Golpo romantic golpo আদিল মির্জাস বিলাভড

আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৩৬


আদিল মির্জা’স বিলাভড
— ৩৬

গ্রামের দক্ষিণদিকের এই রাস্তাটুকু মাটির। সরু, একটু চওড়া। রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় থোকায় থোকায় জমছে বৃষ্টির পানি। পানির স্তুপ পিষে ছোটা গাড়ির ছাদে পড়ছে বৃষ্টির একেকটি ধারালো ফোঁটা। আকাশের বুকে আঁকাবাঁকা ঢেউ ফেলা বজ্রপাতের মতোই গাড়ির গ্লাসে ঢেউ তুলেছে বৃষ্টির সেই ফোঁটাগুলো। সারিবদ্ধ ভাবে স্পিডে চলা গাড়িগুলো থামল ব্রিজের ওপর। ব্রিজের দু-পাশে সিমেন্টের রেলিং। নিচ দিয়ে বয়ে গিয়েছে নর্থ নদী। আকাশটা তখনো বিভৎস কালো মেঘে ঢেকে আছে। অবিরাম নামছে ধারালো বৃষ্টি। হঠাৎ করে তীব্র ঝলক। এক মুহূর্তের জন্য চারপাশের সবকিছু স্পষ্ট হয়ে ওঠে দিনের আলোর মতোন। দেখা যায় বড় ধূসর ট্রাকগুলো। যা ধীরে ধীরে এসে হাজির হয়েছে ব্রিজটির গোড়ায়। হেডলাইটের আলোতে সুস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে বৃষ্টির একেকটি ফোঁটা, চিটচিটে কাঁদামাটি। টারিয়ারের চাকা কাদায় ভিজে বসে গেছে মাটিতে। ট্রাকগুলোর পেছন থেকে সামনে এসে থামা চারচাকার গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো ম্যানেজার আনোয়ার খন্দকার। তার হাতে ছাতা। বড়ো বড়ো কদমে এগুচ্ছেন সামনে দাঁড়ানো গাড়িগুলোর দিকে। ইতোমধ্যে শান্ত ছাতা হাতে বেরিয়েছে। বেরিয়েছে বাকি বডিগার্ডস গুলোও। ছোটোখাটো ব্রিজটা বডিগার্ডস, গাড়ির উপস্থিতিতে আরও ছোটো হয়ে এলো। ওরা ঘিরে ধরেছে আশপাশটা। শান্ত সোজা প্যাসেঞ্জার সিটের দরজা খুলেছে। হাতের ছাতাটা ওপরে তুলে ধরে আছে। ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে ভেজা রাস্তায় ফেলা পায়ের জুতোটা চকচকে, চোখা। লম্বাচওড়া, বিশাল দেহটা পুরোপুরি বেরিয়ে আসতেই আনোয়ার সাহেব বলেন –

‘গুড ইভনিং, বস।’

আদিলের প্রত্যুত্তর অস্পষ্ট। বৃষ্টির শব্দের সাথে ভেসে গিয়েছে। কালো গ্লাভ্‌জ পরিহিত হাতের আঙুলের ভাঁজে পিষ্ট হওয়া সিগারেট পুনরায় ঠোঁটে গুঁজতে গুঁজতে তার ধূসর চোখের দৃষ্টি গিয়ে পড়ল ট্রাকগুলোর ওপরে। দীর্ঘপথ পেরিয়ে আসা ট্রাকগুলোর অবস্থা করুণ। আদিল সামনে কদম বাড়ালে পেছনে ছাতা ধরে দাঁড়ানো শান্তও তালে তাল মিলিয়ে কদম বাড়ায়। পাশাপাশি এলেন, আনোয়ার খন্দকারও। ইশারা পেতেই এলেন সামনের ট্রাকের কন্টেইনার গুলো ধীরে ধীরে খুলল। ভেতরে সাজানো সব দামি, শক্তিশালী অ স্ত্রগুলো হালকা আলোয় ঝকঝক করছে। সিগারেট ঠোঁটে চেপে ধরে দু-হাতে একটি অ স্ত্র তুলে নিলো আদিল। ওজন টানল, ট্রিগার টেনে পরীক্ষা করল। সব ঠিকঠাক, কোনো ঢিলা বা ত্রুটি নেই। অ স্ত্রটা ভেতরে ছুড়ে মেরে অবশেষে জিজ্ঞেস করে –

‘সব ঠিকঠাক আছে?’

আনোয়ার খন্দকার অক্টোবরের এমন ঠান্ডার সময়েও ঘামছেন –

‘নাইন্টি নাইন পার্সেন্ট। প্রতিটি কম্পার্টমেন্টেই সাবধানে গোছানো ছিলো। অবশ্য পুলিশ খবর পেয়েছিল। ঝামেলা করেছে একটু। তবে মাল সব ঠিকঠাক।’

‘ঝামেলা চাই না।’

বলতে বলতে আদিল ঘুরল, কদম বাড়াল। পাশাপাশি থাকল আনোয়ার সাহেব। চাপা কণ্ঠে বলে গেলেন সাজানো সব প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো। একেকটি বাক্যের পাশাপাশি কোম্পানির মিটিংগুলোর সম্পর্কেও অবগত করছেন। শুনতে শুনতেই আদিল পুনরায় গাড়িতে উঠে বসেছে। ভীষণ গুরুগম্ভীর ভঙ্গিতেই আরও কিছু কথাবার্তা চালালেন আনোয়ার সাহেব। প্রত্যকটি বাক্যের শেষে সতর্ক চোখে পরখ করতে চাইছেন বসের অভিব্যক্তি। তবে অন্ধকারে শুধু দেখতে পাওয়া যাচ্ছে আদিলের শক্ত চোয়াল। এযাত্রায় হাতে যত্নের সাথে ধরে রাখা মখমলের ধবধবে সাদা বাক্সটা এগিয়ে দিলেন। কালো গ্লাভ্‌জ পরিহিত হাতটা বাক্সটা নিতেই, গাড়িটা চলতে শুরু করল। উঠে গেলো অল্প খোলা কাঁচটুকুও। আদিল বাক্সটা মুহূর্তে খুলল না। সিগারেটটা শেষ করে তবেই খুলল। ডায়মন্ডের চিকন একটা কোমরবন্দনি ওতে। ওটাকে আঙুলের ভাঁজে ভাঁজে রেখে ঘুরিয়েফিরিয়ে দেখল কেমন! অনেকটা সময় যাবত। ড্রাইভিংয়ে বসেছে এলেন, পাশে শান্ত। ও আড়ে আড়ে তাকাচ্ছিল। বসের হাতে কী তা বোঝার চেষ্টা করছিল যেমন! তখুনি ওর পার্সোনাল ফোনটা বেজে ওঠে। স্ক্রিনে নৈবদ্যর নাম ভাসছে। এভাবে ঝুঁকি নিয়ে অসময়ে কল করার লোক তো নৈবেদ্য নয়। শান্ত দ্রুতো কল রিসিভ করে কানে ধরতেই চোখমুখ ধারালো হয়ে ওঠে। স্পিকারে দেয় মুহুর্তে। নৈবেদ্যর কণ্ঠ তখন হিমালয় ছুঁয়েছে।

‘খা*য় আমাকে সন্দেহ করছে। আমারে দূরে দূরে রেখেছিল তাই খবর পেতে দেরি হয়ে গেসে বস। ওরা ইতোমধ্যে পৌঁছে গেছে রাজপুর… বস..বস!’

ততক্ষণে বাজল এলেনের ফোনও। শান্ত এলেনের হয়ে কল রিসিভ করেছে দ্রুতো। এলেন ইতোমধ্যে গাড়ি চালাচ্ছে সর্বোচ্চ গতিতে। ওদের পেছনের গাড়িগুলোও একই গতিতে অনুসরণ করে যাচ্ছে। ফোনের ওপাশের পুরুষ কণ্ঠের আকুতি পড়তে না পড়তেই গু লির শব্দের পাশাপাশি চিৎকারের শব্দ ভেসে আসে। ওমনি চুপসে গেলো সব। থমথমে নিরবতা অন্যকিছুর ইঙ্গিত দিলো। সামনে থেকে দ্রুতো বেগে ছুটে আসতে দেখা গেলো অচেনা গাড়িগুলো। বুঝতে আর বাকি নেই, প্রি-প্ল্যানড আক্রম ণ সব! হাতের কোমরবন্দনিটা পকেটে ঢুকিয়েই থমথমে গলায় আদেশ ছোড়ে আদিল –

‘গাড়ি থামা।’

এলেন থামিয়েছে গাড়ি। তাদের পেছনের গাড়িগুলোও থেমে গিয়েছে। সরু রাস্তাটায় যে দুটোর বেশি গাড়ি পাশাপাশি চলাফেরা করা অসম্ভব। প্যাসেঞ্জার সিট থেকে বেরুতেই আদিল ভিজে গেলো ঝুম বৃষ্টিতে। ধারালো বৃষ্টির ফোঁটাগুলো পড়ল শক্ত মুখে। হাতের রিভলভারটা চোখের পলকে তুলে কয়েকটা গু লি ছুড়ল ধেয়ে আসা সামনের দুটো গাড়ির প্রথম টায়ারগুলোতে। গাড়ি দুটো কেমন ঝাঁকি মেরে দেবে গেলো এক জায়গায়। এলেন ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে দাঁড়াতেই আদিল উঠে বসল ড্রাইভিংয়ে। এলেন গিয়ে উঠেছে পাশের গাড়ির ড্রাইভিং সিটে। শান্ত আদিলের পাশেই আছে। একসাথেই ওদের গাড়িগুলো দ্রুতো বেগে ছুটল সামনে। এলেন আদিলের গাড়ির আগে গিয়ে সামনে থেকে ধেয়ে আসা গাড়িগুলোর সাথে ভীষণ শব্দ করে মিশে গেলো। দু-পক্ষের গাড়ির ফ্রন্ট ভেঙে গুড়িয়ে গেল এতে। এলেন হেয়ালির সাথে আক্রমণ চালিয়ে রাস্তাটা ক্লিয়ার করতেই আদিলের গাড়ি হাওয়ার বেগে এগিয়ে যায়। পরপর ওদের বাকি গাড়িগুলোও। রাস্তার দুধারে যাওয়া গাছপালা গুলো চোখের পলকে পেছনে চলে যাচ্ছে। বাতাস বেড়েছে, বেড়েছে বৃষ্টির প্রখরতা। ইতোমধ্যে শান্ত সহ বাকি বডিগার্ডস গু লি চালাতে শুরু করেছে কাঁচ নামিয়ে। বিপরীতে গু লির আক্রমণ আরও ভয়াবহ। ওদের প্রাণপণ চেষ্টা তাদের সময় নষ্ট করার। তা ঠিক বুঝে নিয়েছে আদিল। তার ভয়ংকর রূপ নেয়া চোখ দুটো স্থির। স্টিয়ারিংয়ে থাকা হাতটা অজান্তেই কাঁপে। থেমে থেমে বলে –

‘ধ্রুবকে কল লাগা।’

ইতোমধ্যে শান্তর ব্লুটুথ ওপাশে কানেক্ট হয়েছে। যা শুনল এতে একমুহূর্তের জন্য বুজল চোখ। পরমুহূর্তেই আদিলকে জানাল। স্টিয়ারিংয়ে থাকা আদিলের হাতের শিরা ভেসে ওঠে। পরমুহূর্তেই ব্লুটুথটা কেড়ে নিজের কানে ঢোকায়। হিমালয় ছোঁয়া ওই গর্জনে কাঁপল গাড়ির ভেতরটা –

‘গার্ড দিতে বলছিলাম মাদার**র বাচ্চারা। বাড়ি থেকে বেরুলো কীভাবে? ঘাস খাইতেসিলি? সেইফ জোনে নে ওদের। ডু ইট ফাস্ট। ঘিরে রাখ। আমার ওয়াইফ, আমার বাচ্চার গায়ে একটা টোকা পর্যন্ত লাগলে তোদের আমি জিন্দা কব রে ঢোকাব।’

আদিল জোরে শ্বাস টেনে নিলো। গাড়ির গতি সর্বোচ্চতে বাড়িয়ে হিসহিসিয়ে উঠল –

‘ধ্রুউউউব…প্রটে-ককট দেম। আই ওয়ান্ট টু সি দেম সেইফ অ্যান্ড সাউন্ড। ডিড ইউ হিয়ার মি? ডিড ইউ ফাকিং হিয়ার মি?’

.

আকাশ ফেটে বৃষ্টি নামছে। ঝমঝম শব্দে পাতা, মাটি, গাছ সব কাঁপছে। তীব্র বাতাসে ভয়ানক ভাবে দুলছে গাছের পাতলা ডালপালাগুলো। তখুনি বিদ্যুৎ চমকালে কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরো জঙ্গলটা সাদা আলোয় ভেসে উঠতেই স্পষ্ট দেখা যায় তাদের ঘিরে ধরা হিংস্র লোকদের। তাদের একেকটা গু লির আওয়াজে জঙ্গল কেঁপে উঠছে। প্রকৃতির বিভৎসতার চেয়েও যে বিভৎস সে দৃশ্য। সামনে গু লি খেয়ে পড়ে থাকা বডিগার্ডের স্যুটের বাম দিকে পিতলের বাজপাখির ছাপ। রোযা এই বাজপাখি আদিলের কাঁধে দেখেছিল। খেয়াল করেছিল, সেই পাজপাখির ছাপ তার প্রত্যেকটা বডিগার্ডের কালো কোটের বামপাশের কাঁধের দিকে আছে। চিহ্ন, পরিচয়! কিছুক্ষণ আগে তাদের র ক্ষা করতে থাকা একজন চোখের পলকে ম রে পড়ে আছে এটা রোযা সহ্য করতে পারল না। হৃদিকে জড়িয়ে রাখা হাতটা কাঁপল সামান্য। র ক্তে ভেসে যাওয়া মাটির দিকে চাইতেই চোখ বুজে ফেলল। গু লিটা সোজা কপালে ঢুকেছে লোকটার। রোযার পেছনেই হৃদি, ঝুমুর, সুপ্তি সহ বাকিরা। একেকটা গু লির আওয়াজে ওরা ভয়ে আর্তনাদ করে উঠছে। ভয়ে সিঁটিয়ে যাচ্ছে রোযার পেছনে। তাদের ঘিরে আছে ক্লান্ত, ধ্রুব ওরা। ওদের মধ্যে এক চমৎকার অপ্রকাশ্য বোঝাপড়া আছে। চোখের ইশারায় ইশারায় ওদের একেজন আক্র মণ করছে শৃঙ্খলার সাথে। ক্লান্ত রোযার সামনে। বুকের ওঠানামার গতি দ্রুতো ওর। সামনে চেয়ে থেকেই ও চাপা গলায় বলে –

‘ম্যাডাম, প্রিন্সেসকে নিয়ে পেছোন। রাস্তা ক্লিয়ার করে দিতেই ছুটবে….’

ক্লান্ত কথাটুকু শেষ করতে পারে না। একটা গু লি এসে বিঁধে যায় ওর কাঁধে। রোযার শ্বাস গলায় আটকে গেলো। অস্পষ্ট স্বরে আর্তনাদ করে উঠল –

‘ইউ অলরাইট? হেইই! ক্লান্ত!’

ক্লান্ত দাঁতে দাঁত পিষে আওড়ায় তারপরও, ‘ম্যাডাম, পেছনে দৌড়ান। আমি দেখছি…’

গণহারে ছোড়া গু লির আরেকটি এসে বিঁধ ল ক্লান্তর গুলিবিদ্ধ কাঁধেই। হাত কাঁপল, রিভলভারটা পড়তে নিতেই রোযা ধরে ফেলল দু-হাতে। ভেজা চোখে দেখল ক্লান্ত তখনো হিমালয়ের মতো তাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। সামনে তাকাতেই দেখল পুনরায় গু লি ছুড়তে চাচ্ছে ওরা। রোযার রিভলভার ধরে রাখা হাতটা কাঁপল। ভেজা চুল মুখে লেপ্টে আছে। শরীরে মিশে আছে শাড়িটা। ভেজা চোখদুটোর দৃষ্টি ধীরে ধীরে তীক্ষ্ণ হয়, দৃঢ়তা জন্মায়। হৃদি তখনো লুকিয়ে আছে রোযার আঁচলের নিচে। আতঙ্কে কাঁপছে। অস্পষ্ট কণ্ঠে ডাকছে। রোযা ওকে বাম হাতে লুকিয়ে নেয় পেছনে। আরও ভালোভাবে আঁচলের নিচে ঢেকে রাখে। তাদের চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন বডিগার্ডস তখনো প্রতিরোধে ব্যস্ত। ওদের চোখে সতর্কতা, আঙুল ট্রিগারের কাছে। এক মুহূর্তের নীরবতা বইতে না বইতেই পুনরায় গু লির, ঠাস..ঠাস…শব্দ। গুলির শব্দ ছিন্নভিন্ন করে দিলো এই জঙ্গলের নিস্তব্ধতা। রোযা অবশেষে হাত ওঠায়। ক্লান্তর কাঁধ ঠেলে সরিয়ে দেয় সামনে থেকে। মুহূর্তে ওপর দিক থেকে আসা গু লিটা ঢোকে গাছের ভেতর। ক্লান্তর কাঁধ ধরায় ওর ক্ষ তর তাজা র ক্তে ভেসে যায় রোযার হাত। সেদিকে মনোযোগ পড়ে না ওর। দু-হাতে তাক করানো রিভলভারটার ট্রি গার একমুহূর্তের জন্য চোখ বুজে প্রেস করে দিতেই… তীব্র শব্দে গু লিটা কারও গায়ে বোধহয় বিঁধে। আর্ত নাদ শোনা গেলো। সাহস জন্মাতেই চোখ মেলে তাকাল রোযা। হাতের কাঁপুনি কিছুটা কমেছে। দৃষ্টি গাঢ় হয়েছে। গাড়ির হেডলাইটের আলোয় অল্প দেখা গেলো ইটের রাস্তাটা। ওখানে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। প্যাসেঞ্জার সিটের জানালার কাঁচ অল্প নামানো। হুড়মুড়িয়ে নামা বৃষ্টিতে সবটা আবছা, অস্পষ্ট হলেও রোযা খেয়াল করে একজোড়া আগুন চোখের দৃষ্টি। ওই চোখজোড়া সোজা ওকেই দেখছে। পর্যবেক্ষণ করছে। ভাসাভাসা শোনাল অজানা মেয়েলি কণ্ঠের কথাগুলো। যা এতটাই ঠান্ডা যে রোযার হাত বরফের মতো জমল –

‘জীবিত চাই ***কে আমি। গাড়িতে তোল।’

মুহূর্তে একদল ছুটে আসতে চাইল চারদিক দিয়ে। ক্লান্তর তখনো জ্ঞান আছে। ও গাছ ধরে দুর্বলভাবে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে গেলো। ইতোমধ্যে ধ্রুব সহ বাকিরা এসে সমানে গু লি করে যাচ্ছে। প্রতিরোধ করতে করতে লোড করতে হচ্ছে রিভলভার। রোযা নিজেও চোখমুখ শক্ত করে নিজেদের বাঁচাতে গু লি ছুড়ছে বা-দিকে। তখুনি ধ্রুবের পায়ে গুলি বিঁধে। ও ধপ করে দু-হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল। রোযাকে ধরতে এগিয়ে আসা চারজন ভয়ংকরী পুরুষের নজর লক্ষ্য করে আর দ্বিধা করে না মেয়েটা। গু লি করে বসে। গু লির ঠাস..ঠাস..ঠাস শব্দে বৃষ্টির শব্দ মিলিয়ে গেলো। একজন গু লিবিদ্ধ হয়ে পড়ে গিয়েছে মাটিতে। আরেকজনের পায়ে লেগেছে। বাকি দুজন ভীষণ হেয়ালির সাথে এসে দাঁড়িয়েছে রোযার সামনে। সামনের লোকটা থাবা বসানোর মতো হাত বাড়াতেই… ধ্রুবের মুখ দিয়ে একদলা র ক্ত বেরুলো। ও দাঁড়াতে চাইল। বাঘের ন্যায় গর্জন করে উঠল –

‘ডোন্ট টা চ হার, ইউ বাস্টার্ড। ইউ’ল রিগ্রেট ইট…মা রা… পড়বি, মা রা পড়বি।’

রোযা গু লি ছুড়তে চাইল, তবে রিভলভারটার ফাঁকা। গু লি নেই। সেই সুযোগেই লোকটা ওর হাতটা শ ক্ত করে থাবা দিয়ে ধরল। চোখে লালসা, একরকমের মুগ্ধতা। সম্ভাবনা এমন, দু-হাতে কাঁধে তুলে ফেলবে ওকে। রোযা পেছাল এক কদম। চোখের পলকে হাঁটু উঁচু করে আক্র মণ করল সংবেদনশীল জায়গায়। লোকটা আর্তনাদ করে ঝুঁকল সামান্য। ওমনি রোযা লাথি মেরে আরও পেছাল বাকিদের নিয়ে। হাতের রিভলভার দিয়ে সজোরে মার ল মাথায়। রক্ত ছিঁটকে এলো ওর হাতে। লোকটা গর্জে ওঠে। কপালের তাজা র ক্ত বেয়ে আসে গালে। এতে লোকটার রাগ বাড়ল। রক্তচক্ষু নিয়ে তাকাল। হাওয়ার বেগে এগিয়ে, রুক্ষভাবে হাত বাড়াতেই…উচ্চ গতিতে আসা গাড়িগুলোর আওয়াজে কাঁপল মাটি, বাতাস, বৃষ্টিও। সেই গাড়ির সমাবেশে পুরো জঙ্গল হেডলাইটের আলোয় আলোকিত হয়ে এলো। একটা কাদামাখা গাড়ি গাছের ফাঁকফোকর দিয়ে সোজা ঢুকেছে জঙ্গলের ভেতর। ওটার ইঞ্জিনের গর্জন আর টায়ারের ছিটানো কাদা মিশে যাচ্ছে বৃষ্টির শব্দে। গাড়িটা সোজা উঠে গেলো রোযার হাত ধরতে চাওয়া লোকটার গায়ে। মুহূর্তে লোকটার আর্তনাদ, র ক্তে ভেসে গেলো মাটি। গাড়িটা জখ মিত শরীর থেকে সরতেই রোযা আঁতকে উঠে পিছিয়ে যায়। থরথর করে কাঁপে ওর শরীর। তখনো লোকটা জীবিত, গোঙাচ্ছিল। অথচ পরমুহূর্তে আদিল বেরিয়ে এলো ঝড়ের গতিতে, গাড়ি পুরোপুরি থামার আগেই। র ক্তাক্ত ওই চোখ তার ওপর পড়তেই থমথমে নীরবতা নামল। আদিল তখুনি এগিয়ে এলো না। আদেশ ছুঁড়ল হিমালয় কাঁপিয়ে তোলার ক্ষ মতা রাখা কণ্ঠে –

‘একটাও যেন পালাতে না পারে।’

বলতে বলতে সে কদম বাড়াল মাটিতে পড়ে গোঙানো লোকটার দিকে। আদিলের হাতের ওই চকচকে, ধারালো তলোয়ার দেখে রোযাই পিছিয়ে যায় আরও কয়েক কদম। শান্ত ইতোমধ্যে এসে কোলে তুলে নিয়েছে হৃদিকে। রোযার পেছনে দাঁড়ানো ঝুমুর, সুপ্তি সহ বাকিদের দ্রুতো উঠিয়েছে গাড়িতে। মুহূর্তে গাড়িতে চড়ে শান্ত তখুনি রওনা দিয়েছে। অথচ রোযা…চোখ ফেরাতে পারল না, নড়তে পারল না। পলক ফেলতে পারল না। জমে গেলো একই জায়গায়। ও দেখল কীভাবে ধারালো তলোয়ারটা এককোপে আলদা করে ফেলল তাকে ছোঁয়া ওই হাতটা। রোযার গা কাটা দিয়ে উঠল। পেট গুলিয়ে উঠল। আতঙ্কে ও চোখমুখ বুজে তখুনি দৌড়ে পালাতে চাইল। ওর পুরো অস্তিত্ব লুকোতে চাইল অথচ তখুনি আদিল ঘুরে দাঁড়াল। ওই চোখে দৃষ্টি পড়তেই রোযা পিছিয়ে গেলো কয়েক কদম। আনমনা কাঁপল হাত। আদিলের র ক্তাক্ত হাত থেকে টপটপ করে ঝরছে। বৃষ্টির স্পর্শে তা আরও বিভৎস। তলোয়ারটা ফেলে দিয়েছে লা শের পাশেই। বড়ো কদমে এগুচ্ছে ওর দিকেই। রোযা আর পেছাতে পারল না। আদিল এসেই ধরল ওর ঠান্ডা হাত দুটো। র ক্তের স্পর্শ দেখেই দৃষ্টি বদলে গেলো। রোযা বলে বসল দ্রুতো –

‘আমার না।’

আদিল শান্ত হলো না এতে। দম টেনে নিয়ে চোখ বুজে শান্ত করতে চাইল নিজেকে। হাতের পরিষ্কৃত উল্টোপিঠ দিয়ে গাল ছুঁয়ে আওড়াল –

‘গুড…ভেরি গুড।’

পরমুহূর্তেই আদিল একটানে খুলল গায়ের কোট। রোযার কাঁধে মেলে দিলো। ঢাকল ভেজা শাড়ি ভেদ করে দৃশ্যমান হওয়া কম্পিত শরীর। ইতোমধ্যে এলেন সহ বাকিরা কয়েকজনকে জীবিত বন্দি করতে পেরেছে। কিছু মা রা পেরেছে আর কিছু পালিয়েছে। এলেন মাথা নুইয়ে আস্তে করে জানাল –

‘সাথে উনিও ছিলেন।’

আদিলের শক্ত চোয়াল আরও ধারালো হলো। গায়ের পুরো জোর কণ্ঠে ঢেলে আদেশ ছুঁড়ল, ‘গাড়ি রেডি কর, গার্ড রেডি কর। বেরুব এক্ষুণি।’

এলেন তখুনি ছোটাছুটি শুরু করেছে। রোযার চুপসানো মুখখানার পরে ওর নগ্ন পা-জোড়া দেখে আদিল থমকাল। একমুহূর্তের জন্য ব্যস, পরমুহূর্তেই দু-হাতে পাজাকোলে তুলে নিলো। কদম বাড়াল গাড়ির দিকে। ইতোমধ্যে স্বপণ গাড়ির দরজা মেলে ধরেছে। শান্তকে গাড়ি নিয়ে ফিরতে দেখা গেলো। সাথে ম্যানেজার খন্দকারও আছেন। তাদের চোখমুখের অবস্থা ভয়ংকর। শান্ত এসেই হাতের ছাতাটা মেলে ধরল আদিলের মাথার ওপরে। আদিল বাইরে থেকেই ঝুঁকে অর্ধেক ঢুকে…রোযাকে সোজা গাড়ির ভেতরে বসিয়ে দিয়েছে। কাঁদামাটি, র ক্তে নোংরা হওয়া ফর্সা পা দুটো দেখে আদিলে অসন্তুষ্টি আকাশ ছুঁলো বোধহয়। ওভাবেই খুলল গায়ের শার্ট-টা। চোখের পলকে, রোযাকে বাঁধা দেবার সময়টুকু না দিয়েই…ওই শার্ট দিয়ে পা-হাত মুছে.. নিজের পায়ের বিশাল জুতোজোড়া রোযায় পায়ে পরিয়ে দিলো। শার্ট-টা ছুড়ে ফেলল কোথাও একটা। উদোম পিঠের পাজপাখিটার ওপর তখন বৃষ্টির ধারালো ফোঁটা পড়ছে হুড়মুড়িয়ে। রোযা মুখ খুলেও একটা শব্দ বলতে পারল না। শুধু দেখল চোখের এতো সামনে থাকা হিংস্র লোকটার এই নরম, সাবধানের সাথে করা একেকটা কর্মকাণ্ড। আদিল ঝুঁকে ছিলো, এলেন কিছু একটা বলতেই এযাত্রায় মাথাটা বাঁকিয়ে বেরুতে নিতেই নরম স্পর্শ পড়ল তার রুক্ষ হাতে। কণ্ঠ অচেনা বড্ড অপ্রত্যাশিত শোনাল।

‘কোথায় যাচ্ছেন?’

আদিল থামল। থমকাল। ঝড়ের বেগে মাথা ঘুরিয়ে ফের তাকাল। আধো আধো আলোতে রোযার চুপসানো মুখখানা দেখে যেন বুঝতে চাইল তার শোনার ভুল কি-না। থেমে থেমে বলল –

‘কী বললে? আবার বলো!’

রোযা দেখল বৃষ্টিতে অর্ধেক ভিজতে থাকা শরীরটা। বাইরে তখনো বজ্রপাত পড়ছে, বৃষ্টির গভীরতা বাড়ছে। আওড়ায় ও, ‘কোথায় যাচ্ছে….’

রোযা আর একটা শব্দ বলতে পারে না। শ্বাইরের ঝড়টা বুঝি গাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে এক মুহূর্তে। চোখের পলকে রোযার গলাটা একটা শক্তপোক্ত থাবার আয়ত্তে চলে যায়। ঠেলে মিশিয়ে নেয়… বৃষ্টির ফোঁটা বেয়ে বেড়ানো জানালার কাঁচের সাথে। পরমুহূর্তেই মাথাটা নামিয়ে নিজের উত্তপ্ত, রুক্ষ…পুরু ঠোঁটের মাঝে কেড়ে নেয় বাদ বাকিটুকু কথা। গোলাপি নরম, ঠান্ডা ঠোঁটে ডুবতেই স্বাভাবিক ঝড়টা যেন ঘূর্ণিঝড়ে রূপান্তরিত হয়ে ওঠে। রোযা চমকে, শিউরে কেঁপে ওঠে। দু-হাত বাড়ায় সিংহের মতো তার ওপরে ঝাপিয়ে পড়া পেশিবহুল, উদোম শরীরটা সরাতে। পরক্ষণেই তার হাতদুটো মুঠোবন্দি হয় আদিলের একহাতের খসখসে মুঠোতে। গলা পেঁচিয়ে ধরা হাতটা দৃঢ় হতে থাকে চুমুর গভীরতার সাথে তাল মিলিয়ে। রোযার চোখ ভিজে ওঠে, গাল বেয়ে গড়াল জল। ঠোঁটের ভাঁজে থাকা ঠোঁটজোড়ার গভীরতা বাড়তে বাড়তে অতলে পৌঁছাতে থাকল। মিলেমিশে একাকার হতে থাকল প্রতি সেকেন্ডে। রোযা অস্পষ্ট শব্দ করে, মাথাটা ঘোরাতে চায়, পারে না। তার গলা থাবা দিয়ে ধরা হাতটা আরও সুনিবিড় ভাবে ধরে রাখে। গলা ধরে আরও কাছে টেনে এনে নিজের ঠোঁটের ভাঁজে ভাঁজে জড়িয়ে নেয়। রোযা বন্ধ, ভেজা চোখজোড়া মেলে তাকাতেই লজ্জায় আরও মিশে গেলো কাঁচের সাথে। হা করে খোলা গাড়ির দরজাটা। বাইরের সব বডিগার্ডস উল্টো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের পিঠ তাদের দিকে, মাথায় ছাতা। ঝুমঝুম বৃষ্টির শব্দও তাদের ঘন চুমুর শব্দ কাটাতে ব্যর্থ। রোযা সজোরে দু-পাশে মাথা নাড়াল। একপর্যায়ে জোকের মতো আঁকড়ে ধরা ঠোঁটজোড়া থেকে মুক্তি পেতেই বড়ো করে শ্বাস টেনে নিয়ে তাকাল ভেজা তবে কেমন রাগান্বিত চোখে। মুখের সামনে থাকা র ক্তিম, নেশায় বুদ হওয়া শক্তপোক্ত মুখে দুর্বল হাতটার ঘুষি যেন বৃষ্টির স্পর্শ। মধুর ছোঁয়া। রোযা হতভম্ব হয়ে তাকাল নিজের হাতের দিকে। কাঁপছে তখনো, শক্তি নেই। আদিল নিজের ডান হাতের মুঠোয় নেয় ঘুষি মারা হাতটা। ভেজা, উত্তপ্ত ঠোঁটের ভাঁজে ছোঁয়ায়। রোযা ওই র ক্তিম ধূসর চোখে চোখ মেলাতে পারল না। কানের কাছে পড়া উত্তপ্ত শ্বাসের অস্তিত্বও মানতে পারল না। হাত ছুটিয়ে দু-হাতে উদোম বুক ঠেলে সরিয়ে ঠোঁট নাড়াল –

‘সরুন… নাহলে জানে মে রে ফেলব আপনাক…’

ওই ধমকি-ধামকিতে বিপরীত ব্যাপারটা ঘটল। কিছুক্ষণের জন্য দু-আঙুলের দূরত্বে আসা আদিল পুনরায় দূরত্বটুকু ঘোচাল। ভেজা, গোলাপি তিরতির করে কাঁপা ঠোঁটে নিজেকে মেশাতে একরকমের নেশা ধরে গেলো তার অস্তিত্ব জুড়ে। দু-হাতে রোযার পাতলা, বৃষ্টিতে তখনো ভেজা কোমর আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে এনে ফেলল উদোম বুকের ওপরে। ঠোঁট ছেড়ে ঘাড়ে মুখ গুঁজতেই রোযা মিইয়ে গেলো। দু-হাতে ঠেলল শক্ত মুখটা। এযাত্রায় আদিল নিজেই থামল। যখন তাকাল, ওই চোখের দৃষ্টি অন্যরকম। অপ্রকাশিত। ভাসা ভাসা। আদিল বেরিয়ে গেলো। দরজাটা লাগিয়ে দিলো শব্দ করে। কিছু একটা বলল শান্তকে। একপলক ফিরে তাকিয়ে ওভাবেই দলবল নিয়ে বড়ো গাড়িটাতে চড়ে চোখের পলকে বেরিয়ে গিয়েছে….


চলবে ~~
® নাবিলা ইষ্ক।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply