Golpo romantic golpo অবাধ্য হৃৎস্পন্দন

অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৭৫


#অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন (৭৫)

#সোফিয়া_সাফা

কয়েকদিন পর। ১৫ই এপ্রিল।

তখন মধ্যরাত। থান্ডার এস্টেটের উদ্যানের ঘরটায় একধরনের অদ্ভুত, গুমোট ভাব থিতু হয়ে আছে। জানালার ভারী মখমলের পর্দাগুলো টানা। সাদা আলো সহ্য হচ্ছিল না বলেই সেগুলো নিভিয়ে, ঘরে শুধু ডিম লাইটের মৃদু সবুজ আলো জ্বেলে রাখা হয়েছে।

​বিছানার ওপর কুঁকড়ে পড়ে আছে উদ্যান। তার রুক্ষ পুরুষালি হাতের রগগুলো কালচে-নীল হয়ে ফুলে উঠেছে, যেখানে বিঁধে আছে আইভি লাইনের সুঁই। পুরো শরীরটা তার অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে। হাতের আঙুলগুলো দিয়ে বেডশিটটা এতো জোরে আঁকড়ে ধরেছে যে, নখের চাপে কাপড়টা ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম।

পাশে ডাক্তার আর নার্স ছাড়াও ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে চারজন বিশালদেহী গার্ড। উদ্যান নিজেই এদের নিযুক্ত করেছে এবং কড়া নির্দেশ দিয়ে রেখেছে—সে যাই করুক না কেন, তাকে যেন কোনো অবস্থাতেই ড্রাগস দেওয়া না হয় আর ঘর থেকে বের হতে দেওয়া না হয়।

​কিন্তু এখন, নেশার উইথড্রয়াল সিম্পটমসের চরম মুহূর্তে সেই নির্দেশই তার নিজের আসক্ত মস্তিষ্ককে আগ্রাসী করে তুলছে।

​পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ডাক্তার নিচু স্বরে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেন, “মাস্টার, প্যানিক করবেন না। লম্বা লম্বা শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করুন।”

​“চুপ!” উদ্যান গর্জে উঠল।

​চোখ দুটো তার টকটকে লাল। বিগত কয়েকটা দিন সে এক ফোঁটাও ঘুমোতে পারেনি। উদ্যান কাঁপতে কাঁপতে বেডসাইড ড্রয়ারগুলো টেনে টেনে হাতড়াতে লাগল। সবকটা ড্রয়ার খালি দেখে সে গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে উঠল, “আমাকে ড্রাগস দে, নইলে তোদের সব কয়টাকে মে`রে ফেলব!”

​সে বিছানা থেকে নামতে গেলে দুজন গার্ড তাকে আটকাতে এল। উদ্যান আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে হাতের আইভি লাইনটা হ্যাঁচকা টানে ছিঁড়ে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গেই ফিনকি দিয়ে তাজা রক্ত ছিটকে পড়ল মেঝেতে। উদ্যান একজনের পেটে কনুই দিয়ে জোর আঘাত করল, অন্যজনের হাত মট করে মুচড়ে দিল।

​তারা দুজন যখন উদ্যানের পাশবিক শক্তির কাছে হার মানতে যাচ্ছিল, তখনই বাকি দুজন গার্ডও এসে ধস্তাধস্তিতে যোগ দিল। চারজন মিলে একপর্যায়ে তাকে মেঝেতে চেপে ধরতে সক্ষম হলো। তবুও উদ্যানের আক্রোশ কমল না। সে দাঁত কিড়মিড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “তোদের এত বড় সাহস! তোরা হার্দিনকে ছুঁয়েছিস?”

​সে পুরোদমে তাদের পরাস্ত করার চেষ্টা করে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই তার চোখজোড়া স্থির হলো জানালার দিকে। বাতাসের ধাক্কায় পর্দাটা হালকা নড়ছে। আবছা চাঁদের আলোয় সে দেখতে পেল, ওখানে ফুল দাঁড়িয়ে আছে! এলোমেলো চুল, ফ্যাকাশে মুখ আর ডাগর চোখে এক বুক অভিমান নিয়ে সে যেন উদ্যানের এই শোচনীয় অবস্থার প্রহসন করছে।

​উদ্যানের শ্বাস থমকে গেল। মুহূর্তের মধ্যে তার ভেতরের উগ্রতা এক অদ্ভুত মোহবিষ্টতায় রূপ নিল। তার মাঝে যেন ভর করল কোনো এক দানবীয় শক্তি; চারজন গার্ডকে এক ঝটকায় ছিটকে ফেলে দিয়ে সে জানালার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।

​“ফ্লাওয়ার… তুই এসেছিস?”

​সে কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়িয়ে জানালার দিকে পা বাড়াল। ডাক্তার ভীত স্বরে বলে উঠলেন, “মাস্টার, কেউ নেই ওখানে! আপনার হ্যালুসিনেশন হচ্ছে! প্রতিদিনই তো এমন হয়।”

​“চুপ কর হারামি!” উদ্যান গর্জে উঠে ডাক্তারকে শাসাল, কিন্তু তার দৃষ্টি তখনো সেই শূন্য জানালায়। সে চিৎকার করে উঠল, “এই! কে কোথায় আছিস… ফ্লাওয়ারকে আটকা! ও চলে যাবে রে… আটকা ওকে!”

​হলোও তাই। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানেই চোখের সামনে থেকে ফুলের অস্তিত্ব মিলিয়ে গেল। উদ্যান নিথর হয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল মেঝেতে। ক্ষণকাল ওভাবেই বসে থেকে, হঠাৎ উন্মুখ হয়ে বিছানার দিকে দৌড়ে গেল। বালিশের পাশে পড়ে থাকা ফোনটা খপ করে লুফে নিয়ে সে হাঁপাতে লাগল।

​স্ক্রিনে আলো জ্বলে উঠতেই ওয়ালপেপারে ভেসে উঠল ফুলের হাসিমুখ। এবার মেক্সিকো ফিরে আসার পর কোনো এক তীব্র ঘোরের বশেই হয়তো ছবিটা সে ওয়ালপেপার হিসেবে সেট করেছিল।

একদৃষ্টে ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল উদ্যান। কাঁপানো আঙুল দিয়ে স্ক্রিনটা স্পর্শ করল, যেন ফোনের কাঁচ ভেদ করেই সেই আরাধ্য মুখটা ছুঁয়ে দেখতে চাইছে। এই প্রথম তার গলার স্বর একদম ভেঙে চুরমার হয়ে গেল—

“আমি তোকে ছাড়া… থাকতে পারছি না রে। কবে… কবে ফিরিয়ে আনতে পারব তোকে?”

​উদ্যান আর কিছু বলতে পারল না। কথা শেষ হওয়ার আগেই তীব্র বমি বমি ভাব উঠল তার। সে মেঝেতে নুয়ে পড়ল। গার্ডরা এসে তাকে তোলার চেষ্টা করতেই সে শেষবারের মতো হুঙ্কার দিয়ে উঠল, “ডোন্ট ডেয়ার টু টাচ মি, বাস্টার্ডস! দূরে গিয়ে ম`র! আমি… আমি নিজেই নিজেকে সামলাতে পারব।”

,

,

,

১লা জুলাই।

ছয় মাসের প্রজেক্টের কাজ মাত্র পাঁচ মাসেই চটজলদি শেষ করে আজ মেক্সিকোতে ফিরেছে এস্টেটের সদস্যরা—অনি, অনিলা, সোহম, মেলো, লুহান, উর্বী এবং রিদম। দীর্ঘ জার্নির ক্লান্তি সবার চোখে-মুখে স্পষ্ট।

​তারা যখন থান্ডার এস্টেটের মূল ফটকের সামনে গাড়ি থেকে নামল, তখনই সবাইকে চমকে দিয়ে স্বয়ং উদ্যান এসে সামনে দাঁড়াল। পড়ন্ত সকালের কড়া রোদে তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। ঘর্মাক্ত মুখটা দেখে মনে হচ্ছে, সে বেশ অনেকক্ষণ ধরেই বাইরে অপেক্ষা করছিল। তাকে আচমকা এভাবে এগিয়ে আসতে দেখে রিদম রীতিমতো হকচকিয়ে গেল। ভয়ের চোটে আমতা আমতা করে বলল, “আমরা কিন্তু সব কাজ একদম পারফেক্টলি শেষ করেই এসেছি। প্লিজ ক্ষেপে যাস না!”

​রিদমের কথা শুনে উদ্যানের ভ্রু দুটো সামান্য কুঁচকে গেল। তবে সে কোনো উগ্রতা না দেখিয়ে, অত্যন্ত সাবলীল কণ্ঠে বলল, “রেগে যাব কেন? লুইস তো আমাকে আগেই জানিয়েছে যে তোরা আজই ফিরছিস। আমি জাস্ট তোদের ওয়েলকাম জানাতে এলাম। আর কাজ নিয়ে এত হাইপার হতে হবে না। চিল ব্রো!”

​উদ্যানের মুখে ‘চিল ব্রো’ শব্দ দুটো শোনা মাত্রই রিদমের মনে হলো চারপাশের পৃথিবীটা যেন এক চক্কর ঘুরে গেল। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে না পেরে, সে কানের ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে পরিষ্কার করার ভঙ্গি করল, “ক… কী বললি মাত্র?”

​উদ্যান হালকা হাসল। তর্জনী দিয়ে কপাল চুলকাতে চুলকাতে ফিসফিস করে শুধাল, “খুব বেশি ক্রিঞ্জ শোনালো নাকি?”

​তার কথা বলার ধরন আর মুখের এই মৃদু হাসি দেখে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রত্যেকে হাঁ হয়ে গেল। সোহম বিস্ময় সামলাতে না পেরে দু-কদম এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, “তুই ‘ব্রো’ বলেছিস? ব্রো মানে যে ভাই, সেটা তুই জানিস তো?”

​উদ্যান সরু চোখে তাকাল, “তোর ধারণা আমি সেটা না জেনেই রোবোটিকস ইঞ্জিনিয়ার হয়ে গেছি?”

​অনি বিড়বিড় করল, “তার মানে তুই জেনেশুনেই আমাদের ‘ব্রো’ সম্বোধন করলি?”

​উদ্যান মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ, আমি চেষ্টা করছি। এত বছর একসঙ্গে থাকার পর আমার মনে হলো, আমাদের এবার গ্রুপ থেকে ফ্যামিলিতে কনভার্ট হয়ে যাওয়া উচিত। আর পরিবার হতে গেলে তো তোদের নিজের ভাই বানাতেই হবে, তাই না?”

​বাকিরা তখনও স্তব্ধ। লুহান এবার ফোড়ন কাটল, “সে না হয় বুঝলাম, আমাদেরকে তুই ভাই বানিয়ে নিবি। তা মেলোকে কী বানাবি, হুম?”

​উদ্যান একটা ছোট শ্বাস ফেলল, “ওকে আলাদা করে আর কী বানাব?”

​মেলো যারপরনাই অবাক হয়ে নিজের দিকে আঙুল তাক করল, “মানে কী? তুই আমাকেও ভাই বানানোর ধান্দা করছিস নাকি?”

​উদ্যান ওপর-নিচ মাথা নেড়ে শান্ত গলায় বলল, “হুম, তোকে আমি কখনো ওদের থেকে আলাদা মনে করিনি। তবে তুই যদি চাস, তোকে আমি ‘ভাবী’ বানাতেই পারি।”

​তার কথায় বাকিরা ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইলেও মেলোর গলায় আচমকা বিষম লেগে কাশি উঠে গেল। লুহান ফিক করে হেসে উদ্যানের দিকে তাকাল, “তুই কি আজ সকাল সকাল বেশি ড্রাগস কনজিউম করে ফেলেছিস তেহ?”

​উদ্যান ধীর গলায় বলল, “উঁহু, আমি আস্তে আস্তে ওসব ছেড়ে দিচ্ছি। যদিও এখনো ক্র্যাভিংস ওঠে। আসলে, ওসবে আসক্ত হয়ে পড়া সহজ হলেও আসক্তি কাটানো খুব কঠিন।”

​কথা বলতে বলতেই তারা সবাই এস্টেটের ভেতরে প্রবেশ করল। এরপর যে যার রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ডাইনিং টেবিলে লাঞ্চ করতে বসল। কয়েকজন মেইড এসে দক্ষ হাতে টেবিলে গরম গরম খাবার পরিবেশন করে দিল।

​ক্ষুধার্থ পেটে প্রথম লোকমাটা মুখে তুলতেই অনির খটকা লাগল। রান্নার স্বাদটা কেমন যেন অন্যরকম ঠেকছে। সে খাওয়া থামিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আজ কে রান্না করেছে?”

​টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মেইড বহু কষ্টে হাসি চেপে রেখে বিনীত সুরে বলল, “আজ্ঞে, আজ মাস্টার নিজ হাতে রান্না করেছেন।”

​ডাইনিং টেবিল জুড়ে যেন বড়সড় একটা বিস্ফোরণ হলো। সবার মুখের খাবার মুখেই আটকে রইল। বিস্ময়ে ঠিকরে পড়া সব কটা চোখ এক এক করে উদ্যানের ওপর গিয়ে নিবদ্ধ হলো।

উদ্যান একবার সবার থমকে যাওয়া চেহারার দিকে তাকাল। তারপর নিজের প্লেটের খাবারে মনোযোগ দিয়ে বলল, “এত অবাক হওয়ার কী আছে? ফ্লাওয়ারকে রেখে আসার কারণে তোরা আমার ওপর রেগে ছিলি… অ্যাবোভ অল, এত মাস পর এস্টেটে ফিরেছিস, তাই ভাবলাম তোদের একবার রান্না করে খাওয়াই। আমি জানি, প্রফেশনাল রাঁধুনিদের মতো অতটা ভালো হয়নি, বাট একটু ম্যানেজ করে নে।”

​সবাই আর কী খাবে! কারো গলা দিয়ে যেন খাবারই নামতে চাইল না। উদ্যান রান্না করেছে, তাও আবার তাদের জন্য? ব্যাপারটা কেমন যেন অবিশ্বাস্য আর গোলমেলে ঠেকছে। অতীতে মুড ভালো থাকলে উদ্যান কালেভদ্রে অনিকে রান্নার কাজে সাহায্য করত ঠিকই, কিন্তু তা ছিল অত্যন্ত সীমিত পরিসরে। আর আজ কিনা কার্টেল বস তাদের জন্য পুরো লাঞ্চ একা হাতে তৈরি করেছে!

​কিন্তু কেন? হঠাৎ উদ্যানের মাঝে এত বড় আমূল পরিবর্তন আসার রহস্যটা কী? হ্যাঁ, তারা ফুলের বিষয়টা নিয়ে অবশ্যই রেগে আছে; কিন্তু তাদের রেগে থাকাটা কার্টেল বসকে কবে থেকে প্রভাবিত করতে শুরু করল? না, না… ব্যাপারটা যথেষ্ট সন্দেহজনক।

ভুলে গেলে চলবে না যে, এর আগেও ফুলের সাথে অভিনয়ে নামার পূর্বে উদ্যানের মাঝে এমন পরিবর্তন এসেছিল। এবারও কি তেমন কিছুই হতে চলেছে? এবার কি দানবটার শিকার তারা সবাই? উপস্থিত সবার মাথায় কেবল এই একটা প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে।

​উদ্যান লক্ষ্য করল, সবাই খাওয়া থামিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে এদিক-সেদিক তাকিয়ে আছে। সে হাতের চামচটা প্লেটে মৃদু ঠুকে হালকা আদেশের সুরে বলল, “কী রে, খাচ্ছিস না কেন? পুরোটা খেয়ে তবেই উঠবি।”

​কার্টেল বসের সেই চিরচেনা ডমিনেটিং কণ্ঠস্বর ফিরে আসতেই সবাই নিজেদের ভাবনার জগৎ থেকে বাস্তবে আছড়ে পড়ল। কোনো কথা না বাড়িয়ে, এক অজানা আশঙ্কায় মুখ নিচু করে সবাই চুপচাপ প্লেটের খাবারগুলো গিলতে শুরু করল।

,

,

,

রাত বারোটা!

ডিনার শেষ হওয়ার পর এস্টেটের প্রত্যেকে এসে জড়ো হয়েছে বিশাল লিভিং রুমে। সোফায় বসা রিদম, লুহান, সোহম—সবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি একভাবে স্থির হয়ে আছে উদ্যানের ওপর। বিপরীতে উদ্যান সম্পূর্ণ ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে সোফায় হেলান দিয়ে ফোন টিপে যাচ্ছে। যেন চারপাশে কী হচ্ছে না হচ্ছে, তা নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথাই নেই।

​সবার পক্ষ থেকে নীরবতা ভেঙে লুহান বলল, “আমরা এখানে কথা বলতে বসেছি তেহ। ফোনটা রাখ।”

​উদ্যান স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই বিড়বিড় করল, “হুম, শুনছি। তোরা বল, আমার কান খোলা আছে।”

​রিদম এবার গম্ভীর গলায় বলে উঠল, “শুধু কানে শুনলেই হবে না। সবটা ক্লিয়ার করে খুলেও বলতে হবে।”

​উদ্যান ধীরলয়ে স্ক্রিন থেকে চোখ তুলে তাকাল, “কী বলব?”

​অনি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে সোজা হয়ে বসে ক্ষোভ উগরে দিল, “তুই আমাদের সাথে প্র্যাংক করছিস? ফুলবানু নেই, তাই তুই খুব বোর ফিল করছিস, তাই না রে? নাকি ওর ইমোশন নিয়ে খেলে মজা পেয়ে এখন আমাদের ইমোশন নিয়েও খেলতে চাইছিস? কোনটা?”

​উদ্যান ক্ষণিকের জন্য হতবিহ্বল হয়ে গেল। চোখ দুটো সামান্য বড় করে বলল, “কী যা তা বকছিস! তেমন কিছুই করছি না আমি।”

​লুহান এবার চড়া গলায় বলল, “তাহলে কেন এমন উইয়ার্ড বিহেভ করছিস? আমরা যখন নরওয়েতে ছিলাম, কোনোভাবেই তোর সাথে ডিরেক্ট যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। উপরন্তু তুই লুইসকেও কড়া অর্ডার দিয়ে রেখেছিলি, ও যেন ভুলেও আমাদের তোর কোনো আপডেট না দেয়। বল, কেন করেছিস এমন লুকোছাপা?”

​উদ্যান থম মেরে গেল। লিভিং রুমের শুভ্র আলোয় তার গমরঙা মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাশে দেখাল। সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “বাবা মা`রা যাওয়ার পরের দিনই… আমি ওনার লাশ নিয়ে বাংলাদেশে ব্যাক করেছিলাম। তোরা অযথাই টেনশন করবি, কাজের ক্ষতি হবে, সেই জন্য লুইসকে বলতে নিষেধ করেছিলাম।”

​সোহম সোফা থেকে প্রায় অর্ধেক উঠে দাঁড়াল, “কী! তুই বিডিতে ব্যাক করেছিলি তেহ? হোয়াই?”

​উদ্যান সবার চোখ এড়াতে নিজের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল। তারপর শুকনো গলায় বলল, “ওনাকে মায়ের পাশে দাফন করার জন্য ফিরতেই হতো। তাছাড়া আমার কাছে অন্য কোনো অল্টারনেটিভ ছিল না।”

​মেলো সন্দিহান চোখে উদ্যানের দিকে তাকিয়ে বলল, “শুধুমাত্র এই দাফন-কাফনের কারণেই বাংলাদেশে গিয়েছিলি? এর বাইরে আর কোনো উদ্দেশ্য ছিল না তো?”

​উদ্যান নিজের ঘাড় চুলকাতে লাগল—যা সে সাধারণত খুব অস্বস্তিতে পড়লে করে। সে আমতা আমতা করে বলল, “আর… কোন উদ্দেশ্য থাকবে?”

​সোহম চেঁচিয়ে উঠে সরাসরি আসল প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল, “তুই ফুলের সাথে কিছু করিসনি তো তেহ? সত্যি করে বল!”

​ফুলের নাম উঠতেই উদ্যান যেন কেঁপে উঠল। সে নিজের অজান্তেই একটা শুকনো ঢোক গিলল। কাঁপতে থাকা জিহ্বা দিয়ে শুকনো ঠোঁট দুটো হালকা ভিজিয়ে নিয়ে, ভেঙে ভেঙে বলল, “আমি… আমি সেই সময় নিজের প্রোপার সেন্সে ছিলাম না। অতিরিক্ত ড্রাগস কনজিউমের কারণে মাথা কাজ করছিল না। তাই… তাই নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারিনি।”

​সবাই একযোগে আঁতকে উঠল, “হোয়াট!”

​এতক্ষণ ধরে অনিলা আর উর্বী সোফার এক কোণে চুপচাপ বসে তাদের বাক্যবিনিময় শুনছিল। এই পর্যায়ে উদ্যানের স্বীকারোক্তি শুনে তারা দুজনও চমকে উঠে চকিত নয়নে তাকাল উদ্যানের দিকে।

​উদ্যানের নিজেরও অস্থির লাগছিল। সে ইশারায় একজন মেইডকে ডেকে পানি আনতে বলল। মেইড দ্রুত কাঁচের গ্লাসে বরফ-ঠান্ডা পানি এনে দিতেই সে এক ঢোকে পুরো গ্লাসের পানিটাই শেষ করে ফেলল।

উর্বী এবার আর চুপ থাকতে পারল না। তীব্র গলায় জিজ্ঞেস করেই বসল, “কী করেছেন আপনি ওর সাথে?”

​উদ্যান দুই হাত দিয়ে নিজের মাথাটা চেপে ধরল। সে নিজেকে একটু ধাতস্থ করে, মেমোরি ক্র্যাশ করা সেই রাতের ঘটনাটা মনে করার চেষ্টা করল। মুহূর্তেই ধোঁয়াটে আর আবছা কিছু কাঁপাকাঁপা দৃশ্য তার মানসপটে ভেসে উঠল। সে চোখ বুজে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, “আমি আসলে ওর কাছে যেতে চাইনি। তবুও অদ্ভুত এক ঘোরের বশে চলে গিয়েছিলাম। ওকে নিজের সাথে করে সোলার এস্টেট পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলাম। তারপর… তারপর…”

​উদ্যান শক্ত করে চোখ বন্ধ করে দৃশ্যগুলো মনে করার আপ্রাণ চেষ্টা করল। কিন্তু সেদিন অতিরিক্ত মাত্রায় ড্রাগস নেওয়ার কারণে তার মস্তিষ্কের অনেকখানি মেমোরি ডিলিট হয়ে গেছে।

দানবটা ঠোঁট কামড়ে হাঁসফাঁস করে উঠল। যেটুকু তার মনে পড়ছে, সেটুকু সে কাউকে বলতে পারবে না। আর যেটুকু সে বলতে চাইছে, সেটুকু তার মনেই পড়ছে না। সবকিছু তার মত্ত মস্তিস্কে কেমন যেন গুলিয়ে গেছে।

​কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে বিধ্বস্ত গলায় উদ্যান বলল, “আমার শুধু এটুকুই মনে আছে… কোনো একসময় আমি ফ্লোরাকে হুকুম দিয়েছিলাম ওকে বাড়িতে রেখে আসতে।”

​উদ্যানের মুখ থেকে শেষ বাক্যটা শোনা মাত্রই সবাই স্বস্তি পেয়ে চেপে রাখা নিঃশ্বাসটুকু ছেড়ে দিল।

​রিদম সন্দিহান চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তুই তারপর আর কোনো খোঁজ নিসনি ওর?”

​উদ্যান মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “না। আমি ওকে ওর মতো থাকতে দিয়েছি।”

​সোহম সোফায় একটু নড়েচড়ে বসল। উদ্যানের দিকে ঝুঁকে এসে বলল, “তুই ওকে হাতের মুঠোয় পেয়েও কিচ্ছু করিসনি? তুই না বলেছিলি, আঙ্কেলের যতক্ষণ নিঃশ্বাস চলবে, ফুল ততক্ষণই বেঁচে থাকবে। তাহলে ওকে বাঁচিয়ে রাখার কারণটা কী?”

​উদ্যানের চোখের বাদামি মণি দুটো অকস্মাৎ এক অদ্ভুত শূন্যতায় ডুবে গেল। কিছুক্ষণ গভীর ভাবনায় ডুবে থেকে সে নিচু, গম্ভীর স্বরে বলল, “ওকে আমার প্রয়োজন… খুব বেশিই প্রয়োজন।”

​কথাটা শোনা মাত্রই লুহান চট করে অনির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে কিছু একটা বলল। অনি সোজা হয়ে বসে প্রশ্ন করল, “প্রয়োজন মানে? কেমন ভাবে প্রয়োজন শুনি একটু?”

​উদ্যান গালে আঙুল ঠেকিয়ে অতলান্ত ভাবুক ভঙ্গিমায় সিলিংয়ের দিকে তাকাল। তারপর অদ্ভুত এক সম্মোহনী স্বরে আওড়াতে লাগল, “নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য যেমন অক্সিজেন প্রয়োজন, তেষ্টা মেটানোর জন্য যেমন পানি প্রয়োজন, পৃথিবী দেখার জন্য যেমন দৃষ্টি প্রয়োজন, কথা বলার জন্য যেমন কণ্ঠস্বর প্রয়োজন… ঠিক তেমনি ও আমার বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয়।”

​পুরো লিভিং রুমে নিস্তব্ধতা ভর করল। উদ্যান শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আবারও বলল, “আমি… আমি ওর সাথে অনেক খারাপ করেছি। ওকে অতটাও কষ্ট দেওয়া ঠিক হয়নি।”

​রিদম অবাক হয়ে বলল, “তোর সত্যিই অনুশোচনা হচ্ছে তেহ? তোর সত্যিই মনে হচ্ছে যে বোকাফুলকে তোর ঠিক তেমনভাবেই প্রয়োজন, যেমনটা তুই মাত্রই বললি?”

​উদ্যান ধীরলয়ে ওপর-নিচ মাথা নাড়ল, “আমি মিথ্যা বলার মতো বা অভিনয় করার মতো কন্ডিশনে নেই রিদম। আমার সত্যিই ওকে প্রয়োজন। আমার ভালো লাগছে না ওকে ছাড়া। আমার মনে হচ্ছে… মনে হচ্ছে ছুটে চলে যাই ওর কাছে। কিন্তু ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর সাহস জোগাতে পারছি না। ও যদি আমাকে দেখে পালিয়ে যেতে চায়… আমি… আমি সেটা সহ্য করতে পারব না।”

​অনি তপ্তশ্বাসে বলল, “তোকে দেখে ও ডেফিনিটলি পালিয়ে যেতে চাইবে তেহ।”

​“হুম, সেই জন্যই যাচ্ছি না। তবে ওকে আমার চাই-ই চাই। আমি নিজেকে ওর জন্য প্রস্তুত করছি। আমি নিজেকে এতটাই বদলাব, যাতে ও শেষমেশ আমাকে একটা সুযোগ দিতে রাজি হয়ে যায়।”

​সোহম তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বলে উঠল, “কিন্তু তুই ওকে খুঁজে পেয়েছিলি কোথায়? ও তো আমার ফ্ল্যাট থেকে পালিয়ে গিয়েছিল, তাই না? তারপরও তুই ওকে পেলি কীভাবে?”

উদ্যান ফোনের স্ক্রিনটা অফ করে সোফার ওপর রাখল। অবশেষে আসল সত্যটা বলেই ফেলল, “আসলে… ওর পেটে একটা ট্র্যাকিং ডিভাইস আছে। সেটার সিগন্যাল ট্রেস করেই ওর কাছে চলে যেতে পারি আমি।”

​প্রত্যেকের মুখ থমথমে হয়ে গেল। লুহান চাপা স্বরে প্রশ্ন করল, “এটা কবে করলি?”

​“অনেক আগে। যেদিন ও চার্লসের হাত থেকে বাঁচার জন্য নিজের পেটে কাঁচ ঢুকিয়ে সু`ইসা`ইড করতে চেয়েছিল। সেদিনই আমার মনে হয়েছিল, এই মেয়ে সুযোগ পেলেই পালিয়ে যেতে চাইবে। সেই জন্যই অপারেশনের সময় আমার বানানো একটা হিউম্যানয়েড রোবট ডাক্তারকে কনভিন্স করে একটা মাইক্রো-ডিভাইস ওর পেটে পুশ করিয়ে নিয়েছিল।”

​কথাটা বলার পরপরই উদ্যান ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, “আমার মেডিটেশনের সময় হয়ে গেছে। রুমে যাচ্ছি আমি।”

​উদ্যান সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতেই সোহম পেছন থেকে প্রশ্ন করল, “তুই ওকে আর কখনো কষ্ট দিবি না তো তেহ?”

​উদ্যান ঘাড় বাঁকিয়ে তার দিকে তাকাল। শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “আমি ওকে কষ্ট দিতে চাই না ঠিকই, কিন্তু ও যদি পালিয়ে যেতে চায়, তাহলে ও নিজের দোষেই কষ্ট পাবে। আমি ওকে এবং নিজেকে পর্যাপ্ত সময় দিচ্ছি, কিন্তু পরিশেষে ওকে আমার কাছেই ফিরতে হবে। আমি ওর তথাকথিত ভালোর জন্য কিংবা ওর সুখের জন্য ওকে ছেড়ে দিতে পারব না। কোনোদিনও পারব না।”

​সোহমের কণ্ঠরোধ হয়ে এল। “তুই এখনো ওকে সত্যিকারের ভালোবাসিস না তেহ। যদি বাসতি, তাহলে ওর সুখের জন্য সবকিছু করতে পারতি। এমনকি ছেড়ে দিতেও।”

​“কে বলেছে তোকে আমি ওকে সত্যিকারের ওই ক্লিশে ডেফিনিশনে ভালোবাসতে চাই? ও এমনিতেও আমার ভালোবাসায় কষ্টই পায়, আমার মুখ থেকে ও শুনতেও চায় না ভালোবাসার কথা। আর তুই যা বললি, তা কোনোদিনও সম্ভব হবে না। আমি ওকে সাময়িক ছাড় দিচ্ছি ঠিকই, কিন্তু ছেড়ে দেব না। ওর জীবনে তেহজিব ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো অপশন ছিল না, আর কোনোদিন থাকবেও না।”

​সোহম আনমনেই বলল, “ওর জীবনে অনেক অপশন আছে তেহ, ভবিষ্যতে হয়তো সেই অপশন আরও বাড়বে। তোর চেষ্টা করা উচিত ফুল যেন সব অপশন এড়িয়ে গিয়ে শুধু তোকেই চুজ করে। তা যদি তুই না করিস, তাহলে এই যুদ্ধে তোর পরাজয় নিশ্চিত।”

​সোহমের মুখে নিজের পরাজয়ের কথা শুনে উদ্যানের মাথায় আচমকাই রক্ত উঠে গেল। সে চোয়াল শক্ত করে, দাঁতে দাঁত পিষে গর্জে উঠল, “কার এত বড় স্পর্ধা যে আমার… এই কার্টেল বসের বিপরীতে যুদ্ধে নামবে? সে যেই হোক না কেন, যুদ্ধে নামার আগেই হার্দিন তার হাত-পা ভেঙে গুঁড়ো করে মাটির নিচে পুঁতে ফেলবে!”

​“তা হয়তো তুই পারবি তেহ। কিন্তু ফুলের চোখে ঘৃণা দেখলে কি তুই তা সহ্য করতে পারবি?”

​উদ্যান এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাসে মাথা নাড়ল। “ঘৃণা করবে? ও আমাকে কখনোই ঘৃণা করবে না সোহম। সব জানিয়ে দিয়েছি আমি ওকে। এমন কিছুও জানিয়ে দিয়েছি যা তোরাও জানিস না। ও তারপরও আমাকে ঘৃণা করেনি, তবে এখন কেন করবে?”

​সোহম এবার সোফায় হেলান দিয়ে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল উদ্যানকে, “ভুলে যাস না, তুই ওকে তখন ফেলে রেখে চলে এসেছিস যখন ওর তোকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল। ও কত আকুতি-মিনতি করেছিল তোর সাথে আসার জন্য, কিন্তু তুই ওকে আনিসনি। তারপর এতগুলো দিন কেটে গেল, তোর এখনো মনে হয় ও তোকে আগের মতোই ভালোবাসে?”

​উদ্যানের কপালের চামড়া কুঁচকে গেল, সেখানে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমল। হাতের তালুতে কপাল মুছতে মুছতে বলল, “আমি… আমি ওকে নিয়ে আসতে চেয়েছিলাম সোহম। কিন্তু নিজের মধ্যে যেসব পরিবর্তন হচ্ছিল, তা মেনে নিতে পারছিলাম না। আমি ক্রমশই ওর প্রতি নিজের দুর্বলতা টের পাচ্ছিলাম। তখন থেকেই আমি ড্রাগস নেওয়া শুরু করি; মনে হয়েছিল আমি সেই দুর্বলতা সহজেই কাটিয়ে উঠতে পারব। কিন্তু… আমি পারিনি। সেই দুর্বলতা সময়ের সাথে প্রখর হতে হতে আমাকে এমন এক পর্যায়ে এনে দাঁড় করিয়ে দিল যে, মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না।”

​সবকিছু উগড়ে দিয়ে উদ্যান আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। ধুপধাপ পা ফেলে লিভিং রুম ছেড়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল।

কার্টেল বস প্রস্থান করতেই লিভিং রুমে জমে থাকা থমথমে ভাবটা কিছুটা হালকা হলো। রিদম একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলল, “তেহ এবার মিথ্যা বলছে না রে।”

​অনি গম্ভীর মুখে বলল, “তা তো বুঝতেই পারছি। কিন্তু ফুলবানু তো একবারও আমাদের কারও সাথে কোনোভাবে যোগাযোগ করার চেষ্টা করল না!”

​মেলো চিবুকে হাত দিয়ে বলল, “ব্যাপারটা যথেষ্ট চিন্তার। কী করা যায় বল তো?”

​লুহান মাঝখান থেকে বলে উঠল, “বাদ দে, তেহ আছে এখন ফুলকে নিয়ে চিন্তা করার জন্য। তুই এবার অন্তত আমাদের বিয়েটা নিয়ে একটু চিন্তা কর। চুল পেকে যাচ্ছে কিন্তু!”

​অনি মুখ বাঁকাল, “দেখ লুহান, তুই খবরদার মেলোর ওপর জোর খাটানোর চেষ্টা করবি না। এমনিতেই তুই যে ওর প্রেমে পিছলে পড়েছিস, তা আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না।”

​লুহান বলল, “হুহ! তোরা মানতে না পারলে সেটা তোদের ব্যর্থতা। তোদের মানাতে আমার বয়েই গেছে।”

​অনি চোখ রাঙিয়ে বলল, “তুই ভুলে যাচ্ছিস, এখন আমরা একটা পরিবারে কনভার্ট হয়েছি। আমরা মেলোর ভাই, মেলোও আমাদের ভাই। আমাদের অবশ্যই মানাতে হবে তোকে। তবেই না আমরা ওকে তোর হাতে তুলে দিতে রাজি হব।”

​লুহান বিরক্তিতে চোখ উল্টে বলল, “আগে মেলো নিজে তো রাজি হোক, তারপর না হয় তোদের মানাতে যাব।”

​লুহানের কথা শুনে মেলো হুট করেই নিজের মুখটা গম্ভীর করে ফেলল, যেন সে তাকে বিয়ে করতে মোটেও প্রস্তুত নয়। মেলোর হঠাৎ এমন অভিব্যক্তি দেখে লুহানের চনমনে মুখটাও বেলুনের মতো চুপসে গেল।

​কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই মেলো ফিক করে হেসে ফেলল। তাকে হাসতে দেখে বাকিরা যেন বিষম খেল। মেলো উর্বীর পাশ থেকে ঝটপট উঠে দাঁড়াল। তারপর এক অদ্ভুত চপলতায় হেঁটে গিয়ে সোহম আর লুহানের মাঝখানের খালি জায়গাটায় ধপ করে বসে পড়ল। লুহানের চওড়া কাঁধের ওপর নিজের হাতটা রেখে দুষ্টুমিভরা সুরে বলল, “অই, বল না।”

​লুহানের ঠোঁটের কোণ প্রসারিত হলো, “কী বলব?”

​মেলো তার চোখে চোখ রেখে ভ্রু নাচিয়ে বলল, “উইল ইউ ম্যারি মি?”

​লুহান খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়ল, “আবার জিগায়! আমি তো তোকে বিয়ে করার জন্য সেই কবে থেকেই একপায়ে খাড়া।”

​মেলো তার কপালে নিজের আঙুল দিয়ে মৃদু একটা ধাক্কা দিয়ে বলল, “ধুর বোকা! আমি নিজের পক্ষ থেকে বলিনি। আমি এটা বলে তোকে আমায় প্রোপোজ করতে বলেছি!”

​লুহান কথাটা বুঝতে পেরে বলল, “ওহ, ঠিক আছে।”

​বলেই লুহান উঠে দাঁড়িয়ে ফ্লোরে হাঁটু মুড়ে বসল। মেলোর দিকে নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে হাসিমুখে আওড়াল, “মাই ডিয়ার মার্শ-মেলো, উইল ইউ ম্যারি মি?”

​মেলো তার হাতে হাত রেখে মুখ বরাবর ঝুঁকে গিয়ে তার গালে ঠোঁট ছোঁয়াল। জায়গাতেই জমে গেল লুহান। তারপর মেলো তার গলা জড়িয়ে ধরে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করল, “অফকোর্স! আই’ড লাভ টু ম্যারি ইউ।”

​লুহান আবেগপ্রবণ হয়ে মেলোর ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়াতে যাবে, তখনই মেলো তার মুখ চেপে ধরে শাসনের সুরে বলল, “অই, বিয়ে কিন্তু হয়নি এখনো!”

​লুহান তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়িয়ে তার হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে লাগল। রিদম হম্বিতম্বি করে জানতে চাইল, “আরে, কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস ওকে?”

​লুহান সোজাসাপ্টা বলল, “বিয়ে করতে।”

​অনি দ্রুত এগিয়ে গিয়ে দরজার সামনে নিজের দুই হাত প্রসারিত করে পথ আগলে দাঁড়াল। চোখ রাঙিয়ে বলল, “হাতির বাচ্চা! পাগল হয়ে গেছিস নাকি? কয়টা বাজে খেয়াল আছে? তাছাড়া আমরা এখনো রাজি হইনি, বুঝলি?”

​লুহান রাগে ফুঁসে উঠে অনিকে জড়িয়ে ধরে কানে কানে বলল, “রাজি হয়ে যা প্লিজ, আমি তোর বেবিকে কোলে নিয়ে প্রতিদিন এক ঘণ্টা করে ঘুরে বেড়াব।”

​অনি ভেবে দেখল ডিলটা মন্দ নয়। সে ভাবুক ভঙ্গিতে চোখ ছোট করে বলল, “ডিলটা ভালো, বাট এক ঘণ্টায় ঠিক পোষাবে না। দু ঘণ্টা হলে ভেবে দেখা যেত।”

​লুহান দাঁত চেপে কৃত্রিম হেসে বলল, “ওকে, ডিল ডান! দু-ঘণ্টাই সই, এবার পথ ছাড়!”

লুহান অনির কাছ থেকে ছাড় পেয়ে মেলোকে নিয়ে এক কদম এগোতেই রিদম বলল, “আমি কিন্তু এখনো গ্রিন সিগন্যাল দিইনি।”

​লুহান এবার একরাশ বিরক্তি নিয়ে রিদমকে জড়িয়ে ধরল, “রাজি হয়ে যা দোস্ত! তুই ভেবে দেখ, যখন উর্বী রেগে গিয়ে তোকে বকাঝকা করে, তখন পাশে সান্ত্বনা দেওয়ার মতোও কেউ থাকে না। আমি কথা দিচ্ছি, এরপর থেকে টিস্যুর বক্স হাতে নিয়ে আমি তোর পাশে দাঁড়াব। তোকে রুম থেকে বের করে দিলে ওখানে তোর জন্য কাঁথা আর বালিশের ব্যবস্থা করে দেব।”

​রিদম চিবুক চুলকে ভাবনায় পড়ে গেল। উর্বীর রাগের কথা মনে পড়তেই তার শরীর শিউরে উঠল। সে বলল, “ডিলটা বেশ প্র্যাক্টিক্যাল। ঠিক আছে, কিন্তু রুমের বাইরে তো অনেক মশা! যদি একটা মশারির ব্যবস্থা করে দিতি, তাহলে রাজি হয়ে যেতাম।”

​লুহান বহু কষ্টে হাসি চেপে রেখে বলল, “ওকে ব্রো, ডান! মশারির দায়িত্বও আমার।”

​তাদের দুজনকে এভাবে রাজি করাতে দেখে উর্বী আর অনিলা মিটিমিটি হাসছিল। লুহান এবার সোহমের পাশে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। সোহম হয়তো তখন গভীর কোনো ভাবনায় ডুবে ছিল; লুহানের এই আকস্মিক কাণ্ডে তার ঘোর কাটল, সে চমকে উঠল।

লুহান তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “দোস্ত, তুই জাস্ট রাজি হয়ে যা। আমি নিজে তোর বিয়ের ঘটকালি করব। তোর চাহিদা মতো মেয়ে হবে পিওর ভা`র্জিন আর চোখ ধাঁধানো সুন্দরী।”

​সোহম নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল, “আরে বাবা, আমি আগে থেকেই রাজি! তুই দ্রুত বিয়ে করে নে।”

​এভাবেই সবাইকে মানিয়ে লুহান আবারও মেলোর হাত ধরে দরজার দিকে অগ্রসর হলো। পেছন থেকে অনি বলল, “এখনো কিন্তু এল হেফেকে রাজি করানো বাকি আছে।”

​লুহান পিছু ফিরে বলল, “ও আগে থেকেই রাজি।”

​রিদম বলল, “এত তাড়াহুড়োর কী আছে? জীবনে একবারই তো বিয়ে করবি। কোনো অ্যারেঞ্জমেন্ট করার ইচ্ছা নেই নাকি?”

​“না, নেই।”

​মেলো লুহানের হাত ধরে বলল, “ফুলের জন্যও অপেক্ষা করবি না?”

​লুহান মেলোর গালে হাত রেখে নরম স্বরে বলল, “আমি সকাল হওয়ার অপেক্ষাতেও থাকব না মেলো, যদি তোর মত পাল্টে যায়, সেই ভয়ে! তবে ফুল যখন ফিরে আসবে, তখন খুব বড় করে অনুষ্ঠান করব। ঠিক আছে? এবার চল না প্লিজ, আমাকে আর বাধা দিস না।”

​মেলো শুনল লুহানের কথা। আর আটকাতে চাইল না তাকে।

,

,

,

ঘড়ির কাঁটায় তখন ভোর পাঁচটা।

মেক্সিকোর এক প্রাচীন চার্চের অল্টারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে লুহান। তার পরনে ব্ল্যাক স্যুট, কবজিতে দামি ঘড়ি, চুলগুলো খুব পরিপাটি করে সেট করা। চার্চের কাঠের বেঞ্চগুলোতে উপস্থিত আছে উদ্যানসহ এস্টেটের বাকি সদস্যরা; সোহম, রিদম, অনি, উর্বী এবং অনিলা।

​কিছুক্ষণ পরেই চার্চের আইল দিয়ে ধীরলয়ে হেঁটে আসতে দেখা গেল মেলোকে। তার দুই হাতে শক্ত করে ধরা একগুচ্ছ তাজা সাদা গোলাপের তোড়া। গায়ে ধবধবে সাদা ব্রাইডাল গাউন, মাথায় লম্বা ভেইল আর সোনালি চুলগুলো সেই ভেইলের নিচে খোঁপা বাঁধা। এই সাজে তাকে অসম্ভব স্নিগ্ধ দেখাচ্ছিল।

​লুহানের চোখ আটকে গেল তার ওপর। তার চাউনির তীব্র উষ্ণতায় মেলোর ফর্সা গাল দুটো লাল হয়ে উঠল। সে লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলতেই লুহান হালকা হাসল।

ফাদার বাইবেল খুলে তাদের বিয়ে পড়ানো শুরু করতেই ভোরের প্রথম আলো জানালার ফাঁক গলে চার্চের মেঝেতে আছড়ে পড়ল।

​সব নিয়মকানুন মেনে বিয়ে পড়ানো শেষে ফাদার গাম্ভীর্যপূর্ণ গলায় ঘোষণা দিলেন, “নাউ, ইউ মে কিস দ্য ব্রাইড।”

​লুহান আলতো হাতে মেলোর কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে বুকের একদম কাছে টেনে নিল। তাদের চার চোখের দৃষ্টির মিলন ঘটতেই লুহান চোখের ইশারায় অনুমতি চাইল। প্রত্যুত্তরে মেলো চোখের পাতা সামান্য বুজে সম্মতি জানাল। পরপরই লুহান ধীরলয়ে ঝুঁকে পড়ল মেলোর মুখ বরাবর। খুবই সামান্য, কয়েক সেকেন্ডের জন্য তার ঠোঁট মেলোর ঠোঁটের সংস্পর্শে মিশে গেল।

​সঙ্গে সঙ্গেই বাকিরা মেকি নাটকীয়তায় দুহাতে নিজেদের চোখ ঢেকে নিল। উদ্যান অবশ্য তখন ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল, তাই সে চোখ ঢেকে ফেলার কোনো প্রয়োজনীয়তা টের পেল না।

​বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সব মিটে যেতেই চার্চের বাইরে এসে তারা প্রত্যেকে নিজেদের আলাদা আলাদা গাড়িতে উঠে বসল। উদ্যানের গাড়ি সাধারণত লুহান চালালেও, আজ সোহম ড্রাইভিং সিটে বসেছে। কারণ লুহান মেলোকে নিয়ে নিজের গাড়িতে করে এস্টেটে ফিরবে।

​সোহম অত্যন্ত শান্ত ও সুনিয়ন্ত্রিত ভঙ্গিতে মেক্সিকান সিটির ফাঁকা রাস্তা দিয়ে গাড়ি ড্রাইভ করছিল। তার ঠিক পাশের সিটেই বসে আছে উদ্যান। চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ তার, যেন দুচোখ ঘুমে ভারী হয়ে পড়েছে। পুরো গাড়ি জুড়ে এক থমথমে, পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছিল।

​এরই মধ্যে হঠাৎ নিস্তব্ধতা চিরে সোহমের কানে ভেসে এল অদ্ভুত একধরনের শব্দ—ধুকপুক… ধুকপুক… ধুকপুক…।

​সোহম কান খাড়া করে সতর্ক চোখে আশেপাশে তাকিয়ে শব্দের উৎস খোঁজার চেষ্টা করল। উদ্যানের তন্দ্রাচ্ছন্নতা কেটে যেতেই সে হাতে থাকা ফোনটা চোখের সামনে তুলে ধরল। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে ‘রিদম’ নামে সেভ করা নম্বরটা।

​সোহম কৌতূহল দমাতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, “তোর রিংটোনের কী হয়েছে? এমন অদ্ভুত শব্দ আসছে কেন?”

​উদ্যান ফোনটা রিসিভ করার আগে আরও কয়েক সেকেন্ড চোখ বুজে রইল। যেন ওই শব্দটা সে নিজের ভেতরে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছে। আচ্ছন্নতার সুরে সে বিড়বিড় করল, “উইয়ার্ড সাউন্ড নয় এটা। দিস ইজ দ্য হার্টবিট অব মাই ফ্লাওয়ার…”

​“হার্টবিট? ওটা ফুলের হার্টবিটের শব্দ?”

​সোহম ফুলের হার্টবিটের শব্দ শুনে ফেলেছে উপলব্ধি করতেই উদ্যান দ্রুত কলের সবুজ বাটনটা সোয়াইপ করে কানে চেপে ধরল, “হ্যালো রিদম, কী হয়েছে?”

​রিদম ওপাশ থেকে উদগ্রীব কণ্ঠে বলল, “তেহ! অনিলার লেবার পেইন উঠেছে! অবস্থা সুবিধাজনক নয়। ওকে নিয়ে অনি হসপিটালে যাচ্ছে। আমরা বাকিরাও এস্টেটে না গিয়ে সরাসরি ওখানেই যাচ্ছি।”

​উদ্যানের চোখের মণি দুটো তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। সে সিটে সোজা হয়ে বসে পাল্টা প্রশ্ন করল, “কোন হসপিটাল?”

​রিদম ওপাশ থেকে চটজলদি হসপিটালের নাম আর লোকেশন বলে দিয়ে লাইন কেটে দিল। উদ্যান ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে সোহমের উদ্দেশ্যে গম্ভীর গলায় বলল, “আমাদের রুট চেঞ্জ করতে হবে সোহম।”

চলবে,,,

শব্দসংখ্যা: ৪৩০০+

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply