#যেখানে_প্রেম_নিষিদ্ধ
#পর্ব_৫৪
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
ভোর প্রায় পাঁচটা। মীর বাড়ির মূল গেটে বিকট শব্দে হর্ন বাজতেই নাইট গার্ড জলিল মিয়া ঘুমচোখে দৌড়ে এসে গেট খুলে দিল। ধুলোবালি মাখা তেজের ধবধবে প্রকাণ্ড কারটা উঠানে এসে একঝটকায় থামল। তেজ আর গাড়ি লক করার তোয়াক্কাও করল না। গাড়ি থেকে নেমে এক টানে আর্যার হাত ধরে সোজা ড্রয়িংরুমে ঢুকল। তাদের দুজনের চেহারার যে করুণ অবস্থা, তা দেখলে মনে হবে কোনো ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে প্রাণ নিয়ে ফিরেছে! ড্রয়িংরুমে তখন বুড়ো দাদাজান জহিরুল ইসলাম ফজরের নামাজ পড়ে হাতে তাসবিহ নিয়ে জিকির করছিলেন। পাশে বসে বড় আম্মা নাজিরা ওয়ালেদ চশমা চোখে কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করছেন। হঠাৎ ধুপধাপ শব্দে তেজ আর আর্যাকে ব্যাগ হাতে ঘরে ঢুকতে দেখে দাদাজানের হাতের তাসবিহ পড়া থমকে গেল। দাদাজান চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে গর্জে উঠলেন, “কী রে তেজ?! তিন দিনের জন্য শ্বশুরবাড়ি গেলি, আর প্রথম রাতেই চুরি করা কয়েদির মতো ভোরবেলা ব্যাগ নিয়ে হাজির হয়েছিস? কী কাণ্ড ঘটিয়েছিস ওখানে?”
তেজ সোফায় ধপাস করে বসে পড়ে দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল। তারপর এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কাতর গলায় বলল, “দাদাজান! আপনার এই সেজো নাতি বেঁচে ফিরে এসেছে, এটাই শুকরিয়া আদায় করুন! শ্বশুরের নাম আলাউদ্দিন তালুকদার হলেও লোকটা আসলে আধুনিক যুগের ‘কঞ্জুস সম্রাট’! এক রাতে যে পরিমাণ টর্চার সহ্য করেছি, আর দু’ঘণ্টা থাকলে আমার হাড্ডি বেচে উনি ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট করে ফেলতেন!” ঠিক তখনই দোতলা থেকে ট্রাউজার আর ঢিলেঢালা টি-শার্ট পরে রাজ হাই তুলতে তুলতে নেমে এলো। তেজকে দেখেই তার ঘুম উবে গেল, “ওরে বাবারে! তেজ! তুই সত্যি সত্যি ফিরে এসেছিস? তোর চেহারা তো একদম ইথিওপিয়ার রিফ্যুজিদের মতো লাগছে! কী খেসারত দিতে হলো শ্বশুরবাড়িতে?”
আর্যা লজ্জায় ও ক্লান্তিতে এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সে ধীর গলায় বলল, “আব্বু কাল রাতে ওদের খাবার টেবিলে ডাল-পানি আর ফাঁকা হাড্ডি ছাড়া কিছুই দেয়নি বড় আব্বা! আর রাতে গরমে ফ্যান বাঁধিয়ে রেখে বলেছিল তালপাতার পাখা নাড়াতে… তার ওপর বাথরুমে ভিম লিকুইড আর খাটের নিচে গোখরো সাপ!”
“কী?!” বড় আম্মা নাজিরা ওয়ালেদ হাত থেকে তিলাওয়াতের বই রেখে হাঁ হয়ে গেলেন, “জামাইকে ভিম লিকুইড দিয়ে গোসল করানোর চক্রান্ত?! ও মা গো! মেয়ে বেঁচে আছে কীভাবে ওই পরিবারে?”
রাজ তখন পেটে হাত দিয়ে ডাইনিংয়ের চেয়ার ধরে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ার উপক্রম! “হা হা হা! তেজ, তোর শ্বশুরের তো গিনেস বুকে নাম ওঠা উচিত! ভিম লিকুইড দিয়ে চুল ধুলে তো কেমিস্ট্রি ল্যাবের বিকিরণও ফেল মেরে যাবে!”
বুড়ো দাদাজান লাঠিটা মেঝেকে ঠুকে বললেন, ” তেজ, তুই এখন সোজা নিজের ঘরে যা। নাজিরা, ওদের জন্য গরম নাস্তা আর চা পাঠাও। ছেলেটার যে অবস্থা করেছে, ওকে আগে পুষ্টিকর খাবার দাও!”
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। গুলশানের এক পাঁচতারকা কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত হয়েছে দেশের তরুণ উদ্যোক্তা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সমন্বয়ে এক জাঁকজমকপূর্ণ কালচারাল গালানাইট। রাজনীতি, শিল্প ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনে তৈরি এই আয়োজনে শহরজুড়ে আলোড়ন তৈরি হয়েছে। মীর বাড়ির তিনতলার ড্রেসিং রুমের বিশাল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল নৈশি। তার পরনে নেভি ব্লু রঙের একখানা সিল্কের শাড়ি, যার পাড়ে সূক্ষ্ম রুপোলি জরি কাজের ছোঁয়া। লম্বা চুলগুলো একপাশে আলতো করে ছেড়ে দেওয়া, কানে ছোট মুক্তোর দুল। কিন্তু নৈশির মেজাজ বেশ থমথমে। আজকের এই প্রোগ্রামে আসার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে তার ছিল না। কিন্তু বুড়ো দাদাজান ও বড় আম্মার আদেশ, সংসারে যখন রাজনীতি আর দায়িত্বের প্রশ্ন আসে, তখন মীর পরিবারের বউদের স্বামীর সাথে প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে অংশ নিতে হয়। দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে সদ্য নির্বাচিত তরুণ এমপি মীর আব্রাজ রোদ। তার পরনে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি, কলার ও হাতায় সূক্ষ্ম কালো সুতোর এম্ব্রয়ডারি, আর ওপরে পরেছে একখানা কালো কাস্টম-মেড জ্যাকেট। হাতঘড়িটার ফিতে ঠিক করতে করতে আব্রাজ তার সেই চেনা ছ্যাঁচড়া ও রহস্যময় হাসি হেসে বলল, “কী ম্যাডাম? নেভি ব্লু শাড়িতে তো একদম ‘বিরোধী দলের কড়া নেত্রী’দের মতো লাগছে! তবে মেজাজটা অত গরম রাখলে মুখটা কালচে দেখাবে, একটু মিষ্টি হাসি দেন তো!”
নৈশি আয়নার ভেতর দিয়ে আবরাজের দিকে এক অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল, “আমাকে জ্ঞান দিতে আসবেন না আব্রাজ! আপনি আপনার রাজনীতি আর চামচামি নিয়ে থাকুন। আর হ্যা, আপনার ওই আওয়ামী লীগের দাম্ভিকতা আমার সামনে দেখাবেন না। আমি শুধু দাদাজানের খাতিরে যাচ্ছি, আপনার পাশে শোভা বাড়াতে নয়!”
আব্রাজ পকেটে হাত গুঁজে হালকা হেসে কাছে এগিয়ে এলো। নৈশির খুব কাছে এসে নিচু স্বরে বলল, “আহা নৈশি! রাজনীতি রাজনীতিই, কিন্তু জামাই তো জামাই! ওই সোজা হিসেবটা কবে বুঝবে? যাই হোক, চল। গাড়ি রেডি।”
নৈশি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ভ্যানিটি ব্যাগটা তুলে নিয়ে আবরাজের আগে আগে রুম থেকে বের হয়ে গেল।
পাঁচতারকা কনভেনশন সেন্টারে পৌঁছাতেই ক্যামেরার ফ্ল্যাশলাইটের আলো আর সাংবাদিকদের ভিড়ে চারপাশ ছেয়ে গেল। নবনির্বাচিত তরুণ এমপি মীর আব্রাজ রোদকে দেখেই আয়োজকরা তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এলো ফুল দিয়ে বরণ করে নিতে। আব্রাজ অত্যন্ত মেপে, অত্যন্ত প্রফেশনাল ভঙ্গিতে সবার অভিবাদন গ্রহণ করল। নৈশি তার পাশেই হাসিমুখে দাঁড়ানোর ভান করে রইল, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তার এক অদ্ভুত আত্মসম্মানের লড়াই চলছিল। সম্মেলন কক্ষে প্রবেশ করার পর দেখা গেল ড্রয়িং ও সোশ্যাল ক্লাবের বিশাল বিশাল টেবিল সাজানো। সেখানে শহরের এলিট ক্লাবের নানা বয়সের মানুষ বসা ব্যবসায়ী, আমলা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং শাসক দল ও বিরোধী দলের নানা হাই-প্রোফাইল ব্যক্তিবর্গ। আব্রাজকে কিছু ব্যবসায়ী ও প্রবীণ রাজনীতিকরা একটা টেবিলে ডেকে নিয়ে বসালেন। নৈশিকে আব্রাজ বলল, “তুমি লেডিস কর্নারে গিয়ে বোসো নৈশি, আমার কিছু জরুরি আলোচনা আছে। আধ ঘণ্টা পর তোমার কাছে আসছি।”
নৈশি নিঃশব্দে মাথা নেড়ে সোজা ভেতরের দিকে বিশিষ্ট নারীদের নির্ধারিত ভিআইপি লাউঞ্জের এক টেবিলে গিয়ে বসল। কিন্তু নৈশি বসার কিছুক্ষণ পর থেকেই আশেপাশের পরিবেশ বদলে যেতে শুরু করল। টেবিলের চারপাশে বসা কয়েকজন প্রবীণ রাজনৈতিক পরিবারের নারী, বিশিষ্ট ফ্যাশন ডিজাইনার এবং সুশীল সমাজের দু- তিনজন সদস্য নৈশির দিকে তির্যক দৃষ্টিতে তাকাতে লাগলেন। নৈশিকে চিনতে কারো বাকি ছিল না। সে যেমন মীর পরিবারের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিরোধী দল অর্থাৎ বিএনপির নেত্রী, তেমনি সে এখন সরকারি দলের তরুণ উদীয়মান এমপি মীর আবরাজের স্ত্রী! পাশেই বসা এক বয়স্ক মহিলা, যার স্বামী সাবেক এক সচিব, তিনি কফির কাপে চুমুক দিয়ে হালকা হেসে পাশের জনকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “আহা! আজকালকার রাজনীতি কত মজার, তাই না? আদর্শের লড়াই কেবল মাইক আর রাজপথে। ভেতরে ভেতরে সব তো আঁতাত! যে পরিবার বিএনপি করে দেশটা তছনছ করতে চেয়েছিল, তাদের মেয়েই এখন সরকারি দলের এমপি স্বামীর বদৌলতে পাঁচতারকা হোটেলে কফি খাচ্ছে!”
কথাটা নৈশির কানে সোজা বিষের মতো গিয়ে বিধল। নৈশির গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল, সে হাতের কফির কাপটা টেবিলের ওপর শক্ত করে চেপে ধরল।
অন্য এক তরুণী ফ্যাশন উদ্যোক্তা টিটকারি দিয়ে বলে উঠল, “আরে আন্টি, রাজনীতি তো এদের কাছে স্রেফ ব্যবসা! একদিকে বিরোধী দলের সুবিধা নেওয়া, আরেকদিকে জামাইকে এমপি বানিয়ে ক্ষমতার সুবাতাস গায়ে লাগানো! সাধারণ মানুষ হাহাকার করছে, রাজপথে মার খাচ্ছে, আর এনাদের বিএনপি পরিবার আজ সরকারি দলের বিলাসিতায় মত্ত!”
কথাগুলোর ধরণ ক্রমশ বাড়তে লাগল। আশেপাশের দুটো টেবিলের মানুষও এখন নৈশির দিকে চেয়ে হাসাহাসি করছে। আম জনতা, অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অনুসারী এবং উপস্থিত এলিট ক্লাবের মানুষজন যেন একটা সুযোগ পেয়ে গেছে নৈশিকে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিকভাবে আক্রমণ করার।
“হ্যাঁ ঠিকই তো!” অন্য এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক পাশ থেকে যোগ করলেন, “বিএনপির সেই বড় বড় কথা এখন কোথায় গেল? দেশ নাকি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে! অথচ ঘরের মেয়ে এসে বসেছে ক্ষমতাশালী মীর পরিবারের কোলজুড়ে! আসলে এই পার্টিটাই ভণ্ড আর সুবিধাবাদী!”
“লজ্জা হওয়া উচিত!” আরেকজন ফিসফিস করে বলল, “নীতি-নৈতিকতা বলতে কিছু নেই। নীতি বেচে এখন রূপ দেখিয়ে চলছেন!”
নৈশির চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা গরম জল গড়িয়ে পড়ার উপক্রম হলো। তার সারা শরীর লজ্জায়, ক্ষোভে আর অপমানে কাঁপছে। সে যে পরিবারের ঐতিহ্য আর নীতিকে ছোটবেলা থেকে লালন করে এসেছে, আজ এই জমকালো অনুষ্ঠানে সর্বসমক্ষে তার সেই পরিচয়কে এভাবে টেনে নামানো হচ্ছে, তাকে ভণ্ড ও সুবিধাবাদী বলা হচ্ছে! সে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে চাইল। কিন্তু অপমান আর কান্নার চোটে তার পা দুটো যেন অবশ হয়ে আসছিল। ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সবাই এখন তামাশা দেখছে। কেউ ভিডিও করছে, কেউ বা কুৎসিত হাসি হাসছে। নৈশির মনে হলো, তার মাথা ঘুরে পেছনের কাঁচের ওপর আছড়ে পড়বে। সে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। ‘কেন এলাম আমি এখানে? কেন নিজের আত্মসম্মানকে এভাবে বিলিয়ে দিতে এলাম?’ সে মনে মনে নিজেকে ধিক্কার দিতে লাগল।
ঠিক তখনই একটি প্রকাণ্ড, শক্ত ও উষ্ণ হাত এসে নৈশির হিম হয়ে যাওয়া কাঁপতে থাকা ডান হাতটি শক্ত করে মুঠোয় পুরে নিল! তপ্ত স্পর্শে নৈশি চমকে উঠে চোখ মেলল। পাশে দাঁড়িয়ে আছে মীর আব্রাজ রোদ!
আব্রাজের চেহারা আর সেই চেনা ফুরফুরে বা ছ্যাঁচড়া রূপের জায়গায় নেই। তার চোখ দুটো রক্তবর্ণ, চোয়াল শক্ত হয়ে ফুলে উঠেছে, আর তার পুরো অবয়ব জুড়ে নেমে এসেছে এক প্রকাণ্ড গাম্ভীর্য!
আব্রাজ এক টানে নৈশিকে নিজের গায়ের কাছে, নিজের ডান পাশে নিয়ে এলো। তারপর পুরো কনভেনশন হলের নিস্তব্ধতাকে চুরমার করে দিয়ে তার সেই গমগমে, গম্ভীর ও ধারালো কণ্ঠে গর্জে উঠল!
“স্টপ ইট! জাস্ট শাট আপ এভরিওয়ান!”
আব্রাজের ওই এক চিৎকারে পুরো ভিআইপি লাউঞ্জ এক লহমায় মহাশ্মশানের মতো নিস্তব্ধ হয়ে গেল! স্পিকারের গান বন্ধ হয়ে গেল, আশেপাশের সব গুঞ্জন স্তব্ধ হয়ে সবার চোখ এসে পড়ল আবরাজের ওপর। নৈশি স্তম্ভিত হয়ে আবরাজের মুখের দিকে তাকাল। আবরাজের চোখের আগুন দেখে নৈশির বুকের ভেতর এক অজানা তোলপাড় শুরু হলো।
আব্রাজ ধীরে ধীরে সামনে হেঁটে গিয়ে যে মহিলাটি প্রথম ত্যাচ্ছ্যিল্য করেছিল, তার ঠিক মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াল।
“আপনার নামটা যেন কী, মিসেস চৌধুরী?” আবরাজের কণ্ঠ থেকে যেন বরফ ঝরছিল, “সাবেক সচিবের স্ত্রী হয়ে আপনার এই যদি হয় কথা বলার শিষ্টাচার, তবে আপনার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে!”
মহিলা ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে কয়েক পা পিছিয়ে গেলেন, “আ-আব্রাজ… মানে এমপি সাহেব, আমরা তো জাস্ট…”
“জাস্ট কী?!” আব্রাজ হাত উঁচিয়ে কড়া কণ্ঠে টেবিলের সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলতে শুরু করল, “আপনারা এখানে বসে আম জনতা সাজছেন? রাজনীতির নামে একজন নারীর আত্মসম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন? আপনাদের কোন একতিয়ার আছে আমার স্ত্রীকে আর তার পরিবারকে সুবিধাবাদী বলার?!”
আব্রাজ এক পা এগিয়ে পুরো হলঘরের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল, “শুনুন আপনারা সবাই! রাজনীতি আমার ময়দানে, আদর্শের লড়াই রাজপথে! নৈশি বিএনপি সমর্থক পরিবার থেকে আসতে পারে সেটা তার ব্যক্তিগত ও সামাজিক বিশ্বাস! এতে তার পরিবারের কোনো অপরাধ নেই, আর তার আদর্শের প্রতি সম্মান আমারও আছে!”
আব্রাজ নৈশির দিকে এক নজর তাকিয়ে আবার উপস্থিত জনতার দিকে চোখ রেখে বলল, “আমার স্ত্রীর সাথে আমার বিয়ে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা নয়, আর না সে ক্ষমতার লোভে আমার কাছে এসেছে! সে মীর পরিবারের বউ, আর তার চেয়েও বড় কথা সে আমার স্ত্রী! মীর আব্রাজ রোদের স্ত্রী!”
হলঘরের সবাই একদম নিস্পন্দ হয়ে আবরাজের কথা শুনছিল। কারো মুখে কোনো শব্দ করার সাহস ছিল না। “যে দলই করুক না কেন,” আব্রাজ আঙুল উঁচিয়ে সুদৃঢ় গলায় হুঁশিয়ারি দিল, “যদি আজ থেকে কেউ আমার স্ত্রীর আদর্শ, তার দল কিংবা তার পরিবার নিয়ে একটিও কটু কথা বলার দুঃসাহস দেখায়, তবে ভুলে যাবেন না আমি শুধু একজন তরুণ এমপি নই, আমি মীর পরিবারের ছেলে! আমার স্ত্রীকে অপমানের খেসারত কীভাবে আদায় করতে হয়, তা আমার খুব ভালো করেই জানা আছে। চোর-সুবিধাবাদীর ট্যাগ অন্য কোথাও লাগাবেন, আমার স্ত্রীর গায়ে আঁচড় লাগলে আমি কাউকে ছাড়ব না!”
আব্রাজের সেই বজ্রকণ্ঠ আর রোষে ভরা প্রতিবাদে পুরো লাউঞ্জে এক শীতল ভয়ের হাওয়া বয়ে গেল। যারা এতক্ষণ হাসাহাসি করছিল, তারা লজ্জায় আর আতঙ্কে মাথা নিচু করে ফেলল। অনেকে চুপিচুপি ওই স্থান ত্যাগ করতে লাগল। আব্রাজ আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। সে অত্যন্ত স্নেহে কিন্তু শক্ত মুঠিতে নৈশির হাতটা চেপে ধরে টানতে টানতে হলের বাইরে নিয়ে এলো। বাইরের ঠাণ্ডা বাতাস নৈশির গালে এসে লাগল। আব্রাজ সোজা নৈশিকে নিয়ে গিয়ে নিজের রেঞ্জ রোভার গাড়ির পেছনের দরজায় গিয়ে দাঁড় করাল। সে নৈশির হাত ছেড়ে দিয়ে দরজাটা খুলে বলল, “গাড়িতে বোসো।”
আব্রাজের কণ্ঠ এখনো বেশ গম্ভীর। সে নিজের শার্টের ওপরের বোতামটা একটু ঢিলে করে দিল। নৈশি গাড়িতে না উঠে সোজা আবরাজের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরছিল। কিন্তু এ জল অপমানের নয়, এ জল চরম অপরাধবোধ ও অনুশোচনার! এতদিন সে আব্রাজকে কী ভেবে এসেছে? আব্রাজ তাকে হাজারটা পচাত, ক্ষ্যাপাত, মিষ্টি ফাইজলামি করত, সরকারি দলের অহংকার দেখাত বলে সে ধরে নিয়েছিল আব্রাজ একটা অহংকারী, খারাপ আর স্বার্থপর ছেলে! সবসময় আবরাজের সাথে দুর্ব্যবহার করেছে, তাকে খোঁচা দিয়ে কথা বলেছে, তার সাথে স্ত্রীর মতো আচরণ তো দূরে থাক, মানুষের মতো সুন্দর করে দুটো কথাও বলেনি! অথচ আজ যখন পুরো দুনিয়া, ভিন্ন দলের মানুষ, আম জনতা নৈশিকে ভণ্ড আর সুবিধাবাদী বলে ছি ছি করছিল তখন এই মানুষটাই, এই ‘আওয়ামী লীগ করা’ স্বামীটাই বাঘের মতো গর্জে উঠে পুরো সমাজের সামনে তার সম্মান রক্ষা করল! তার আদর্শকে, তার দলের ব্যাকগ্রাউন্ডকে বিন্দুমাত্র ছোট হতে দিল না! নিজের ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে শত্রুর সামনে নিজের স্ত্রীর জন্য প্রকাণ্ড এক ঢাল হয়ে দাঁড়াল!
“কী হলো? দাঁড়িয়ে আছ কেন? বোসো,” আব্রাজ নৈশির গাল বেয়ে পড়ে যাওয়া জল দেখে নিজের সুর কিছুটা নরম করে বলল, “ওদের কথায় কান দিয়ো না নৈশি। পৃথিবীর মানুষের কাজই ফালতু কথা বলা। আমি তো আছি, ভয় পাচ্ছ কেন?”
নৈশি আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে কোনো কথা না বলে এক ঝটকায় আবরাজের চওড়া বুকের ওপর গিয়ে আছড়ে পড়ল! নিজের দু’হাত দিয়ে আবরাজের কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার বুকে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সে! আব্রাজ মুহূর্তের জন্য একদম স্তব্ধ হয়ে গেল। তার হাত দুটো শূন্যে ভেসে রইল। যে নৈশি তাকে ছোঁয়া তো দূর, তার দিকে সোজা হয়ে তাকাতও না সেই নৈশি আজ নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে!
“ন-নৈশি…?” আব্রাজ বিস্ময়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল, “কী হলো? কাঁদছ কেন? কেউ তোমাকে কিছু বলেছে নাকি এখনো? দাঁড়া, আমি আবার যাচ্ছি—”
“না আব্রাজ… প্লিজ আর কোথাও যাবেন না!” নৈশি আবরাজের বুকে মুখ গুঁজেই আকুল হয়ে বলল, “আমাকে ক্ষমা করে দিন, আব্রাজ! প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দিন!”
আব্রাজ ধীরেসুস্থে তার হাত দুটো নৈশির পিঠের ওপর রাখল। আলতো করে নৈশির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে মৃদু হেসে বলল, “ক্ষমা কিসের নৈশি? কী করেছি আমি?”
নৈশি মুখ তুলে আবরাজের দিকে তাকাল। তার ভেজা চোখ দুটো জোৎস্নার আলোয় স্ফটিকের মতো জ্বলজ্বল করছে।
“আমি বড্ড ভুল ছিলাম আব্রাজ,” নৈশি কেঁদে কেঁদে বলল, “আমি সবসময় ভেবেছি আপনি খুব খারাপ, আপনি শুধু নিজের অহংকার আর রাজনীতি বোঝেন! আমি আপনার সাথে কত খারাপ ব্যবহার করেছি, আপনাকে কত কথা শুনিয়েছি! অথচ আপনি… আপনি আজ নিজের সবটুকু দিয়ে আমার সম্মান বাঁচালেন? আমার মতো একটা খারাপ মেয়ের জন্য সবার সাথে লড়াই করলেন?”
আব্রাজ একহাতে নৈশির গালের জল মুছে দিল। তার ঠোঁটের কোণে আবার ফুটে উঠল সেই মায়াবী, ক্ষ্যাপাটে আর গভীর ভালবাসার হাসি।
“আরে বোকা মেয়ে!” আব্রাজ নিচু স্বরে বলল, “তুমি আমাকে হাজারটা গালি দাও, পচাও, আওয়ামী লীগ নিয়ে খোঁচা দাও ওটা আমাদের পার্সোনাল বিষয়! ওটা আমার জামাই-বউয়ের ভালোবাসা আর ঝগড়ার সম্পর্ক! কিন্তু বাইরের কোনো থার্ড পারসন এসে আমার নৈশিকে একটা বাজে কথা বলবে, আর আব্রাজ রোদ চুপ করে দাঁড়িয়ে আঙুল চুষবে? অত সহজ নাকি?”
আব্রাজের এই সহজ অথচ অতল ভালোবাসার গভীরতা নৈশির হৃদয়ে এক নতুন অনুভূতির জন্ম দিল। এতদিন যে হৃদয়ে ছিল কেবল রাজনৈতিক তিক্ততা আর মান-অভিমান, আজ সেখানে আবরাজের জন্য এক সমুদ্র ভালোবাসার প্লাবন নেমে এসেছে! নৈশি বুঝতে পারল, এই ছেলেটা মুখে যতই পচাক, যতই ফাজিল হোক তার হৃদয়টা কাঁচের মতো পরিষ্কার এবং তার ভেতরের পুরুষটা তার স্ত্রীকে আগলে রাখার জন্য যেকোনো ঝড়ের মুখোমুখি হতে পারে! নৈশি আবার আবরাজের বুকে নিজের মাথাটা সঁপে দিল। এবার সে আর কোনো দূরত্ব রাখল না।
আব্রাজ নৈশিকে আরো নিবিড় করে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল।
বিকেল চারটে। মীর ইন্ডাস্ট্রিজের সুউচ্চ গ্লাস টাওয়ারের ওপর সিইও-র সুবিশাল অফিস রুম।
রুমের বিশাল কাঁচের দেয়াল দিয়ে পুরো ঢাকা শহরের ব্যস্ত রূপ স্পষ্ট দেখা যায়। ভেতরের পরিপাটি আবহে কেবল ফাইলপত্রের ঘ্রাণ আর এসির হালকা গুঞ্জন। রিভলভিং চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছেন মীর ইন্ডাস্ট্রিজের সর্বেসর্বা, তরুণ ও কড়া মেজাজের সিইও মীর আরযান শান। পরনে তার গাঢ় ছাই রঙের দামী ব্লেজার, ভেতরের ধবধবে সাদা শার্টের কলারটা নিখুঁতভাবে সেট করা। চোখে সেই স্পেশাল মেটালিক ফ্রেমের চশমা। আরযানের সামনে ফাইল হাতে দাঁড়িয়ে আছেন কোম্পানির চিফ এক্সিকিউটিভ প্রীতম। প্রীতম কাঁপতে কাঁপতে বলছিলেন, “স-স্যার… নতুন প্রজেক্টের বাজেট রিপোর্টটা… আপনি যেভাবে চেয়েছিলেন সেভাবেই তৈরি করা হয়েছে।”
আরযান এক নজরে ফাইলের পাতাগুলোতে চোখ বোলাল। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যেন এক সেকেন্ডে সব ভুল ধরে ফেলল। সে ফাইলটা বন্ধ করে টেবিলের ওপর আলতো শব্দে রাখল।”প্রীতম,” আরযানের কণ্ঠ বরফের মতো ঠান্ডা, “আমি তোমাকে ফিনান্সিয়াল অ্যানালাইসিস করতে বলেছিলাম, বাচ্চাদের যোগ-বিয়োগ খেলা দেখতে বলিনি। আর পাঁচ মিনিটের মধ্যে পুরো রিপোর্ট রি-রাইট হয়ে আমার মেইলে আসা চাই। আদারওয়াইজ, ইউ আর ফায়ারড।”
“ই-ইয়েস স্যার! এখনই করছি স্যার!” প্রীতম তড়িঘড়ি করে ফাইল নিয়ে এক প্রকার জিব নিয়ে দৌড়ে বের হয়ে গেল।
অফিসে সবাই তাকে চেনে ‘দ্য হিটলার সিইও’ নামে। যার একটা ভুল চাহনিতে গোটা বোর্ডের ডিরেক্টরদের ঘাম ছুটে যায়! প্রীতম বের হতেই আরযান চেয়ারে হেলান দিয়ে চশমাটা একটু নিচে নামাল। তার ডান হাতটা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ল্যাপটপের ওপর চলে গেল। অত্যন্ত প্রফেশনাল এই সিইও নিজের আলমারির আড়ালে রাখা এক স্পেশাল সিকিউরিটি পাসকোড ডায়াল করে ল্যাপটপের একখানা প্রাইভেট উইন্ডো অন করল। স্ক্রিনে মুহূর্তের মধ্যে ভেসে উঠল মীর বাড়ির তিনতলার সাঁঝের ঘরের সিসিটিভি ফুটেজ!
সাঁঝ! সাঁঝ কোথায় যাচ্ছে, কী করছে, কখন কার সাথে কথা বলছে সব কিছুর ওপর আরযানের দৃষ্টি এই গোপন সিসিটিভির মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা নিবদ্ধ থাকে।
স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই আরযানের শক্ত চোয়াল সামান্য আলতো হলো। স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে, সাঁঝের ঘরে তার দুজন বিশ্বস্ত বান্ধবী এসেছে। ঘরের খাটের ওপর ছড়ানো রকমারি কাঁচের চুড়ি, মেকআপের ড্রেসিং কিট আর একটা ঘিয়ে রঙের রাজকীয় সুতি জামদানি শাড়ি। তিন বান্ধবী মিলে তুমুল আড্ডা দিচ্ছে, হাসাহাসি করছে আর বাইরে রেস্টুরেন্টে গিয়ে ছবি তোলার প্ল্যান করছে। সাঁঝ আজ খুব খুশি। পরনে তার সাধারণ একটা কুর্তি, চুলগুলো ঢিলেঢালা করে বাঁধা। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বান্ধবীদের সাথে শাড়ি পরার কায়দা নিয়ে আলোচনা করছিল।
হঠাৎই এক বান্ধবী সাঁঝের হাত ধরে হেসে বলল, “সাঁঝ! অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে তো রে! তুই আগে চল, জামাটা খুলে শাড়িটা প্যাঁচাতে শুরু কর!”
সাঁঝ মিষ্টি হেসে মাথা নেড়ে নিজের গায়ের লম্বা জামাটার পেছনের চেইনটা আলতো করে খুলতে হাত বাড়াল… ঠিক সেই মুহূর্তে ল্যাপটপের স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা আরযানের বুকের ভেতর যেন বিকট এক থরথর কম্পন সৃষ্টি হলো! আরযানের কান দুটো এক লহমায় টকটকে লাল হয়ে গেল! সে চট করে চোখ ফিরিয়ে নিল। যদিও সাঁঝ তার চোখের মনি, তার সর্বস্ব… কিন্তু সাঁঝের এই একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তে নজর দেওয়া তো দূরের কথা, কোনো পুরুষালি অসভ্যতাকে আরযান প্রশ্রয় দেওয়ার মতো মানুষ নয়!
আরযান এক মুহূর্তও দেরি না করে হাত বাড়িয়ে ল্যাপটপের স্ক্রিনটা ঠাস করে বন্ধ করে দিল! সে চেয়ারে বসে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হাত দিয়ে নিজের কপাল চেপে ধরে ফিসফিস করল, “উফ সাঁঝ… তোকে নিয়ে আমি কী যে করব!”
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। ততক্ষণে নীল আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গিয়ে ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। মুষলধারে নামা বৃষ্টির শব্দে ধানমন্ডি ৮ নম্বরের কাঁচের তৈরি সেই বিলাসবহুল ক্যাফেটার চারপাশ এক মায়াবী আবহে ভরে উঠেছে। ক্যাফের ভেতরের এক কোণে বসেছিল সাঁঝ আর তার বান্ধবীরা। সাঁঝকে ঘিয়ে রঙের শাড়িতে, হাতে লাল কাঁচের চুড়ি আর খোলা চুলে যেন এক রূপকথার অপ্সরী লাগছিল। তারা কফি খাচ্ছিল আর দেদারসে ছবি তুলছিল।
কিন্তু বিপত্তি ঘটল ক্যাফে থেকে বের হওয়ার সময়!
ক্যাফের বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি, আর সাথে কালবৈশাখী ঝড়ের মতো হাওয়া বইছে। রাস্তার জমা পানিতে চারপাশ থৈ থৈ করছে। সাঁঝ শাড়ির কুঁচি সামলে কোনমতে দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল। তার বান্ধবীদের গাড়ি চলে এলেও, সাঁঝের গাড়ি আসার কোনো নাম নেই। ঠিক তখনই ক্যাফের বাইরে এসে থামল প্রকাণ্ড একখানা নেভি ব্লু রঙের ল্যান্ড ক্রুজার! গাড়ির দরজা খুলে সেখান থেকে কালো ছাতা হাতে নেমে এলেন মীর ইন্ডাস্ট্রিজের সিইও মীর আরযান শান! পরনের ছাই রঙের ব্লেজারটা খুলে এখন শুধু শার্টের বোতামগুলো খোলা, হাত দুটো পকেটে। বৃষ্টির পানির ঝাপটায় আরযানের চুলগুলো সামান্য ভিজে কপালে এসে পড়েছে। সে ধীর পায়ে ক্যাফের গেটের দিকে হেঁটে আসতে লাগল। আরযানকে ওই বৃষ্টি আর সন্ধ্যার ঝাপসা আলোয় হেঁটে আসতে দেখে সাঁঝের বুকটা ভয়ে আর আতঙ্কে একদম শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল! সাঁঝের বান্ধবীরা তো আরযানকে দেখে পুরো হা হয়ে গেল, “ওরে বাবারে! তোর এই রাগী চাচাতো ভাইয়া এখানে কীভাবে এলো?!”
সাঁঝ ভয়ে এক পা পিছিয়ে গিয়ে দরজার কাঁচ আঁকড়ে ধরল, “আ-আরযান ভাইয়া… আপনি?”
আরযান কোনো কথা বলল না। তার চোখের সেই শীতল ও গম্ভীর চাহনি সাঁঝের ওপর স্থির। সে সাঁঝের ঠিক সামনে এসে ছাতাটা নিজের বাঁ হাতে ধরল। সাঁঝের কাঁপা কাঁপা ঘিয়ে রঙের শাড়ির আঁচলটা বৃষ্টির বাতাসে উড়ছিল। “কোথায় যাওয়া হচ্ছিল?” আরযানের কণ্ঠ বৃষ্টির শব্দের চেয়েও গম্ভীর শোনাল।
সাঁঝ তোতলে উঠে বলল, “ব-বান্ধবীদের সাথে একটু খেয়েছিলাম… এখন বাড়ি ফিরতাম…”
“এই ঝড়ের মধ্যে? শাড়ি পরে কাঁদার মধ্যে হেঁটে গাড়িতে উঠবি?” আরযান চশমা ছাড়া চোখ দুটো ছোট ছোট করে তাকাল।
“না মানে… আমি ট্যাক্সি ডাকছিলাম…”
সাঁঝের কথা শেষ হওয়ার আগেই, আরযান ছাতাটা নিজের কাধের ওপর ব্যালেন্স করে, এক সেকেন্ডও সময় না নিয়ে সোজা নিচু হয়ে সাঁঝের কোমরের নিচে আর হাঁটুতে হাত বাড়িয়ে দিল!
“আ-আরযান ভাইয়া?! কী করছেন?!” সাঁঝের অস্ফুট আর্তনাদ বের হওয়ার আগেই আরযান এক এক ঝটকায় সাঁঝকে শূন্যে তুলে নিল! সাঁঝের হাতের লাল কাঁচের চুড়িগুলো রুনঝুন শব্দে বেজে উঠল! ভয়ে আর আতঙ্কে সে নিজের দু’হাত দিয়ে আরযানের চওড়া শার্টের কলার শক্ত করে চেপে ধরল। সাঁঝের বুকের ধুকপুকানি আরযানের ছাতির ওপর পরিষ্কার অনুভূত হচ্ছিল! সাঁঝের বান্ধবীরা তো মুখে হাত দিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল! আরযান অত্যন্ত শান্ত, কিন্তু শক্ত পায়ে সাঁঝকে কোলে নিয়ে বৃষ্টির ঝাপটা এড়াতে নিজের ছাতাটা তার ওপর ঝুঁকিয়ে দিল। ঝুম বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা আরযানের পিঠে গিয়ে পড়ছিল, কিন্তু সে সাঁঝের শাড়িতে এক ফোঁটা কাদা বা পানি লাগতে দিল না। সাঁঝ ভয়ে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে রেখেছে। তার বড় ভাই, তার ‘হিটলার’ চাচাতো ভাই তাকে এভাবে সবার সামনে কোলে তুলে নিয়ে যাচ্ছে এই লজ্জায় তার পুরো মুখ আর গাল টকটকে লাল আপেলের মতো হয়ে উঠেছে! গাড়ির কাছে এসে আরযান এক হাতে পেছনের সিটের দরজাটা খুলে দিল। তারপর খুব নমনীয়ভাবে সাঁঝকে গাড়ির নরম চামড়ার সিটে বসিয়ে দিল।
গাড়ির দরজা বন্ধ হতেই বাইরের সব ঝড়ের শব্দ স্তব্ধ হয়ে গেল। আরযান অন্য পাশ দিয়ে গাড়িতে উঠে ড্রাইভ সিটে বসল। তার শার্টের পেছনের অংশ ভিজে গেছে, কিন্তু সে সেদিকে পাত্তাই দিল না। সে চশমাটা পরে নিয়ে আয়নায় সাঁঝের দিকে তাকাল। সাঁঝ সিটে একদম জবুথবু হয়ে বসে আছে, ভয়ে তার পা কাঁপছে। সে শাড়ির আঁচল দিয়ে নিজেকে পেঁচিয়ে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। আরযান গাড়ির এসিটা কমিয়ে হিটার অন করে দিল। তারপর পেছনের সিটের দিকে ঘুরে একটি টিস্যু বক্স আর একটা শুকনো তোয়ালে সাঁঝের দিকে বাড়িয়ে দিল।
“চুলগুলো মুছে নে, সাঁঝ। ঠাণ্ডা লাগবে,” আরযানের গলায় আর সেই কড়াকড়ি নেই, সেখানে কেবল এক অদ্ভুত মায়াবী সুর।
সাঁঝ হাত বাড়িয়ে তোয়ালেটা নিল। সে নিচু স্বরে বলল, “আ-আপনি কীভাবে জানলেন আমি এই রেস্টুরেন্টে আছি?”
আরযান স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে এক হালকা মুচকি হাসল। “আমি সিইও, সাঁঝ। পুরো শহরের খবর রাখি, আর তুই তো আমার সবচেয়ে বড় প্রজেক্ট!”
চলবে? See less
Share On:
TAGS: ইশরাত জাহান জেরিন, যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ গল্পের লিংক
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৩২
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ১০
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ১৪
-
প্রেম আসবে এভাবে গল্পের লিংক
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৬+৭
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪+৫
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৪৫
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪৯
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪৪