Golpo romantic golpo অবাধ্য হৃৎস্পন্দন

অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৭১


অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন (৭১)

সোফিয়া_সাফা

ফিরে দেখা অতীত <শেষ>

(A/N: পুরো পর্বের সংলাপ গুলো স্প্যানিশ এবং ইংরেজিতে হলেও বোঝার সুবিধার্থে বাংলায় লেখা হলো।)

তুষারাবৃত ধূসর পথ চিরে গাড়িটা এগিয়ে চলেছে। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তিতে সোহম আর রিদম গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। উদ্যান একমনে ফোনের স্ক্রিনে আঙুল চালাচ্ছে, কিন্তু তার কপালে চিন্তার ভাঁজ। সময় হিসাব করে দেখল, গন্তব্যে পৌঁছাতে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি দেরি হয়ে যাচ্ছে।

উদ্যান সন্দিহান কণ্ঠে আওড়াল, “রিহান, আমরা সঠিক পথেই যাচ্ছি তো? এত সময় তো লাগার কথা নয়।”

রিহান অহমিকার বশে ‘হাহ’ শব্দ উচ্চারণ করল, “তুমি আমাকে বিরক্ত করছো কেন বারবার?”

“বিরক্ত কোথায় করলাম? এক কাজ করো, লোকেশন টা আমাকে পাঠিয়ে দাও।”

“আমি তোমাকে কেন পাঠাবো? চুপচাপ বসে থাকো, নইলে তোমার নামে আমি পাপার কাছে কমপ্লেইন করবো।”

উদ্যান কথা না বাড়িয়ে লুহানের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ইশারা করল। লুহান ঠোঁট নেড়ে বিড়বিড় করল, “আমি রেডিই আছি।”

কিছুক্ষণ পর শব্দ তুলে গাড়িটা থেমে গেল। বাইরে তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার আর হাড়কাঁপানো ঠান্ডা। সবাই উলের মোটা জ্যাকেট আর গ্লাভস পরে গাড়ি থেকে নামল। ড্রাইভার ভাড়া চাইতেই রিহান আদেশের সুরে উদ্যানকে বলল, “দাঁড়িয়ে আছো কেন? দেখো কত টাকা হয়েছে, মিটিয়ে দাও।”

লুহান কিছু বলতে চেয়েও দমে গেল উদ্যানের ইশারায়। অনি নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে ভাড়া মিটিয়ে দিল। উদ্যান ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে ইংরেজিতে বলল, “আপনি এখানেই অপেক্ষা করুন। আমরা কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফিরব।”

কথাটা কানে যেতেই রিহান তেড়ে এল। “তুমি বেশি হুঁশিয়ারি দেখাবে না বলে দিলাম! কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফিরব, মানে কী? কার্টেল বসের ছেলে আমরা। বুঝলে? অনেক খাতিরদারি করবে, দেখো। তারপর নিজেদের গাড়িতে করে হোটেলেও ছেড়ে দিয়ে আসবে।”

উদ্যান ঘাড় কাত করে কপাল চুলকাতে চুলকাতে শান্ত গলায় বলল, “সে তুমি নাহয় কার্টেল বসের ছেলে বলে এক্সট্রা সুবিধা পাবে। আমাদেরকেও তো ফিরতে হবে, নাকি?”

“​সমস্যা নেই, আমাদের সাথেই ফিরতে পারবে।” বলে রিহান ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে দম্ভের সাথে ইংরেজিতে বলল, “ভাড়া তো পেয়েই গেছেন, ইউ ক্যান লিভ নাউ (আপনি এখন যেতে পারেন)।”

ড্রাইভার কালক্ষেপণ না করে ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে চলে গেলেন। গাড়ির পেছনের লাল আলোটা অন্ধকারে মিলিয়ে যেতেই চারপাশে এক ভৌতিক নিস্তব্ধতা নেমে এল। সবাই একটা সরু গলি ধরে এগোতে লাগল। গলির শেষ প্রান্তে এসে দেখা মিলল এক বিশাল বহুতল ভবনের। ভবনের গা ঘেঁষে অসংখ্য ছোট ছোট নিয়ন লাইট জ্বলছে। মূল ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে আছে একদল সশস্ত্র সিকিউরিটি গার্ড।

উদ্যানের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বিপদ আঁচ করতে পারল। থেমে দাঁড়াল সে। কিন্তু রিহান ততক্ষণে গার্ডদের সামনে গিয়ে দাপটের সাথে বলে দিল, “আমরা ভিআইপি। ভেতরে যেতে দিন।”

গার্ডদের লিডার একবার তীক্ষ্ণ চোখে তাদের পা থেকে মাথা পর্যন্ত মেপে নিলেন। সম্ভবত তাদের কাছে আগে থেকেই খবর ছিল যে আজ কিছু বিশেষ অতিথি আসবে। কোনো প্রশ্ন ছাড়াই তারা ভারী দরজাটা খুলে দিল। ভেতরে ঢোকার ঠিক আগের মুহূর্তে উদ্যানের চোখ পড়ল এক গার্ডের কবজিতে থাকা একটা বিশেষ ট্যাটুর ওপর।

মুহূর্তে উদ্যানের চোয়াল আড়ষ্ট হয়ে গেল। সে বাকিদের আটকানোর জন্য হাত বাড়াল ঠিকই, কিন্তু ততক্ষণে রিহানের পিছু পিছু সবাই ভেতরে ঢুকে পড়েছে। নিরুপায় হয়ে উদ্যানকেও ভেতরে পা রাখতে হলো।

ভেতরের জাঁকজমক পরিবেশ দেখে রিহানের চক্ষু চড়কগাছ। আর বাকিদের চোয়াল ঝুলে গেল আতঙ্কে। উদ্যান দ্রুত পায়ে এগিয়ে রিহানের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, “আমার কাছে তিনটা গুড নিউজ আছে তোমার জন্য। প্রথমত, এটা কোনো সিক্রেট মিটিংপ্লেস নয়, বরং একটা নাইটক্লাব। দ্বিতীয়ত, এরা আমাদের মিত্র নয়; রিভেল গ্যাংয়ের সদস্য। আর শেষ কথা হলো, আমরা ভুল জায়গায় চলে এসেছি।”

রিহানের শরীর থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। সে পাশে তাকাতেই দেখল উদ্যানের সেই চিরচেনা কঠোর দৃষ্টি তার ওপরেই আবদ্ধ। যা দেখে রিহানের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। অজান্তেই তার ঠোঁট গলে বেরিয়ে এল, “সরি হার্দিন!”

ভেতরের বড় হলঘরে তখন কয়েকজন উচ্চপদস্থ গ্যাং মেম্বার বসে দাবা খেলছিল। উদ্যানদের আকস্মিক আগমনে তারা খেলা থামিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই রিহান ভয়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। উদ্যান চাপা গলায় বলল, “ডোন্ট প্যানিক।”

কিন্তু রিহান ততক্ষণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। সে উল্টো ঘুরে দৌড়ে পালাতে চাইল। আর অমনি পুরো পরিবেশটা প্রতিকূলে চলে গেল। ভেতরে থাকা লিডারের এক ইশারায় খটখট শব্দে মূল ফটক বন্ধ হয়ে গেল।

উদ্যান বুঝল পিছু হটার রাস্তা বন্ধ। সে যতটা সম্ভব নির্লিপ্ত থেকে লিডারের দিকে এগোতে লাগল। হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “হ্যালো, নাইস টু মিট ইউ।”

লিডার এক মুহূর্তের জন্য দ্বিধায় পড়ে গেলেন; তারা কি শত্রু নাকি ভুল করে আসা কোনো মিত্র? বুঝে উঠতে পারলেন না। চোখের পলকে উদ্যান আরও কিছুটা এগিয়ে গিয়ে সামনে থাকা ভারী কাঠের টেবিলটা এক ঝটকায় উল্টে দিল। টেবিলটাকে শিল্ড বানিয়ে সে বিদ্যুৎবেগে সিঁড়ির দিকে ধেয়ে গেল।

“লুহান! রিহানকে ধর!” উদ্যানের গর্জন শোনা গেল।

​লুহান কোনোমতে কাঁপতে থাকা রিহানকে এক হাতে জাপটে ধরে বাকিদের নিয়ে উদ্যানের দেখানো পথে উপরে উঠতে শুরু করল। পেছনে তখন রিভেল গ্যাংয়ের চিৎকার আর অস্ত্র বের করার ধাতব শব্দ প্রতিধ্বনি তুলছে।

সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ানোর সময় রিদম প্রশ্ন করল, “আমরা উপরে যাচ্ছি কেন?”

লুহান উদ্যানের হয়ে ক্ষিপ্র গলায় জবাব দিল, “নিচে দাঁড়িয়ে থাকলে এতক্ষণে ঝাঝরা হয়ে যেতাম। ওরা মেইন গেট বন্ধ করে দিয়েছে। উপরে যাওয়া ছাড়া আপাতত কোনো রাস্তা খোলা নেই।”

ততক্ষণে পুরো ক্লাবে সাইরেন আর রেড অ্যালার্মের কানফাটানো শব্দ বাজতে শুরু করেছে। করিডোরে করিডোরে গার্ডদের বুটের শব্দ। বিশৃঙ্খলার মধ্যে উদ্যান বাকিদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল; ওর সাথে রইল শুধু সোহম আর রিদম। তারা এখন তিনতলায়। একটা করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় উদ্যান থমকে দাঁড়াল। সামনে একটা বিচিত্র দৃশ্য।

একজন মাঝবয়সী মহিলা একটা দালাল গোছের লোকের সাথে টাকা নিয়ে চড়া গলায় দর কষাকষি করছেন। পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণী; যার চোখেমুখে উপচে পড়া বিতৃষ্ণা। মহিলাটি মেয়েটার বাহু খামচে ধরে বললেন, “তাকিয়ে দেখুন, এত সুন্দর একটা মেয়ের বদলে আপনি এই সামান্য কটা টাকা দিচ্ছেন?”

লোকটার চোখেমুখে চরম বিরক্তি। “ম্যাম, আপনার মেয়ে সুন্দরী বলেই এত বছর এখানে কাজ করার সুযোগ পেয়েছে। এখন বুঝুন, ও তো আর ভা`র্জিন নয়। ক্লায়েন্টরা ওকে দেখতে দেখতে হাঁপিয়ে উঠেছে। ওকে দেখাতে গেলে বলে ‘নতুন কিছু দেখাও।”

মহিলাটা হার মেনে বললেন, “তবুও দেখুন না, আরও যদি কিছু বাড়িয়ে দেওয়া যায়। এই অল্প কটা টাকায় তো আমার এক সপ্তাহও চলবে না।”

পুরো দৃশ্যটা দেখে উদ্যান সোহমের দিকে তাকাতেই সোহম বাঁকা হাসল। সে চোখের ইশারাতেই বুঝে গেছে উদ্যান কী করতে চাইছে। রিদম কেবল বোকার মতো তাকিয়ে রইল।

দালাল লোকটা টাকা আনতে পাশের রুমে ঢুকতেই উদ্যান চিতার গতিতে মেয়েটার পেছনে গিয়ে তার মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে ধরল। সোহম এক মুহূর্ত দেরি না করে মহিলাটিকে ধাক্কা দিয়ে রুমের ভেতর ঢুকিয়ে বাইরে থেকে দরজা আটকে দিল।

মেয়েটা ভয়ে ভয়ে দুহাত উপরে তুলল। উদ্যান তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে, কপালে বন্দুকের নল চেপে ধরেছে। মেয়েটা কাঁপা গলায় প্রশ্ন করল, “হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট ফ্রম মি? (কী চাই আপনাদের?)”

উদ্যান তার কানের কাছে মুখ নামিয়ে ভরাট কণ্ঠে শুধাল, “তুই নাকি অনেক বছর ধরে এখানে কাজ করছিস?”

​“হ্যাঁ… ত-তো?”

“আমাদের বাইরে বেরোনোর একটা গোপন রাস্তা দেখা। মনে রাখিস, কোনো চালাকি করলে খুলি উড়িয়ে দেব।”

​মেয়েটা ঘাড় নেড়ে সায় দিল। “আমি একটা সুড়ঙ্গ চিনি, কিন্তু তার দরজায় তালা দেওয়া থাকে। আর সেই দরজার চাবি ওই লোকটার কাছে আছে।”

উদ্যান দাঁতে দাঁত চেপে সোহমকে ইশারা করতেই সোহম বন্দুক উঁচিয়ে সন্তর্পণে রুমের ভেতরে ঢুকে— লোকটাকে শ্যুট করে দিল। যা দেখে মহিলাটি চিৎকার করে উঠলেন, “আমাকে শ্যুট করবেন না, আমার কোনো টাকা লাগবে না। ওকে আপনারা এমনিতেই নিয়ে যান।”

সোহম বিরক্ত হলো, “জাস্ট শাট আপ!” তারপর চাবিটা পকেটে ভরে বেরিয়ে এল।

মেয়েটার বাহু চেপে ধরে উদ্যান পা বাড়াল। মেয়েটা কোনোমতে শুকনো ঢোক গিলে বলল, “চলুন, নিয়ে যাচ্ছি।”

উদ্যান তাকে টেনে অন্যদিকে নিয়ে যেতে যেতে বলল, “আগে বাকিদের খুঁজে বের করি, তারপর বের হবো।”

পুরো ত্রিশ মিনিট তল্লাশি চালানোর পর লুহান, অনি আর রিহানের খোঁজ মিলল। তারা একটা স্টোর রুমের ভেতরে আটকা পড়েছে, দরজার বাইরে গার্ডস থাকায় বের হতে পারছে না। এক ফাঁকে লুহান সুযোগ বুঝে অনি আর রিহানকে দৌড়াতে বলল। অনি সাহসের সাথে রিহানের হাত ধরে করিডোর দিয়ে ছুটতে শুরু করল। কিন্তু প্রচণ্ড আতঙ্কে রিহান হোঁচট খেয়ে উপুড় হয়ে পড়তেই এক গার্ডের নজরে পড়ে যায় তারা।

পরপর দুটো গুলির আওয়াজ! অনি রিহানকে টেনে তোলার চেষ্টা করতেই একটা বুলেট এসে বিঁধল অনির পায়ে। যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠলেও সে রিহানকে ছাড়ল না। লুহান পেছন থেকে কভার ফায়ার করে তাদের পালানোর সুযোগ করে দিল। সোহমও তৎক্ষনাৎ ছুটে গিয়ে অনিকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করল।

মেয়েটার দেখিয়ে দেওয়া গোপন সুড়ঙ্গ দিয়ে তারা মাটির নিচের এক সংকীর্ণ পথে নামল। সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় একটা বিশাল লোহার দরজা। লুহান মরিয়া হয়ে তালায় গুলি করতে গেলে মেয়েটা হাত চেপে ধরল। “না! গুলি করলে তালা জ্যাম হয়ে যাবে। চাবি দিয়ে খুলুন।”

সোহম পকেট থেকে চাবি বের করে এগিয়ে দিল। চাবি ঘোরানোর সাথে সাথেই ‘ক্লিক’ শব্দে দরজাটা খুলে গেল। বাইরের তুষারশীতল বাতাস ঝাপটা দিয়ে ঢুকল ভেতরে। বাইরের মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে পেরে সবাই স্বস্তি খুঁজে পেল। কিন্তু মুক্তির আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।

অনির পায়ের ক্ষত থেকে চুইয়ে পড়া রক্ত আর প্রচণ্ড ব্যথায় তার প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল যন্ত্রণাদায়ক। লুহান আর সোহম দুপাশ থেকে তাকে ধরে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল। উদ্যান মেয়েটাকে মুক্ত করে দিলেও মেয়েটা তাদের সাথে সাথেই হাঁটছে।

রিদম বিরক্তি নিয়ে পেছনে ফিরল। “শোন, আমার পাপা একটা নীতি মানেন—‘গিভ অ্যান্ড টেক’। তুই আমাদের বের হতে সাহায্য করেছিস, তার বদলে আমরা তোকে ছেড়ে দিয়েছি। হিসাব চুকে গেছে। তবুও কেন পিছু পিছু আসছিস?”

মেয়েটি থামল না। বরফে পা ডুবিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দৃঢ় গলায় বলল, “আমি ওখানে ফিরে যেতে চাই না। ওই জায়গাটা একটা হেল।”

কেউ আর কথা বাড়াল না। উদ্যান তো একদমই মুখে কুলুপ এঁটেছে। রিহানও মাথা নিচু করে হেঁটে চলেছে। মেয়েটি সবার গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে পরিবেশ হালকা করার চেষ্টা করল। “আই সি, তোদের টিমে একজনও মেয়ে নেই। আচ্ছা তোদের রান্না করে খেতে সমস্যা হয় না? নাকি কাজের মেয়ে আছে?”

অনি ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছিল, তবুও কোনোমতে বলল, “কাজের মেয়ে নেই। রান্না আমিই করি, বাকিরা পালাক্রমে হাত লাগায়।”

সুযোগটা লুফে নিল মেয়েটি। “কী আফসোস! অথচ আমি কী দারুণ রান্না করতে পারি।”

লুহান আর সোহম একযোগে প্রশ্ন করল, “সত্যিই?”

মেয়েটি জ্যাকেটের পকেটে হাত গুঁজে মাথা নাড়াল। “জি জনাব। আর একটা কথা শুনলে তোরা একেবারেই হতভম্ব হয়ে যাবি।”

রিদম কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, “সেটা কী?”

​মেয়েটি হুট করে দাঁড়িয়ে পড়ল। “তোরা ভুল পথে যাচ্ছিস। ওইদিকে কোনো রাস্তা নেই।”

কথাটা কানে যেতেই উদ্যানের পা থমকে গেল। প্রচণ্ড রাগে আর উত্তেজনায় সে ম্যাপ দেখার কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিল। তাড়াহুড়ো করে ফোন বের করে অন করার চেষ্টা করল সে, কিন্তু স্ক্রিন অন্ধকার হয়েই রইল। মনে পড়ে গেল অতিরিক্ত ঠান্ডায় ব্যাটারির চার্জ দ্রুত শেষ হয়ে যায়।
“তোদের কারো ফোনে চার্জ আছে?”

সবাই একে একে ফোন চেক করল। কিন্তু কারো ফোনেই চার্জ ছিল না। উদ্যান বিকল্প কিছু ভাবতে যাবে তার আগেই মেয়েটা বলল, “আমি কিন্তু তোদের শহরে পৌঁছাতে হেল্প করতে পারি।”

লুহান ঝটকা টানে বন্দুক বের করে মেয়েটার কপালে চেপে ধরল। “চালাকি করছিস আমাদের সাথে? জলদি বল সঠিক পথ কোনটা!”

মেয়েটি বিন্দুমাত্র ঘাবড়ে না গিয়ে উল্টো ঘুরে লুহানের বন্দুকের নলটা খপ করে ধরে ফেলল।
“আমি এক শর্তে সাহায্য করবো, আর সেটা হলো আমাকেও সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হবে।”

লুহান বিমূঢ় হয়ে পড়ল। সে মেয়েটিকে টেনে নিয়ে গেল উদ্যানের সামনে। “কী করবো একে?”

উদ্যান একবার অনির দিকে তাকাল। অনির কপালে ঘাম জমেছে, যন্ত্রণায় রীতিমতো গোঙাচ্ছে। বেশি দেরি করলে ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়তে পারে।
“ঠিক আছে, আমাদের শহরে নিয়ে চল।”
,
,
,
প্রায় এক ঘণ্টা হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় হাঁটার পর তুষারচাদরে ঢাকা শহরের আলোগুলো নজরে এল। রাত তখন তিনটা। দুটো ট্যাক্সি জোগাড় করে তারা দ্রুত ছুটল হাসপাতালের দিকে।
অনিকে অপারেশন থিয়েটারে ঢুকিয়ে দিয়ে উদ্যান ফোন চার্জে বসালো। তারপর ধীর পায়ে রিহানের সামনে এসে দাঁড়াল।
“তোমার কাছে কি আরও কোনো প্ল্যান আছে? নাকি বাকিটা আমাকে সামলাতে দেবে?”

কথাটা রিহানের গায়ে লাগলেও সে মাথা নিচু করে অপরাধীর মতো বলল, “না… তুমি যা বলবে, তাই হবে।”

পরের তিনদিন উদ্যানের কথামতো তারা হোটেল পাল্টে একটা সাধারণ, জনাকীর্ণ হোটেলে আস্তানা গাড়ল। এমনিতেই রিভেল গ্যাং তাদের উপস্থিতি সম্পর্কে জেনে গেছে। তাই উদ্যান পরিস্থিতি শিথিল হওয়ার অপেক্ষায় থাকল।
,
,
,
তারা নরওয়ে থেকে ব্যাক করেছে গতকাল। আজ নিজেদের বাড়িতে ফিরে সোহম আর অনি স্বস্তিতে ড্রইংরুমের সোফাতেই গা এলিয়ে দিল। উদ্যান বিশেষ কিছু না বলে পা বাড়াল নিজের ঘরের দিকে। তাদের সাথে আসা মেয়েটি কৌতূহলী চোখে ড্রয়িংরুমের আসবাবপত্র থেকে শুরু করে দেয়ালের সূক্ষ্ম কারুকাজ; সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল। তখনই লুহান তার সামনে এসে দাঁড়াল। ঘাড় চুলকাতে চুলকাতে বলল, “একমিনিট তোর নামটাই তো জানা হয়নি।”

মেয়েটি সোহমের পাশের সোফাটায় বেশ একটা শব্দ করে বসে পড়ল। নির্লিপ্ততা নিয়ে উত্তর দিল, “আমার নাম এ-মেলো। তোরা চাইলে মেলো বলেও ডাকতে পারিস। বয়স একুশ।”

সোহম চোখ বুজে ছিল। ক্লান্ত গলায় প্রশ্ন ছুড়ল, “ওকে কোথায় থাকতে দিবি? বল।”

পরপরই আশঙ্কায় লুহানের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। “অসম্ভব! যা-ই হয়ে যাক না কেন, আমি কিন্তু নিজের রুম কিছুতেই ছাড়তে পারব না।”

অনির কপালে ভাঁজ পড়ল, “তাহলে কি তেহকে গিয়ে তোর রুমে শিফট হতে বলবো?”

সোহম একটা শুকনো ঢোক গিলল, “তোর সাহস আছে ওকে গিয়ে বলার?”

অনি মাথা নাড়ল, “আমার তো নেই। তবে লুহান যদি নিজের রুম ছাড়তে না চায়, তাহলে ও-ই গিয়ে বলবে।”

মেলো তাদের এই তর্কাতর্কি শুনে অবাক হয়ে মাঝপথে বলে উঠল, “বাড়িটা তো অতোটাও ছোট মনে হচ্ছে না, তবে রুম নিয়ে সমস্যা হবে কেন?”

লুহান বুঝিয়ে বলল, “রুম আরও দুটো আছে। বাট একটাকে মিটিং রুম আরেকটাকে স্টাডি রুম বানানো হয়েছে।”

কিছুক্ষণ পর একটা কুইক শাওয়ার নিয়ে ফিরে এল উদ্যান। তার পিছু পিছু লেজ নাড়তে নাড়তে তানও বেরিয়ে এল। উদ্যান সোজা কিচেনে গিয়ে চায়ের জন্য পানি বসাল। অনি সুযোগ বুঝে মেলোকে বলল, “তুই গিয়ে ওকে চা বানিয়ে দে, যা। তাহলে হয়তো তোর জন্য রুমের ব্যবস্থা করে দেবে।”

মেলো তব্দা খেয়ে বসে রইল। সোহম তাড়া দিয়ে বলল, “হা করে আছিস কেন। যা না বাবা।”

মেলো একরকম ধড়ফড়িয়ে উঠে চলে গেল কিচেনে। উদ্যান পানি বসিয়ে তানকে খাওয়াচ্ছিল। মেলো গিয়ে গলা পরিষ্কার করে জানতে চাইল, “আমি চা-টা বানিয়ে দেবো?”

উদ্যান তার দিকে না তাকিয়েই বলল, “প্রয়োজন নেই। শুধু অনি যখন রান্না করতে আসবে তখন বরং ওকে একটু সাহায্য করিস।”

মেলো মাথা নেড়ে চলে আসতে নেবে তখুনি উদ্যানের ভরাট কণ্ঠের প্রশ্ন তাকে থামিয়ে দিল, “পড়াশোনা করেছিস?”

মেলো অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে জবাব দিল, “করেছি, হাই-স্কুল পর্যন্ত।”

“আমাদের সাথে থাকতে হলে আরও পড়াশোনা করতে হবে।”

মেলো মাথা নিচু করে ফেলল, “তুই আমাকে এমনি এমনি পড়াশোনা করাবি?”

“একদমই না। ভবিষ্যতে আমাদের হয়ে কাজ করতে হবে। সেই জন্যই করাবো।”

“তোর মনে হয় আমি তোদের কাজে সাহায্য করতে পারব?”

উদ্যান কিছু সময় চুপ থেকে সংক্ষেপে ‘হুম’ বলল। এই একটি শব্দই যেন মেলোর শিরা-উপশিরায় এক অজানা শিহরণ জাগিয়ে তুলল। এই প্রথম কেউ তার দিকে না তাকিয়েও তার মাঝে সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছে। সে তাদের সাথে এসে একদম সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

তাদের বাড়িতে তিনটা বেড রুম আছে। অনি ও সোহম একটাতে আর অন্য দুটোতে লুহান আর উদ্যান থাকে। উদ্যানকে নিজের রুমে শিফট হতে লুহান বলতে পারেনি আর নাতো উদ্যানের রুমে শিফট হতে চাইতে পেরেছে। বাধ্য হয়ে তাকেই অনি আর সোহমের রুমে চলে যেতে হয়েছে। রুম বড় থাকায় তাদের সমস্যা হয়নি অবশ্য।

অনির পা পুরোপুরি ভালো না হওয়ায় সে বাদে বাকিরা কাজে বের হয়েছে। অনি বসে না থেকে আজ আগেভাগেই রাতের রান্না বসিয়ে দিল। ভেবেছিল মেলো আছে তাই তারা দুজন মিলে সামলে নিতে পারবে। মেলোও বেশ উৎসাহ নিয়ে কোমরে অ্যাপ্রোন বেঁধে পাকা গিন্নির মতো রান্নাঘরে হাজির হলো।
কিন্তু মিনিট কয়েকের মধ্যেই অনি বুঝে গেল সে আসলে রান্নার ‘র’-ও জানে না। অনি যেই কড়াইতে গরম তেলের ওপর মাছের টুকরোটা ছাড়ল, অমনি ফড়ফড় করে শব্দ হতেই মেলো লাফিয়ে উঠে কিচেন থেকে দৌড়ে পালালো।

অনি একা হাতে রান্না করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সে রান্না শেষ করে ড্রইংরুমে এসে দেখল, মেলো সোফায় বসে আছে, তার দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুখটা দেখে মনে হচ্ছে কোনো গভীর সাগরে তলিয়ে যাচ্ছে সে। অনিকে দেখামাত্রই সে মাথা নিচু করে ধরা গলায় বলল, “সরি, আসলে আমি রান্নাবান্না জানি না।”

​অনি বিনাবাক্যব্যয়ে পাশের সোফাটায় এলিয়ে পড়ল। চোখ বোজা অবস্থাতেই বিড়বিড় করল, “হুম, সেটা তো হাড়েই হাড়েই টের পেয়েছি। কিন্তু মিথ্যা কেন বলেছিলি?”

“মিথ্যে না বললে কি তোরা আমাকে আনতি নিজেদের সাথে?”

“তো, এখন জানার পরেও তো বের করে দিতে পারি নাকি?”

মেলো হকচকিয়ে গেল, “না প্লিজ। আমি রান্না শিখে নেবো।”

“তোকে কতকিছু শিখতে হবে ধারণা আছে?”

“আর কী কী শিখতে হবে?”

“স্প্যানিশের পাশাপাশি বাংলাও শিখতে হবে। তার ওপর তেহ বলেছে তোকে ভার্সিটিতে ভর্তি করিয়ে দেবে। সেই সাথে আবার রান্নাও শিখবি কীভাবে?”

মেলো কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। দেয়ালের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে বলল, “আমার মা আমাকে শুধু মনোরঞ্জন করতেই শিখিয়েছে। অন্য কিছুই শেখায় নি। আমি দরকার হলে দিনরাত এক করে সব শিখে নেবো, শুধু আমাকে থাকতে দে এখানে।”

অনি একবার আঁড়চোখে তাকাল মেলোর দিকে। মনে মনে হাসল সে; আচ্ছা, মেলো কি জানে সে আসলে একজন প্লেবয়? জানলে কি আর তার সামনে এভাবে বলতে পারত? মেয়েটা বোধহয় তাদের সবাইকে দেবদূত ভেবেই বসে আছে।
ভাবনার মাঝেই মেলোর সাথে তার চোখাচোখি হয়ে গেল। সবচেয়ে বেশি অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল অনি নিজে। কেন যেন মেলোর চোখের দিকে তাকিয়ে কোনো বাজে চিন্তা তার মাথায় এল না। বরং মনে হলো, মেয়েটা যেন ঠিক তাদের মতোই একজন। অথচ অনি মেয়েদের প্রতিই সবচেয়ে বেশি উইক।

পরবর্তী ছয়টি মাস উদ্যানদের বড্ড ব্যস্ততার মধ্যে কাটলো। এল হেফে তাদের একের পর এক কঠিন মিশনে পাঠাতে লাগলেন। উদ্যান তার অসামান্য বুদ্ধি আর বিচক্ষণতার জোরে প্রতিটি মিশনে সফল হয়ে এল হেফের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষে পরিণত হলো। সেই শুভক্ষণটিও এল একদিন, যখন উদ্যানকে কার্টেলের ‘এল সেগুন্দো’ পদে নিযুক্ত করা হলো।

সময়ের স্রোতে দিন গড়িয়ে বছর পেরোল। এক বৃষ্টিস্নাত দিনের পরে অনিলাকেও তুলে নিয়ে এল অনি। উদ্যান প্রথমে একটু মেজাজ দেখালেও বেশি কিছুই বলেনি। কারণ সে কখনোই কারো পার্সোনাল বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পছন্দ করতো না।
এল সেগুন্দো হওয়ার পরপরই উদ্যান তার বাবার উন্নত চিকিৎসার জন্য সব ব্যবস্থা সম্পন্ন করে তাকে ইউএসএ পাঠিয়ে দিল। অবশ্য সে ডিস্ট্রিবিউশন কাপো হওয়ার পরেই তার বাবাকে নিজের কাছে নিয়ে এসেছিল।

যত দিন যাচ্ছিল, উদ্যান যেন কার্টেল বস ট্রুয়েনোর আত্মার আত্মীয় হয়ে উঠছিল। আর এই দৃশ্যটি রিহানের কাছে বিষের মতো মনে হতো। উদ্যানকে সে এখন নিজের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।
উদ্যান তার নিজস্ব গ্রুপ ‘টি’কে’ (T.K Group) শুরু করার কিছুদিনের মধ্যেই ট্রুয়েনো গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। বার্ধক্য আর দীর্ঘদিনের অসুস্থতা তাকে শয্যাশায়ী করে ফেলল। কিছুটা সুস্থ হয়েই তিনি ঘোষণা দিলেন; উদ্যানই হবে পরবর্তী এল হেফে। এই খবর রিহানের কানে পৌঁছানো মাত্রই তার পায়ের তলার মাটি সরে গেল যেন।

“পাপা তুমি এমনটা কীভাবে করতে পারলে?” রিহানের প্রশ্নে ট্রুয়েনো ক্লান্ত চোখে তাকালেন। তিনি নিজের রুমেই বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। উদ্যান বাকিদের নিয়ে তাকে দেখতে এসেছিল।

“অকারণে চেঁচামেচি করো না হান। আমি তেহ-কে এমনি এমনি কার্টেল বস বানাইনি, সেটা তুমিও খুব ভালো করেই জানো।”

রিহানের পাগলের মতো হাসতে লাগল। তীব্র কণ্ঠে বলল, “তুমি আমাদের সাথে বেঈমানী করেছো পাপা। বঞ্চিত করেছো অধিকার থেকে।”

“করি নি রিহান, তুমি জানো কীভাবে আমাদের রিভেল গ্যাং আমার মৃত্যুর অপেক্ষায় আছে? তেহ তোমাকে সেগুন্দো বানাবে। তোমাদের সব দায়িত্ব আমি ওর ওপর দিয়ে যাবো। সেটাই ভালো হবে, তোমাদেরকে কোনো কিছু নিয়ে ভাবতে হবে না। শুধু ওকে যতটুকু পারো সহযোগিতা কোরো।”

রিহান রেগেমেগে তেড়ে যেতে চাইল উদ্যানের দিকে। পথিমধ্যেই লুহান তড়িৎ বেগে এসে তাকে আটকায়। উদ্যান শুধু তাকিয়ে ছিল নির্লিপ্ত চোখে। রিহানের উগ্রতা দেখে ট্রুয়েনো ব্যথিত হলেন, “কার্টেল বস হওয়া চাট্টিখানি কথা নয় রিহান। আগেই বলেছিলাম যোগ্যতা অর্জন করতে হবে।”

“তোমার চোখে তো শুধু এই তেহ বাদে পুরো দুনিয়াটাই অযোগ্য পাপা।”

“আমি তোমার সাথে তর্কে জড়াতে চাই না। তুমি না সিঙ্গাপুর ঘুরতে গিয়েছিলে? ফিরে এলে কেন? পাপার অসুস্থতার খবর শুনে তো আসোনি। যেই শুনলে আমি তেহকে বস বানিয়ে দিয়েছি অমনি একেবারে ছুটে চলে এসেছো।”

রিহান তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “তুমি তো আমাকে কখনো ছেলে ভাবতে পারো নি। তাও আশা কীভাবে করো যে আমি তোমাকে নিজের বাবা ভাবতে পারবো?”

ট্রুয়েনোর চাউনি শক্ত হলো, “ক্ষমতার অধিকার চাওয়ার বেলায় তো তোমার মনে হয়না যে আমি তোমাদের বাবা নই। শুধু আমার প্রতি দায়িত্ব পালনের সময়েই কেন মনে হয় যে আমি তোমাদের জন্মদাতা নই?”

রিহান চেঁচিয়ে উঠল, “এখন থেকে আর চাইব না। তোমার আপন ছেলে তো নই আমরা, কিসের তবে অধিকারের লড়াই? রিদ, আমরা এক্ষুণি চলে যাবো এখান থেকে।”

বলেই রিহান গিয়ে রিদমের হাত ধরল। কিন্তু রিদম নড়ল না। সে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে শান্ত গলায় বলল, “তুই কেন পাগলামি করছিস হান? মানছি পাপা আমাদের জন্মদাতা নন, কিন্তু আমাদের জীবনে ওনার অবদান কি তুই অস্বীকার করতে পারবি? ভুলে যাস না, দিল্লির সেই ধূলাবালি মাখা রাস্তা থেকে আমাদের তুলে এনে এই রাজপ্রাসাদে ঠাঁই দিয়েছিলেন তিনি।”

কথাটা শোনামাত্র রিহান হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে রিদমকে এক প্রবল ধাক্কা দিয়ে বসল। টাল সামলাতে না পেরে রিদম ছিটকে গিয়ে মেঝেতে আছড়ে পড়ল।

“হ্যাঁ, অনেক অবদান আছে ওনার! কিন্তু দিনশেষে উনি মুখে বড় বড় কথা বললেও আমাদের ‘বাবা’ হয়ে উঠতে পারেননি। যদি পারতেন, তবে একটা বাইরের ছেলেকে এভাবে সুপিরিয়র বানিয়ে দিতে পারতেন না।”

রিদম মেঝেতে বসেই বলল, “তার যাকে যোগ্য মনে হয়েছে তাকেই বানিয়েছে। আমার বিশ্বাস, আমাদের জায়গায় ওনার নিজের সন্তান থাকলেও উনি এই সিদ্ধান্তই নিতেন।”

রিহান মারাত্মক ক্ষেপে গিয়ে কাঁপতে লাগল। সে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল, “আমি কখনোই ওই রাস্তার ছেলের আন্ডারে কাজ করতে পারব না। তুই যেতে না চাইলে থাক। বাট আমার দ্বারা সম্ভব হবে না।”

রিহান বেরিয়ে যেতেই পুরো রুম জুড়ে নিস্তব্ধতা ভর করল। সবাই চুপচাপ থাকলেও প্রত্যেকের মুখ থমথমে শুধুমাত্র উদ্যান বরাবরের মতোই নির্বিকার। যেন চুপচাপ সব সহ্য করার স্বভাবটা সে তার মায়ের কাছ থেকেই পেয়েছে। কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে সে মুখ খুলল, “স্যার, বলছিলাম কী…”

“কিছু বলিস না তেহ,” ট্রুয়েনো হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন। “আমি একটু একা থাকতে চাই। তোরা সবাই যা।”

উদ্যান বিনাবাক্যে হাঁটা ধরল। তখনই ট্রুয়েনো বললেন, “কালকের মধ্যে এখানে শিফট হয়ে যাস।”

তার কথা মেনে উদ্যান থান্ডার এস্টেটে শিফট হয়ে গেল পরদিনই। উদ্যান সবেমাত্র সব বুঝে নিচ্ছিল এমনই একদিন ট্রুয়েনো নিজের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। বিষাদের মেঘ কাটতে না কাটতেই খবর এল, রিহান তাদের চিরশত্রু রিভেল গ্যাং-এর সাথে হাত মিলিয়েছে। রিদম খবরটা শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ভাবল: “ভাগ্যিস পাপাকে এই দিনটা দেখে যেতে হয়নি। আজ উনি বেঁচে থাকলে খুবই কষ্ট পেতেন।”

সময় এরপর তার নিজস্ব গতিতে বয়ে চলল। উদ্যান সময়ের চাকা ঘুরিয়ে একের পর এক সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে লাগল। টি’কে (T.K) গ্রুপের ফাউন্ডার হিসেবে তার নামডাক তখন সবার মুখে মুখে।
সেই ব্যস্ত সময়ের মধ্যেই একদিন উদ্যানের ইনস্টাগ্রামে ফুল মেসেজ পাঠিয়ে বসে; উদ্যান ফুলের মেসেজ গুলো সিন না করলেও মেসেজ বক্স চেক করার সময় ফুলের নিকনেম ‘Petal’ অজানা কারণে তার চোখে পড়েছিল। তবুও সে খতিয়ে দেখেনি। না দেখাটাই স্বাভাবিক, টি’কে গ্রুপের ফাউন্ডার হিসেবে অনেকেই তাকে কৌতুহলী বা আগ্রহী হয়ে মেসেজ পাঠিয়ে বসে। সে সেগুলো খতিয়ে দেখাটা দরকারী মনে করে না।

কিন্তু ভাগ্যের লিখন ছিল অন্যরকম। সময়ের পরিক্রমায় ফুল তার সাথে যোগাযোগ স্থাপনে সফল হলো, উদ্যানও ফিরল নিজের দেশে। এরপর যা কিছু ঘটেছে, তা তো ফুলের জানাই আছে।

বর্তমান!

পুরোটা রাত ফুল যেন কোনো এক ঘোরের মধ্যে ডুবে ছিল। তার মনে হচ্ছিল, সে কোনো অদৃশ্য শক্তি হয়ে উদ্যানের অতীতের প্রতিটি অলিগলি ঘুরে এসেছে। যখন সে বাস্তবে ফিরল, তখন তার শরীরে একবিন্দু শক্তিও অবশিষ্ট ছিল না। বেশ কয়েক ঘণ্টা সে অসাড় হয়ে পড়ে রইল। চারপাশের শব্দগুলো কানে আসছিল ঠিকই, কিন্তু চোখ মেলার কিংবা হাত-পা নাড়ানোর ক্ষমতাটুকুও কেউ যেন শুষে নিয়েছে।

যখন সে নিজের মধ্যে সম্বিৎ ফিরে পেল তখন জানালার কাঁচে দুপুরের রোদ উত্তাপ ছড়িয়েছে। ফুল চোখ না খুলেই পাশ ফিরে হাতড়াতে লাগল। সেই নির্দিষ্ট উষ্ণতাটা পাচ্ছে না বহু সময় ধরে। তার চোখ মেলতে ভয় করল, উন্মত্ত চিত্তে উঠে বসে ধরতে চাইল কাউকে।
ঘেমে-নেয়ে একাকার হয়ে গেছে ফুল। জ্বর ছেড়ে দিয়েছে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে থাকার পর অবশেষে ফুল চোখ মেলল। তার শ্বাস প্রশ্বাস দ্রুত ওঠানামা করছে। পুরো ঘরে চোখ বুলিয়েও কাঙ্ক্ষিত মানুষটার সন্ধান মিলল না। অস্থির পায়ে সে খাট থেকে নেমে দরজার কাছে এল। দরজাটা আধখোলা। যার মানে উদ্যানের সান্নিধ্য তার কল্পনা ছিল না। অতীত থেকে ঘুরে আসার পরপরই হয়তো লোকটা বেরিয়ে গেছে রুম থেকে।

ফুল নিজেকে ধাতস্থ করে ওয়াশরুমে ঢুকল। হাতমুখ ধুয়ে ওড়ানাতেই মুছে নিল। চুলগুলো কোনোমতে হাত খোপা করে উদ্যানের রুমের উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরল। সে জানে না, কেন সে ছুটে চলেছে সেই দিকে। এটাও জানে না উদ্যানের সাথে তার কোনো কথা আদৌ আছে কিনা। শুধু জানে, এই মুহূর্তে লোকটাকে একবার না দেখলে তার দম বন্ধ হয়ে যাবে।

উদ্যানের রুমের সামনে পৌঁছে সে বারবার ডোরবেল বাজাল। কোনো সাড়া নেই। ফুলের গলা শুকিয়ে এল, চোখের কোণে জল টইটম্বুর। মরিয়া হয়ে দরজায় ধাক্কা দিতেই সেটা আপনা-আপনি খুলে গেল। সে হন্যে হয়ে ভেতরে ঢুকতেই অদ্ভুত এক শূন্যতা তাকে চেপে ধরল।

ধীরপায়ে খাটের দিকে এগিয়ে যেতেই হঠাৎ তার নজরে এল সবুজ রঙের ছোট্ট একটা যন্ত্র। সন্তর্পণে আশেপাশে একবার চোখ বুলিয়ে সে যন্ত্রটি হাতে তুলে নিল। এপিঠ-ওপিঠ উল্টেপালটে দেখার পর বুঝতে পারল সেটা একটা টেপ রেকর্ডার।

ফুলের হাত কাঁপল, বুকের ভেতর কোনো একটা কিছু খচখচিয়ে উঠল। চোখের কোণে জমা জল গাল বেয়ে নামার অপেক্ষায়। সে কাঁপাকাঁপা আঙুলে প্লে বাটনে চাপ দিল। কয়েক সেকেন্ড পার হয়ে গেল, নিস্তব্ধতা ভাঙল না। তবুও ফুল ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করল।

প্রায় দেড় মিনিট পর গুমোট নীরবতা ছিঁড়ে ভেসে এল উদ্যানের সেই পরিচিত গম্ভীর কণ্ঠস্বর:

“তুই এখন এটা শুনছিস, যার মানে আমি চলে গেছি…”

চলবে,,,

শব্দসংখ্যা: ৩৮০০+

(আর মাত্র হাতে গোনা কয়েকটা পর্বই বাকি আছে। রেসপন্স করা কমিয়ে দিলে চলবে নাকি? আর আপনারা #একলামহাআবেশ_মেহেক পড়ছেন না কেন? খুবই হতাশ হলাম আপনাদের আচরণে। যারা পড়েছেন তারাও রিভিউ দিতে কার্পণ্য করছেন। জলদিইইই ই-বুকটি পড়ে ফেলুন মাত্র ৩০ টাকায়। লিংক কমেন্টে!)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply