Golpo কষ্টের গল্প শেষ পাতায় সূচনা

শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫৯.১


শেষপাতায়সূচনা [৫৯.১]

সাদিয়াসুলতানামনি

[গল্পের শেষের কথাগুলো অবশ্যই পড়বেন।]
দুরুদুরু বুকে আরিয়ান রুমে প্রবেশ করে দরজার খিল লাগিয়ে পেছনে ঘুরে। অতি কাঙ্ক্ষিত কিছু পাওয়ার খুশিতে সে এতটা বেচেইন হয়ে রয়েছে। কিন্তু তার সকল উসখুস, অস্থিরতা, সংঙ্কা থমকে যায় বেডের উপর ফুলরাণী হয়ে বসে থাকা আরওয়াকে দেখে।
ছোটখাটো গড়নের মেয়েটা বর্তমানে একটা মেরুন রঙের সুতির শাড়ি অঙ্গে জড়িয়ে দুইহাত, গলায়, মাথায় টাটকা ফুলের তৈরি গহনা পরে মাথায় ঘোমটা টেনে বেডের মাঝখানে বসে আছে। তার আশেপাশেও গোলাপ ফুলে পাপড়ি ছড়ানো-ছিটানো রয়েছে। তাঁকে বর্তমানে ফুলের রাজ্যের রাণী লাগছে। আরিয়ান মন্ত্রমুগ্ধের হয়ে সম্মোহনী দৃষ্টি নিয়ে একপা একপা করে এগিয়ে যায় প্রিয় রমণীর দিকে।
এদিকে আরিয়ানকে নিজের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে আরওয়াও ভেতরে ভেতরে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেও, তার মনোভাব মুখে দেখায় না। বরং কোমল ভঙ্গিতে বেড থেকে নেমে কিছুটা খুড়িয়ে হেঁটে আরিয়ানের সামনে এসে দাঁড়ায়। তারপর মা-ভাবীর শিখিয়ে দেওয়া শিক্ষা প্রয়োগ করে সে স্মিত গলায় সালাম দিয়ে ওঠে প্রাণপ্রিয় স্বামীকে।
—আসসালামু আলাইকুম জনাব।
আরওয়ার সালামে আরিয়ানের ধ্যান ভঙ্গ হলেও, তার চোখে তখনও কিছুটা ঘোর লেগেই থাকে। সেও বিনীত ভঙ্গিতে তার সালামের জবাব দেয়–
—ওয়া আলাইকুমুস সালাম প্রিয়তমা। কেমন আছেন?
ঘন্টা দুয়েক আগেও যেই লোকটা আরওয়াকে নিজের পাশে বসিয়ে পাতে তুলে তুলে খাওয়াল, সে হঠাৎই “কেমন আছেন?” জিজ্ঞেস করায় আরওয়া অদ্ভুত চাহনি নিয়ে তার দিকে তাকায়। আরিয়ানের মুখের হাবভাব দেখে প্রশ্নের গুরুত্ব বুঝতে চাইছে সে। লোকটা কি মজা নিলো তার? এটা বুঝতে চাইছে সে।
কিন্তু না। আরিয়ানের চোখে মুখে বিন্দু পরিমাণ দুষ্টুমির ছাপ নেই। বরং তার চোখ জোড়ায় রয়েছে মুগ্ধতায় ভরপুর। আরওয়া আমতাআমতা করে বলল–
—আলহামদুলিল্লাহ ভালোই আছি বর্তমানে। তবে হঠাৎ এই প্রশ্ন করলেন যে?
—কারণ আমি ঠিক নেই। বুকের এই দিকটায় কেমন চিনচিন করে ব্যথা করছে।
আরিয়ান পূর্বের ভঙ্গিতে থেকেই বুকের বাম পাশে হাত দিয়ে কথাটি বলে। অথচ তার এই কথায় সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সুশ্রী রমনীকে ঘাবড়ে দিতে সক্ষম হয়েছে পুরো।
আরিয়ানের কথা শুনে আরওয়ার অবচেতন মন একা একাই ভেবে নেয়, লোকটা বিগত দিনগুলোয় ছুটোছুটির কারণই হয়ত এই বুকে ব্যথার কারণ।
সে আরিয়ানের একদম নিকটে চলে এসে নিজের একটা হাত দিয়ে আরিয়ানের দেখিয়ে দেওয়া জায়গায় আলতো করে হাত দিয়ে ডলে দিতে দিতে বিচলিত হয়ে বলল–
—বেশি ব্যথা করছে বুকে? হু? বাসার সবাইকে ডাকবো?
রমণীটির এহেন বিচলিতা আরিয়ানের বুকে প্রশান্তির বাতাস বইয়ে দেয়। সে একহাত দিয়ে প্রিয়তমাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে নিয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল–
—কাউকে ডাকতে হবে না। শুধু তুমি চুপটি করে কিছুক্ষণ মাথা দিয়ে রাখো, তাহলেই সব ব্যথা কমে যাবে। সব বিষাদ বিলীন হয়ো যাবে। সব অপ্রাপ্তি দূর হয়ে যাবে।
আরওয়ার মনটা যদিও স্বামীর ব্যথার কথা শুনে অস্থির হয়ে রয়েছে, তবুও সে অমান্য করে না তার কথার। বেশ কিছুক্ষণ আরিয়ানের বুকে মাথা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। গত তিনদিন ধরে রেগুলার ঔষধ খাওয়ায় তার পায়ের ব্যথাটা অনেকটাই কম আজ।
কিছুটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পর আরিয়ান আরওয়াকে নিজের বুক থেকে সরিয়ে সামনে আনে। তারপর তার মুখটা নিজের হাতের আজলায় নিয়ে আরওয়ার কপালের মধ্যাংশে এক গভীর স্নিগ্ধ, ভালোবাসাময় উষ্ণ পরশ ছুঁয়ে দেয়। হালাল ভাবে আজ দ্বিতীয় বারের মতো ছুঁচ্ছে আরওয়াকে সে। স্বর্গীয় এক প্রশান্তিতে তার দিন-দুনিয়া ছেয়ে যায়।
নিজেদের অনুভূতিগুলোকে একটু আশকারা দেওয়ার পর তারা দু’জনের মনটাই একটু শান্ত হয়। তারপর আরিয়ান বলে–
—অজু আছে? নফল সালাত আদায় করবে না?
—হুম আছে। পূর্ণতা আপু করিয়ে দিয়ে গিয়েছে।
—আচ্ছা চলো।
আরিয়ান কাবার্ড থেকে দুটো জায়নামাজ বের করে আনে। জায়নামাজ আনার সময় সেখানে একটি বড় নামাজের হিজাবও পায়। বুঝতে বাকি থাকে না কাজটি কার। সে মনে মনে উপরওয়ালার কাছে হাজারবার শুকরিয়া জ্ঞাপন করে পূর্ণতার মতো একটি বোন তাকে দেওয়ার জন্য। অনেকসময় দেখা যায়, মায়ের পেটের বোনও ভাইয়ের জন্য এতটা করে না, যতটা পূর্ণতা তার জন্যে করে।
আরিয়ান আরওয়াকে সহায়তা করে ফুলের গহনা গুলো খুলতে। তারপর শাড়ির উপরই হিজাব পড়ে আরিয়ান-আরওয়া আগপাছ করে দাঁড়ায় নামাজের জন্য। নামাজ শেষ করে আরিয়ান সময় নিয়ে কিছু দোয়া পড়ে আরওয়াকে ফু দেয়।
এরপর আরিয়ান আরওয়াকে জিজ্ঞেস করে–
—ঘুমাবে? নাকি আমার কাঁধে মাথা রেখে চাঁদ দেখতে গল্প করবে?
—আপনি জানেন না বুঝি, আমার মনের কথা?
—চলো তাহলে।
আরিয়ান আরওয়াকে কোলে তুলে বেলকনিতে চলে যায়। তার বেলকনিটা তেমন ডেকোরেশন করে সাজানো নেই। তবে আরিয়ান রং-বেরঙের ফুল দিয়ে বেলকনিটা সুন্দর করে সাজিয়েছে। আর নিচে একটা ছোটখাটো বিছানা করে তারই পাশে ছোট একটা বুকসেলফ রেখেছে।
ছোট ছোট তিন তাক বিশিষ্ট বুকসেলফটায় বেশ কিছু বই এটেছে। ছুটির দিনগুলোতে সে নিজের বেলকনিতে ফুলের সুবাস নিতে নিতে বই পড়তে ভীষণ পছন্দ করে। আরিয়ান আরওয়াকে সেই বিছানাতে বসিয়ে দেয়। তারপর নিজে তার পাশে বসে আরওয়ার মাথাটা নিজের কাঁধের উপর রাখতে ইশারা করে। আরওয়া তাই করে।
এমনভাবে বাসর রাত পালন করার ইচ্ছেটা আরওয়ারই ছিল। তারা যখন প্রেম করত, একদিন কথার ছলে আরওয়া তাঁকে এমনভাবে বাসর রাত কাটানোর কথা জানিয়েছিল।


এরপর বেশ কিছুদিন শান্তি-সুখেই কাটে সকলের। আরওয়া আপাতত কিছুদিন অফিস করবে না, অসুস্থতার জন্য। পূর্ণতাও স্বামী – সন্তান নিয়ে ফিরে গিয়েছে তার নীড়ে।
জিনিয়াকে দেখতে আসা পাত্রপক্ষও কোন একটা কারণে আপাততের জন্য মেয়ে দেখতে আসছে না। তবে জিনিয়া শুনেছিল তার বাবা-ভাইয়ের আলোচনার সময়, তাঁকে দেখতে আসতে চাওয়া ছেলে পক্ষ নাকি কি একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে আঁটকে গিয়েছে। সময়-সুযোগ বুঝে পরে কোন একসময় আসবে জিনিয়াকে দেখতে। তাই এখন জিনিয়াও টেনশন ফ্রি ভাবে টনির সাথে প্রেম করছে চুটিয়ে।
কলেজে হাফ ইয়ারলি এক্সাম শেষ হওয়ার কারণে টনির কলেজ সাত দিনের জন্য অফ রয়েছে খাতা কাটার জন্য। তাই ইদানীং সে সকালটাতে খাতা দেখার কাজ শেষ করে দুপুরের রোদটা একটু পড়ে গেলে ছুটে চলে যা জিনিয়ার ভার্সিটিতে। ভার্সিটির আশেপাশে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে পরন্ত বিকেলের অম্লান আলো গায়ে মেখে নিজেদের নীড়ে ফিরে চলে যায়।
অন্যদিনের ন্যায় আজও টনি বিকাল চারটার দিকে জিনিয়ার ভার্সিটির সামনে এসে দাঁড়িয়ে রয়েছে। জিনিয়া ডিপার্টমেন্টের একটা কোর্সের প্রফেসর কয়েকদিনের জন্য ভেকশনে রয়েছে। সেই কোর্সটার ক্লাস সকালেও হলেও, স্যার না থাকার কারণে প্রক্সি যেই টিচার দেন, সে বিকালের দিকে ক্লাসটা নিয়ে থাকে। এজন্য বাসায় ফিরতে ফিরতে জিনিয়ার প্রায়শই সন্ধ্যা সন্ধ্যা হয়ে যায় বলে, টনিই দায়িত্ব নিয়ে তাঁকে বাসায় পৌঁছে দেয়।
জাওয়াদ যদিও বোনকে গাড়ি দিয়ে যাতায়াতের কথা বলেছিল, কিন্তু জিনিয়া প্রাইভেট গাড়ির চেয়ে বেশি ভালোবাসে রিকশা বা টনির বাইকে চড়তে। টনি দিয়ে যায় বলে, জাওয়াদও আর বেশি পীড়াপীড়ি করে না জিনিয়াকে গাড়িতে আসার জন্য।
চারটা দশে জিনিয়া ছুটতে ছুটতে ভার্সিটির মেইন গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা টনির কাছে এসে পৌঁছায়। তাকে এমন ছুটে আসতে দেখে টনি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে–
—এমন ছুটে আসলে কেনো? পাগল কুকুরে তাড়া করেছে? নাকি আজ আবারও সিফাত তোমার পিছু নিয়েছে? তাহলে আজ শালার একদিন কি আমার একদিন।
জিনিয়া হাঁপাতে হাঁপাতে নিজের সাইড ব্যাগটা থেকে পানি বের করে কিছুটা খেয়ে নিজেকে শান্ত করে। তারপর বলল–
—কেউ তাড়া করেনি। লেট হয়ে গেলো দশ মিনিট তাই ছুটে এসেছি।
দশ মিনিট লেট হয়েছে আসতে তাই বলে সেই তিন তলা থেকে ছুটতে ছুটতে আসা লাগবে? দশ মিনিটই তো। কথাটা শুনে টনির মেজাজ প্রচন্ড গরম হয়ে যায়। সে জিনিয়াকে কড়া গলায় ধমক দিয়ে বলে–
—দশ মিনিট লেট হয়েছে তো কি হয়েছে? তাই বলে এমন ছুটতে ছুটতে আসা লাগবে? যদি পড়ে গিয়ে ব্যথা-ট্যথা পেতে?
যেহেতু বিকাল টাইম তাই অন্যান্য আরো কয়েকটি ডিপার্টমেন্টের ছুটি মাত্রই হয়েছিল। স্টুডেন্টরা বের হচ্ছিল ভার্সিটি থেকে, তখন তারা পুরুষালি গলার রুক্ষ ধমক শুনে নিজেদের হাঁটা থামিয়ে সেই দিকে তাকিয়ে নাটক দেখতে থাকে।
টনির এমন আকস্মিক ধমক দেওয়ায় জিনিয়া প্রথমে চমকে গেলেও, নিজেকে সামলে নিয়ে আশেপাশে তাকালে দেখতে পায়, বেশ কয়েকজন পথচারী তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। কয়েকজন ছেলে-মেয়ে আবার হাসাহাসিও শুরু করে দিয়েছে। এই বিষয়টা জিনিয়ার ভীষণ খারাপ লাগে। যার জন্য করলো ছুট, সেই দেয় ধমক।
জিনিয়া মন খারাপ করে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। তার এমন মলিন মুখ দেখে টনির টনক নড়ে। আঁড়চোখে সে নিজেও একবার চারিপাশে চোখ বুলিয়ে নেয়। সকলকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে গলা খানিকটা বাড়িয়ে আম জনতার উদ্দেশ্যে বলে–
—এখানে কোন নাটক হচ্ছে না যে, দাড়িয়ে হা করে তাকিয়ে থাকবেন। হবু বউ ভুল করেছে, তাই একটু বকা দিয়েছি। যান, যে যার কাজে যান।
নিমিষেই ভীড়টা পাতলা হতে হতে একসময় তার অস্তিত্ব নাই হয়ে যায়।
পাবলিকরা চলে যেতেই জিনিয়াও হাঁটা দেয় মেইন রাস্তার দিকে। উদ্দেশ্য পাবলিক বাস বা রিকশা করে বাসায় ফিরবে। কিন্তু সে এক কদম ফেলেছে কি ফেলেনি তার আগেই টনি তার ডান হাতটি টেনে ধরে। জিনিয়া থমকে দাঁড়িয়ে যায় তার হাত টেনে ধরায়। তবে সে পেছন ফিরে তাকায় না টনির দিকে। জিনিয়ার অভিমান বুঝতে পেরে টনি নিজেই তার সামনে এসে বলে–
—তুমি কি চাচ্ছো তোমার অভিমান ভাঙানোর জন্য আমি তোমায় কোলে তুলি? আর দশ সেকেন্ড সময় আছে তোমার। এর মধ্যে যদি তুমি বাইকে না উঠে এখানে দাঁড়িয়ে থাকো, আই সোয়্যার আজ তোমার ক্যাম্পাস পুরোটা চক্কর লাগাবো তোমায় কোলে নিয়ে।
টনি নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে কথাটা বলে। তার চোখে-মুখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। যেন সে যা চলেছে তাই করবে। জিনিয়া চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে টনির দিকে। লোকটা এত বেপরোয়া হলো কবে থেকে?
—অসহ্যকর লোক! রাগ টাও ভালো করে ভাঙাতে পারে না। আমি বলে টিকে যাচ্ছি, আমার জায়গায় অন্যকেউ হলে না, আপনাকে উষ্টা দিয়ে চলে যেতো। যত্তসব নিরামিষ লোক কোথাকার!
চাপা গলায় আচ্ছা মতো ঝেড়ে জিনিয়া রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে টনির বাইকের পেছনে বসে পড়ে। টনি তার রাগ দেখে আড়ালে ঠোঁট টিপে হাসে। ভুলেও যদি এখন জিনিয়া তার হাসি দেখে, তাহলে তার ধর হয়ত থাকবে কিন্তু ধরে মুন্ডুটা হয়ত আর থাকবে না।
টনি বাইকে উঠে হেলমেটটা জিনিয়ার দিকে বাড়িয়ে দেয় অন্যান্যদিনের ন্যায়। কিন্তু আজ জিনিয়া সেটি নেয় না। উপরন্তু সে টনিকে না ধরে বাইকের পেছনে একটা হ্যান্ডেল ছিলো সেটা শক্ত করে ধরে বসে। টনি লুকিং গ্লাসে অভিমানিনীর অভিমান সন্তর্পণে দেখে। তারপর কোমল গলাতেই বলে–
—হেলমেটটা পরে আমায় ধরে বসো। নাহলে পড়ে যেতে পারো। জানোই তো আমি স্পিডে বাইক চালাই।
—পড়লে পড়ব। আপনি বাইক স্টার্ট দিবেন নাকি আমি নেমে হাঁটা দিবো।
—এত রাগ করা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো না অভিমানী প্রিয়তমা।
—রাগ করে নেই আমি। চলুন আপনি।
টনি আর কথা বাড়ায় ঠিকই, তবে এবার সে নিজেই বাইক থেকে নেমে জোর করে জিনিয়াকে হেলমেটটা পরিয়ে দেয়। জিনিয়া জেদ দেখিয়ে খুলে ফেলতে চাইলে, আবার লাগায় এক রাম ধমক। ধমক খেয়ে জিনিয়া ঠোঁট ফুলিয়ে বসে থাকে। টনি বাইকে উঠে সেটিকে স্টার্ট দিয়ে ভার্সিটির ক্যাম্পাস ছাড়ে।
তাদের এই খুনসুটিময় মূহুর্তের পুরোটাই দেখে একদল শকুন। যারা তাদের চলে যাওয়ার পরও হিংস্র চাহনি নিয়ে তাকিয়ে আছে তাদের প্রস্থান পানে।
টনি জিনিয়াকে তাদের বাসার কাছের পার্কটিতে নিয়ে আসে। অন্যদিন জিনিয়া হৈহৈ করে নেমে গেলেও, আজ সে বাইক থেকে নামে না। মুখ ফুলিয়ে বসে থাকে। টনিই তার মাথার হেলমেট খুলে দিয়ে তার হাত ধরে নামায়। পার্কটির একপাশে ভ্রাম্যমান এক ক্যাফে হয়েছে সদ্যই। জিনিয়াকে টানতে টানতে সেখানে নিয়ে গিয়ে একটা চেয়ারে বসিয়ে দেয়।
টনি গিয়ে কাউন্টারে চিকেন স্যান্ডউইচ আর কোল্ড কফি অর্ডার দিয়ে আসে। তারপর এসে দেখে জিনিয়া মুখ ফুলিয়ে অন্যদিকে বসে রয়েছে। টনি তার কাছে গিয়ে আবারও সরি বলে তাকে। কিন্তু জিনিয়া কিছুই বলে না।
টনি এবার জিনিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে করুণ গলায় বলে–
—আচ্ছা সরি তো বাবা। আর কখনো বকাবকি করবো না। এবার তো মাফ করে আবার দিকে ফিরো। একটু হেঁসে কথা বলো। ভালো লাগে না আমার তোমার এই মলিম মুখ দেখলে। বুকে অদ্ভুত রকমের একটা পীড়া হয়। ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড জিনু।
জিনিয়া এমন একটা ভান করে বসে থাকে সে ছাড়া এখানে আর কেউ নেই। মলিন দৃষ্টি নিয়ে অদূরে তাকিয়ে থাকে। টনি তার কোন রেসপন্স না পেয়ে কেমন ছটফট করতে থাকে। কি করে জিনিয়ার মান ভাঙাবে বুঝতে না পেরে হঠাৎই টনি কান ধরে উঠবস করতে শুরু করে। জিনিয়া তার এমন কাজে বেআক্কল হয়ে হা করে তাকিয়ে থাকে।
টনি উঠবস করতে করতে বলে–
—যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি হাসছ, ততক্ষণ অব্দি আমি কান ধরে উঠবস করতে থাকব। দেখি তুমি রাগ না ভেঙে কতক্ষণ কথা না বলে থাকতে পারো।
টনির মতো একজন প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেকে পার্ক এসে উঠবস করতে দেখে পার্কে ঘুরতে আসা অনেক পথচারী, কাপল, বাচ্চা-কাচ্চা দাঁড়িয়ে যায়। পুরুষটিকে একটি মেয়ের সামনে উঠবস করতে দেখে কারোই বুঝতে বাকি থাকে না, কোন এক প্রেমিক পুরুষ তার প্রিয়তমার অভিমান ভাঙানোর প্রয়াসরত। বিষয়টা কাপলদের কাছে ভীষণ ভালো লাগে। কেউ কেউ, নিজের পার্টনারকে খোঁচা দিয়ে বলে–
—দেখো, কীভাবে প্রিয় নারীর রাগ – অভিমান ভাঙাতে হয় দেখো। দেখো অন্তত কিছু শিখো।
আশেপাশে অনেক মানুষের হইচই শুনে জিনিয়ার হুঁশ ফিরে। একজন শিক্ষক মানুষ হয়ে পার্কে গার্লফ্রেন্ডের অভিমান ভাঙানোর জন্য উঠবস করা বিষয়টা মোটেও ভালো দেখায় না। জিনিয়া আশেপাশে চোখ বুলিয়ে দেখে, ডিজিটাল এই দেশের অনেকেই ইতিমধ্যে ফোন বের করে ভিডিও করা শুরু করে দিয়েছে।
জিনিয়া হুড়মুড়িয়ে উঠে টনির হাত টেনে ধরে থামিয়ে দেয়। তারপর তাঁকে নিজের পাশের বেঞ্চেটাতে বসিয়ে দিয়ে বলে–
— আমি রেগে নেই আর। সবাই দেখছে আমাদের। আপনি একজন কলেজের লেকচারার হয়ে এমনটা করছেন, আপনার প্রেস্টিজ নিয়ে পরে টানাটানি লেগে যাবে আমার জন্য।
টনি জিনিয়ার হাতের ভাঁজে নিজের হাত দিয়ে বলে–
—ও মাহ্! তুমি প্রফেশনাল লাইফের সাথে পারসোনাল লাইফকে মেলাচ্ছ কেন? দুটোরই ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় রয়েছে আমার জীবনে। ঘর ঠিক থাকলে, বাহিরে কাজ করতে পুরুষ মানুষ এক আলাদা শক্তি পায়। প্রিয় মানুষটির কাছেও যদি শান্তি, স্বস্তি না পায় তাহলে বাহিরে কাজের উপরও এটার ইফেক্ট পড়ে।
—বুঝেছি, বুঝেছি। তাও আপনি এমন পাগলামি আর করবেন না। অনেককেই দেখলাম আমাদের ভিডিও করতে, এসব যদি আপনার স্টুডেন্টরা দেখে ফেলে, কেমন বিশ্রী হবে বিষয়টা বুঝতে পারছেন?
টনি এবার একটা ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলে–
—বিশ্রী বিষয় হবে কেনো? বরং আমার জন্যই ভালো হবে। কলেজের সবচাইতে ইয়াং, ব্যাচেলর টিচার হয়ে কি প্যারায় যে আছি তোমায় তো এতদিন বলে নি। পাছে তুমি যদি আবার রেগে যাও এজন্য। প্রতিদিন ২/৩ টা করে লাভ লেটার দেয় মেয়েরা।
আমি শুধু ইন্টার লেভেলের স্টুডেন্টদের ক্লাস নেই, কিন্তু স্কুলের মেয়ে গুলোও লাভ লেটার দেয়। কত-শত গিফটস, ফ্লাওয়ার বুকে দিয়ে আমার টেবিল ভরিয়ে রাখে রোজ রোজ। আ’ম জাস্ট ফেডাপ। তাই আজকের ঘটনার ভিডিও যদি ভাইরাল হয়, তাহলে আমারই লাভ।
জিনিয়া চোখ বড় বড় করে টনির কথাগুলো শুনে। কথাগুলো শুনে তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক ধরণের জ্বলনের সৃষ্টি হয়েছে। মন চাচ্ছে, টনিকে লাভ লেটার দেওয়া ঐসব মেয়েদের চড়িয়ে সোজা করতে।
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন। ]
শব্দসংখ্যা~২১০০+

চলবে?

জাওয়াদ, পূর্ণতা ও তাদের ছোট ছানাকে নিয়ে লেখা আমার তৃতীয় ই-বুক “পূর্ণতার সংসার”
পড়ুন ই-বই “পূর্ণতার সংসার”
https://link.boitoi.com.bd/hMuN3
[এই গল্প টায় সবচেয়ে কম লেখা জুটি হলো টনি-জিনিয়া। তাই আজকের পর্বটা এই দু’টো সাইড ক্যারেক্টারদের নিয়ে সাজালাম। আগামী পর্বে জাওয়াদ-পূর্ণতা আর তাদের ছোট্ট ছানাকে নিয়ে একটা আদুরে পর্ব দিবো ইনশা আল্লাহ।
সামনেই আমার পরীক্ষা, রুটিনও দিয়ে দিয়েছে। সারাবছর ভণ্ডামি করি, তাই পরীক্ষার আগে না পড়লে হয়? আপনারাই বলুন। তাও নিজের কাছেই প্রমিজ করেছি, আপনাদের এখন থেকে আর বেশি দিন অপেক্ষা করাবো না গল্প দিতে।
এই পর্বটায় একটু বেশি রেসপন্স করেন সবাই। আগামী পর্ব তাড়াতাড়ি দিবো ইনশা আল্লাহ। প্রমিজ করলাম।
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ] See less

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply