Golpo romantic golpo কালারব্লাইন্ড

কালারব্লাইন্ড পর্ব ১৭(ক+খ)


#কালারব্লাইন্ড — ১৭.ক

#সোফিয়া_সাফা

অন্ধের মতো ঘর থেকে বের হয়ে এল আলতা। বুকে তীব্র হাঁসফাঁস, গন্তব্য একটাই—ধারার ঘর। ধারার ঘরটা দোতলাতেই, এরমধ্যে বেশ কয়েকবার যাওয়া আসা হয়েছে সেই ঘরে। কিন্তু এই মুহূর্তে নোনা জলে ঝাপসা হয়ে আসা চোখে দিক ঠাহর করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। পথ হারিয়ে, দেয়াল হাতড়াতে হাতড়াতে সে এসে থামল লিফটের দরজার সামনে। 

ঘরের দরজা মনে করে লিফটের দরজার বোতাম প্রেস করতে করতে আর্জি জানিয়ে ডেকে উঠল, “ধারা আপু! আমাকে সাহায্য করুন… আমি… আমি কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছি না!”

আলতা মেঝেতে পড়ে মাথা নিচু করে যন্ত্রণায় ছটফট করছিল তন্মধ্যে যান্ত্রিক শব্দে খুলে গেল লিফটের দরজা। ভেতরে দাঁড়িয়ে ছিল তাঁরা। তিনতলার ঘর থেকে নেমে বন্ধুদের সাথে লেট-নাইট আড্ডায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হচ্ছিল সে। হঠাৎ দোতলায় কেউ বোতাম প্রেস করে দেওয়ায় লিফট থেমে গেছে। তাঁরা অনাগ্রহী চোখে দেখতে চেয়েছিল এই রাতের বেলা দোতলার কোন সদস্যের আবার লিফট ব্যবহারের প্রয়োজন পড়েছে। সে ভাবতেও পারেনি এটা আলতা হতে পারে। 

কেবল আলতাকে দেখে নয়, তার চেয়েও বেশি ধাক্কা খেল মেয়েটার চেহারার বেহাল দশা দেখে। চোখ দুটো লাল টকটকে, যন্ত্রণার তোড়ে গাল দুটো ফুলে উঠে মুখের পুরো গড়নটাই বিকৃত দেখাচ্ছে।

“একি? তোমার এই অবস্থা কেন?” পরিচিত কণ্ঠ শুনে আলতা অনুমান করে নিল; সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যাক্তিটি খুব সম্ভবত তাঁরা।

মুহূর্তেই হাতজোড় করে ফেলল সে, “আপু আমাকে সাহায্য করুন। আমার চোখে খুব ব্যথা করছে… আমি সহ্য করতে পারছি না। কিছু একটা করুন।”

তাঁরা হাঁটু গেড়ে নিচু হয়ে আলতার মুখের ওপর ঝুঁকল। চোখের ভেতরের অস্বাভাভিকতা লক্ষ্য করে প্রশ্ন করল, “তুমি কি লেন্স পরেছ?”

“আমি… আমি জানি না এটা কী। আমি খোলার চেষ্টা করেছি। তাতে ব্যথাটা আরও বেড়ে গেছে।” আলতার গলায় আতঙ্কের রেশ।

আর কথা না বাড়িয়ে তাঁরা একহাতে আলতার চিবুক শক্ত করে চেপে ধরল। অপর হাতের দক্ষ আঙুলে এক এক করে খুলে আনতে উদ্যত হলো চোখের মণিতে আটকে থাকা কন্টাক্ট লেন্স দুটো। বিড়বিড় করে বলল, “পরার অভ্যাস নেই যখন তখন পরতে গেলে কেন?”

তাঁরার কথাটা আলতা খেয়াল করতে পারল না। ভয়ে চিবুকে চেপে থাকা হাতটা খামচে ধরল। তাঁরা বিরক্ত হলেও সে লেন্স দুটো বের করে আনলো। ষোড়শীর অশান্ত মনটায় এক চিলতে স্বস্তি নেমে এল। হাঁপাতে হাঁপাতে সে বলল, “ধন্যবাদ আপু।”

আলতা চোখের কাছে হাত নিয়ে যেতেই চড়া গলায় সতর্ক করল তাঁরা, “উঁহু! একদম চোখে হাত দেবে না! একটু আরাম পেলেও ঘা হয়ে যাবে। কচলে কচলে এমনিতেই চোখের বারোটা বাজিয়ে ফেলেছ!”

​“এখনো তো ভেতরটা জ্বলছে আপু…”

“দেখো একটু সময় নিয়ে। তারপরও না কমলে ডাক্তার দেখাতে হবে।”

“ডাক্তার?”

“হ্যাঁ, চোখ নিয়ে হেলাফেলা ক—” বলতে বলতেই থেমে গেল তাঁরা। আলতার এলোমেলো চুলগুলো নজরে আসতেই দৃষ্টি আটকে গেল তার। কপাল কুঁচকে বিস্মিত গলায় বলল, “এক মিনিট… তোমার চুলগুলো এমন কালো দেখাচ্ছে কেন? হেয়ার ডাই করেছ নাকি?”

আলতার মনটা ভারী হয়ে এলো। গলা দিয়ে আর একটা শব্দও বের হলো না তার; একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস আটকে রইল সেথায়। 

তাঁরা বিরক্তিতে এক হাত নেড়ে বলল, “যাক গে! তোমার চুল তুমি যা ইচ্ছা করো, তাতে আমার কী? তবে একটা কথা না বলে পারছি না তোমার আগের চুলের রঙটা ইউনিক ছিলো। বেকার ডাই করতে গেলে!”

​কথাটা শেষ করেই আবার লিফটের দিকে ঘুরে দাঁড়াল তাঁরা। কিন্তু এক কদম এগিয়ে গিয়েও কী ভেবে যেন আবার পিছন ফিরে তাকাল, “এখন ঠিকঠাক দেখতে পাচ্ছ তো? নাকি ঘরে রেখে আসতে হবে?”

“আমি… আমি পারব যেতে।”

“যাও তাহলে।” মুখে চলে যেতে বললেও, আলতা ঠিকঠাক পৌঁছাতে পারে কি না; তা দেখতে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল তাঁরা।

আলতা অনেক কষ্টে দেয়াল ধরে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল। কিন্তু নোনাজলের চাদর ঠেলে দৃষ্টি তখনও আবছা। সে কিছুই পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে না।

​তাঁরা ভ্রূ কুঁচকে কয়েক মুহূর্ত আলতার দিকে চেয়ে রইল। তারপর অকস্মাৎ এগিয়ে এসে আলতার নরম কবজিটা চেপে ধরে বলল, “থাক, ডেমো দেখাতে হবে না। আমার মনে হয় না এই অবস্থায় সাহায্য ছাড়া নিজের ঘর অবধি পৌঁছাতে পারবে।”

আলতা আর প্রত্যুত্তর করল না। তাঁরা তাকে ঘরের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলল, “যেসব কাজ করে তুমি অভ্যস্ত নও সেসব কাজ করতে যাও কেন? অ্যাটলিস্ট কারো সাহায্য তো নিতে পারতে নাকি?”

আলতা মাথা নিচু করে কাঁপা গলায় ফিসফিস করল, “দুঃখিত, আপু…”

থমকে গেল তাঁরা। একটু অবাক চোখে তাকিয়ে বলল, “তুমি আমাকে সরি বলছ কেন?”

আলতা অপরাধীর মতো ঠোঁট চেপে ধরে শাড়ির আঁচল কচলাতে লাগল। চোখের ফোলা পাতা ছাপিয়ে টপটপ করে নোনাজল গড়িয়ে পড়ছে তার লালচে গাল বেয়ে।

​তাঁরা কিছুক্ষণ নীরব থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর মৃদুমন্দ স্পষ্ট গলায় বলল, “একজায়গায় চুপ করে বোসো। আমি দেখছি কী করা যায়।”

তাঁরা বিরক্ত মুখে লিফটের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে পার্স থেকে ফোনটা বের করল। সে জানে না হঠাৎ কেন মেয়েটার প্রতি দরদ উথলে পড়ছে তার। হয়তো বা মেয়েটার গায়ে পড়া আপু ডাকটাই তাকে দিয়ে এসব করিয়ে নিচ্ছে। বাড়ির সবচেয়ে ছোট সদস্য হওয়ায় কেউ কোনোদিন তাকে শ্রদ্ধায় কিংবা ভরসায় ‘আপু’ বলে ডাকেনি। এই প্রথমবার কারো মুখে ডাকটা শুনে বুকের ভেতর অচেনা এক দায়িত্ববোধ জেগে উঠেছে।

ওদিকে আলতা গুটিশুটি মেরে কোণ ঘেঁষে মেঝের ওপর বসে পড়ল। চোখের ভেতরের অসহ্য জ্বালাপোড়াটা কমছেই না। এখন তো মনে হচ্ছে সেই যন্ত্রণার রেশ ছড়িয়ে পড়ছে পুরো মাথায়, রগগুলো দপদপ করছে তীব্র ব্যথায়। চোখের পাতা মেলে তাকানোর ন্যূনতম শক্তিটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছে ষোড়শী।

এমন সময় দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন আরিজ মাহতাবির। তার ঠিক পেছনে উদ্বিগ্ন মুখে ধারা আর ফারিশ। আলতার এমন যন্ত্রণাদগ্ধ অবস্থা দেখে এক মুহূর্তও দেরি করলেন না তারা। তিনজন মিলে দ্রুত তাকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটলেন।

চক্ষু বিশেষজ্ঞ আলতার চোখ পরীক্ষা করে কর্নিয়ার উপরিভাগে ছোট একটা আঁচড় দেখতে পেলেন। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা শেষে তিনি বললেন, “পেশেন্টের ডান চোখের কর্নিয়ার উপরিভাগে ছোট একটা আঁচড় লেগেছে। কন্ট্যাক্ট লেন্স পরা অবস্থায় চোখ ঘষাঘষি করার কারণে এমনটা হয়ে থাকতে পারে।”

তিনি প্রেসক্রিপশন লিখতে লিখতে আবার বললেন, “আমি একটা অ্যান্টিবায়োটিক আই ড্রপ দিচ্ছি, সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য। আর চোখের অসাড়তা কমাতে লুব্রিকেটিং ড্রপ ব্যবহার করবেন। নিয়ম মেনে ওষুধ দেবেন, আপাতত কন্ট্যাক্ট লেন্স পরা যাবে না। চোখে হাত দেওয়া বা ডলাডলি করাও একেবারে নিষেধ।”

হাসপাতাল থেকে আলতাকে নিয়ে যখন তারা তিনজন বাড়িতে ফিরল, তখন রাতের অন্ধকার গভীরভাবে চারপাশ গ্রাস করেছে। পিনপতন নীরবতা ভেঙে পুরো পরিবার এসে জড়ো হয়েছে লিভিংরুমে। 

সোফায় জড়সড় হয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে আলতা। পাশে তাকে আগলে ধরে বসে আছে ধারা। লিভিংরুমের ঠিক মাঝখানে, বুকের ওপর দু-হাত আড়াআড়ি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে রঞ্জক। 

আরিজ মাহতাবির খিটখিটে মেজাজে বললেন, “তুমি জানো বউমার চোখের কর্ণিয়ায় স্ক্র‍্যাচ পড়ে গেছে?”

রঞ্জক একনজর তাকালো আলতার দিকে। মেয়েটার চোখের পাতা দুটো অতিরিক্ত ফুলে এতটুকু হয়ে গেছে, তাকিয়ে আছে নাকি চোখ বুজে যন্ত্রণায় ছটফট করছে; নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। 

রঞ্জক কোনো অস্থিরতা না দেখিয়ে একহাতে নিজের ঘাড় চেপে ধরে অন্য হাতটা পকেটে পুরল। শান্ত স্বরে বলল, “আমি ওকে চোখে হাত দিতে নিষেধ করেছিলাম। ও আমার কথা শোনেনি।”

আরিজ মাহতাবির ছেলের দিকে দুপা এগিয়ে গিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, “তুমি ওকে লেন্স পরাতে গিয়েছিলে কেন সেটা আগে ব্যাখ্যা করো।”

“ইচ্ছা হয়েছে তাই পরিয়েছি। এখানে আবার ঘটা করে ব্যাখ্যা করার মতো কী আছে?”

ধারা বলল, “ইচ্ছা হয়েছে? তোর ইচ্ছা হয়েছে বলেই তুই মেয়েটার চোখে লেন্স পরিয়ে দিয়ে ওর সুন্দর চুলগুলো কালো করে দিবি?”

“হ্যাঁ, দেবো। আমার যা ইচ্ছা হবে আমি তাই করবো।”

আলতা ঝাপসা চোখের ভারী পাতা মেলে একবার তাকাল রঞ্জকের দিকে। ধারা আলতার পিঠে হাত রেখে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, “তুমি চিন্তা কোরো না আলতা। আমি তোমাকে পার্লারে নিয়ে গিয়ে আগের শেডে তোমার হেয়ার ডাই করিয়ে আনবো।”

কথাটা রঞ্জকের কানে পৌঁছাতেই সে ধারালো স্বরে বলল, “তেমন কিছু করলে আমি ওর চুলগুলো গোড়া থেকে কেটে ফেলতে বাধ্য হবো।”

কথার রেশ বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার পূর্বেই আরিজ মাহতাবিরের হাত সপাটে রঞ্জকের গালে আছড়ে পড়ল। বাম গালটা ঝিমঝিম করে উঠল রঞ্জকের। মাথার ভেতরের রগগুলো যেন দপ করে উঠল এক নিমেষে। 

আলতা চোখ বুজে মাথাটা আরও নিচু করে নিলো। ​গালে হাত রেখে দু-এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল রঞ্জক। অতঃপর চিবুক উঁচিয়ে দ্বিগুণ ক্ষুব্ধ গলায় বলল, “তুমি আমার গায়ে হাত তুলে একদম ঠিক করলে না, এখন তো আমি ড্যাফিনেটলি সেটাই করবো।”

আরিজ মাহতাবির দাঁতে দাঁত পিষে বললেন, “কেনো করবে? ওর চুল লাল হোক কিংবা অন্য কোনো রঙের তাতে তোমার কী সমস্যা?”

রঞ্জক বিচলিত না হয়ে শীতল গলায় বলল, “অবশ্যই সমস্যা আছে। ওর চুল কিংবা চোখ কোনোটাই ভালো লাগে না আমার।”

ফারিশ বলে উঠল, “এখন খুব ভালো লাগছে? তাকিয়ে দেখো কী হাল করেছো মেয়েটার। এখন নিশ্চয়ই খুব ভালো লাগছে? এখন কি তুমি ওকে স্ত্রী হিসেবে মেনে নেবে?”

রঞ্জকের চোখজোড়া জ্বলে উঠল। ফারিশ তার অভিব্যক্তি দেখে ঠোঁট প্রসারিত করল, “নেবে না নিশ্চয়ই? যদি তুমি এরপরও ওকে মেনেই নিতে না পারো তাহলে শুধু শুধু এসব করে কী লাভ হলো?”

রঞ্জক কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে মুখ খুললো, “আমি তোকে লাভ লসের হিসাব দিতে ইন্টারেস্টেড নই ফারিশ। শুধু এটুকু জেনে রাখ, ডিভোর্স না হওয়া পর্যন্ত আমি ওর বিষয়ে কাউকে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই।”

“তুমি যদি ওকে ডিভোর্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েই থাকো তাহলে দেরি করছো কেন?”

আরিজ মাহতাবিরের দিকে ইশারা করে রঞ্জক বলল, “সেটা তুই ওনাকে জিজ্ঞেস কর। কেন উনি ডিভোর্সটা হতে দিচ্ছেন না।”

কথাটা ছুড়ে দিয়েই রঞ্জক হনহনিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। আরিজ মাহতাবির নিজের হতাশা চেপে ক্লান্ত গলায় বললেন, “ধারা, বউমাকে নিয়ে ঘরে যাও।”

পরিবারের সবাই একে একে যার যার ঘরের দিকে চলে গেল। আরিজ মাহতাবির আর ফারিশ একত্রে লিফটে উঠে ছিল। চতুর্থ তলায় এসে ফারিশ নেমে যাবে এমন সময় আরিজ তাকে থামালেন। আশেপাশে নজর বুলিয়ে ধিমে গলায় বললেন, “দেখো ফারিশ, তুমি এমন কিছু কোরো না যাতে রঞ্জক রাগের মাথায় আলতার ধ`র্ষিতা হওয়ার কথাটা সবার সামনে বলে ফেলে।”

ফারিশ দুচোখ শক্ত করে বন্ধ করে নিজেকে ধাতস্থ করার চেষ্টা করল। তারপর চাচার দিকে রক্তিম চোখে তাকিয়ে চাপা কণ্ঠে বলল, “তোমার ছেলের ট্যানট্রাম আর নেওয়া যাচ্ছে না চাচ্চু। প্রথমত আলতাকে মেনে নেয়নি, দ্বিতীয়ত গার্লফ্রেন্ডের সাথেও সম্পর্ক রেখেছে, লাস্ট বাট নট লিস্ট মেয়েটাকে শান্তিতে থাকতে পর্যন্ত দিচ্ছে না।”

“আমি বুঝতে পারছি ফারিশ, কিন্তু—”

“তুমি শুধু নিজের ছেলের দিকটাই বুঝতে পারছো চাচ্চু। আলতার দিকটা বোঝার চেষ্টাও করছো না।”

“তুমি এটা বলতে পারলে? আমি আলতার দিকটা বুঝিনি?”

“যদি বুঝতেই তাহলে নিজের গোয়ার ছেলেটার সাথে আলতার বিয়ে না দিয়ে বড় ভাইয়াকে বেছে নিতে।”

আরিজের মুখের গড়ন শক্ত হলো, “গুঞ্জনের সাথে তাঁরার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে, ফারিশ। সেটা ভুলে যেয়ো না।”

“সেজো ভাইয়াও তো ছিল, মেজো ভাইয়াকেই কেন? তুমি আমি আমরা সবাই জানি মেজো ভাইয়া কতোটা অপ্রতিরোধ্য ও হিংস্র। কাউকেই গ্রাহ্য করে না। এখন কেবল সামনে নির্বাচন, তাই মুখ বুজে আছে। শুধু একবার এমপি হয়ে যাক তখন দেখো কোনো ভাবেই তুমি তার মুখ বন্ধ রাখতে পারবে না।”

“তোমার কি মনে হয় আলতা ধ`র্ষিতা এটা জানার পরেও ইভান মেনে নিতো ওকে? ও রঞ্জকের চেয়েও বেশি উগ্রতা দেখাতো। রঞ্জকের মুখ তাও বন্ধ রাখার উপায় ছিল, ইভানের মুখ বন্ধ রাখতাম কীভাবে?”

ফারিশ দীর্ঘশ্বাস ফেললো, “যা হওয়ার হয়ে গেছে, তুমি আর বাধা হয়ে দাঁড়িও না। মেজো ভাইয়া যদি আলতাকে ডিভোর্স দিতে চায় তাহলে দিয়ে দিক। আমি আলতাকে বিদেশ পাঠিয়ে দেবো।”

“তুমি দেবে? ফারিশ, ডিভোর্স হয়ে গেলে আলতার ওপর আমাদের কারো কোনো অধিকার থাকবে না। তখন ওর মা এসে ঝামেলা পাঁকাবে। সেই অধিকার চেয়ে বসবে যা আমরা দিতে পারবো না। নিজের মায়ের কথাটা একবার ভেবে দেখো, সত্যিটা জানতে পারলে তাকেই বা আমরা কীভাবে সামলাবো?”

ফারিশ স্তব্ধ হয়ে গেল। কপাল বেয়ে ঘাম ঝরতে শুরু করল তার। হাঁসফাঁস করতে করতে রুদ্ধশ্বাসে বলল, “আমরা এখন কী করবো চাচ্চু? কীভাবে সবদিক সামাল দেবো? সবকিছুই যে পরস্পরের সাথে সাংঘর্ষিক।”

আরিজ মাহতাবির গম্ভীর মুখে বললেন, “আমাদের সামনে এই মুহূর্তে মাত্র তিনটা পথ খোলা আছে। প্রথমটা হলো, রঞ্জক আলতাকে মেনে নিলেই সব ধামাচাপা পড়ে যাবে।”

“এই আশা তো বাদই দাও। সেকেন্ড অপশন বলো।”

“সেকেন্ড অপশন হলো এমন কাউকে খুঁজে বের করা যে আলতার অতীত জেনেও স্বেচ্ছায় ওকে বিয়ে করতে রাজি হবে।”

ফারিশ দু’হাতে নিজের মাথা চেপে ধরল। ভেতরের অস্থিরতা ঢাকতে গিয়ে তার গলাটা বুজে এল, “মিসেস ইছাপূর্ণা কী তাতে খুশি হবেন? উনি তো বলেছেন আলতাকে আমাদের পরিবারের সদস্য হিসেবেই টিকিয়ে রাখতে হবে।”

“আমরা ওনাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে বলতে পারি, উনি যদি আলতাকে সুখে শান্তিতে সংসার করতে দেখেন তাহলে আমার মনে হয় না উনি আপত্তি করবেন।”

“তুমি থার্ড অপশনটা বলো তো। সেকেন্ড অপশনটা মোটেও গ্যারান্টি দিচ্ছে না।”

আরিজ মাহতাবির নিস্তেজ হয়ে গেলেন, “সেই অপশন থেকেও না থাকার মতো কেননা আমরা কোনোদিনও সেই অপশন বেছে নিতে পারব না।”

আরিজের কণ্ঠস্বর নিচু হয়ে এলো, “আমরা নিজেদের স্বার্থে কাউকে মে`রে তো আর ফেলতে পারবো না ফারিশ।”

কথাটা শুনেও না শোনার ভান করল ফারিশ। কারণ সেও এই কথার সাথে একমত। ইছাপূর্ণার মুখ বন্ধ রাখতে তাকে মে`রে ফেলা তো আর সম্ভব নয়।

নিজের ঘরের খাটের ওপর বসে আছে আলতা। ধারা চিন্তিত মুখে আলতার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, “আচ্ছা, আরএম যখন তোমার চুলে হেয়ার ডাই করে দিচ্ছিল তখন কি তুমি বুঝতেও পারোনি?”

আলতা মাথা নেড়ে বলল, “আমি একদমই বুঝতে পারিনি আপু। উনি বলেছিলেন ওই টোটকাতে চুলের গোড়া শক্ত হবে। এও বলেছিলেন, আমি ওটা লাগাতে দিলে উনি জুবাকেও ফিরিয়ে দেবেন। তাছাড়া টোটকাটা তো সাদাটে ছিল, আমি স্বপ্নেও ভাবিনি ওটা লাগানোর পর আমার চুলগুলো এমন কালো হয়ে যাবে।”

ধারা কিছু বলতে যাবে তার আগেই দরজার কপাট ভেদ করে তার স্বামীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, “বারিধারা তোমার কি এখনো ঘরে ফেরার সময় হয়নি? আর কতক্ষণ আমাকে জাগিয়ে রাখার পরিকল্পনা আছে?”

কৌশিকের কণ্ঠ শুনে আলতা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। বলতে গেলে সে এর আগে লোকটার কণ্ঠ শোনেইনি। লোকটা খুব কম কথা বলে।

“তুমি যাও আপু। ভোর হতে চলল, আমাকে নিয়ে এমনিতেই অনেক ছোটাছুটি করতে হয়েছে। এখন গিয়ে বিশ্রাম নাও।”

ধারা ঘড়িতে নজর বুলিয়ে আলতার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় আলতো করে চাপল। তারপর খাটের বাইরে পা নামিয়ে রেখে বলল, “তুমিও ঘুমিয়ে পড়ো। ঘুম ভাঙতেই দেখবে চোখের সকল সমস্যা দূর হয়ে গেছে। বুঝলে?”

আলতা মাথা নাড়তেই ধারা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। 

উইকেন্ডের শেষ দিনটা নিজের ঘরে শুয়ে বসেই কাটলো আলতার। ঘুম থেকে উঠে একটা লম্বা শাওয়ার নিয়েছে সে। চুলে শ্যাম্পু করেছে সময় নিয়ে; কিন্তু লাভের লাভ কিচ্ছুটি হয়নি। উল্টো চুলগুলো যেন কুচকুচে কালো হয়েছে আরও। লাঞ্চটা সে ঘরে বসেই সেরেছে। রাত হতে হতে চোখের ফোলা ভাব কমে যাওয়ায় ডিনার করতে সবার সাথে টেবিলেই বসেছিল। রঞ্জক যদিও উপস্থিত ছিল না। সে কোথায় আছে, তা নিয়ে কারো মাঝে কৌতূহলও দেখা গেল না।

পরের দুটো দিন আলতা কলেজ থেকে বিরতি নিয়ে বাড়িতেই থেকেছে। এমনটা নয় যে সে যেতে চায়নি; ফারিশই তাকে রেস্ট নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। যদিও তার জ্ঞানার্জনের ধারা থেমে নেই। উইকেন্ডসহ প্রতিটা দিন ফারিশ তাকে নিয়ম করে পড়িয়েছে।

আজ পুরোপুরি সুস্থ হয়ে কলেজের পোশাকে নিজেকে প্রস্তুত করেছে আলতা। কিছুক্ষণ আগেই ফারিশ আর তাঁরার সাথে এসে পৌঁছেছে ক্যাম্পাসে। ফারিশ আজও তাকে ক্লাসে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে আগে আগে হাঁটছে, তার ঠিক পিছু পিছু কিছুটা আড়ষ্ট হয়ে হাঁটছে আলতা। কোমর সমান কালো চুলের সাথে এখনো নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেনি ষোড়শী। চুলগুলো আজ খোলাও রাখেনি সে, দুপাশে বেণি করে বেঁধে এসেছে।

হঠাৎ নিজের হাঁটার গতি কমিয়ে আলতার পাশাপাশি এসে দাঁড়াল ফারিশ। গলায় স্নেহের সুর মিশিয়ে বলল, “কলেজের কেউ যদি তোমাকে কিছু বলে সরাসরি আমাকে জানাবে। যদিও আমার মনে হয় না তুমি আমার কাজিন এটা জানার পরেও তোমাকে বিরক্ত করার দুঃসাহস কেউ দেখাবে।”

আলতা স্কুলব্যাগের বেল্টটা শক্ত করে খামচে ধরে মিনমিন করে বলল, “ঠিক আছে, ভাইয়া।”

​ফারিশ মৃদু হেসে আলতার দিকে তাকিয়ে আশ্বস্ত করল, “আরে তুমি এতো ঘাবড়াচ্ছো কেন? তোমার অসুস্থতার প্রেসক্রিপশন আমি প্রিন্সিপালের কাছে সাবমিট করে দিয়েছি, তুমি এই কদিন কেন অনুপস্থিত ছিলে তা কোনো টিচারই জানতে চাইবে না।”

আলতা কথাটা শুনেও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। ফারিশ একটা ছোট্ট শ্বাস ফেলে বলল, “তোমাকে কালো চুলে অতোটাও খারাপ দেখাচ্ছে না। এটা নিয়ে এতো ইনসিকিউরড ফিল কোরো না।”

আলতা ইংরেজি শব্দটার অর্থ না বুঝলেও ঠোঁট চেপে মাথাটা হালকা কাঁত করলো। ফারিশ তাকে ক্লাসের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে নিজের ক্লাসের দিকে চলে গেল। 

ব্যাগটা কাঁধে আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরে পুরো ক্লাসরুমে একবার চোখ বোলালো আলতা। ধীরপায়ে এগোতে লাগল পেছনের সারির দিকে। একদম পেছনের বেঞ্চে এসে পৌঁছাতেই চোখে পড়ল সেদিনের সেই মেয়েটি; নির্লিপ্ত চোখে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। 

আলতার বুকের ভেতর অস্বস্তি দোলা দিল। চোখ সরিয়ে দুটো বেঞ্চ সামনে একটা ফাঁকা জায়গা দেখে সেখানে গিয়ে বসল সে। কিন্তু সে বসার মুহূর্তকালের মধ্যেই বেঞ্চের অপরপ্রান্তে বসা মেয়েটি চট করে উঠে দাঁড়াল; তারপর কেমন যেন সন্তর্পণ ভঙ্গিতে ব্যাগ গুটিয়ে অন্য একটা ফাঁকা সিটে গিয়ে বসল।

আলতা হতভম্ব হয়ে গেল এমন আচরণে। দ্রুত ব্যাগ থেকে ছোট আয়নাটা বের করে নিজের মুখটা দেখে নিল একবার। না, মেকআপ ঠিকঠাকই আছে। রঞ্জকের দেওয়া এই মেকআপ গুলো অনেক বেশি লং লাস্টিং। রিমুভেবল ছাড়া চব্বিশ ঘণ্টার আগে তোলাই সম্ভব না। অদ্ভুত! দাগ গুলো তো দেখা যাচ্ছে না তারপরও কেন মেয়েটা এমন আচরণ করলো? চুলের জন্য এমন করলো না তো? কিন্তু কালো চুল হওয়াটাও তো অস্বাভাবিক নয়। 

এক মিনিট তারা আলতার অতীত সম্পর্কে জেনে যায়নি তো? ভাবতে ভাবতেই আলতার প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত ঠিক তখনই পাশে এসে বসলো কেউ। আলতা পাশ ফিরে দেখল সেদিনের সেই মেয়েটা নিজের ব্যাগপত্র সমেত তার পাশে এসে বসেছে।

মেয়েটা তার দিকে না তাকিয়েই গজগজ করে উঠল, “ওয়াট দ্য একচুয়াল ফা*ক? ওরা তোমার সাথেও সেম বিহেভ করছে কেন?”

আলতা তাজ্জব হয়ে চেয়ে রইল। মেয়েটি তার দিকে ঘুরে বেঞ্চে কনুই ঠেকিয়ে কপালে হাত রেখে বলল, “যাক গে, বাদ দাও ওদের কথা! এটা বলো, সেদিন আমাকে মিথ্যা বললে কেন?”

“মিথ্যা? ক-কী মিথ্যা বলেছি?”

​“ওই যে—ওটা নাকি তোমার ন্যাচারাল হেয়ার কালার ছিল!”

“আপনি কি চুলে রঙ করার কথা বলছেন?”

“অফকোর্স, ওয়েট তুমি কি আমার কথা বুঝতে পারছো না?”

প্রশ্নটা পাশ কাটিয়ে গিয়ে আলতা নিচু স্বরে বলল, “আমার চুলের আগের রঙটাই আসল রঙ ছিল।”

মেয়েটা সন্দিহান গলায় বলল, “তুমি বলতে চাইছো তোমার লাল চুল তুমি কালো করে ফেলেছো?”

আলতা উপরনিচ মাথা নাড়তেই মেয়েটার ঠোঁটের কোণে অবিশ্বাসের হাসি ফুটে উঠল, “আরে কী বলছো তুমি? সবাই যেখানে নিজেদের কালো চুল লাল করে সেখানে তুমি নিজের লাল চুল কালো করিয়েছো?”

আলতার স্ফীত ঠোঁট দুটো আর নড়ল না। আর কিছু বোঝানোর চেষ্টা করল না সে। মেয়েটা যা খুশি ভাবুক, তাতে তার কী-ই বা যায় আসে?

মিনিট খানেক পর ক্লাসে টিচার প্রবেশ করলেন। কিছুক্ষণ ক্লাস নেওয়ার পর তিনি একটা প্রশ্ন করলেন, “হোয়াট হ্যাপেন্‌স টু ডিমান্ড হোয়েন দ্য প্রাইস অভ আ প্রোডাক্ট ইনক্রিসেস? এনিওয়ান হু নোজ দ্য আনসার, রেইজ ইয়োর হ্যান্ড।”

স্যারের মুখের ইংরেজি বাক্যের এক বর্ণও আলতার মগজে ঢুকল না। তবে সে খেয়াল করল, ক্লাসের প্রায় অনেকেই বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে হাত তুলছে। আলতা একবার পাশের মেয়েটির দিকে তাকিয়ে দেখল মেয়েটিও তাকেই দেখছে। হয়তো আলতাকে চঞ্চল চোখে এদিক ওদিক তাকাতে দেখে অবাক হচ্ছিল সে। 

নিজের অজ্ঞতা ও বোকা বোকা অস্বস্তিটা ঢাকতে আলতাও অন্যদের দেখাদেখি হাত তুলে ফেলল। তবে তার হাত তোলার ভঙ্গিটা ছিল অদ্ভুত—যেন ক্লাসে কে কার চেয়ে উঁচুতে হাত তুলতে পারে, সেই প্রতিযোগিতায় নেমেছে সে! ফলে স্যারের নজর আটকে গেল আলতার সেই উঁচিয়ে ধরা হাতের ওপর।

​স্যার হাতের কলম দিয়ে আলতার দিকে ইশারা করে স্বাভাবিক গলায় বললেন, “ইউ, দ্য গার্ল ইন দ্য থার্ড রো ফ্রম দ্য ব্যাক। স্ট্যান্ড আপ অ্যান্ড আন্সার দ্য কোয়েশ্চন।”

আলতা বুঝতে পারল স্যার কথাটা তাকেই বলেছে কিন্তু ঠিক কী বলেছে তা সে কদাচিৎ বুঝতে পারেনি। তাকে দ্বিধান্বিতভাবে নড়েচড়ে বসতে দেখে পাশে বসে থাকা মেয়েটা হতবিহ্বল হয়ে গেল। হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফিসফিস করে বলল, “এই দাঁড়াচ্ছো না কেন? উঠে দাঁড়িয়ে উত্তর দাও।”

আলতা ভড়কে গেল। গলার স্বর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে বলল, “উ-উত্তর দেব? কিসের উত্তর?!”

মেয়েটার চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল, “মানে কী? উত্তরটা তোমার জানা না থাকলে হাত তুলেছো কেন?”

আলতা ঝটপট অপরাধীর মতো নিজের উঁচিয়ে রাখা হাতটা একদম নিচে নামিয়ে নিল। ওদিকে স্যার পেছনের বেঞ্চের দিকেই এগিয়ে আসছেন। আর কোনো উপায় না দেখে পরিস্থিতি সামাল দিতে আলতার হয়ে মেয়েটাই হুট করে উঠে দাঁড়াল। তারপর এক নিমেষে ফটাফট বলে গেল, “জেনারেলি, দ্য কোয়ান্টিটি ডিমান্ডেড ডিক্রিজেস হোয়েন দ্য প্রাইস অব আ প্রোডাক্ট ইনক্রিজেস, অ্যাসিউমিং আদার ফ্যাক্টর্স রিমেইন কনস্ট্যান্ট।”

অনেক পেছনের বেঞ্চ হওয়ায় দূর থেকে স্যার ঠিক বুঝতে পারেননি আসলে হাতটা কে তুলেছিল। তবে মেয়েটাকে দাঁড়িয়ে উত্তর দিতে দেখে স্যারের মুখটা কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেল। ক্লাসের এই মেয়েটির কাছ থেকে এমন নিখুঁত উত্তর আশা করেননি বোধহয়, তবু ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও বললেন, “কারেক্ট! ইউ মে সিট ডাউন।”

বেঞ্চে বসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল মেয়েটা। আলতা কোমল দৃষ্টে তাকিয়ে ছিল তার দিকে। তা দেখে মেয়েটি নিজের কপালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করে উঠল, “মাইরি! তুমি ঠিক কী জিনিস বলো তো?”

আলতা মুখ নিচু করে ফিসফিস করল, “দুঃখিত আপু। আমি আসলে বুঝতে পারিনি স্যার প্রশ্ন করেছেন আর হাত তুললে সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। আমি তো ভেবেছিলাম কে কতো বেশি উঁচুতে হাত তুলতে পারে স্যার হয়তো সেটাই দেখতে চাইছেন।” 

আলতার এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন কথা শুনে মেয়েটি এবার রাগী চোখে তাকাল, “হোয়াট ননসেন্স! তুমি কি অন্য কোনো গ্রহ থেকে এসেছ নাকি? এর আগে কোনোদিন ক্লাস করোনি? এই ধরনের জেসচারের সঙ্গে তো ক্লাস ওয়ানের বাচ্চাও পরিচিত।”

আলতা গুটিয়ে গেল। আর কিচ্ছু বলল না। মেয়েটা বিরক্ত হয়ে ক্লাসে মন দিলো। কিছুক্ষণ পর আলতা বলল, “আচ্ছা আপু, আপনি তো প্রশ্নটার উত্তর জানতেন… তারপরও তখন উত্তর দেওয়ার জন্য হাত তোলেননি কেন?”

মেয়েটা আঁড়চোখে তাকিয়ে বলল, “কারণ আমি ইন্ট্রোভার্ট। ক্লাসভর্তি এতোগুলো মানুষের সামনে উঠে দাঁড়িয়ে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো গাটস্ নেই।”

আলতা কথাটার মানে পুরোপুরি না বুঝলেও হাসার চেষ্টা করে বলল, “আপনাকে ধন্যবাদ আপু। আপনি না থাকলে আমাকে সবার সামনে লজ্জায় পড়তে হতো।”

মেয়েটাও প্রত্যুত্তরে একটুকরো হেসে বলল, “সে না হয় বুঝলাম কিন্তু বারবার আপু বলে কাকে ডাকছো? ক্লাসম্যাটদের আপু কিংবা আপনি করে সম্বোধন করা কিন্তু রূঢ় শোনায়।”

“তাহলে কী বলে ডাকবো?”

​“সরাসরি বলো না যে তুমি আমার নাম জানতে চাইছ!”

আলতা সরল ভঙ্গিতে মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, “বুঝতেই যখন পেরেছেন তখন এবার নামটা বলেই ফেলুন।”

মেয়েটি ডেস্কের ব্যাগের ওপর মাথাটা কাত করে এলিয়ে দিল, “আমার নাম শায়েরী।”

“নামটা খুব সুন্দর।”

শায়েরী চোখ দুটো একটু ছোট করে বলল, “কিন্তু তোমার নামটা আমার একদমই ভালো লাগেনি, আলতা।”

গাল দুটো অজান্তেই ফুলে গেল আলতার। তা দেখে শায়েরী মিষ্টি হেসে আলতার বাহুতে আলতো চাপড় মেরে বলল, “আরে, মন খারাপ করলে নাকি? সিরিয়াসলি নিও না, আমি তো মজা করেছি।”

আলতার মুখের টানটান ভাব মিলিয়ে গেল মুহূর্তেই।

চলবে…

#কালারব্লাইন্ড — ১৭.খ

#সোফিয়া_সাফা

মাথার ওপর মধ্যাহ্নের সূর্য তখন রুক্ষ তাপ ছড়াচ্ছে। লাঞ্চ ব্রেকে ক্লাসেরুমের সবাই যে যার মতো খাবার খেতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেছে। আলতাকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে শায়েরী একটু ঝুঁকে জিজ্ঞেস করল, “কী হলো? লাঞ্চ করতে যাবে না?”

আলতা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে নিজের কানের নিচে আঙুল বোলাতে বোলাতে ভাবল কী উত্তর দেবে। ​শায়েরী আবার তাগাদা দিল, “খিদে লাগেনি?”

আলতা এবার বুঝতে পারল শায়েরী খেতে যাওয়ার কথা বলছে। নাকের নিচে জমতে থাকা সূক্ষ্ম ঘামের বিন্দুগুলো হাতের উল্টো পিঠে মুছে নিয়ে দ্বিধান্বিত হাসি ফুটিয়ে বলল, “আসলে আমি তো নতুন তাই এখানের কিছুই চিনি না।”

“চেনো না তাতে কী হয়েছে? আমি আছি না? চলো, আমি তোমাকে ক্যাফেটেরিয়ায় নিয়ে যাচ্ছি।”

আলতা কিছু বলার আগেই শায়েরী তার হাত ধরে একপ্রকার টেনেই দাঁড় করিয়ে দিল, তারপর দুজন মিলে রওনা হলো ক্যাফেটেরিয়ার দিকে।

ক্যাফেটেরিয়ার সামনে পৌঁছাতেই যেন হইচইয়ের রাজত্বে ঢুকে পড়ল তারা। চারদিকে থালা-বাসন আর চামচের টুংটাং শব্দ, তরুণ-তরুণীদের আড্ডা আর গমগমে কোলাহলপূর্ণ। দুপুরের এই সময়টায় ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হয় ক্যাফেটেরিয়ার কর্মীদের। তবে এত ব্যস্ততার মধ্যেও চারপাশটা বেশ পরিপাটি। সারি সারি সাজানো টেবিল-চেয়ার। ট্রে ভর্তি খাবার নিয়ে আলতা আর শায়েরী ফাঁকা একটি কোণার টেবিলে গিয়ে বসল।

খেতে খেতেই শায়েরী প্রশ্ন করল, “এই দুদিন আসোনি কেন শুনি?”

শায়েরীর দেখাদেখি আলতাও মৃদু কামড় বসালো স্যান্ডউইচের কোণে। ধীরে ধীরে চিবোতে চিবোতে চোখ নিচু করে বলল, “একটু অসুস্থ ছিলাম।”

​“ওমা, তাই নাকি! কী হয়েছিল?”

“তেমন কিছু না। চোখে ব্যথা ছিল।”

“এখন ঠিক আছো তো?”

আলতা ঠোঁটের কোণে ইতস্তত হাসি ফুটিয়ে বলল, “ঠিক না থাকলে আজও কলেজে আসা হতো না।”

শায়েরী মৃদু হাসল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “তোমার সাথে কম্ফোর্টেবল ফিল করছি। তাই এবার তোমার বাড়ির লোকেদের সম্পর্কে জানার কিউরিয়াসিটি জাগছে। কিন্তু তুমি তো আমার সম্পর্কে কিছুই জানতে চাইছো না এমতাবস্থায় আলাপের খাতাটা কীভাবে খোলা যায় বলো?”

আলতা অস্বস্তি বোধ করলেও বুঝতে দিল না। স্বাভাবিক হওয়ার প্রয়াসে সামনে রাখা ফ্লেভারড মিল্কের কাপে চুমুক দিল সে। এক নিঃশ্বাসে প্রায় অর্ধেকটা মিল্ক গলাধঃকরণ করে যখন কাপটা নামিয়ে রাখল, শায়েরী হঠাৎ ফিক করে হেসে ফেলল। তার হাসির শব্দে আলতার বুকটা ধক করে উঠল; সে কি কোনো ভুল করে ফেলেছে? তার বিহ্বল চাউনি দেখে শায়েরী নিজের হাসি চেপে একটা টিস্যু নিয়ে তার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা মিল্কটুকু মুছে দিতে দিতে বলল, 

“আমি এভাবে হাসতে চাইনি আলতা। তুমি আমাকে ভুল বুঝো না।”

আলতার চেহারায় একরাশ লজ্জা ও অস্বস্তি ফুটে উঠল। সে মাথা নিচু করে ভাঙা গলায় বলল, “না না, সমস্যা নেই… আমি কিছু মনে করিনি।”

শায়েরী মুখ খুলে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই পেছন থেকে এক অনাকাঙ্ক্ষিত নারীকণ্ঠ ভেসে এল, “তোমার নাম কি আলতা?” 

মেয়েটিকে দেখে বিস্মিত হলো আলতা। দরদর করে কাঁপতে থাকা চোখে ডানে-বাঁয়ে মাথা নেড়ে অস্বীকার করতে চাইল। কিন্তু তার আগেই শায়েরী পেছনে ঘুরে বলে দিল, “হ্যাঁ, ওর নাম আলতা। সো হোয়াট?”

মেয়েটি শায়েরীর দিকে তাকাল না। সরাসরি এগিয়ে এসে আলতার বাঁ বাহু চেপে ধরে তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। মুহূর্তে আলতার বুকের ভেতর প্রচণ্ড তাণ্ডব শুরু হলো, ঝড়ের মাতমে যেন ভেতরের সব ভেঙেচুরে যাচ্ছে। 

মেয়েটা ঈষৎ হেসে বলল, “আমাকে চিনতে পারছ না? আমি ঋতু! সুমনার ফুপাতো বোনের চাচাতো বোন।”

আলতা এবার জোরে জোরে না সূচক মাথা নাড়ল। ঋতু আশাহত হলো তার আচরণে, “কী অবাক কাণ্ড, তুমি আমাকে চিনতে পারছ না? মাত্র ছয় মাস আগে শীতের ছুটিতে আমার কাজিনের সাথে সুমনাদের বাড়ি বেড়াতে গেলাম না? তোমার সাথে কত খাতির হলো, কত জায়গায় ঘুরে বেড়ালাম একসঙ্গে!”

আলতার বুকের ভেতরটা অসহ্য যন্ত্রণায় ভার হয়ে এল, চোখের কোণ ঘেঁষে জলের ধারা নেমে আসতে চাইল। কেন সে একের পর এক চেনাজানা মানুষের সম্মুখীন হচ্ছে এখানে এসে? পৃথিবীটা কি এই কলেজে এসে সংকীর্ণ হয়ে গেছে নাকি? আলতার চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এল। এখন কী হবে? মেয়েটা নিশ্চয়ই তার সাথে ঘটে যাওয়া সেই ভয়াবহ ঘটনা সম্পর্কে অবহিত? যদি মেয়েটা সবাইকে জানিয়ে দেয়? তখন কী হবে? নিজের কলঙ্কিত মুখটা তখন কোথায় লুকাবে আলতা?

অসহ্য এক আতঙ্কে আলতার শরীর রি রি করে উঠল। সে কোনোক্রমে ঋতুর থেকে নিজের হাতটা অলগোছে ছাড়িয়ে নিয়ে বিপরীত দিকে মুখ ঘুরিয়ে কাঁপতে থাকা শুকনো গলায় বলল, “আপনার… আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে। আমি আপনাকে চিনি না।

আলতার পাশে থাকা চেয়ারটায় বসে পড়ল ঋতু। ডান হাতে থাকা খাবারের ট্রে’টা নামিয়ে রাখল টেবিলের ওপর। মুখটা কালো করে বলল, “তুমি নিশ্চয়ই আমার ওপর অভিমান করে আছো? করারই কথা, ফিরে আসার সময় আমি তোমাকে বলে আসিনি। আসলে হয়েছিল কী, সুমনাদের পরিবারের সাথে আমার কাকিমার একটা বিরাট ক্যাঁচাল লেগে গিয়েছিল। পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে হুট করেই আমাদের চলে আসতে হয়। সেই ঝামেলা এখনো মেটেনি… ওদের সাথে আর যোগাযোগও নেই। তাই ডেলভিয়াতে আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি।”

কথাগুলো শুনে আলতা ধীরে ধীরে ঋতুর দিকে মুখ ফেরাল। ঋতু মলিন হেসে বলল, “আর অভিমান করে থেকো না। বুঝিয়ে বলার পরও যদি না বোঝো তাহলে কিন্তু আমার খুব খারাপ লাগবে।”

আলতা শুকনো ঢোক গিলে সোজা হয়ে বসলো। ঋতুর কথা অনুযায়ী সুমনাদের সাথে যেহেতু যোগাযোগ নেই সেহেতু আলতার জীবনে ঘটে যাওয়া সেই কালরাতের ভয়াবহ সত্যটা ঋতুর জানার অবকাশও নেই বললেই চলে।

আলতার গায়ের ওপর থেকে যেন এক অদৃশ্য পাথর নেমে গেল। সে সোজা হয়ে বসে নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টায় জিজ্ঞেস করল, “তুমিও কি এই কলেজে পড়ো?”

উচ্ছ্বসিত হয়ে ওপর-নিচে মাথা নেড়ে ঋতু বলল, “এই তো! চিনতে পেরেছ তাহলে?”

“হ্যাঁ… আসলে অনেকদিন আগের কথা তো, হঠাৎ দেখে চিনতে একটু অসুবিধে হচ্ছিল।”

​ঋতু দুই গাল ফুলিয়ে মেকি রাগ দেখিয়ে বলল, “তুমি সত্যিই আমাকে ভুলে গিয়েছিলে? আর আমি কী না ভাবলাম অভিমান করেছো। তাই না চেনার ভান ধরছো।”

বলেই ঋতু উঠে দাঁড়াল, “যদি বুঝতে পারতাম তুমি সত্যিই আমাকে ভুলে গেছো। তাহলে আর মনে করানোর চেষ্টা করতাম না। শুধু শুধু বিরক্ত করলাম তোমাকে।”

ঋতু খাবারের ট্রেটা তুলে নিয়ে পা বাড়াতেই আলতা হাত বাড়িয়ে তার স্কার্টের কাপড়ের প্রান্তটা আলতো করে চেপে ধরে রিনরিনে গলায় বলল, “দয়া করে আমার ব্যবহারে কষ্ট পেও না ঋতু আপু। আমি… আমি আমার আচরণের জন্য খুবই লজ্জিত।”

ঋতু প্রতিক্রিয়া দেখানোর পূর্বেই পেছন থেকে এক চড়াগলার হাঁক ভেসে এল, “এই তিতুর বাচ্চা! তুই এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কার সাথে এত বকরবকর করছিস? আমি যে ওদিকে তোকে খুঁজে মরছি সেদিকে খেয়াল আছে?”

ঋতু পেছনে ফিরে মেয়েটির দিকে হাত নাড়ল, “এদিকে আয়, জায়গা খালি আছে। এখানে বসে খাবো।”

মেয়েটি অনুসন্ধানী চোখে এগিয়ে এল। ঋতু তাকে শায়েরীর পাশের খালি চেয়ারটায় বসার ইশারা করতে গিয়ে মাঝপথে থমকে গেল। 

শায়েরী তখন শান্ত ভঙ্গিতে ফোনে আঙুল চালাতে চালাতে এনার্জি ড্রিংকসের স্ট্র-তে চুমুক দিচ্ছিল। তার ভাবলেশহীন চেহারা চোখে পড়তেই ঋতুর মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।

“তুমি এখানে বসেছো?” ঋতুর গলায় স্পষ্ট অস্বস্তি। 

শায়েরী মুখ তুলে তাকিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল, “কেন, তুমি কি দেখতে পাচ্ছো না?”

ঋতু মুখ কুঁচকে আলতার দিকে তাকিয়ে বলল, “আলতা, চলো অন্য টেবিলে গিয়ে বসি।”

“এখানেই বোসো না। জায়গা তো খালিই আছে।”

আলতার কানের কাছে সামান্য ঝুকে পড়ল ঋতু। ফিসফিসিয়ে বলল, “আরে তুমি চেনো ও কে?”

আলতা স্বাভাবিক কণ্ঠেই বলল, “হ্যাঁ, চিনি তো। ওর নাম শায়েরী, আমরা দুজনেই প্রথম বর্ষের ছাত্রী।”

কথাটা শুনে শায়েরী একবার আঁড়চোখে তাকাতেই ঋতু সোজা হয়ে দাঁড়াল। শায়েরী আবার ফোনে মনোযোগী হতেই আবার আলতার কানের কাছে ঝুঁকে গিয়ে বলল, “ওর পরিচয় জানো?”

কথাটা কান দিয়ে শুনে চোখ দিয়ে শায়েরীর দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল আলতা। ডানে বায়ে মাথা নেড়ে বোঝালো সে পরিচয় জানে না। ঋতু এবার বলল, “সেই জন্যই বুঝতে পারছো না। ওর পাশে বসে নিজেদের বিপদ ডেকে আনার মানেই হয় না। আমাদের সঙ্গে চলো, অন্য কোথাও গিয়ে বসি।”

আলতা কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়ল। এই সুযোগে ঋতু তাকে টেনে উঠিয়ে অন্য টেবিলে নিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু তার আগেই শায়েরী উঠে এসে পেছন থেকে আলতার অন্য হাতের কবজি আঁকড়ে ধরল। ঠান্ডা গলায় বলল, “ও কোথাও যাবে না। তুমি যদি ওর সাথে বসে লাঞ্চ করতে চাও তাহলে এই টেবিলেই বসে পড়ো। আদারওয়াইজ, যেখানে খুশি যেতে পারো।”

ঋতু আলতার হাত ছেড়ে দিতেই আলতা নিজে উদ্যোগী হয়ে ঋতুর হাত ধরে বলল, “প্লিজ যেও না ঋতু আপু… বসে পড়ো না।”

​ঋতু অনিচ্ছা সত্ত্বেও অগত্যা মাথা নেড়ে রাজি হলো। তারা আবার টেবিলে গুছিয়ে বসল। আলতা গিয়ে বসল শায়েরীর পাশে, আর ঋতু মুখোমুখি চেয়ারে। ঋতুর সাথে আসা মেয়েটি এদিক-ওদিক তাকিয়ে সরে পড়তে চাইলেও ঋতু তাকে ছাড়ল না, জামা টেনে বসিয়ে দিল। 

কথায় কথায় ঋতু মেয়েটির দিকে ইশারা করে বলল, “ওর সাথে পরিচয় করিয়ে দিই আলতা, ওর নাম কয়ে—”

মেয়েটা প্রখর চোখে তাকাতেই ঋতু সংশোধন করল, “আই মিন… কোয়েল পাখি! আর কোয়েল, ও হলো আলতা, আমার সেকেন্ড কাজিনের ফ্রেন্ড।”

কোয়েল এক পলক আলতার মুখের দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিল ঋতুর ওপর। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “সেকেন্ড কাজিন?”

“ইয়াহ! মানে আমার চাচাতো বোনের মামাতো বোনের বান্ধবী আর কী!”

কোয়েল নিজের কপালে হাত চাপড়ে বলল, “বাপরে! মাথাটা কেমন যেন ভনভন করে উঠল।”

ঋতু তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, “আহা গো আমার সোনা মনা। মাথার মধ্যে থাকা মাছিটা বড্ড জ্বালাচ্ছে গো।”

ঋতুর এমন বোকাবোকা কথায় কোয়েল চটজলদি তার পিঠের ওপর এক থাপ্পড় বসিয়ে দিল। ঋতু ব্যথা পাওয়ার ভান করে কাঁদো কাঁদো মুখে পিঠ চেপে ধরে বলে উঠল, “উফ! আঃ! মাছিটা তো তোর মাথায় ছিল। নিজের মাথায় না মেরে আমার পিঠে কেন মারলি রে?”

কোয়েল নিজের হাতদুটো একে অপরের সাথে ঘষতে ঘষতে ধুলো ঝাড়ার মতো করে বলল বলল, “আর বলিস না মাছিটা উড়ে গিয়ে তোর পিঠের ওপর বসেছিল। তাই ওখানেই মেরে দিয়েছি।”

বলতে বলতে অজান্তেই শায়েরীর সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল কোয়েলের। মেয়েটা নরম চোখে তাদের খুঁনসুটি অবলোকন করছিল। দৃষ্টি মিলিত হতেই শায়েরী চোখ নামিয়ে ফোনে মনোযোগী হলো। 

ঋতু কিছুক্ষণ মুখটাকে কাঁচুমাচু করে রাখল। তারপর হঠাৎই তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল আলতার চুলে। কৌতূহলী সুরে বলে উঠল, “আচ্ছা আলতা, একটা কথা অনেকক্ষণ ধরে জিজ্ঞেস করব করব ভাবছিলাম, সুযোগ হয়ে উঠছিল না।”

​“বলো না।” মৃদু স্বরে বলল আলতা।

​“তোমার চুলগুলো না আগে লালচে রঙের ছিল?”

আলতার মুখটা বিবর্ণ হয়ে গেল। শায়েরী একবার তেড়ছা চোখে দেখে নিল তাকে। মেয়েটার চুল তাহলে সত্যিই লাল ছিল? হবে হয়তো। 

আলতা কোনোমতে বুক চিরে ওঠা কম্পন লুকিয়ে বলল, “ঋতু আপু… আসলে আমি চুলে রঙ করেছি।”

“কেন করলে আলতা, তোমার আগের চুলগুলো কতো সুন্দর দেখাতো।”

“আচ্ছা ঋতু আপু, তোমরাও কি আমাদের মতো প্রথম বর্ষেই পড়ো?” আলতা জানে তারা প্রথম বর্ষের নয়। কারণ তেমনটা হলে ক্লাসে দেখা হতো তাদের সাথে। মূলত প্রসঙ্গ পাল্টাতেই আলতা প্রশ্নটা করেছে।

ঋতু খাবার খেতে খেতে বলল, “না, আমরা সেকেন্ড ইয়ার, তোমার সিনিয়র।

এরইমধ্যে ফারিশ এসে হাজির হলো টেবিলের সামনে। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ, দম ফেলতে ফেলতে বলে উঠল, “আলতা তুমি এখানে? জানো, ক্লাসে তোমাকে না পেয়ে কতোটা ঘাবড়ে গিয়েছিলাম আমি?”

হঠাৎ ফারিশের উপস্থিতিতে হকচকিয়ে গিয়ে উঠে দাঁড়াল আলতা। 

“আসলে ভাইয়া, আমি ভেবেছিলাম আপনি ছুটি হওয়ার আগে আমার খোঁজ করবেন না। তাই…”

ফারিশ মৃদু ধমকের সুরে বলল, “ওহ কাম অন আলতা। তুমি এই কলেজে নতুন। আমি অবশ্যই লাঞ্চ টাইমে কোথায় যেতে হবে, কীভাবে খাবার কিনতে হবে এসব বুঝিয়ে দিতাম তোমাকে।”

আলতা অবাক হলো, “খাবার কিনতে হবে?”

“হ্যাঁ, তুমি আমার সাথে এসো আমি ম্যানেজারের সাথে তোমার পরিচয় করিয়ে দিয়ে খাবার কেনার পদ্ধতি দেখিয়ে দিচ্ছি।”

আলতা কিছুটা দ্বিধায় পড়ে ঘাড় ঘুরিয়ে শায়েরীর দিকে তাকাল। শায়েরী তখনো নির্বিকারভাবে ফোনে নজর রেখে তাদের কথাই শুনছিল।

​ফারিশ তাড়াহুড়ো করে বলল, “কী হলো, এসো? ব্রেক টাইম তো প্রায় শেষ হয়ে এল।” 

ফারিশের তাড়ায় আলতা ফের তার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি তো খাবার খেয়ে ফেলেছি ভাইয়া।”

ফারিশের কপাল কুঁচকে গেল, চোখ দুটো সরু হলো, “তোমার কাছে টাকা ছিল?”

আলতা জড়তার সাথে না-সূচক মাথা নাড়তেই ফারিশ আরও বেশি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “তাহলে?”

“আমি তো জানতাম না এখানে এলে খাবার কিনে খেতে হবে। শায়েরী আমাকে নিয়ে এসেছে। তারপর ও-ই খাবার এনে দিয়েছে।”

“শায়েরী কে? তোমার সহপাঠী নাকি?”

আলতা স্বাভাবিকভাবেই পাশে বসা শায়েরীকে দেখিয়ে দিল, “হ্যাঁ, ওর নাম শায়েরী।”

ফারিশ মাত্রই লক্ষ্য করল টেবিলে আলতা একা নেই। তার সঙ্গে আরও তিন তিনটা মেয়ে উপস্থিত।

​“ওরাও কি তোমার সহপাঠী?” ফারিশ জিজ্ঞেস করল।

​আলতা মাথা নেড়ে আঙুল দিয়ে ইশারা করে পরিচয় করিয়ে দিল, “না ভাইয়া, ওনারা দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। এনাদের একজন ঋতু আপু, আর অন্যজন কোয়েল আপু।”

ফারিশকে আলতার সাথে এভাবে কথা বলতে দেখে ঋতু আর কোয়েল একে অপরের দিকে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিলল। তাদের মুখের অভিব্যক্তি খেয়াল করল আলতা। 

পরপরই ওরা দুজন উঠে দাঁড়িয়ে একসাথে বলল, “আমাদের… আমাদের ক্লাসের সময় হয়ে গেছে। আমরা এখন আসি।”

আলতাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই মেয়েদুটো দৌড়ে চলে গেল। ব্যাপারটা শায়েরীও লক্ষ্য করল। ফারিশ শায়েরীর মুখোমুখি চেয়ারে বসল। মানিব্যাগ থেকে কয়েকটা কচকচে টাকার নোট বের করে টেবিলে রেখে হাত দিয়ে এগিয়ে দিল শায়েরীর দিকে। শায়েরী তখনও ঋতু আর কোয়েলের যাওয়ার পথের দিকে চেয়ে ছিল। 

“নাও, এটা নেওয়ার জন্যই নিশ্চয়ই বসে আছো?” ফারিশের এমন ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্যে শায়েরী চমকে তাকাল তার দিকে। ফারিশের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল, যুবক কেমন যেন শীতল চোখে চেয়ে আছে তার দিকে। 

শায়েরী দৃষ্টি নামিয়ে আনলো যুবকের হাতের ওপর। টাকার নোটগুলোর ওপর চোখ পড়তেই দৃষ্টি সরু হয়ে এলো তার। ​কড়া গলায় প্রতিপ্রশ্ন ছুড়ল, “আপনার কাছে কি আমি টাকা চেয়েছি? নাকি টাকার গরমে মানিব্যাগ ফেটে যাচ্ছে আপনার?” 

শায়েরীর ঝাঁজালো কণ্ঠে ফারিশের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। যেখানে মেয়ে থেকে শুরু করে ছেলেরা পর্যন্ত তাকে দেখলে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে দৌড়ে পালায় সেখানে এই মেয়েটা তার মুখের ওপর কথা বলেছে? কে এই মেয়েটা? সে কি চেনে না ফারিশ মাহতাবিরকে?

টাকার নোটগুলো মুঠোয় পিষে ধরে ফারিশের ইচ্ছা করল মেয়েটার মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে। কিন্তু আলতার সামনে তেমন কিছু করতে পারবে না সে। 

পরিস্থিতি উত্তপ্ত দেখে আলতা শায়েরীর উদ্দেশ্যে বলল, “শায়েরী উনি আমার ভাইয়া হয়।”

“তো? আমাকে কি ওনার পায়ে পড়ে সালাম ঠুকতে হবে নাকি?”

ফারিশ পায়ের ওপর পা তুলে বসেছিল। মেয়েটার কথা বলার ধরন শুনে সে না পেরে কটমট চোখে তাকাল। 

আলতা তড়িঘড়ি বলল, “এমা, এসব তুমি কী বলছো? আমি শুধু বলতে চেয়েছি তুমি টাকাগুলো নিয়ে নাও।”

শায়েরী রাগান্বিত চোখে তাকাল আলতার দিকে। আলতা শুকনো ঢোক গিলে কাঁচুমাচু মুখে ফারিশের দিকে ফিরে বলল, “ভাইয়া, ও টাকা নিতে চাইছে না।”

“কেন নেবে না? ও তোমার আত্মীয় হয়?”

আলতা পড়ল চরম মসিবতে। এখন কী করবে সে। শায়েরী কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর মুখ খুলল। জোরালো গলায় বলল, “বন্ধু হই। আমার বন্ধুকে আমার নিজের টাকায় খাওয়ানোর সামর্থ্য আছে। তার জন্য আমাকে আপনার কাছ থেকে টাকা বুঝে নিতে হবে না, ভাইয়া।”

কথাটা শুনে আলতা চমকে তাকালেও ফারিশের কপালের রগ টনটন করে উঠল। দেমাগ দেখিয়ে এতোকিছু বলার পর আবার আদিখ্যেতা করে ভাইয়া ডাকা হচ্ছে? আলতা এদের দুজনকে আলাদা করার পথ খুঁজছিল এমন সময় শান্তির দূত হয়ে ক্যাফেটেরিয়ার বেল বেজে উঠল। 

আলতা যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। একপ্রকার হম্বিতম্বি করে বলল, “ঘণ্টা পড়ে গেছে। তাড়াতাড়ি চলো, ক্লাস শুরু হয়ে যাবে।”

শায়েরী আর তর্কে জড়ালো না। দীর্ঘ একটা অবজ্ঞার নিঃশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটা ধরল। তার পিছু পিছু আলতাও বেরিয়ে গেল ক্যাফেটেরিয়া থেকে। ফারিশ হাতের মুঠোয় চেপে রাখা টাকাগুলো ডাস্টবিনের দিকে ছুঁড়ে মারল। তারপর পেছনে ঘুরতেই দেখল তার কজন সাঙ্গোপাঙ্গ বন্ধু দৌড়ে তার কাছে এগিয়ে এসেছে।

ফারিশ তাদের দিকে তাকিয়ে বলল, “আলতার সাথে যে মেয়েটা বেরিয়ে গেল তার চেহারা দেখেছিস তো?”

ছেলে গুলো মাথা নেড়ে কিছু বলতে যাবে তার আগেই ফারিশ বলে দিল, “ছুটির পর ওকে তুলে নিয়ে গিয়ে এমন হাল করবি যেন আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলার কথা চিন্তা করার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে।”

ফারিশ নিজের ড্রেসের কলার ঠিক করতে করতে উল্টো ঘুরে পা বাড়াতে যাবে তখনই তার একটা বন্ধু বলে উঠল, “সে না হয় ওকে তুলে নিয়ে গিয়ে খাতিরযত্ন করবো কিন্তু তারপর শ্রেয়ানের সাথে যে শান্তি চুক্তিটা হলো সেটা রক্ষা করবি কীভাবে?”

ফারিশ পেছনে ফিরল, “মানে? শ্রেয়ানের কথা আসছে কেন?”

অন্য আরেকজন বলল, “বা রে, শ্রেয়ানের বোনকে তুলে নিয়ে যেতে বলছিস আর শ্রেয়ানের কথা আসবে না?”

“শ্রেয়ানের বোন?”

“হ্যাঁ রে হ্যাঁ, মাসখানেক আগে কলেজের মাঠে দাঁড়িয়ে সবার সামনে শ্রেয়ান নিজের বোনের পরিচয় উন্মোচন করেছিল।”

“কই আমি তো দেখলাম না।”

“তুই দেখবি কেমনে? সেদিন তো তুই কলেজের ওই চিপা গলিটায় দাঁড়িয়ে মনের সুখে গাঁ/জা টানছিলি!”

ফারিশের শান্ত চোখের চাহনি নিমেষে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করল। অপরাধী বন্ধুটি সঙ্গে সঙ্গে নিজের ঠোঁটে আঙুল চেপে ধরল, যার মানে সে আর সত্যি কথা বলবে না, মিথ্যা কথাও বলবে না। একেবারে একটি কথাও বলবে না। ফারিশ নিজের চুলগুলো পেছনের দিকে ঠেলে দিতে দিতে ভাবতে লাগল কিছু একটা। 

তার এক বন্ধু বলল, “তার মানে শ্রেয়ানের বোন ফারিশের বোনের সহপাঠী?”

“শুধু সহপাঠী নয় লা দেখে তো বান্ধবী মনে হচ্ছে।” অন্যজন বলল।

“আমার মনে হয় শান্তি চুক্তি বেশিদিন টিকবে না রে আমাদের এবার থার্ড ওয়ার্ল্ড ওয়্যার-এর জন্য প্রস্তুতি নেওয়া উচিত।”

ফারিশ তাদের কোনো কথায় আর কান দিল না। গায়ের সমস্ত রক্ত যেন মাথায় চড়ে বসেছে, সে বিক্ষুব্ধ পায়ে ঝড়ের বেগে ক্যাফেটেরিয়া ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

ক্লাস ছুটির পর:

আলতা ক্লাসে বসে ফারিশের অপেক্ষায় ছিল। শায়েরী চাইছিল না ফারিশের মুখ দর্শন করতে। প্রথম সাক্ষাতেই লোকটার প্রতি কেমন যেন বিরক্তি জন্মেছে তার। 

“আলতা, তুমি আমার সাথে চলো আমি তোমাকে তোমার গাড়ি অবধি পৌঁছে দিয়ে আসছি।”

“না গো, ভাইয়া এসে আবার খোঁজাখুঁজি করবে। তুমি যাও আমি ভাইয়ার জন্য অপেক্ষা করবো।”

শায়েরী দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “আচ্ছা।” তারপর দু-কদম এগিয়েও কেমন যেন একটা টানে আবার ঘুরে দাঁড়াল। কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে বলল, “যাহ বাবা! তোমার সাথে এত কথা হলো, অথচ নম্বরটাই তো নেওয়া হলো না।”

“নম্বর?”

“হ্যাঁ, তোমার ফোন নম্বরটা দাও।” বলতে বলতেই শায়েরী নিজের ফোন বের করল। 

আলতা দোনোমোনো করে বলল, “আমার তো কোনো ফোন নেই। নম্বর কীভাবে দেবো?”

শায়েরী অবাক হলো, “কী? তোমার ফোন নেই?”

আলতা ঠোঁট ফুলিয়ে ডানে বায়ে মাথা নাড়ল। শায়েরী বলল, “কলেজে উঠেছো এখনো ফোন কিনে দেয়নি?”

আলতা উদাস চোখে তাকাতেই শায়েরী বলল, “আচ্ছা আমার নম্বরটা লিখে দিচ্ছি তোমাকে। পড়াশোনার বিষয়ে বা অন্য যেকোনো বিষয়ে আমাকে কল দিও। কেমন?”

এরপর শায়েরী একটুকরো কাগজে নিজের নম্বর লিখে দিয়ে আলতার থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল।

শায়েরী বেরিয়ে যাওয়ার পর পুরো ক্লাসে শুধু আলতাই বসে ছিল একাকী। সে একটা বই বের করে টাইম পাস করতে চাইলো। এমন সময় কারো পদধ্বনি শোনা গেল। ফারিশ এসেছে ভেবে ঝট করে বইটা নামিয়ে সমুখে তাকাতেই বিস্মিত হলো ষোড়শী। সামনে থেকে ধীরপায়ে এগিয়ে আসছে শ্রেয়ান। 

আলতার বুকের ভেতরটা ধকধক করে উঠল। দ্রুত বইটা আবার মুখের সামনে মেলে ধরে চোখ বুজে নিল সে; ইঁশ যদি কোনোভাবে এই মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া যেত! 

শ্রেয়ান এসে তার ঠিক সামনে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে আলতার মুখের সামনে থেকে বইটা ছোঁ মেরে তুলে নিল সে। তারপর সামনের বেঞ্চে হেলান দিয়ে, বইটা একহাতে ধরে নিচু গলায় বলে উঠল, “কী এতো পড়ছো দেখি।”

আলতা বেশ বুঝতে পারল শ্রেয়ান তার সাথেই কথা বলতে এসেছে, এই বুঝতে পারাটাই যেন পুরো স্নায়ুতে কাঁপুনি ধরিয়ে দিল তার। ষোড়শী দুহাতে নিজের ব্যাগ জড়িয়ে ধরে পা টিপে টিপে পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হতেই শ্রেয়ান বলল, “বই না নিয়ে চলে যাচ্ছো যে। বইটা লাগবে না নাকি? ফেলে দেবো?”

আলতা চকিতে ঘুরে দাঁড়াল। বুকের কাছে ব্যাগটা শক্ত করে চেপে ধরে কাঁপতে থাকা হাত বাড়িয়ে দিল, “লাগবে… দিয়ে দিন।” 

শ্রেয়ান বইটা দিল না। বরং মৃদু হেসে বইটা হাতে নিয়েই দেয়ালের পাশের সারির একেবারে শেষের বেঞ্চটার ওপর রেখে দিল।

“বেশ তো নিয়ে যাও।”

আলতা বইটা ফিরে পাওয়ার আশায় বেঞ্চের দিকে এগিয়ে গেল। বইটা হাতের নাগালে পাওয়া মাত্রই বুঝতে পারল শ্রেয়ান তাকে কোণঠাসা করে ফেলেছে। বেঞ্চের পেছনে এবং বামপাশে দেয়াল আর ডানপাশের একমাত্র বের হওয়ার পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছে শ্রেয়ান।

রুদ্ধশ্বাসে আলতা ফিসফিস করে উঠল, “আমাকে… আমাকে যেতে দিন।”

শ্রেয়ান কোনো ভণিতা না করে সোজাসাপ্টা বলল, “যতক্ষণ না আমাকে চিনতে পারছো যেতে দেবো না।”

আলতা এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখল কেউ নেই। সে বাধ্য হয়েই বলল, “আমি… আমি চিনতে পেরেছি আপনাকে।”

আলতার উত্তরে প্রসন্ন হয়ে শ্রেয়ান এবার বেঞ্চে বসে পড়ল, “চিনে যেহেতু ফেলেইছো সেহেতু একটু কথাবার্তা বলাই যায়।”

“আপনি বলেছেন আমাকে যেতে দেবেন।”

“সঙ্গে সঙ্গেই যেতে দেবো তা তো বলিনি।”

আলতার দম বন্ধ হয়ে আসছে। সে ভয়ে কেঁপে উঠল, “আপনি কেন এমন করছেন আমার সাথে?”

শ্রেয়ানের কণ্ঠস্বর হঠাৎই নরম হয়ে এল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তোমাকে দুটো জিনিস বলার জন্য—একটা ‘থ্যাঙ্ক ইউ’, আর একটা ‘সরি’।”

আলতার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। 

“ম… মানে?”

“নিশ্চয়ই তুমি সেদিন আমার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলে। সেইজন্যই তো সেই দেখাই আমাদের শেষ দেখা হয়নি। দেখা করতে যাওয়ার জন্য থ্যাঙ্কিউ, আর সরিটা হলো সেদিন আমি নিজেই যেতে পারিনি তার জন্য।”

আলতার চোখজোড়া ভিজে উঠল। সেদিনের স্মৃতি এমুহূর্তে মনে করতে চায় না সে। তার অভিব্যাক্তি দেখে শ্রেয়ান হাসি থামিয়ে বিষণ্ণ গলায় জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি সেদিন আমার জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছিলে?”

আলতা নিরুত্তর রইল। শ্রেয়ান নিজেই নিচু স্বরে বলে চলল, “আই অ্যাম সো সরি… আমি আসলে ভেবেছিলাম তুমি আসবে না, তাই আর যাইনি। ওখানে গিয়ে তোমার দেখা না পেলে সেদিন আমার খুব খারাপ লাগতো।”

আলতার পা দুটো যেন আর নিজের ভার বহন করতে পারছিল না, হাঁটু জোড়া অসাড় হয়ে এল। সমস্ত শক্তি হারিয়ে সে ধপ করে বেঞ্চটায় বসে পড়ল। শ্রেয়ান একটু পাশ ফিরে বসল তার দিকে। তাদের মাঝে অনেক বেশিই দূরত্ব বিদ্যমান। 

​“তুমি কি জানো, সেদিন তোমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলার মতো কত কথা আমার বুকে জমে ছিল?” শ্রেয়ানের গলার স্বর ভারী হয়ে এল, “শুধুমাত্র তোমার দেখা পাওয়ার অনিশ্চয়তাটুকু ছিল বলেই, সেদিনের সেই না-বলা কথাগুলো আজও আমার বুকের গভীরে অপ্রকাশিতই রয়ে গেছে। তোমার কথার মান রাখতে সেদিন দুপুরেই আমি ডেলভিয়া ছেড়ে চলে এসেছিলাম। এমনকি তোমার দেখা পাওয়ার চেষ্টাও করিনি আর কখনো।”

“আ-আমাকে যেতে দিন।”

“তুমি কি আমার সেই অপ্রকাশিত কথাগুলো শুনতেও চাও না?”

আলতা না-সূচক মাথা নাড়তে উদ্যত হতেই শ্রেয়ান দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে অন্য দিকে তাকাল।

“আমি তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই।”

আলতার কণ্ঠনালী তখন কান্নায় রুদ্ধ হয়ে এসেছে। সে একটি বর্ণও উচ্চারণ করতে পারল না। 

শ্রেয়ান উঠে দাঁড়াল আচমকা। তারপর পথ ছেড়ে দিয়ে বলল, “আমি কোনোদিনও তোমার সব পথ বন্ধ করে দিয়ে তোমাকে আটকে রাখতে চাই না। আমি চাই হাজারটা পথ খোলা থাকার পরেও তুমি শুধু আমিতে আটকাও।”

আলতা নিস্তরঙ্গ পায়ে উঠে দাঁড়াল। বইটা ব্যাগে ভরতে গিয়ে সময় নষ্ট করতে চাইল না সে। বইটা হাতে নিয়েই ব্যাগটা কোনোমতে কাঁধে চাপিয়ে বেঞ্চের বাইরে বের হতেই শ্রেয়ান পেছন থেকে বলে উঠল, “তোমাকে লাল চুলে সুন্দর দেখাতো…”

আলতার পা থেমে গেলেও সে পিছু ফিরল না। শ্রেয়ান পকেটে হাত গুঁজে বাক্যটা শেষ করল, “কিন্তু এখন কালো চুলে আরও বেশি সুন্দর দেখাচ্ছে।”

আলতা হাঁটার গতি আবার বাড়িয়ে দিল। দরজার চৌকাঠে পৌঁছাতেই শ্রেয়ানের জোরালো কণ্ঠের আর্দ্র ডাক ভেসে এল— 

“রঙ্গবতী!”

আলতার সমস্ত শক্তিমত্ততা যেন নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। এই বিশেষ সম্বোধন উপেক্ষা করার সাধ্য ছিল না তার। অদ্ভুত এক চুম্বকীয় টানে সে বাধ্য হলো পেছন ফিরে তাকাতে।

আলতাকে ঘুরে তাকাতে দেখে শ্রেয়ান নিজের ডান হাতটা আলতো করে বুকের বাঁ পাশে চেপে ধরল। চোখের গভীর চাহনিতে অদ্ভুত এক আকুতি ফুটিয়ে বলল,

“খুব বেশি উপেক্ষা কোরো না রঙ্গবতী… বড্ড লাগে এখানটায়।”

জ্বলবে… 

ওপস সরি!

চলবে…

Share On:

TAGS:



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply