দুইজনাতেই
পর্ব_০২
লেখনীতেঃ অলকানন্দা ঐন্দ্রি
সাক্ষ্য এহসান! দ্বিতীর চোখের বালি এই পুরুষটিই আজ ভার্সিটিতে কালো পাঞ্জাবী পরে এসেছে। সুদর্শন পুরুষের রূপটা যেন এবারে চোখে ষোলো আনাই ফুটছে। দ্বিতী তাকাবে না প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েও বারকয়েক তাকাল আড়ালে আবড়ালে। ঘন চুল, খোঁচা দাঁড়ি আর কালোর ফ্রেমের চশমা সাথে কালো পাঞ্জাবী। বেশ অনেকটা সময় যাবৎই ভার্সিটি ক্যান্টিনে বসে সাক্ষ্যকে সরু চোখে পরখ করতে করতেই মনে মনে আওড়াল,
“ কোন এক চৈত্র মাসে এই সুদর্শন পুরুষ আমার জীবনে কেন এসেছিল? এমন বুকের ভেতর ধুকপুক ধুকপুক রোগটা তৈরি করে হার্টের রোগী বানিয়ে দেওয়ার জন্য? কি আশ্চর্য! আমি যদি এভাবে অকালে মরে যাই?”
দ্বিতী খুবই চিন্তিত হলো। মনে মনে এতকিছু ভেবেই মুহুর্তেই মনে করল সেদিনকার অপমানের কথা। দ্বিতীকে, অর্থ্যাৎ নিজের স্ত্রীকেই নিজের দিকে তাকানোর জন্য ক্লাস থেকে বের করে দিয়েছিল। ছিঃ! এহেন অপরাধের পরও দ্বিতী তাকাল কি করে ঐ পুরুষের দিকে? কিভাবে? তাও এতোটা সময়? দ্বিতীর নিজের চোখের প্রতিই বিতৃষ্ণা জন্মাল। ইচ্ছে হলো চোখগুলোকে নিজেই খুলে নিয়ে ব্যাগের ভেতর ডুকিয়ে নিক। নিজের চোখ যদি নিজের নিয়ন্ত্রনেই না থাকে তো সে চোখ থেকে উপায়টা কি? দ্বিতী ফোঁসফাঁস করল। মুহুর্তেই শুনল পাশ থেকে মিহুর গলা,
“ সাক্ষ্য স্যারের থেকে আজ সত্যিই চোখ সরানো যাচ্ছে না, তাই না দ্বিতী?”
দ্বিতী মুহুর্তেই ফিরল। মিহুর দিকে চেয়ে বুঝল মিহু নিজেও দুয়েকবার তাকিয়েছে। পাশে তিন্নি তো তখন থেকেই তাকানো একপলকেই। দ্বিতী গলা ঝাড়ল। বোধহয় তার তাকানোটাও মিহু খেয়াল করে নিয়েছে। ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ তো? আমার কি? ”
“ তোর কি মানে? তুই ও তো দেখলাম এতক্ষন ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে ছিলি। ”
দ্বিতী মুহুর্তেই কপাল কুঁচকাল। জানাল,
“ ছিঃ! ঐ লোকের দিকে? কোন দুঃখে? আমার চোখ অন্ধ না হওয়া অব্দি ঐ লোকের দিকে তাকানোর চান্স নেই। ”
খেয়া এবারে নোট থেকে মুখ তুলে তাকাল। দ্বিতীর কথা শুনেই মুহুর্তে একটা হাসি দিয়ে বলল,
“ বোধহয় উনাকে দেখতে দেখতেই তোদের চোখ অন্ধ হয়ে যাবে রে দোস্ত। আমি জানি না, সবাই সাক্ষ্য স্যারকে স্যার হিসেবে না দেখে প্রেমিক হিসেবে দেখে কেন। আমার তো স্যারের বুঝানো সেই ভালো লাগে। ”
মিহু মুহুর্তেই শুধাল,
“ সাক্ষ্য স্যার দুটোতেই পার্ফেক্ট রে দোস্ত। সব দিক দিয়েই পার্ফেক্ট।যদি কোনভাবে এমন একজন জুটে যেত কপালে। ”
দ্বিতী কপাল কুঁচকায়। এমন ভাবে সেঁজেগুজে আসেই বা কেন ভার্সিটিতে যে মানুষজন চেয়ে থাকে? আফসোস করে? মনে মনে হাজারটা রাগ ফুসে নিয়েই বান্ধবীকে বলল,
“ সাক্ষ্য স্যারকে ট্রাই করবি? আমরা সবাই মিলে হেল্প করব প্রয়োজন হলে। করবি কিনা? বল। ”
মিহু লজ্জা নিয়ে হাসল। মুখ নুইয়ে নিয়ে বলল,
“ দ্যাত। তোকে তো ক্লাসরুম থেকে বের করেছে, আমাকে নির্ঘাত ভার্সিটি থেকেই বের করে দিবে। ”
দ্বিতী তবুও আশ্বাস দিল। বলল,
“ আরেহ সমস্যা নেই। আমরা নিজেরাই হেল্প করব। তোকে আজকের মধ্যেই নাম্বার খুঁজে দিব দেখিস। ”
অতঃপর দ্বিতী মনের মধ্যে ভয়ংকর রাগ ফুসে উপরে শুধু হাসল। মনে মনে আওড়াল,
“ সাক্ষ্য এহসান, খালি দ্বিতীকা তাসনিমকে ঠকানোর সাহস করে দেখবেন! সোজা খু’ন করে দিব। ”
.
দ্বিতীকে সেদিন বের করে দেওয়ার পর সপ্তাহখানেক দ্বিতী সাক্ষ্যর দিকে ফিরেই তাকায়নি। ভাবখানা এমন, সাক্ষ্য এহসান নামক কাউকে সে চিনেও না। জানেও না। দ্বিতী সম্পূর্ণই নিজের মতো থেকেছে। অথচ আজ লুকিয়ে চুরিয়েই হোক সরাসরি বার কয়েক সাক্ষ্যর সাথে দ্বিতীর চোখাচোখি হয়ে গিয়েছে। দ্বিতীর অবশ্য এই নিয়ে আফসোস হচ্ছে। নিজের প্রতিজ্ঞায় দৃঢ় থাকতে না পেরে আফসোস নিয়ে যখন ফের ভার্সিটি চত্ত্বরে দাঁড়ানো সাক্ষ্যর দিকে একবার তাকাল ঠিক তখনই দেখা গেল সাক্ষ্যর সাথে এক সুন্দরী রমণী দাঁড়ানো। রমণীটি তারই ডিপার্টমেন্টের নিধি। কিছু নিয়ে আলোচনা করছে বোধহয়। দ্বিতীর চাহনি এবার আরও সরু হলো। একদম খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দুই দুইজনকে পরখ করতে করতে খেয়াল করল আজ নিধিও কালো জামা পরেছে। ম্যাচিং ম্যাচিং! দূর থেকে দেখলেই বোধ হচ্ছিল একটা সুন্দর কাপল। দ্বিতী ফোঁসফাঁস করে আওড়াল,
“ বিয়ে করা বউয়ের দিকে আজ পর্যন্ত এক নজর তাকাতে দেখলামনা অথচ নিধির সাথে কত ভালো আলাপ উনার। ”
এইটুকু বিড়বিড় করতে করতেই পা বাড়াল সে। একদম সাক্ষ্য আর নিধির সামনে দিয়েই হেঁটে গেল। নজরটা এমন রাখল যেন পাশে কে আছে সে খেয়ালই করল না৷
.
দ্বিতী বাসায় ফিরল প্রায় সন্ধ্যার আগে আগে। এসেই একটা সুন্দর ঘুম দিয়ে যখন উঠল ঠিক তখনই দ্বিতীর মা এল। মুহুর্তের মধ্যেই তাড়াহুড়ো করে বলল,
“ তোকে কখন থেকে ডাকছি দ্বিতী? তোকে তো বললাম, তাহির ছেলের বিয়েতে যেতে হবে আজ। তখন থেকে ডাকছি আমি। সাজি নিশ্চয় তৈরি হয়ে বেরও হয়ে গিয়েছে৷ ”
দ্বিতী শুনল। চোখমুখ কুঁচকে মায়ের দিকে চাইল মুহুর্তেই। তাহি,সাজি তার মায়েরই কলিজার বান্ধবী। এই তিনজনের বন্ধুত্ব এই এতোটা বয়সে এসেও থমকে নেই। কোন অনুষ্ঠান হোক, উৎসব হোক তিনজনের পরিকল্পনা চলবেই। সে অনুযায়ী দ্বিতীর সাথে আলোচনা করে আজ সকালেই শাড়ি-চুড়ি সব চয়েজ করে রেখেছিল তার মা। দ্বিতীকেও বারবার বলে রেখেছিল। অথচ দ্বিতীর মনে থাকলে তো! দ্বিতী নাক মুখ কুঁচকে বলল,
“ সাজি আম্মুর ছেলেরাও যাবে নাকি?”
“ ইনভাইট করেছে যখন যাবে না কেন? ”
দ্বিতী চুপ করে থাকল। সাজি আম্মু হলো সাক্ষ্যরই মা। এই কারণেই জিজ্ঞেস করা। দ্বিতীর মা অমন চুপ করে থাকতে দেখে মুহুর্তেই বলল,
“ কি আশ্চর্য। গেলে কি হবে? সাক্ষ্য কি তোকে বকবে নাকি? তোদের এই কেমন বিয়ে হলো বল তো? মাস দুয়েকে একটাবারও দেখলাম না ছেলেটার সাথে ফোনে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলেছিস৷ দেখলাম না কোথাও ঘুরতে গেলি। মানে কিছুই তো দেখলাম না তোদের মধ্যে। কাল যাও এল ছেলেটা, বলা নেই কওয়া তোর রুমে গিয়ে আবার কিছুক্ষন পর বেরিয়ে চলেও গেল। অদ্ভুত। ”
দ্বিতী দাঁত বের করে হাসল। আসলেই তো। অদ্ভুত। তাই নিজেও বলল,
“ অদ্ভুতই তো! জেনেশুনে অদ্ভুত এক ছেলেই ঝুলিয়ে দিয়েছো আমার কপালে। ”
.
দ্বিতী ইচ্ছে করেই খুব সুন্দর করে সাঁজল। সাদা স্টোনের কাজ করা একটা ফুটফুটে শুভ্র শাড়ি জড়িয়েছে। চশমাটা খুলে রেখেছে আজ। চুলগুলো খুলে রেখে কানে গুঁজেছে দুটো লাল টকটকে গোলাপ। গায়ের রং ফর্সা হওয়াতে শাড়িটাও বেশ ফুটছে যেন। তাকালেই চোখ শান্ত হয়ে আসছে এমন একটা সাঁজ নিয়েই দ্বিতী আয়না দেখল। বিড়বিড় করে বলল,
” সেঁজে মেয়েপাগল করার খুব ইচ্ছা না সাক্ষ্য এহসান? আমিও সাঁজলাম। দেখব, আপনি সত্যিই সবদিনের মতো অবহেলা করেন কিনা। ”
এইটুকু বিড়বিড় করে বলেই হাসল দ্বিতী। এর ঠিক একটু পরই তার আম্মু তার কাছে এল। দ্রুততা নিয়ে বলল,
“ এইতো সাজিরা গাড়ি নিয়ে এখানে আসছে দ্বিতী। তৈরি তো তুই? ”
কথাগুলো বলতে বলতেই মেয়ের দিকে ফিরে তিনি চোখের ফলক ফেললেন না। হেসে নিজের চোখের কাজল থেকে একটু খানি কাজল নিয়ে একদম দ্বিতীর কপালের চুল সংলগ্ন অংশটায় লাগিয়ে বললেন,
“ মাশাল্লাহ! আমার মেয়েকে খুব সুন্দর লাগছে। কারোর নজর না লাগুক। ”
দ্বিতী শুধু হাসল। ঠিক এর কিছুক্ষন পরই সাক্ষ্যদের গাড়ি এল। মা-মেয়ে দুইজনেই তৈরি হয়ে যখন সাক্ষ্যদের গাড়িতে উঠতে নিল ঠিক তখনই সাক্ষ্য একনজর তাকাল দ্বিতীর দিকে। রাস্তার ম্লান আলো এবং বিল্ডিংয়ের উজ্জ্বল আলোতে মেয়েটাকে সত্যিই সুন্দর লাগছে। একদম চেয়ে থাকার মতো। সাক্ষ্য মুহুর্তেই নজর সরিয়ে সামনে ফিরে শুধু ভ্রু বাঁকাল। একটা বিয়ে বাড়িতে এমন সুন্দর শাড়ি পরে যাওয়ার কারণ কি? না পরলে কি ক্ষতি হতো?
সবাই মিলে ওখানে পৌঁছাতে বেশি সময় লাগল না। তবে ওখানে পৌঁছেই যে সমস্যাটা হলো তা হলো দ্বিতীর দিকে অনেকের চেয়ে থাকা৷ বিয়ে বাড়ির ভীড়, জনসমগম সব কিছুর মধ্যেই সাক্ষ্যর কাছে এই বিষয়টা বিষের মতো লাগছিল। নিজের বউয়ের দিকে সে নিজেও এভাবে মুগ্ধতা নিয়ে তাকায়নি আজ অব্দি। সাক্ষ্য তবুও শান্ত স্থির ভাবখানা নিয়ে যখন পা বাড়িয়ে দ্বিতীদের অতিক্রম করে যেতে নিচ্ছিল ঠিক তখনই কানে এল,
“ আমার ছেলেটা এবার ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছে আপা। এই তো সামনের মাসেই কানাডা যাবে। আপনার মেয়টাকে আমার বেশ মনে ধরেছে বুঝলেন? আমার ছেলেরও বেশ পছন্দ হয়েছে। দুইজনকে মানাত ও খুব সুন্দর। ”
চলবে…
( যারা পড়বেন দয়া করে মন্তব্য জানাবেন হুহ? অনুরোধ এটা। আর হ্যাঁ, একটু কষ্ট করে রেসপন্স করবেন। ভুলত্রুটি গুলো ধরিয়ে দিবেন অবশ্যই।)
Share On:
TAGS: অলকানন্দা ঐন্দ্রি, দুইজনাতেই
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দুইজনাতেই পর্ব ২৯
-
দুইজনাতেই পর্ব ৩৮
-
দুইজনাতেই পর্ব ২২
-
দুইজনাতেই পর্ব ৩
-
দুইজনাতেই পর্ব ৫
-
দুইজনাতেই পর্ব ১৪
-
দুইজনাতেই পর্ব ২৮
-
দুইজনাতেই পর্ব ১৫
-
দুইজনাতেই পর্ব ৩৯
-
দুইজনাতেই পর্ব ১১