর তোর পোস্টার বানানো ছেলে গুলোকে ধরেছি। এখন ওরা তোর বেসমেন্টে আছে। আর শাহারিয়ার আর তার বাপের কেস কোনো উকিল লড়বে না। এতগুলো মেয়ের জীবন নষ্ট করার পর ওদের ফাঁসি না দিতে পারলেও ভয়ংকর শাস্তি হবে। ইতিমধ্যে অনেক মেয়ের বক্তব্য উদ্ধার করেছি। আশা করছি ওরা আর কোনোদিন মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারবে না।”

কায়ান ধীরে মাথা নেড়ে বলল,

“ঠিক আছে, তুই ভাবির কাছে যা। বাকিটা আমি সামলে নিব।”

“ওকে। খেয়াল রাখিস, নিজেরও আর সেরিনেরও।”

“ওকে।”

হিমেল চলে যেতেই আবার ছাদের চারপাশে নীরবতা নেমে এলো। দূরের পাহাড়ি বাতাস ধীরে ধীরে বইছে। রাত আরও গভীর হয়ে উঠেছে। জেবরান কায়ানের দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বলল,

“ভাই, তুমিও রুমে যাও। সেরিন অপেক্ষা করবে।”

কায়ান মৃদু মাথা নেড়ে বলল,

“ওকে।”

তারপর দুজন দুই দিকে হাঁটা দিল। পাহাড়ি রাতের নিস্তব্ধতার মাঝে সিকদার নিবাসের করিডোরগুলো ধীরে ধীরে তাদের পদচারণার শব্দে ভরে উঠল।

———-

কায়ানের রুমটা যদিও বাসরের সাজে সজ্জিত, তবুও খাটে শুয়ে থাকা বউটা মোটেও বাসরের জন্য প্রস্তুত নয়। পুরো রুমজুড়ে নরম আলোর মায়াবী আবেশ ছড়িয়ে আছে। সাদা আর লাল ফুলের গন্ধ মিশে ঘরটাকে স্বপ্নময় করে তুলেছে। জানালার বাইরে পাহাড়ি রাতের নীরবতা ধীরে ধীরে আরও গভীর হয়ে উঠছে। দূর থেকে ভেসে আসা ঠান্ডা বাতাস পর্দাগুলোকে আলতো দোলাচ্ছে।

সেরিনের পরনে তখনও সেই লাল শাড়িটা। দিনের সমস্ত ক্লান্তি আর অনুভূতির ছাপ যেন এখনো তার চোখেমুখে লেগে আছে। কায়ান ভেতরে প্রবেশ করেই দেখতে পেল সেরিন শুয়ে আছে, অথচ এখনো সাজ তোলা হয়নি।

কায়ান দরজা বন্ধ করে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো তার কাছে।

“জান, তুমি কেন সাজ তুলোনি?”

সেরিন শান্ত গলায় বলল,

“আপু বললো আপনার জন্য অপেক্ষা করতে।”

কায়ানের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। সে ঝুঁকে সেরিনের কপালে আলতো চুমু এঁকে দিল। তারপর খুব যত্ন করে সেরিনকে পাঁজাকোলে তুলে ওয়াশরুমে নিয়ে গেল।

পাহাড়ি রাতের ঠান্ডা আবহাওয়ার মাঝেও ওয়াশরুমের উষ্ণতা যেন এক প্রশান্ত অনুভূতি এনে দিচ্ছিল। কায়ান নিজ হাতে সেরিনকে শাওয়ার করিয়ে শাড়ি বদলে দিল। ভারী গয়না আর সাজসজ্জা সরিয়ে তাকে পরিয়ে দিল নরম আর আরামদায়ক পোশাক। এরপর কোলে করেই তাকে আবার বাইরে নিয়ে এলো।

ঘরের নরম আলোয় বসিয়ে খুব যত্ন করে সেরিনের ভেজা চুল শুকিয়ে দিল কায়ান। তার প্রতিটি ছোঁয়ায় ছিল এক অদ্ভুত কোমলতা। যেন মানুষটা নিজের সমস্ত ভালোবাসা নিঃশব্দে ঢেলে দিচ্ছে।

এরপর সেরিনকে বিছানায় শুইয়ে রেখে কায়ান নিজেও ফ্রেশ হতে চলে গেল।

সেরিন চুপচাপ তাকিয়ে রইল তার দিকে। মানুষটা কতটা যত্ন করতে পারে, তা যেন তার ভাবনারও বাইরে। বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত শান্তি অনুভব হচ্ছে তার।

কিছুক্ষণ পর কায়ান ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এলো। সেরিন তখনও তার দিকেই তাকিয়ে আছে। কায়ান এসে তার পাশে বসলো।

“ঘুম আসছে না?”

সেরিন মাথা নেড়ে বলল,

“উহু না।”

“তাহলে কি করতে চাও?”

সেরিন ছোট্ট শিশুর মতো আবদার করে বলল,

“ছাদে নিয়ে চলুন। দোলনায় বসে তারা দেখব।”

কায়ান হেসে বলল,

“জো হুকুম মহারানী।”

এরপর কায়ান সেরিনকে কোলে তুলে ছাদের দিকে চলে এলো।

ছাদের দোলনায় বসে কায়ান সেরিনকে নিজের কোলে বসিয়ে আগলে রাখল নিজের বুকে। রাতের আকাশজুড়ে অসংখ্য তারা মিটমিট করে জ্বলছে। চারপাশে পাহাড়ি রাতের স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে আছে। পাশের বাগানজুড়ে জোনাকিরা ছোট ছোট আলোর বিন্দু হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। বাড়ির চারপাশে লাগানো ক্ষুদ্র আলোগুলো পুরো পরিবেশকে আরও মায়াময় করে তুলেছে।

সেরিন মাথা রেখে আছে কায়ানের বুকে। মুগ্ধ চোখে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। প্রকৃতির সেই অপরূপ সৌন্দর্য তাকে গভীরভাবে মোহিত করছে।

আর কায়ান সমস্ত পৃথিবী ভুলে তাকিয়ে আছে নিজের ব্যক্তিগত সৌন্দর্যের দিকে।

কি অদ্ভুত, তাই না।

দুজনই সৌন্দর্য দেখছে, অথচ দুজনের কাছে সৌন্দর্যের ব্যাখ্যাটা সম্পূর্ণ আলাদা।

কিছুক্ষণ পর সেরিন আলতো করে কায়ানের বুকে মাথা ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“ঘুম পাচ্ছে।”

কায়ান সেরিনের চুলের ঘ্রাণ নিতে নিতে শান্ত গলায় বলল,

“হুম, চলো। বেশ রাত হয়েছে।”

——-

সে রাত ছিল তাদের বাসর রাত। অথচ সেই রাতে ছিল না কোনো শারীরিক মেলামেশা, ছিল না কোনো দৈহিক চাহিদা। ছিল শুধু দুটো হৃদয়ের গভীর ভালোবাসার নীরব মিলন। পাহাড়ি রাতের নিস্তব্ধতা আর আকাশভরা তারার নিচে তারা দুজন যেন অনুভূতির এক ভিন্ন জগতে হারিয়ে গিয়েছিল।

সে রাতে অসাধারণ কিছু না ঘটলেও, রাতটা দুজনের মনের ভেতর সারাজীবন জীবন্ত হয়ে থাকবে। কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলোর সৌন্দর্য শব্দে প্রকাশ করা যায় না। শুধু অনুভব করা যায় নিঃশব্দে।

সে রাত কায়ানের জন্যও ছিল ধৈর্যের পরীক্ষা। এত বছর পর প্রিয়তমাকে নিজের করে পেয়েও তাকে স্পর্শ না করতে পারার কোনো আক্ষেপ কিংবা অসন্তোষ তার চোখেমুখে ফুটে উঠল না। বরং নিজের ভেতরে সে আরও বেশি অপরাধবোধ অনুভব করল। সেরিনের এই দুর্দশার জন্য যেন নিজেকেই দায়ী মনে হতে লাগল তার।

রাত তখন আরও গভীর হয়ে উঠেছে। পাহাড়ি বাতাসে হালকা শীতের আবেশ মিশে আছে। সিকদার নিবাসের চারপাশ ধীরে ধীরে নিস্তব্ধতায় ডুবে যাচ্ছে।

———–

শিমুল বিয়ের বাড়ির সমস্ত কাজ শেষ করে বেশ কিছুক্ষণ আগেই নিজের রুমে এসেছে। দিনের ব্যস্ততা শেষে শরীরজুড়ে ক্লান্তি নেমে এলেও তার চোখে ঘুম নেই। জেবরান তখনও বাইরে।

ফ্রেশ হয়ে আয়নার সামনে বসে শরীরে লোশন মাখছিল শিমুল। ঘরের হালকা হলুদ আলো তার ক্লান্ত মুখটাকে আরও কোমল করে তুলেছে। ঠিক তখনই হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল জারিফ আর জিনুর কথা।

ছেলে দুটো কতটা মায়াবী, কতটা আপন হয়ে গিয়েছিল তার সঙ্গে। তাদের নিষ্পাপ মুখ, ছোট ছোট আবদার, ভালোবাসা পাওয়ার আকুতি সবকিছু যেন হঠাৎ করেই মনে ভিড় জমালো।

আজকাল ভীষণ মনে পড়ে ওদের।

শেষের দিনগুলোতে মেহেরীণের জায়গায় মায়ের সমস্ত দায়িত্ব পালন করেছে শিমুল। হয়তো সেই কারণেই অজান্তেই ছেলেদুটোর প্রতি গভীর মায়া জন্মে গেছে তার।

এসব ভাবতে ভাবতেই চোখের কোণা বেয়ে দু ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল নিচে।

ঠিক তখনই রুমে প্রবেশ করল জেবরান। শিমুলকে কাঁদতে দেখে মুহূর্তেই অস্থির হয়ে উঠল সে।

“শিমুল, কি হয়েছে? তুমি কাঁদছো কেন?”

জেবরানকে দেখে শিমুল দ্রুত চোখের পানি মুছে নিল।

“কিছু না।”

জেবরান মাটিতে বসে শিমুলের হাত দুটো শক্ত করে ধরল। তার কণ্ঠে ছিল উদ্বেগের ছাপ।

“সেরিনের জন্য কষ্ট লাগছে?”

শিমুল ধীরে মাথা নেড়ে বলল,

“না।”

“তবে?”

শিমুল দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত গলায় বলল,

“জারিফ, জিনুর কথা মনে পড়লো। ছেলে দুটো ভীষণ ভালোবাসা কাতুরে। জানো, ওরা কারোর এটেনশন পায় না। আল্লাহ ওদের মা দিয়েও যেন দেয়নি।”

জেবরান চুপ করে রইল। সে বিষয়টা বুঝতে পারছে। খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে। কিন্তু বুঝে লাভ কি, যখন কিছুই করার নেই। চারপাশের নীরবতা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল সেই মুহূর্তে।

চলবে?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply