Uncategorized

রাগে অনুরাগে পর্ব ৫০


#রাগে_অনুরাগে

#পর্ব_৫০

#সুহাসিনি_ফাতেহা

তিতলি কিছুক্ষণ আগে গোসল করে ওয়াশরুম থেকে বের হয়েছে। দেওয়াল ঘড়িতে নজর বুলিয়ে দেখল একটা দশ মিনিট। ফারাজ কলেজ থেকে আসতে আসতে ততক্ষণে ২ টা বেজে যাবে। যেই ভাবা সেই কাজ। ব্যস্ত পায়ে নিজের ল্যাগেজ নিয়ে বিছানার মাঝখানে বসেছে। তার একটা পারসোনাল ডায়েরি আছে। যেটা সে এবার বাড়ি থেকে আসার সময় ল্যাগেজে করে নিয়ে এসেছে। খুব যত্নে ল্যাগেজ ভর্তি জামাকাপড়ের একেবারে তলায় লুকিয়ে রেখেছে৷ যাতে কারোর চোখের সামনেও না পড়ে এমনকি ফারাজেরও না। নিজেই খুব একটা ধরে না৷ যখন ইচ্ছে হয়,তখন বের করে মনের কিছু অনুভূতি লিখে আবার রেখে দেয়। ভুলেও আগের লেখাগুলো’তে চোখ বুলোতে যায়না। আজকে কেন জানি দেখতে মন চাইল। ফারাজকে প্রথম দেখার পর তার অনুভূতি কেমন ছিল? সে কেন ফারাজের প্রেমে পড়ল। তাদের মাঝে কী কী হয়েছিল সবকিছু ডায়েরিতে লিখে রেখেছে। প্রথম পৃষ্টা থেকে শুরু করে সব ফারাজকে নিয়ে লিখা। আবেগে এমন এমন কিছু অদ্ভুত লিখা সে ডায়েরিতে লিখেছে যে কারো হাতে গেলে মানইজ্জত আর থাকবে বলে মনে হয়না। বিশেষ করে ফারাজের হাতে পড়তে দেওয়া যাবেনা। একদম না। কয়েক পৃষ্টা উল্টাতেই দেখতে পেলো দুইটা জামাই বউ আঁকা যারা একে অপরের দিকে তাকানো। পাশে ছোটছোট অক্ষরে লিখা,

“আপনার অচেনা বউ জামাইজান।”

এটা একেছে যখন সে নতুন নতুন ফারাজের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিল তখন। শুধু তাই নয় একদিন ভীষণ সাহস যুগিয়ে এমন আরও কিছু ছবি কেমেস্ট্রি ল্যাবের সবচেয়ে বড় নোট বইটার ভেতরে রেখে এসেছিল। ফারাজকে বইটা নিয়ে ক্লাসে আসতে দেখা যেত সেই সুযোগে। তারপর টানা তিনতিন আর কলেজে যায়নি। সে জানেনা ফারাজ আদৌ সেটা দেখেছে কিনা। নাকি অবহেলায় কোথাও পড়ে গিয়েছে। কিন্তু তাকে চিনতে পারার মতো কোনো প্রমাণ রাখেনি। আরো কয়েক পৃষ্টা উল্টাল। একটা লেখাতে চোখ আটকে গেল,

“আমি কি আপনার টুনাটুনিদের মা হতে পারি?”

লেখাটা পড়ে মুচকি মুচকি হাসতে লাগল তিতলি। সেদিন তার সাহস আরও বেড়ে গিয়েছিল ফারাজকে নিজের করে পাওয়ার যখন দেখল ফারাজও তার মেসেজের রিপ্লাই দিয়েছে। আর সেটাও সে ডায়েরীতে লিখে রেখেছে। ফারাজ রিপ্লাই দিয়ে বলছিল,

“তা আপনি কয়টা বাচ্চা নিতে পারবেন ম্যাডাম? আমার তো আবার কম বাচ্চা দিয়ে পোষাবে না। আফটার অল,দশ-বিশ টা বাচ্চা নেওয়ার কথা

ভেবেছি এতবার আমাকে সামলাতে পারবেন তো?”

“হুহ!কয়টা বাচ্চা দিতে পেরেছেন আমায়?”

মুখ ভেংচি কেটে বিড়বিড় করে বলল তিতলি।

এই মেসেজটা পড়ে এখন বেশ বুঝল লোকটা আগেও ভীষণ,ভীষণ অসভ্য ছিলো নয়তো একটা অপরিচিত মেয়ে মেসেজ দিয়েছে দেখে রিপ্লাই দিলো তাও সোজা বাচ্চা নেওয়ার কথা বলে দিলো। যদিও মানুষটা সে নিজেই ছিল তাতে কি? এখন তো তার নিজের উপরেই হিংসা হচ্ছে। সত্যি বলতে সে ফারাজকে পাওয়ার জন্য কত পাগলামিই না করত। আর পেয়ে গেলো কত সহজেই।

তার ফারাজের সাথেই বিয়েই হচ্ছে সেটা

যদি তিতলি জানতো তাহলে বিয়ের দিন তারচেয়ে খুশি আর কেউ হতে পারতো না। অথচ সে হলুদ থেকে বিয়ের মতো একটা দিনে কান্নাকাটি করেই ভাসিয়ে দিয়েছে। কান্নাকাটি করেও তো ফারাজকে পেয়েছে। ভাগ্য থাকলে অসম্ভব কিছুও সম্ভব হয়। তিতলি নিজের অজান্তেই ভালোবাসার মানুষকে নিজের করে পেয়েছে। যার জন্য ভাগ্যে লাগে। তিতলি ডায়েরীর পরের পৃষ্টা উল্টানোর মাঝেই হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল। তিতলি ভাবল অসময়ে কে এসেছে? ফারাজ তো কলেজে। ভাবতে ভাবতে আর কোনো আওয়াজ আসলো না। তিতলি ভালোর ভালোই ডায়েরি টা জায়গা মতো রেখে দিলো। ল্যাগেজর চেইন লাগিয়ে বিছানা থেকে নেমে যেতে গিয়ে কারো সাথে ধাক্কা খেয়ে মেঝেতে পড়ে যেতে নিলো বেচারি। মানুষটা তাকে দুহাতে আগলে নিয়ে পাশের দেওয়ালের সাথে চেপে ধরল। ভয়ে তিতলির হাত থেকে ল্যাগেজ মেঝেতে পড়ে যায়। ভয়ার্ত রমণী চোখজোড়া বন্ধ করে নিশ্বাস নিতেই নাকে হঠাৎ চেনা পরিচিত পারফিউমের ঘ্রান ভেসে এলো। ফারাজের শরীরের সুবাস এটা। এ সুবাস তার যে চেনা ভীষণ। ধীরে ধীরে চোখ খুলল সে। মুখ ফুটে কিছু বলতে নিলে তৎক্ষণাৎ ফারাজ বলল,

“চুপ, চুপ একদম।”

তিতলির বুঝতে একটুও সময় লাগলো যে বেলকনির দরজা দিয়ে ফারাজ রুমে ঢুকেছে। আর কিছুক্ষণ আগেও দরজা ফারাজ ধাক্কা দিয়েছে। কলেজ থেকে ২ টার আগে চলে আসলো কেন? তিতলির অযাচিত ভাবনার মাঝেই ফারাজ গম্ভীর গলায় বললো,

“ওই সময় ফোন কেটে দিয়েছিলে কেন?”

“আমি গোসল করতে যাচ্ছিলাম তাই।”

“তখন ফোনে কি যেন বলছিলে?”

তিতলি ঢোক গিলল। গোসল করার আগে সে ফারাজকে কল দিয়ে বলছে, “আমি হানিমুনে যেতে চাই।” তারপর ফারাজকে কিছু বলতে না দিয়ে কল কেটে দিয়েছে। সে কল কেটে দিয়েছে বলে ফারাজ কলেজ থেকে চলে আসছে কী? আড়চোখে দেখে নিলো ফারাজ দুষ্ট চাহনি নিয়ে তাকিয়ে আছে। আশ্চর্য! সে হানিমুনে যাবে বলছে, যখন বলছিলো তখন কি কানে তুলো পেঁচিয়ে রেখেছে? যাই হোক আবার বললে যদি তাকে হানিমুনে নিয়ে যায় তাহলে আবার বলতে তার কোনো অসুবিধা নেই।

তাই আমতা আমতা করে বলল,

“হা..হা হানিমুনে যাবো বলছিলাম।”

“হানিমুনে যাবে, রাইট? হানিমুনে তোমার সাথে কি হতে পারে সে ব্যাপারে কোনো ধারনা আছে তোমার?”

“না।”

“না কেন?”

তিতলি মুখ কাচুমাচু করে মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে। ফারাজের কথার জবাব খুঁজতে ব্যস্ত সে। কিছুক্ষণ পর জবাব খুঁজেও পেয়ে গেলো। আওড়ানোর সুরে বললো,

“আমিতো জানি হানিমুনে মানুষ ঘুরতে যায়।”

“তা,ঠিক কিন্তু রাত হলে হানিমুন আর হানিমুনের জায়গায় থাকেনা তখন হয়ে যায়..”

তিতলি ফারাজের কথার মাঝে বললো,

“তখন কি হয়ে যায়? নিশ্চয়ই চাঁদ দেখার রাত বলবেন, আমি, আপনি দুজনে মিলে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে চাঁদ দেখব তাইনা বলুন?”

অলক্ষ্যে ঠোঁট পিষে হাসল ফারাজ। তিতলির মাথার পাশে দেয়ালে ভর দিয়ে রাখা হাতটা আরেকটু ঝুঁকিয়ে এনে, কেমন গভীর দৃষ্টি নিয়ে তাকাল তিতলি মুখের দিকে। মৃদুস্বরে বললো,

“চাঁদ কিন্তু দুই ধরনের হয়।”

“মানে?”

ফারাজ ঠোঁট কামড়ে ক্ষীণ নাচাতে নাচাতে বলল,

“মানে তোমাকে আকাশের চাঁদ দেখতে হবেনা। একটা চাঁদ দেখতে দেখতেই তো গোটা রাত কেটে যাবে তোমার।

“কোন চাঁদ দেখতে দেখতে রাত কাটবে শুনি?”

তিতলি ফারাজের কথার মানে বুঝতে না পেরে ইন্টারেস্টিং হয়ে ফারাজকে প্রশ্ন করল।

হঠাৎ তাকে কোন চাঁদ দেখার কথা বলছে? ওদিকে তিতলির নিজের দিকে কোনো খবর নেই। গোসল করে সে ঢিলেঢালা সাদা রঙা একটা কূর্তি পরেছে। গলাও সামনে পিছনে বেশ বড়। যার ফলস্বরপ তুলতুলে নরম ফর্সা কাঁধে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে কালো অন্তবার্সের চিকন ফিতা। সাদা কালোর সংমিশ্রণে যেন সেটা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। তারউপর তিতল ওড়না ছাড়া থাকায় বুকের দিকেও সব বুঝা যাচ্ছে।

ফারাজ হঠাৎ হাস্কিসুরে বলে উঠলো,

“দোষ আমার না দোষ তোমার, কারণ তুমি একটু বেশিই হট। আর এমন হট জিনিস চোখের সামনে থাকলে থাকলে চাঁদ নিজের কন্ট্রোল হারিয়ে রুখে দাঁড়াবে এটাই স্বাভাবিক না?”

লজ্জায় কুঁকড়ে গেল তিতলি! এক আকাশসম লজ্জার তোড়ে নিমিষেই রক্তিম হয়ে উঠল তার গালদুটো। লজ্জা সংবরণের মৃদু প্রচেষ্টায় লজ্জিত মুখটা তড়িঘড়ি করে লুকানোর জন্য ফারাজের বুকে মুখ গুঁজে দিলো। খানিকবাদে কপট রাগ নিয়ে বলল,

“আমি পবিত্র মনে আপনাকে প্রশ্ন করেছি আর আপনি তখন থেকে আমাকে অশালীন ভাবে উত্তর দিয়ে দিচ্ছেন। এসব বলতে লজ্জা লাগেনা আপনার?”

“নাতো লজ্জা আমার কেন লাগবে? আমরা পুরুষেরা শুধু লজ্জা দিতেই জানি।”

“সব পুরুষ আপনার মতো বউদের এসব বলেনা।”

“এতেই তোমার গর্ব করা উচিত ছিল, যে তোমার স্বামী ডার্ক রোমান্স পছন্দ করে। তার মুখে অসভ্য, বেহায়া কথাছাড়া অন্যকিছু আশা করাটা বোকামি।”

ফোঁসফোঁস করে শ্বাস ছাড়ল তিতলি। ফারাজের বুক থেকে মাথা তুলে নিয়ে দেওয়ার সাথে চেপে গেল। এই লোকটা যে এক নম্বরের রগচটা আর ঠোঁটকাটা তার আগেই জানা হয়ে গেছে।

পরপর তেজ দেখিয়ে শুধায়,

“হুহ! গর্ব করতে করতে একদিন গর্ভবতী হয়ে যাবো।”

দুহাতে নিজের মুখ চেপে ধরল তিতলি। ঠোঁটকাটার সাথে থাকতে থাকতে সেও কেমন ঠোঁটকাটা হয়ে যাচ্ছে। তিতলি তখনো জানতে পারলো না নিজের অবস্থা। কারণ ফারাজ তাকে কিছুই বুঝতে দেইনি। কথার ধারায় ইঙ্গিত দিলেও তিতলি বুঝেও বুঝে উঠতে পারেনি। ফারাজ তিতলির অন্তবার্সের ফিতের দিকে নজর রেখে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার ইচ্ছে করছে টেনেছিড়ে খুলে ফেলতে এটা। তার চোখ এসে থামল কাঁধের একটু নিচের দিকে। সাদা জামার উপর দিয়ে কালো অন্তবার্সের গোলগোল অবয় দুটো স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। ফারাজের দেহে এক অজানা কম্পন ছড়িয়ে গেল। একরাশ আবেগ জমে উঠল ভেতরটায়। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। একের পর এক ঢোক গিলে যাচ্ছে। বড়বড় নিশ্বাস নিচ্ছে। কিছুক্ষণ পর গভীর গলায় বলে,

“তুমি চাইলে এখনই গর্ভবতী বানিয়ে দিতে পারি।”

“আপনার কী শরীর খারাপ লাগছে? এত বড়বড় নিশ্বাস নিচ্ছেন কেন?

বিচলিত হয়ে জিজ্ঞেস করল তিতলি। ফারাজ তখনো তিতলির দিকে ওভাবে তাকানো। নিচের অধরকোণ কামড়ে ধরে নিজেকে সামলানোর চেষ্টায় মত্ত। ঘোর লেগে আসা মাদকীয় কন্ঠে আওড়ালো,

“খারাপ লাগার ঔষুধ তুমি।”

“আমি?

“হুম।”

তিতলি এতক্ষণ ফারাজের দৃষ্টি খেয়াল না করলেও এখন তার নজরে এলো ফারাজ তার কোথায়ও একটা তাকানো। কিছু একটা দেখছে সে। সেটা কী তবে? কি দেখছে সেটা খেয়াল করার জন্য ফারাজের দৃষ্টি লক্ষ্য নিজের দিকে তাকাল। মুহূর্তেই গালদুটো লাল হয়ে আসে তার। এতক্ষণ ধরে সে এভাবে দাঁড়িয়ে ছিলো। ভাবতেই লজ্জায় লাল, নীল হয়ে যাচ্ছে লাজুকময়ী মেয়েটা। ততক্ষণে দৌড়ে বিছানা থেকে ওড়না নিয়ে গায়ে জড়িয়ে নিলো। পেছন থেকে ঝাঁঝালো গলায় বলল,

“আপনি আসলেই একটা নির্লজ্জ।”

ফারাজের নেশা যা ধরেছে না? সে আবারও তিতলির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে তিতলির পেছনে এসে দাঁড়াল। তিতলিকে পেছন থেকে নিজের সাথে চেপে ধরে তিতলির নরম পেট পুরুষালী বলিষ্ঠ দুহাত দিয়ে খামছে নিজের শরীরের সাথে চেপে ধরল। তিতলি ধনুকের মতো বেঁকে গেল। কিছু অনুভব করতেই একটা অজানা অনুভবে শিউরে উঠে তিতলি চমকে ফারাজের হাত খামচে ধরে। ঠিক তখনি তিতলির কাঁধে বাচ্চাদের মতো চিবুক ঠেকিয়ে তিতলির নরম গালে নিজের দাড়িযুক্ত চোয়াল চেপে ধরে ফিসফিস করল ফারাজ,

“হুম আমি নির্লজ্জ,আর তোমাদের মতো লজ্জাবতীদের কপালে নির্লজ্জ হাসবেন্ডই ঝুঁটে যেমনটা তোমার ক্ষেত্রে হলো। আর লজ্জা পাওয়াটাই এখন তোমার একটা শাস্তি।”

তিতলি দুহাতের নরম কব্জির সাহায্য ফারাজকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিতে চাইল। ফারাজ তিতলির দুহাতের কব্জিদুটো শক্ত করে ধরে ফেলল। তিতলিকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে এনে অনেকখানি ঝুঁকে আসল। তার চোখ বলছে সে এখন কিছু চাই। তিতলি মুহূর্তেই বুঝে যায় লোকটার মতলব। তাকে আর কিছু বুঝতে, ভাবতে দিলো না ফারাজ। ঝড়ের গতিতে মুখ ডুবিয়ে দিলো তিতলির গলার তুলতুলে নরম চামড়ায়। বেসামাল ভাবে চুমু খেতে খেতে ভিজিয়ে দিলো তিতলির গলা, ঘাড়। হঠাৎ আক্রমনে দুহাতে ফারাজের শার্ট আঁকড়ে ধরল তিতলি। চোখজোড়া বন্ধ করে ফারাজকে অনুভব করতে লাগল। খোঁচাখোঁচা চাপ দাড়ির ঘর্ষনে তিতলি গলায় হালকা ব্যথা অনুভব করে। ফারাজ থামল না। মুখ তুলে এবার লম্বা লম্বা শ্বাস টেনে নাক ঘষতে শুরু করল তিতলির সর্বাঙ্গে। তিতলির শরীরের এই স্মেল তাকে পাগল করিয়ে দেয়। এটা না নিতে পারলে নিজেকে কেমন পাগল পাগল লাগে। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। কিছুদিন ধরে এটা তার নেশায় পরিনিত হয়েছে। এমন নেশা সে এর আগে কোনোদিন অনুভব করেনি। যখন এই নেশা উঠে তখন তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে যায় তার,পানি,সিগারেট যাই খাক কাটাতে পারেনা এই নেশা। তখন তার তিতলিতে চাই মানে চাই চাইই।

তিতলিরও একটা অভ্যাসে পরিনিত হয়েছে ফারাজকে খামছি দেওয়া। এতক্ষণ সব ঠিক থাকলেও ফারাজ এখন উন্মাদ হয়ে গেছে। গলা থেকে নিচের দিকে নামতে শুরু করেছে। সে বুঝল ফারাজ তাকে ছাড়বেনা তাই খামছে ধরল ফারাজ শক্তপোক্ত হাত। তার ধারালো নখ বসে গেল শক্তপোক্ত হাতের চামড়ায়। তাতে সামান্য উদ্বেগ দেখাল না ফারাজ। খামছাখামছি করার এক পর্যায়ে গিয়ে তিতলি শান্ত হয়ে গেল। ফারাজ কিছুক্ষণ পর নিজের মর্জি মতো তিতলিকে ছাড়াল।

তিতলি হাঁফাতে লাগল। বলে,

“আপনি একটা উন্মাদ।”

“শুধু তোমার জন্য।”

বলে তিতলির হাতের নরম কব্জি ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে ড্রেসিংটেবিলের ড্রয়ার থেকে নখ কাটার মেশিন নিলো ফারাজ। তিতলির চোখ কপালে উঠে গেল। দুদিন আগেও ফারাজকে নখ কাটতে দেখেছে সে। এখন আবার কি করতে নিয়েছে? তার নখগুলো একবার দেখে নিলো প্রথমে। বাম হাতের নখ বেশ বড় হয়েছে। যাকে স্টাইল বলে আরকি। হঠাৎ মনে পড়ল তাদের বিয়ের পরেরদিন সকালে ফারাজ তাকে ঠিক এভাবেই টেনে এনে সোফায় বসিয়ে তার শখেরগুলো নখ কেটে দিয়েছিল। যদিও এখন সোফায় বসায় নি তবে তার মনে বলছে ফারাজ এক্ষুনি হেঁচকা টান মেরে সোফায় বসাবে তাকে। মতলব তো সুবিধার লাগছেনা।

সন্দেহের গলায় জিজ্ঞেস বললো,

“এটা কেন নিয়েছেন?”

“নিশ্চয়ই নখ কাটতে। “

“কার?”

“তোমার।”

তিতলি উঁচু গলায় বলল,

“কার নখ কাটবেন বললেন আবার বলেন দেখি?”

ফারাজের ত্যাড়া জবাব,

“যা শুনছো তাই?”

কথাটা বলে ফারাজ তিতলিকে সোফায় বসিয়ে নিজেও পাশে বসেছে। তিতলি নিজের হাতদুটো জামার ভেতরে ঢুকিয়ে বসে আছে। সে কিছুতেই তার হাত বের করবেনা। নখ কাটবেনা। জেদ ধরে বলল,

“বিয়ের পরের দিন সকালে আপনি আমার নখ কেটে দিয়েছিলেন মনে আছে? সেদিন শুধুমাত্র নতুন বউ বলে চুপ হয়ে ছিলাম। কিন্তু আজকে আমি নতুন বউ না তাই কিছুতেই চুপ থাকব না।”

বাঁকা হাসল ফারাজ। তার খুব জানা কীভাবে তিতলির নখ কাটতে হবে। বরং স্বেচ্ছায় কাটবে তিতলি। ঠোঁটের কোণে চিলতে রহস্যময় হাসি এনে বলল,

“হানিমুনে যাওয়ার অনেক শখ তোমার তাইনা?”

“অবশ্যই শখ। মালদ্বীপ,,সুইজারল্যান্ড,

কক্সবাজার,সাজেক সব জায়গায় ঘুরতে চাই।”

“তোমাকে সব জায়গা থেকে ঘুরিয়ে আনার দায়িত্ব আমার। তার আগে নখ কাটবে তুমি। তোমাকে ডোজ দেওয়ার সময় অনেক ধকল যাবে তোমার ভেতরে। তখন আমার কাজে তোমার নখগুলো ডিস্টার্ব করবে”

“করুক ডিস্টার্ব!”

ফারাজ নিজের শার্টটা খুলে নিজের বুক পিঠ, পেট সব দেখাল তিতলিকে। শক্তপোক্ত বুক পিঠে অসংখ্য আচরের দাগ। এই দাগ গুলোতে কখনো কোনো মলমও লাগায়নি ফারাজ।

ফারাজ গাম্ভীর্যতা ছেড়ে ঠান্ডা গলায় বলল,

“দেখো কীভাবে দাগ করে ফেলেছো তুমি। তোমার জন্য এখন আর খালি গায়ে এক্সারসাইজও করতে পারিনা! কখন আব্বু, আম্মু ছাদে এসে দেখে নিবে।”

তিতলি ফ্যালফ্যাল নয়নে তাকিয়ে রইল। নিজের হাত দিয়ে ফারাজের ঢেউ খেলানো বুকে আচর দেওয়া জায়গাগুলো হাত দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতে লাগল। ভ্রু নাচালো ফারাজ। স্থিরভাবে দেখছিল তিতলি কি করছে। তিতলির একদিকে খুশি লাগছে সাথে অন্যদিকে কান্না পাচ্ছে। এভাবে খামছি দিয়েছে সে তার প্রানের স্বামীকে?

কিন্তু একদিকে ভালোই হয়েছে কেউ আর তার স্বামীর দিকে কুনজর দিতে পারবেনা। দাগ দেখলেই ভাববে লোকটা বিবাহিত। একটা গুলুমুলু বউ আছে। তাই ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলল,

“বেশ করেছি। দরকার পড়লে আরও করব। আপনি যে কামড় দিয়ে আমার শরীরে দাগ করেন সেটা কি?”

“তোমার শরীরে এখনও অনেক কিছুই করা বাকি আছে আমার। তোমার ভাগ্য ভালো দাগগুলো শুধু গলায়, কাঁধে, ঘাড়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে এখনো। বুকের নিচ থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত দাগ করা বাকি। সেটাও হয়ে যাবে খুব তাড়াতাড়ি, তোমার শরীরের প্রতিটা ভাঁজে ভাঁজে আমার রাজত্ব থাকবে শুধু।”

“আপনি কি ডাকাত?”

ফারাজ একটা ধমক দিয়ে উঠল তিতলিকে। কাজের সময় এতবেশি কথাবার্তা তার পছন্দ না। সে চাইলে জোর করে তিতলির হাত বের করতে পারে এখন। কিন্তু করবেনা। স্বেচ্ছায় তিতলি হাত বের করে দিতে হবে তাকে। হুকুম ছুড়ল,

“চুপচাপ হাত বের করো। গোসল করতে হবে আমায়।”

“তো করুন না গোসল। আমি কী ধরে রেখেছি?”

“সাইন্স নিয়ে পড়ো অথচ হাতের নখ রাখা যে খারাপ স্বভাব সেটা জানোনা?”

“সাইন্সের সাথে আমার নখের সম্পর্ক কী শুনি?”

“অনেক সম্পর্ক আছে।”

“কী সম্পর্ক?”

“বিজ্ঞানে বলা আছে যারা হাতের নখ রাখে তারা নখের সাথে পায়খানা খায়।”

“ছিহঃ আপনি এখন কত কথা বলবেন যাতে আমি নখ কাটি। আমি সব জানি।”

“আরে ঠিক কথায় তো বললাম আমি।”

“তো আমি কী করবো?”

“ভালো কথা কানে যায় না তাইনা?”

তিতলি কানটা একটু চুলকে নিলো। বলল,

“আসলে কানে মশা ঢুকছে তো তাই শুধু খারাপ কথা কানে যায়। কেউ ভালো কথা বললে মশা কানে ভোঁ ভোঁ করে তাই শুনতে পায়না।”

ফারাজ তাকিয়ে আছে তিতলির মুখের দিকে। হঠাৎ করেই কঠিন হৃদয়ের পুরুষটার মুখটা কেমন মলিন দেখা যাচ্ছে। হৃদয়ে অমন ঘোর আমাবস্যা নামল কেন? মেয়েটা তার কথা শুনে তাকে কেউ বলে সমোন্ধোন করেছে তাই বলে কী? ভাবা যায়? ঠিক কতটা আপন ভাবতে শুরু করলে এমন হয়?

নরম গলায় বলল,

“আমি কেউ?”

তিতলি নিশ্চুপ। মনেমনে বলছে, আপনি আমার জান,পরান,কলিজা,ভালোবাসা,প্রিয় স্বামীজান,আমার জীবণ, মরন সব টুনাটুনিদের বাপ সব আপনি। তার ভাবনার মাঝেই ফারাজ আবার জিজ্ঞেস করল,

“বলো কে আমি?”

“আপনি মানুষ।”

“শাটআপ!

“জ্বি ওকে। “

ফারাজকে তিতলিকে আর কিছু বলল না। কিছুক্ষণ শক্ত মুখবয়বে সোফায় বসে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল। নিজেকে স্বাভাবিক করে তিতলিকে ভয় দেখানোর জন্য শক্ত গলায় বলল,

“তোমাকে হানিমুনে নিয়ে যাচ্ছিনা।”

“এটা কিন্তু অন্যায়।”

“যা মনে করো।”

তিতলি মুখ কাচুমাচু করল কিছু একটা ভেবে।দোনোমোনোর পর্যায়ে মিনিট দুয়েক গড়ালো তার। খানিকক্ষণ পর বলল,

“আমার একটা শর্ত আছে আপনি যদি তা মানেন তবেই আমি নখ কাটবো।”

“যেমন?”

“আপনি আমার নখ কেটে দিলে আমিও আপনার দাঁত ফেলে দিবো। আমার শর্ত মানতে রাজী?”

তিতলি নিজের শর্তের কথা বলল। ফারাজ চোখ ছোট করে তাকিয়ে আছে। সময় নিয়ে জবাব দিলো,

“তাতে কী পেতে পারি আমি?”

“আমার নখ কাটলে আমি কি পাবো শুনি?”

“তার বিনিময়ে তুমি হানিমুন যেতে পারবে।”

“আপনিও আমাকে পাবেন যদি দাঁত ফেলতে পারেন।”

ফারাজ তিতলির কথার প্রত্যুত্তর দেবার প্রয়োজনীতা দেখাল না। তিতলি ভাবছে নখ না কাটলে যদি তাকে হানিমুনে না নিয়ে যায় তখন। এতবড় সুযোগ পেয়ে সে কীভাবে হাতছাড়া করতে পারবে। না কিছুতেই হাতছাড়া করা যাবেনা। তিতলি এখনো হাত বের করছে না দেখে এবার ফারাজের মুখবয়বে বিরক্ত ভাব ফুটে উঠলো। যেকোনো মুহূর্তে তিতলিকে ধমক দিতে পারে। বলতে পারে,

“তোমার হানিমুনে যাওয়া ক্যন্সেল স্টুপিড, অথবা বলবে থাপ্পড় চিনো? যারা নখ রাখে তারা পেত্নী,

নখ রাখে পেত্নীরা। এসব আরো কথা বলবে তার কোনো হিসেব নেই। তার চেয়ে বরং নখও কেটে নিবে সাথে হানিমুনেও যেতে পারবে। পরে না হয় নখ কাটার জন্য সুদ তুলে নিবে। যাকে বলে একডিলে দুই পাখি। শেষপর্যন্ত ফারাজের কাছে হার মেনে তিতলি নখ কেটে নিলো।

___________________

Share On:



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 


0 Responses

Leave a Reply