দুইজনাতেই
পর্ব_০৩
লেখনীতেঃ অলকানন্দা ঐন্দ্রি
“ আমার ছেলেটা এবার ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছে আপা। এই তো সামনের মাসেই কানাডা যাবে। আপনার মেয়টাকে আমার বেশ মনে ধরেছে বুঝলেন? আমার ছেলেরও বেশ পছন্দ হয়েছে। দুইজনকে মানাত ও খুব সুন্দর। ”
ঠিক এইটুকু শোনার পরই সাক্ষ্যর পা থেমে গেল। মুহুর্তের মধ্যে ঘাড় ফিরে ওদিক ফিরে চেয়েই ভ্রু উঁচাল। ঠিক তখনই আবারও সাক্ষ্যর কানে ভেসে এল,
“ তাই নাকি আন্টি? আমার অনেকদিনের শখ কানাডা যাওয়ার। আপনার ছেলে কি নিয়ে যাবে আমাকে? ”
দ্বিতীর মা মুহুর্তেই দ্বিতীকে চোখ রাঙ্গিয়ে কনুইয়ে চিমটি কাঁটল। মেয়েটা সত্যিই একটা বিচ্ছু! অন্যদিকে সাক্ষ্যর ভ্রু জোড়া এইটুকু শুনে আরো কুঁচকে এল। বাহ! কয়েক বছর যাবৎ একটা ছেলের সামনে-পিছনে ঘুরঘুর করে ছেলেটাকে ড্যাবড্যাব করে দেখতে দেখতেই কবুল বলে বিয়ে করল। আর এখন কিনা অন্য কারোর সাথে কানাডা যাওয়ার প্ল্যান করছে? দারুণ ব্যাপার। সাক্ষ্য ওভাবেই দাঁড়াল। মুখচোখ টানটান করে গম্ভীর একটা ভাব এনে ভ্রু উঁচু করে রাখতেই ভদ্রমহিলা হেসে বললেন,
“ নিবে না কেন মা? অবশ্যই নিবে। দেখো বিয়ের পর ওখানেই স্যাটেল হয়ে যাবে তোমাকে নিয়ে। ”
দ্বিতী ফের আবারও কিছু বলতে নিচ্ছিল। দ্বিতীর মা তখনই ফের চোখ রাঙাল। কনুই ধরে টেনে নিজের পাশে দাঁড় করিয়ে ভদ্রমহিলাকে হেসে হেসে বলল,
“ আরেহ আপা, আমার মেয়ের জন্য একটা লাল টুকটুকে বর অলরেডি ঠিক করে নিয়েছি যে। নয়তো অবশ্যই ভাবতাম আপনার প্রস্তাবটা। কিন্তু এখন যে আর ভাববার সুযোগ নেই। এক রাজপুত্র এসে নিজের করে নিয়েছে আমার রাজকন্যাকে। ”
এইটুকু বলতে বলতেই দ্বিতীর মা হাসলেন। অপরদিকে ভদ্রমহিলা আশাহত হয়ে চাইতেই পাশে এসে দাঁড়াল ভদ্রমহিলার ছেলেও। মাকে কোন এক দরকারেই ডাকতে এল বোধহয় ছেলেটা। অথচ এসেই মায়ের হতাশ মুখ দেখে ভ্রু কুঁচকাল। ভদ্রমহিলা এবারে বড্ড হতাশ স্বরে বলল,
“ দেখুন, এই হলো আমার রাজপুত্রটা। আপনার রাজকন্যার সাথে দারুণ মানাত। আমি দূর থেকে দাঁড়িয়ে এতক্ষন আপনার মেয়েকে দেখে এসব ভাবছিলাম। কিন্তু আপনি তো বললেন, হবে না। ”
দ্বিতী শুনল। এবার সান্ত্বনা দিতেই বলল,
“ থাক আন্টি, মন খারাপ করবেন না। আপনার রাজপুত্র ঠিক একটা রাজকন্যা পেয়ে যাবে। ”
ছেলেটা শুধু বিস্ময় নিয়ে চাইছিল। চোখজোড়া গোল গোল করে যখন দ্বিতীর কথা শুনছিল ঠিক তখনই দ্বিতী ছেলেটার বিস্ময় দেখে বলল,
“ হাই, আন্টির রাজপুত্র!”
একটু খানিক দূরে দাঁড়ানো সাক্ষ্যর এবার ভ্রু আরো উঁচু হলো। খুব সূক্ষ্ম নজরে দ্বিতীর হাই বলাটা খেয়াল করেই শরীর মন সব কেমন যেন রাগে শিরশর করল। অথচ বাইরের রূপটা শান্ত, স্থির! সাক্ষ্য দাঁড়াল না আর। স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই পা বাড়াল। মুখভঙ্গিও রাখল অত্যন্ত স্বাভাবিক। যেন কিচ্ছু হয়নি। অথচ সাক্ষ্য জানে, আসলর কি হচ্ছে!
.
বিয়েবাড়ির রমরমা খাওয়া-দাওয়ার পর্বে সাক্ষ্য আর দ্বিতী বসল পাশাপাশিই। সাথে সাক্ষ্যর ছোটভাই সাম্য এবং কথা। দ্বিতী খাওয়ার মধ্যেই কয়েকবার আড়চোখে তাকিয়ে সাক্ষ্যকে পরখ করল। অথচ সাক্ষ্য একবারও তাকাল না। পাশে বিবাহিত স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও একটাবার ফিরে দেখছে না স্ত্রীর দিকে। এহেন দুঃখে দ্বিতীর চোখ বুঝে বসে থাকতে মন চাচ্ছে। কেন তাকাবে না? দ্বিতী সুন্দর নয়? নাকি শাড়িতে দ্বিতীকে সুন্দর লাগছে না? কোনটা? দ্বিতী মনে মনে এই রাগ-ক্ষোভ আর হতাশা নিয়েই বিড়বিড় করল,
“ একটা মানুষ কেমন নির্দয় হলে এমন হয়? আমার দিকে তাকাচ্ছে না। আমার দিকে! কখনো শুধু তাকাক, আমি চোখ গ্লু দিয়ে আটকে দিব একদম! ”
দ্বিতী এইটুকু মনে মনে বলতেই সাম্য পাশ থেকে বলল,
“ দ্বিতীর জন্য একটা বিয়ের প্রস্তাব পেয়েছি ভাইয়া। তুমি রাজি থাকলে দিয়ে দেই বিয়ে বলো? আরো একটা দাওয়াত খেতে পারব। কি বলো তুমি? ”
সাক্ষ্য তাকাল। কপাল শিথিল করে উত্তর করল,
“ কি বলব? ”
“ পাত্র একদম ভালো। ইঞ্জিনিয়ার। সামনেই কানাডা যাবে। ”
দ্বিতী ভ্রু কুঁচকাল শুধু। ঘাড় বাঁকিয়ে উৎসুক হয়ে দেখছিল কি বলে সাক্ষ্য। অথচ সাক্ষ্য কেবল ভ্রু নাচিয়ে এইটুকুই বলল,
“ তো? ”
কথা হাসল নিঃশব্দে। সাম্যর মুখটা একটু হলেও কালো হয়েছে দেখে বলল,
“ সাম্য, তুই এমন ছোট বাচ্চাদের মতো কথা বলিস কেন? ভাইয়ার বিয়ে করা বউকেই নাকি ভাইয়ার সামনে বিয়ে দিয়ে দিবে। সাহস কত! ”
সাম্য নাক ফুলিয়ে তাকাল। ফুঁসে উঠল যেন। কথাকে দুচোখে সহ্য করতে না পারা সাম্য মুহুর্তেই বলল,
“ তুই চুপ কর কাঁথা। খেয়ে খেয়ে হাতি হচ্ছিস, হাতি হ। আমার কথায় নাক গলাতে বলেছি তোকে? ”
কথা এই পর্যায়ে চুপ হলো। মেয়েটা লক্ষী স্বভাবী, শান্ত। আর স্বাস্থ্যের দিক দিয়ে গুলুমুলু । সহজ ভাষায় মোটা। আর এই মোটা অর্থ্যাৎ স্বাস্থ্যটুকুর কারণেই মেয়েটা কত কথা শুনছে চারপাশে। কত মজা, কত উপহাস। কথা সত্যিই চুপ হয়ে গেল। মনটা খারাপ হয়ে এল এক মুহুর্তেই যেন। যা স্পষ্টই মেয়েটকর চোখ মুখে ফুটে এল। সাক্ষ্য এই কারণেই সাম্যকে শাসাল। চোখমুখ কুঁচকে শুধাল,
“ এসব কি কথা সাম্য? বলেছি না ওকে এভাবে বলবি না তুই? ”
এর পরের মুহুর্তে সাম্য চুপ হলো, কথাও চুপ হলো। শুধু সাক্ষ্যর শান্তি লাগল না। দ্বিতী ঠিক তার পাশেই বসা। আরামেই বসে বসে খাচ্ছে। অথচ ভাবখানা এমন কিচ্ছু হয়নি। সাক্ষ্য ছোটশ্বাস ফেলর পাশের টেবিলে তাকাতেই দেখা গেল ওখানে বেশ কয়জন ছেলে বসেছে। খাবার খাওয়ার সাথে চোখের নজর বারবার এদিকেই ঘুরপাক খাচ্ছে। সাক্ষ্যর বুঝতে কষ্ট হলো না। শীতল এক রাগ সমস্ত শরীরে বইতেই সাক্ষ্য খাওয়া থামিয়ে ওদিক পানে তাকিয়ে থাকল। ছেলেগুলো তাকানোর সাহস করল না বোধহয় আর তার তাকানো দেখেই। সাক্ষ্য অবশ্য এতে তৃপ্তি পেল না। আরাম করে বসে অপেক্ষা করল দ্বিতীর খাওয়া শেষ হওয়ার। অতঃপর খাওয়া শেষ হতেই শান্তশিষ্ট অথচ চতুর সাক্ষ্য তরকারির ঝোল টুকু ইচ্ছে করেই ফেলল দ্বিতীর শাড়িতে। দ্বিতী তড়িৎগতিতেই ছিটকে যাওয়ার চেষ্টা করল যেন৷ ফোঁসফাঁস করে বলল,
“ কি করলেন এটা? আমার শাড়িটা! ”
সাক্ষ্য কিছুই করেনি এমন এক ভঙ্গিতে তাকাল। অত্যন্ত হীম শীতল গলায় জানাল,
“ কি করেছি? ”
“ তরকারি টা আমার শাড়িতেই ফেলেছেন। জেনেবুঝে, ইচ্ছে করেই। ”
“ তো? ধুঁয়ে নিন। ”
ঠিক এইটুকু বলেই অপরিচিত এক পুরুষের মতো সাক্ষ্য পা বাড়াল। ফিরেও চাইল না দ্বিতীর দিকে। অথচ দ্বিতী দাঁড়িয়ে সাক্ষ্যর চলে যাওয়াটাই দেখছিল। কি নিষ্ঠুর! বউকে সমস্যায় ফেলে কিভাবে একা একা চলে যাচ্ছে। দ্বিতী মনে মনে রাগই ফুঁসল। একশো একটা কথা শুনিয়ে অবশেষে গেল শাড়িতে ঝোল পড়া অংশ টুকুই পরিষ্কার করতে। অথচ হলো না। ওয়াশরুমে গিয়েই শাড়িটা পরিষ্কার করে চলে আসবে ভাবতেই ভাবতেই যখন পা বাড়াচ্ছিল ঠিক তখনই কানে বাজল,
“ কানাডা যাওয়ার খুব শখ না মিসেস সাক্ষ্য এহসান? পাঠিয়ে দেই আপনাকে কি বলুন? ”
দ্বিতীর পা জোড়া তখনই থামল। পিছু ফিরে তাকাতেই বুঝল সাক্ষ্য পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে। মুখভঙ্গি দেখে বুঝার উপায় নেই যে রেগে আছে নাকি অন্যকিছু। দ্বিতী শুধু দেখল। উত্তর করার আগেই সাক্ষ্যে ফের ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,
“ কি হলো? যাবেন না কানাডায়? ”
দ্বিতী মুখ কুঁচকাল। উত্তর দিল,
“ যাব না কেন? অবশ্যই যাব। ”
সাক্ষ্য হাসল এবারে ঠোঁট এলিয়ে। দ্বিতীর দিকে চেয়ে ফের ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন করল,
“ শিওর? ”
“ হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর। ”
সাক্ষ্য আবারও হাসল দ্বিতীর আড়ালেই। দ্বিতীর চাহনি তীক্ষ্ণ। দেখে মনে হচ্ছে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। এইটুকু অবলোকন করেই পা বাড়িয়ে সামনে এল সাক্ষ্য। একদম সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“ শুনে খুশি হলাম। যাচ্ছেন কবে? সেকেন্ড ম্যারেজের পর? ”
দ্বিতী শুনল। উত্তর করল,
“ সেকেন্ড ম্যারেজ হলে খারাপ কোথায়? ছেলেটা জোশ না বলুন? লম্বা, চওড়া একদম রাজপুত্রের মতোই! ”
শুধুই প্রশংসা করল দ্বিতী। অথচ সে ছেলেটাকে ভালোভাবে খেয়াল ও করেনি। কি পরেছে না পরেছে এসবও দেখল না। লম্বা নাকি খাটো তাও না। তবুও করল। শুধুমাত্র সাক্ষ্যর জন্যই। সাক্ষ্য সমস্তটাই শুনল। শুনে প্রশ্ন ছুড়ল,
“ মিসেস সাক্ষ্য এহসান, অস্পষ্টইাবে এইটুকুই বুঝাতে চাচ্ছেন যে আপনি দ্বিতীয় বিয়েতে সম্মতি প্রদান করছেন তাই তো? ”
“ তাই। ”
সাক্ষ্যর কপাল কুঁচকানো। সুন্দরী বউ সামনে থাকলে যেভাবে মুগ্ধ নজরে তাকানো উচিত তার বিন্দুমাত্রও দেখা গেল না চোখেমুখে। বরং শীতল রাগ নিয়ে কিছুটা ঝুঁকে একদম দ্বিতীর চোখে নজর রাখল। কন্ঠে শীতল রাগ ঢেলে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ দ্বিতীয়বার বিয়ের শখ বলেই কি এভাবে শাড়ি পরে সেঁজেগুজে ছেলেমানুষ ভর্তি বিয়েবাড়িতে ঘুরে বেড়ানোর সাহস হয়েছে মিসেস দ্বিতীকা তাসনিম? নো প্রবলেম! সাক্ষ্য এহসান তার ওয়াইফের সাহসকেও নিভাতে জানে। জাস্ট ওয়েট! ”
চলবে…
[ শুভ নববর্ষ। একটু দেরির জন্য দুঃখিত। আর হ্যাঁ সবাই মন্তব্য জানাবেন অবশ্যই হুহ? নয়তো কষ্ট পাব।বিদ্যুৎ আসা যাওয়ার মধ্যে অন্ধকারে বসে গরমে মশার কামঁড় খেয়ে লিখছি৷ এলোমেলো হইতে পারে।তবুও, রেসপন্স করিয়েন প্লিজ আগের দুই পর্বের মতো। রেসপন্স বেশি করলে আমি ফটাফপ লিখে ফেলব।
]
Share On:
TAGS: অলকানন্দা ঐন্দ্রি, দুইজনাতেই
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দুইজনাতেই পর্ব ১১
-
দুইজনাতেই পর্ব ৩৩
-
দুইজনাতেই পর্ব ৮
-
দুইজনাতেই পর্ব ৩৯
-
দুইজনাতেই পর্ব ৩৬
-
দুইজনাতেই পর্ব ২২
-
দুইজনাতেই পর্ব ৭
-
দুইজনাতেই পর্ব ১৯
-
দুইজনাতেই পর্ব ২৮
-
দুইজনাতেই পর্ব ৩৮