#আলতো_ছোঁয়ায়_সমুদ্রকথন__(০৯)
#নুসরাত_সুলতানা_সেঁজুতি
ভোর সাতটা। শীত বলে কুয়াশা চারিদিক। রওনকদের ফ্ল্যাটে এই সময়েও কেউ ঘুমোয় না। মারিয়া মায়ের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে নাস্তা বানিয়ে দেয়। মা রুটি ভাজেন,ও বেলে দেয়। রওনক কাজে বের হয় দ্রুত। আজকেও তার বেশ তাড়া আছে। সেজন্যে নাস্তার রুটি অর্ধেকই পড়ে রইল প্লেটে। প্রয়োজনের চেয়েও তাড়াতাড়ি বের হলো সে। ওর সাথে সব সময় চলাফেরার মতো ৫-৬ জন ছেলেপেলে থাকে। এদের ভোট নিয়ে রওনক আশ্বস্ত। এরা ওকেই ভোট দেবে,আবার পুরো দু মাস প্রচারণায় সাথেও থাকবে ওর। আপাতত রওনক যাচ্ছে ভিন্ন উদ্দেশ্যে। পার্টি অফিসের সকল কর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাইতে হবে। নির্বাচন বেশি দূরে নয়। দু মাস সময়ের দেড় সপ্তাহ শেষ । এখন ওকে সব ভাবে সক্রিয় থাকতে হবে। ধূসরকে ও হারাবেই। এদিকে ভাইয়ের নাস্তার প্লেটে খাবার পড়ে থাকতে দেখে ফোস করে শ্বাস ফেলল মারিয়া। ও জানে, কেন এই তাড়াহুড়ো। সবই সংসার চালানোর তাগিদ। মানুষটার মাথায় কত প্রেশার মারিয়া বোঝে। আর এই চাপ একটুখানি ও যে ভাগ করে নেবে,সেই যোগ্যতাটাও ওর হলো না। ইন্টারভিউ দিয়ে আসার আজ প্রায় দুই সপ্তাহ চলছে। ওরা বলেছিল, তিন দিনের মধ্যে জানাবে। অথচ এখনো কোনো মেইল এলো না,কল এলো না। চাকরিটা হলো না তাহলে!
মারিয়ার বুকটা ব্যথায় চৌচির হয়ে যায়। চোখ ডুবে আসে জলে। রওনক ভাঙাচোরা, পুরোনো বাইকটা নিয়ে ফ্ল্যাটের চত্বর ছাড়তেই ফের তড়িঘড়ি করে তৈরি হতে ছুটল সে।
একটা চাকরি হয়নি তো কী হয়েছে? আবার চাকরি খুঁজবে। দরকার পড়লে প্রত্যেকটা অফিস ভবনের দ্বারে দ্বারে ঘুরবে মারিয়া। চাকরি ও নেবেই। মেয়েকে চোখ মুছতে মুছতে চুল বাঁধতে দেখে মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
কিন্তু মানা করার শক্তি পেলেন না। মারিয়াটা চাকরি করুক উনি চান। মানা করলেও অবশ্য মেয়ে শুনবে না। মারিয়া পণ করেছে,নিজে ইনকাম করে ওর ভাইকে আবার ডিগ্রীতে ভর্তি করবে। ভাইয়াকে নতুন উদ্যমে পড়াশোনা করাবে। এই লক্ষ্যে মা যদি পাশে না দাঁড়ায়,চলে কখনো?
একটা ফাঁকা রাস্তায় মোট তিনখানা বাইক শো শো বাতাসের সাথে চলছিল। প্রত্যেকটায় দুজন করে বসা। তবে দুপাশের চকচকে বাইকগুলোর মাঝে জং ধরা,রংচটা বাহনই রওনকের । কিনেওছিল সেকেন্ড হ্যান্ড। এইত, প্রায় পাঁচ বছর চালাচ্ছে। এখনো যে ইঞ্জিন চালু হয় এই অনেক!
ভো ভো শব্দ তুলে রওনক যখন ওলি-গলি পাড় হচ্ছিল, হঠাৎ চোখ পড়ল সোহরাবের বাবার দোকানের দিকে। সোহরাবও পার্টি অফিসের লোক। ওদের দলের সাথেই থাকে বেশি। এই মিখাইল,নামাল, সোহরাব সব একই রসুনের কোয়া বলা চলে। ছেলেটার বাবা বড়োসড়ো মুদির দোকান দেন। কিন্তু আজ সেই পরিচিত দোকানের এক ভয়ানক অবস্থা দেখে রওনক ভারি আশ্চর্য হয়ে গেল। চট করে ব্রেক কষল সে। হতবাক হয়ে বলল,
“ দোকানে আগুন লাগল কী করে?”
মিখাইল রওনকের পেছনে বসে ছিল। বলল,
“ ওহো ভুলেই গেছিলাম। আগুন কাল রাতে লেগেছে। সোহরাব তো ফোনও করেছিল আমাকে।”
নামাল জানাল,” আমাকেও করেছিল। সকালে দেখেছি।”
রওনক তাজ্জব হয়,ত্রস্ত পকেট হাতিয়ে ফোন বের করে। বাইশটা মিসড কল উঠে আছে! ও চ সূচক শব্দ করল। ফোনের ডি-এনডি মোড চালু হয়ে ছিল। তাই কিছু টের পায়নি।
ও নামল দ্রুত বেগে। চারপাশে চেয়ে সোহরাবকে খুঁজল। দোকানের টিন,ছাদ সব পুড়ে একশা। কেবল আধপোড়া খুঁটি গুলো দাঁড়িয়ে আছে এখনো। কালো ধোঁয়া আকাশ ছুঁয়ে যাচ্ছে। পরনে সাদা পাঞ্জাবি ,মাথায় টুপি নিয়ে সোহরাবের বাবা মলিন মুখে টুলে বসে আছেন। মায়ের পরনে বোরখা। হঠাৎ তার মাঝে আরিফদের দেখা গেল। দোকানের পেছন থেকে লাইন ধরে ধরে সামনের দিকে আসছে ওরা। হাতে কিছু না কিছু বইছে। হয় লাকড়ি,নাহয় টিন,নাহয় ভাঙাচোরা জিনিসপত্র। রওনক চমকে উঠল সেই ভিড়ে ধূসরকে দেখে। সব সময় পরিপাটি ছেলেটার পরনে কোনোরকম একটা সাদা ক্রিউ নেকের গেঞ্জি,ট্রাউজার নিচে। পায়ে বাসায় পরা জুতো। হাতঘড়িটা অবধি নেই। ক্লান্ত মুখ,এলোমেলো চুল। এক কাঁধের ওপর ভাঁজ করা টিন। সেটা ঝুপ করে ফেলল দোকানের সামনের উঠোনে। হাত নেড়ে সোহেলকে কিছু বলতে বলতে কনুই ভাঁজ করে ঘাম মুছল কপালের।
রওনক থমকে বলল
“ ও এলো কখন?”
পাশ থেকে একটা প্রফুল্ল স্বর শোনা গেল,
“ রাতে এসেছে।”
রওনক পাশ ফিরল চকিতে। ইকবালকে দেখেই মিখাইল ওরা তটস্থ হয়ে সালাম দিলো। সালামের উত্তর করল ইকবাল। রওনককে হাসিমুখে বলল,
“ ভালো আছো? আমিও ভালো আছি।”
তারপর পাশ কাটিয়ে চলে গেল ওদিকটায়। হাতে কিছু খাবার-দাবার।
রওনকের মাথায় ঢুকল না এসব। ধূসর এখানে রাতে এলো কী করে? বাকিরাই বা এলো কখন? অদূরে সোহরাবের দেখা পেলো তখন। গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি,লুঙ্গি পরনে। বোঝাই যাচ্ছে ধকল গিয়েছে অনেক। ওকে দেখেই হাত তুলে ডাকল রওনক। ছেলেটা শশব্যস্ত এগিয়ে এলো। নীরস চেহারায় বলল,
“ আসসালামু আলাইকুম ভাই!”
“ ওয়ালাইকুমুস সালাম, কী রে,এসব কখন হলো?”
সোহরাবের মুখটা আরো বিষণ্ণ দেখায়,
“ রাত তিনটার দিকে। কারেন্টের তার দিয়া লাগছে।”
“ অত রাতে!”
“ হ। কী যে একটা অবস্থা হইছিল। আব্বা বুড়া মানুষ, দোকানে ঘুমায়। আটকা পইড়া গেছিল। আমি একলা ভয়ে কী করমু কিচ্ছু বুঝতাছিলাম না। আপনাগো যার যার নম্বর ছিল সবাইরে কল দিছি, কিন্তু কেউ উঠায় নাই। অনেকে তো কল ধইরাও উলটা আমারে ধমকায়। কয়,বিরক্ত না কইরা ঘুমাইতে দে।”
বলতে বলতে মিখাইলের দিকে অভিমানি চোখদুটো ফেলল ও। ছেলেটা মাথা নিচু করে মিনমিন করল,
“ আমি আসলে একটু খেয়েছিলাম কাল। তাই হুশ ছিল না।”
সোহরাব উলটো হাত দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলল
“ ইকবাল ভাইরেও কল দিসি। নাম্বার ব্যস্ত!
পরে দিকদিশা না পাইয়া ধূসর ভাইরে কল দিছি। আর জানেন ভাই,ধূসর ভাই ভাত ফালাইয়া আসছে। হাতটাও ধোয়নাই। পায়ে জুতা আনেনাই। ও অবস্থায় আইছে। এরপর ইকবাল ভাই আইল, তারা মিইলা বাইর করল আব্বারে। এরপর আস্তে ধীরে আরিফরা আইল। দোকানে পানি মারল,দোকানের জিনিসপত্র সরাইল। দেখেন, এখনো কাম করতেছে। আব্বারে কিছু করতেই দেয়নাই। বাড়ি পাঠাই দিসিল, আব্বা সকালে আবার আসছে। ধূসর ভাই আসলেই একটা জিনিস! ভালো জিনিস।”
রওনক সব শুনলেও,শেষ কথায় কিছু বিরক্ত হলো। পেছনের ওদের বলল,
“ তোরা হাঁ করে দেখছিস কী? যা ওদের সাথে কাজে হাত লাগা।”
হুকুম পেতেই ওরা বাইক রেখে ছুটল সেদিকে।
রওনক সোহরাবের কাঁধে হাত রেখে বলল,
“ শোন কষ্ট পাস না। আমি আসলে ফোন সাইলেন্ট থাকায় টের পাইনি।
তুই এক কাজ কর,কিছু টাকা রাখ, দোকানে ছোটোখাটো যা লাগে কিনে নিস!”
রওনক মানিব্যাগে হাত দিতে গেলে সোহরাব থামাল,
“ ভাই লাগবে না। দোকানে যা যা লাগব ধূসর ভাইরা কিইনা দিছে। যা লাগব না তাও দিছে, সব পিছে রাখা। আগে মেরামত হইব,তারপর লাগামু ওসব। আসেন আপনারে দেখাই।”
সোহরাব চলে গেল। তবে স্তম্ভের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল রওনক।
ছেলেটা ভীষণ ভক্ত ছিল ওর। সেই ছেলে আজ ৫ মিনিটে ধূসরের প্রতি পাঁচশো বার গদগদ ভাব প্রকাশ করেছে। এমন তো হওয়ার কথা ছিল না।
বৃহস্পতিবার বিকেল….
পুষ্প ছটফট করে দোতলায় হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে আবার ঘাম মুছছে মুখের। ওরনা দিয়ে নিজেকে বাতাস করতে করতে ঝাঁকাতে এ মাথা থেকে ও মাথা পায়চারি করছে । চিন্তায় ওর চেহারা প্রায় শুকিয়ে যাওয়ার জোগাড়।
এই কিছুক্ষণ আগে বাড়ির সামনে এক ডেলিভারি ম্যান এসেছেন। কল দিয়েছেন পুষ্পর নম্বরে। পার্সেল এসেছে নাকি! কিন্তু পুষ্পর কিছু অর্ডার ছিল না। ঢেড় বুঝেছে,এটা ইকবালের কাণ্ড। কিন্তু, ও পারছে না গিয়ে নিয়ে আসতে। আব্বু শুক্রবার ছাড়া বাসায় থাকেন না। কিন্তু আজকে আছেন। ব্যবসার জন্যে দুজন ভদ্রলোক দাওয়াত পেয়েছেন বাড়িতে। সেজন্যে চাচ্চু,আব্বু কেউ অফিসে যাননি। বসার ঘরে তাদের কথাবার্তা চলছে। সাথে আছে সাদিফও। পুষ্প সবার সামনে থেকে যেতে পারছে না।
পিউকে বাড়িতে যতটা ছাড় দেয়া হয়,ওকে মিনা বেগম ততটাই গার্ড দিয়ে রাখেন। কলেজ আর কোচিং বাদে পুষ্পকে বাইরে যেতে দেয়া হয় না। কিছু লাগলে মায়েদের কেউ না কেউ সাথে যান। পুষ্প এখন কী বলে পার্সেলটা আনবে?
আর আনতে গেলেই বাবা যদি বলেন,ওতে কী আছে? যদি মা খুলে দেখতে চান?
পুষ্পর মন চাইছে ইকবালের মোটা মাথাটা মবিলে চুবিয়ে দিতে। ঢং করে গিফট বাসায় কেন দিতে হবে? রোজই তো দেখা হয়,তখন দিতে পারল না? রাতভর যে ফোনে পকপক করে,তখন বলতে পারল না? তাহলে অন্তত পুষ্প সতর্ক থাকতো। রাদিফকে চকলেট-টকলেট খাইয়ে ওটা নিয়ে আসতে পারতো। কিন্তু এখন? এখন কী হবে!
পিউয়ের আজ কোচিং এর শেষ দিন। সামনের রবিবার থেকে পরীক্ষা শুরু। ক্লান্ত চিত্তে ও যখন বাড়ি ফিরল, দেখল গেইটের বাইরে ডেলিভারি ম্যান সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। লাগাতার কল দিচ্ছেন কাউকে। ও এগিয়ে এসে বলল,
“ কার পার্সেল?”
“ আপনি কি পুষ্প?”
“ না,উনি আমার আপু। কল ধরছে না? “
“ জি না।”
পিউ কী যেন ভাবল। জিজ্ঞেস করল,
“ কত টাকা হয়েছে?”
“ পেইড পার্সেল ম্যাম?”
“ ওহ, তাহলে আমাকে দিন। আমি নিয়ে যাচ্ছি।”
“ ওটিপি দরকার যে।”
“ আমি ভেতরে গিয়ে কল ব্যাক করে জানাব।”
“ ওহ,অনেক ধন্যবাদ ম্যাম!’’
পিউ পার্সেল নিয়ে কেচি গেইট দিয়ে ভেতরে এলো। দারোয়ানকে বলল,
“ লোকটা কতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে ছিল! পার্সেলটা আপনি নিলেই তো পারতেন,কাকা। ”
“আমারে কিছু কয়নাই। আমি ক্যামনে বুঝমু? আর তোমরা তো খালি মাডার করতেই থাকো। ভাবছি আইসা নিবা।”
পিউ হেসে মাথা নাড়ল দুপাশে। ঝকঝকে সিমেন্টের উঠোনে হাঁটতে হাঁটতে পার্সেলে নজর বোলাল। বড়ো বড়ো চোখজোড়া গুছিয়ে গেল অমনি। পার্সেল কারো তরফ থেকে ব্যক্তিগত ভাবে পাঠানো হয়েছে। কোনো পেজ থেকে আসলে প্যাকেজিং এরকম হয় না। আবার
প্রেরকের নম্বর আছে,কিন্তু নাম ধাম নেই।
পিউয়ের মাথা ছোট্ট হলেও,মনে বিরাট সন্দেহের উদয় হলো অমনি। নিজে প্রেমে পড়ার পর থেকেই খুব করে মনে হচ্ছে দুনিয়ার সবাই প্রেম করছে এখন। ও ত্রস্ত হাতে প্যাকেট ছিঁড়ে ফেলল। একটা কালো শাড়ি, সাথে একটা অর্নামেন্টসের বাক্স। সেই সঙ্গে একটা ছোট চিরকুট! পিউ দোটানায় পড়ল। অন্যের চিঠি পড়া ঠিক হবে? পরপর ভাবল,না পড়া উচিত। আপু কোন পুকুরে ডুব দিয়েছে ওকে জানতে হবে না? পুকুরে যদি ভালো ঘাট না থাকে,পচা পানি হয় তখন? তাই চিরকুট মেলল পিউ। লেখা,
“ মাই লাভ,
তোমার শাশুড়ী কাল জোর করে আমায় যমুনায় নিয়ে গেছিল। বাবা ব্যস্ত থাকেন তো,তাই!
মা যখন শাড়ি কিনছিল,আমার চোখ পড়ল এটাতে। আর একবার দেখেই মনে হলো, এই শাড়ি শপিংমলে উঠেছে কেবল আমার মাই লাভের জন্যে। লুকিয়ে কিনলাম,একটা ছুঁতোয় বাইরে বেরিয়ে কুরিয়ার করে দিলাম। তারপর থেকে এই শাড়িতে কেবল তোমাকেই ভাবছি। তোমার খোলা চুল,পরনে শাড়ি,দুহাত ভরা থাকবে সোনালী রঙের কাচের চুড়িতে। সেজেগুজে আমায় সুন্দর কিছু ছবি দেবে সোনাপাখি? যাতে এই অধমের তোমাকে দেখেই দ্বিতীয় বারের জন্যে কয়েকটা হার্ট মিস হয়!
ইতি,
তৃষ্ণায় মরে যাওয়া এক কাতর যুবক!”
পিউ চিঠি পড়ে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল। দুই ঠোঁট হাঁ করে চেয়ে রইল আকাশের দিকে। ওরে রে.. আপু সত্যি সত্যিই প্রেম করছে? অমন গোবেচারা,শান্ত, সারাদিন পড়াশোনা করা,আম্মুর ভালো-লক্ষ্মী মেয়েটা আবার কার প্রেমে পড়ল? ছেলেটা কথা তো কবিতার মতো বলে। মনে কী প্রেম! শাড়ি পরা ছবি চাই।
পিউ শুনেছে, দুষ্টু লোকের মিষ্টি কথা। এখন ওকে জানতে হবে,কোন দুষ্টু ওর বোনের গলায় ঝুলতে চাইছে।
আদরের মেয়েকে বাড়ি ঢুকতে দেখেই আমজাদ হাতের চা রাখলেন টেবিলে। ওর দিকে বাহু বাড়িয়ে বললেন,
“ পিউ মা,এসেছো তুমি?”
পিউ একটু বিব্রত হয়ে পড়ল,হঠাৎ বসার ঘরে এমন অচেনা লোক দেখে। ওর পরনে একটা সুতির হাঁটু সমান টপ,ওপরে নেটের কোটি,নিচে একটা ডিভাইডেড জিন্স। পুষ্প যেমন সব সময় বাড়িতে চুরিদার পরে ঘোরে, এখন অবধি সেভাবে চুরিদার ধরেনি মেয়েটা।
রয়েসয়ে বলল,
“ আসসালামু আলাইকুম।”
আমজাদ মেয়েকে কাছে নিয়ে পরিচয় করিয়ে দেন,
“ আমার ছোটো মেয়ে প্রহর্ষা!”
ভদ্রলোকদের একজন বললেন,
“ মাশ আল্লাহ, ভারি মিষ্টি! ”
“ এইবার এস এস সি দেবে। দোয়া করবেন!”
“ নিশ্চয়ই, যাও মা তুমি গিয়ে বিশ্রাম নাও।”
পিউ মাথা নাড়ল। আমজাদ বললেন,
“ চোখমুখ শুকিয়ে গেছে। ছাতা নাও না কেন আম্মু?”
“ আব্বু নিয়েছিলাম। বাইরে রোদ নেই।”
“ আচ্ছা যাও।”
পিউ ওপরের পথ ধরল। দ্বিতীয় ভদ্রলোক বললেন,
“ আপনার দুই মেয়েই ভীষণ সুন্দরী দেখছি!”
আমজাদ হেসে বললেন,
“ হ্যাঁ, বড়ো মেয়ে ওর মায়ের মতো হয়েছে। আর.. “
আফতাব স্ফূর্ত চিত্তে জানালেন,
“ আর পিউ হয়েছে আমাদের আম্মার মতো। একদম সেই চোখ,নাক সব আম্মার। আম্মাও এমন ছোটোখাটো ছিলেন। আমরা আব্বার মতো লম্বা হয়েছি সবাই! তাই না ভাইজান?”
আমজাদ হাসলেন। বাকিরাও হাসল বলে,
উশখুশ করতে করতেও হাসল সাদিফ।
ওর আর এখানে বসতে ইচ্ছে করছে না। ঘুম পাচ্ছে। কাল রাত জেগে ক্রিকেট ম্যাচ দেখেছে। তারপর আর ঘুমায়নি। কিন্তু আমজাদ যেভাবে ডেকে এনে বসিয়েছেন, এখন আর উঠে যাওয়ার সাহস হচ্ছে না। মাথা নুইয়ে বসে রইল। পকেটে ফোন ভাইব্রেট হলেও বার করল না। মুরুব্বিদের সামনে ফোন ধরবে, পারবে সাদিফ? এটাই তো ওর শিষ্টাচার!
এর মাঝে জবা বেগম মাথায় আঁচল টেনে চা দিয়ে গেলেন। বাকি দুই গিন্নী রাতের রান্না নিয়ে ব্যস্ত। লোক দুজন খেয়েদেয়ে যাবেন। সাদিফ চা নিজে না নিয়ে আগে বাকিদের দিলো। আমজাদ ভীষণ মুগ্ধ হয়ে গেলেন। ছেলেটা এত ভদ্র! পরপরই দীর্ঘশ্বাস ফেললেন আরেক ছেলের কথা ভেবে।
সম্মুখের ভদ্রলোক তক্ষুনি বললেন,
“ আফতাব ভাই,আপনার ছেলে শুনলাম দেশে ফিরেছে,কোথায়, বাড়িতে নেই?”
ব্যস, আফতাবের হাসিহাসি মুখটা অমনি কালো হয়ে গেল। বিরস চোখে বড়ো ভাইয়ের দিকে চাইলেন। আমতাআমতা করে বললেন,
“ আসলে ওর এক বন্ধুর আম্মা হার্ট অ্যাটাক করেছেন। কাল রাত থেকে ও সেখানেই,মানে হাসপাতালে আরকি!”
“ বাহ বাহ, এতো ভালো কথা। ছেলে তো আপনার তাহলে খুব পরোপকারী। আজকালকার যুগে এরকম দেখা যায় নাকি! তা এখন কী করছে এমনিতে?”
আমজাদ গলা ঝেরে বললেন,
“ মাত্রই তো কদিন হয়েছে ফিরল। গ্রাজুয়েশন করেছে,করবে কিছু একটা।”
“ আফতাব ভাইয়ের কাছে ছেলের যা প্রশংসা শুনেছি। খুব ব্রিলিয়ান্ট নাকি! ব্যবসা ধরলে আপনাদের আর ফিরে তাকাতে হবে না কিন্তু ভাইসাহেব।”
আমজাদের বুক ফেটে দুইভাগ হয়ে গেল। এক ভাগ চ্যাঁচাল দুঃখে,কষ্টে,আফসোসে। আরেক ভাগ রেগে রেগে বলল,
বজ্জাত ছেলে তো তার ব্যবসায় আসবে না। সে সাপের পাঁচ পা দেখেছে,তাই এখন রাজনীতি করবে। আর আজকেও এই জন্যে আমজাদের সব ক্ষোভ বর্তাল ইকবালের ওপর। ওর ভোলাভালা হাসিমুখটা মনে পড়তেই দাঁত খিচলেন তিনি। ওই কুলাঙ্গার ছেলেই যত নষ্টের গোড়া। সারাক্ষণ দাঁত মেলে হাসে। ফের বাড়ি আসুক, চড়িয়ে ওই দাঁত ফেলে দেবেন তিনি।
পিউকে দেখতেই পুষ্প দাঁড়িয়ে গেল। ঠোঁটে মিছিমিছি হাসি টেনে বলল,
“ এ-এসেছিস?”
তারপর ভয়ে ভয়ে সদরের দিকে দেখল এক পল। বাইরে ডেলিভারি ম্যানকে কি পিউ দেখেনি নাকি! নাকি লোকটা ফেরত চলে গেল?
পিউ বলল,
“ তুই এখানে পায়চারি করছিস কেন?”
“ পায়চারি করব কেন? হাঁ-হাঁটছিলাম ব্যায়াম করছিলাম!”
পুষ্প হাত -পা ছুড়ে ব্যায়াম করা দেখাল। পিউ ঠোঁট চেপে হাসি আটকায়। পাশ কাটিয়ে হাঁটা ধরতেই পুষ্প কী ভেবে ওর পেছন পেছনে এলো।
বড্ড উদ্বেগ নিয়ে বলল,
“ পিউ, আমার একটা কাজ করে দিবি?”
“ কী পাব তাহলে?”
“ ২০০ টাকা দেবো।”
“ আমার কাছে ৫০০ টাকা আছে।”
পুষ্প চুপসে গিয়ে বলল,
“ তাহলে আরো ৫০০ দেবো। ১০০০ হয়ে যাবে। করে দিবি প্লিজ?”
কাঁধব্যাগ নামিয়ে রেখে ঘুরে চাইল পিউ। পুষ্প বলল,
“ বাইরে আমার একটা পার্সেল এসছে। এনে দিবি? আ- আসলে নিচে এত লোক! আমার তো বাইরের লোকের সামনে খুব লজ্জা লাগে। নাহলে আমিই যেতাম।”
পিউ হাত পাতল।
“ আচ্ছা, টাকা দে।”
হতাশ শ্বাস ফেলে পুষ্প নিজের ঘরে গেল। ফিরে এলো টাকা নিয়ে। হাতে দিতেই পিউ ঝুপ করে শুয়ে পড়ল খাটে। পুষ্প ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ আবার শুলি কেন? যা না। লোকটা চলে যাবে তো!”
পিউ হাত বাড়িয়ে ব্যাগ টেনে কোলের ওপর আনল। ভেতর থেকে পার্সেলের প্যাকেট দুটো বার করতেই শ্বাস আটকে গেল পুষ্পর। শাড়ি বেরিয়ে আছে। যখনই পিউ চিরকুট বের করল,পুষ্পর মাথা চক্কর কাটল দুপাশে।
পিউ চিরকুট মেলে জোরে জোরে বলল,
“ মাই লাভ,
কা…”
পুষ্প ধড়ফড় করে ওর মুখ চেপে ধরল। চাপা কণ্ঠে আর্তনাদ করল,
“ আম্মু শুনবে, আম্মু শুনবে।”
পিউ চোখের ইশারায় মুখ ছাড়তে বোঝাল। সরে গেল পুষ্প। অপরাধীর মতো মাথা নুইয়ে বলল,
“ আম্মুকে কিছু বলিস না,প্লিজ! লক্ষ্মী বোন আমার!”
“ হাহাহাহাহহা,এখন লক্ষ্মী বোন তাই না? কাল তোর টপ পরাতে আমাকে বেয়াদব বললি না?”
“ ভালোবেসে বলেছিলাম।”
“ আমিও আম্মুকে ভালোবেসে বলে দেবো।”
বলতে বলতে চিরকুট ভাঁজ করে জিন্সের পকেটে রাখল পিউ।
পুষ্প আঁতকে বলল,
“ না না প্রিয় বোন,সোনা বোনএরকম করিস না প্লিজ! দ্যাখ আমি তোকে কত ভালোবাসি। কত আদর করি। আজ থেকে আমার সব তোর। আমার জামা-জুতো মেক আপ যা ইচ্ছে তুই লাগাস।”
পিউ বালিশে হাত রেখে,তারওপর মাথা কাত করে চোখ বুজে হাসছিল। পুষ্প হড়বড় করতে করতে বলল,
“ পিউ প্লিজ বলিস না কাউকে। তোর যা লাগবে আমি দেবো। আমার পকেটমানিও তোকে দেব। দ্যাখ এত ভালোবাসার এই দাম দেয়া কি ঠিক হবে? ইকবালও তো তোকে কত ভালোবাসে!”
চটক কাটার ন্যায় চোখ মেলল পিউ।
তড়াক করে বসে বলল,
“ ইকবাল ভাই? এর মানে তুই ইকবাল ভাইয়ার সাথে প্রেম করছিস আপু?”
পুষ্প দাঁতের তলায় জিভ পিষে বাকরুদ্ধের মতো চেয়ে রইল কিছু পল।
কথায় কথায় মুখ ফস্কে ইকবালের নাম বেরিয়ে গেছিল। শেষে চিবুক নুইয়ে ঘাড় নাড়ল একবার।
পিউয়ের চেহারায় চাঁদ ভেসে উঠল সহসা। উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,
“ গুড চয়েস আপু,ভেরি গুড চয়েস। ইকবাল ভাই আমার দুলাভাই হবে,ও মাই গড!”
পুষ্প হাঁসফাঁস করে বলল,
“ আস্তে আস্তে…”
“ সরি সরি। আপু কবে থেকে এসব? তুই আগে পছন্দ করলি নাকি ভাইয়া?”
“ সব বলব। আগে কথা দে,কাউকে বলবি না।”
পিউ মুচকি হেসে বলল,
“ এই চিনলি আমায়? বলব না রে বাবা। আমিতো তোকে ভয় দেখাচ্ছিলাম।”
পুষ্পর বুকে পানি এলো । খুশিতে বুকে টানল বোনকে।
পিউ ব্যস্ত হয়ে বলল,
“ শাড়িটা তো দ্যাখ। আর এই তোর চিঠি। আমি তো আন্দাজও করিনি এটা ইকবাল ভাই হবেন। কী সুন্দর করে একেকটা কথা লিখেছেন পড়। ওনার মতো এত রোমান্টিক মানুষ,ধূসর ভাইয়ের মতো নিরামিষের বন্ধু যে কী করে হলো!”
পুষ্প চিরকুটে মন দিয়েছিল। কপাল কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“ ধূসর ভাই নিরামিষ! মানে?”
পিউ থতমত খেয়ে বলল,
“ না মানে,আমার তো মনে হয় না ধূসর ভাই কখনো এসব কথা বলতে পারবেন। ওনাকে দেখে বোঝা যায় বল? সারাদিন কেমন মুখ গোমড়া করে থাকেন। কপাল কুঁচকে হাঁটেন।”
“ তুই না,বোকাই রয়ে গেলি। ধূসর ভাই একটু গম্ভীর,কিন্তু আড়ালে হয়ত অনেক রোমান্টিক! সেটা তো আর আমরা বুঝব না,বুঝবে ওনার গার্লফ্রেন্ড। উনিও নিশ্চয়ই ওনার গার্লফ্রেন্ডকে সুন্দর সুন্দর কাব্যিক কথা শোনান।”
পিউ আঁতকে বলল,
“ গার্লফ্রেন্ড! ওনার গার্লফ্রেন্ড আছে আপু?”
“ নট শিয়র। এতদিন বিদেশে ছিলেন,থাকা স্বাভাবিক।”
পিউয়ের এতক্ষণের স্ফূর্ত আননে এক ঝটকা আমবস্যা নেমে এলো অমনি।
“ সত্যিইত, ওদের ক্লাসের পুচকে পুচকে ছেলেপেলে প্রেম করছে যেখানে, সেখানে ধূসর ভাইয়ের মতো মানুষের গার্লফ্রেন্ড থাকবে না?
তবে কি এজন্যেই পিউয়ের প্রতি ধূসর ভাইয়ের কোনো আগ্রহ নেই? এজন্যেই কি মানুষটা পাত্তা দেয় না ওকে?”
পুষ্প গা ধরে ঝাঁকাল,
“ কী রে, তোর আবার কী হলো?”
পিউ ঠোঁট টেনেটুনে হাসল।
“ কিছু না।”
“ ইকবাল ছবি চেয়েছে৷ কিন্তু শাড়ি দেখে আম্মু যদি বুঝে যায়! ও হ্যাঁ, এক কাজ করব দুদিন পর সাদিফ ভাইয়ার জন্মদিন না? তখন তো শপিং এ যাব। বলব ওই সময় কিনেছি।”
“ তাহলে ছবি?”
পুষ্প রহস্য করে হাসল।
“ জন্মদিনে তো ইকবালও আসবে। তখন চমকে দেব ওকে।”
পিউ নিষ্প্রভ চোখে বলল,
“ আচ্ছা। আমি যাই, পড়তে বসব।”
চেয়ার টেনে বসে, বই মেলে গুণগুণ করে পড়তে নিল পিউ। বুকখানা হুহু করছিল তাও। ধূসর ভাইয়ের জীবনে কি সত্যিই কেউ আছে? কীভাবে জানবে ও? কার কাছে শুনবে?
****
ইকবাল মনমরা হয়ে পাঞ্জাবির পকেটে ফোন ভরে রাখল। মাই লাভ ম্যাসেজ দিয়ে ওকে আচ্ছা মতো ঝেরেছে। কেন বাড়িতে পার্সেল পাঠালো! আরে বাবা ওর কী দোষ? ভাবল,সারপ্রাইজ করবে। আর ও কী জানতো নাকি আজকেই ওর হিটলার বাপ বাড়ি বসে ডিম পাড়বে? ব্যাটা তো শুক্রবার ছাড়া বাড়ি থাকার কথা না। ধুর!
ইকবাল দাঁড়িয়ে ছিল হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকের সামনে। একটু পরেই সেখান থেকে বেরিয়ে এলো ধূসর। কনুইয়ের এ পাশটায় গজ চেপে ধরা৷ ওকে দেখেই ইকবাল ব্যস্ত গলায় বলল,
“ কী রে, মাথা টাথা ঘুরছে?”
“ না, অভ্যেস আছে।”
“ কিন্তু তোর ব্লাড ডোনেটের দরকার ছিল না। দলে কত ছেলেপেলে আছে!”
“ ঝামেলা নেই।”
আরিফ হাই তুলতে তুলতে বলল,
“ বিকাল হইলেই আমার এত্ত ঘুমে ধরে। যাক গা, ধূসর ভাইরে কইছিলাম রক্ত আমি দিই। আমারো একই গ্রুপ। ভাই আপনার রক্ত হইল স্বর্ণের মতো দামি। এই রক্ত সামলাই রাখা লাগবে না?”
ইকবাল কনুই দিয়ে মূহুর্তে ওর ঘাড় ঠেসে নুইয়ে ফেলল। বলল,
“ শালা পাম দেয়া তো ভালোই শিখছস। আমাকে তো এত বছরেও এসব বললি না!”
আরিফ ক্যাকু আওয়াজ করে বলল,
“ ভাই ছাড়েন,ব্যথা লাগে!”
সোহেল ধূসরকে বলল,
“ চল, তোকে কিছু পুষ্টিকর খাবার খেতে দিই।”
ধূসর পা বাড়ায়। সামনে হাঁটে। বলে,
“ লাগবে না, আমার অভ্যেস আছে বললাম তো। এরকম ব্লাড ডোনেট আমি এর আগেও করেছি।”
ইকবাল বলল,
“ হ্যাঁ দয়াল বাবা,আপনি হলেন দাতা কর্ণ,আপনার অভ্যেস থাকবে না? শরীর আপনার, চিন্তা আমার। আপনার কিছু হলে আপনার হিটলার চাচা এসে আমাকে বোমা মেরে ওড়াবে। আপনার তাতে কী?”
সোহেল বলল,
“ শুধু কি শরীর? ওর তো নিজের কিছু নিয়েই কোনো চিন্তা নেই। এই যে ভোট আসছে, তার চিন্তাও আমাদের। রওনক প্রতিদিন মিখাইলদের নিয়ে কর্মীদের বাড়ি বাড়ি ভোট চেয়ে আসছে। বাইকও বেচেছে গত মাসে। কত টাকা খসাচ্ছে ভাব। আর ইনি,ইনি কতক্ষন ডানে ছুটছেন কতক্ষণ বায়ে। ওকে গিয়ে
কাউকে এখন অবধি বলতে শুনলাম না,ভাই আমাকে ভোটটা দিস।”
ধূসর আগে আগে গিয়ে গাড়িতে উঠে বসল। একটা কথারও কোনো উত্তর না পেয়ে হতাশ হলো ওরা। উঠল ওর সাথেই। পার্টি অফিসের চত্বরে এসে থামল সে গাড়ি। ইকবালকে বের হতে দেখেই দারোয়ান কোনোরকম হাত তুলে সালাম ঠুকলেন একটা। ধুসর গাড়ি থেকে বের হয়ে বলল,
“ আপনার নাতি কেমন আছে?”
অমনি অবাক চোখে চাইলেন ভদ্রলোক। ও বলল,
“ বললেন না টাইফয়েড? ডাক্তার দেখাবেন? দেখিয়েছেন?”
ভদ্রলোক বিস্ময় নিয়ে বললেন,
“ আপনার মনে আছে?”
“ আছে।
“ ভালো, ভালো আছে আলহামদুলিল্লাহ।”
ধূসর ডিকি খুলতে এগোয়। আরিফ থামাল। বুক ফুলিয়ে বলল,
“ ভাই,মাত্র সুই দিলো আপনারে। আপনি আমারে কন। কী লাগব?”
“ একটা ক্যারেট আছে। বের করো।”
আরিফ ডিকি তুলে দেখল ক্যারেটটা ফল দিয়ে ভরা। দুইহাতে ধরে নিচে নামাতেই ধূসর বলল,
“ এখানে কিছু ফ্রুটস আছে। আপনার নাতিকে দেবেন।”
দারোয়ান তখনো হাঁ করে রইলেন। তার দুচোখ ছাপানো অবিশ্বাস দেখে দুদিকে মাথা নেড়ে হাসল ইকবাল।
ধূসরের সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
“ ছুটি আমার কাছ থেকে নিলো, আমি ভুলে গেছি। অথচ তোর মাথায় আছে?”
তারপর মনে মনে ভাবল,
“ অবশ্য ভুলে যাব না? এক সুন্দরী কন্যা মনে ঢোকার পর মাথা থেকে তো সব বেরিয়ে যাচ্ছে।”
ধূসর কিছু মনে পড়েছে এমন ভাবে বলল,
“ রেজাউলের কথা শুনেছিস?”
“ না,কী হয়েছে?”
“ ও দলের নাম করে এক্সট্রা হাদিয়া নিচ্ছে ওদের এলাকা থেকে। দল ভাঙিয়ে ক্ষমতা দেখাচ্ছে শুনলাম।
ইকবাল চমকাল কিছু,
“ কীইই? এ তো এক রকম চাঁদাবাজি। কিন্তু তুই জানলি কী করে?”
“ সোহেল বলেছে। তোকে সরাসরি জানাবে কিনা ভাবছিল। আফটার অল রেজাউল তোর কাছের লোক!”
“ গুল্লি মারি এমন কাছের লোকের।
এই কয়েকটা আগাছার জন্যেই তো দলের নাম খারাপ হয়। ওটাকে যে আমি কী করব, ভাবতে দে।”
“ আমি ডিল করি?”
ইকবাল খুশি হয়ে গেল,
“ অফ কোর্স। আমি আর তুই তো আমরাই বন্ধু।”
ধূসর পার্টি অফিসে ঢুকছিলই,উল্টোপথে হাঁটা ধরল অমনি। ইকবাল তব্দা খেয়ে বলল,
“ আরে, এক্ষুনি কেন যাচ্ছিস? হতচ্ছাড়া রেস্ট নে দু মিনিট। ”
ধূসর শোনেনি। গাড়ির দিকে হাঁটছে। আরিফ দাঁড়িয়ে ছিল অন্যদের সাথে। ধূসরকে গাড়ির দিকে এগিয়ে আসতে দেখেই,ছুটে এলো সহসা।
দরজা খুলবে ধূসর,দারোয়ান দৌড়ে এসে খুলে দিলেন। সালাম দিলেন আবারো৷
ধূসর টের পেলো,আজকের এই সালামে কোনো ভণিতা নেই। দ্বায়সারা ভাব নেই। বরং বুড়ো লোকটার চোখে এই সামান্য কারণে অপার শ্রদ্ধা দেখা যাচ্ছে।
ধূসর গাড়ির সীটে বসতে বসতে ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসল একটু।
ভোটে যাই হোক; হারুক বা জিতুক সে। তাতে ওর কিছু যায় আসবে না। কয়েকটা সিলমোহরের জায়গায় ও যে কারো মন জিতে যাচ্ছে,এই জয় ওর কাছে অনেক বড়ো কিছু। এই যে একজন ছলছলে চোখে সম্মান মিশিয়ে সালাম দিলো ওকে,ঠিক এখানেই আরেকবার জিতে গেল ধূসর।
ওপর তলার করিডোরে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছিল রওনক। চিলের মতো চোখ দুটো মেলে এতক্ষণ নিচের সব দেখেছে সে। মিখাইল চাপা স্বরে বলল,,
“ ওর ব্যাপারটা দেখলি? আস্তে আস্তে সব কেমন হাত করে নিচ্ছে।”
নামাল বলল,
“ এখন লাগতেছে,ভাই বেহুদা বাইকটারে বেচলেন।”
মিখাইল বলল,
“ আমরা মনে হয় না পারব। একে তো ইকবাল ভাইয়ের জানের দোস্ত। পুরা অফিস তার হাতে। আজকাল তো এমনিতেই কত কী হয়!”
রওনক সিগারেটের ধোঁয়া ছুড়ে বলল,
“ উহু, ইকবাল এসবে আসবে না। ওকে আমি চিনি। আর ধূসরের ব্যক্তিত্ব যা দেখলাম,কারচুপি করে ও জিততে চাইবে, এমনও মনে হলো না।”
“ জানি না ভাই কী হবে!”
নামাল ফিসফিস করে বলল,
“ আচ্ছা এত রিস্ক নেয়ার কী দরকার? আপদ রাস্তা থেকে সরালেই তো হয়।”
রওনক চমকে তাকাল,
“ মানে!”
“ অনেক রাত করে বাড়ি যায়। ঢাকা তখন ফাঁকা। বলেন তো….”
রওনক ঠোঁট কামড়াল। ভাবল,কী করবে। তারপর পকেট থেকে একটা পাঁচ টাকার কয়েন বের করে বলল,
“ আয় বাজি ধরি। শাপলা হলে ধূসর জিতবে,
সেতু হলে আমি!”
ওর দু আঙুলের টোকায় কয়েনটা শূন্যে উড়ে গেল। একটু পর থুবড়ে এসে পড়ল মাটিতে। ঘুরতে ঘুরতে থামল যেই,রওনকের চোয়াল শক্ত হলো অমনি। জ্বলজ্বলে শাপলায় চেয়ে বলল,
“ কর যা মন চায়।”
চলবে…
Share On:
TAGS: আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন, নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন পর্ব ৫
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৭৪
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮৩
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩৮
-
হেই সুইটহার্ট পর্ব ১
-
আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন পর্ব ১৩
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬৮.৩
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৯
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৭১
-
আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন পর্ব ১০