#কালারব্লাইন্ড — ০৪
#সোফিয়াসাফা
আলতাকে নিয়ে দোতলায় এলেন আরিজ মাহতাবির। পথিমধ্যে কোনো কথা হয়নি তাদের মাঝে। একটা ঘরের দরজার সামনে এসে থেমে দাঁড়ালেন তিনি। আলতার দিকে না তাকিয়েই বললেন,
“বউমা, আজ থেকে এটাই তোমার ঘর। তুমি এখানেই থাকবে।”
আলতা কোনো উত্তর দিল না। আরিজ মাহতাবির নিঃশব্দে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর তাকালেন পুত্রবধূর দিকে। আলতার চোখজোড়া তখন জলে টলমল করছিল। মুখজুড়ে ফুটে উঠেছিল অব্যক্ত ব্যথার ছাপ। গলার কাছে কান্না দলা পাকিয়ে আছে—কিছু বলার জন্য মুখ খুললেই হয়তো ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলবে। কিন্তু এই মুহূর্তে সে কাঁদতে চাইছে না। একদমই না।
শ্বশুরমশাইয়ের দৃষ্টি নিজের ওপর অনুভব করতেই আলতা ঠোঁট চেপে মাথা নিচু করে নিল। আরিজ মাহতাবিরের চাউনিতে হঠাৎ কোমলতা নেমে এল।
“আমি জানি, রঞ্জকের ব্যবহারে তুমি কষ্ট পেয়েছো। কষ্ট পাওয়াটা স্বাভাবিক। তবুও বলছি, ওর কথাগুলো গায়ে মেখো না। ওর রাগ, ক্ষোভ কিংবা অভিযোগ—সবটাই আমার ওপর; কিন্তু তা বহিঃপ্রকাশের মাধ্যম তুমি হয়ে উঠছো। তাই বলছি, তুমি ওর ধারেকাছেও যেয়ো না। আমি চাই না, আমার ওপর জমে থাকা ক্ষোভ ও তোমার ওপর ঝাড়ুক। বাকিটা আমি সামলে নেব।”
কথাগুলো বলে আরিজ মাহতাবির ভেবেছিলেন, হয়তো মেয়েটার মনটা একটু হালকা হবে। কিন্তু হলো ঠিক উল্টো। আলতার বুকটা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল; মনে হলো, কেউ তার বুকের ওপর একটা বিশাল পাথর চাপিয়ে দিয়েছে।
আরিজ মাহতাবির বুঝলেন, এখন চুপ থাকাই উত্তম। মেয়েটার মনে কী চলছে, তিনি তা বুঝতে পারছেন না। তবে একটা বিষয়ে তিনি নিশ্চিত; আলতা তার সামনে কাঁদতে চাইছে না।
“তোমাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে। আপাতত ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নাও। বাকি কথা পরেও বলা যাবে।”
আরিজ মাহতাবির দরজাটা খুলে দিয়ে প্রস্থান করার উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরতেই আচমকা থমকে গেলেন। ভ্রূদ্বয়ের মাঝে ভাঁজ ফেলে প্রশ্ন করলেন,
“জুবা কোথায়?”
আলতার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। চোখের পাতা কাঁপতে লাগল। ঘন ঘন শ্বাস ফেলে নিজেকে ধাতস্থ করল সে। এই প্রশ্নের উত্তর তাকে দিতেই হবে। আরিজ মাহতাবির তাকে সময় দিলেন।
আলতা কম্পিত গলায় বলে দিল,
“জুবা ওনার ঘরেই রয়ে গেছে। আমি ওকে আনতে পারিনি।”
“রঞ্জকের ঘরে?”
আলতা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। আরিজ মাহতাবির কিছু মুহূর্ত নির্বাক থাকলেন। অতঃপর বললেন,
“জুবা ওখানে থাকলে তোমার কি কোনো আপত্তি নেই?”
আলতা প্রশ্নটার সরাসরি জবাব না দিয়ে আর্জি জানাল,
“আপনি…কাউকে বলে, ওকে ওই ঘর থেকে এনে দেবেন?”
আরিজ মাহতাবির নিজের প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলেন। তিনি বেশ ভালোই অনুমান করতে পারছেন, এই মুহূর্তে মেয়েটার মন খারাপের সবচেয়ে বড় কারণ জুবার অনুপস্থিতি। মেয়েটা হয়তো মুখ ফুটে তা বলতে পারছিল না।
যেখানে আলতা সাথে করে বাবার বাড়ি থেকে কিছুই নিয়ে আসেনি, সেখানে পুরোটা সময় জুবার খাঁচাটা আঁকড়ে ধরেছিল। তা থেকেই তো বোঝা যায়, জুবা নামের বুনো পাখিটা এই মেয়েটার কাছে কতটা প্রিয়!
“তুমি চিন্তা কোরো না বউমা। আমি নিজে গিয়ে জুবাকে নিয়ে আসছি।”
আলতার অশ্রুসজল চোখজোড়া উজ্জ্বল হয়ে উঠল। এই প্রতিক্রিয়াটুকু প্রত্যক্ষ করে আরিজ মাহতাবির হাঁটা ধরলেন।
এদিকে নিজের ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে নাবিলের পরিষ্কার-পর্ব শেষ হওয়ার অপেক্ষা করছিল রঞ্জক। নাবিল ঝটপট ড্রয়িংরুমটা পরিষ্কার করে বাইরে বেরিয়ে এল। তার হাতে ছিল একটি ট্রে, যার ওপর আলতার রেখে যাওয়া এঁটো প্লেট আর গ্লাস রাখা।
রঞ্জক নাক কুঁচকে প্লেট-গ্লাসগুলোর দিকে একবার তাকিয়েই মুখ ফিরিয়ে নিল। অতঃপর ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল।
নাবিল পেছন থেকে জিজ্ঞেস করল,
“আমি শুধু সিটিং এরিয়াটুকুই পরিষ্কার করেছি, মেজো সাহেব। এগুলো নিচে রেখে এসে কি বাকি ঘরগুলোও পরিষ্কার করে দেব?”
রঞ্জক চারপাশে চোখ বোলাতে বোলাতে বলল, “না। আবর্জনাটা এই ঘরেই ছিল। তাই অন্য ঘরগুলো পরিষ্কার করার প্রয়োজন নেই।”
“আমি যাচ্ছি তবে?”
রঞ্জক যাওয়ার অনুমতি দিতে যাচ্ছিল, ঠিক এমন সময় তার চোখ আটকে গেল সোফার ওপর পড়ে থাকা নীল শাড়িটায়। তারপরই দৃষ্টি গিয়ে থামল খাঁচার ভেতর গোল হয়ে ঘুমিয়ে থাকা জুবার ওপর।
“এটা চোখে পড়েনি তোমার? এটা রেখে যাচ্ছ কেন?”
রঞ্জকের গমগমে কণ্ঠ শুনে নাবিল দ্রুত পায়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
একহাতে ট্রে সামলে অন্য হাতে খাঁচাটা তুলে নিতে উদ্যত হতেই রঞ্জক চাপা গলায় বলল,
“আমি ওটার কথা বলিনি, সোফার ওপর যেটা পড়ে আছে সেটার কথা বলেছি। ওটা সরাও আমার চোখের সামনে থেকে।”
“দুঃখিত, মেজো সাহেব। আমি এক্ষুণি নিয়ে যাচ্ছি।”
নাবিল শাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে যেতেই ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। রঞ্জক কিছুক্ষণ শান্ত চোখে তাকিয়ে রইল খাঁচার ভেতর ঘুমিয়ে থাকা জুবার দিকে।
. . . . .
মিনিটখানেক পর রঞ্জক বেডরুমের দিকে পা বাড়াতেই পেছন থেকে দরজায় নক হলো। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, তার বাবা এসে দাঁড়িয়েছেন।
রঞ্জকের ঠোঁটের কোণে সঙ্গে সঙ্গেই তাচ্ছিল্যের হাসির রেখা ফুটে উঠল,
“কী ব্যাপার? পথ ভুলে আমার ঘরে চলে এলে নাকি?”
“পথ ভুলে আসিনি, উল্টো তুমিই আসতে বাধ্য করলে। নাবিলকে বেরিয়ে যেতে দেখলাম। তুমি কি পারতে না ওর মাধ্যমে জুবাকে বউমার কাছে পাঠিয়ে দিতে?”
রঞ্জক কিছুটা উপহাসের ভঙ্গিতে বলল,
“ওহহো, ওই পাখিটার কথা বলছ? আরে পাখিটা আমার দারুণ পছন্দ হয়েছে! কী সুন্দর কথা বলতে পারে। আমি সত্যিই ইম্প্রেসড।”
ছেলের কথায় আরিজ মাহতাবির গম্ভীর গলায় বললেন,
“আমি পাখিটা নিয়ে যেতে এসেছি, রঞ্জক।”
কথাটা যেন শ্রবণগোচর হলোই না রঞ্জকের। সে হাসতে হাসতেই বলল,
“অন্য কোনো দিন তো আমার ঘরে আসো না তুমি। অথচ আজকের মতো একটা বিশেষ দিনে এসে বিরক্ত করছ? সো ব্যাড! এই বয়সেও ম্যানার্স আয়ত্ত করতে পারলে না।”
আরিজ মাহতাবির ক্ষুব্ধ হলেন, তবুও ধৈর্য ধরে বললেন,
“পাখিটা ফিরিয়ে দাও।”
রঞ্জক ধীর পায়ে বাবার দিকে এগিয়ে গেল। একদম সামনা-সামনি এসে মেকি গলায় বলল,
“তোমার আদরের বউমার তো সামর্থ্য নেই আমাকে কিছু দেওয়ার। যা-ও একটা পাখি আমার ঘরে রেখে গেছে, সেটাও তুমি নিয়ে যেতে এসেছো? এতো কিসের জেলাসি তোমার? লজ্জা করছে না বাসর রাতে ছেলেকে এসে ডিস্টার্ব করতে?”
আরিজ মাহতাবির নিজেকে আর সামলে রাখতে না পেরে সজোরে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন রঞ্জকের গালে। থাপ্পড়ের তোড়ে এই দফায় চশমাটা খুলে নিচে পড়ে গেল রঞ্জকের। তবুও সে শব্দ করে হেসে উঠল। তার বাবা তাকে থাপ্পড় মেরেছেন—অর্থাৎ কথাটা ঠিক জায়গাতেই গিয়ে আঘাত করেছে।
রঞ্জক থাপ্পড় খাওয়া গালটা সামান্য কাত করে কিছুক্ষণ বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। যিনি কি-না রাগে ফুঁসছেন।
“বারবার আমি কিন্তু তোমাকে ক্ষমা করব না, রঞ্জক! ভালোয় ভালোয় পাখিটা ফিরিয়ে দাও। নইলে…”
“নইলে কী হুম? নমিনেশন পেতে দেবে না, তাই তো? ওকে অ্যাজ ইউ উইশ। তারপর কী হবে সেটাও তাহলে জেনে রাখো, ভ্যালেনিয়ার প্রতিটি মানুষ জানবে তুমি আমার বাবা হয়ে আমারই সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছ! নয় নয়টা পুরুষের দ্বারা ধ`র্ষিত হওয়া একটা মেয়েকে আমার কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছ!”
আরিজ মাহতাবির বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক চোখে চারপাশটা দেখে নিলেন—আশেপাশে কেউ রঞ্জকের কথাগুলো শুনে ফেলল কি না। তার এই অভিব্যক্তি দেখে রঞ্জক একধরনের তৃপ্তি পেল।
আরিজ মাহতাবির কণ্ঠ খাঁদে নামিয়ে প্রশ্ন করলেন,
“কে বলেছে তোমাকে এসব?”
“কোনসব?” রঞ্জকের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটল।
আরিজ মাহতাবির কথাটা আর মুখে আনতে চাইলেন না। রঞ্জকও না বোঝার ভান করে মেঝে থেকে চশমাটা তুলে নিয়ে আবার চোখে এঁটে নিল।
আরিজ মাহতাবির ছেলের এমন দায়সারা ভাব দেখে দাঁতে দাঁত চেপে জিজ্ঞেস করলেন,
“সেই ঘটনার পেছনে নয় জন ছিল তা তোমাকে কে বলেছে?”
“কেন? আরও বেশি ছিল নাকি?”
“তোমার তা না জানলেও চলবে।”
“তোমার কি মনে হয়? তুমি না বললে আমি কিছুই জানতে পারব না?”
“জেনে কী করবে শুনি? নিশ্চয়ই আমাকে ব্ল্যাকমেইল করবে?”
রঞ্জকের ভ্রূ কুঁচকে গেল। আরিজ মাহতাবির বুকে হাত গুটিয়ে বললেন,
“অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার জন্য তো আর এত বিস্তারিত জানতে চাইছ না। নিশ্চয়ই এসব ফাঁস করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করার পরিকল্পনা করছ?”
রঞ্জকের ঠোঁটের বাঁক আরও চওড়া হলো,
“বাহ! খুব ভালো চেনো দেখছি আমাকে? আমি তেমন কিছুই ভাবছিলাম, কিন্তু এভাবে ধরা পড়ে যাবো তা একদম ভাবিনি!”
আরিজ মাহতাবির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। রঞ্জক নির্বিকার গলায় যোগ করল,
“এবার তুমি আসতে পারো।”
“পাখিটা দিয়ে দাও।”
“বললাম তো, দেব না। আমার ধ`র্ষিতা বউ বাসর রাতে আমার জন্য একটা উপহার রেখে গেছে, আমি কেন সেটা তোমার হাতে তুলে দিতে যাব?”
“তোমার সাথে কেউ অন্যায় করে থাকলে আমি করেছি, রঞ্জক। তুমি মেয়েটাকে কেন শাস্তি দিচ্ছ?”
“কারণ আমি একা একা এই যন্ত্রণা পোহাব আর ওই মেয়েটা শান্তিতে থাকবে—তা তো একদমই ফেয়ার হবে না। আমি বিষয়টাকে জাস্ট ফেয়ার করতে চাইছি। এই বিয়েটা আমাকে যতটা যন্ত্রণা দেবে, ওকেও ঠিক ততটাই পেতে হবে।”
আরিজ মাহতাবির শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিলেন।
“কিসের বিনিময়ে পাখিটা ফিরিয়ে দেবে বলো। তুমি যা চাইবে, আমি তা-ই দেব।”
রঞ্জক বিন্দুমাত্র না ভেবেই বলল,
“খুবই সিম্পল। আমি ডিভোর্স চাই, সঙ্গে নমিনেশনও।”
আরিজ মাহতাবির ভাবতেও পারেননি রঞ্জক এত সহজভাবে এত বড় একটা কথা বলে দেবে।
“বিয়েটাকে কি তুমি ছেলেখেলা মনে করো, রঞ্জক? মেয়েটাকে বিয়ে করার চব্বিশ ঘণ্টাও পার হয়নি, এরই মধ্যে তুমি ডিভোর্স চাইছ?”
“বিয়েটাকে আমি ছেলেখেলা মনে করি না বলেই তো ডিভোর্স চাইছি। যে মেয়েটাকে আমি স্ত্রী হিসেবে কোনো দিন মেনেই নিতে পারব না, তার সঙ্গে এই বিয়ে নামক সম্পর্কের বন্ধনে আটকে থাকার কোনো মানে হয় না।”
আরিজ মাহতাবির থমথমে মুখে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। রঞ্জক দুই পা পিছিয়ে গেল। ঠোঁটের কোণে আবারও সেই তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে বলল,
“তুমি হয়তো ডিলটাতে রাজি নও। আচ্ছা বেশ, যাও তবে।”
“তুমি পাখিটা দেবে না, তাই তো?”
“একদম তা-ই।”
আরিজ মাহতাবিরের আর কিছুই করার রইল না। জুবার খাঁচাটা না নিয়েই খালি হাতে তাকে ফিরে যেতে হলো আলতার কাছে।
রঞ্জক মিনিটখানেক সেখানেই দাঁড়িয়ে থেকে বেডরুমের দিকে পা বাড়াতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে তার ফুপু আরজু বেগমের ডাক ভেসে এলো,
“রঞ্জু!”
রঞ্জকের উদ্যত পা থেমে গেল। চোখ বুজে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“খাবার নিয়ে এসেছো, তাই না? সরি ফুপি, আমি বাইরে থেকে খেয়েই এসেছি। তুমি ওগুলো নিয়ে যাও।”
আরজু বেগম রঞ্জকের কথায় কান না দিয়ে খাবারভর্তি ট্রেটা হাতে নিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়লেন। টেবিলের ওপর ট্রেটা রেখে বললেন,
“আমাকে মিথ্যা বলছিস?”
তিনি এগিয়ে গিয়ে রঞ্জকের হাত ধরে তাকে নিজের দিকে ফেরালেন,
“আমি তোর মুখ দেখেই বলতে পারি, তুই খেয়েছিস কি না।”
রঞ্জকের চোখেমুখে বিষণ্ণতা ফুটে উঠল। এই একজন মানুষের কাছেই সে কখনো মিথ্যা বলে পার পায় না। মানুষটা ঠিক ধরে ফেলেন তাকে। যতই আড়াল করার চেষ্টা করুক, আরজু বেগমের চোখকে ফাঁকি দিতে পারে না।
রঞ্জক তার ফুপুর হাতের ওপর হাত রাখল। হাতটা দু’হাতের মুঠোয় নিয়ে আক্ষেপের সুরে বলল,
“ভালো করে তাকিয়ে দেখো তো, আর কী কী বুঝতে পারছ?”
আরজু বেগমের চোখে অসহায়ত্ব ফুটে উঠল,
“বলেছিলাম তোকে, ভাইয়াকে বিশ্বাস করিস না। সে কখনোই তোকে নিয়ে ভাবেনি; সে শুধু নিজের আর গুঞ্জনের কথাই ভাবে।”
রঞ্জক ফুপুর হাতের ওপর কপাল ঠেকিয়ে মুখটা আড়াল করল। নিচু গলায় বলল,
“আমার ভুল হয়ে গেছে। ভেবেছিলাম, অন্তত এই ব্যাপারে উনি আমার খারাপ চাইবেন না। শত হোক, আমিও তো ওনার ছেলে!”
আরজু বেগম অন্য হাতটা রঞ্জকের মাথায় রাখলেন। ধীরে ধীরে চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,
“মেয়েটা দেখতে কিন্তু লাখে একটা। বয়সটাও খুব কম মনে হচ্ছে। তবুও ওকে মেনে নিতে তোর সমস্যা কোথায়?”
এই প্রশ্নে রঞ্জকের বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে গেল। মুখ তুলে তাকাল স্নেহময়ী নারীটির দিকে। তার চোখের দৃষ্টি দেখে আরজু বেগম থমকে গেলেন। সরু ফ্রেমের চশমার আড়ালে রঞ্জকের ধূসর চোখের মণি দুটো কেমন যেন সংকুচিত হয়ে এসেছে। পুরুষটির চোখ ও অভিব্যক্তি—দুটোই এতটা ধূসর ও অস্পষ্ট যে তার চোখের ভাষা তিনি বুঝতে পারলেন না।
“দেখ রঞ্জু, তোর চোখে মেয়েটাকে কেমন দেখাচ্ছে তা হয়তো আমরা পুরোপুরি বুঝতে পারব না। তবুও তুই ফুপির কথা বিশ্বাস কর, মেয়েটা ভীষণ সুন্দরী। ভাইয়া অন্তত এই জায়গাটায় তোকে ঠকায়নি।”
“তুমি ওর যে সৌন্দর্যের এত প্রশংসা করছো, আমি ওর সেই সৌন্দর্যটাই সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করি।”
“এসব কেন বলছিস? আমি জানি, তুই ওর বিশেষ দুটো দিক দেখতেই পারিসনি। তবুও সেই দুটো দিক বাদ দিলেও মেয়েটা নিঃসন্দেহে সুন্দরী। আচ্ছা বল তো, তুই কেন এমন জিনিসকে ঘৃণা করছিস যা তুই দেখতেই পাচ্ছিস না?”
“এমন কী আছে ওর মধ্যে, যা আমি দেখতে পাচ্ছি না?”
“আফসোস বাড়িয়ে কী লাভ? শুধু বল, যে বিশ্বাস নিয়ে তুই মেয়ের চেহারা না দেখেই ভাইয়ার পছন্দে বিয়ে করলি, সেই বিশ্বাসটা কোথায় গেল? কী এমন হলো যে তুই মেয়েটাকে মানতে পারছিস না?”
একই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তিতে ফুপুর হাত ছেড়ে দিয়ে রঞ্জক ঘুরে গিয়ে দুপা এগিয়ে গেল। গলার স্বর কিছুটা ভারী করে বলল,
“কারণটা শুনলে তুমি সহ্য করতে পারবে না। তাই না শোনাই ভালো। আমি বরং ফ্রেশ হয়ে এসে খেয়ে নিই, অনেক ক্ষুধা লেগেছে।”
রঞ্জক হাঁটা ধরতেই আরজু বেগম তার বাহু চেপে ধরলেন,
“কী এমন কথা, যা তুই আমার কাছেও লুকিয়ে যাচ্ছিস?”
রঞ্জক হাসার চেষ্টা করল,
“তেমন কিছুই নয় ফুপি। আমি শুধু চাইছি না তোমার ভাইয়ের প্রতি তোমার সম্মানের জায়গাটা নষ্ট হয়ে যাক।”
“কিন্তু আমি সত্যিটা জানতে চাইছি।”
“কিছু কিছু সত্য না জানাই ভালো।”
রঞ্জক এড়িয়ে যাওয়ার শেষ চেষ্টা করে আবারও পা বাড়াল। কিন্তু পেছন থেকে আরজু বেগমের কণ্ঠ ভেসে এল,
“তুই কি আমাকেও বিশ্বাস করতে পারছিস না, রঞ্জু?”
রঞ্জক তৎক্ষণাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল,
“তুমিও জানো, আমি তোমাকে নিজের চেয়েও বেশি বিশ্বাস করি।”
“তাহলে কেন বলতে চাইছিস না?”
রঞ্জকের ভেতরে গড়ে তোলা প্রতিরক্ষার দেয়াল যেন ভাঙার দ্বারপ্রান্তে। যে কথাগুলো আরিজ মাহতাবিরের সামনে খুব সহজেই বলে দিতে পেরেছে, সেই কথাগুলোই যেন অন্য কারও উপস্থিতিতে মুখে আনাও অসম্ভব মনে হচ্ছে। অথচ কিছুক্ষণ আগেই সে সবাইকে নিচে জড়ো করেছিল সত্যিটা প্রকাশ করবে বলে।
হাস্যকর!
সত্যিই তার জীবনটা হাস্যকর করে দিয়েছে তার নিজেরই জন্মদাতা।
আরজু বেগম টের পেলেন রঞ্জকের ভেতরের অস্থিরতা। তিনি তার হাত ধরে সোফায় বসিয়ে দিলেন। তারপর রঞ্জকের মাথাটা নিজের কোলে টেনে নিতেই সে ফুপুর কোলে মুখ গুঁজে দিল।
কিছুক্ষণ পর আরজু বেগম অনুভব করলেন, রঞ্জক কাঁদছে। সেই পুরুষটি কাঁদছে—যে অন্যের সামনে কাঁদার চেয়ে ম`রে যাওয়াকেও শ্রেয় মনে করে।
চলবে…
(এখন থেকে নিয়মিত দেওয়ার চেষ্টা করবো তাই রেসপন্স করুন সবআইইই!)
Share On:
TAGS: কালারব্লাইন্ড, সোফিয়া সাফা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৪
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৬৬
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫২
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৬৮
-
কালারব্লাইন্ড গল্পের লিংক
-
কালারব্লাইন্ড পর্ব ৮
-
কালারব্লাইন্ড পর্ব ৩
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৬৪
-
কালারব্লাইন্ড পর্ব ১৮
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৭২