Golpo romantic golpo অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোকে

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১৬


অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায়

লেখিকাসুমিচৌধুরী

পর্ব ১৬

🚫 অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ 🚫

কেটে গেল কিছুদিন। এই কয় দিনে যেন রিদির জীবনের সবচেয়ে কষ্টের সময় ছিল! শুভ্র এক মুহূর্তের জন্যও রিদিকে ছাড় দেয়নি। রিদি সামান্য একটু কলম ফেললে বা খাতার পাতা উল্টাতে দেরি করলে শুভ্র যেন ওত পেতে থাকত ওকে শাস্তি দেওয়ার জন্য। শুভ্রের তো এটা নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে রিদিকে রাগালে ওর চোখের সেই আগুনের ফুলকি দেখতে ওর দারুণ লাগে! ওদিকে রিদিও মনে মনে শুভ্রর চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে ফেলে গালি দিতে দিতে। রাগ এতই চরমে ওঠে যে, রিদি ভুলেই যায় সে নিজেও কোনো না কোনোভাবে শুভ্রর ওই একই গোষ্ঠীর অংশ!

আজ কলেজে সেই বহুল প্রতিক্ষিত বসন্ত উৎসব’। রিদিদের বাড়িতে সকাল থেকেই সাজ সাজ রব। শুভ্রা, রিয়া, ভাবনা আর মিথি সবাই হাজির। সবার পরনে বাসন্তী আর যার যার পছন্দের রঙের শাড়ি। ওরা সবাই মিলে রিদিকে চেপে ধরেছে শাড়ি পরার জন্য। কিন্তু রিদি অনড়! ওর শাড়ির কথা মনে হলেই শুভ্রর সেই ‘কাক-জেব্রা’র অপমানের কথা মনে পড়ে যায় আর গা রি রি করে ওঠে।

কিন্তু রিয়ারাও দমবার পাত্র নয়। রিয়া মুখটা বাংলা পাঁচের মতো করে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল শুরু করল।

“দেখ রিদি, তুই যদি আজ শাড়ি না পরিস, তবে আমরাও এখনই সব খুলে ফেলব। আমরা কত শখ করে এই সাজটা দিয়েছি! তোর জন্য যদি আমাদের সব মাটি হয়, তবে আমরা খুব কষ্ট পাব রে!”

ভাবনা পাশ থেকে ফোড়ন কাটল।

“একদম! নিজের বান্ধবীদের এইটুকু আবদার রাখতে পারবি না?”

এত সব ইমোশনাল ড্রামার সামনে রিদি আর টিকতে পারল না। হার মেনে সে আলমারি থেকে শুভ্রর দেওয়া সেই নীল রঙের জর্জেট শাড়িটা বের করল। ভাবনা খুব যত্ন করে রিদিকে শাড়িটা পরিয়ে দিল। কুচিগুলো এমন নিখুঁতভাবে বসাল যে রিদির ছিপছিপে গড়নে শাড়িটা যেন লেপ্টে রইল। রিয়া রিদির ঘন কালো চুলগুলো ব্রাশ করে পিঠের ওপর ছেড়ে দিল।সেই চুল অবলীলায় ওর হাঁটুর নিচে নেমে এল।শুভ্রা এবার রিদির মেকআপের দায়িত্ব নিল। একদম হালকা টাচ-আপ, গালে স্লাইট ব্লাশন আর চোখে ঘন করে কাজল লেপে দিল। সবশেষে রিদি যখন আয়নার সামনে দাঁড়াল, নিজের প্রতিবিম্ব দেখে সে নিজেই থমকে গেল! নীল শাড়ির সাথে রুপালি কাজ করা স্লিভলেস ব্লাউজ, কানে বড় ঝুমকো, আর কপালে একটা ছোট্ট টিপ। খোলা চুলের মাঝখানে নীল শাড়ি পরা মেয়েটাকে কোনো মানবী নয়, বরং আকাশ থেকে নেমে আসা কোনো পরি মনে হচ্ছিল।

শুভ্রা রিদির চিবুক ছুঁয়ে বলল।

“আজ আমাদের এই নীল পরিকে দেখে কার যে হার্টবিট বন্ধ হবে, তা শুধু আল্লাই জানে!”

রিদি আয়নায় নিজেকে দেখছিল আর ভাবছিল।সেই খবিশ শুভ্র ভাই কি আজকেও তাকে কাক বলবে।

সবশেষে চার মূর্তির এই রূপসী বাহিনী বাড়ি থেকে বেরিয়ে কলেজের গেটে পা রাখল। নীল শাড়িতে রিদি যখন ধীর পায়ে কলেজের মেইন গেট দিয়ে ঢুকল, মনে হলো পুরো ক্যাম্পাসের বাতাসের গতি যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। গেটে দাঁড়িয়ে থাকা সিনিয়র-জুনিয়র সব ছেলের চোখ তখন রিদির ওপর আঠার মতো আটকে গেছে। কেউ হাঁ করে তাকিয়ে আছে, কেউবা নিজেদের মধ্যে কনুই দিয়ে গুঁতো মারছে। সারা কলেজ আজ রঙিন সাজে সেজেছে চারপাশে উজ্জ্বল আলো, ছাত্র-ছাত্রীদের আড্ডা আর হাসাহাসিতে মুখরিত চারপাশ।

ঠিক তখনই পার্কিং এরিয়া দিয়ে কলেজের ভেতরে ঢুকল শুভ্র। আজ সে কোনো লেকচারার নয়, যেন কোনো হাই-প্রোফাইল সিনেমার হিরো সেট থেকে সরাসরি উঠে এসেছে। শুভ্রর পরনে আজ কুচকুচে কালো রঙের একটা প্রিমিয়াম কটন পাঞ্জাবি, যার হাতাগুলো কনুই পর্যন্ত ফোল্ড করা। সাদা ফিটিং জিন্স আর পায়ে ব্রাউন লেদার সু। বাঁ হাতে সেই পরিচিত ঘড়ি নেই, আজ জায়গা করে নিয়েছে একটা দামী স্মার্ট ওয়াচ। চুলগুলো জেল দিয়ে নিপুণভাবে স্পাইক করে সেট করা, আর চোখে দামি ব্ল্যাক সানগ্লাস।

শুভ্র যখন সানগ্লাসটা খুলে পকেটে রাখল, তখন ওর ধারালো চাউনি আর সুঠাম দেহের বলিষ্ঠতা দেখে অনেক মেয়ের হার্টবিট যেন মিস হয়ে গেল। কলেজের অর্ধেকের বেশি মেয়ে তো অনেক আগে থেকেই ওর ওপর ‘ক্রাশ’ খেয়ে বসে আছে, আর আজ এই সাজ দেখে মনে হচ্ছে তারা নতুন করে প্রেমে পড়ার সিরিয়াল দিচ্ছে। কিন্তু শুভ্রর সেই বিধ্বংসী রাগ আর গম্ভীর ব্যক্তিত্বের কথা ভেবে কেউ টু শব্দ করার সাহস পাচ্ছে না। ও যেন এক মূর্তমান রহস্য যার আভিজাত্যে সবাই মুগ্ধ, কিন্তু ব্যক্তিত্বে সবাই তটস্থ।

শুভ্র পকেট থেকে ফোনটা বের করে ঈশানকে কল করল। ফোনটা কানে চেপে গম্ভীর মুখে কথা বলতে বলতে সে টিচারদের জন্য নির্ধারিত ভিআইপি প্যান্ডেলের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। শুভ্র যখন লম্বা কদমে হেঁটে যাচ্ছিল, অনেক মেয়েই তখন হা করে ওর দিকে তাকিয়ে ছিল। কেউ হয়তো ফিসফিস করে বলছিল, “উফ! শুভ্র স্যার আজ কী ড্যাশিং লাগছে!” আবার কেউ স্রেফ ওর ব্যক্তিত্বে মোহিত হয়ে পলকহীন তাকিয়ে রইল। কিন্তু শুভ্রর সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে ঈশানকে দ্রুত কলেজে চলে আসতে বলে ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে সোজা নিজের আসনে গিয়ে বসে পড়ল।

এদিকে রিদিরা বসার স্টেশনে পৌঁছে গেছে। চার বান্ধবী মিলে আড্ডায় মশগুল হলেও রিদির মনটা কেমন জানি কু গাইছে। অনুষ্ঠান শুরু হতে আর মাত্র কয়েক মিনিট বাকি। এর মধ্যেই ঈশান কলেজে এসে পৌঁছাল। ঈশানও আজ কালো পাঞ্জাবিতে বেশ জমকালো সাজে এসেছে। ওকে আজকের অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ঈশান এসে সরাসরি শুভ্রর পাশের চেয়ারে বসল। দুই বন্ধুর আভিজাত্য যেন পুরো স্টেজ কাঁপিয়ে দিচ্ছে।

ধীরে ধীরে অনুষ্ঠানের পর্দা উঠল। নাচ, আবৃত্তি আর ছোট নাটকের পর্বগুলো একে একে শেষ হলো। দর্শকরা করতালিতে মেতে আছে। যখন গানের পর্ব শুরু হলো, তখন হঠাৎ মাইকে স্পষ্ট স্বরে ঘোষণা করা হলো।

“এবারে আমাদের মঞ্চ মাতাতে আসছে তাসনিন রিদিকা!”

নামটা শুনেই রিদির বুকটা ধক করে উঠল। হাত-পা যেন বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। সেইদিনি শুভ্রা আর রিয়া জোর করেই ওর নামটা দিয়ে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এখন এই হাজারো মানুষের সামনে স্টেজে উঠতে গিয়ে ওর কলিজা শুকিয়ে যাচ্ছে। ও গান শিখেছে ঠিকই, ওর গলাও চমৎকার, কিন্তু এই মুহূর্তে ওর মনে হচ্ছে ও এক লাইনও গাইতে পারবে না।

রিদি একদম আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে দেখে শুভ্রা আবার তাগাদা দিয়ে বলল।

“কিরে, কী হলো? যা না!”

রিদি আমতা আমতা করে কাঁপা গলায় বলল।

“আ-আমার খুব ভয় করছে রে! এত মানুষের সামনে যদি ভুল করে ফেলি?”

রিয়া ওর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে সাহস জুগিয়ে বলল।

“আরে কিচ্ছু হবে না! তুই জাস্ট স্টেজে গিয়ে মাইক্রোফোনটা হাতে নিবি, আর সব ভুলে চোখ বন্ধ করে গেয়ে উঠবি। তুই পারবি, যা!”

বন্ধুদের ঠ্যালায় আর ইমোশনাল সাপোর্টে রিদি কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে ধীর পায়ে মঞ্চে উঠে এল। তখন শুভ্রর ধ্যান ফোন স্ক্রিনে, সে নিচু হয়ে একমনে ফোন টিপছিল। রিদি কাঁপতে কাঁপতে ড্যান্ড থেকে মাইক্রোফোনটা হাতে নিল। কয়েক সেকেন্ড গভীর শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল সে। তারপর চারপাশের সব কোলাহল ছাপিয়ে, চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে সুরের মূর্ছনায় গেয়ে উঠল।

~তুমি আমার এমনি একজন…~
~যারে একজনমে ভালোবেসে ভরবে না এই মন~

এত মধুর আর মায়াবী চিকন কণ্ঠটা কানে যেতেই শুভ্র ঝড়ের গতিতে মঞ্চের দিকে তাকাল। আর তাকাতেই তার পৃথিবীটা যেন ওই এক মুহূর্তেই স্থির হয়ে গেল! স্টেজে দাঁড়িয়ে নীল শাড়ি পরা এক অপরূপা বালিকা, যার চোখ দুটো বন্ধ, বাতাসে অবাধ্য চুলগুলো অবলীলায় উড়ছে, আর ঠোঁট দুটো গানের ছন্দে কাঁপছে। শুভ্রের বুকের ভেতরটা যেন ওলটপালট হয়ে গেল। এই কি সেই চঞ্চল রিদি? যাকে সে উঠতে বসতে ধমক দেয়? নীল শাড়িতে ওকে আজ বাস্তবের কোনো পরী ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছে না। শুভ্রের হৃদস্পন্দন হুহু করে বেড়ে গেল, সে পৃথিবীর সবকিছু ভুলে গিয়ে অপলক দৃষ্টিতে রিদির দিকে তাকিয়ে রইল।

এদিকে রিদি নিজের গানের জগতে ডুবে গিয়ে গেয়ে চলল।

~এক জনমের ভালোবাসা, এক জনের কাছে আসা~
~একটি চোখের পলক পড়তেই লাগে যতক্ষণ…~
~তুমি আমার এমনি একজন…~
~যারে একজনমে ভালোবেসে ভরবে না এই মন~

গানের শেষ রেশটুকু বাতাসে মিলিয়ে যেতেই পুরো অডিটোরিয়াম করতালিতে ফেটে পড়ল। রিদি আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস পেল না। দ্রুত মাইক্রোফোনটা স্ট্যান্ডে রেখে প্রায় দৌড়ে স্টেজ থেকে নেমে এল। বুকের ভেতরটা যেন আস্ত একটা ড্রামসেট হয়ে বাজছে। সে ভিড় এড়িয়ে সোজা কলেজের করিডোর দিয়ে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রিদি হাঁপাচ্ছিল। নিজের এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুলগুলো আর নীল শাড়ির কুচিগুলো ঠিকঠাক করে নিল। নিজেকে সামলে নিয়ে রিদি যেই না বের হতে যাবে, অমনি ঘটল সেই অঘটন।

হঠাৎ করেই ওর বাঁ হাতে কেউ একজন লোহার মতো শক্ত কবজিতে টান দিল। রিদি কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক জোড়া শক্তিশালী হাত ওকে সজোরে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। আতঙ্কে আর বিস্ময়ে রিদি চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। কয়েক সেকেন্ড কাটল পিনপতন নিস্তব্ধতায়। রিদি অনুভব করল ওর মুখের খুব কাছে কারো তপ্ত নিঃশ্বাস পড়ছে। গায়ের সেই পরিচিত পারফিউমের ঘ্রাণটা নাকে আসতেই রিদি ধীরে ধীরে চোখ মেলল।সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা আর কেউ নয় স্বয়ং শুভ্র!

শুভ্রর চোখে আজ সেই কড়া লেকচারারের শাসন নেই, বরং সেখানে এক অদ্ভুত ঘোর লাগা নেশাতুর দৃষ্টি। সে অপলক চেয়ে আছে রিদির দিকে। রিদির মনে হলো শুভ্রর ওই চোখের মনিতে সে যেন ডুবে যাচ্ছে। শুভ্রর এক হাত রিদির ঠিক পাশের দেয়ালে শক্ত করে চেপে ধরা, আর অন্য হাত দিয়ে সে রিদির কবজিটা মুঠোর ভেতর বন্দি করে রেখেছে। দুজনের নিঃশ্বাস একে অপরের ওপর আছড়ে পড়ছে। শুভ্রর দীর্ঘশ্বাসের উত্তাপ রিদির কপালে আর চিবুকে কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে।

শুভ্র রিদির চোখের গভীরে এমনভাবে তাকিয়ে আছে, যেন সে রিদির হৃদস্পন্দনের প্রতিটি শব্দ শুনতে পাচ্ছে। রিদি এই ঘোর লাগা দৃষ্টির সামনে অসহায় হয়ে কাঁপতে লাগল। শুভ্র আরও একটু ঝুঁকে এল, ওর ঠোঁট আর রিদির কপালে দূরত্ব মাত্র কয়েক ইঞ্চির। শুভ্র একদম নিচু, খসখসে গলায় প্রশ্ন করল।

“শাড়ি পরেছিস কেন?”

শুভ্রর এই রহস্যময় আর ঘোর লাগা কথাটা মাথামুণ্ডু কিছুই রিদি বুঝে উঠতে পারল না। সে কপালে ভাঁজ ফেলে অবাক হয়ে বলল।

“মা-মানে? আপনি কী বলতে চাইছেন?”

শুভ্রর চোখের সেই নেশাতুর মায়া মুহূর্তেই বদলে গিয়ে এক অদ্ভুত কঠোরতায় রূপ নিল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল।

“মানে এটাই শাড়ি পরেছিস কেন? তোকে শাড়ি পরতে আমি একদম নিষেধ করেছিলাম। মনে নেই তোর?”

রিদি এবার একটু অবাক হলো। শুভ্রর এমন অদ্ভুত শাসনে তার ভেতরটাও যেন বিদ্রোহী হয়ে উঠল। সে ভ্রু কুঁচকে বলল।

“শাড়ি পরলে সমস্যাটা কোথায় আপনার?”

শুভ্র রিদির আরও কাছে এসে ওর নিশ্বাস বন্ধ করে দেওয়ার মতো এক পরিস্থিতি তৈরি করল। সে গম্ভীর গলায় আদেশ দিল।

“না, তুই পরবি না। ব্যাস! এই মুহূর্তে তুই বাড়িতে যাবি। এই উৎসবে তোর আর থাকার দরকার নেই।”

রিদির এবার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। সারাক্ষণ এই মানুষের শাসন আর ধমক সইতে সইতে সে ক্লান্ত। সে জেদি গলায় চিবিয়ে চিবিয়ে বলল।

“আমি শাড়ি পরব কি না তা আপনি বলার কে? আর আমাকে শাড়িতে ভালো দেখা গেল নাকি খারাপ, সেটা একান্তই আমার বিষয়। আমার ব্যক্তিগত ব্যাপারে আপনি কেন নাক গলাচ্ছেন?”

রিদির মুখে মুখে এমন তড়পানো শুনে শুভ্র নিজেকে যেন আর কন্ট্রোল করতে পারল না। সে এক ঝটকায় রিদির দুই হাত শক্ত করে ধরে ওকে একদম দেয়ালের সাথে মিশিয়ে ফেলল। নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে করতে হিশহিশিয়ে বলল।

“আই সেইড, আমি শাড়ি পরতে বারণ করেছি মানে তুই পরবি না! জাস্ট শাট আপ অ্যান্ড গো হোম!”

শুভ্রের এমন আচরণে রিদি এক মুহূর্তের জন্য ভয় পেলেও পরক্ষণেই রাগে ফেটে পড়ল। সেও চেঁচিয়ে বলল।

“কেন এমন করছেন শুভ্র ভাই? আপনি তো আর আমাকে ভালোবাসেন না! তাহলে আমার জীবন, আমার চলাফেরা নিয়ে কেন আপনি এভাবে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন? আমার কি কোনো স্বাধীনতা নেই?”

শুভ্র এবার প্রচণ্ড ধমক দিয়ে উঠল।

“ডোন্ট আর্গুই উইথ মি! তোকে শাড়ি পরতে না করেছি মানে শাড়ি তুই পরবি না। দ্যাটস ইট!”

রিদি এবার সর্বশক্তি দিয়ে শুভ্রকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। তার চোখে তখন জল আর জেদ দুটোই খেলা করছে। সে একদম জেদি গলায় স্পষ্ট জানিয়ে দিল।

“পরব! একশ বার পরব! আমি আপনার কথা শুনতে বাধ্য নই। যাকে ভালোবাসেনই না, তাকে শাসন করার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?”

রিদির এই সমানে মুখে মুখে তর্ক করাটা শুভ্র কোনোভাবেই নিতে পারল না। রাগে ওর মাথার রগগুলো দপদপ করছে। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে শুভ্র সজোরে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল রিদির নরম গালে। পুরো করিডোরে সেই থাপ্পড়ের শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো। রিদি যন্ত্রণায় গালে হাত দিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। শুভ্র ওর দিকে আঙুল উঁচিয়ে শাসানোর গলায় বলল।

“আমার সাথে মুখে মুখে তর্ক একদম করবি না ! তোকে দৃতীয়বার ওয়ার্নিং দিচ্ছি, আবার শাড়ি তৃতীয়বার পরলে আমার চেয়ে খারাপ আর কেউ হবে না। আর শোন, এই মুহূর্তে যদি কলেজ ছেড়ে বাড়ি না যাস, তবে গুনে গুনে ৫০টা থাপ্পড় খাবি আমার হাতে। গেট আউট!”

রিদির চোখ ফেটে জল গড়িয়ে পড়ল। অপমানে আর ব্যথায় ওর শরীরটা রি রি করে উঠল। সে তেজদীপ্ত চোখে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে ভাঙা গলায় বলল।

“মারতেই পারবেন শুধু,ভালোবাসতে তো আর পারবেন না, ঠিক আছে যাচ্ছি! আমি চলেই যাচ্ছি। তবে যাওয়ার আগে শুধু একটাই কথা বলব আপনার মতো একটা পাথর আর নিঠুর মানুষকে ভালোবাসাটাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল!”

বলেই রিদি এক দৌড়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে গেল। কারও সাথে কোনো কথা না বলে, বান্ধবীদের না জানিয়েই সে কাঁদতে কাঁদতে কলেজের মেইন গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল। ওদিকে শুভ্র যে হাত দিয়ে রিদিকে মেরেছে, সেই হাতটা দিয়েই সজোরে দেয়ালে একটা ঘুষি মারল। ওর চোখ দুটো তখন টকটকে লাল। দাঁতে দাঁত চেপে সে বিড়বিড় করল।

“পাগল করে দিচ্ছিস তুই আমাকে! কেন বুঝিস না তোর এই রূপ আর এই সাজ আমি ছাড়া অন্য কারও দেখা বারণ? কাউকে দেখতে দেব না আমি তোকে। তুই শুধুই আমার, মনোমোহিনী ! শুধুই আমার!”

এদিকে রিদি রাস্তা দিয়ে হাহাকার করে কাঁদতে কাঁদতে যাচ্ছে। চারপাশের কোনো খেয়াল নেই ওর। নীল শাড়ির আঁচলটা লুটিয়ে পড়ছে, কিন্তু সেদিকে ওর ভ্রুক্ষেপ নেই। হাঁটতে হাঁটতে সে যখন একটা নির্জন নিরিবিলি রাস্তার মোড়ে এল, হঠাৎ একটা কুচকুচে কালো রঙের দামি গাড়ি ওর গা ঘেঁষে এসে ব্রেক কষল।

রিদি কিছু বুঝে ওঠার আগেই গাড়ির দরজা খুলে একজন লোক বেরিয়ে এল। চোখের পলকে সে রিদির মুখে একটা ক্লোরোফর্ম মাখানো রুমাল চেপে ধরল। রিদি গোঙানোর চেষ্টা করল, কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ওর শরীর অবশ হয়ে এল। লোকটা ওকে পাঁজাকোলা করে গাড়ির পেছনের সিটে ছুড়ে ফেলল। মুহূর্তের মধ্যে গাড়িটা স্টার্ট দিয়ে ধুলো উড়িয়ে অনেক দূরে মিলিয়ে গেল।রাস্তার এক কোণায় পড়ে রইল শুধু রিদির চুলের একটা ক্লিপ আর হাতের ফোন।

রানিং…!

প্রিয় পাঠক সবাই আমার এই পেইজে ফলো করে রাখো।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply