Golpo romantic golpo অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায়

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৫০


লেখিকাসুমিচৌধুরী

পর্ব ৫০

“ভালোবাসা মানুষকে যেমন শুধরিয়ে দেয় তেমনি ভালোবাসা মানুষকে অন্ধও করে দেয়।”

কারো গম্ভীর কণ্ঠস্বরে সবাই দরজার দিকে তাকাল। ঈশান দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার পিছনে পিছনে শুভ্রাও কক্ষে প্রবেশ করল। শুভ্রা সরাসরি শুভ্রের পাশে গিয়ে বসল। সে বিদ্রুপের সুরে বলল।

“বাবা গো আমি আমার নিজের ভাইকেই চিনতে পারছি না। এই কি আমার সেই ভাই যে রাগ উঠলে পুরো বাড়িতে তাণ্ডব চালাত। সে আজ হাসপাতালের বিছানায় পড়ে আছে। তাও কার জন্য। আমার এই এক গাদি বান্দি বান্ধবী রিদির জন্য। শুধু তাই না রিদিও তো ঠিক এইভাবে হা।”

“শুভ্রা চুপ একদম।”

ঈশানের ধমক খেয়ে শুভ্রা থেমে গেল। ঈশান সবার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল।
“আসলে আমার মনে হচ্ছে বসের এখন একটু বিশ্রাম আর একা থাকা প্রয়োজন।”

সাহেরা চৌধুরী শুভ্রের মাথায় মমতাভরে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন।
“চিন্তার কিছু নেই। সব ঠিক হয়ে গেছে। তোর রিদি তোর কাছেই আছে বাবা।”

একে একে সবাই কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন। এখন ঘরে শুধু ঈশান শুভ্রা আর রিদি। রিদি আগের জায়গাতেই মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার মাথা এখনো নিচু হয়ে আছে। ঈশান শুভ্রার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল।

“শুভ্রা তুমি এখনো বসে আছো। যাবে না?”

“না যাবো না। এখানে বসে বান্ধবী আর হবু দুলাভাইয়ের প্রেমকথন শুনবো।”

ত্যাড়া ভাবে জবাব দিল শুভ্রা। ঈশান ভ্রু কুঁচকে শুধাল।
“হোয়াট?”

“হ্যাঁ।”

শুভ্র আর ঈশান দুজনেই শুভ্রার দিকে চরম বিস্ময়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। ঈশান খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে বলল।
“শুভ্রা। বস কিন্তু তোমার বড় ভাই লাগে।”

“তো কী হয়েছে। এখন ভাইয়ের সাথে দুলাভাইও হয়ে গেছে। ভাই প্লাস দুলাভাই। প্রেম কাহিনি শোনার দিকে ভাই আমার দুলাভাই। আবার সম্মানের দিকে দুলাভাই আমার ভাই।”

শুভ্রার এমন অদ্ভুত যুক্তিতে রিদিও চমকে মাথা তুলে তাকাল। ঈশান যেন কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। শুভ্র এবার হাত নেড়ে ঈশানকে কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করল। ঈশান তীক্ষ্ণ নজরে লক্ষ্য করল শুভ্র আঙুল দিয়ে লেখার ভঙ্গি করছে। অর্থাৎ তার কলম আর কাগজ প্রয়োজন। ঈশান দ্রুত পাশের ডেস্ক থেকে প্যাড আর একটা কলম তুলে নিয়ে শুভ্রর হাতে দিল। শুভ্র কাঁপাকাঁপা দুর্বল হাতে দ্রুত কিছু একটা লিখল। তারপর কাগজটা শুভ্রার মুখের সামনে ধরল। শুভ্রা লেখাটা পড়ল।

“ফালতু কথা না বলে এখান থেকে যা। আমার রিদির সাথে এখন প্রাইভেসি চাই।”

শুভ্রা জেদের স্বরে বলল।
“মোটেও যাবো না আমি। এখানেই বসে তোমাদের প্রেমকথন শুনবো।”

“নির্লজ্জ মেয়ে।”

ঈশান বিড়বিড় করে কথাটা বললেও শুভ্রার কানে পৌঁছাতে একদম সময় লাগল না। সে রাগী চোখে ঈশানের দিকে তাকাল।

“কিছু বললেন?”

“না। আর কী বলবো।”

ঈশান বেশ আফসোস করার ভঙ্গিতে জবাব দিল। শুভ্র কাগজের ওপর পুনরায় দ্রুত কিছু লিখল। শুভ্রা আবারও সেটা পড়ল।

“শরীর দুর্বল কিন্তু হাত না। থাপ্পড় যদি খেতে না চাস তাহলে এখনই এখান থেকে ভালোই ভালোই কেটে পড়।”

শুভ্রা ভয়ে দুইবার ঢোক গিলল। শুভ্র মোটেও ভয় দেখাচ্ছে না। তার ভাই সবসময় সিরিয়াস থাকে এবং যা বলে তা করার ক্ষমতা রাখে। শুভ্রা এবার আমতা আমতা করে বলল।

“একটু থাকি না?”

শুভ্র কাগজের ওপর বড় বড় অক্ষরে লিখল।
“গেট আউট।”

ধমক ছাড়াই শুভ্রের চোখের চাহনি দেখে ঈশান আর শুভ্রা দুজনেই তড়িঘড়ি করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মুহূর্তেই পুরো ঘরটায় এক অদ্ভুত নীরবতা গ্রাস করল। রিদি এখনো আগের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে। তার মাথা নুইয়ে আছে এবং চোখের পাপড়িগুলো থরথর করে কাঁপছে। শুভ্র একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে রইল। দুজনের বুকের ভেতরেই এখন এক অদ্ভুত অনুভূতির তোলপাড় চলছে।

বেশ কিছুক্ষণ এভাবেই কাটল। সময় কতটুকু পার হয়েছে তারা নিজেরাও বলতে পারবে না। শুভ্রর ধৈর্য চ্যুতি ঘটল। এভাবে স্তব্ধ হয়ে থাকাটা সে আর সহ্য করতে পারছে না। এক ঝটকায় সে লাথি বসাল পাশে রাখা ওষুধের টেবিলে। বিকট শব্দে টেবিলটা উলটে মেঝেতে পড়ে গেল। কাঁচের বোতলগুলো ভেঙে ঝনঝন শব্দে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল আর ওষুধগুলো গড়িয়ে গেল মেঝেতে।

রিদি আতঙ্কে চমকে মাথা তুলল। শুভ্র সাথে সাথে চোখের ইশারায় তাকে কাছে আসার আদেশ করল। রিদি তবুও নড়ছে না। তার পা যেন মাটির সাথে গেঁথে গেছে। শুভ্র হাতের চিরকুটটা মুঠো পাকিয়ে গোল বল বানিয়ে রিদির দিকে ছুড়ে মারল। রিদি আবারও কেঁপে উঠল। এবার সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। খুব ধীরে ধীরে সে শুভ্রর শয্যার পাশে এগিয়ে এলো। তার হাঁটু কাঁপছে এবং বুকের ধড়ফড়ানি যেন বাইরে থেকে টের পাওয়া যাচ্ছে। শুভ্র পলকহীন চোখে রিদির দিকে তাকিয়ে রইল। এই মুখটা দেখার জন্য সে কত রাত তৃষ্ণার্ত চাতকের মতো কাতর হয়ে মরেছে তার কোনো হিসাব নেই।

আচমকা শুভ্র রিদির হাত ধরে সজোরে টান মারল। রিদি তাল সামলাতে না পেরে সরাসরি শুভ্রের বুকের ওপর আছড়ে পড়ল। আকস্মিক ধাক্কায় দুজনের ওষ্ঠ জোড়া মুহূর্তের জন্য মিলিত হলো। রিদির পুরো শরীর যেন বরফ হয়ে গেল। শরীরের লোমকূপগুলো এক অজানা শিহরণে জেগে উঠল। শুভ্র আলতো করে রিদির ঠোঁট থেকে নিজের ঠোঁট সরিয়ে নিল। রিদি কাঁপা কাঁপা গলায় বিড়বিড় করে বলল।

“আপনি অসুস্থ। একটু নিজের শরীরের খেয়াল রাখবেন।”

শুভ্র কোনো কথা না বলে পাশ থেকে কাগজ টেনে নিল। দ্রুত হাতে কিছু একটা লিখে রিদির চোখের সামনে ধরল। রিদি পড়ল।

“তুই কি এসেছিলি আমার কেবিনে?”

রিদি কোনো উত্তর দিল না। সে পুনরায় মাথা নিচু করে রইল। শুভ্র এবার কঠোর চোখে তাকিয়ে আবার লিখল।
“উত্তর দে।”

রিদি খুব ধীরলয়ে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। শুভ্রর চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে দ্রুত কাগজে লিখল।
“লুকিয়ে কেন ছিলি আমার থেকে?”

রিদি এবার চোখ তুলে শুভ্রর চোখের দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা। সে শান্ত স্বরে বলল।
“আপনার সামনে আসতে ইচ্ছে করেনি।”

কথাটা শোনামাত্রই শুভ্রর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে চিৎকার করে কিছু বলতে চাইল কিন্তু গলার সেই তীব্র ব্যথায় আটকে গেল। অবুঝের মতো শুভ্র তবুও শব্দ করার চেষ্টা করছে দেখে রিদি ব্যাকুল হয়ে উঠল। সে চট করে নিজের আঙুল শুভ্রর ঠোঁটের ওপর চেপে ধরল। আর্তনাদ করে রিদি বলল।

“করছেন কী। কথা বলবেন না প্লিজ।”

শুভ্র কাগজের ওপর বিষাদমাখা হাসিমুখে লিখল।
“আমি যদি মরে যেতাম?”

রিদি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। এবার সে ফুঁপিয়ে কেঁদে দিল। শুভ্রের হাত থেকে কলম আর কাগজটা এক প্রকার ছিনিয়ে নিল সে। অশ্রুভেজা চোখে বড় বড় অক্ষরে কাঁপা কাঁপা হাতে রিদিও কিছু একটা লিখল এবং শুভ্রের চোখের সামনে ধরল। শুভ্র দেখল সেখানে লেখা।

“আপনার লাশের পাশে তখন আরেকটা লাশও থাকত।”

শুভ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাগজে লিখল।
“এত কষ্ট দেওয়ার কারণ?”

রিদি এবার আর চোখের জল আটকাল না। সে শুভ্রের হাত থেকে কলম নিয়ে জেদের বশেই লিখল।
“প্রতিশোধ।”

শুভ্র আলতো করে হাসল। সেই হাসিতে কোনো রাগ নেই, আছে এক বুক প্রশান্তি। সে পুনরায় কাঁপা কাঁপা অক্ষরে লিখল।

“একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরবি আমাকে?”

রিদি আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে দুই হাতে শক্ত করে শুভ্রকে জড়িয়ে ধরল। চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে সে ঘন ঘন লম্বা শ্বাস ফেলতে লাগল। মনে হচ্ছে প্রতিটি নিশ্বাসের সাথে বুকের ভেতর জমে থাকা পাহাড়সম হাহাকারগুলো সে আজ মুক্ত করে দিচ্ছে।

শুভ্রও নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে রিদিকে নিজের বুকের সাথে পিষে ধরল। তার আলিঙ্গন এতটাই সুদৃঢ় ছিল যে মনে হচ্ছিল সে রিদিকে নিজের অস্তিত্বের ভেতরেই মিশিয়ে নিতে চায়। দুজনই একে অপরের হৃদস্পন্দন অনুভব করতে পারছে। অনেক দিন পর যেন তারা এক শান্ত শীতল আশ্রয়ের দেখা পেল। সেও বড় বড় শ্বাস নিয়ে রিদির গায়ের সেই চেনা ঘ্রাণটা ফুসফুসে ভরে নিতে লাগল। অবশ হয়ে আসা শরীরটা যেন এই মুহূর্তে এক অলৌকিক প্রাণশক্তি ফিরে পেল।

কিছুক্ষণ এভাবেই কাটল। রিদির গায়ের চেনা সুবাস আর হৃদস্পন্দনের শব্দে শুভ্রের বুকের ভেতরটা জুড়িয়ে আসছিল। হঠাৎ রিদি তার বুক থেকে মুখ তুলে সজল চোখে শুভ্রের দিকে তাকাল। আর্তনাদ মেশানো কণ্ঠে বলে উঠল।

“আমাকে এত ভালোবাসেন তা আগে বলেননি কেন?”

রিদি প্রশ্নটা করতেই আচমকা শুভ্র বাচ্চাদের মতো হুহু করে কেঁদে দিল।

রানিং…!

কেউ আমাল ছেলে বউমার ভালোবাসার দিকে নজর দিবা না… 🥺

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply