ভবঘুরে_সমরাঙ্গন
সারপ্রাইজ_পর্ব (০.০০০০০১৮+ পর্ব)
তাজরীন ফাতিহা
নিস্তব্ধ দ্বারে পুষ্পের ঘনঘটা,
রঙটি তাহার বড্ড ফকফকা।
কোমল স্পর্শে খুঁজিয়া আত্মজ,
কি মায়ায় করিলে গো বশ?
“নৌমিন মারইয়াম আজওয়া” মারওয়ান আজাদ ও ফৌজিয়া নিশাত দম্পত্তির একমাত্র আত্মজা। বর্তমানে নরম তুলোর ন্যায় নমনীয় কায়াটি হাত পা ছড়িয়ে কান্না করছে। কান্নার বেগ বাড়তেই মায়মুনা বেগম দৌঁড়ে এলেন। কাঁদতে কাঁদতে গলা বসে গেছে দুইমাস বয়সী কোমল শিশুটির। মায়মুনা বেগম দেখলেন আশেপাশে নিশাত নেই। দরজায় বেলের আওয়াজে তিনি নাতিকে থামাতে থামাতে দরজা খুলে দিলেন। ওপাশে ঘর্মাক্ত ও ক্লান্ত মুখশ্রী নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শিশুটির সুঠামদেহী পিতা। মেয়েকে কাঁদতে দেখে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল,
“কাঁদছে কেন?”
মায়মুনা বেগম শিশুটির পিঠে হাত ওঠানামা করতে করতে বললেন,
“জানি না, সম্ভবত খিদায়।”
মারওয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল,
“খিদায় কেন? ওর মা কই?”
“দেখলাম না তো রুমে। বাথরুমে গিয়েছে বোধহয়। তুই একটু কোলে নে।”
“আমি ফ্রেশ হবো তারপর নেব। বাইরে থেকে এসেছি প্রচুর জার্ম শরীরে।”
বলেই রুমে ঢুকে দেখল নিশাত বাথরুম থেকে বালতি ভরে বাচ্চার কাঁথা, জামা কাপড় ধুয়ে বেরোচ্ছে। মারওয়ানকে দেখতে পেতেই হাসল। প্রতুত্তরে মারওয়ান সৌজন্যমূলক হাসিও হাসল না। মুখ গম্ভীর করে শক্ত কণ্ঠে বলল,
“বাচ্চাকে এভাবে ফেলে রাখো তোমরা? ঘরে এতগুলো মানুষ থাকতে মেয়েটার গলা বসিয়ে ফেলার দশা করেছ।”
নিশাত অবাক বদনে বিছানায় চাইতেই দেখল নৌমিন নেই। ঘুম পাড়িয়ে রেখে গিয়েছিল তো। সে কিছু বলতে নিলেই মারওয়ান তাকে সরিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল। নিশাত একটা নিঃশ্বাস ফেলে জামাকাপড় দড়িতে মেলে দিয়ে এসে শাশুড়ির কাছ থেকে নৌমিনকে কোলে নিল। মায়ের কোলে যেতেই বাচ্চাটা শান্ত হয়ে ফোঁপাতে লাগল। নিশাত রুমে এসে ব্রেস্ট ফিডিং করাতে বসল। নৌমিন খাবার পেতেই চুকচুক শব্দ করে চোখ বুঁজে খেতে লাগল। নিশাতের শিরদাঁড়ায় পেইন হয় ইদানিং। বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারেনা। বালিশে হেলান দিয়ে মেয়েকে বুকে আঁকড়ে চোখ বুঁজে রইল। নাহওয়ান গেছে ওর চাচাদের সাথে চিলড্রেনস প্যাভিলিয়নে।
নৌমিন হওয়ার পর থেকে রাতে ঘুমাতে পারেনা নিশাত। বাচ্চাটা দিনে ঘুমায় আর সারা রাত জেগে থাকে। নিশাত সারাদিনের ক্লান্তিতে চোখ বুজতে চাইলেও মেয়ের জন্য পারেনা। মারওয়ান একটা আইটি ডিপার্টমেন্টে কর্মরত। এছাড়াও ইতোমধ্যে সে ওয়েব ডেভেলপার হিসেবে ভালোই দক্ষতা অর্জন করে ফেলেছে। সেজন্য সারা দিনে অফিসে থাকলেও রাতে বাসায় এসেও ফুসরৎ মেলেনা তার। ওয়েব ডেভেলপের কাজগুলো নিয়ে বসে। চোখ একবার বন্ধ করলে পরেরদিন ফজরের সময় খোলে। নিশাতও আর ঘাটেনা তাকে। কত পরিশ্রম যায় লোকটার উপরে। তাই সে এক্সট্রা কোনো প্রেশারে ফেলেনা।
মারওয়ান বাথরুম থেকে বের হয়ে দেখল নিশাত চোখ বুঁজে বালিশে হেলান দিয়ে বাচ্চাকে ফিডিং করাচ্ছে। সে মুখ গম্ভীর করে খেয়ে আসল। নিশাত বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছিল। এসে বিছানায় শুতেই নিশাত চোখ খুলে বলল,
“সেকি শুয়ে পড়লেন যে, খাবেন না?”
মারওয়ান জবাব দিল না। নিশাত মারওয়ানের মুড বুঝছে না। হঠাৎ আজ এত গম্ভীর হয়ে গেল? নিশাত ঘুমন্ত নৌমিনকে আস্তে করে শুইয়ে দিয়ে মারওয়ানকে ধরতেই ওপাশ থেকে জবাব এল,
“আমাকে টাচ করবে না।”
“কি হয়েছে আপনার?”
“কিছু না।”
“আজকে এত গম্ভীর কেন? মন মেজাজ খারাপ?”
“পকপক করবে না। ঘুমাতে দাও। আবার মাগরিবের সময় উঠতে হবে।”
নিশাত আর ঘাটল না। মারওয়ানের মাথায় মালিশ করে দিতে চাইল। মারওয়ান নিশাতের হাত সরিয়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। নিশাত ক্লান্তিতে ভরা মুখটার দিকে চেয়ে ভীষণ মায়া অনুভব করল। আজকে যে কি হয়েছে! কখনো তো এমন করেনা। কোনো গুরুতর বিষয় নিয়ে আপসেট নাকি?
মারওয়ান নৌমিনকে বুকে নিয়ে হেলান দিয়ে ল্যাপটপে টাইপ করছে। নৌমিন বাবার বুকে শুয়ে শুয়ে নানারকম শব্দ করছে আর হাত-পা ছুঁড়ছে। নাহওয়ান পাশে বসে বসে খেলছিল। উঠে এসে বলল,
“বাবা?”
মারওয়ান কাজ করতে করতেই জবাব দিল,
“হুম।”
“স্নোপিকে কোলে নিব?”
“কোলে নিয়ে উল্টে পড়তে?”
“পড়ব না, দাও।”
মারওয়ান নৌমিনকে তার ঘুমানোর ছোট্ট বালিশটায় আস্তে করে শুইয়ে রাখল। বাবার কোল থেকে বিছানায় শুতেই নৌমিন গলা উঁচিয়ে কাঁদতে লাগল।নাহওয়ান বোনের পাশে বসে কান্না থামানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে তবুও নৌমিন থামছে না। যেন কত জোরে কাঁদতে পারো তার প্রতিযোগিতা লাগিয়েছে। মারওয়ান ল্যাপটপে টাইপিং করতে করতেই বলল,
“এহহে, পোলাপান আমার কোলে যে কি মধু পেয়েছে আল্লাহ জানে।”
বলতে বলতে মেয়েকে এক হাতে উঠিয়ে কোলে নিল। নাহওয়ান মন খারাপ করে শুয়ে পড়ল। নৌমিন বাবার বুকে শুয়ে শুয়ে মুখে আঙুল ভরে ভাইকে দেখছে।বাবার গেঞ্জিতে মুখের লালা ভরিয়ে ফেলেছে। নিশাত সবকিছু গুছিয়ে রুমে এসে দেখল মারওয়ান মেয়েকে নিয়ে কাজ করছে। নাহওয়ানকে পাশে শুয়ে থাকতে দেখে বলল,
“ছেলে ঘুমিয়ে পড়েছে?”
প্রশ্নটা মারওয়ানের উদ্দেশ্যে থাকলেও সে কোনো জবাব দিল না। দুপুর থেকে মারওয়ানের অদ্ভুত আচরণের কারণ খুঁজে পাচ্ছে না নিশাত। সে এগিয়ে এসে নৌমিনকে কোলে নিতে চাইলে মারওয়ানের জোরের সাথে পারল না। অর্থাৎ মেয়েকে কিছুতেই দেয়া হবেনা।
“ঘুমানোর আগে মেয়ের ডায়াপার চেঞ্জ করে দুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েন। আমি আর ছেলে ঘুমালাম।”
বলেই নিশাত ছেলেকে বুকের মধ্যে আগলে ঘুমের দেশে পাড়ি দিল। মারওয়ান পাশে শায়িত নারীটির দিকে একবার ভ্রু কুঁচকে চেয়ে কাজে মনোনিবেশ করল। কিছুক্ষণ পর নৌমিন কেঁদে ওঠায় মারওয়ান উঠে ডায়াপার চেঞ্জ করিয়ে দিল। তারপরেও মেয়ের কান্না না থামায় বুঝল বাচ্চাটা খিদার জন্য কাঁদছে। মারওয়ান আয়েশ করে ঘুমিয়ে থাকা নারীটির দিকে তাকিয়ে বিড়বিড়ালো,
“মেয়েটাকে না খাইয়ে কিভাবে ঘুমাচ্ছে দেখো। রাত এগারোটাও বাজেনি এত তাড়াতাড়ি কিসের ঘুম? এতদিন তো দুটোর আগে বালিশে মাথা রাখতেই দেখিনা। আজকে ইচ্ছে করে আগে আগে শুয়ে পড়েছে। মেয়ের কান্নাও কি কানে যাচ্ছে না?”
নিশাত ঘুমায়নি। এমনিতেই চোখ বুজে ছিল। মেয়েকে না খাইয়ে কোনো মা ঘুমাতে পারে? নাহওয়ান ঘুমিয়ে পড়েছে। এতক্ষণ নিশাত মারওয়ানের কার্যকলাপ দেখছিল। মেয়ের কান্নার গতি বাড়তেই আর শুয়ে থাকতে পারল না। উঠে বসে বলল,
“দিন মাতব্বর সাহেব, আপনি যে মেয়েকে কতটা সামলাতে পারবেন বোঝা হয়ে গেছে।”
মারওয়ান কিছু না বলে মুখ গম্ভীর করে মেয়েকে নিশাতের কোলে দিল। ঝগড়া করার মুড নেই আপাতত। নিশাত মেয়েকে খাওয়াতেই বাচ্চাটা শান্ত হয়ে গেল। মারওয়ান ল্যাপটপ নিয়ে টেবিলে গিয়ে বসল। খানিকপর মেয়ে ঘুমিয়ে পড়তেই নিশাত আস্তে করে শুইয়ে দিল। উঠে বেবি পাউডার এনে গলায় লাগিয়ে দিল। পাশে ঘুমন্ত ছেলের গলাতেও লাগালো। ঘুমন্ত মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে বলল,
“তুইও বাপের আদল পাচ্ছিস? তোরা ভাই, বোন দুটোই বাপের আদল পেলে আমার আদল পাবে কে? পেটে রাখি আমি, চেহারা পাস বাপের। এত বড় গাদ্দারী দুনিয়ায় আর একটাও আছে?”
মারওয়ান সব শুনলেও পাত্তা দিল না। তাকে শুনিয়ে শুনিয়েই যে কথাগুলো বলছে তা সে ভালোই বুঝতে পারছে। শোনাক, সে আজ কোনো প্রত্যুত্তর করবে না। মারওয়ানের সাড়াশব্দ না পেয়ে নিশাত কোণা চোখে চাইল। এই রাতের বেলা হঠাৎই মাথায় একটা ভাবনা উঁকি দিল। উঠে পা টিপে টিপে ধীর হস্তে আলমারির পাল্লা খুলে একটা মেরুন রঙের শাড়ি বের করল। এটা তাকে মাহাবুব আলম দিয়েছিলেন। নিশাত শাড়ি বেশি পরে না দেখে মারওয়ান কোনোদিন তাকে শাড়ি কিনে দেয়নি। তাছাড়া শাড়ি ক্যারি করা বিরাট ঝামেলার। লোকটা কতটা বেকুব শাড়ি পরে না দেখে একটা শাড়িও কিনে দেয়নি। মেয়েদের সাজগোজের কোনো কিছু তাকে কিনতে দেখা যায়নি কখনো। নিশাতও কোনোদিন বলেনি তার এটা লাগবে কিংবা ওটা। সাজগোজ তেমন পারে না সে। তাই অমনভাবে করা হয়নি কখনো। তবে লোকটার সামনে সবসময় পরিপাটি হয়েই থেকেছে। স্বামীর জন্য পরিপাটি থাকতে তার আবার ভীষণ ভালো লাগে। আজকে ইচ্ছে করছে মন ভরে সেজে লোকটাকে দেখাতে। আচ্ছা, লোকটা কেমন রিয়েকশন দেবে? কোনোদিন না সাজা নিশাতকে হঠাৎ করে সাজুনি রূপে দেখে লোকটার অনুভূতি কেমন হবে? বুকের হৃদপিণ্ড ছলাৎ ছলাৎ করবে কি?
নিশাত বেশ মনোযোগ দিয়ে শাড়ি পরে লম্বা চুলগুলো খোঁপা করল। শাড়ির কুঁচি গুলো ঠিকঠাক হয়নি তবুও সে চেষ্টা করেছে একটা সুন্দর রূপ দেয়ার। নিশাত মারওয়ানের দিকে চাইতেই দেখল এখনো ল্যাপটপের কীবোর্ডে হাত দ্রুত ওঠানামা করছে। পূর্ণ মনোযোগ ল্যাপটপের স্ক্রিনে। আশেপাশের কোথাও ধ্যান জ্ঞান নেই। একবার এদিকে তাকাতেই তো পারতো। কেমন নির্লিপ্ত এই লোক! যার জন্য এত সাজা সেই মুখ ফিরিয়ে দেখছে না। নিশাত আবার আয়নায় মুখ ঘুরিয়ে নিজেকে দেখে আলমারি থেকে একটা আর্টিফিশিয়াল গাঁজরা বের করল। এটা তার বিয়ের সময়ের। বিয়ের সবকিছু নিশাত গুছিয়ে রেখে দিয়েছে। মাঝে মধ্যে বের করে দেখে। ভালোই লাগে। বক্স খুলে একটা রেড লিপস্টিক পেল। এটা কি মেরুন রঙা শাড়িটার সাথে মানাবে? সাজার বিষয়ে তার জ্ঞান একদমই নেই। লোকটাকে জিজ্ঞেস করবে? না থাক, একদম সেজে টেজে চমকে দেয়া যাবে।
ঠোঁট দুটোতে লিপস্টিক দিয়ে একবার আয়নায় নিজেকে দেখল। নাহ, খারাপ লাগছে না। তার চোখে তো ভালোই দেখাচ্ছে। লোকটার চোখে কেমন লাগবে কে জানে? লিপস্টিকের উপর একটা বেবি পিংক কালারের লিপগ্লস লাগালো। ঠোঁটটা এখন গ্লোসি লাগছে। খোঁপায় গাঁজরা পেঁচিয়ে মুখে একটু নৌমিনের বেবি পাউডারটা দিল। এইটার ঘ্রাণ তার এত ভালো লাগে! নৌমিনকে দিলে বারবার ঘ্রাণ নেয়। বাচ্চাদের সোপ, শ্যাম্পু, বডি লোশন, তেল, ক্রিম, পাউডার সব তার প্রিয়। নৌমিনকে দিতে নিলে নিজেও কিছুটা হাতে লাগিয়ে নেয়। বারবার নৌমিনের শরীরের ঘ্রাণ নেয়। উফফ চমৎকার একটা ঘ্রাণ! ভাবতে ভাবতে স্পঞ্জ দিয়ে পাউডার গুলো মুখে মিশিয়ে নিল।
চোখে একটু কাজল দিয়ে আয়নায় নিজেকে ঘুরে ঘুরে দেখল। সব ঠিকঠাক। ওহ এখনো চুড়ি পড়া বাকি! নিশাত নিজের বিয়ের চুড়ি বের করে পড়তে নিলে দেখল হাতে লাগছে না। অনেক চেষ্টা করেও পারল না। সে মোটা হয়ে গেছে। বিয়ের সময় কত চিকন ছিল আর এখন! নিশাতের হঠাৎ কান্না পেল। এত কষ্ট করে যদি পরিপূর্ণ ভাবে সাজতেই না পারে তাহলে কেমন লাগে? সে মন খারাপ করে ঘরের সাধারণ চুড়ি দুটোই পরে নিল। যদিও শাড়ির সাথে মানাচ্ছে না তবুও কিছু করার নেই। হাত খালি তো থাকল না। শাড়ির আঁচল টেনে এপাশে আনল। ধীর পায়ে হেঁটে মারওয়ানের চেয়ারের পিছনে দাঁড়ালো। নিশাতের হঠাৎ লজ্জা করছে। লোকটা কি ভাববে? যদি মুখের উপর বলে দেয়, মাঝ রাতে তোমার হঠাৎ সাজতে মন চাইল কেন? এসব শাড়ি টারি পরে আমার পাশে শুতে পারবে না। একটুও ভালো লাগছে না ফৌজিয়া নিশাত। তোমাকে সাধারণভাবেই ভালো লাগে। তখন সে কি উত্তর দেবে?
নিশাত হাত কচলাতে লাগল। বারবার শরীর, কপাল ঘেমে উঠছে। হাত কচলাতে কচলাতে আস্তে করে গলা খাঁকারি দিল। নিজের কানেই নিজের আওয়াজ আসছে না। আশ্চর্য তার হঠাৎ এত লজ্জা লাগছে কেন? মনে হচ্ছে নতুন বিবাহিত বরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সেজে গুজে দাঁড়িয়ে থাকতে ভীষণ লজ্জা লাগছে। মনে চাচ্ছে সবকিছু খুলে আবার সাধারণ রূপে ফিরে আসতে। সাধারণ নিশাত হলে এতক্ষণ ফটাফট কথা বলে ফেলত। সেজেছে দেখে এত লজ্জা পেতে হবে কেন? মারওয়ানের সামনে কি সে নতুন? নতুনই তো এমন সেজে গুজে তো কখনো সামনে আসেনি। তার গাল দুটো রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে।
মারওয়ান ল্যাপটপ শাট ডাউন করে পিছনে ঘুরতেই নিশাতের সঙ্গে ধাক্কা খেল। চোখের সামনে একটা শাড়ি পরিহিত রমণীকে দেখে হতবাক হলো। এই রুমে এই মহিলা কে? তাও আবার উল্টো ঘুরে তার চেয়ারের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে কেন? নিশাত কোথায়? বিছানায় তাকিয়ে দেখল নিশাত নেই। কি আশ্চর্য এই মহিলা কে? কঠোর ভঙ্গিতে গলার স্বর উঁচু করে বলল,
“এই আপনি কে? আমার বেড রুমে ঢুকেছেন কিভাবে? নিশাত, নিশাত।”
নিশাত লজ্জায় মুখ ওদিকে করে নিজেকে প্রস্তুত করছিল। হঠাৎ মারওয়ানের চিৎকারে হকচকিয়ে দ্রুত ঘুরে বলল,
“চুপ!! আস্তে এটা আমিইই।”
মারওয়ান মুখ হা করে নিশাতের দিকে চেয়ে রইল। উপর নিচ স্কান করে বলল,
“তুমি??”
“হ্যাঁ, আপনি নিজের বউকেও চেনেন না?”
“বউকে তো চিনি তবে এত লম্বা আর ভিন্ন সাজের বউকে তো চিনিনা।”
নিশাতের গাল আরক্তিম হলো। সে পা উঁচিয়ে উঁচু হিল দেখিয়ে বলল,
“হিল পড়েছিলাম।”
মারওয়ান ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ডিস্কো জুতা তোমাকে কে দিয়েছে?”
“মানহা।”
“তাই তো বলি এই রাতের বেলা কোন বেগানা নারী আমার ইজ্জত হরণ করতে এল।”
নিশাত লজ্জায় মুখ নামিয়ে শাড়ির আঁচলের কোণা হাতে পেঁচাতে লাগল। মারওয়ান নিশাতকে উপর নিচ পর্যবেক্ষণ করে বলল,
“হঠাৎ সাজার কারণ?”
“কারণ নেই, এমনিই।”
মারওয়ানের হঠাৎ কিছু মনে পড়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে মুখ কঠিন হয়ে গেল। নিশাতের পাশ কাটিয়ে বিছানায় গিয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল। নিশাত হতবাক হয়ে বলল,
“এটা কি হলো?”
নিশাত বুঝল কোনো কারণে তার উপর মারাত্মক রেগে আছে মারওয়ান। তাই এমন করছে। কি করেছে সে? নিশাত শাড়ির কুঁচি ধরে বিছানায় মারওয়ানের পাশে বসে ধীর গলায় ডাকল,
“ফাইয়াজের বাবা?”
মারওয়ানের সাড়া শব্দ নেই। নিশাত মারওয়ানের বুকের উপর মাথা রেখে আবারো ডাকল,
“এই ফাইয়াজের বাবা, আপনি কি আমার উপরে রেগে আছেন?”
“তুমিই ভেবে দেখো, আমার রাগের কোনো কিছু করেছ কিনা।”
নিশাত ভাবতে বসল। অনেক ভেবেও কিছু বের করতে পারল না। নিশাত কান পেতে শুনল মারওয়ানের বুকের হার্ট দ্রুত লাফাচ্ছে। অবুঝ গলায় বলল,
“কই কিছু করিনি তো?”
“না করলে ভালো।”
নিশাত ঠোঁট টিপে বলল,
“বাবুর জামাকাপড় ধুয়েছি দেখে রেগে আছেন?”
মারওয়ান জবাব দিল না। নিশাত মারওয়ানের চোখের উপর থেকে হাত সরিয়ে বন্ধ নেত্র দুটির দিকে চেয়ে বুকে থুতনি ঠেকালো।
“এদিকে তাকান?”
মারওয়ান তাকালো না। নিশাত বুঝতে পারছে মারওয়ানের হার্টবিট দ্রুত ওঠানামা করছে। চোখের পাপড়ি গুলো তিরতির করে কাঁপছে। মারওয়ানের এমন অপ্রস্তুত রূপ দেখতে তার ভালোই লাগছে। নিশাত ফিসফিসিয়ে বলল,
“এই ফাইয়াজের বাবা, নাহওয়ান নৌমিন ঘুমাচ্ছে।”
“তো?”
নিশাত মারওয়ানের গালে আলতো করে আঙুলের স্পর্শ দিতে দিতে কোমল গলায় বলল,
“চলুন প্রেম করি।”
মারওয়ান ফট করে চোখ খুলে নিশাতের চোখে চোখ রেখে বলল,
“সরো।”
নিশাত সরে উঠে বসল। মারওয়ান নিজেও উঠে বসে সাইড টেবিল থেকে পানি নিয়ে ঢকঢক করে খেয়ে বলল,
“তুমি ঘুমাবে না?”
“না, আজকে শুধু প্রেম করব।”
“না ঘুমালে নাই। করোগে প্রেম। আমার ঘুমে ডিস্টার্ব করলে তোমার খবর আছে।”
মারওয়ান আবারও শুয়ে পড়তেই নিশাতও তার বুকের উপর শুয়ে পড়ে বুকে হাত বুলাতে বুলাতে ঠোঁট টিপে বলল,
“এই মারওয়ান আজাদ চলুন প্রেম করি।”
“তুমি কিন্তু বেশি করছ।”
নিশাত মারওয়ানের আঁখিতে আঁখি মিলিয়ে বলল,
“আপনি কম করুন, আমি নাহয় আপনাকে বেশি বেশি ইভটিজিং করি।”
“এটা রীতিমত হ্যারেসমেন্ট।”
“যতক্ষণ পর্যন্ত না আপনি আমার সঙ্গে স্বাভাবিক হচ্ছেন ততক্ষণ পর্যন্ত এই হ্যারেসমেন্ট চলবে।”
মারওয়ান পরাজিত ভঙ্গিতে বলল,
“তোমাকে সুন্দর লাগছে।”
নিশাত বুকে থুতনি রেখে নয়নে নয়ন রেখে বলল,
“আর?”
“আর কী?”
“সেটাই তো জিজ্ঞেস করছি।”
“খুব সুন্দর লাগছে আজকে, একদম অপ্সরা। রূপের আগুনে ঘেমে টেমে এখন আবার গোসল করতে হবে।”
“আর?”
“কি আর আর করছ? আর কী বলব?”
“মন ভরেনি।”
“তোমাকে ফৌজিয়া নিশাতের মতো লাগছে, ফাইয়াজ-আজওয়ার মায়ের মতো লাগছে, মাহাবুব আলমের পুত্রবধূর মতো লাগছে, নাসির উদ্দিনের মেয়ের মতো লাগছে, মানহার ভাবির মতো লাগছে।”
“আর?”
“আর তোমার মাথা আর আমার মুণ্ডু।”
নিশাত গভীর স্বরে বলল,
“বলুন।”
“আর কী বলব?”
মারওয়ানের বুকে আঁকিবুঁকি করতে করতে নিশাত বলল,
“শাড়িতে মারওয়ান আজাদের বউ বউ লাগছে না?”
“শুধু শাড়ি কেন ফৌজিয়া নিশাত সর্বরূপে মারওয়ান আজাদের। সে পুরোটাই তো মারওয়ান আজাদের লিলিপুট অর্ধাঙ্গিনী।”
নিশাত উত্তরটা শুনে মনে মনে বেশ খুশি হলো। মুখে তা না বলে বলল,
“ধুর আপনি মোটেও প্রেম করতে জানেন না। একটুও রোমান্টিক না।”
“রোমান্টিক না বলেই দুটো আন্ডার বাপ হয়ে গেছি। রোমান্টিক হলে যেন কয় ডজন আন্ডাবাচ্চার বাপ হতাম। আল্লাহ তোমাকে বাঁচিয়েছে যে রোমান্টিক হয়নি।”
নিশাতের লজ্জায় আবারও কান, গলা গরম হয়ে উঠল। মারওয়ানের বুকে মুখ লুকিয়ে বলল,
“আপনাকে প্রেমময় বাক্য বলার কথা বলেছি আর আপনি কি বলছেন?”
“আমিও তো সেটাই বলছি। রোমান্টিক নই বলেই তো প্রেমময় বাক্য গলা দিয়ে বেরোচ্ছে না। শুধু বেরোতে চাচ্ছে, শাড়ি পড়া হাতির বাচ্চাটাকে বুক থেকে সরিয়ে ঘুমা।”
নিশাত মুখ ফুলিয়ে বলল,
“আপনি কি আমাকে হাতির বাচ্চা বললেন?”
“আমি তো কিছু বলিনি। আমার মুখ বলতে চাচ্ছে আরকি।”
“কই বলবেন, তোমাকে সুন্দর লাগছে প্রিয়তমা। সেখানে বলছেন হাতির বাচ্চা?”
“শোনো মারওয়ান আজাদ অলওয়েজ ইউনিক। এসব প্রিয়তমা, মৃয়তমা, ডিমতমা আমি বলি না। ওসব সেকেলে ডাক। অনলি হাতির বাচ্চা ইজ সুইটেস্ট ডাক। হাতির বাচ্চা দেখতে কি কিউট তুমি জানো? মন চায় চুমিয়ে লাল করে ফেলতে।”
নিশাত আবারও লজ্জায় মারওয়ানের বুকে মুখ লুকালো। লোকটা মুখে ভালোবাসা কিংবা প্রেমময় বাক্য না বলেও কিভাবে তাকে লজ্জায় ফেলে দেয়। ইশ কি লজ্জা!!
কোমরের অসহনীয় ব্যথায় নিশাতের ঘুম ভেঙে গেল। মারওয়ানের বুকে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। এখন ব্যথায় শরীর টনটন করছে। উঠে বসে কোমর ডলতে লাগল। এই ব্যথায় কত যে কষ্ট পায় বলে বোঝানো যাবেনা। শাড়িটা খুলে ফেললে ভালো হতো। প্রায় খুলেই গেছে কোনরকম শরীরে পেঁচিয়ে রেখেছে সে। নিচে ফুল স্লিভ ব্লাউজ আর পেটিকোট আছে নিশাত ঝটপট শাড়ি খুলে রাখল। শব্দ ছাড়া ডয়ার থেকে মুভ ক্রিম বের করল। কোমরে মুভ লাগানোর চেষ্টা করতেই একটা গরম হাতের স্পর্শ পেল সেখানে। নিশাত চমকে তাকাতেই দেখল মারওয়ান কড়া চোখে তার দিকে চেয়ে আছে। নিশাত চোখের পানি আড়াল করে আমতা আমতা করে বলল,
“আপনি ঘুমাননি?”
“কোমরে ব্যথায় নিশ্চয়ই ভালো লাগছে? স্বামীর কথা অমান্য করলে এমনই হবে। বারবার করে বলেছি ছাওগুলোর জামাকাপড় আমি এসে ধুয়ে দেব। শোনোনি এখন কোমর ব্যথায় লাফাচ্ছ কেন? বেশ হয়েছে।”
নিশাত কিছু বলতে নিতেই ঘুমন্ত নৌমিন মোড়ামুড়ি করে নড়ে উঠে গলা উঁচিয়ে কাঁদতে আরম্ভ করল। সে মলম রেখে তড়িঘড়ি করে মেয়েকে কোলে নিল। দুলিয়ে দুলিয়ে কান্না বন্ধ করতে চাইল কিন্তু নৌমিনের কান্না থামানোর কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। উপায় না পেয়ে ফিডিং করাতেই কান্না বন্ধ হয়ে গেল। বাচ্চাটা শান্ত হয়ে চুকচুক করে দুধ খেতে খেতে চোখ বুজল। নিশাত অসহ্য কোমরের ব্যথা নিয়েই বাচ্চাকে শান্ত করতে ফিডিং করাচ্ছে। মারওয়ান চুপচাপ সেই ব্যথায় জর্জরিত মুখখানা দেখল। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় যোদ্ধা এজন্যই বোধহয় মাকে বলা হয়। নিজের সমস্ত দুঃখ, কষ্ট চাপা দিয়ে নিজের সন্তানকে আগে প্রায়োরিটি দেয়ার নামই মা। মারওয়ান আজকে তার কথা অমান্য করায় নিশাতকে মোটেও কেয়ার করতো না কিন্তু তার সন্তানের মাকে যত্ন না করলে সে বিবেকের কাছে ছোট হয়ে যাবে। একজন মায়ের সম্মান তার কাছে সবার উপরে। উঠে বসে নিশাতের কোমরে মলম লাগিয়ে দিতে লাগল। নিশাত বাধা দিতে চাইলেও মারওয়ান শুনল না। মালিশ করায় বেশ আরাম অনুভূত হচ্ছে নিশাতের। চোখে কখন ঘুম নেমে এল টেরই পেল না।
মারওয়ানের বুকে হেলান দিয়ে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে মা ও মেয়ে। তার বুকে হেলান দেয়া নিশাত আর নিশাতের বুকে নৌমিন। মারওয়ান নৌমিনকে নিশাতের বুক থেকে আলাদা করে আস্তে করে বিছানায় শুইয়ে দিল। নিশাত ভার মুক্ত হওয়ায় মারওয়ানকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঘুমাল। মারওয়ান হাত বুলিয়ে দিয়ে নিশাতের মাথায় চুমু খেল। শাড়িতে বেশ সৌন্দর্যমন্ডিত ও মোহনীয় লাগছিল ফৌজিয়া নিশাতকে। এই কথা সে কোনোদিন বলবে না। এই নারীর অবস্থান যে তার বুকের কোথায় সেটা কাউকে কোনোদিন জানতে দেবে না।
ফজরের নামাজ পড়তে মারওয়ান ছেলেকে বগলদাবা করে মসজিদে ছুটল। মাহাবুব আলম, মাহদী, মাহফুজ আগেই বেরিয়ে পড়েছে। তাই আজ তাদের সঙ্গে যাওয়া হয়নি। বাপ, পুত্র নামাজ শেষ করে চওড়া রাস্তাটায় হেঁটে আসছে। এসময় হোয়াইটচ্যাপেল পুরোটাই শান্ত থাকে। একটু পরেই ব্যস্ততম এক নগরীতে রূপে নেবে তা। নাহওয়ানকে লাফিয়ে লাফিয়ে আসতে দেখে মারওয়ান হঠাৎ দাঁড়িয়ে বলল,
“এই পেঙ্গুইন, চল দৌঁড় প্রতিযোগিতা করি।”
নাহওয়ান খুশিমনে বলল,
“চলো।”
দুজন একটা সীমানায় দাঁড়িয়ে স্টার্ট বলে দৌঁড় শুরু করল। প্রথমে মারওয়ান এগিয়ে থাকলেও আস্তে আস্তে তার দৌঁড়ের গতি কমে গেল। নাহওয়ান তাকে ক্রস করে যেতেই মারওয়ান ধীরে ধীরে দৌড়ে আসতে লাগল। নাহওয়ান জেতার সীমানায় পৌঁছাতেই মারওয়ান দৌঁড়ের গতি বাড়িয়ে সীমানায় পৌঁছালো। এদিকে নাহওয়ান জিততে পেরে খুশিতে খিলখিলিয়ে হাসতে লাগল। তার হাসির শব্দ আশেপাশের উঁচু উঁচু দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে মারওয়ানের কানে প্রবেশ করল। ছেলের এই খুশির মূল্য মারওয়ান আজাদের কাছে অমূল্য। নাহওয়ানকে কাঁধে উঠিয়ে চলতে লাগল বাড়ির উদ্দেশ্যে।
সকালের নাস্তা শেষ করে নিশাত নাহওয়ানকে নিয়ে একটু পড়াতে বসল। বাচ্চাটাকে সে সময় দিতেই পারেনা। নৌমিনকে নিয়ে ব্যস্ততা বেড়েছে। এখন মাহদী নাহওয়ানকে পড়ায়। নৌমিন হওয়ার পর ছেলেটাকে আদরও কম করা হচ্ছে। এটা আসলেই ঠিক হচ্ছেনা। নাহওয়ান তার বড় আদরের প্রথম নাড়ি ছেঁড়া ধন। তাকে প্রথম মা ডাক শোনানো আদুরে বাচ্চা। নাহওয়ান বেশ মনোযোগ দিয়ে খাতায় লিখছে। বাংলা স্বরবর্ণ এবং ব্যঞ্জনবর্ণ সব পারে সে। ইংরেজি অ্যালফাবেটও তার বেশ আয়ত্ত হয়েছে। নিশাত মেয়েকে পাশে শুইয়ে ছেলেকে কাছে ডেকে বলল,
“আব্বা, মায়ের কাছে আসুন।”
নাহওয়ান খাতা থেকে মনোযোগ সরিয়ে মায়ের কাছে এগিয়ে এল। নিশাত ছেলেকে ঝাপটে চুমু দিতে লাগল। নাহওয়ান হঠাৎ মাকে এত আদর করতে দেখে বলল,
“মা, কিছু হয়েছে?”
“নাতো আব্বা। কেন?”
নাহওয়ান মায়াময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“তাহলে আজকে এত আদর করছ কেন?”
নিশাতের বুকে কামড় দিল। বাচ্চাটাকে কতদিন মন ভরে আদর করেনা সে। নাহওয়ানটাকে এত দূরে সরিয়ে দিয়েছে কবে? তার সেই ঘর মাতিয়ে রাখা আদুরে ছানাটা কোথায় হারিয়ে গেল? ছানাটা অল্প বয়সেই ম্যাচিউর হয়ে গেছে। মায়ের মন হঠাৎই কেঁদে উঠছে। ছেলেকে বুকে চেপে আদর করতে করতে চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। মাকে কাঁদতে দেখে নাহওয়ান ভারী অবাক হলো।
“মা কাদো কেন?”
নিশাত কথা বলতে পারল না। মারওয়ান রুমে এসে নিশাতকে কাদতে দেখে বলল,
“কান্নাকাটি কিসের? কিরে ফাইয়াজ তোর মায়ের কী হয়েছে?”
নাহওয়ান মাথা নাড়িয়ে অবুঝ স্বরে বলল,
“জানি না।”
“মাকে মেরেছিস নাকি?”
নাহওয়ান ঠোঁট টেনে টেনে বললো,
“ইহ না, তওবা তওবা।”
“তুইই কিছু করেছিস কবুতরের ছাও, সত্যি করে বল।”
মাহাবুব আলমের ডাকে নাহওয়ান দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। এখন দুই দাদা নাতির গল্প করার টাইম। দুনিয়া উল্টে গেলেও নাহওয়ানকে আর আটকে রাখা যাবেনা। নবী, রাসুল ও সাহাবীদের জীবনী শুনতে তার বেশ ভালো লাগে। নৌমিন তার চাচ্চু মাহদী- মাহফুজের কাছে। নিশাত চোখের পানি মুছে বলল,
“ফাইয়াজের বাবা, আমার ফাইয়াজটা কত দ্রুত বড় হয়ে যাচ্ছে তাইনা? এইটুকুন ছিল।”
মারওয়ান এগিয়ে এসে বলল,
“এজন্য কাঁদছ?”
“মেয়েটার কারণে ছেলেটাকে সেভাবে সময় দিতেও পারিনি। আমি কি খুব খারাপ মা?”
মারওয়ানের নিশাতের চোখে চোখ রেখে বলল,
“আমার দেখা পৃথিবীর সবচেয়ে চমৎকার মা তুমি। শ্রেষ্ঠ মায়ের তালিকা করলে সবার প্রথমেই তোমার নাম থাকবে কোনো সন্দেহ নেই।”
নিশাত তবুও মানতে চাইল না।
“নৌমিন আসার পর কতদিন হয়েছে ছেলেটাকে বুকে আঁকড়ে ঘুমাইনা।”
“কখনো কখনো কারো আসায় কাউকে তো ত্যাগ করতেই হয়। আমাদের ফাইয়াজ ত্যাগী বাচ্চা। এবয়সেই সে নিজের আদরের ভাগ বোনকে দিয়ে দিয়েছে। বুঝতে পারছ ফাইয়াজ কতটা দায়িত্বশীল ভাই হবে?”
নিশাত তো এভাবে ভেবে দেখেনি। আল্লাহ তার সন্তানদের কবুল করুন। নাহওয়ান, নৌমিন যেন আদর্শবান মানুষ হতে পারে।
__
ইংল্যান্ডের সাফোক (Suffolk) অঞ্চলের একটি নিরিবিলি গ্রাম। পরিবার নিয়ে অনেকেই একটু রিফ্রেশ হতে আসে এখানে। মারওয়ানও এর ব্যতিক্রম নয়। যান্ত্রিক শহরে থাকতে থাকতে দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার যোগাড়। ছুটি পাওয়ার সাথে সাথেই তাই পরিবারের সবাইকে সাথে নিয়ে রিল্যাক্স হতে আসা। কটেজটি ওক (Oak) কটেজ নামেই বেশি পরিচিত। বেশ ছিমছাম গোছানো একটা কটেজ। ওক, অ্যাশ, হথর্ন, এল্ডার, বিচ ইত্যাদি বিভিন্ন গাছের সমাহার এখানে। ডেইজি, ব্লুবেল, ল্যাভেন্ডার ও হলি গাছেরও মেলা বসেছে যেন। কটেজের সামনে একটি পুরোনো ওক গাছ দাঁড়িয়ে। পাশে অ্যাশ ও বিচ গাছের পাতা ও ডালের ছায়া। হথর্নের কাঁটাঝোপ আর বুনো গোলাপে ভরা চারপাশ। শরতের এসময়ে পাতাগুলো ভিন্ন রঙ ধারণ করে। ওক গাছের লম্বাটে হলদে পাতাগুলো বাতাসে মৃদু কম্পমান। পাশে বিচ গাছের মসৃণ ধূসর কাণ্ডে ছায়া পড়ছে এবং তার হলদে লালচে পাতাগুলো হালকা নড়ে নড়ে উঠছে।
মারওয়ান আশপাশটা দেখতে বেরিয়েছিল। আশেপাশের প্রকৃতি বেশ সুন্দর। অনেকদিন পর প্রকৃতির সান্নিধ্যে আসায় মনটা ফুরফুরে লাগছে তার। তবুও সেই সুজলা, সুফলা শস্য-শ্যামলা উর্বর ভূমিটিকে কিছুতেই ভুলতে পারেনা সে। জন্মভূমির ঘ্রাণ আলাদাই হয়। সেখানের মাটির ঘ্রানেই মন, প্রাণ জুড়িয়ে যায়। গাছ-গাছালির মন কেমন করা গন্ধ তাকে মোহিত করে রাখতো।
মারওয়ান গাড়ি থেকে বের হলো। উপরে আসার সময় পাশের কটেজের একজোড়া বুড়ো দম্পতি তার হাতে ফুলের তোড়া ধরিয়ে দিল। কারণ তারা এখানে আসা সকল দম্পতিকে ফুলের তোড়া বিনিময় করে থাকেন। মারওয়ান প্রথমে নিতে আপত্তি জানালেও পরে তাদের অনুরোধে নিল। তারা চলে যেতেই নিশাত কটেজের বারান্দায় এল আশপাশের প্রকৃতি দেখতে। লন্ডনে আসার পর তো প্রকৃতি দেখাই হয়না। উঁচু উঁচু ইট, পাথরের দালান ঘর ছাড়া কিছুই চোখে পড়ে না। জায়গাটা নিরিবিলি, শান্ত। ভালো লাগে। হঠাৎ নিচে চাইতেই মারওয়ানকে ফুলের তোড়া হাতে নিয়ে আসতে দেখে চোখ দুটো খুশিতে চিকচিক করে উঠল। আশেপাশে পর্যবেক্ষণ করে কাউকে না দেখে দু’তলা থেকে হালকা চিল্লিয়ে উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,
“এই ফাইয়াজের বাবা, ফুল কি আমার জন্য?”
মারওয়ান উপরে তাকিয়ে বলল,
“না।”
“তো কার জন্য?”
“যে আমার মুখোমুখি কথা বলতে পারে তার জন্য।”
“কেন আমি কি আপনার মুখোমুখি কথা বলি না?”
“না, তোমার সাথে কথা বলতে ষাট ডিগ্রি এঙ্গেল বরাবর চোখ নামাতে হয়। আমার ঘাড় ব্যথা করে। রীতিমত পানিশমেন্ট। যে আমাকে শাস্তি দেয় তাকে ফুল দিতে যাব কোন দুঃখে?”
মারওয়ান রুমে আসতেই নিশাত মুখ লটকে ফেলল। তার মুখ লটকানো দেখে মারওয়ান বলল,
“থাক, বাচ্চাদের মন খারাপ করতে হয়না। ফুলের বুকে দিয়ে বাচ্চারা কি করবে বলো? তাছাড়া তোমাকে নিচু হয়ে ফুল দিতে গেলে তো আমারও কষ্ট হবে। এত কষ্ট করে ফুল দেয়ার কোনো মানে হয় তুমিই বলো?”
নিশাত হাত ভাঁজ করে ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“বাচ্চা কে?”
“কেন নিজেকে বড়সড় ভাবতে শুরু করেছ নাকি? দেখো তোমার সাইজ আমার বুকের নিচে। লুক লাইক লিলিপুট।”
“একটা বাচ্চাকে দুই দুইটা বাচ্চার মা বানিয়ে দিতে আপনার লজ্জা করল না?”
মারওয়ান হাই তুলে বলল,
“হ্যাঁ করেছে কিন্তু কি আর করার দুটো আন্ডা অলরেডি পৃথিবীতে ল্যান্ড করে ফেলেছে ফিক্কা মেরে পাঠিয়ে দিতে তো আর পারিনা। প্রিল্যান্ড করার ক্ষমতা থাকলে লজ্জার কথা ভেবে হলেও ফিক্কা মারতাম।”
নিশাত ফুঁসতে ফুঁসতে বিছানায় গিয়ে বসল। এই ইতর লোকের সাথে কথা বলার কোনো মানে হয়না। কিসব কথা বলা শুরু করেছে! নিশাতের বারবার কান, গাল গরম হয়ে যাচ্ছে।
কটেজের রুমগুলো বেশ বড় আর খোলামেলা। ছিমছাম পরিপাটি রুমে নৌমিনকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কুরআন তেলাওয়াত করছে মারওয়ান। নৌমিন বাবার বুকে মাথা এলিয়ে মনোযোগ দিয়ে আল্লাহর কালাম শুনছে। এমনভাবে কান খাড়া করে শুনছে যেন সব বুঝতে পারছে সে। গুলুমুলু হাতের আঙুল মুখে পুড়ে ঠোঁট নাড়িয়ে নাড়িয়ে খাচ্ছে। মারওয়ান তেলাওয়াত শেষে মেয়েকে এক হাতের তালুতে উঠিয়ে কালেমায়ে শাহাদাত পড়ল। তারপর মোলায়েম কায়াটির নাকে নাক ঘষে বলল,
“মুখে আঙুল দেয়ার স্বভাব? তোকে খেয়ে ফেলব টমেটোর বাচ্চা।”
নৌমিন কি বুঝল জানা নেই বাবার দিকে চেয়ে দন্তবিহীন নির্মল হাসি হাসল। নিশাত এগিয়ে এসে বলল,
“বাচ্চাদের এসব কি নামে ডাকেন? এত সুন্দর সুন্দর নাম থাকতে এসব কী? পটলের বাচ্চা, টমেটোর বাচ্চা।”
“খারাপ কিছু তো বলিনা। পটলের বোন টমেটো।”
“ওদের বাবা-মা কি পটল আর টমেটো?”
“বায়োজিকালি না। তবে কল্পনায় হলাম সমস্যা কি? তুমি টমেটো, আমি পটল। পটলের বাচ্চা ফাইয়াজ আর টমেটোর বাচ্চা আজওয়া। সুন্দর না?”
“একদম মুলার মতো সুন্দর।”
মুলার নাম শুনতেই মারওয়ানের মুখের ভাব পাল্টে গেল। নাহওয়ান বাবাকে মুখ কুঁচকে যেতে দেখে মুখ চেপে হেঁসে ফেলল। ছেলেকে হাসতে দেখে মারওয়ান চোখ রাঙিয়ে বলল,
“ওই পটলের বাচ্চা তুই হাসিস কেন? চেপে ভর্তা করে ফেলব।”
নাহওয়ান মুখ টিপে বলল,
“ভর্তা করলে মা তোমাকে মুলার জুস খাওয়াবে।”
“কতবড় ব্রিটিশ ভাবা যায়!”
__
রাত বারোটা। বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে নিশাত কালো ও নীলের মিশেলে একটা জামদানি শাড়ি পরেছে। এই শাড়ির বিশেষত্ব হলো এটা মারওয়ান আজাদ তাকে কিনে দিয়েছে। সাধারণ সাজে আকর্ষণীয় লাগছে তাকে। তার দুহাত ভর্তি চুড়ি। সেদিন তার হাত খালি থাকায় সামনাসামনি কিছু না বললেও লোকটা ঠিকই পর্যবেক্ষণ করেছিল। একদিন হুট করেই তার হাতের মাপের বিভিন্ন পদের কয়েক জোড়া চুড়ি আর শাড়ি নিয়ে হাজির হয়েছে। হাতের মাপ জানলো কিভাবে জিজ্ঞেস করায় ত্যাড়া উত্তর দিয়েছিল,
“এতকিছুর উত্তর তো দিতে পারব না। পরতে মন চাইলে পরবে নয়তো ফেলে দেবে, ইওর উইশ।”
নিশাত আর প্রশ্ন করেনি। লোকটার ত্যাড়ামি ইহজনমে যাবেনা। নিশাত কটেজের বারান্দায় এল। আশেপাশে শুধু প্রকৃতি। মারওয়ান নিবিড় হয়ে বাইরের প্রকৃতি দেখছে। নিশাত পিছনে গিয়ে গলা খাঁকারি দিতেই মারওয়ান না ফিরেই বলল,
“এত রাতে গলা খাকাচ্ছ কেন? ঠাণ্ডা লাগিয়েছ নাকি?”
“এদিকে ঘুরুন।”
মারওয়ান ঘুরতেই নিশাতের ভিন্নরূপ নজরে এল।
“আজকেও শাড়ি?”
“তো কি ওয়েস্টার্ন পরব?”
মারওয়ান পিছনে ভর দিয়ে বলল,
“পড়তেই পারো, স্বামীর সামনে ওয়েস্টার্ন পরলেই কি আর কিছু না পরলেই বা কি?”
“ফাইয়াজের বাবা, রাগাবেন না।”
“আচ্ছা কাঁদাবো।”
নিশাত প্রত্যুত্তর না করে মারওয়ানের বুকে মাথা রেখে বলল,
“চলুন আজকে দুজন প্রেমিক প্রেমিকা হয়ে যাই।”
“প্রেমিক প্রেমিকা হলে কি হবে?”
“একটা প্রেমময় কাব্য রচিত হবে।”
“সেই প্রেমময় কাব্য রচনা করে লাভ কী?”
“কোনো লাভ নেই। আপনাকে তো কখনো প্রেমিক রূপে দেখিনি আজ মন ভরে দেখতে চাচ্ছি।”
“আমি তো প্রেমিক পুরুষ নই।”
“একদিন আমার জন্য হলে ক্ষতি আছে?”
মারওয়ান নিজের বুকে মাথা এলিয়ে দেয়া নারীটির দিকে তাকিয়ে বলল,
“শিখিয়ে দাও প্রেমিক রূপে আমাকে কী কী করতে হবে?”
নিশাত কাজল কালো নয়ন দুটো মারওয়ানের নয়নে মিলিয়ে ধীর গলায় বলল,
“বেশিকিছু করতে হবেনা শুধু ভাবুন ফৌজিয়া নিশাত পৃথিবীতে এত এত পুরুষ থাকতে শুধুমাত্র মারওয়ান আজাদের জন্য শাড়ি পরেছে, বেশ যত্ন করে সেজেছে। বলুন, চোখের ক্ষুধা মিটছে কি?”
মারওয়ান ঢোক গিললো। নিশাত মারওয়ানের অ্যাডামস অ্যাপেলের ওঠানামা দেখছে। সে উত্তরের আশায় চেয়ে আছে। মারওয়ান ধীর গলায় বলল,
“ফৌজিয়া নিশাতকে কোনো পুরুষ এত কাছ থেকে দেখেনি কিন্তু মারওয়ান আজাদ প্রতিদিন দেখে। সেই নারীটির প্রতিটি লোমকূপ তার চেনা। বলো সেই পুরুষটি ভাগ্যবান নাকি তার চোখ?”
নিশাতের শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল। শিউরে উঠছে দেহের প্রতিটি কণা। মারওয়ানের বুকে থুতনি ঠেকিয়ে চোখে চোখ রেখে বলল,
“শুধু এই বুকটায় ঠাঁই পেতে চাই অনন্তকাল। আমার ভার সহ্য করতে পারবেন কি?
এরপর আঁখিতে আঁখি মিলিয়ে দীর্ঘক্ষণ থাকা হলো। পলক পড়ল না একটুও। ব্যস বাকি কাজ চোখে চোখেই হোক। আজ নাহয় চক্ষু প্রেমের পসরা বসুক।
(আসসালামু আলাইকুম। নিন ওদেরকে সারপ্রাইজ দিলাম। ইহাব, মানহা, জিনান, ইরা ওদেরকে নাহয় আরেকদিন দেব।)
Share On:
TAGS: তাজরীন ফাতিহা, ভবঘুরে সমরাঙ্গন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ২৪+২৫
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৪৭+৪৮
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৪৩+৪৪
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৩৭+৩৮
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৭৪
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন ১৯+২০
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৬৩
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৫০
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৪১+৪২
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৭৬(অন্তিম পর্বের শেষাংশ)