নির্লজ্জ ভালোবাসা
লেখিকাসুমিচৌধুরী
পর্ব সারপ্রাইজ
দীর্ঘ ২১ বছর পর সুইজারল্যান্ড থেকে রৌদ্র তুরা এবং এক মাএ আদরের ছোট বোন রুহিনি খান তুন্নার সাথে বাড়ি ফিরছে তাহমিদ খান রৌশান। মাত্র ৭ বছর বয়সে যখন রৌশান বাবা-মায়ের হাত ধরে সুইজারল্যান্ড পাড়ি দিয়েছিল, তখন সে ছিল এক অবুঝ শিশু। রৌদ্র আর তুরা তাদের দুই সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা ভেবেই বিদেশের মাটিতে থিতু হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। যদিও মাঝে রৌদ্র আর তুন্না দেশে কয়েকবার চক্কর দিয়ে গেছেন, কিন্তু রৌশান আসেনি। সে সবসময় পড়াশোনা নিয়ে ডুবে থাকত। দাদু আনোয়ার খান আর দাদি রৌশনি খানের সাথে ল্যাপটপের ছোট পর্দায় ভিডিও কলেই তার সবটুকু যোগাযোগ সীমাবদ্ধ ছিল। আজ সব পড়াশোনা শেষ করে, একজন পূর্ণবয়স মানুষ হিসেবে সে তার নিজের দেশের মাটিতে পা রাখল।
কাউকে কিছু না জানিয়ে হুট করে বাড়িতে এসে সবাইকে চমকে দেওয়ার পরিকল্পনাটা ছিল রৌদ্রের। গাড়িটা যখন বাড়ির সামনে এসে থামল, রৌশান গাড়ি থেকে নেমে দীর্ঘশ্বাস নিল। চারপাশটা একবার চোখ বুলিয়ে দেখে নিল সে। ২১টা বছর! এই গেট, এই বাগান, এই বাতাসের ঘ্রাণ সবই যেন তার চেনা, আবার বড্ড অচেনা।
সবাই মিলে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। তুরা কলিং বেল টিপতেই ভেতর থেকে পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল। দরজাটা খুলল তিথি। সামনে রৌদ্র, তুরা, তুন্না আর রৌশানকে দেখে সে যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারল না। খুশিতে আত্মহারা হয়ে চিৎকার করে উঠল।
“রৌদ্র ভাইয়া! আপু!”
মুহূর্তের মধ্যেই তিথি তুরাকে জড়িয়ে ধরল। দুই বোনের আবেগের বাঁধ ভেঙে গেল। তুরা তিথির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আর্দ্র কণ্ঠে বলল।
“কেমন আছিস রে?”
তিথি চোখ মুছে হেসে বলল।
“ভালো ছিলাম, কিন্তু এখন তোমাদের দেখে মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ হয়ে গেছি।”
তুরার সাথে কথা শেষ করে তিথির নজর গেল রৌশানের দিকে। লম্বা, চওড়া কাঁধ আর তীক্ষ্ণ চাহনির এক সুপুরুষ দাঁড়িয়ে আছে সামনে। সেই ৭ বছরের ছোট্ট ছেলেটা এখন ২১ বছর পর তার সামনে। তিথি অবাক হয়ে চেয়ে থেকে বলল।
“কেমন আছিস রৌশান?”
রৌশান মৃদু হেসে মাথা নিচু করে সালাম দিয়ে বলল।
“ভালো মামুনি। তুমি কেমন আছো?”
তিথি আবেগ সামলাতে না পেরে রৌশানের গালে দুই হাত রেখে পরম মমতায় বলল।
“কত বড় হয়ে গিয়েছিস তুই! সেই ছোটবেলায় দেখেছিলাম, আর আজ…”
তুন্না এতক্ষণ পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সবাই যখন রৌশানকে নিয়ে ব্যস্ত, সে তখন গাল ফুলিয়ে বুকে হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে রইল। অভিমানী সুরে বলল।
“আমাকে বুঝি কেউ মনেই করে না?”
তিথি এবার রৌশানকে ছেড়ে তুন্নার গালে আলতো করে হাত দিয়ে আদুরে গলায় বলল।
“শোনো কথা! তুই আমার একমাএ মেয়ে, তোকে মনে করব না তো কাকে করব শুনি?”
মুহূর্তেই তুন্নার সব অভিমান জল হয়ে গেল। সে খুশিতে তিথিকে জড়িয়ে ধরল। হইহই করতে করতে সবাই বাড়ির ভেতরে ঢুকল। খবর পেয়ে ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন আনোয়ার খান, রৌশনি খান, আশিক খান, তনুজা খান, আরিফুল খান আর হিমি খান। সারা বাড়িতে যেন ঈদের আনন্দ নেমে এল। রৌশনি খান তো তার কলিজার টুকরো নাতি রৌশানকে দেখা মাএই কেঁদেই দিলেন।
এরই মধ্যে অফিস থেকে ফিরল আয়ান আর তিহান। বাবা-ছেলে মিলে এখন ফ্যামিলি বিজনেস সামলায়। তিহান কিছুদিন হলো জয়েন করেছে। বাড়িতে ঢুকে ড্রয়িংরুমে রৌদ্রদের দেখে আয়ান কয়েক মুহূর্ত মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। ঘোর কাটতেই সে রৌদ্রকে জড়িয়ে ধরল।রৌদ্র তার পিঠ চাপড়ে দিয়ে হাসতে হাসতে বলল।
“সারপ্রাইজটা কেমন দিলাম বল?”
আয়ান আনন্দাশ্রু আড়াল করে বলল।
“ভাইয়া, বাড়িতে এসে তোমাদের এভাবে দেখব ভাবতেই পারিনি।”
তিহানও এগিয়ে এসে রৌশানকে জড়িয়ে ধরল। দুই ভাই যেন কত কাল পর একে অপরকে খুঁজে পেল। তিহান রৌশানের পিঠে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ থাবড়া দিয়ে বলল।
“কিরে! দেখছি অনেক হ্যান্ডসাম হয়ে গিয়েছিস?।”
রৌশানের গম্ভীর চেহারায় তখন বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। তিহানের কথাগুলো তার কানে যেন তীরের মতো বিঁধছে। সে তিহানের দিকে তাকিয়ে বেশ কড়া গলায় বলল।
“ফালতু কথা বন্ধ কর। কেমন আছিস সেইটা বল আগে!”
তিহান দমবার পাত্র নয়। সে রৌশানের কাঁধে হাত রেখে দাঁত বের করে হাসল। তার চোখেমুখে দুষ্টুমির ঝিলিক। সে রৌশানের চোখের দিকে তাকিয়ে জবাব দিল।
“ভালোই ছিলাম রে ভাই, তবে এখন আরও ভালো হয়ে গেছি। কারণ তোর বিয়ের দাওয়াত খাব বলে!”
রৌশান যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে ঝটকা দিয়ে তিহানের হাত সরিয়ে দিল। নিজের সুতীক্ষ্ণ নাক আর মুখ কুঁচকে অবিশ্বাসের সুরে বলল।
“বিয়ে?”
তিহান এক চুলও নড়ল না। বরং আরও এক ধাপ এগিয়ে এসে বুক ফুলিয়ে বলল।
“হ্যাঁ বিয়ে! তোর বিয়ে!”
রৌশান এবার পুরোপুরি থমকে দাঁড়াল। দুই হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে দিয়ে একদম টানটান হয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল সে। রৌশানের ব্যক্তিত্বে একটা আভিজাত্য আছে, যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। সে তিহানের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন করল।
“তোকে কে বলেছে আমি বিয়ে করব?”
তিহান এবার একটা নাটকীয় ভঙ্গি করে বলল।
“কেউ বলেনি, আমি বলছি! এখন তো অনেক বড় হয়ে গিয়েছিস, আর তুই আমার থেকেও লম্বা। তাই নিয়ম অনুযায়ী আমার আগে তোর বিয়েটাই আগে হবে।”
রৌশান বুঝল, এই পাগলের সাথে তর্ক করে লাভ নেই। সে আর কথা না বাড়িয়ে গটগট করে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল। ওপরে উঠতে উঠতেই ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে থাকা তিহানকে উদ্দেশ্য করে সাফ জানিয়ে দিল।
“তোর বিয়ে করার শখ হয়েছে? তো তুই বিয়ে কর। বাট আমার না। এসব বিয়ে-টিয়ে আমি করছি না, একদম ফালতু কথা!”
রৌশান গটগট করে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে গেল। পেছনে তিহান একাই হাসতে হাসতে ড্রয়িংরুম মাতিয়ে তুলল। সে জানে, এই গম্ভীর রৌশানকে রাগানোর মজাই আলাদা।
রৌশানকে গটগট করে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে চলে যেতে দেখে রৌদ্র একটু অবাক হলেন। ছেলের এই গম্ভীর স্বভাবটা তার চেনা, কিন্তু হুট করে এভাবে চলে যাওয়ায় তিনি তিহানকে জিজ্ঞেস করলেন।
“কিরে তিহান, রৌশান চলে গেল কেন?”
তিহান দাঁত বের করে একটা চওড়া হাসি দিল। যেন খুব বড় কোনো জয় করে ফেলেছে। সে রৌদ্রর দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল।
“চাচ্চু, বিয়ের কথা বলেছি বলে ও রেগে পালিয়েছে!”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তুন্না এতক্ষণ ভাই আর কাজিনের এই খুনসুটি দেখছিল। সে হাসতে হাসতে তিহানের দিকে তাকিয়ে বলল।
“তিহান ভাইয়া, তুমি এখনো জানো না? ভাইয়া বিয়ের কথা শুনলে যতটা না রাগ করে, তার চেয়ে বেশি বিরক্ত হয়। ও এসব একদম নিতে পারে না।”
তিহান কাঁধ নাচিয়ে দুষ্টুমির সুরে বলল।
“জানি তো! আর জানি বলেই তো ওকে বিয়ের কথা বলে রাগাতে আমার বেশ ভালো লাগে। ওর ওই মুখ কুঁচকানো দেখাটা একটা আর্ট!”
এবার তিহান বাড়ির সবার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। যেন কোনো এক রাজকীয় ঘোষণা দিচ্ছে, এমন ভঙ্গিতে হাত নেড়ে বলল।
“সবাই শোনো! রৌশান বিয়ে পছন্দ করুক আর না করুক, আমার আগে কিন্তু ওকে বিয়ে করাতে হবে। এটা আমি একদম কনফার্ম বলে দিলাম!”
তিহানের এই আত্মবিশ্বাসী ঘোষণা শুনে পুরো ড্রয়িংরুমে হাসির রোল পড়ে গেল। বাড়ির বড়রা থেকে শুরু করে ছোটরা কেউই হাসি থামাতে পারল না। রৌদ্র তিহানের কথা শুনে হোহো করে হেসে উঠলেন। তিনি তিহানের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন।
“আমার ছেলের বিয়ের দাওয়াত খাওয়ার শখ যদি তোর এতই থাকে, তবে তো মুশকিল? রৌশানের বিয়ের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে তো তুই বুড়ো হয়ে যাবি রে বাপ!”
রৌদ্রর এই মন্তব্যে বাড়ির পরিবেশ আরও হালকা হয়ে গেল। দাদি রৌশনি খান তনুজা খান আর হিমি খান হাসতে হাসতে সোফায় গড়িয়ে পড়লেন। অনেকগুলো বছর পর খান বাড়ির দেয়ালগুলো যেন আবার প্রাণ ফিরে পেল। দীর্ঘ ২১ বছরের নীরবতা কাটিয়ে আজ হাসির শব্দে মুখরিত হয়ে উঠল পুরো বাড়ি।
খান বাড়িতে আনন্দের জোয়ার যেন থামছেই না। রৌদ্র আর তুরা আসার খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে। খবর পাওয়া মাত্রই একে একে সবাই এসে হাজির হতে শুরু করল।
প্রথমে এল শিহাব আর আরশি। সাথে তাদের একমাত্র আদরের মেয়ে আনিকা জান্নাত শান্তা। আরশির মাতৃত্বের জার্নিটা খুব সহজ ছিল না। শান্তার পর তার আরেকটি সন্তান আসার কথা ছিল, কিন্তু এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় সেই সন্তানটি নষ্ট হয়ে যায়। সেই সাথে আরশি চিরতরে মা হওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। যদিও শুরুর দিকে মনের কোণে কিছুটা হাহাকার ছিল, কিন্তু আজ তাদের সেই আফসোস নেই। শান্তা বড় হয়েছে, তাকে ঘিরেই এখন তাদের সবটুকু পৃথিবী। একটি সুস্থ সন্তান আছে, এটাই তাদের কাছে পরম পাওয়া।
এরপরই হইহই করে বাড়িতে ঢুকল নেহাল আর আরফা। তাদের সাথে এসেছে বড় ছেলে নিহাদ আর ছোট্ট মেয়ে আফরিন। নিহাদের বেশ কয়েক বছর পর আফরিনের জন্ম হয়েছে। অনেকটা রৌদ্র আর তুরার সংসারের মতোই রৌশানের অনেক পরে যেমন তুন্নার জন্ম হয়েছে, নেহালদের পরিবারেও ঠিক তাই।
ড্রয়িংরুমের আড্ডাটা এখন রীতিমতো জমে ক্ষীর! রৌদ্র, আয়ান, শিহাব আর নেহাল এই চারমূর্তি যখন একসাথে বসে, তখন তাদের বয়স যে বেড়েছে সেটা বোঝার উপায় নেই। তাদের হাসি-ঠাট্টা আর চিল্লাপাল্লা দেখে মনে হচ্ছে সেই ২১ বছর আগের তরুণ রৌদ্র-আয়ানরাই ফিরে এসেছে।তুরা রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ নিয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকল। সবার হাতে চা দিতে দিতে সেও হাসিমুখে তাদের খুনসুটি দেখছিল। ঠিক সেই সময় নেহাল চায়ে একটা তৃপ্তির চুমুক দিয়ে দুষ্টুমির সুরে তুরার দিকে তাকিয়ে বলল।
“তুরা ভাবি, তোমার একটা পুরনো কথা মনে আছে? সেই যে শিহাব তোমার বার্থডেতে আস্ত একটা কেক চুরি করে লুকিয়ে ফেলেছিল!”
নেহালের কথা শেষ হতে না হতেই পুরো ড্রয়িংরুমে হাসির রোল পড়ে গেল। আয়ান আর রৌদ্র তো হোহো করে হেসে সোফায় প্রায় গড়িয়ে পড়ার দশা। তুরাও মুখ টিপে হাসছে সেই পুরনো স্মৃতি মনে করে।কিন্তু শিহাবের দশা তখন দেখার মতো! সে রাগে আর লজ্জায় লাল হয়ে নেহালের দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে গর্জে উঠল,
“ওই বুইড়া! এক পা তোর কবরে গেছে, দুদিন পর মরে যাবি আর তুই এহন কস এসব মিথ্যা কথা? হালা জাহান্নামি!”
শিহাবের গালি আর রাগের ভঙ্গি দেখে ড্রয়িংরুমে হাসির রোল পড়ে গেল। রৌদ্র, আয়ান আর নেহাল হাসতে হাসতে যেন সোফায় গড়িয়ে পড়ার দশা। সবার হাসির তোড়ে ড্রয়িংরুমের দেয়ালগুলোও যেন কাঁপছে। আয়ান নিজের চশমাটা নাক থেকে খুলে কাঁচের ওপর আলতো করে ফু দিতে দিতে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সবার উদ্দেশ্যে বলল।
“নেহাল না হয় কেক চুরির মিথ্যা কথা বলেছে, তবে আমি একটা ধ্রুব সত্য কথা কই! তোমাদের কি মনে আছে শিহাব একবার তুরার জন্মদিনে পেমপার্স গিফট করেছিল?”
এই কথা শোনার পর হাসির মাত্রাটা এবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল। হাসতে হাসতে নেহালের চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছে, সে কথা বলার শক্তিটুকুও পাচ্ছে না। শিহাব এবার সত্যি সত্যি চরম লজ্জা পেল। সে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে আয়ানের দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকাল, কিন্তু আয়ান তখনও নির্বিকার, যেন খুব সাধারণ কোনো তথ্য দিচ্ছে।
নেহাল কোনোমতে হাসি থামিয়ে দম নিতে নিতে বলল।
“মনে থাকবে না? ওই গিফটটার জন্য বেচারা শিহাব আরশির হাতে যে ধুমধাম মারগুলো খেয়েছিল, সেটা তো ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে!”
বড়দের এই পুরোনো দিনের পাগলামি আর আড্ডায় পুরো বাড়ি যখন উৎসবে মাতোয়ারা, তখন সেই হাসির স্রোতে একজনের মনে একটুও আনন্দ নেই সে হচ্ছে শান্তা। শিহাব আর আরশির মেয়ে শান্তা যখন থেকে শুনেছে রৌশান বাড়িতে এসেছে, তখন থেকেই তার হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আসছে। তার বুকের ভেতরটা দুরুদুরু কাঁপছে।
ছোটবেলা থেকেই শান্তা রৌশানকে ভীষণ ভয় পায়। রৌশানের ৭ বছর বয়সে সে যখন নানু বাড়ি আসত, তখন থেকেই সে অকারণে ধমক খেত রৌশানের। শান্তার ঠিক মনে নেই রৌশান কেন ওরকম করত বা সেই সময়ের পুরো কাহিনীটা কী ছিল, কিন্তু রৌশানের সেই মারাত্মক কড়া ধমকের আওয়াজটা আজও তার স্মৃতিতে টাটকা। এখন ২১ বছর পর রৌশান বিদেশ থেকে পড়াশোনা শেষ করে ফিরেছে, আরও বড় হয়েছে, গম্ভীর হয়েছে শান্তার মনে হচ্ছে আবারও যদি রৌশান তাকে ধমক দেয়, তবে সে নির্ঘাত সেখানেই জ্ঞান হারাবে।
রাত তখন প্রায় বারোটার কাছাকাছি। পুরো খাঁন বাড়ি নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। কিন্তু শান্তার চোখে ঘুম নেই, সে নিজের রুমে অস্থিরভাবে পাইচারি করছে। তার মাথায় তখন একটাই চিন্তা নিচে গিয়ে ফ্রিজ থেকে আইসক্রিম খেতে হবে। এটা তার পুরনো স্বভাব নানু বাড়ি আসলে মাঝরাতে চুরি করে আইসক্রিম খাওয়া তার চাই-ই চাই। শুধু এই বাড়িতেই নয়, নিজের বাড়িতেও সে একই কাজ করে। শিহাব আর আরশি হাজার বারণ করে, ঠান্ডা লাগবে বলে বকাঝকা করে, কিন্তু আইসক্রিম পাগলি শান্তা কারো কথা শোনে না। চুরি করে খাওয়ার মধ্যেই যেন তার আসল তৃপ্তি।
বেশ কিছুক্ষণ দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থেকে শান্তা ধীরে ধীরে কপাটটা ফাঁক করে উঁকি দিল। করিডোরে কেউ নেই, চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার। সবাই বোধহয় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। এই তো সুযোগ! শান্তা বিড়ালের মতো নিঃশব্দে পা ফেলে নিচে নেমে এল। বাড়ির সিঁড়ি আর করিডোরগুলো তার চেনা, তাই আলো জ্বালানোর ঝুঁকি নিল না সে। অন্ধকারেই হাতড়ে হাতড়ে ফ্রিজ খুঁজতে লাগল।
ঠিক সেই সময় ওপর থেকে নেমে এল রৌশান। এতক্ষণ সে ছাদেই ছিল। রাতের নিস্তব্ধতা আর খোলা আকাশ উপভোগ করা তার দীর্ঘদিনের অভ্যাস। করিডোর দিয়ে নিজের রুমের দিকে যাওয়ার সময় হঠাৎ নিচতলার হল রুমে কিছু একটা পড়ার শব্দে রৌশান থমকে দাঁড়াল।
“এত রাতে নিচে কিসের শব্দ?”মনে মনে ভাবল সে।
রৌশান অত্যন্ত সতর্কতার সাথে অন্ধকারে পা টিপে টিপে নিচে নেমে এল। এদিকে শান্তা ফ্রিজ খুঁজতে গিয়ে অন্ধকারের মধ্যে হল রুমের একটা ফুলের টব ফেলে দিয়েছে। শব্দটা হওয়ার পর সে কয়েক সেকেন্ড দম বন্ধ করে দাঁড়িয়ে ছিল, দেখছিল কেউ আলো জ্বালায় কি না। যখন দেখল সব শান্ত, সে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আবারও ফ্রিজ খুঁজতে শুরু করল।
রৌশান অন্ধকারে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চারপাশটা পরখ করছিল। হঠাৎ তার কানে ভেসে এল টুংটাং শব্দ। কারো পায়ের নূপুরের আওয়াজ! সে চোখ বন্ধ করে শব্দটা বোঝার চেষ্টা করল এটা কি সত্যি নাকি মনের ভুল? না, শব্দটা সত্যি। কেউ একজন এই অন্ধকারে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
শান্তা অনেক খুঁজেও ফ্রিজটা পেল না। অন্ধকার আর উত্তেজনায় সে হয়তো দিক হারিয়ে ফেলেছে। শেষমেশ আইসক্রিম না পাওয়ার আফসোস নিয়ে সে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। সিঁড়ির দিকে এগোতে গিয়ে অন্ধকারেই সে হঠাৎ শক্ত আর চওড়া কোনো কিছুর সাথে সজোরে ধাক্কা খেল। মনে হলো কোনো পাথরের দেয়ালের ওপর আছড়ে পড়েছে সে।অন্ধকারে এক বিশাল আর দীর্ঘদেহী অবয়বকে সামনে দেখে শান্তার কলিজা যেন গলার কাছে চলে এল। সেই অবয়ব থেকে আসা ভ্যাপসা গাম্ভীর্য আর নিস্তব্ধতা তাকে দিশেহারা করে দিল। ভয়ে তার সারা শরীর কুঁকড়ে গেল, আর মুহূর্তেই এক আকাশ সমান আতঙ্ক নিয়ে সে চিৎকার করে উঠল।
“আহ…….!”
কিন্তু সেই চিৎকার পূর্ণতা পাওয়ার আগেই বাতাসের বেগে রৌশান এগিয়ে এল। এক হাত দিয়ে শক্ত করে শান্তার কোমর চেপে ধরল সে, আর অন্য হাতের তালু দিয়ে নিমিষেই চেপে ধরল শান্তার মুখ। চিৎকারের শব্দটা শান্তার কণ্ঠনালীতেই আটকে গেল।রৌশানের এমন আচমকা আর শক্ত স্পর্শে শান্তা থরথর করে কেঁপে উঠল। অন্ধকারের মাঝেও সে অনুভব করতে পারল রৌশানের সুঠাম দেহের উষ্ণতা। রৌশান তাকে প্রায় নিজের শরীরের সাথে মিশিয়ে ধরেছে। শান্তার কপালে আছড়ে পড়ছে রৌশানের তপ্ত নিঃশ্বাস। রৌশানের শরীরের সেই বিশেষ পারফিউমের ঘ্রাণ আর পুরুষালি আভিজাত্য যেন পুরো পরিবেশটাকে আরও থমথমে করে দিল।
জাস্ট এইটা একটা সারপ্রাইজ ছিল সবাইকে একটু গল্পের সবাইকে মনে করিয়ে দিলাম…🫰🥺
Share On:
TAGS: নির্লজ্জ ভালোবাসা, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮৩
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৪
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫০
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬০
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২৯