Golpo romantic golpo আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন

আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন পর্ব ৬


#আলতো_ছোঁয়ায়_সমুদ্রকথন!

#নুসরাত_সুলতানা_সেঁজুতি

(০৬)

পিউ খুব মন খারাপ করে বাড়ি ঢুকল। পড়াশোনা ওর দুই চোখের বিষ। নেহাৎ বাবার মান আর মন রাখতে হয় বলে একটু পড়তে বসে। আবার নাহলে মাও খুব কথা শোনান। এর-ওর সাথে তুলনা দেন। পিউ আগে ওসব গায়ে মাখতো না। ব্রেইন তো ভালো। অল্প পড়লেই পারতো! পড়তেও ইচ্ছে করে না,ছাড়তেও মন চায় না রকম অবস্থা! কিন্তু এখন,আজ থেকে পিউ ভালোবেসে পড়বে। নিজের ভালোবাসা পাওয়ার জন্যে লেখাপড়াকে ভালোবাসা বানাবে। সত্যিই তো, আজ বাদে কাল ও যখন গিয়ে ধূসর ভাইকে ভালোবাসার কথা জানাবে, তখন তার সামনে দাঁড়ানোর মতো একটা যোগ্যতা তো চাই!

পিউ ফোস করে শ্বাস ফেলে ঘরে যেতে নিলো। এর মাঝেই পথরোধ করে দাঁড়ালেন মিনা। নিস্পন্দ চোখ তুলে চাইতেই ঘাবড়ে গেল মেয়েটা। মায়ের ফুঁসতে থাকা চেহারা দেখে বলল,

“ কী,কী হয়েছে আম্মু?”

“ শিরিন ম্যাম ফোন করেছিলেন। কী কী নাকি করা হচ্ছে আজকাল!” ”

এক কথায় পিউয়ের গলার শিরা দাঁড়িয়ে গেল ভয়ে। ম্যাম মাকেও সব বলে দিয়েছেন? কাচুমাচু চেহারায় বলল,

“ আসল-আসলে আমি ওই…”

মিনা ধমকে বললেন,

“ চুপ। বেয়াদব মেয়ে, তোর জন্যে আজ প্রথম এই বাড়িতে ক্লাস টিচারদের কল এসেছে। ছি ছি,লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাচ্ছিল। অভদ্র ফাঁকিবাজ মেয়ে একটা । ক্লাসে পড়া পারিস না,হোমওয়ার্ক করিস না। সারাদিন ফোন আর টিভি। পিটিয়ে তোমার ছাল তুলে নেব আমি।”

চ্যাঁচামেচি শুনে রুবায়দা ত্রস্ত ছুটে এলেন। পিউয়ের মাথা নত। কাঁদছে না,তবে মুখটা লাল। ভদ্রমহিলা উদ্বীগ্ন হয়ে বললেন,

“ কী হলো এখানে?,ওমা মেয়েটা মাত্র এলো, বকছো কেন আপা?”

“ বকব না তো কী মাথায় বসাব? ওর ক্লাস টিচার কল করে আমাকে এত্তগুলো কথা শুনিয়েছে। পড়াশোনার নাম নেই,সারাদিন টইটই।”

রুবায়দা পিউকে টেনে কাছে নিয়ে গেলেন। গালে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,

“ আচ্ছা থাক। এখন থেকে পড়বে। পড়বি না পিউ?”

পিউ মুখ কালো করে মাথা নাড়ল। বোঝাল- পড়বে।

“ যা মা, রুমে যা। খেতে দিই।”

মায়ের দিকে একবার ভয়ে ভয়ে চেয়ে রুমের পথ ধরল পিউ। যেতে যেতে শুনতে পেলেন মিনা তখনো গজগজ করে বলছেন,

“ হ্যাঁ দে,আরো আশকারা দে। তখন ঘাড়ে উঠে নাচবে তখন বুঝবি। আর এই যে নবাব কন্যা, পড়তে মন না চাইলে বলে দিন। বলুন যে আপনাকে দিয়ে হবে না। শুধু শুধু টাকা খসিয়ে লাভ কী?”

পিউয়ের মন আরো বিষণ্ণ হয়ে গেল। পরপর রাগ উঠল ম্যামের প্রতি। শিরিন ম্যাম দিন দিন সিরিয়ালের কুটনি হয়ে যাচ্ছেন না? নুরুল স্যারকে বলে,এখন আবার বাড়িতে জানিয়েছে। অবশ্য খাতায় ধূসরের নাম ছিল,সেটা বলেননি। যাক,এইটুকু ভাবতেই পিউয়ের ক্ষোভ আবার পানি হয়ে গেল। গলে পড়ল কৃতজ্ঞতায়। ভাগ্যিস ম্যাম বলেননি,নাহলে যেখান থেকে এখন অবধি ও এক ফোঁটা পাত্তাও পেলো না সেটার কথা সবাই আগেভাগে জেনে ফেললে মুশকিল না? লজ্জায় কোথায় গিয়ে মরতো পিউ? মুখ দেখাতো কীভাবে!

আজ বৃহস্পতিবার, তাই তাড়াতাড়ি ফিরেছিল পিউ। তারপর খেয়েদেয়ে,একটা ঘুম শেষে উঠল মাত্র। ফোলা দুটো চোখ নিয়ে টলতে টলতে নিচে নেমে দেখল মা টিভি ছেড়ে বসেছেন। ওকে সারাক্ষণ টিভি নিয়ে বলে বলে নিজেই দেখে আবার।

পিউ আশেপাশে চাইল। রাদিফের আজ ক্যারাটে ক্লাস আছে। জবা সেখানেই নিয়ে গেছেন। পুষ্প ঘুমে। বাড়ি শান্ত পুরো!

পিউয়ের খুব খিদে পেয়েছে। মেজো মাকে খুঁজল ও। এখন মায়ের কাছে গেলেই ঝারি শুনবে। ডাকল গলা বাড়িয়ে,

“ মেজো মা,ও মেজো মা!”

মিনার হাতে একটা টেবিল ক্লথ। শখের বশে এসবে নিজের হাতে সেলাই করেন তিনি। মেয়ের কণ্ঠে গম্ভীর গলায় বললেন,

“ মেজো মা নেই। কাজে গেছে। যার যা লাগবে নিজে নিয়ে নিক!”

পিউ হাত কচলাতে কচলাতে এসে পাশে দাঁড়াল। মিনমিন করে ডাকল,

“ আম্মু,খিদে পেয়েছে।”

মিনা তাকালেন না। সুই সুতোতে হাত ব্যস্ত রেখে থমথমে সুরে বললেন,

“ আমি কারো আম্মু না।”

পিউ ঠোঁট টিপল। বলল,

“ আন্টি,খিদে পেয়েছে।”

তুরন্ত বিস্ফোরিত চোখে চাইলেন মিনা। স্যান্ডেলে হাত দিতেই পিউ ধড়ফড়িয়ে ছুট লাগাল। মিনা স্যান্ডেলটা ছুড়ে মারলেন। ঠিক তক্ষুণি সদরের খোলা দরজা দিয়ে ঢুকছিল,ইকবাল আর ধূসর।

পিউ তাড়াহুড়ো করে ছুটতে গিয়ে ধূসরের বাহুর সাথে ধাক্কা খেল। আর জুতোটা উড়ে গিয়ে পড়ল ইকবালের গায়ে। হকচকানোর তোড়ে বাম দিকে ধপাস করে পড়ে গেল ছেলেটা। আর ধূসরের শক্ত শরীরের সাথে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে মেঝের ডান পাশটায় পড়ে গেল পিউ। নিজের দুপাশে দুজন থুবড়ে পড়ার দৃশ্যে মাঝখানে হতভম্ব বনে দাঁড়িয়ে রইল ধূসর। নির্বোধ চোখদুটো ঘুরিয়ে একবার ডানে,একবার বামে দেখল সে। ইকবাল এতটাই ভড়কে গেছিল, চারদিকে চার হাত পা ছড়িয়ে গেছে ওর। দৃশ্যটায় নিজেকে ভুলে হুহা করে হেসে উঠল পিউ। মিনা জিভ কেটে ত্রস্ত ছুটে এলেন।

“ সরি বাবা,সরি! আমি আসলে দেখিনি। লেগেছে?”

ইকবাল ধাত সামলেছে। হাসল এবার। বলল,

“ না আন্টি। লাগেনি।”

তারপর ধূসরের দিকে হাতটা বাড়াল ও। ধূসর তুলল টেনে। অমনি পিউয়ের খিলখিলে হাসি বন্ধ হয়ে গেল। চট করে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিলো ইকবালের মতো। ডাকল মিনমিন করে,

“ ধূসর ভাই,আমিও পড়ে গেছি। আমাকেও তুলুন না!”

মেঘমন্দ্র গম্ভীরমুখটা ওর দিকে ফিরলও না। দৃষ্টির অনীহা দেখে পিউ ভাবল,ওকে তুলবে না। মন খারাপ করে হাতটা নামাতে নিল,কব্জি ধরে ঝট করে এক টান মারল ধূসর। তুলোর মতো দেহটা উড়ে আসা পাতার মতো দাঁড় করিয়ে ফেললেও,পিউ স্থির থাকতে পারল না। পা টলমল হয়ে ফের পড়ে যাওয়া ঠ্যাকাতে পেছনের দেওয়াল ধরে আটকাল নিজেকে।

ইকবাল দাঁড়িয়ে পাঞ্জাবি ঠিকঠাক করল। এক পল দেখল চারিদিক। পুষ্প কোথাও নেই। ভাগ্যিস নেই! সবে সবে প্রেম শুরু হওয়া প্রেমিকার সামনে প্রেমিকের এই আছাড় খেয়ে চিৎ হয়ে পড়ে যাওয়ার দৃশ্য নিশ্চয়ই খুব বাজে লাগতো! এদিকে মিনা বেগম অনুতাপে শেষ। ফের বললেন,

“ মাফ করো বাবা,আমি আসলেই দেখিনি,আমিতো এই পাঁজিটাকে মারতে গেছিলাম।”

ইকবাল হাসিহাসি মুখে বলল,

“ সমস্যা নেই আন্টি। আমি আসলে কখনো জুতোর বাড়ি খাইনি। আজ সেটারও একটা অভিজ্ঞতা হলো। থ্যাংক ইউ সো মাচ!”

মিনা বেগম লজ্জায় কোনদিকে তাকাবেন বুঝলেন না। ইকবাল জুতোটা তুলে এনে সামনে রাখতেই,আরো বিব্রত হয়ে পড়লেন। কোনোরকম শাড়ির আঁচলটা মাথায় তুলে বললেন,

“ তোমরা,তোমরা বসো। আমি চা দিই!”

মিনা বেগম পালালেন ত্রস্ত।

এদিকে পিউয়ের চাঁদের মতো উজ্জ্বল চোখমুখ ধূসরের পানে। মানুষটা ওর হাত ধরে তুলেছে! হাতে হাত,আঙুলে আঙুল আহা…

কিন্তু ওত আনরোমান্টিক ভাবে কেউ কাউকে তোলে? এমন ভাবে টান দিতো,যাতে পিউ এসে বুকে আছড়ে পড়ে,তা না। ধূসর ইকবালকে সোফা দেখায়।

“ বোস।”

ফের আশেপাশে চেয়ে চেয়ে বসল ইকবাল। ধূসর খেয়াল করতেই বলল,

“ কাউকে চাই?”

“ হুঁ? না, না না। কাকে চাইব? তুই আছিস,আর কাকে লাগবে আমার বল!”

ধূসর পেছন ফিরতেই দেখল পিউ এখনো একই জায়গায় মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে। বড়ো বড়ো চোখজোড়া মুগ্ধ হয়ে ওকেই দেখছে। ও তাকাতেই থতমত ভাব করে দৃষ্টি নামাল। চুপচাপ এগোলো খাবার রুমের দিকে।

পিউ যেতেই ফিক করে হেসে উঠল ইকবাল। ধূসর চটে চাইল ওর দিক।

কোমরে এক হাত ঠেকিয়ে চোখ পাঁকাতেই,ইকবাল গুনগুন করে বলল,

“ পিউপিউয়ের প্রেমে পড়ার কারণ,

বন্ধুর শ্যামলা শ্যামলা বরণ!”

এত রাগিস না। বললাম না ফ্যাসিনেশন? দুদিন গেলে ঠিক হয়ে যাবে।”

বাড়িতে রুবায়দা,পিউ,পুষ্প আর মিনাই ছিলেন আজ। সাদিফ এই সময়টা স্কুল-কলেজের বন্ধুদের সাথে কাটাতে যায়। পুষ্প ঘুমোচ্ছিল!

রুবায়দা ছাদে গিয়েছেন গাছে পানি দিতে।

মিনাই কফি করে আনলেন। ওদের সামনে রাখতেই ধূসর বলল,

“ আমি কফি খাই না।”

“ ওহ,তোর আদা চা… ভুলেই গেছিলাম। পারভীন,আরেকটু পানি বসা তো।”

“ আমি এখন চা খাব না বড়ো মা।”

“ খেয়েছিস বাইরে?”

“ হ্যাঁ।”

“ আরেকটু নাহয় বড়ো মার হাতে খেলি।”

“ আচ্ছা শোনো… মা কোথায়?”

“ ছাদে গেল। ডাকব?”

ধূসর চুপ রইল দু পল। বলল,

“ না । আমি আজকের রাতটা ইকবালদের বাড়িতে থাকব। কেউ জিজ্ঞেস করলে জানিয়ে দিও।”

“ আচ্ছা। বেশ! চায়ের পানিটা দেখে আসি।”

মিনা ফের উঠে গেলেন। সিরামিকের কাপে চা আনলেন দ্রুত। ধূসর চিনি ছাড়া রং চা খায়,আদা কুচি দিয়ে। এলাচ আর তেজপাতার ঘ্রাণ থাকে তাতে।

চায়ে দু চুমুকের মাঝেই ইকবাল বলল,

“ আন্টি,পিউয়ের বিয়ে দেবেন না? আমার কাছে একটা ভালো পাত্র আছে।”

ধূসরের চা মাথায় উঠে গেল অমনি। বিষম খেলেও, চোখ পাকিয়ে চাইল সে। ইকবাল মাথায় চাপড় কেটে বলল,

“ সাত সাত,

পানি খাবি?”

পিউ কান খাড়া করে এ ঘরের কথাবার্তা শুনছিল। পানির নাম শুনে নিজের ভাত ফেলে গ্লাস নিয়ে ছুট্টে এলো অমনি। খুব উদ্বেগ নিয়ে বলল,

“ পানি,পানি! ধূসর ভাই পানি।”

মিনা বললেন,

“ তুই আবার খাবার রেখে এলি কেন? পানি তো এখানেই আছে।”

পিউয়ের নজর পড়ল সেন্টার টেবিলে। জগ গ্লাস সবই এখানে। জিভ কেটে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“ ওহ তাইত!”

“ যা, খেতে যা।”

ফের গ্লাসটা নিয়ে মাথা নুইয়ে প্রস্থান নিলো বেচারি।

ইকবাল ফের একই কথা শুধায়,

“ আন্টি,দেবেন?”

“ কী যে বলো ইকবাল, মাত্র পনেরো পেরিয়ে ষোলোতে পড়বে মেয়েটা। এখন কি এসব ভাবার সময়? তাছাড়া পুষ্প তো ওর চেয়ে বড়ো। ওর বিয়ে আগে দিতে হবে না?”

“ তাহলে সেটাই করুন না আন্টি। আমি তো সেটাই চাইছি।”

শেষটুকু বিড়বিড় করে বলল ইকবাল। মিনা সতর্ক চোখে বললেন,

“ হ্যাঁ? কিছু বললে?”

“ না না,বললাম আচ্ছা ঠিক আছে। আসলে পিউপিউটা আমার বোনের মতো তো! দেখলেই মায়া লাগে। ইচ্ছে করে একটা লম্বাচওড়া ছেলে দেখে বিয়ে দিয়ে সুখে শান্তিতে সংসার করার ব্যবস্থা করে দিই। ভাইদের কত দায়িত্ব না বলুন! কী রে ধূসর ঠিক না?”

ধূসর কথা বলল না। একটা রগচটা মুখ করে চা খেতে লাগল। মিনা হেসে বললেন,

“ যখন বিয়ে দেয়ার কথা ভাবব,তোমাদের নিশ্চয়ই বলব।”

“ জি। আজ তাহলে উঠি। ধূসর, কী রে তুই কাগজ আনলি না,যেজন্যে এলি সেটাই তো রয়ে যাচ্ছে।”

“ আনছি।”

“ কীসের কাগজ রে ধূসর?”

“ কিছু ডকুমেন্টস।

আমি কাল গাড়ি কিনব।”

“ ওমা,তাই! এ তো ভালো খবর।”

পিউ চেয়ারে বসে পিঠ সোজা করে ফেলল। ধূসর ভাই গাড়ি কিনবেন?

মেয়েটা তড়িঘড়ি করে ভাত শেষ করল। গতিতে

হাত ধুয়ে এসে দাঁড়াল এখানে। ততক্ষণে ধূসর ঘর থেকে নেমে এসেছে। ইকবালের অস্থির, হন্যে চোখ শান্ত হলো “ চল” শব্দটায়। মন খারাপ করল বেচারা। পুষ্পকে বলেনি ও আসবে। সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিল। ইস,দেখা হলো না ধুর।

দুজন হাঁটা দিতেই পিউ পেছন থেকে হড়বড়িয়ে বলল,

“ গাড়ি কী রঙের কিনবেন, ধূসর ভাই?”

ধূসর না চাইতেও থামে। বড়ো মা আছেন,মেয়েকে এভাবে ইগনোর করলে উল্টোপাল্টা ভাববে। ছোট করে বলল,

“ ব্লু!”

ইকবাল বলল,

“ সাহেবের রয়্যাল ব্লু পছন্দের রং তো। সেটাই নেবে। কী? তাই তো!”

মিনা বললেন,

“ হ্যাঁ, ওর বড়ো চাচারও পছন্দের রং। এই সব দিকে দুজনের খুব মিল কিন্তু ইকবাল। খেয়াল করেছ? একদম চাচার মতো ও।”

ইকবাল মুখে উত্তর দিতে পারল না। হাসল শুধু। তবে মনে মনে কটমটিয়ে বলল,

“ আপনার ঐ হিটলার স্বামীর সাথে আমার বন্ধুকে মেলাবেন না আন্টি। খবরদার না!”

এদিকে দুঃখ আর হতাশায় পিউয়ের ঠোঁট চূড়ায় উঠে গেছে। ধূসর ভাইয়ের পছন্দের খাবার সরষে ইলিশ। যা নাকে শুকলেই পিউয়ের গা গোলায়। ধূসর ভাইয়ের পারফিউমের গন্ধ জেসমিনের মতো! যা শুকলে পিউয়ের মাথা ধরে। ধূসর ভাইয়ের পছন্দের রংটা শেষে নীল? যা পিউয়ের পছন্দের ধারেকাছেও নেই। এখন থেকে সামনে নিশ্চয়ই আরো অমিল খুঁজে পাবে? দুজনের এত অমিল থাকলে মিল হবে কী করে?

শুক্রবার সকালের কথা….

ঠান্ডা মারবেল মেঝেতে উপুড় হয়ে পুশ আপ করছে সাদিফ। পরনে একটা কালো স্যান্ডো গেঞ্জি,এ্যাশ রঙের ট্রাউজার। চশমাটা পাশে খুলে রাখা। সাদা শরীর দরদর করছে ঘামে। মুখের হাড় শক্ত করে ছেলেটা চেয়ে আছে কোথাও। প্রতিবার একেকটি পুশে চোয়াল টনটন করে উঠছে। চোখের পর্দায় ভাসছে একটি মেয়ে! সেই বেনি করা,ফারসি সালোয়ার স্যুট পরা ঝগড়ুটে মেয়েটা। কিড়মিড় করা মুখ,তেড়েমেরে ওঠা,আর সবশেষে ওর চোখ থেকে চশমাটা নিয়ে আছাড় দেয়া ভাবতেই সাদিফের পুশ আপ থামল। রেগেমেগে দাঁত খিচে একটা থাপ্পড় মারল ফ্লোরে।

কিড়মিড়িয়ে বলল –

ম্যালেরিয়া, একবার শুধু পাই মেয়ে। এই দু আঙুলে নিয়ে চটকে চটকে মারব।

তক্ষুণি খরগোশের মতো লাফাতে লাফাতে ঘরে এলো রাদিফ। ভাইকে উপুড় হয়ে থাকতে দেখেই মুখটা জ্বলে উঠল আনন্দে। সঙ্গে সঙ্গে এক ছুটে গিয়ে পিঠের ওপর বসে পড়ল তার। একটু চমকাল সাদিফ। ভ্রু কুঁচকে ঘাড় ভেঙে চাইতেই,রাদিফকে দেখে শান্ত করল রাগটা। নরম গলায় বলল,

“ সকাল সকাল এ রুমে কী? পড়তে বসিসনি?”

“ পড়া শেষ করেই তো এলাম। আমায় নিয়ে পুশ আপ করো না। আজ হান্ড্রেড করবে!”

“ আজ মুড নেই। নাম।”

“ প্লিজ ভাইয়া,মজা লাগে। করো না।”

এত অনুনয় শুনে চ সূচক শব্দ করল সাদিফ। হার মেনে দুই হাতের ভরে পুশ আপ করতেই,উচ্ছ্বল গলায় গণনা শুরু করল রাদিফ। ১,২,৩…

ঠিক বিশ গোণার মাথায় হাতে একটা গ্লাস নিয়ে ঘরে ঢুকল পিউ। একদম সাদিফের মুখের সামনে ঘুরে এসে দাঁড়াল। বলল,

“ সাদিফ ভাইয়া,তোমার চিরোতার পানি।”

সাদিফ ওইভাবেই চোখ তুলে চাইল। আদুরে বিড়ালছানার মতো একটা ফরসা মেয়ে পিউ। চুলটা পাঞ্চক্লিপে বাঁধা থাকে সব সময়। স্কুলে গেলে বেনি করে দুটো।

পরনে স্কার্ট,শার্টের মতো ফুল হাতার টপ। ও রাদিফকে বলল “ নাম,বসব।”

এইবার উঠে গেল ছেলেটা। সাদিফ নিজেও উপুড় থেকে উঠে বসল। পাশের জায়গা দেখিয়ে পিউকে বলল – বোস।”

গ্লাস সমেত দুই পা আসন করে বসল মেয়েটা। সাদিফ এক নিশ্বাসে গ্লাস খালি করে ফেলল। সকাল বেলা খালি পেটে চিরোতার রস খাওয়া ওর অভ্যেস। তারপর চশমাটা টেনে এনে পরল চোখে। পিউয়ের মসৃণ মুখখানা দৃষ্টির সামনে স্পষ্ট হলো এইবার। মেয়েটার চেহারার অর্ধেক জুড়েই দুটো চোখ। একদম পুতুলের মতো বড়ো বড়ো চোখে,লম্বা লম্বা পাঁপড়ি। ঝাপটে ঝাপটে দেখছে এদিকে। সাদিফ ফোস করে শ্বাস ফেলে বলল,

“ পিউ,পৃথিবীতে কত রকমের মেয়ে আছে জানিস?”

“ কত রকমের,ভাইয়া?”

“ তিন রকম। একটা, তোর মত। যারা চঞ্চল, খুব লাফায়,আনন্দ করে, কিন্তু কারো সাতে পাঁচে নেই। কাউকে কোনো বাজে কথা বলে না।

দুই,পুষ্পর মতো। এমনি ভদ্র, একটু মিনমিনে।

আর তিন…

বলতে গিয়েই দাঁত পিষল সাদিফ।

“ তিন নম্বরে আছে কিছু অসভ্য,অভদ্র মেয়ে। হিংসুটে, ঝগড়ুটে। দেখলেই মন চায় চাপকে লাল করে দিই।”

পিউ ঠোঁট গোল করে মাথা নাড়ল,

“ ওওও।”

সাদিফ খুব উদ্বেগ নিয়ে বলল,

“ আচ্ছা ধর এরকম কেউ যদি তোর সাথে অহেতুক ঝামেলা করে,তোর শখের কিছু ভেঙে দেয়,তুই কি করবি?”

পিউ অবোধ বালিকার ন্যায় বলল,

“ অনেক কাঁদব।”

সাদিফ চ সূচক শব্দ করে বলল,

“,আমি কি কাঁদব? আমি তো ছেলে। আমি কী করব?”

“ মাফ করে দেবে।”

“ কীহ?”

“ আম্মু বলে কেউ ভুল করে অনুতপ্ত হলে মাফ করে দিতে। ক্ষমা মহৎ গুণ সাদিফ ভাই।”

সাদিফের কথাটা পছন্দ হলো না। উলটে চটে গেল একটু। মৃদূ ধমকে বলল,

“ ওঠ।”

পিউ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চোখ ঝাপটে উঠে দাঁড়াল সহসা। সাদিফ বলল,

“ তোর জ্ঞান শুনতে তোকে পাশে বসিয়েছিলাম? তোর গ্লাস ধর,যা। বের হ। আজ আমি এক হাজার পুশ আপ করব।”

“ ওমা,তাহলে তো ফ্লোরেই চ্যাপ্টা হয়ে থাকবে।”

“ থাকলে থাকব। কিন্তু কেউ আসবি না। যা,তাড়াতাড়ি যা। এটাকেও নিয়ে যা।”

পিউ ঘাড় নাড়ল। রাদিফের গলা প্যাঁচিয়ে বেরিয়ে গেল বাইরে।

সাদিফ খিটমিট করতে করতে পুশ আপ শুরু করল আবার। ওই অসভ্য মেয়েকে ও মাফ মরবে? অসম্ভব!

****

শুক্রবার

শিকদার বাড়ির জন্যে অন্যরকম উৎসব,অন্যরকম আনন্দ। সবাই এক সাথে খায়,গল্প করে, আড্ডা দেয়। ভালো মন্দ রান্না হয়! যদিও গত কয়েকদিন ধরে বাড়িতে এলাহি আয়োজন হয়েই যাচ্ছে। তবে আজকের দিন একটু বিশেষ। আর তা হলো বাড়ির তিন কর্তার জন্যে। অন্যান্য দিন তো আমজাদ,আফতাব,আনিস তিন রকম ব্যস্ততায় থাকেন। আজমল বাড়ি আসেন যে কোনো লম্বা ছুটিতে। তাই শুক্রবারটাই এক সঙ্গে পরিবারের সাথে কাটানোর ফুরসত পান তারা। আজ ধূসরও বাড়িতে। ইকবালের ওখান থেকে দশটা নাগাদ ফিরেছিল। বড়ো চাচাই ফোন করে ডাকলেন। দুপুরে এক সঙ্গে খাবেন বলে।

ছেলেটা দেশে আসার পর থেকে,একইসাথে বসা হয়নি। কথাও হয়নি ঠিকঠাক।

শিকদার বাড়ির ডায়নিং টেবিলটা বিশেষ ভাবে কাস্টমাইজ করে বানানো। প্রায় একুশ কেদারা বিশিষ্ট এটা। যাতে এক টেবিলে পরিবারের সবাই খেতে বসতে পারে।

ধূসর নেমে আসতেই, আমজাদ সাহেব একবার নিজের পাশে বসাতে চাইলেন। কিন্তু ছোটো চাচার পাশেরটা টেনে বসে গেল সে। ভদ্রলোক আর কিছু বললেন না। নীরস শ্বাস ফেলে নিজের প্লেটে ভাত তুললেন। আফতাবও ছেলেকে নিশ্চুপ দেখলেন কয়েক পল। বাপ- চাচার সাথে ছেলেটার একটা নিস্পন্দ যোগ-বিয়োগ চলল।

তক্ষুনি

ছুটতে ছুটতে এলো পিউ। গোসল করে ভেজা চুল মোছেওনি। কোনোরকম তোয়ালে দিয়ে প্যাঁচিয়ে ওপরে তুলে রেখেছে। ধূসরের এক পাশে আনিস,অন্যপাশে পুষ্প। বিষয়টায় হতাশ হলো সে। ঘুরে ওইপাশে গিয়ে বসল।

মিনা দেখেই বললেন,

“ কী রে,তোকে না বলেছি এভাবে চুল প্যাঁচাবি না!”

“ গরম লাগছে। চুলটা কেটে দাও না আম্মু।”

জবা বললেন,

“ সে কী, তুই না ক মাস আগেই চুলের গোড়া ছাটলি? এত ঘন ঘন কেউ চুল কাটে?”

“ ওর চুল অনেক তারাতাড়ি বড়ো হয়ে যায় মেজো মা। ছোটো মানুষ তো, সামলাতেও কষ্ট হয়। আম্মু বলো তো বিকেলে পার্লারে নিয়ে ঘাড় অবধি করে দিই?”

মিনা চোখ রাঙিয়ে বললেন,

“ তুই চুপচাপ খা।”

পিউ বিড়বিড় করল,

” লম্বা চুল একদম ভাল্লাগে না! আমি পারলে প্রিন্সেস ডায়না কাট দিয়ে ঘুরতাম।”

ধূসর শুনতে পেলো কথাটা। খাওয়ার মাঝে ঠান্ডা চোখের কোণ তুলে একবার তাকাল একটু। কেন তাকাল,কীজন্য! বোঝা যায়নি যদিও। দু সেকেন্ডের চেয়েও কম সময়ে দৃষ্টি নামিয়ে আবার ভাতের প্লেটে ফেলল।

এবার আড়চোখে চাইল পিউ। ধূসর ভাই যে খুব নিষ্পৃহ একটা মানুষ, ও বুঝে গেছে। খাবার টেবিলে সবাই-ই কিছু না কিছু বলছে। এই লোকটা এমন চুপ থাকে কী করে? জিভের ভেতর চুলকানি হয় না? পিউ গালে হাত দিয়ে চেয়ে থাকতে থাকতেই আহত শ্বাস টানল। কবে যে এই শীতল চোখ দুটো ওকে দেখবে! ওর দিকেও মুগ্ধ হয়ে চাইবে! কবে বলবে,

পিউ তুই খুব সুন্দর!

হবে আদৌ এরকম?

সাদিফ হাজির হলো তক্ষুণি। একেবারে হন্তদন্ত ভঙ্গিতে একটা চেয়ার টানতেই আমজাদ বললেন,

“ কী ব্যাপার, এত দেরি কেন?”

“ একটা মেইল এসছিল, চাচ্চু। দেখছিলাম।”

“ আচ্ছা,বসো।”

বসল ও। ভাত মুখে দেয়ার আগেই ফের একটা প্রশ্ন ছুটে এলো,

“ রেজাল্টের কথা তো শুনলাম। তা এখন কী করবে কিছু ভেবেছ? এই রেজাল্ট দিয়ে তো ভালো কিছু হবে না।”

দাঁনার ভেতর সাদিফের হাতটা শিথিল হলো অমনি। চুপ রইল জবাবে।

আফতাব বললেন,

“ আজমলের সাথে কথা বললাম বুঝলি। ও তো তোকে ব্যবসায় নিতে বলছে।”

আঁতকে চাইল সাদিফ।

আমজাদ বললেন,

“ ব্যবসা ছাড়া গতি কী! চাকরির বাজার ভালো না এখন। জবা কী বলো?”

“ আমি কী বলব ভাইজান,আপনারা যা ভালো বুঝবেন।”

সাদিফের ভেতরটা ফেটে পড়ল দুঃখে। ও কিছুতেই ব্যবসা করবে না। ও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হবে। ওর প্যাশন এটা। কিন্তু ছেলেটা মুখে আনতে পারল না। সাহস হলো না বলার। চুপচাপ বিরস মুখে ভাত গালে দিলো।

ঠিক তার এক মিনিটের মাথায় কথার তির সাই সাই বেগে ঘুরে গেল ধূসরের দিকে। আমজাদ যেন বহু কাঙ্খিত একটা প্রশ্ন করে বসলেন,

“ আর তুমি,তুমি কী করবে? বাড়িতেই তো থাকো না। কথাও হয় না। পড়াশোনা শেষ তো করলে,কী করবে এরপর ভেবেছ?”

ছোট্ট একটা জবাব,

“ ভেবেছি।”

“ আমরা জানতে পারি?”

“ ঘরে গিয়ে ঘুমাব।”

আমজাদ তব্দা খেয়ে ভাইয়ের দিকে চাইলেন। আফতাব থমথম করে বললেন,

“ ভাইজান কি সেটা জানতে চেয়েছে? তোমার পরিকল্পনা বলো। কী করবে জীবনে? কোন দিকে এগুবে?”

ধূসর চোখ তুলে সরাসরি বড়ো চাচার দিকে চাইল। “ আপনাদের বলা হয়নি,আমি গত সপ্তাহে *** দলে নাম লিখিয়েছি।”

একটা বিকট বোমা যেন খাবার টেবিলের ঠিক মাঝখানে পড়ল। তরকারির চামচ ঝট করে হাত থেকে পড়ে গেল রুবার। সবার চোখ শৃঙ্গে,ভ্রূ উঠল কপালে। আফতাব,আমজাদ আনিস,রুবায়দা, মিনা,জবা দেখে শুরু করে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে বাদ গেল না কেউ। আমজাদ হতবিহ্বল সুরে আওড়ালেন,

“ রাজনীতি! আবার রাজনীতি!”

“ হ্যাঁ। এন্ড দিস ইজ মাই ফাইনাল ডিসিশান!”

সহসা ফুঁসে উঠলেন ভদ্রলোক,

“ তোমার ডিসিশান দিয়ে কী হবে? এত সাহস হলো কী করে আবার দলে নাম দিয়ে আসার। একবার আমাদের কাউকে জিজ্ঞেস করেছ তুমি!”

রুবায়দা দিশাহারা হয়ে বললেন,

“ ভাইজান শান্ত হন! শরীর খারাপ করবে।”

আফতাব চটে বললেন,

“ শান্ত হওয়ার মতো কিছু বলেছে তোমার ছেলে? যে জন্যে তাকে বাড়ি থেকে পাঠানো হলো,সে এসেই আবার তাতে নাম দিয়েছে। কত বড়ো স্পর্ধা! শোনো ধূসর,এ বাড়িতে ওসব চলবে না। হয় একটা ভালো চাকরি করো,নাহয় ব্যবসায় এসো।”

পুষ্প,পিউ,রাদিফ,সাদিফ চুপসে ঝগড়াঝাঁটি দেখছে। ভেতর ভেতর সাদিফ আগ্রহী বেশি। একই জ্বালায় তো সেও ভুগছে। এবার ধূসর ভাই কীভাবে সামাল দেয় সেটাই দেখার পালা। একমাত্র চুপ রইলেন আনিস। বড়ো ভাইদের মাঝে সে খুব কম কথা বলেন।

আমজাদ বললেন,

“ আমি ভালো করেই জানি,তোমার মাথায় এসব শয়তানি কে ঢোকায়! ওই ইকবাল,ওই লাফাঙ্গাটা তাইত!”

পুষ্পর মুখটা অমনি চোরের মতো দেখাল। খুব করে চাইল,ইকবালের হয়ে প্রতিবাদ করতে। পারল না!

ধূসরই বলল,

“ এখানে ওকে টানবেন না।”

“ কেন টানব না? ওই ছেলের সাথে সারাদিন ঘুরে বেড়াও। যখন তখন বগলদাবা করে বাড়িতে নিয়ে আসো। ওই তোমার মাথা বিগড়েছে। আমি বেশ ভালোই জানি।”

পরের দফায় আমজাদ মেজাজ কমালেন। শান্ত ভাবে বললেন

“ যাক গে,যা করার করেছ। নাম দিয়েছিলে,কাল গিয়ে কেটে আসবে।”

“ হবে না।”

“ কী?”

ধূসর চাচার চোখের দিকে চেয়ে বলল,

“ আমি নাম কাটব না।”

“ ধূসর!”

“ আমি ইন্টারমিডিয়েট এর বাচ্চা নই বড়ো আব্বু। তাই চোখ রাঙালে ভয় পাব,এমন ভাববেন না।

লাইফটা আমার,চয়েসও আমার হওয়া উচিত।”

“ এত্ত থার্ডক্লাশ চয়েস তোমার কেন হবে? তুমি শিকদার বাড়ির ছেলে। এ বাড়ির কেউ ওসব ফালতু জিনিস করে না।”

“ কিন্তু আমি করব। সবাই যেদিকে যায়,আমি সেদিকে যাই না। আর এ কারণেই শিকদার ধূসর মাহতাব সবার থেকে আলাদা!”

পিউ অভিভূত হয়ে গেল।

মনে মনে বলল,

“ ওরেহ কী ডায়লগ রে!”

পর্বের ন্যায় সটান দেহ নিয়ে ধূসর উঠে দাঁড়াল এবার। খাবারে আঙুল ঝেরে দৃঢ় স্বরে বলল,

“ আমি আজ এই টেবিলে খেতে বসেইছি আপনাদের বলতে,আমি রাজনীতি করছি। কিন্তু এবার আর আপনি আমাকে পিটিয়ে দেশ ছাড়া করতে পারবেন না বড়ো আব্বু। আপনাদের জন্যে আমার মনে একইরকম সম্মান আছে তবে আগের মতো ভয়টা আর নেই। খুব বেশি ঝামেলা হলে,আমি নাহয় বাড়ি ছেড়ে আলাদা থাকব।”

আফতাব দুই ভ্রু উঁচিয়ে বললেন,

“ আলাদা থাকবে? খুব লায়েক হয়ে গেছ?”

“ যা ভাবলে আপনারা খুশি হবেন,তাই। যে ভুলের কারণে আমাকে বাড়ি ছাড়িয়েছিলেন,সেই ভুলটাকে আমি আমার প্যাশন বানিয়ে নিয়েছি। দশ কথার একটাই মানে,আমি রাজনীতি করছি।”

ধূসর বেরিয়ে গেল। একদম বাইরের পথ ধরল। মিনা উতলা হয়ে চ্যাঁচালেন দুবার,

“ খেয়ে যা বাবা…”

শোনেনি ও। চলে গেছে। রুবায়দা অসহায় চোখে একবার স্বামীকে দেখলেন,একবার ভাসুরকে। ধূসর পেছনে ফেলে গেছে কতগুলো তাজ্জব,বিহ্বল চেহারা। তবে এর মাঝে চারজোড়া চোখ হাঁ করে মুগ্ধ ভাবে দেখল ওকে। সাদিফ সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করে ফেলল,ওর পরের পদক্ষেপ কী হবে!

আর পিউ,মেয়েটা আরেকবার মরল। এইত এক্ষুনি ছোট করে একটা হার্ট ব্রেক করল সে। এই না হলে সাহস! প্রেমের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে এমন সাহসী প্রেমিকই তো চাই। যে ওকে পাওয়ার জন্যে বাবার চোখে চোখ রেখে একদিন বলবে,

“ শুধু আপনি না,বাড়ির সবাইকে বলছি; পিউয়ের বিয়ে আমার সাথেই হবে। এই পৃথিবীতে ও যদি কারো বউ হয় সেটা হবে শুধুমাত্র শিকদার ধূসর মাহতাবের বউ।”

****

ধূসর গাড়ি কিনেছে আজ। গতকাল নেয়া হয়নি কাগজপত্রের একটা ঝামেলার কারণে। এই মাত্র পার্টি অফিসের একটা হইহল্লা শেষ করে বাড়ির রাস্তা ধরল ও। বাড়িতে আবহাওয়া ভালো না। হয়ত চাচা সমাজ ওর ওপর ক্ষিপ্ত এখনো। এই লড়াই যে ক্রমশ আরো বাড়বে,পথটা যে সুগম হবে না জানতো ধূসর। ইকবালকে সাথে আনল না তাই। আমজাদ আবার কী থেকে কী শুনিয়ে দেন ওকে!

রয়্যাল ব্লু রঙের গাড়িটা নিয়ে যখন গুলশানের মূল চত্বর পেরিয়ে গলির অভিমুখে এলো,হুট করে চলন্ত গাড়ির দুইপাশ থেকে হাত সোজা করে নেড়ে নেড়ে থামাতে ইশারা করল দুজন ছেলে। ওদের পেছনে আরো দুজন আছে। অচেনা মুখ দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেলল ধূসর। চট করে ব্রেক কষল গাড়িতে।

একজন ঘুরে এসে গাড়ির বন্ধ জানলায় টোকা দিতেই,কাচ নামাল ধূসর। ছেলেটা শুধাল,

“ এলাকায় নতুন?”

ধূসর ইচ্ছে করেই বলল,

“ বলা যায়।”

“ নিচে আসেন।”

ধূসর নিম্নোষ্ঠ দাঁতে চেপে তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে রইল। ছেলেটার পোশাক আশাক,চুল,চেহারার কাটাছেঁড়া, আর হাতে গলার জিনিসপত্রে বোঝা গেল পাতি মাস্তান হবে।

“ কী? নামেন।”

সিটবেল্ট খুলে নামল সে। সবাইকে দেখল চুপচাপ। মোট চারজন ওরা। জিজ্ঞেস করল সামনেরজন,

“ কোন রোডে থাকেন?”

“ ২।”

“ ভাড়াটিয়া?”

“ কী দরকার সেটা বলো।”

“ক্যান, ব্যস্ত অনেক?”

“ কিছুটা।”

“ গাড়ি চকচকা। নতুন নিছেন?”

“ হু।”

ছেলেটা পেছনে ঘুরে বাকিদের দিক চেয়ে হাসল। ফের ওর দিক চেয়ে বলল,

“ আমাগো চেনেন?”

“ না।”

“ আমি সালাম,ও গোলাম। ও ফরিদ,আর ও জুনায়েদ। এইখানে থাকি। পারমানেন্ট। ”

“ তো?”

“ গাড়ি কিনছেন,হাঁদিয়া কই?”

ধূসর ভ্রু নাঁচায়,

“ হাঁদিয়া?”

“ বখশিশ। দেখতাছি কয়েকদিন ধইরাই, আসেন যান। ভালোই। এই এলাকার পোলাপান আমরা। এলাকা দেখাশোনা করি। তাই এই গলি দিয়া গাড়ি নিতে হইলে হাদিয়া দেওন লাগব।”

“ না দিলে?”

“ না বলতে শব্দ নাই। ক্যান কন তো!”

বলতে বলতে প্যান্টের

হোলস্টার থেকে এক টানে ছুরি টেনে বার করল ফরিদ। ভাঁজ খুলে সূচালো মাথার অল্প একটু ঠেসে ধরল ধূসরের বুকের সাথে।

***

কোচিং সেন্টার কাছে। পিউ গাড়ি নেয় না এটুকু পথ। তানহার সাথে ফুটপাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে যায়। আজকেও কথা বলতে বলতে আসছিল দুজন। কদিন ধরেই পিউ খুব পড়ছে। তানহা প্রসন্নও এতে। অবশেষে ধূসর ভাইয়ের ওই ভূতটা তো নামল! এদিকে পিউয়ের মনের অবস্থা বেশামাল। রাত জেগে পড়ায়,দিনে টলছে শুধু। কোচিং এ আজ কী পড়াল,অর্ধেক বোঝেনি। এমন করলে রেজাল্ট দেখতে হবে না!

হঠাৎ সাইকেলের টুং টুং শব্দে দাঁত পিষল ও। মেজাজ খারাপ করে বলল,

“ ছ্যাচড়টা আজকেও পেছন পেছন আসছে।”

তানহা বলল,

“ পাগল প্রেমিক। কী আর করবি!”

তক্ষুনি পাশ থেকে গদগদ স্বর শোনা গেল,

“ হেই প্রহর্ষা,প্রহর্ষা!”

পিউ থামে না। তানহার হাত ধরে পায়ের গতি বাড়িয়ে দেয়। রবিন ওদের কোচিং এ পড়ে। একই ক্লাসে। বছরখানেক ধরেই খুব লাইন মারছে ওকে। বরাবরের মতো আজকেও পাত্তা পেলো না, কিন্তু পিছু ছাড়ল না তাও। সাইকেল টানতে টানতে সেই সাথে সাথে চলল। ডাকল অনুনয় করে,

“ শোনো প্লিজ,প্রহর্ষা?”

**

বুকে ধরা ছুরিটার দিকে একবার চোখ নামিয়ে দেখল ধূসর। ঠোঁটের এক পাশ তুলে বরফের মতো হাসতেই ফরিদের শয়তানি চাউনি দপ করে নিভল। রেগেমেগে বলল,

“ তুই কি এইটারে নকল ভাবতেছস? দাবাইলে বুঝবি কত ধার!”

ধূসর কথা কানে নেয়ার বদলে,টিশার্টের ওপর বুকখোলা শার্টের কলারের দুইপাশ ধরে ওপরে ঠেলে দিলো। রাগে জ্বলে গেল ফরিদ। খপ করে ওর কলার ধরে টান দিলো, অমনি নিজের মাথা দিয়ে ওর কপালের তারায় সজোরে এক বাড়ি মারল ধূসর।

প্রচণ্ড ব্যথায় হাতটা ছুটে গেল ফরিদের। ছুরি সুদ্ধ নিজেও পড়ে গেল নিচে। ততক্ষণে জটলা বেঁধে গেছে। পিউরা এ পথেই আসছিল। ভীড় দেখে হেঁটে এসে দাঁড়াল দুজন। পিউয়ের চোখ বেরিয়ে গেল ওই পাড়ে ধূসরকে দেখে। আরো উদ্বীগ্ন হয়ে ঠেলেঠুলে সামনের দিকে চলে এলো সে।

দলের একজনকে আঘাত করলে বাকিরা তো চুপ থাকবে না। জুনায়েদ তেড়েমেরে মারতে এগোতেই,ধূসর বাম হাত দিয়ে কানের গোড়ায় থাপ্পড় মারল ওর। ছেলেটার গোটা মাথা এ্যান্টেনার মতো ঝিম করে উঠল । পেছনে হটে এসে, দুবার ঝাঁকাল ঘাড়টাকে।

পরপর টের পেলো কানের লতি ছুঁয়ে একটা গরম কিছু লাইন বেয়ে নামছে। আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে হাতটা সামনে আনতেই,মুখচোখ বসে গেল অমনি। ফ্যাসফ্যাস করে বলল “ রক,রক্ত! রক্ত!”

একইসাথে আতঙ্কে ফ্যাকাশে হয়ে গেল পিউ। ঝট করে ওর হাতটাও গালে চলে গেল। মাথার মধ্যে ভনভন করে উঠল সে রাতে ধূসরের দিয়ে যাওয়া হুমকি।

জুনায়েদ রক্ত দেখে শেষ। একবার হকচকানো চোখে ধূসরকে দেখেই,হঠাৎ উল্টোঘুরে ভো দৌড় দিলো সে। বাকি দুজনও ছুটল দেখাদেখি। ফরিদ ভয় পেলো আরো। সব পালিয়েছে, ও একা পারবে? ধূসর উদ্ভ্রান্তের ন্যায় হন্যে চোখ ঘুরিয়ে এদিক ওদিক চাইল। পাশে ছিল আখের ভ্যান। সাড়ি সাড়ি আখগুলো দেখে, এক লাফে গিয়েই আখের মোটা দণ্ডটা তুলে হাঁটুতে চাপ দিয়ে ভাঙল সে। ফরিদ পালানোর সময় পেলো না,সপাৎ করে ওর পিঠে বাড়ি মারল ধূসর। ঐ এক ঘা এত জোরালো! ভারসাম্য হারিয়ে ফের মাটিতে থুবড়ে পড়ল ছেলেটা। এক চোট চমকাল সবাই। এগোলো না তবে। ধূসর আর থামল না, ওর চোখদুটো অদ্ভুত ক্রোধে জ্বলজ্বল করছে। ফুঁসছে পেটানো দেহ। এত রাগ,এত রাগ আজ অবধি বাপ-চাচার কারো মাঝে দেখেনি পিউ। হতবাক হয়ে চেয়ে রইল মেয়েটা। চোখের সামনে মাটি কোঁপানোর মতো আখ দিয়ে ফরিদকে পিটিয়ে গেল ধূসর। সাপের মতো ধুলোর মাঝে গড়াতে থাকে ছেলেটা। সরে যাওয়ার চেষ্টা করে। হাঁটু,হাত,কোমর মুখ একটা জায়গা যদি রেহাই পায়। এক সময় আখের দণ্ড ভেঙে ছেচে গেল, সেটা ছুড়ে ফেলে আবার ভ্যান থেকে আরেকটা নিয়ে এলো ধূসর। এলোপাথাড়ি পেটাতে পেটাতে হিঁসহিঁস করে বলল, “ আমার এলাকায় গুণ্ডামি! হাঁদিয়া নিবি? কত লাগবে?”

ফরিদ ককায়,গাল-মুখ ফেটে গেছে ওর।

অনুনয় বিনয় করে বলে,- না ভাই,লাগব না। ভাই মাফ করেন,ছাইড়া দেন,আর করুম না।”

পিউ মুখে হাত চেপে চেয়ে রইল। শীর্ণ পিঠ বেয়ে একটা শীতল স্রোত গলগল করে নামছে। ধূসর থামল একটা সময়। ছেচে যাওয়া আখের ডাল ছুড়ে ফেলল মাটিতে। ফোসফোস করতে করতে কনুই ভাঁজ করে শার্ট দিয়ে নিজের ঘর্মাক্ত কপাল,মুখ মুছল। গোল হয়ে দাঁড়ানো এত মানুষ, এত তাজ্জব দৃষ্টি! অথচ একটা কৈফিয়ত, বা কোনো রকম জবাবদিহিতা না দিয়ে নিজের মতো গাড়িতে গিয়ে বসল সে।

ইঞ্জিন ছুটাতেই গোল জটলা ফাঁকা হয়ে তাকে যাওয়ার পথ দিলো। কানাঘুষা বাড়ল পরপর। যে যার নিজের মতো আলাপ-আলোচনা করল। ফাঁটা হাত-পা, চেহারা নিয়ে নিজেই টলতে টলতে উঠে, খোড়াতে খোড়াতে স্বীয় গন্তব্যে রওনা করল ফরিদ। কেউ ওকে ধরলও না,ছুঁলোও না। এক পর্যায়ে ভীড় কমল,জায়গা ফাঁকা হলো। শুধু পাথরের মতো জমে রইল পিউ। গোল মুখ আরো ফ্যাকাশে সাদা হয়ে গেছে। রবিন নিজেও দেখল এই দৃশ্য। বিমূর্ত বনে বলল,

“ বাপ্রে,কে ইনি! কী রাগ,কী শক্তি!”

তানহা ঢোক গিলে বলল -পিউয়ের কাজিন।

রবিন চমকে ফিরল পিউয়ের দিকে। মেয়েটা এখনো চোখের পাতা ফেলেনি। রবিন আর একটা শব্দও না করে,সাইকেল ঘুরিয়ে ভো ভো করে ছুটল কোথাও।

তানহার হাসি পাওয়ার কথা ,তবে কেন যেন হাসতে পারল না। ঘোলা চোখে আওড়াল,

“খাতায় যেন কী লিখেছিলি!”

পিউয়ের কণ্ঠ দিয়ে কথা আসে না। তুঁতলে বলে,

“ প-পুউউউউক-কি!”

“ আর পুকি লাগছে?”

ও ঢোক গিলতে গিলতে মাথা নাড়ল দুপাশে।

শরীরটা কাঁপুনি দিলো তখনই। ধূসর ভাই মারপিটে এত এক্সপার্ট? আর পিউ কিনা তাকে তেমন গায়েই মাখছিল না! আল্লাহ গো,

এমন ভয়-ঙ্কর,তেজি লোকটাকে ও পটাবে কী করে?

( গল্পটা শুরু করেছিলাম স্রেফ ধূসর ভক্তদের জন্যে। তাই ওদের গল্পই বেশি থাকবে। বাকিদের কাছে ক্ষমা চাই। আমি এখানে সাদিফ মারিয়া বা ইকবাল পুষ্পকে সব পর্বে হাইলাইট করতে পারব না। তবে ওদের কাহিনীও থাকবে টুকটাক। কিন্তু সেটা সময় বুঝে। ওই জুটি এই জুটি বেশি দিন,এরকম বলে লাভ নেই। গল্প ধূসরের,ওকে নিয়েই থাকবে। ধন্যবাদ!)

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply