#আলতোছোঁয়ায়_সমুদ্রকথন_(১৬)
#নুসরাত_সুলতানা_সেঁজুতি
“পিউ, এই পিউ! পিইইইইইউ!”
চিকণ হাতটা ধরে সাদিফ এত জোরে ঝাঁকাল, নড়েচড়ে-হকচকিয়ে চাইল মেয়েটা।
“ হু,হ্যাঁ হ্যাঁ! হ্যাঁ?
সাদিফ আশ্চর্য হয়ে বলল,
“ একা একা কী করছিস এখানে?”
পিউয়ের বড়ো নিষ্পাপ স্বর,
“ছবি তুলছিলাম সাদিফ ভাই!”
সাদিফ বিভ্রান্ত হয়ে আশপাশ দেখে বলল,
“ছবি! কে তুলে দিচ্ছে?”
“কেন, ধূ…”
চারপাশটায় চোখ যেতেই বিস্ময়ে হোচট খেল পিউ। যেন আকাশ থেকে মাটিতে থুবড়ে পড়ল এক্ষুনি। তারপর হন্যে দৃষ্টিতে খুঁজল কাউকে। পেলো না। গোটা জায়গাই ফাঁকা। এখনো তো
পার্টির ফোকাস পয়েন্টের এখানটাতেই দাঁড়িয়ে আছে ও। তাহলে ধূসর ভাই! পিউয়ের মাথা এলোমেলো লাগল। ও না এতক্ষণ স্টেজে বসে ছবি তুলল, ধূসর ভাই না ফটোগ্রাফার হলেন?
কোথায় সেসব? সেসব তবে স্বপ্ন! সব ওর কল্পনা? পিউয়ের মন ভেঙে দু টুকরো হয়ে গেল। এর মানে ধূসর ভাই ওর ছবি তুলে দেয়নি? পিউ নিরাশায়, হতাশায় হাতটা তুলে কপাল চাপড়াল। সাদিফ আরো তাজ্জব হয়ে বলল,
“তোর হয়েছেটা কী?”
পিউ কাঁদোকাঁদো চোখে বলল,
“কিছু না।”
“বড়ো মা তোকে ডাকছে, চল।”
“যাব না।”
“না গেলে খাবার ভাগেও পাবি না। সবাই খেতে বসে গেছে।”
“সবাই? আপু, তানহা, ধূসর ভাই সবাই?”
“হ্যাঁ, তো কী বসে থাকবে? চল।”
পিউ মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে রইল। সাদিফ যেতে নিয়েও থামল ওকে দেখে। মোলায়েম স্বরে শুধাল,
“কী হয়েছে বল তো? ওহ হো, আজকে তো ছবি-টবি তুলে দিইনি। রাগ করেছিস?”
পিউ মাথা নুইয়ে দুপাশে ঘাড় নাড়ল। সাদিফ তাও বলল,
“আচ্ছা চল এখন তুলে দিচ্ছি।”
পিউ বলল,
“আজ আর তুলব না ভাইয়া। এমনিতেই তুমি অনেক কাজ করেছ। চলো!”
মেয়েটা ঘুরে হাঁটা ধরল। বিষণ্ণতা চুইয়ে পড়ল ভেতর হতে। ধূসর ভাইকে ও বলল, আবদার করল, এক রকম অনুনয়ই তো ছিল ওটা। ওভাবে বললে যে কোনো ছেলেই তো ছবি তুলে দিতো তাই না?
কিন্তু, মানুষটা ইগ্নোর করল এভাবে? এত ভাব একটা মানুষের কী করে হয়! হায়রে পিউ, তুই প্রেমে পড়ার জন্যে এই লোককেই পেলি!
পিউয়ের পেছনে হাঁটতে হাঁটতে সাদিফ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বাচ্চা মেয়ে, অথচ কত বুঝদার! লক্ষ্মীমন্ত যাকে বলে। দুনিয়ার সব মেয়ে কেন যে এরকম হয় না! বিশেষ করে ওই বেনিওয়ালি ম্যালেরিয়া। সাদিফ দাঁত কপাটি পিষল মুহূর্তে। নেহাত চাচ্চুর বিয়ে নিয়ে ওর খুব ব্যস্ত সময় যাচ্ছে। নাহলে ওই মেয়েকে বুঝিয়ে দিতো সাদিফ কী জিনিস!
খাবার রুমে এসে মন খারাপ আরো গাঢ় হলো পিউয়ের। বিশাল টেবিল ঘিরে গোটা শিকদার বাড়ির মানুষজন বসেছে। যদিও আনিসকে বসতে হয়েছে শ্বশুর বাড়ির সাথে। আমজাদই বসিয়ে দিয়ে এলেন।
এক টেবিলে তো আর এত লোক ধরে না। তার মধ্যে ধূসরের বাম পাশে রিনিকে দেখে পিউয়ের দুনিয়া অন্ধকার দেখাল। তানহা তক্ষুনি বলল,
“পিউ! কোথায় ছিলি তুই? কতক্ষণ অপেক্ষা করছিলাম। পরে আপু জোর করে খেতে বসিয়ে দিলো।”
তানহার কথায় সবার নজর একবার করে পিউয়ের দিকে ঘুরলেও, ধূসর ব্যস্ত রইল খাবারে। রাইসে চামচ নাড়ার শব্দ ব্যাতিত আর কিছু নেই। মুখচোখ তুলনামূলক শক্ত। যেন বিরক্ত কিছু নিয়ে! পিউ মনে মনে ভেংচি কাটে। এরকম ভোঁতা কেন চেহারা? পাশে সুন্দরী চাশমিশ বসেছে, হাসি তো উথলে পড়া উচিত!
মিনা বেগম কিছু রেগে রেগে বললেন,
“কোথায় টইটই করছিলি? তোকে ডাকতে আবার আলাদা লোক লাগে কেন? মেয়েটা কতক্ষণ বসেছিল, ওনার খবর নেই।”
রুবায়দা বললেন,
“ আপা, আজকে অন্তত বকো না। পিউ আয়, আমার কাছে আয়।”
আফতাব-রুবায়দা পাশাপাশি বসেছিলেন। আফতাব নিজের চেয়ারটা ছেড়ে শিফট হলেন অন্যটায়। ওকে বললেন,
“আয় না, এখানে আয়!”
চাচা-চাচির এত আহ্লাদে পিউ খুব আবেগী হয়ে পড়ল। হেঁটে গেল ত্রস্ত। পাশে বসতেই রুবায়দা থালায় পোলাও-সালাদ, কাবাবের পিস সব তুলে তুলে দিলেন। রোস্টের বাটিতে আর লেগপিস ছিল না। পিউ লেগপিস ছাড়া খেতেও পারে না। রুবায়দার থালারটায় এখনো হাত পড়েনি। ভদ্রমহিলা সঙ্গে সঙ্গে নিজের প্লেট থেকে লেগপিসটা তুলে ওর প্লেটে দিলেন। পিউয়ের ভেতরটা টলমল করে উঠল তাতে। ছেলে দু আনা দাম দেয় না, আর মা কত আদর করে! কিন্তু পিউ কি এত ভালোবাসার যোগ্য? ও তো মেজো মায়ের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছে। তারই আড়ালে তার ছেলেকে লাইন মারছে। এটা কি অন্যায় হচ্ছে না?
পিউয়ের বুক হুহু করে উঠল। মেজো মায়ের দিকে অসহায় চোখে চেয়ে ভাবল,
“সরি মেজো মা, তোমাকে আমার ঠকাতেই হবে। কদিনে তোমার ছেলে নিজের প্রেমে আমাকে এমনভাবে ফাঁসিয়ে ফেলেছে, আমি আর তাকে ছাড়তে পারব না। তবে তুমি ভেবো না, বিয়েটা হয়ে গেলেই আমি সারাদিন তোমার পা টিপে দেবো। এখনো দিতাম, কিন্তু সবাই সন্দেহ করবে।”
ওকে হাঁ করে থাকতে দেখে রুবা বললেন,
“কী রে খা?”
পিউ-ধূসর কোণাকুণি বসেছিল। আমজাদ ছিলেন ধূসরের মুখোমুখি। খেতে খেতে একবার বাবাকে দেখল ও। আমজাদও কেমন চুপচাপ, গম্ভীর হয়ে আছেন। একটা কথাও বলছেন না যে! বাবা তো এমন চুপচাপ নন। পিউ বোঝার চেষ্টা করল। হঠাৎ খেয়াল পড়ল ইকবালও এই টেবিলে বসেছে। ওহ, এর মানে এই কেস!
বাবা ইকবাল ভাইকে একদম সহ্য করতে পারেন না। সেখানে একই টেবিলে বসে খেতে হচ্ছে! পরপর পিউয়ের নজরে পড়ল আরেকটা ব্যাপার। পুষ্প বারবার ইকবালকে চোখ পাকাচ্ছে। নীরবে শাসাচ্ছে যেন। মাঝে সহায়হীন নজর ঘুরিয়ে দেখছে সবাইকে। উল্টোদিকে ইকবালের ঠোঁটে মিটিমিটি হাসি! পিউয়ের এদিকে মন দেওয়ার ইচ্ছে হলো না। রিনি যে ধূসরের এত কাছে, এটা নিয়েই মাথা ফাঁকা ওর। ইস, ধূসর ভাইয়ের গা থেকে আসা জেসমিনের সুবাস অন্য কেউ পাচ্ছে?
পিউয়ের মলিন চোখটা আবার ইকবালের ওপর পড়ল। দেখল ইকবাল ওর দিকেই চেয়ে। চোখাচোখি হতেই বড়ো আফসোসের চাউনি ফেলল সে। দুপাশে মাথা নাড়ল। আবার রিনিকে দেখিয়ে নাক সিটকাল। পিউ হেসে ফেলল ওর মুখভঙ্গি দেখে!
তুরন্ত তড়াক করে উঠে দাঁড়াল ধূসর। ওঠার তোড়ে চেয়ারটা পিছিয়ে গেল একটু। ছলকে উঠল রিনি। টেবিলে থাকা প্রত্যেকেই ভড়কাল অল্প। প্রশ্নবিদ্ধ নজরগুলো এড়িয়ে ধূসর তড়বড়িয়ে হেঁটে গেল কোথাও। পিউ দেখল প্লেটে ভাত,মাংস সবই পড়ে আছে। কিছুই শেষ হয়নি। তাহলে, তাহলে খেলেন না কেন উনি? মিনা বেগম উদগ্রীব হয়ে ডাকলেন,
“ধূসর, কোথায় যাচ্ছিস?”
ও উত্তর দেয় না। আফতাব মেজাজ খারাপ করে বিড়বিড় করলেন,
“অসভ্য কোথাকার!”
পিউ পাশে থাকায় শুনতে পেলো। মাথা নুইয়ে নিলো অন্ধকার মুখে। ধূসর ভাইকে কেউ বকা দিলে ওর এত খারাপ লাগছে কেন? ওনার বাবাই তো বকলেন! না রে পিউ, তুই অতিরিক্ত ভালোবেসে ফেলছিস। এত ভালোবাসিস না, যাতে পরে তাকে না পেলে দুনিয়া জাহান্নাম মনে হয়!
আজমল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বললেন,
“বোধ হয় ওয়াশরুমে গিয়েছে। যাক গে, পুষ্প তানহাকে বেড়ে বেড়ে দাও একটু। ওর তো প্লেট খালি।”
পুষ্প চামচে হাত দিতে গেলেই ও বলল,
“না না আপু আমি এত খেতে পারি না।”
মিনা বললেন,
“আরে খাও, তোমরা আজকালকার ছেলেমেয়েরা তো ফাস্টফুড খেয়ে এসব মুখেই নাও না। আচ্ছা তানহা, তুমি নাকি নানুবাড়ি গেলে কাল। আমরা তো শুনলাম আসতে পারবে না। হঠাৎ সারপ্রাইজ দিলে কী করে?”
“হ্যাঁ আন্টি, যাওয়া তো ফাইনালই ছিল। পিউকে বলেওছিলাম। কিন্তু রাতে আবার পাপা ক্যানসেল করে দিয়েছিলেন। পিউকে বলিনি, অবাক হবে দেখে। কিন্তু উবার নিয়ে আসতে গিয়ে আমি রুটই ভুলে গিয়েছিলাম। তাই ওকে জানাতেই হলো!”
“ভালো হয়েছে। এসেছ আমরা খুব খুশি হয়েছি!”
পুষ্প স্বভাবসুলভ হাসছিল। হঠাৎ টের পেলো উল্টোপাশে বসা ইকবাল ফের পা দিয়ে টেবিলের নিচে ওর পায়ের ওপর ঘষছে। মুহূর্তে চোখমুখ শক্ত করে ভাতের থালায় নজর নামাল সে। এই ছেলেটাও না, এত অসভ্য!
বড়োদের খাওয়া একে একে শেষ হলো। রিনি হাত ধুতে যাবে, পিউও দাঁড়াল খাবার শেষে। রিনি আর ও একইসাথে বেসিনের সাথে যাচ্ছে। ধূসর ওখানেই দাঁড়িয়ে তখন। হুট করে বলল,
“রিনি, আপনার সাথে আমার কথা আছে।”
“ তাই? আমি এক্ষুনি হাতটা ধুয়ে আসছি।”
পিউয়ের বুকে বাঁজ পড়ল। আকাশ ভাঙল মাথায়। বিশ্বাস করতে পারল না, কানে ঠিক শুনেছে কিনা!
ততক্ষণে বেসিনের দিকে ছুটেছে রিনি। গতিতেই যেন উল্লাস চুইয়ে পড়ছে। পিউ আহত মুখে ধূসরের পানে চেয়ে রইল। মানুষটা ওকে দেখল না। টিস্যুতে হাত মুছতে মুছতে চলে গেল সামনে। একটু পরই ওর চোখের সামনে দিয়ে সেই পথে হেলেদুলে চলল রিনিও। পিউ ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল যেন। পা চলল না, শরীর নড়ল না। এঁটো হাত ধুতে ভুলে গেল। খাবার চটচট করছিল যখন, ইকবাল হাজির হলো সেখানে। পিউয়ের আমাবস্যার মতো অন্ধকার চেহারা দেখে হাসল একটু। ওকে শান্ত করতে বলল,
“এত ভয় পাচ্ছো কেন পিউপিউ? আর যাই বলুক, প্রোপোজ করবে না। তবে ডাকল কেন আমিও ভাবছি। তখন খাবারও খেলো না। ঘটনা তো একটা ঘটেইছে! উম, শুনে আসি দাঁড়াও।”
পিউয়ের স্পাই হয়ে ইকবাল এগিয়ে গেল ত্রস্ত। লুকাল দূরত্ব রেখে। ওকে ঠায় দাঁড়িয়ে দেখে বাড়ির কতজন কতবার ডাকলেন, তাও মেয়েটা নড়ল না। হঠাৎ দেখল ইকবাল দুলতে দুলতে আসছে। সেই একইরকম স্ফূর্তি তার। পিউ ব্যাকুল হয়ে শুধাল,
“কী বলছে ওরা?”
“বলছি, কিন্তু আমাকে কী দেবে?”
পিউ ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
“আমি ছোটো মানুষ, আপনাকে কী আর দেবো? খুব জোর বিয়েতে জুতো চুরির টাকা থেকে বাঁচিয়ে দিতে পারি।”
ইকবাল হেসে ফেলল শব্দ করে। বলল,
“আরে ওসব লাগবে না।”
পরপর এদিক-ওদিক দেখে ফিসফিস করল,
“কাল তোমার বোন নিয়ে একটু ঘুরতে যাব, ব্যবস্থা করতে পারবে?”
পিউ বিপন্ন চোখে চাইল।
“ এত হইচইয়ের মধ্যে কীভাবে বার করব?”
“প্লিজ পিউপিউ, প্লিজ বোন!”
পিউ হার মেনে বলল,
“আচ্ছা দেখছি। বলুন না, কী বলেছে ওকে?”
ইকবাল মুখটা মুহূর্তেই ধূসরের মতো গম্ভীর বানাল। কপালে ভাঁজ নিয়ে বুক ফুলিয়ে, পা একটু ফাঁকা করে দাঁড়াল ওর মতো করে। তারপর গজগজিয়ে বলল,
“মিস রিনি, আপনি খাবার টেবিলে আমার সাথে বেয়াদবি করেছেন। যাকে এক প্রকার অসভ্যতা বলে। আমি চাইলে এক্ষুনি এটা আপনার বাড়ির লোকদের কানে দিতে পারি। কিন্তু চাইছি না গেস্ট হয়ে এসে, অসম্মানিত হন। তাই এটাই আপনার প্রথম এবং শেষ ওয়ার্নিং। ফার্দার এসব করলে আমি নিজেই আপনার ব্যবস্থা নেব, বড়োদের দরকার হবে না। শিকদার বাড়ির ছেলে হিসেবে আমি কিন্তু মোটেও অতটা ভদ্র-সভ্য নই!”
পিউ তাজ্জব হয়ে চেয়ে রইল খানিকক্ষণ! ইকবাল নিজেই বলল,
“আরে সত্যিই এসব বলছিল। আমিও তো বলি, ব্যাটা খাওয়া রেখে অমন উঠে গেল কেন? নিশ্চয়ই মেয়েটা টেবিলের তলে পা দিয়ে গুঁতোগুঁতি করছিল, যেভাবে আমি তোমার বোনকে গুঁতোচ্ছিলাম!”
পিউ হু-হা করে হেসে উঠল। ইকবাল নিজেও নিজের চুল ঠেলতে ঠেলতে হাসে। পিউয়ের এঁটো হাত দেখে বলে,
“এবার তো হাতটা ধোও শালীকে!”
পিউয়ের খেয়াল পড়ল যেন।
“ও হ্যাঁ হ্যাঁ!” বলে ছুটল তড়িৎ।
**
রাত গড়িয়েছে প্রায়!
এক হুঁশিয়ারিতেই রিনি একদম নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। কথা-বার্তা বলছে না তেমন। পুষ্প বেশ কবার জিজ্ঞেস করেছে, কিছু হয়েছে কিনা! তবে পিউয়ের কিছু যায়ই এলো না। দুনিয়ায় এত ছেলে থাকতে চারচোখীকে কেন ওর ধূসর ভাইয়ের কাছে গিয়েই ঘেঁষতে হবে? যেখানে এক বাড়িতে এত মাস থেকেও পিউ চার আনা অ্যাটেনশন পেলো না, সেখানে ইনি চারদিন এসে কত রংঢং দেখাচ্ছিল!
তানহা আজ থেকে গিয়েছে। মিনা বেগম, পুষ্প এরা জোর করে রেখে দিয়েছে। আমজাদ নিজেও বারবার বললেন, আজ থাকো। আমি তোমার বাবাকে ফোন করে বলে দিচ্ছি!
জমকালো পার্টির ড্রেস পালটে এখন গায়ে পিউয়ের জামা পরেছে তানহা। সাথে কিছু নিয়ে আসেনি তো! তবে এই দৃশ্যে ভারি হতাশ হলো ইকবাল। পিউয়ের বন্ধু নিয়ে আমজাদ শিকদার কত গদগদ করেন! আর ওকে দেখলেই হলো, মোটা নাকটা কুঁচকে শুধু, ওয়াক ওয়াক!
সত্যিই রে খালিদ, মেয়েমানুষের প্রতি দুনিয়া দুর্বল! ইকবাল আশায় ছিল ওকেও কেউ থাকতে বলবে। অনেকটা সময় বসেছিল সেজন্যে। কেউ যখন কিছু বলছিল না, উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি তাহলে এখন আসি রে ধূসর!”
সুমনার পরিবারের সাথে সবার একটা বিস্তর গল্পের আসর চলছিল। মিনা বললেন,
“ওমা কেন? আজ কোথাও যাওয়া চলবে না ইকবাল। আজকে সবাইকে থাকতে হবে বুঝলে।”
এই এক কথায় আবার ধপ করে ফোমের চেয়ারে বসে পড়ল ইকবাল। সব দাঁত বের করে বলল,
“ঠিক আছে, আন্টি। আপনি যখন এত করে বলছেন, থেকেই যাআয়ায়া…. (আমজাদের লাল চোখ দেখে মিইয়ে গিয়ে) চ্ছি।”
সুমনা আনিসকে আজ এক ঘরে দেওয়া হবে। কয়েক রকম ফুল দিয়ে বাসর ঘর সাজানো হয়েছে। টানেলগুলো বেলি আর রজনীগন্ধার। সুমনা একটা কাতান শাড়ি পরে, মাথায় অল্প ঘোমটা দিয়ে নারীমহলের মাঝে বসেছিলেন। পিউ ছুটে এলো তক্ষুনি। খুব উদ্বেগে ওনার হাত ধরে বলল,
“ছোটো মা, তোমার সাথে কিছু জরুরি কথা আছে, একটু এসো তো।”
সুমনা ঘাবড়ে গেলেও চললেন সাথে সাথে। ওনাকে নিয়ে একদম আনিসের ঘরে এলো পিউ। খাটে বসাতেই সুমনা বললেন,
“কী হয়েছে, পিউ?”
“বলছি!”
পিউ হাতের দু আঙুল মুখে গুঁজে সিটি বাজাল। আর অমনি ঝাঁক বেঁধে সব ছুট্টে ঢুকল ঘরের ভেতর। পুষ্প, সাদিফ, রাদিফ, তানহা, শান্তা, সুপ্তি, রিনিও আছে। সুমনা ভড়কে বললেন,
“কী হয়েছে বলো তো! আমার কিন্তু খুব চিন্তা হচ্ছে।”
সাদিফ বলল,
“আপনার চিন্তার কিছু নেই ছোটো মা! চিন্তা তো হবে চাচ্চুর। এই পুষ্প, ফিতে কই? টাঙা, তাড়াতাড়ি টাঙা।”
সবাই মিলে হুলস্থুল করে দরজার চৌকাঠে একটা লাল ফিতে টাঙাল। সুমনা বুঝতে পারলেন, বাসরের গেট ধরা হয়েছে!
হেসে ফেললেন তিনি। এতক্ষণে দুই পা গুছিয়ে একটু আরাম করে বসলেন।
ইকবাল ধূসরের ঘরে ঘুমাবে। বিয়ে বাড়িতে আজ গাদাগাদি হলেও, ওর ঘর থাকবে কোলাহলমুক্ত। কারণ এই ছেলে নিজের সাথে শুতে কাউকে নেয় না। শুধু আর শুধুমাত্র ইকবাল ছাড়া কারো সাথে বেড শেয়ার করেনি ধূসর। দুজন একইসাথে ওর ঘরের দিকে যাচ্ছিল। ধূসর সামনে, ইকবাল পেছনে। সন্তর্পণে একজনকে ম্যাসেজ পাঠাল ও,
“সবাই ঘুমিয়ে গেলে ছাদে আসবে মাই লাভ?”
ওদিক থেকে উত্তর এলো,
“না
!”
ধূসর থামল হঠাৎ। দ্বিতীয় তলায় এত মানুষ আর এই গেট ধরা দেখে ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে গেল সেদিকে। পিউ আর রাদিফ একটা চেয়ার নিয়ে ঝগড়া করছিল। রাদিফ বসবে, পিউ বলছিল ও বসবে। তবে ধূসরকে দেখতেই সব ফেলে সোজা হয়ে দাঁড়াল পিউ। ধূসর সবাইকে একবার একবার দেখে বলল,
“কী হচ্ছে এখানে?”
পিউ উচ্ছ্বসিত গলায় আগ বাড়িয়ে বলল,
“আমাদের বিয়ের গেট ধরেছি।”
“কীহ!”
“আব না মানে আমাদের চাচ্চুর বিয়ের গেট ধরেছি ধূসর ভাই।”
ইকবাল ঠোঁট চেপে হাসি আটকাল। ধূসর কপালে ভাঁজ ফেলে সাদিফ আর পুষ্পকে বলল,
“এটা নাহয় ছোটো, কিন্তু তোরাও কি জ্ঞান-বুদ্ধি খেয়ে ফেলেছিস? চাচার বিয়ের গেট ধরে কে?”
সাদিফ চুপ। তবে পুষ্প মিনমিনিয়ে বলল,
“ভাইয়া তুমি আমাদের ডিমোটিভেট করো না। আমরা সবাই সেজো মার থেকে অনুমতি নিয়ে এসেছি। সেজো মাও আমাদের দলে আছে। এখন তুমি চাইলে ফিতা পেরিয়ে ভেতরে এসে দাঁড়াতে পারো। আমরা তোমাকেও ভাগ দেব। কী বলো সবাই?”
সবাই হ্যাঁ হ্যাঁ বলল। আর পিউ বিড়বিড় করল,
“আমি তো পুরো আমাকেই দিয়ে দেব।”
ধূসর কিছু বলার আগেই আনিসকে দুপাশ থেকে ধরে এনে জবা আর রুবা হাজির হলেন। রুবায়দা অবাক হয়ে বললেন,
“ওমা গেইট ধরেছিস তোরা? বেশ বেশ!”
আনিস মাথা চুলকালেন।
“ভাবি এখন কী হবে?”
জবা বললেন, “আমাকে বলে লাভ নেই, আমিও ওদের দলে।”
আনিসের হাতটা ছেড়ে টুপ করে ফিতা পেরিয়ে এপাশে ভিড়ে গেলেন তিনি। পুষ্পরা হইহই করে উঠল। আনিস রুবায়দার দিকে চাইলেন। ভদ্রমহিলা ঠোঁট চেপে হাসতে হাসতে নেমে গেলেন নিচে। ভদ্রলোক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“তোমাদের দাবি কত?”
রাদিফ আগে আগে বলল,
“পঞ্চাশ হাজার, পঞ্চাশ হাজার আমি জানি!”
ধূসর বলল,
“পঞ্চাশ হাজারে জিরো কটা?”
ওর মুখটা শুকিয়ে গেল অমনি। আঙুলের কর গুণে গুণে হিসাব করতে শুরু করল তৎক্ষনাৎ।
পুষ্প বলল,
“ভাইয়া ও না জানলেও আমরা তো জানি। তাহলে আমরা তো নিতেই পারি বলো!”
জবা বললেন,
“দেবরজি, তাড়াতাড়ি টাকা ছাড়ো। নাহলে কিন্তু বউয়ের কাছে যেতে পারবে না।”
ধূসর বলল,
“কেন পারবে না? চাচ্চু, চাচ্চুর বউয়ের কাছে যাবে, তাতে টাকা দেবে কেন?”
“উফ ধূসর, তুই কথা বলিস না! তুই বুঝিস কিছু?”
“ভাইয়া তোমার বিয়েতেও এভাবে গেট আটকাব। তখন ১ লাখ চাইব দাঁড়াও।”
এত বাগ্বিতণ্ডা আনিস দুই হাত তুলে থামালেন। বললেন,
“ক্যাশ নেই। কার্ড দিচ্ছি। যা মন চায় তুলে নিও।”
কার্ড জবার হাতে দিতেই সবাই হাততালি দিলো। কেচিটা ত্রস্ত এগিয়ে দিল সাদিফ। আনিস ফিতা কাটলেন, এরপর দুপাশ থেকে শান্তা ওরা ফুল ছেটাতে শুরু করল। পার্টি পপার ফাটাল রাদিফ। একেবারে সুমনার পাশে ওনাকে বসিয়ে দেওয়ার পর যেন ক্ষান্ত হলো সকলে।
ইকবালের ব্যাপারগুলো দারুণ লাগল। ফটাকসে বলে ফেলল,
“পিউপিউ আমার বিয়েতেও কিন্তু এভাবে গেট ধরবে হ্যাঁ?”
জবা বললেন,
“পিউকে পাবে কোথায়? তোমার বিয়েতে তো তোমার শালীরা গেট ধরবে ইকবাল!”
“পিউপিউ তো আমার শালীর মতোই আন্টি।”
“হ্যাঁ?”
সবাই তব্দা খেয়ে একযোগে চাইল ওর পানে। ভয়ে পুষ্প আর পিউ হাত চেপে ধরল দুজনের। ইকবাল থতমত খেয়ে বলল,
“ইয়ে মানে, আমার আসলে ঘুম পাচ্ছে তো। কিছু মনে করবেন না আন্টি। চোখ অনেক ঘুম, তাই ভুলভাল বকে দিয়েছি। ঘুমের ঘোরে তো বাচ্চারা কত কী-ই বলে!”
আর দাঁড়ানোর হিম্মত পেলো না ইকবাল। তাকালেই দেখবে পুষ্প আগুন চোখে ঝলসে দিচ্ছে হয়তো। তাই ধূসরকে নিয়েই হাঁটা ধরল তড়িৎ। পেছনে হুহা করে হেসে উঠল সবাই। ইকবাল দেখল ধূসরের চেহারা একইরকম। বলল,
“ তুই এত রেগে আছিস কেন? চাচা টাকা দিলে তোর কী?”
“ আমি তোকে কিছু বলেছি?”
“ আমি ভাবলাম বলবি। আসলে বিয়ের মজাই এগুলো। এখন ভাবছিস চাচা এত টাকা কেন খসালেন?
তুই তো ব্যাটা বাসর ঘরে ঢোকার জন্যে পুরো দুনিয়া খসিয়ে দিবি!”
(স্পয়লার যা নিয়ে দিয়েছিলাম সে অবধি আসতে পারিনি। পর্ব আরো বাকি আছে!)
চলবে… See less
Share On:
TAGS: আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন, নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২৮(ক+খ)
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৯
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২৬
-
হেই সুইটহার্ট পর্ব ৩
-
আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন পর্ব ৫
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৪ খ
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৯
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮৯
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫৯(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬৭