#অ্যাঞ্জেল_অ্যাঞ্জেলিনা
[পর্ব ৭২] [প্রথম অংশ]
#লেখিকা_ফারহানা_নিঝুম
( দূর্বল হৃদয়ের পাঠকদের জন্য গল্পটা একদম নয় এবং প্রাপ্তমনস্কদের জন্য উন্মুক্ত)
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)
(দ্বিতীয় খন্ড)
“হোয়াই ম্যান? হোয়াই? কেন করছো আমাদের সাথে এমন? এতগুলো বছর ধরে এভাবে শাস্তি দিচ্ছো? কোন পাপের শাস্তি?”
মিস্টার আলবার্টের আর্তনাদ শুনে পৈশাচিক আনন্দ হচ্ছে আফরিদ এহসানের। সে এটাই চেয়েছিল ,এই সায়েন্টিস্টদের সে একেবারে নয়! ক্ষণে ক্ষণে মারবে! কষ্ট দেবে ,ঠিক যেমন কষ্ট পেয়েছিল তার কেউ!
আফরিদ হেড চেয়ারে বসে হিসহিসিয়ে বলল।
“খুব কষ্ট হচ্ছে মিস্টার আলবার্ট? খুব কষ্ট? আমারো হয়েছিল এমন কষ্ট যখন আপনি..
বাকিটুকু বলতে পারলো না আফরিদ ,চোখ বুজে নিল শক্ত করে। পরক্ষণেই রোষে ফেটে পড়ল।
“এভাবেই ক্ষণে ক্ষণে, তরপিয়ে তরপিয়ে শেষ করব আপনাকে!”
মিস্টার আলবার্টের কাঁপা কাঁপা স্বর ভেসে এল।
“আমার মেয়েটা কেমন আছে? ওকে তো তুমি দেখালে না আমাকে!”
এতগুলো বছর কা’টিয়ে দিয়েছেন তিনি একটিবার চোখে দেখা ছাড়াই। যে মেয়েটি সাত বছরের কচি ডানাপনা নিয়ে একদিন তার হাত ছেড়ে চলে গিয়েছিল, সে আজ কতটা বড় হয়েছে, কতটাই বা বদলে গেছে এই প্রশ্নগুলো প্রতিদিন তাকে ভিতর থেকে খুঁড়ে খুঁড়ে খেয়েছে। পিতৃত্ব যেন বছরের পর বছর অবহেলিত ক্ষ’তের মতো ব্যথা হয়ে বসে আছে বুকের মাঝে।
আফরিদ মৃদু দুলে হেসে উঠল। সেই হাসিতে যেন নিষ্ঠুরতার ঢেউ। চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়িয়ে মাথা একটু কাত করে বলল।
“সে তো বড়ই হয়ে গেছে! অদ্ভুত সুন্দর, অসম্ভব আদুরে। দেখে মনে হবে দুনিয়ার সেরা মেয়ে।”
কথা গুলো ছু’রি হয়ে বিঁধল আলবার্টের হৃদয়ে। আপন সন্তানের মুখ একটিবার দেখার আকাঙ্ক্ষা অস্থির করে তুলল তাকে। চোখে ঝিলমিল করে উঠল ব্যাকুলতা, অধীরতা, প্রায় কান্নার মতো একটা ভেজা আলো।
আফরিদ তা দেখে আরও উঁচু করে ঠোঁট বাঁকাল।
“দেখতে মন চাইছে, তাই না? আই নো দ্যাট।”
তারপর পকেট থেকে ফোন বের করে একটা মেয়ের চোখের ছবি খুলল একজোড়া বিস্ময়ভরা চোখ, যেন আদর আর নিষ্পাপতা দিয়ে বানানো। ছবিটা চোখের সামনে ধরতেই আলবার্টের বুকের ভেতর ঝড় বয়ে গেল। মুখটা দেখার অস্থিরতায় তার হাত নিজে থেকেই ফোনের দিকে এগিয়ে গেল।
কণ্ঠ যেন শুকিয়ে যাওয়া নদীর মতো। তিনি তার মেয়েটাকে দেখার জন্য ছটফট করছেন।
“একটু তাকে দেখতে দাও।”
কিন্তু ঠিক সে মুহূর্তেই আফরিদ ঝটকা দিয়ে ফোনটা পেছনে সরিয়ে নিল। চোখে পৈশাচিক উচ্ছ্বাস, ঠোঁটে খেলার মতো এক অভিসারী হাসি।
“তড়পাও, মিস্টার আলবার্ট। তড়পাও। নিজের মেয়েকে দেখার স্বপ্নটাকে আজীবন ভুলে যাও।”
এক মুহূর্তে পৃথিবীটা ঝাপসা হয়ে এল আলবার্টের চোখে। দুঃখে, গ্লানিতে, অপমানের শীতে বুকে যেন পাথর চাপা পড়ল। তার মুখের ক্লেশ, চোখের জল, আর নীরব আর্তনাদ সব মিলিয়ে জমাট হয়ে উঠল বেদনার এক ভারী স্তর। কি অপরাধ তার? কি অপরাধ? সেই নির্মম রাতটি না আসতো তার জীবনে তাহলে হয়তো আজ নিজের স্ত্রী এবং সন্তান কে নিয়ে তিনি সুখে শান্তিতে বসবাস করতেন।
________________
স্পেন বার্সেলোনা…
ভ্যানটি চলতে শুরু করে নিজের নিয়মে, ধীর অথচ অমোঘ গতিতে। লোহার হাতকড়া রাইসার কবজিতে ঠান্ডা ছাপ রেখে যায়, যেন আগেই তাকে জানিয়ে দিচ্ছে সামনে কী অপেক্ষা করছে। ভেতরে বন্দিদের গাড়ির বাতাস ভারী, নিঃশ্বাসে মিশে আছে অপরাধ, অনুশোচনা আর অনুচ্চারিত আতঙ্কের গন্ধ। পেছনে পেছনে পুলিশের গাড়ি, লাল-নীল আলো ছড়িয়ে পড়ছে রাস্তায় স্বাধীনতার শেষ চিহ্নের মতো।
আরো প্রায় এক ঘণ্টা। তারপরই পৌঁছানো হবে সেই হাই-সিকিউরিটি ডিটেনশন ফ্যাসিলিটিতে। শহরের কোলাহল ফেলে রেখে, পাহাড়ের বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা কোল্ড স্টোন প্রিজন যেখানে মানুষকে জীবিত রেখেই বরফে আটকে রাখা হয়। দিনরাত নজরদারি, একাকী কোয়ারেন্টাইন সেল, দেয়ালের ওপাশে শুধু নিস্তব্ধতা আর সময়ের নিষ্ঠুর ধীরগতি।
কিছুক্ষণ আগেই পোঁছেছে তারা। ন্যান্সি কে একা একটা সেলে বন্দি করা হয়েছে। আশেপাশে লেডিস কনস্টেবল রয়েছে। সেই সময় আগমন ঘটে ইস্ক্রিয়াসের। ইস্ক্রিয়াস প্রবেশ করতেই বাকিরা বেরিয়ে গেল। এবারে তার সম্পূর্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রাইসার উপর।
রাইসা ওমন চাহনি দেখে ফিচলে হাসে। পাগল ইন্সপেক্টর তাকে ভালোবাসে, মারাত্মক ভালোবাসে।
ইস্ক্রিয়াস দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো মেয়েটার দিকে। ইচ্ছে তো করছে বুকের সাথে জড়িয়ে পিষে ফেলতে কিন্তু দায়িত্ব আর নিয়মের বেড়াজালে বাধা তার হাত দুটো।
“আজ থেকে এখানেই তো দিন কা’টবে!”
রাইসা শুনলো, প্রত্যুত্তরে শুধু মাথা দোলায়।
ইস্ক্রিয়াস ফের বলল।
“আজকের পর থেকে বাইরের দুনিয়া তোমার জন্য নিষিদ্ধ।”
রাইসা এবারেও হাসলো। হাসতে গিয়ে চোখের কোল ঘেঁষে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।বড় ব্যথাতুর কন্ঠে বলে উঠে।
“তবে তুমি নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা দিলে?”
ইস্ক্রিয়াস শক্ত কন্ঠে বলল।
“এখানেও তুমি সুরক্ষিত নও।”
রাইসা কিয়ৎক্ষণ চুপ থেকে বলল।
“বাইরের দুনিয়াটা সুরক্ষিত ছিলো কবে? এরচেয়ে এখানে আমি সুরক্ষিত।”
ইস্ক্রিয়াস ধুমধাম পা ফেলে এগিয়ে এসে শক্ত করে বাহু চেপে ধরে।
ব্যাথায় ককিয়ে উঠলো মেয়েটা।
“তুই ভীষণ বাজে একটা মেয়ে রাইসা। আমার ইমোশন নিয়ে খেলা করেছিস!”
প্রত্যুত্তরে রাইসা নিষ্প্রভ চোখে তাকায় ইস্ক্রিয়াসের দিকে। অনূভুতি শূন্য কন্ঠে বলে।
“আর তুমি আমার শরীর নিয়ে খেলা করলে, ইন্সপেক্টর।”
ইস্ক্রিয়াস কিড়মিড়িয়ে কিছু বলতে চাইলো তার পূর্বেই আবারো রাইসা বলে উঠে।
“যেভাবে চার বছর আগে একদল জানোয়ার আমার দেহ,মন অন্তর কলুষিত করেছিল ঠিক সেইভাবে।”
স্তম্ভিত হয় ইস্ক্রিয়াস।
“মানে? কি বলতে চাইছো তুমি?”
রাইসা কিছু বলতে পারলো না। দৃষ্টি জোড়া ঝাপসা হয়ে আসছে, অতঃপর দেহ আর এই সবকিছুর ভার সইতে পারলো না। লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।
“রাইসা? রাইসা? হেই কিউটিপাই কি হলো তোমার?”
অস্থির হয়ে উঠে ইস্ক্রিয়াস। কিন্তু রাইসা যে কথা বলে না।
___________________
নিঃশব্দ দুপুর ধীরে ধীরে বিকেলের প্রান্তর স্পর্শ করতে উদ্যত। বহিরাঙ্গন যেন সূর্য মামা ক্রোধে দগ্ধ এক প্রান্তর। প্রখর সূর্যালোকের দহনময় স্বর্ণালি কিরণ চারদিককে রুক্ষ ও শুষ্ক করে তুলেছে। বৃক্ষরাজির ক্লান্ত পত্রপল্লব একে একে শাখা ত্যাগ করে ভূমিতে ঝরে পড়ছে, সামান্য বায়ুপ্রবাহেই ধূলিকণার ন্যায় উড়ে যাচ্ছে দূরে। উত্তপ্ত মৃত্তিকার বুকে খালি পদক্ষেপ রাখার সাহস কারোর নেই; যেন প্রতিটি কণা আগুনের শিখা ধারণ করে আছে। অথচ সেই অসহনীয় তাপপ্রবাহের সম্পূর্ণ বিপরীত এক পরিবেশ বিরাজমান এহসান মঞ্জিলের সুবিশাল পাকশালায়।
সেখানে আজ ব্যস্ত ইলহাম ন্যান্সি অ্যাঞ্জেলিনা।
মঞ্জিলের অসংখ্য সার্ভেন্ট ও সেফ থাকা সত্ত্বেও আজ সে নিজেই নেমেছে রান্নার আয়োজনে। বারংবার বাধা দিয়েছে কর্মরত নারীরা।
“ম্যাডাম, দয়া করে আমাদের করতে দিন। স্যার যদি জানতে পারেন, ভীষণ অসন্তুষ্ট হবেন।”
কিন্তু আজ যেন কোনো যুক্তিই গ্রহণযোগ্য নয় ন্যান্সির কাছে।একগুঁয়ে দৃঢ়তায় সমস্ত আপত্তি উপেক্ষা করে সে নিজেই রন্ধনকার্যে নিমগ্ন।তার পার্শ্বে ছায়ার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে তিতলি। ক্ষুদ্র দুটি হাতে যতটুকু সম্ভব সহায়তা করার প্রাণান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছে সে।অপরদিকে প্রাসাদের অন্য এক প্রান্তে নিঃশব্দ দিনযাপন করছেন কল্পনা এহসান।স্বামীর মৃ’ত্যুর পর মাত্র এক সপ্তাহ অতিক্রান্ত হয়েছে, অথচ এই ক্ষুদ্র সময়ের ব্যবধানেই যেন বহু বছরের বার্ধক্য নেমে এসেছে তাঁর অবয়বে।
যে নারী একসময় পরিপাটি সাজসজ্জা, আভিজাত্য আর প্রাণোচ্ছ্বল উপস্থিতিতে চারপাশ আলোকিত করতেন, আজ তিনি ভগ্নপক্ষ দোয়েলের মতো নিশ্চুপ।
চোখের নিচে গাঢ় ক্লান্তির ছাপ, মুখমণ্ডলে বিষণ্ণতার রেখাচিত্র।অগোছালো কেশরাশি আর বিবর্ণ চাহনি যেন তাঁর অন্তর্গত শোকের ভাষ্য হয়ে উঠেছে।সাজগোজ, হাঁটাহাঁটি, হাসি সবকিছু থেকেই নিজেকে নির্বাসিত করে ফেলেছেন তিনি।
তিতলি হঠাৎ ন্যান্সির দিকে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,
“ইলহাম আপি, তুমি দয়া করে রুমে চলে যাও। এখানকার সব আমি সামলে নেব। ভাই যদি এসে দেখে তুমি রান্না করছো, খুব রেগে যাবে।”
ন্যান্সি কটাক্ষে তাকালো তার দিকে।হাতে ধরা ধারালো ছুরির সাহায্যে টমেটোগুলো নিখুঁত ভঙ্গিতে কর্তন করতে করতে বলল,
“হ্যাঁ, তোমাদের ভাইকে আমি খুব ভয় পাই! আশ্চর্য! কতক্ষণ আর মানুষ এভাবে শুয়ে-বসে থাকতে পারে? আর কয়দিন এভাবে চললে তো আমি অকালে কবরেই চলে যাব।”
তিতলি কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।তার কর্ণযুগল হঠাৎই সজাগ হয়ে উঠেছে।দূর থেকে ভেসে আসছে ভারী পদক্ষেপের শব্দ।পরক্ষণেই দ্রুতপদে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করল সাব্বির।ন্যান্সি আড়চোখে একবার তাকিয়ে পুনরায় নিজের কাজে মনোনিবেশ করল।
সাব্বির প্রবেশ করেই কর্কশ স্বরে বলে উঠল,
“এই মেয়ে! ওখানে দাঁড়িয়ে কী দেখছিস? যা, এক গ্লাস পানি নিয়ে আয়।”
তিতলি মাথা নত করে এগিয়ে যেতে উদ্যত হলো। কিন্তু তার পূর্বেই বজ্রকঠোর কণ্ঠে বাধা দিল ন্যান্সি।
“এক মিনিট!”
ন্যান্সির দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।
“এখানে কী হচ্ছে, সাব্বির? ও কি তোমার ব্যক্তিগত চাকর? কেন ওকে আদেশ করছো?”
সাব্বির বিরক্তির সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“তাহলে কি ও এই বাড়ির সদস্য?”
ন্যান্সি হাতে ধরা ছুরিটা দেখিয়ে নিরুত্তাপ অথচ দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিল,
“প্রথমত, গলার স্বর নিচে নামাও। উচ্চস্বরে কথা বলে নিজের অভদ্রতা প্রকাশ করার কোনো প্রয়োজন নেই। দ্বিতীয়ত, হ্যাঁ ও এই পরিবারেরই একজন সদস্য। ঈশান ভাইয়ার হবু স্ত্রী।”
সাব্বিরের মুখমণ্ডলে অসন্তোষের ছায়া আরও গাঢ় হয়ে উঠল।চোয়াল শক্ত করে বলল,
“দু’জনই একই ধরনের। ঈশান ভাইয়ের চামচা, আর এই মেয়েটা তোমার চামচা।”
“সাব্বির!”
ন্যান্সির ধমক যেন মুহূর্তে পরিবেশ বিদীর্ণ করে দিল।
তার নয়নযুগল কঠোর হয়ে উঠল।
“আর একটা অবমাননাকর শব্দ উচ্চারণ করলে এমন থাপ্পড় দেব যে দাঁত গুনতে হবে। তখন আমি ভুলে যাব তুমি আমার চেয়ে বয়সে বড়। সীমা অতিক্রম করো না। ঈশান কে আমি আমার ভাই বলি,আর আমি আফরিদ এহসানের স্ত্রী। তার স্ত্রীর আত্মীয়কে অপমান করার দুঃসাহস হয় কি করে তোমার?”
সাব্বির এবার সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেল। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠছে বুঝে তিতলি কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“প্লিজ আপি, ছেড়ে দাও। আমি পানি এনে দিচ্ছি।”
ন্যান্সি দৃঢ়স্বরে বলল,
“একদম নয়।”
অতঃপর শীতল তাচ্ছিল্যে সাব্বিরের দিকে তাকিয়ে যোগ করল,
“ও এমন কোনো মহৎ কর্ম করে আসেনি যে তাকে পানি হাতে দাঁড়িয়ে সেবা করতে হবে। ভার্সিটিতে গিয়ে মারামারি, নেশা, গাঁজা, ড্রাগস এগুলোই তো তার প্রধান কৃতিত্ব।”
কথাগুলো যেন দাউদাউ আগু’নে হুতি দিল।সাব্বিরের মুখ ক্রোধে রক্তাভ হয়ে উঠল।আর এক মুহূর্তও সেখানে অবস্থান না করে সে তিতলির দিকে একবার দৃষ্টিপাত করল।তারপর প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে ভারী পদক্ষেপে সিঁড়ির দিকে অগ্রসর হলো। ধুপধাপ শব্দ তুলে একের পর এক সিঁড়ি অতিক্রম করতে লাগল সে। আর নিচে দাঁড়িয়ে রইল ন্যান্সি অবিচল, নির্ভীক, দৃঢ়চেতা। যেন সামান্য ঝড়ে নত না হওয়া কোনো প্রাচীন অশ্বত্থ বৃক্ষ।
তপ্ত এক দীর্ঘশ্বাস নিঃসৃত হলো ন্যান্সির অধরযুগল হতে।
না, এভাবে আর চলতে পারে না।
আর কতদিন তিতলি এই অনিশ্চয়তার দোলাচলে ঝুলে থাকবে? সময় এসেছে সম্পর্কটিকে একটি বৈধ পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়ার। ঈশান ও তিতলির বিবাহের আয়োজন এখন আর বিলম্বিত করার অবকাশ নেই।
ঠিক সেই সময়েই বহিরাঙ্গনে ভেসে এলো গাড়ির আগমনী শব্দ। তিতলি প্রায় ছুটে গেল সদর দরজার দিকে।
আফরিদ ও ঈশান ফিরেছে। গাড়ি থেকে নামতেই আফরিদ এক পলকের ইশারায় কিছু জানিয়ে দিল ঈশানকে। ইঙ্গিত বুঝে ঈশান আর এক মুহূর্তও অপচয় না করে নিজ কক্ষের দিকে অগ্রসর হলো।
তার পিছনে ছায়ার ন্যায় অনুসরণ করল তিতলি।
আফরিদও সিঁড়ির দিকে অগ্রসর হচ্ছিল।কিন্তু হঠাৎই তার পদক্ষেপ থমকে গেল। দৃষ্টি ঘুরে স্থির হলো কিচেনের দিকে।
সেখানে দাঁড়িয়ে আছে ন্যান্সি। মুখভরা নির্মল হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। এক মুহূর্ত স্থির থেকে পথ পরিবর্তন করল আফরিদ। উপরতলায় আর গেল না।
কাঁধ থেকে স্যুট খুলে সোফার উপর নিক্ষেপ করে ধীরপদে এগিয়ে গেল ন্যান্সির নিকট।
শার্টের হাতার বোতাম খুলে গুটাতে গুটাতে বলল,
“তুই এখানে কী করছিস? এই মাতারি, তোকে কিছু জিজ্ঞেস করছি না?”
ন্যান্সি নির্বিকার ভঙ্গিতে টমেটোগুলো ধুয়ে কর্তন করতে করতে বলল,
“রান্না করছি।”
আফরিদের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো।দৃষ্টিতে স্পষ্ট অসন্তোষ।ন্যান্সি সেই অভিব্যক্তি দেখে মৃদু হেসে ফেলল।
আফরিদ গম্ভীর স্বরে বলল,
“এই বাড়িতে কি সার্ভেন্টের অভাব পড়েছে? কোথায় গেছে সবাই? এই,,,
“আস্তে।”
তাৎক্ষণিকভাবে থামিয়ে দিল ন্যান্সি।
“এভাবে চিৎকার করছেন কেন? কাউকে আসতে হবে না।”
আফরিদ ভ্রুকুটি করল।ন্যান্সি শান্ত কণ্ঠে বলল,
“সারাদিন শুয়ে-বসে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে গেছি, এহসান। তাই কাজ করছি। ওরা আমাকে করতে দেয়নি, আমিই জোর করেছি।”
কথা বলতে বলতে ছুরি চালিয়ে টমেটো কাটছিল সে।
আফরিদ গভীর মনোযোগে কিছুক্ষণ লক্ষ্য করল কর্তনের ধরন। অতঃপর নিঃশব্দে তার পেছনে এসে দাঁড়াল।
তার বিশাল দু’টি করতল আলতো করে স্পর্শ করল ন্যান্সির হাত। স্থির করে দিল ব্যস্ত আঙুলগুলো।
তারপর ধীরে ছুরিটি নিয়ে নিল নিজের হাতে।
“এত বসে থাকতে কষ্ট হলে আমার কাছে চলে আসতি।”
গভীর স্বরে বলল সে।
“সারাদিন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাকে চুমু দিতি।”
ন্যান্সি অধর কামড়ে হাসি চেপে রাখার চেষ্টা করল।
অবশেষে ছু’রিটি ছেড়ে দিল। আফরিদ নিপুণ দক্ষতায় একের পর এক টমেটো কেটে ফেলতে লাগল।
ন্যান্সি বিরক্ত হলো। লোকটা যেন কিছুতেই তাকে কাজ করতে দেবে না! সে চাল নিয়ে ধুয়ে হাঁড়িতে বসিয়ে দিল।
এরপর কয়েকটি আলু হাতে তুলে নিয়ে আবার ছুরি ধরল।
হঠাৎ বলল,
“আপনার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।”
আফরিদ স্বভাবসুলভ নির্লিপ্ততায় উত্তর দিল,
“বলে ফেল।”
ন্যান্সি কিছুটা ইতস্তত করে বলল,
“ঈশান ভাইয়া আর তিতলির ব্যাপারে ভেবেছেন?”
আফরিদ ভ্রু উঁচু করল।
“কী নিয়ে ভাবব?”
ন্যান্সি হতাশ হয়ে গেল।পরক্ষণেই বিরক্ত স্বরে বলল,
“কী নিয়ে ভাববেন মানে? ওদের বিয়ে দেবেন না? আর কতদিন এভাবে থাকবে? দ্রুত ব্যবস্থা করুন।”
আফরিদ অত্যন্ত সন্তর্পণে আবারও তার হাত থেকে ছুরিটি নিয়ে নিল। এতক্ষণ ধরে ন্যান্সির আলু কাটার পদ্ধতি পর্যবেক্ষণ করছিল সে। এবার নিজেই কাটতে শুরু করল।
“কিন্তু ওরা তো সারাদিন ঝগড়া করে।”
কথাটি শুনে ন্যান্সি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল।
চোখ গোল করে তাকিয়ে বলল,
“আমিও তো আপনাকে সারাদিন বকাবকি করি, ঝগড়া করি। তবুও ঘুরেফিরে আমার কাছেই আসেন।”
আফরিদের মুখমণ্ডল মুহূর্তে গম্ভীর হয়ে উঠল।
“তুই কি আমাকে অপমান করলি?”
“না। সম্মান দিলাম।”
অত্যন্ত গম্ভীর ভঙ্গিতে উত্তর দিল ন্যান্সি।
কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে হেসে ফেলল আফরিদ।
আর ন্যান্সি বিরক্ত কণ্ঠে বলে উঠল,
“সমস্যা কী আপনার? ছুরি নিয়ে এত টানাটানি করছেন কেন? আমাকে কিছুই করতে দিচ্ছেন না!”
আফরিদ আলুগুলো নামিয়ে রেখে ধীরস্বরে বলল,
“হাত কেটে গেলে কী হবে?”
ন্যান্সি পুনরায় ছুরিটি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করল।
কিন্তু আফরিদ দিল না।হঠাৎই সে ন্যান্সির বাহু আঁকড়ে ধরল। অন্য হাতে ধরা ছুরির ভোঁতা অংশ এনে গলার কাছে ঠেকিয়ে দুষ্টু স্বরে বলল,
“মেরে দিই?”
ন্যান্সি নির্বিকার চোখে তাকিয়ে রইল।
“দিন, মেরে দিন।”
আফরিদ ভ্রু কুঁচকাল।তারপর মুখ নামিয়ে ন্যান্সির নাকে নাক ঘষে মুচকি হেসে বলল,
“একদিন এভাবেই মে’রে ফেলব, বান্দি।”
ন্যান্সি মুখ বিকৃত করল।
“একদিন আমিই মে’রে দেব আপনাকে। ফাজিল, অসহ্য লোক!”
আফরিদ হেসে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। তার কণ্ঠে অদ্ভুত কোমলতা।
“তোর হাতে এই এহসান মরতেও রাজি।”
ন্যান্সি মুখ বাঁকিয়ে তাকে সরিয়ে দিল।পুনরায় রান্নার কাজে মনোনিবেশ করল।কিন্তু আফরিদের দৃষ্টি যেন সরল না।খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল সে ন্যান্সিকে।
হঠাৎই অত্যন্ত নিকটে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
“শোন।”
“হ্যাঁ?”
“তোকে আজ ভীষণ বউ-বউ লাগছে, পরাণ।”
ব্যস্ত হাতদুটি মুহূর্তে থেমে গেল।চমকে ফিরে তাকাল ন্যান্সি।আফরিদ কিছুক্ষণ গভীর মনোযোগে তার মুখখানি নিরীক্ষণ করল। অতঃপর ঠোঁট কামড়ে যেন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছে বলল,
“তোর নাকে একটা নাকফুল থাকা অত্যন্ত জরুরি, বান্দি।”
কথাটি শুনে ন্যান্সির নয়নতারা বিস্ময়ে বিস্ফারিত হয়ে উঠল।
মুহূর্তের জন্য ভাষা হারিয়ে ফেলল সে। শুধু স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেই রহস্যময় নীলাভ চক্ষুযুগলের দিকে যেন সেখানে লুকিয়ে আছে অগণিত অপ্রকাশিত অনুভূতির গল্প।
চলবে……..।
#অ্যাঞ্জেল_অ্যাঞ্জেলিনা
[পর্ব ৭২] [দ্বিতীয় অংশ]
#লেখিকা_ফারহানা_নিঝুম
( দূর্বল হৃদয়ের পাঠকদের জন্য গল্পটা একদম নয়।)
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)
(দ্বিতীয় খন্ড)
“আমি এক ধ’র্ষিতা ইন্সপেক্টর!”
ইস্ক্রিয়াস নিরুত্তর, বাকরুদ্ধ।
এমন কিছু নিজের সম্পর্কে বলার পর কি কেউ কথা বলতে পারে? চাইলেও কি জিজ্ঞেস করতে পারে? ইস্ক্রিয়াসও পারেনি। কোনো রকম প্রশ্ন করতে পারেনি।
তবে তাকে ওতটা প্রশ্ন করার বেগ পোহাতে হয়নি। তার আগেই সামনে বসে থাকা রমণী বলতে লাগলো।
“আমিও কারো মেয়ে ছিলাম , রাজকন্যা ছিলাম ইন্সপেক্টর। আমাকেও কোনো একজন বাবা খুব আদরে বড় করেছিল। এতটাই আদরে বড় করেছিল যে দুঃখ নামক শব্দটির সাথে পরিচয় ছিলো না। হওয়ার কথাও নয়। তার মহলের রাজকন্যা ছিলাম আমি।”
রাইসা থামলো , শুকনো হেসে ফের বলল।
“অবাক হচ্ছেন আমার কথা শুনে তাই না? আচ্ছা ইন্সপেক্টর আমাকে কেন বাঁচিয়ে রেখেছেন বলুনতো? আমাকে তো বাঁচিয়ে রাখার কারণ নেই! আমি আপনাকে ঠকিয়েছি। ভালোবাসার নাম করে দিনের পর দিন মিথ্যের আশ্রয় নিয়েছি। আপনি কেন আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন?”
ইস্ক্রিয়াস কিড়মিড়িয়ে বলে উঠে।
“মোদ্দা কথা থেকে তুমি সরে যাচ্ছো ,রাইসা!”
রাইসা চোখ বুঁজে। চোখের কোল ঘেঁষে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। দেয়ালে মাথা হেলিয়ে বলে।
“আমার ইচ্ছে করছে না বলতে। খুব করে মনে হচ্ছে আমার অতীত জানতে পারলে তোমার গা গুলিয়ে উঠবে ইন্সপেক্টর! তোমার ঘেন্না লাগবে এটা ভেবেই তুমি আমার মতো মেয়েকে ছুঁয়েছো!”
ইস্ক্রিয়াস তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়লো , নিষ্প্রভ চোখে তাকিয়ে আছে রাইসার দিকে। মেয়েটা চোখ বুঁজে রয়েছে।
নিজের একেবারে নিকটে কারো উপস্থিতি টের পেতেই রাইসা ধীরে দৃষ্টি মেলে তাকাল। শ্বাসের উষ্ণতা এসে ঠেকছে তার মুখে , অচেনা নয়, ভয় আর আশ্বাসের মাঝামাঝি এক অদ্ভুত অনুভব। ইস্ক্রিয়াস নীরবে তার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে, সেই দৃষ্টিতে প্রশ্ন কম, অনূভুতির ছড়াছড়ি বেশি। ডান হাত তুলে আলতো করে রাইসার গালে ছুঁয়ে দিল বুড়ো আঙুল যেন ছোঁয়াটুকুই বলে দিতে চায়, সে একা নয়।
কণ্ঠটা সহজ, নিখাদ।
“খুব কষ্ট হচ্ছে?”
এই প্রশ্নটাই যেন বাঁধ ভাঙাল। রাইসার চোখের কোণ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। এতদিন কেউ এমন করে জিজ্ঞেস করেনি কেউ জানতে চায়নি তার ব্যথার খবর, তার ক্লান্তির হিসাব। বুকের ভেতর জমে থাকা কান্না হাত-পা ছড়িয়ে বেরিয়ে আসতে চায়, গলা জড়িয়ে অভিযোগের পাহাড় উগরে দিতে চায়।
তার মনে হয় বলতে পারলে বলত,
“আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, ইন্সপেক্টর। অসহ্য কষ্ট। প্রতিদিন আঘা’তের ভার বয়ে নিয়ে চলেছি। এই ক্ষ’তগুলো আর বইবার শক্তি নেই আমার। আমি ক্লান্ত, ভীষণ ক্লান্ত।”
কিন্তু ঠোঁট নড়ে না। শব্দরা গলা পেরোতে পারে না। রাইসা চুপ করেই থাকে নীরবতার ভেতর তার ভাঙা হৃদয়ের আর্তনাদ গোপন রাখে।
ইস্ক্রিয়াস আরও কাছে ঝুঁকে আসে। চোখের পাশে এক ফোঁটা চুমু এঁকে দেয় । তাতে আছে কেবল আশ্বাস। নিখাদ ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। অতঃপর ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে।
“সব বলে দাও, কিউটিপাই। আমি তোমাকে বাঁচিয়ে নেব। কোনো দোষ তোমার নয় কখনোই না। খুব যত্নে, খুব আদরে তোমাকে নিজের কাছে রাখব। তোমার অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সব আমার হবে।”
কথা গুলো রাইসার বুকে গিয়ে ধাক্কা খায় ব্যথার ওপর নরম কোনো হাতের পরশের মতো।
রাইসা চুপ থাকে, ইস্ক্রিয়াস বুঝে উঠতে পারে না মেয়েটা কেন চুপ আছে? কেন বলছে না কিছু? ইস্ক্রিয়াস তো তাকে ছাড়বে না উল্টো নিজের ভালোবাসায় সব ভুলিয়ে দেবে।
ইস্ক্রিয়াস নিচু হয়,রাইসার ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো। আলগোছে স্পর্শ করে চলেছে। কম্পিত হয় রাইসার সর্বাঙ্গ। রাইসা নিশ্চুপ , ঠোঁটে ঠোঁট রেখে ব্যথা আস্বাদন করে চলেছে। হোক না একটুখানি ভুল, দায়িত্বের বাইরে গিয়ে না হয় নিজের অস্তিত্ব খুঁজে নিলো। তার আপন মানুষটিকে একটুখানি বুঝতে চাইলো! তাতে ক্ষতি কি?
_________________
তিতলি ও ঈশানের বৈবাহিক আয়োজনকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যেই প্রাথমিক পরামর্শপর্ব সমাপ্ত করেছে আফরিদ এহসান। আগামী মাসের সূচনালগ্নে আর মাত্র সাতটি দিবস অবশিষ্ট, আর সেই সপ্তম দিবসেই নির্ধারিত হয়েছে তাদের শুভ পরিণয়ের দিনক্ষণ।
এই সংবাদে ন্যান্সি ও স্মাইলির উচ্ছ্বাস যেন সীমা মানতে চাইল না। বিশেষত স্মাইলির জন্য বিষয়টি ছিল এক অভিনব অভিজ্ঞতার প্রতিশ্রুতি। বাঙালির ঐতিহ্যবাহী বিয়ের উৎসব সে কখনো প্রত্যক্ষ করেনি; অতএব এই সুযোগ তার নিকট ছিল এক সাংস্কৃতিক বিস্ময় দর্শনের সমতুল্য।
অপরদিকে, বিবাহের তারিখ চূড়ান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঈশানের মুখমণ্ডল হতে উধাও হয়ে গেল স্বাভাবিক রঙ। আনন্দের পরিবর্তে তার দৃষ্টিতে ঘনীভূত হলো উদ্বেগের ছায়া। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিয়ে কি আদৌ সমীচীন? রাইসা এখনো ইন্সপেক্টর ইস্ক্রিয়াসের হেফাজতে বন্দিনী। এমন অবস্থায় ব্যক্তিগত সুখের কথা ভাবতেও তার অন্তর সংকুচিত হয়ে আসে।
ধরণীর বক্ষে ততক্ষণে নেমে এসেছে রজনীর নীরব আধিপত্য। অস্তগামী সূর্য তার রক্তাভ আবরণ গুটিয়ে নিয়েছে, আর আকাশের শীর্ষে অধিষ্ঠিত হয়েছে ধবল চন্দ্র। বাইরে মিহি বৃষ্টিধারা আর মাদকতাময় বাতাস মিলেমিশে সৃষ্টি করেছে এক রহস্যাবৃত পরিবেশ।
এই সময় স্টাডি রুমে একাকী অবস্থান করছিল আফরিদ এহসান। সাম্প্রতিক সময়ে এই কক্ষটিই যেন তার নীরব আশ্রয়স্থল। ভেতর থেকে দরজাটি সুরক্ষিতভাবে বন্ধ করে সে একটি নির্দিষ্ট বাটনে স্পর্শ করল। মুহূর্তেই সক্রিয় হলো বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যার ফলে কক্ষের অভ্যন্তরে কী ঘটছে তা বাহির হতে অনুধাবন করা সম্পূর্ণ অসম্ভব।
ধীর অথচ সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপে বুকশেলফের নিকট গিয়ে একটি বই সরিয়ে নিল সে। বইটির পেছনে লুকায়িত ক্ষুদ্র নবটি ঘুরিয়ে দিতেই ভারী বুকশেলফটি শব্দহীনভাবে সরে গেল। উন্মোচিত হলো এক গুপ্ত কক্ষের প্রবেশদ্বার।
আফরিদের মুখাবয়ব তখন গম্ভীরতায় আবৃত।
দ্বার উন্মুক্ত করে সে প্রবেশ করল ভেতরে।
কক্ষটির চার দেয়ালজুড়ে শোভা পাচ্ছে ন্যান্সির অসংখ্য আলোকচিত্র শৈশব থেকে বর্তমান পর্যন্ত প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের নিখুঁত সংরক্ষণ। ছবিগুলোর পাশে লাল কালিতে টানা রয়েছে অসংখ্য চিহ্ন। সেইসঙ্গে রয়েছে মিস্টার আলবার্ট এবং এক রহস্যময় নারীর প্রতিকৃতিও।
একটি হাস্যোজ্জ্বল ছবির সামনে এসে থমকে দাঁড়াল আফরিদ। অত্যন্ত স্নেহমাখা ভঙ্গিতে আঙুল বুলিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“তোকে পাওয়ার জন্য নিজের সঙ্গেই যুদ্ধ করে চলেছি, পরাণ। এই সংগ্রামে যদি পরাজিত হই, তবে তোকে হারাব। আর যদি বিজয়ী হই, তবে তুই নিজের কাছেই পরাজিত হয়ে যাবি।”
অতঃপর ছবিটির উপর আলতো চুম্বন এঁকে মৃদুস্বরে উচ্চারণ করল,
“তোকে অর্জন করার মূল্য যদি তোকে হারানো হয়, তবে সহস্রবার হারিয়েও আমি নিজেকে বিজয়ী করব।”
আরও কিছুক্ষণ গোপন কক্ষে অবস্থান করে প্রয়োজনীয় কার্যাবলি সম্পন্ন করল সে। কারণ সে জানে, অল্প সময়ের মধ্যেই ন্যান্সি তাকে খুঁজতে স্টাডি রুমে আসবে। তার আগেই এই কক্ষ ত্যাগ করা আবশ্যক।
নিজ কক্ষে বেরনোর উদ্দেশ্যে অগ্রসর হয়েও মাঝপথে থমকে দাঁড়াতে হলো আফরিদকে।সোফায় বসে আছে ঈশান। মুখাবয়ব গম্ভীর, দৃষ্টিতে উৎকণ্ঠার ছাপ।
আফরিদ নীরবে এগিয়ে এসে তার সম্মুখে বসল।
“কী রে? মুখখানা বাংলার পাঁচের মতো ঝুলিয়ে রেখেছিস কেন?”
ঈশান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।আফরিদ ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“বিয়ে ঠিক হয়েছে, অথচ আনন্দের লেশমাত্র নেই। তিতলিকে কি সত্যিই পছন্দ নয় তোর?”
ঈশান গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিল,
“এই মুহূর্তে বিয়ে করা কি উচিত, বস? রাইসা টর্চার সেলে আছে। তাকে কিভাবে,,
“ওসব নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না।”
আফরিদের কণ্ঠ দৃঢ়।ঈশান বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকালে সে মৃদু হাসল।
“ইদ্রান ইতোমধ্যেই পুরো পরিকল্পনা সাজিয়ে ফেলেছে। কীভাবে রাইসাকে বের করে আনতে হবে, সব নির্ধারিত।”
ঈশানের কণ্ঠে উৎকণ্ঠা রয়ে গেল।
“কিন্তু ততদিনে যদি রাইসা মুখ খুলে ফেলে?”
আফরিদ ধীরেসুস্থে উঠে দাঁড়াল। স্যুটের ভাঁজ ঠিক করতে করতে বলল,
“খুলবে না। শরীরে প্রাণ থাকা পর্যন্ত সে মুখ খুলবে না।”
তার কণ্ঠে এমন এক অটল আত্মবিশ্বাস ছিল, যা সংশয়কে পর্যন্ত লজ্জিত করে। তবু ঈশানের অন্তর্দহন প্রশমিত হলো না। তার ভয় অন্যত্র। যদি কোনোদিন ন্যান্সি সমস্ত সত্য জানতে পারে? যদি সে আফরিদের অতীতের অন্ধকার প্রকোষ্ঠগুলো দেখতে পায়? সহজ-সরল হৃদয়ের ইলহাম ন্যান্সি অ্যাঞ্জেলিনা মেয়েটি কি এমন নির্মম সত্য মেনে নিতে পারবে?
তৎক্ষণাৎ আফরিদ জায়গা ছাড়লো। সিঁড়ির দিকে অগ্রসর হতে হতে আফরিদ শুধু বলল,
“বিয়ে নিয়ে আনন্দ কর, ঈশান।”
এদিকে বাংলাদেশ থেকে স্পেনের বার্সেলোনাগামী একটি বিশেষ বাহিনী প্রস্তুত করা হচ্ছে।পর্দার অন্তরালে চলছে এক নীরব অথচ ভয়াবহ আয়োজন।এটি কেবল অস্ত্রের প্রস্তুতি নয় এটি শীতল হিসাব, নির্মম কৌশল এবং সময়কে পরাজিত করার সূক্ষ্ম পরিকল্পনার সমষ্টি।
অন্ধকারে নিমজ্জিত এক কক্ষে বসে আছে ইদ্রান।
চারপাশ নিস্তব্ধ। কেবল মোবাইলের স্ক্রিনের আলো তার মুখাবয়বের কিছু অংশ আলোকিত করছে।
একের পর এক কল।একটিরও গুরুত্ব কম নয়।তার কণ্ঠ অস্বাভাবিক শান্ত।আর সেই শান্ততাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
“টাইমলাইন বদলাবে না।”
ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এলো,
“ভুলের সুযোগ শূন্য, বস। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।”
কিন্তু ইদ্রান নিশ্চিন্ত হতে পারল না। আফরিদ একাধিকবার সতর্ক করেছে কোনো ভুল চলবে না।
“বার্সেলোনায় পৌঁছানোর আগেই সব পরিষ্কার চাই।”
ওপাশে সংক্ষিপ্ত উত্তর,
“Yes. Understood.”
হাজার মাইল দূরে অবস্থান করেও যেন প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি নিঃশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করছে ইদ্রান। তার মনের পর্দায় বারবার ভেসে উঠছে একটিই নাম রাইসা।
বার্সেলোনার কোয়ারেন্টাইন সেলের ঠাণ্ডা, জীবাণুমুক্ত দেয়ালের মধ্যে বন্দি এক জীবন। আইনের ভাষায় সে কেবল একজন বন্দিনী। কিন্তু ইদ্রানের কাছে?
সে এক অসমাপ্ত সমীকরণ। এক অপূর্ণ হিসাব।
যে কোনো মূল্যে তাকে বের করে আনতেই হবে।ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলে।সময় দ্রুত নিঃশেষ হচ্ছে।
আর ইদ্রান জানে এই অভিযান সফল হলে বিজয়ের পাল্লা আবারও তাদের দিকেই ঝুঁকবে।
ফোনের শেষ কলটি বিচ্ছিন্ন করে সে নিম্নস্বরে বলল,
“Game on.
“কিসের গেইম, চার্ম?”
প্রিয় কণ্ঠস্বর শুনে মুহূর্তেই চমকে উঠল ইদ্রান।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে স্মাইলি। চোখে অবাধ প্রশ্নের ছড়াছড়ি। নিজেকে সামলে নিয়ে মৃদু হাসল ইদ্রান।
“আমরা তো খুব শীঘ্রই স্পেনে ফিরব। সেই ব্যবস্থাই করছিলাম।”
কথাটি শুনেই স্মাইলির মুখ মলিন হয়ে এলো।এখানেই তো বেশ আছে তারা।ফিরে যাওয়া কি সত্যিই প্রয়োজন?
মেয়েটির অভিব্যক্তি দেখেই তার মনের কথা পড়ে ফেলল ইদ্রান।
সস্নেহে থুতনিতে স্পর্শ করে বলল,
“রিল্যাক্স, প্রিন্সেস। আমরা এখনই ফিরছি না। তোমার যতদিন ইচ্ছে এখানে থাকবে। তারপর ফিরব।”
মুহূর্তেই আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল স্মাইলির মুখ।
সে দু’হাতে জড়িয়ে ধরল তার প্রিয় মানুষটিকে।
আর ইদ্রান অনুভব করল সমস্ত অন্ধকার পরিকল্পনার মাঝেও কিছু মানুষই পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখে।
_______________
“ওভাবে দাঁড়িয়ে কী দেখছেন?”
“তোকে।”
আফরিদ এহসানের শার্ট প্যান্ট গুলো যত্নসহকারে ভাঁজ করে কাবার্ডে গুছিয়ে রাখছিল ন্যান্সি। তার আজকাল আফরিদের কাজগুলো করতে ভালো লাগে ভীষণ। এই যেমন লোকটার জন্য গ্রিন টি বানিয়ে সকাল সকাল হাজির হয়, দুপুরে নিয়ম করে ধমকে বাড়িতে লাঞ্চ করায়। বিকেলে জেদ করে বাগানে গিয়ে দোলনায় বসে এবং পুরুষটিকে দিয়ে দোলনা ঠেলতে বলে। পুরুষটি বিনা বাক্যব্যয়ে তার কথাগুলো মান্য করে। আবার মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে বলবে,
“তুই আমাকে বড্ড জ্বালাচ্ছিস,পরাণ!”
কিন্তু ন্যান্সি মোটেও পাত্তা দেয়না। রাতের বেলায় অহেতুক লোকটাকে বসিয়ে দুনিয়ার সকলে অহেতুক কথাগুলো বলবে। আফরিদ মন দিয়ে তা শুনবে। যখন মেয়েটা ক্লান্ত হয়ে ঝিমুবে ঠিক সেই সময় বুকে টেনে নিয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়বে। ন্যান্সির মাঝে মধ্যে ভীষণ হাসি পায় এসব ভাবলে।
কাজের ফাঁকে অন্যমনস্কভাবে একবার দৃষ্টি তুলতেই তার সমগ্র সত্তা যেন মুহূর্তে স্থবির হয়ে গেল।
দরজার চৌকাঠে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আফরিদ।
গভীর, দুর্বোধ্য, অনিমেষ চাহনিতে সে নিরবচ্ছিন্নভাবে তাকিয়ে আছে কেবল তার দিকেই।
ন্যান্সি ভ্রু কুঞ্চিত করে বলল,
“এভাবে তাকিয়ে থেকে কী লাভ?”
আফরিদের অধরে ধীর এক হাসি ফুটে উঠল।
“লাভ-ক্ষতির হিসাব জানি না, তবে তোকে দেখতে ভালো লাগে।”
কথাটা শুনে অকারণেই হৃদস্পন্দন যেন খানিক দ্রুত হয়ে উঠল ন্যান্সির।
সে কৃত্রিম বিরক্তি প্রকাশ করে বলল,
“আপনি দিন দিন ভীষণ অসহনীয় হয়ে যাচ্ছেন, জানেন?”
আফরিদ এহসান নিম্নস্বরে হাসিতে দুলে উঠল। তার গম্ভীর নীলাক্ষী নিবদ্ধ হয়ে রইল সেই ক্ষিপ্র আঙুলগুলোর ওপর, যেগুলো অপরিসীম মনোযোগে একের পর এক শার্ট ভাঁজ করে নির্দিষ্ট তাকে গুছিয়ে রাখছে।
অদ্ভুত এক অনুভূতি বয়ে গেল তার অন্তরে।
এই চপল, দুর্বিনীত, অবাধ্য রমণীটি কবে যে নিঃশব্দে তার গৃহিণীতে পরিণত হয়েছে, সে নিজেও যেন তার হিসাব রাখতে পারেনি। একসময় যে মেয়েটি প্রতিটি কথায় বিদ্রোহ করত, প্রতিটি নির্দেশে চোখ রাঙাত, আজ সেই একই মেয়ে সংসারের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়েও আপন কর্তব্যবোধে নিমগ্ন।
আফরিদের অধরে পুনরায় হাসির রেখা ফুটে উঠল।
বধূ হয়ে গেল কবে?প্রশ্নটা যেন নিজেকেই করল সে।
এই তো সেদিনও ছিল এক দুর্বার ঝড় অবিন্যস্ত, উচ্ছৃঙ্খল, নিয়মভঙ্গের এক জীবন্ত প্রতিমূর্তি। আর আজ? আজ সে ঘর গোছায়, জামাকাপড় ভাঁজ করে, তার অবহেলায় ফেলে রাখা জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখে, তার ব্যথায় উদ্বিগ্ন হয়, তার অনুপস্থিতিতে অস্থির হয়ে ওঠে।
সময়ের কী নিপুণ কৌশল!অবাধ্যতা কবে যে মমতায় রূপ নিল, তর্ক কবে যে অধিকার হয়ে উঠল, আর দূরত্ব কবে যে সংসারের অন্তরঙ্গতায় বিলীন হয়ে গেল তার কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর আফরিদের জানা নেই। সে কেবল স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ন্যান্সির দিকে।
হয়তো এই দৃশ্যটাই তার সবচেয়ে প্রিয় তার পরাণ, তার দুর্বিনীত বান্দি, আপন মনে সংসারী বধূর মতো শার্ট ভাঁজ করে চলেছে। আর সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখছে, যেন পৃথিবীর সমস্ত প্রশান্তি এসে জায়গা করে নিয়েছে এই সামান্য মুহূর্তটুকুর ভেতর।
“অসহনীয় না, বান্দি। একে বলে আদর্শ রোমান্টিক হাসব্যান্ড।”
ন্যান্সি ঠোঁট বাঁকিয়ে তাকাল।এরই মধ্যে আফরিদ কক্ষে প্রবেশ করে স্বয়ংক্রিয় পাসওয়ার্ড লকে দরজা বন্ধ করে দিল। তারপর হাতে থাকা একটি প্যাকেট ছুড়ে দিল তার দিকে।
প্যাকেটটি এসে সোজা ন্যান্সির মুখে আ’ঘাত করতেই সে বিরক্ত মুখে বিড়বিড় করে কিছু একটা বলল।
অতঃপর মোড়ক খুলতেই বিস্ময়ে তার চোখ বড় হয়ে গেল।
ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো তিনটি অপূর্ব শাড়ি একটি রক্তিম, একটি শুভ্র, আরেকটি মৃদু বাদামি আভামণ্ডিত।
“এগুলো কার?”
বিস্ময়ভরা কণ্ঠে প্রশ্ন করল সে। ব্লেজার খুলতে খুলতে আফরিদ উত্তর দিল,
“আমার প্রতিবেশী শ্বশুরের সুন্দরী মেয়ের জন্য।”
অবচেতনেই ন্যান্সির ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসির রেখা ফুটে উঠল। ভাঙবে তবুও মচকাবে না এই নষ্ট পুরুষ। তবু বাহ্যিক গাম্ভীর্য বজায় রেখে বলল,
“ইশ! এত ভালোবাসা কোথায় রাখি বলুন তো?”
আফরিদ তৎক্ষণাৎ জবাব দিল,
“বালতি এনে দেব? বালতিতে ভরে রাখবি!”
চোখ পাকালো মেয়েটা। আফরিদ ততক্ষনে ঘা ঘেষে এসে দাঁড়ায়, কন্ঠস্বর বদলায় তার, সেথায় দেখা দিলো দুষ্টুমি।
“মাতারি আজকে আমার খুব করে টিটোয়েন্টি ম্যাচ খেলতে ইচ্ছে করছে।”
মতলবটা অনুধাবন করতেই সামান্য গুটিয়ে গেল ন্যান্সি। কপালের মসৃণ ত্বকে কয়েকটি সূক্ষ্ম ভাঁজ স্পষ্ট হয়ে উঠল, যেন নীরব আপত্তির রেখাচিত্র।
“কিন্তু আমার তো মোটেও কোনো আগ্রহ নেই। আজ মুড নেই।”
আফরিদ ধীর ভঙ্গিতে তার সরু কটিদেশ আগলে নিল। অধরের কোণে কৌতুকমিশ্রিত হাসি।
“সেটা নিয়ে ভাবছিস কেন? মুড তৈরির দায়িত্ব আমার।”
ন্যান্সি অনিচ্ছুক ভান করলেও ঠোঁটের কোণে হাসির আভা লুকিয়ে রাখতে পারল না। আফরিদ গভীর দৃষ্টিতে তাকে পর্যবেক্ষণ করে বলল,
“তুই এত নরম কেন,বল তো?”
অভিমানী ভঙ্গিতে নাক সিটকালো ন্যান্সি।
“আমি নরম হতে পারি, কিন্তু আপনি ভীষণ কঠিন প্রকৃতির মানুষ। যেভাবেই ধরেন, মনে হয় ব্যথা পেয়ে বসি।”
আফরিদের হাসি আরও প্রশস্ত হলো। সে আলতো করে মুখ ঝুঁকিয়ে কানের পাশে ফিসফিস স্বরে বলল,
“ব্যথা দেওয়ার মতো আদর যদি করতে না পারি তাহলে কিসের আদর করলাম? নরমের সাথে একটু তো গরম হতেই হয়।”
আফরিদ কথার ফাঁকে ফাঁকে ন্যান্সিকে আয়ত্ত করে নেয়। আফরিদ ওই মসৃণ উদরে হাত ছোঁয়াতেই ন্যান্সির সমস্ত সত্তা কেমন অকারণ অস্থির হয়ে উঠল। আফরিদের স্পর্শে তার শরীরজুড়ে অদ্ভুত এক শিরশিরে অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ছে।
সে অপ্রস্তুত কণ্ঠে বলল,
“আচ্ছা, এমন করছেন কেন? ভীষণ সুড়সুড়ি লাগছে তো!”
আফরিদ মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
“এত সুড়সুড়ি কেন বল তো? মনে হচ্ছে এখনও অনেক রহস্য বাকি আছে উন্মুক্ত করার। আমার বউয়ের এই অদ্ভুত দুর্বলতার সুড়সুড়িদের সমাধান তো করতেই হবে!”
ন্যান্সি দুর্বল হাসলো। আবার সম্পূর্ণ রূপে কন্যাকে আপন বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে মোহাচ্ছন্ন কন্ঠে বলল,
“আজকে একটা নতুন জিনিস শেখাব..
চলবে……….।
Share On:
TAGS: অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা, ফারহানা নিঝুম
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৭
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ১৮
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৩৩
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ২২
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৪১
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৫১
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ১০
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৫৫ (প্রথম অর্ধেক)
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৪৫
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৬০