প্রণয়ের_মায়াতৃষ্ণা ||১৬||
ফারজানারহমানসেতু
রোজা ভ্রু কুঁচকে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল।
“তোমার ভাই কে?”
ছেলেটা একটু ইতস্তত করে বলল, “ওই যে… ওই বিল্ডিংয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।”
রোজা আর তুবা দুজনেই একসাথে ঘুরে তাকাল। দূরে একটা ছেলে ফোন হাতে উল্টো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ফোনে কথা বলছে হয়তো। ছেলেটার পিঠ ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না। রোজার মুখ মুহূর্তেই শক্ত হয়ে গেল। বা বলেও থেমে গেলো। পরে বললো, ছেলে মানুষ মেয়ে মানুষ দেখলেই ঢং দেখায়।
তুবাকে বলল,“তুবা তুই ওই হাদারামকে চিনিস , আমি তো ওকে চিনি না।”
তুবা ফিসফিস করে বলল,“আমিও চিনি না!”
রোজা জুসগুলো আবার ছেলেটার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো,“নাও এগুলো নিয়ে যাও। আমি কিছু খাবো না। আর গিয়ে বলো রং নাম্বারে ডায়াল করছে।”
ছেলেটা মাথা নেড়ে বলল,“ ভাবি, ভাই বলছে আপনি না নিলে আমাকে বকা দেবে।”
রোজা এবার বিরক্ত হয়ে গেল।“ আমি তোমার ভাবি না। যাও এখান থেকে, আমার হাজবেন্ড নিতে আসবে একটু পর ! যদি দেখে তুমি এখানে আমাকে ডিসটার্ব করছো, তাহলে তোমাকে ধরে কেলাবে!”
“ ভাবি আপনি বিবাহিত, তবে ভাই যে বললো আপনার সাথে ভাইয়ের বিয়ে হয়েছে !আর বাড়ি থেকে আপনাদের বিয়ে ঠিক করেছে?”
“তোমার ভাইকে উত্তম মাধ্যম খাওয়াতে হবে দেখি।”
“ ভাবি, ভাই কিন্তু অনেক ভালো মানুষ। .আচ্ছা আপনি এগুলো নিয়ে নেন!”
“ এই তোমাকে সহ তোমার ভাইকে কেলানি খাওয়াবো। গণপিটুনি চেনো? “
ছেলেটা হতাশ মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে তো একটা ছবি দেখানো হয়েছে সেখানে তিনটা মেয়েই ছিল। আর যার কাছে সাদা পার্স আছে তাকেই তো দিতে বলল। সে কি করবে, আর সাদা পার্স তো রোজার কাছেই রয়েছে। ছেলেটা ভুল কি বলছে, তাইতো বুঝতে পারছে না। একজন বলল, বাড়ি থেকে বিয়ে ঠিক করেছে। আরেকজন বলছে সে বিবাহিত।
ছেলেটার ভাবনার মাঝেই পেছন থেকে একটা ঠান্ডা গম্ভীর কণ্ঠ শোনা গেল, “কেউ কিছু খাবে না।”
রোজা আর তুবা দুজনেই ঘুরে তাকাল। তূর্জান দাঁড়িয়ে আছে। চোখ দুটো কেমন যেন কঠিন হয়ে আছে। ছেলেটার হাত থেকে জুসগুলো নিয়ে তূর্জান একবার তাকাল ওই দূরের ছেলেটার দিকে। সেই ছেলেটা তখনো মুখ ঘুরিয়ে কথা বলে যাচ্ছে। তার পিঠ ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না।
তূর্জান নিচু গলায় রোজার দিকে তাকিয়ে বলল,“কে দিয়েছে?”
রোজা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “আপনার মতো কোনো হিটলার না। অন্য কেউ।”
তূর্জান চোখ সরু করে তাকাল। “নাম জানিস?”
“না।”
“চিনিস?”
“না।”
তূর্জান আর কিছু বলল না। জুসগুলো ডাস্টবিনে ফেলে দিল।
রোজা অবাক হয়ে বলল,“এই! ফেলে দিলেন কেন?”
তূর্জান শান্ত গলায় বলল,“অচেনা কারো দেওয়া কিছু খাওয়া উচিত না।”
রোজা গজগজ করে বলল,“সবাই আপনার মতো সন্দেহ প্রবণ না।”
তূর্জান এবার একটু ঝুঁকে রোজার চোখের দিকে তাকাল।বলল, “আর সবাই তোর মতো বোকাও না।”
তুবা মুখ চাপা দিয়ে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে।রোজা রেগে বলল,“আমি বোকা?”
তূর্জান খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,“হ্যাঁ। “
রোজা গজগজ করে বলল,“আমাকে কি ছোট বাচ্চা মনে হয় আপনার?”
তূর্জান একটু থেমে বলল, “বাচ্চারা অন্তত অচেনা লোকের কাছ থেকে কিছু নেয় না।”
তুবা ফিক করে হেসে ফেলল।রোজা সঙ্গে সঙ্গে তাকাল,“তুই হাসছিস কেন?”
“কিছু না!”
তূর্জান ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বলল,” কেউ ছবি দেখিয়ে তোমাকে ‘ভাবি বলতে বলল আর তুমি বিশ্বাস করে এসে ভাবি বলে ফেললে।”
ছেলেটা আমতা আমতা করতে লাগলো।
রোজাও এবার একটু থেমে গেল। সত্যি কথাটা শুনে মুখটা কেমন চুপসে গেল ছেলেটার । তূর্জান আবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,“আর একটা কথা।”
রোজা বিরক্ত হয়ে বলল,“কি?”
“আজ থেকে কেউ যদি তোকে কিছু দেয়, চকোলেট, জুস, কিছুই—খাবি না।”
রোজা হাত গুটিয়ে বলল,“খেলে কি করবেন?”
তূর্জান একদম ঠান্ডা গলায় বলল,“খেতে দেব না।”
“কেন?”
তূর্জান কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,“কারণ তুই আমাদের বাড়ির দায়িত্ব।আর নেওয়াজ পরিবার অন্যের দেওয়া কিছু খাওয়া পছন্দ করে না। বিশেষ করে কোনো খারাপ ইনটেনশন থাকা লোকের জিনিস।”
রোজা কিছু বলল না। কেন যেন বুকের ভেতরটা হালকা ধক করে উঠল।
তূর্জান ঘুরে চলে যেতে যেতে শুধু বলল—
“এক্সাম শেষ। ক্লাস শেষ হলে এখানেই থাকবি। আমি নিতে আসব।”
“ আপনি কোথায় যাচ্ছেন? “
“জাহান্নামে, যাবি?”
রোজা তূর্জানকে জ্বালাতে বলল,“ জাহান্নামে কি করতে যাবেন?”
তূর্জান এই মেয়েকে কি করবে। শুধু মাত্র ভালোবাসে দেখে সব সহ্য করছে। নয়তো একে থাপ্পড়ে এতক্ষনে সোজা বানিয়ে দিত। রাগটুকু সংবরণ করে বলল, “ম’রতে যাবো!”
রোজা মুচকি হেসে বলল, “ এমাআআ, সবাই মরে ওখানে যায়! আর আপনি মরতে ওখানে যাবেন?”
তূর্জান কথা না বাড়িয়ে চলে গেল। এই মেয়ে তার মাথা নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট। যদি প্রতিবছর রোজা বিতর্ক প্রতিযোগিতায় নাম দেয়। নিশ্চই বিতর্ক প্রতিযোগিতায় রোজা প্রতিবার ফাস্ট হবে!যেই হারে মুখ চলে!
রোজা পেছন থেকে মুখ বাঁকিয়ে বলল, “নিজেকে কি মনে করেন উনি!”
তুবা হেসে বলল,“সত্যি বলব?”
“বল।”
“নাহ! থাক বলবো না ।”
রোজা কিছু বলল না। তুবাও ইদানিং ভন্ডামীর দলে যোগ দিয়েছে। তার কথাও এখন অহেতুক মনে হয়। রোজা দূরে হাঁটতে থাকা তূর্জানের দিকে একবার তাকাল।
তারপর ধীরে ধীরে বিড়বিড় করল,“উফ! লোকটা আসলে কী চায়…?”
ততক্ষনে নূর ক্লাস থেকে বেরিয়ে এসেছে। নূর আসতেই রোজা নূরের সাদা পার্স ফেরত দিল।
★★★
একটা গাছের নিচে তখনকার সেই ভাবি ডাকা ছেলেটা আর সেই জুস দেওয়া ছেলেটা দাড়িয়ে।
সাথে তূর্জানও আছে। যেন সে কিছুই জানে না।
ছোট ছেলেটাকে কাছে ডেকে বলল,
“এই ছেলে শোনো, তা তোমার ভাইয়ের নাম কি? “
“জি ভাইয়া, ওনার নাম সমুদ্র।”
“ ও তোমার ভাইকে দেখছি সত্যিই সমুদ্রে চুবাতে হবে! দিনদুপুরে মেয়েদের বিরক্ত করা। আবার কি বলছিলে বিয়ে ঠিক! তা আমার বউয়ের সাথে তোমার বিয়ে ঠিক হলো কেমনে? “
সমুদ্র নামের ছেলেটা বলল, “ ভাইয়া আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে, আমি আমার ফিউন্সের জন্য জুসগুলো পাঠিয়েছিলাম।”
“তিনটা কেন?”
“ ওরা তিনজন একসাথে থাকে তাই তিনটা পাঠিয়েছিলাম।“
“ তা তোমার ফিউন্সের নাম বলো তো দেখি? “
ছেলেটা শান্ত গলায় বলল, “ নূরাইয়া ইসলাম নূর”
তূর্জানের রাগটা এতক্ষনে কমে গেছে। ছোট ছেলেটা হয়তো আগা মাথা পাচ্ছে না। কি হচ্ছে? তূর্জান শান্ত গলায় ছোট ছেলেটাকে দেখিয়ে বলল, “ তাহলে ও আমার ওয়াইফের কাছে ওগুলো দিলো কেন? “
“ ভাইয়া ওর মনেহয় ভুল হয়েছে। আমি ওকে একটা ফটো দেখিয়েছিলাম। তিনজন একই কালারের ড্রেস পরেছিলো। নূরের হাতে সাদা পার্স ছিলো, আর আজকেও ও সাদা পার্সটা নিয়ে এসেছে। ওটা দেখিয়ে ওকে বলেছিলাম জুসগুলো ওকে দিয়ে আসতে। কিন্তু ও ভুল করে আপনার ওয়াইফের কাছে দিয়েছে। “
“ নূর আমার স্টুডেন্ট হলেও বোনের মতো। তাই নাম ধরে বলছি, ভালোবাসো নূরকে? “
“ হুমম!”
“ কতটা? “
“ আমাদের বিয়েটা সবাই জানে পারিবারিক, হয়তো নূরের জন্য পারিবারিক কিন্তু আমার কাছে তা নয়, দুইবছর আমি ওকে ভালোবাসি! ও নিজেও জানে না। “
তূর্জান এগিয়ে এসে সমুদ্রের সামনে দাড়াল। বলল, “ তুমি নিজেই যেতে পারতে! তার সামনে দাড়ানোর সৎ সাহস না থাকলে ভালোবাসার কি দরকার?”
“ আমি চাই, ও বিয়ের পরে সব জানুক!”
“ যদি সে অন্য কাউকে ভালোবাসে? “
“ বাসে না!”
“ এতো বিশ্বাস? “
“ হয়তো আপনার মতো ওতটা নয়!”
“ মানে? “
“ ভুল করে হলেও,আপনার ওয়াইফও নাকি আপনার জন্য জুসগুলো নিতে চায়নি। “
“হুমম, থাকো তাহলে!”
বলেই আবার বলল, “আর ভাবি বলবে না। আপু বলবে,মনে করবে মায়ের পেটের বোন। আমি দুলাভাই হতে রাজি আছি, কিন্তু আমার ওয়াইফকে ভাবি হয়ে দেবরকে কোনো সুযোগ টুযোগ দিতে পারবো না।”
বলেই জায়গা ত্যাগ করলো। রোজা বিয়ের ব্যাপার জানে জন্য বলেনি সে বিবাহিত। সে না নেওয়ার বাহানা দিয়েছে বিবাহিত বলে।তবে তূর্জানের রোজার প্রতি এতটুকুও বিশ্বাস আছে, রোজা কোনো সম্পর্কে জড়াবে না।তূর্নান যেতেই ছোট ছেলেটা বলল, “ ভাই আমি ভুল জায়গায় গেছিলাম? “
“ নাহ, মানে ভুল জায়গায় না গেলে আমি নূরের সামনে যাওয়ার সাহস পেতাম না। তবে এবার বুজতে পারলাম, সব ভুল, ভুল নয়!”
ছোট ছেলেটা বললো, “ ভাই ওই ভাইটা আর ভাবিটা মনেহয় দুজন দুজনকে অনেক ভালোবাসে। জানেন ওই ভাবি তওবা, ওই আপু, দুলাভাইয়ের জন্য সামান্য জিনিস নিল না। আবার দুলাভাই আমাদের এখানে যেভাবে দাড় করায়ছে আমি ভাবছি আজকে আমার শেষদিন।“
★★
রোজা আর তুবা গেটের বাইরে এসে দেখল তূর্জান গাড়িতে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
রোজা অবাক হয়ে বলল,“আপনি এখনো যাননি?”
তূর্জান সংক্ষেপে বলল,“চল।”
“কোথায়?”
“বাসায় যাবো।”
রোজা ভ্রু তুলল।বলল,“আমরা কি নিজেরা যেতে পারি না?”
তূর্জান শান্ত গলায় বলল,“পারিস । কিন্তু আজ থেকে আমি নিয়ে আসবো, আমি নিয়ে যাবো।”
রোজা কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল। লোকটার কণ্ঠে এমন একটা দৃঢ়তা থাকে, যেটা অদ্ভুতভাবে চুপ করিয়ে দেয়।গাড়িতে ওঠার পর কয়েক মিনিট নীরবতা। রোজা জানালার কাঁচে নিজের মুখের প্রতিচ্ছবি দেখছিল। হঠাৎ মনে পড়ল—জুসের ঘটনা।
সে আস্তে করে বলল,“আপনি এত রেগে গেলেন কেন?”
তূর্জান চোখ রাস্তার দিকেই রেখে বলল,“রাগিনি।”
“তাহলে জুস ফেলে দিলেন কেন? “
“কারণ অচেনা মানুষ হঠাৎ এত যত্ন দেখালে সেটা ভালো লক্ষণ না।”
রোজা বলল, “ আসলে ওগুলো আমার ছিলো না! আমার ফ্রেন্ড নূরের ছিলো, ওই ছোট ছেলেটা ভুল করে আমাকে দিয়েছিল। “
“ জানি!”
রোজা আর কিছু বলল না।কিন্তু মনে মনে ভাবল
“লোকটা আসলে এত খেয়াল রাখে কেন সবার ? যাক হিটলারটার বউ একদিক থেকে বেচে যাবে। দায়িত্বশীল জামাই পাবে।”
সামনে ড্রাইভ করতে করতে তূর্জানও একবার রিয়ার ভিউ মিররে তাকাল।
রোজা তখন জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে।
তূর্জান খুব আস্তে নিজের মনে বলল,
“ঝামেলার মেয়ে একটা…”
ইনশাআল্লাহ চলবে…
গল্পটা ভালো লাগলে আমার পেইজ
Farzana Rahman Setu ফলো দিয়ে রাখবেন।
Share On:
TAGS: প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা, ফারজানা রহমান সেতু
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১০
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ২
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৭
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১১
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১৭
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৩
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৮
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১৫
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১৩
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১৪