Golpo romantic golpo যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ

যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ২৯


#যেখানে_প্রেম_নিষিদ্ধ

#ইশরাত_জাহান_জেরিন

#পর্ব_২৯

পরদিন দুপুর বারোটা। কলেজের ক্লাস শেষ হতে না হতেই মীর এভিয়েশনের ব্ল্যাক এসইউভি গাড়িটা সাঁঝকে সোজা মীর বাড়ির সদর দরজায় এনে নামিয়ে দিল। কলেজের গেটে আজ আরযানের পাঠানো চারজন বডিগার্ড চিলের মতো চোখ রেখে দাঁড়িয়ে ছিল, যার কারণে স্বাধীন আজ সাঁঝের ধারেকাছে ঘেষারও সুযোগ পায়নি। ফুচকা খাওয়া তো দূর, দূর থেকে একটা ইশারা করার সাহসও স্বাধীনের হয়নি।

সাঁঝ তীব্র রাগে আর অভিমানে ফুঁসতে ফুঁসতে দোতলার করিডোর দিয়ে নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই মীর আরযানের স্টাডি রুমের সেগুন কাঠের ভারী দরজাটা নিঃশব্দে খুলে গেল।

“ভেতরে আয়, সাঁঝ।” ভেতর থেকে আরযানের গম্ভীর, ভরাট কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। সাঁঝের পা দুটো থমকে গেল। সে বুকের ভেতর একরাশ ভয় আর জেদ জমা করে ধীর পায়ে ঘরের ভেতরে ঢুকল। আরযান ল্যাপটপ স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে রিডিং চশমাটা টেবিলের ওপর রাখল। তাঁর ধবধবে সাদা শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত অত্যন্ত নিখুঁতভাবে গুটানো।

“আজকের ক্লাসের লেকচারগুলো কি খুব জটিল ছিল সাঁঝ? নাকি গেটের বাইরের পলিটিক্সটা বুঝতে একটু সমস্যা হচ্ছিল?” আরযান অত্যন্ত শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল। টেবিলের ওপর রাখা দামী কলমটা আঙুলের ডগায় ঘুরছে তাঁর। সাঁঝের চোখে জল চলে এল। সে আরযানের টেবিলের ঠিক সামনে গিয়ে দু-হাত মুঠো করে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় বলল, “আপনি নিজেকে এই মীর বাড়ির বড় কর্তা ভাবেন আরযান ভাইয়া? আমার ফ্রেন্ডরা আমার সাথে কথা বলতে ভয় পায়, আমার ক্লাসের ছেলেরা আমাকে দেখে রাস্তা বদলে ফেলে! আপনি বডিগার্ড পাঠাননি, আমার চারপাশটা একটা লোহার খাঁচা বানিয়ে দিয়েছেন। আমি কি আপনার কেনা কোনো কয়েদী?”

আরযান চেয়ার ছেড়ে ধীর পায়ে উঠে দাঁড়াল। তাঁর বিশাল, দীর্ঘ অবয়বটা নিয়ে সে টেবিলটা ঘুরে এসে সাঁঝের খুব কাছে এসে দাঁড়াল। দুজনের মাঝে মাত্র কয়েক ইঞ্চির দূরত্ব। আরযানের চড়া, দামী ওউড পারফিউমের চেনা ঘ্রাণে সাঁঝের মাথাটা আবার ঝিমঝিম করে উঠল। সে ভয়ে এক কদম পিছিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু আরযান চট করে সাঁঝের কনুইয়ের ঠিক ওপরটায় নিজের শক্ত হাত দিয়ে চেপে ধরে তাকে স্থির করল।

“কয়েদী?” আরযান সাঁঝের চোখের মণির দিকে তাকাল। সেই চোখে এক মুহূর্তের জন্য অধিকারবোধ ফুটে উঠল, যা সাঁঝের চেনা ‘বড় ভাইয়া’ ইমেজের সাথে একেবারেই খাপ খায় না। আরযানের তপ্ত নিশ্বাস সাঁঝের কপালে এসে আছড়ে লাগছিল। সে অত্যন্ত নিচু, ফিসফিসানি কণ্ঠে বলল, “যদি এটা খাঁচায় বন্দি করাও হয় সাঁঝ, তবে মনে রাখিস এই খাঁচার চাবিটা শুধু মীর আরযানের পকেটেই থাকে। বাইরের কোনো থার্ডক্লাস ছেলের সাহস হবে না সেই চাবিতে হাত দেওয়ার। মীর বাড়ির সীমানা যেখানে শেষ হয়, তোর ওপর আমার নজরদারি সেখান থেকে আরও কড়া হয়।”

আরযানের হাতের সেই শক্ত কিন্তু না-ব্যথা দেওয়া বাঁধন আর তাঁর চোখের এই নাম না জানা তীব্র চাহনিতে সাঁঝের বুকের ভেতরের ড্রাম বাজানোটা যেন এক সেকেন্ডে স্তব্ধ হয়ে গেল। এটা কি শুধুই বড় ভাই সুলভ শাসন? নাকি এর আড়ালে অন্য কোনো তীব্র, দমবন্ধ করা মায়া আর তীব্র কোনো অধিকারের টান লুকিয়ে আছে? সাঁঝের অবুঝ মন তা পুরোপুরি ডিকোড করতে পারল না, সে শুধু এক অদ্ভুত আবেশে নিজের চোখের পাতা দুটো বন্ধ করে ফেলল।

পরক্ষণেই আরযান নিজেকে সামলে নিয়ে হাতটা ছেড়ে দিল। সে টেবিলের দিকে ইশারা করে গম্ভীর গলায় বলল, “কাল রাতে দেওয়া নতুন ফোনটা আশা করি সচল আছে। ওটার জিপিএস ট্র্যাকার যেন কোনো অবস্থাতেই অফ না হয়। আর ওই স্বাধীন নামের ছেলেটার ফাইল আমি ক্লোজ করে দিয়েছি, নতুন ফোনে যেন ওর কোনো নোটিফিকেশন না দেখি। এবার নিজের রুমে যা, আর কান্নাকাটি বন্ধ কর।”

সাঁঝ আর কোনো কথা না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সে নিজের রুমে গিয়ে দরজায় পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে বড় বড় নিশ্বাস ফেলতে লাগল। তার হৃদস্পন্দন তখনো স্বাভাবিক হয়নি। লোকটা মুখে এত বিষ ওড়ায়, অথচ তার চোখের ওই লুকানো ইশারাটা কেন সাঁঝের অবুঝ মনকে এক তীব্র কালবৈশাখী ঝড়ে কাঁপিয়ে দিয়ে গেল?

বিকেলের দিকে সাঁঝ নিজের ঘরের বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে নিজের ভাগ্যকে আর মীর আরযানকে সমানে অভিশাপ দিয়ে যাচ্ছিল। তার রাগটা এবার অন্যায্য ছিল না। কলেজের সেই ‘স্বাধীন’, যাকে নিয়ে সে মনে মনে কত ফুচকা উৎসবের স্বপ্ন বুনেছিল, সে আজ সকালে কলেজের গেটে আরযানের পাঠানো চারজন কালো কোট পরা, যমদূতের মতো বডিগার্ড দেখেই এমন ভয় পেয়েছে যে সাঁঝের নতুন নম্বরটাই চিরতরে ব্লক করে দিয়েছে! শুধু তাই নয়, আরভিদের কাছ থেকে শোনা গেছে, স্বাধীন নাকি আজই কলেজ পরিবর্তনের জন্য প্রিন্সিপালের রুমে টিসি-র আবেদন জমা দিতে গেছে।

“ফটকা! এক নম্বরের কাপুরুষ! চারটা বডিগার্ড দেখেই লাইফ থেকে ইস্তফা দিয়ে দিল?” সাঁঝ বালিশে আরেকটা ঘুসি মেরে ফুঁপিয়ে উঠল। “আর ওই হিটলার! কসাই! আমার জীবনের সব সুখ যে এভাবে কেড়ে নিল, ওনার কি একটুও অনুশোচনা নেই? আমি মরে যাব! আমি না খেয়ে এই ঘরেই একদম শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাব, তখন বুঝবে মীর আরযান!”

ঠিক তখনই দরজায় মৃদু টোকা পড়ল। সাঁঝ চোখ মুছে আরও জোরে চাদর মুড়ি দিল। “আমি কারও সাথে কথা বলব না! আম্মু, তুমি চলে যাও এখান থেকে!”

“আমি আম্মু নই রে সাঁঝু, আমি তোর একমাত্র শুভাকাঙ্ক্ষী আরভিদ।” দরজা ঠেলে আরভিদ ভেতরে ঢুকল। তার বগলে যথারীতি সেই চামড়ার ডায়েরি। সে ধীর পায়ে এসে সাঁঝের বিছানার পাশে বসল। “পলিটিক্যাল সায়েন্সের নতুন আপডেট শুনতে চাস? তোর ওই স্বাধীনের পলিটিক্যাল ক্যারিয়ার আজ সকালেই মীর এভিয়েশনের আইটি ল্যাব আর সিকিউরিটি ফোর্সের যৌথ প্রযোজনায় খতম হয়ে গেছে। ছেলেটা এখন ঢাকা ছেড়েই পালাচ্ছে।”

সাঁঝ চাদর সরিয়ে উঠে বসল। তার চোখ দুটো কান্নায় জবা ফুলের মতো লাল। “ও একটা কাপুরুষ, আরভিদ ভাইয়া! কিন্তু আরযান ভাইয়া কেন এমন করল? আমার কি নিজের একটা বন্ধু রাখারও অধিকার নেই?”

আরভিদ ডায়েরিটা খুলে কলম ঘোরাতে ঘোরাতে বলল, “অধিকার তো পুরোই আছে। তবে তুই যাকে বন্ধু ভাবছিস, সে আসলে একটা ফটকা। আরযান ভাইয়ার সিকিউরিটি ড্রিল সহ্য করার ক্ষমতা ওর ডিএনএ-তেই ছিল না। তুই বরং স্বাধীনের শোক ভুলে নিজের স্বাস্থ্যের দিকে নজর দে।”

“আমি খাব না! আমি উনুনমুখী হয়ে উপোস করব!” সাঁঝ আবার শুয়ে পড়ার চেষ্টা করতেই সাইরা শেখ ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকলেন। তাঁর হাতে একটা স্মার্টফোন, স্ক্রিনে ভিডিও কল সচল। “ওরে সাঁঝ! জলদি ওঠ! দেখ তোর নানী আর খালারা লাইনে আছে। গ্রামের বাড়িতে মেজো খালার মেয়ের বিয়ের ধুম লেগে গেছে। সবাই তোকে দেখার জন্য চিল্লামিল্লি করছে।” সাইরা শেখ জোর করে ফোনটা সাঁঝের মুখের সামনে ধরলেন।

সাঁঝ বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিতে চাইল, “আমি কোনো বিয়েতে যাব না আম্মু। আমি মানসিকভাবে অত্যন্ত অসুস্থ…”

সাঁঝের কথা শেষ হলো না। ভিডিও কলের ওপাশ থেকে তখন গ্রামের বাড়ির পুরো লবি দেখা যাচ্ছিল। নানী, খালা, মামাতো বোনদের হাসির হুল্লোড়ের মাঝেই হুট করে ক্যামেরাটা ঘুরে গেল ড্রাইভওয়ের দিকে। সেখানে একটা চকচকে সাদা পাজেরো গাড়ি এসে থামল। আর গাড়ি থেকে যিনি নামলেন, তাঁকে দেখামাত্রই সাঁঝের মুখের ‘মানসিকভাবে অত্যন্ত অসুস্থ’ এক্সপ্রেশনটা এক সেকেন্ডে ভ্যানিশ হয়ে গেল!

লম্বা, ফর্সা, ছিপছিপে গড়ন। পরনে একটা হালকা নীল রঙের লিনেন শার্ট, হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত নিখুঁতভাবে গুটানো। চোখে দামি সানগ্লাস, আর চুলের কাটিংটা একদম ঢাকার নামী সেলুনের মতো স্টাইলিশ। সে গাড়ি থেকে নেমে অত্যন্ত মার্জিতভাবে হাসল এবং বয়স্কদের সালাম ঠুকে ভেতরে চলে গেল।

সাঁঝের চোখ দুটো চশমা ছাড়াই বড় বড় হয়ে গেল। তার বুকের ভেতরের ড্রাম বাজানোটা যা এতক্ষণ স্বাধীনের শোকে বন্ধ ছিল, তা এখন এক অন্য রিদমে বাজতে শুরু করল। সে এক লাফে বিছানায় উঠে বসে মায়ের হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিল। “আম্মু! আম্মু! ওই নীল শার্ট পরা ছেলেটা কে?”

ভিডিও কলের ওপাশ থেকে মেজো খালা হেসে উঠলেন, “ওরে সাঁঝ,, চিনতে পারিসনি? ও তোর ছোট খালার ননদের বড় ছেলে, আদিব। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে মাত্র গত পরশু দেশে ফিরেছে। এই বিয়েতে ও-ই তো সব মেইন ম্যানেজমেন্ট দেখছে।”

“আদিব…” সাঁঝ মনে মনে নামটা উচ্চারণ করল। কোথায় সেই ঢাকার ফুটপাতের ধুলোবালি মাখা, সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে ঘোরা স্বাধীন, আর কোথায় মেলবোর্ন ফেরত সিভিল ইঞ্জিনিয়ার আদিব! স্বাধীনের জন্য জমানো এক বছরের গভীর শোক সাঁঝের মন থেকে ঠিক ০.৫ সেকেন্ডে কর্পূরের মতো উড়ে হাওয়া হয়ে গেল। সে সাথে সাথে ফোনটা মায়ের হাতে দিয়ে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল।

“আম্মু! আমরা কবে যাচ্ছি গ্রামে? মেজো খালার বিয়ে বলে কথা! সরি তার ঘরের একমাত্র মেয়ের বিয়ে, আর আমরা ঢাকার এই চার দেওয়ালে বন্দি হয়ে থাকব? এটা তো আমাদের ফ্যামিলি ভ্যালুজের বাইরে! আমি এখনই ব্যাগ গোছাচ্ছি!”

সাইরা শেখ মেয়ের এই চটজলদি হৃদয়ের পরিবর্তন দেখে হা হয়ে রইলেন। আরভিদ পাশে বসে ডায়েরিতে খসখস করে লিখল, “মিশন পিলুগ্রামের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। ফটকা প্রেমিকের পতন, মেলবোর্ন সিভিলের উত্থান।”

বিকেল পাঁচটা। মীর বাড়ির বিশাল লিভিং রুমে আজ আবার চা-চক্র বসেছে। তবে আজকের চা-চক্রের আবহাওয়াটা একটু ভিন্ন। আরযান মীর সোফার মাঝখানে বসে ল্যাপটপে মীর এভিয়েশনের আগামী সপ্তাহের শিডিউল দেখছিলেন। তাঁর পরনে কালো শার্ট, চোখে চশমা। ঠিক তখনই সাঁঝ সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলো। তার গায়ে এখন আর সেই সাধারণ থ্রি-পিস নেই। একটা সুন্দর সুতির কুর্তি, চুলে চমৎকার একটা পনিটেল এবং মুখে এক চিলতে চটপটে হাসি। তার পেছনে আরভিদ আর আব্রাজ দুটো বড় বড় ট্রলি ব্যাগ টেনে নামাচ্ছে।

বড় চাচা আফজাল শাহরিয়ার চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, “কী রে সাঁঝু মা? এত বড় বড় ব্যাগ নিয়ে কোথায় যাওয়া হচ্ছে?”

সাঁঝ আরযানের দিকে আড়চোখে একবার চাইল। আরযান ল্যাপটপ থেকে চোখ তোলেননি, কিন্তু তাঁর টাইপিংয়ের গতিটা একটু কমে গেছে। সাঁঝ গলাটা একটু উঁচিয়ে বলল, “বড় চাচা, গ্রামে মেজো খালার মেয়ের বিয়ে. পুরো পরিবার যাচ্ছে। আমিও যাচ্ছি। অনেকদিন গ্রামে যাওয়া হয় না তো, তাই একটু রিফ্রেশমেন্ট দরকার।”

সাইরা শেখ আরযানের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বাবা আরযান, তুই তো মীর বাড়ির বড় ছেলে। তুই না গেলে গ্রামের মানুষ কী বলবে? তুইও চল আমাদের সাথে দুদিনের জন্য। ল্যাপটপটা না হয় ওখানেই চালাবি।”

আরযান অত্যন্ত শান্তভাবে ল্যাপটপটা বন্ধ করল। চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রেখে সে সোফায় হেলান দিয়ে বসল। তাঁর সেই তীক্ষ্ণ, ধারালো চোখ দুটো সোজা গিয়ে পড়ল সাঁঝের মুখের ওপর। সাঁঝের বুকের ভেতরটা একটু কেঁপে উঠল, কিন্তু মেলবোর্ন ফেরত আদিবের চেহারাটা মনে আসতেই সে নিজের মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়িয়ে রইল।

“আমার আগামী সপ্তাহে মীর এভিয়েশনের একটা আন্তর্জাতিক ডেলিগেশনের সাথে মিটিং আছে।” আরযানের কণ্ঠস্বর লিভিং রুমের চার দেওয়ালে ধাক্কা খেল। “আমার ঢাকার বাইরে যাওয়া সম্ভব নয়। আর সাঁঝ, তোর শরীর কাল রাত থেকে খারাপ ছিল। গ্রামের ধুলোবালিতে তোর যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। তুই ঢাকাতেই থাকবি।”

আরযানের এই সরাসরি ‘না’ শুনে সাঁঝের ভেতরের জেদটা এবার দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। সে এক কদম এগিয়ে গিয়ে বলল, “আমার শরীর একদম ঠিক আছে আরযান ভাইয়া! আর গ্রামে তো কোনো বহিরাগত নেই, সবাই আমাদের ফ্যামিলি। মেজো খালার বাড়ি। আর আমার নিজের খালাতো, মামাতো ভাইয়েরা থাকবে। মেলবোর্ন থেকে আদিব ভাইয়া এসেছে, উনি তো পুরো ইভেন্ট ম্যানেজ করছেন। আমাদের কোনো কষ্টই হবে না। আমি যাবই!”

‘আদিব ভাইয়া’ নামটা সাঁঝের মুখে শুনতেই আরযানের ডান হাতের চোয়ালটা এক মুহূর্তের জন্য শক্ত হয়ে গেল। ঘরের বাকিরা হয়তো খেয়াল করেনি, কিন্তু আরভিদের তীক্ষ্ণ নজর সেটা মিস করল না। আরযান চা-এর কাপটা অত্যন্ত ধীরলয়ে পিরিচের ওপর রাখল। পিরিচ আর কাপের টুং শব্দটা আজ একটু বেশিই শোনাল। “আমি যখন একবার বলেছি যাবি না, তার মানে যাবি না।” আরযানের গলার স্বর এবার আরও নিচু হলো।

“আমি যাব! আমি জাস্ট যাব!” সাঁঝ এবার আরযানের চোখের দিকে তাকিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল। “আপনি শুধু মীর এভিয়েশনের ডিরেক্টর, আমার লাইফের ডিরেক্টর নন!” পুরো লিভিং রুমে পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। মীর বাড়ির কোনো ছেলেমেয়ের এত বড় সাহস আজ পর্যন্ত হয়নি যে আরযানের সিদ্ধান্তের ওপর কথা বলে। আব্রাজ আর রাজ ভয়ে নিজেদের ঢোক গিলল। আরযান সোফা ছেড়ে ধীর পায়ে উঠে দাঁড়াল। তাঁর সেই বিশাল, দীর্ঘ অবয়বটা সাঁঝের সামনে এসে দাঁড়াতেই সাঁঝ একটু পিছিয়ে গেল, কিন্তু তার চোখের জেদটা কমল না।

আরযান কিছু বলার আগেই ড্রয়িংরুমের পর্দা ছিঁড়ে ভেতরে ওয়ান-ম্যান আর্মি হিসেবে প্রবেশ করল মীর বাড়ির অঘোষিত খলনায়ক, চিকু পাখি! চিকু উড়ে এসে সোজা মেজো চাচা আয়মান হোসেনের টাক মাথার ওপর বসল। পা দুটো একটু চুলকে নিয়েই সে কর্কশ গলায় চেঁচিয়ে উঠল, “আদিব হ্যান্ডসাম! আদিব ব্লু শার্ট! সাঁঝের নতুন বর! আরযান পচা! আরযান বুড়ো!”

“ঐ বজ্জাত পাখি! তোকে আজ আমি মেরেই ফেলব!” আব্রাজ সোফার কুশন হাতে নিয়ে চিকুকে তাড়া করতে গেল। কিন্তু চিকু সেখান থেকে উড়ে গিয়ে সোজা বড় চাচী নাজিরা ওয়ালেদের পানের বাটির ওপর বসল এবং ডানা ঝাপটে চেঁচাল, “আরযান একা! আরযান জেলাস! আরযান জেলাস!” এক মুহূর্তে পুরো লিভিং রুমের তাপমাত্রা যেন হিমাঙ্কের নিচে নেমে গেল। সাঁঝের মনে হলো সে এখনই মেঝে ফাঁক করে ভেতরে ঢুকে যাবে। সে আরযানের দিকে তাকাতেই দেখল আরযানের ফর্সা মুখটা রাগে আর তীব্র অধিকারবোধে মুহূর্তেই থমথমে হয়ে উঠেছে। আরভিদ এবার সুযোগ পেয়ে মুচকি হেসে তার ডায়েরিটা খুলল। “ছাদে এবং ভিডিও কলে পলিটিক্যাল সায়েন্সের এক নতুন থিওরি আবিষ্কৃত হয়েছে। আদিব থিওরি। বিস্তারিত আরযান ভাইয়া ভালো বলতে পারবেন।”

আরযান আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সে নিজের ল্যাপটপটা হাতে নিয়ে অত্যন্ত শান্ত কিন্তু ভারী কদমে সিঁড়ি দিয়ে নিজের স্টাডি রুমের দিকে চলে গেল। যাওয়ার আগে শুধু বলে গেল, “গাড়ি কাল সকাল ছয়টায় ছাড়বে। যার যাওয়ার ইচ্ছা, সে যেতে পারে। আমার কোনো মাথাব্যথা নেই।”

আরযানের এই চরম উদাসীনতা আর রাগ দেখে সাঁঝের বুকের ভেতর কেমন যেন একটা ফাঁকা অনুভূতি হলো। লোকটা এত জেদ ধরে চলে গেল কেন? সে কি আসলেই জেলাস? নাকি সে সাঁঝকে আর শাসন করতে চায় না? কিন্তু আদিবের সেই হ্যান্ডসাম চেহারাটার কথা ভেবে সাঁঝ নিজের মনকে বোঝাল, “যাক গে! হিটলার ঢাকাতেই থাকুক। আমি গ্রামে গিয়ে মনের সুখে ফুচকা আর রসগোল্লা খাব!”

পরদিন দুপুর দুটো। মীর পরিবারের তিনটি বড় গাড়ি অবশেষে পিলুগ্রামে সাঁঝের খালাদের সেই বিশাল জমিদার বাড়িতে এসে পৌঁছাল। চারদিকে সবুজ গাছপালা, পুকুরঘাট আর ঢাক-ঢোলের সাথে বিয়ের সানাইয়ের শব্দে পুরো বাড়ি মুখরিত। ঢাকা থেকে এসে গাড়ি থেকে নামতেই সাঁঝের ফুসফুসটা একরাশ তাজা বাতাসে ভরে গেল। মনে মনে সে ভাবল, “যাক! অবশেষে সেই খাঁচা থেকে মুক্তি!” কিন্তু গাড়ি থেকে নেমেই সাঁঝের চোখ দুটো চিল্লামিল্লি আর মানুষের ভিড়ের মাঝে শুধু সেই ভিডিও কলে দেখা ‘মেলবোর্ন ফেরত’ আদিবকে খুঁজতে শুরু করল। বেশিক্ষণ খুঁজতে হলো না। বাড়ির সামনের বিশাল প্যান্ডেলের নিচে দাঁড়িয়ে আদিব তখন ডেকোরেটরের লোকদের ডিক্টেশন দিচ্ছিল। আজ তার পরনে একটা সাদা রঙের পাঞ্জাবি, কনুই পর্যন্ত হাতা গুটানো। রোদে ফর্সা মুখটা একটু লালচে হয়ে আছে, কপালে হালকা ঘামের বিন্দু।

সাঁঝ নিজের ওড়নাটা একটু ঠিক করে, মুখে তার সবচেয়ে কিউট হাসিটা ঝুলিয়ে ধীর পায়ে প্যান্ডেলের দিকে এগিয়ে গেল। “আসসালামু আলাইকুম, আদিব ভাইয়া!”

আদিব হাতে থাকা ডেকোরেটরের রসিদ থেকে চোখ তুলে তাকাল। সাঁঝকে দেখামাত্রই তার মুখে এক চমৎকার ভদ্র হাসি ফুটে উঠল। “ওয়ালাইকুম আসসালাম! তুমি নিশ্চয়ই সাঁঝ? ছোট খালামণি তোমার কথা মেলবোর্নে থাকার সময় প্রায়ই বলতেন। ছবিতে যেমন দেখেছি, তুমি সামনাসামনি তার চেয়েও অনেক বেশি কিউট!”

মেলবোর্ন ফেরত সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের মুখে সরাসরি ‘কিউট’ শব্দটা শুনে সাঁঝের মনে হলো সে ঢাকার আকাশ ছেড়ে এক লাফে মেলবোর্নের আকাশে উড়ছে। সে লাজুক হেসে বলল, “ধন্যবাদ আদিব ভাইয়া। গ্রামে এসে খুব ভালো লাগছে। ঢাকার ওই একঘেয়ে পরিবেশ, চারদিকের কড়া ডিক্টেশন… আই মিন, জাস্ট দম বন্ধ হয়ে আসছিল।”

আদিব মৃদু হেসে বলল, “আই ক্যান আন্ডারস্ট্যান্ড। শহরের জীবনটা বড্ড যান্ত্রিক। আচ্ছা সাঁঝ, তুমি ভেতরে গিয়ে একটু রেস্ট নাও। আমি জাস্ট এই লাইটিংয়ের লোকটাকে বিদায় করে আসছি।”

সাঁঝ ভেবেছিল আদিব হয়তো তাকে সাথে নিয়ে পুরো বাড়ি ঘুরিয়ে দেখাবে। কিন্তু না! আদিব কথাটি বলেই উল্টো ঘুরে জেনারেটর অপারেটরের দিকে তীরের মতো ছুটে গেল। সাঁঝের মুখের হাসিটা একটু থমকে গেল।

এরপর শুরু হলো আসল যুদ্ধ। কেটে গেল পুরো দুটো দিন! কিন্তু এই দুই দিনে সাঁঝের ডায়েরিতে আদিবের সাথে শান্তিতে দুটো কথা বলার মতো কোনো পাতা যুক্ত হলো না। বিয়েবাড়ির মূল তোরণ থেকে শুরু করে কাচ্চির আলুর হিসাব সবকিছুর তদারকিতে আদিব একা এক পায়ে খাড়া। সে এতটাই বিজি যে, সাঁঝের দিকে আলাদা করে ফিরে তাকানোর কোনো ফুসরতই তার নেই। প্রথম দিন বিকেলে সাঁঝ দেখল আদিব পুকুরঘাটের দিকে তাবু খাটানোর তদারকি করছে। সাঁঝ একটা কাঁচের গ্লাসে ঠান্ডা লেবুর শরবত নিয়ে ধীর পায়ে সেখানে গেল। ভেবেছিল শরবতটা দিলে আদিব অন্তত একটু বসবে, দুটো গল্প হবে। সাঁঝ গিয়ে মিষ্টি গলায় বলল, “আদিব ভাইয়া, রোদে অনেক খাটছেন। এই শরবতটা একটু….” আদিব এক হাতে জেনারেটরের তার টানতে টানতে অন্য হাতে গ্লাসটা নিয়ে এক চুমুকে শেষ করল। তারপর গ্লাসটা সাঁঝের হাতে ফেরত দিয়ে বলল, “থ্যাংকস সাঁঝ! লাইফ সেভার! ওই ডেকোরেটর ভাই, পর্দাটা ওপাশে টানুন!” বলেই সে আবার উধাও। সাঁঝ গ্লাস হাতে নিয়ে বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল।

দ্বিতীয় দিন সকালে সাঁঝের জেদ আরও বেড়ে গেল। মীর বাড়ির কোনো মেয়েকে কেউ এভাবে ইগনোর করতে পারে? সে আজ চমৎকার একটা সুতির কুর্তি পরল, চুলে আলগা একটা খোঁপা করল। সারাটা দিন সে আঠার মতো আদিবের আশেপাশে ঘুরঘুর করতে লাগল। আদিব যখন হলুদের ডালা সাজানোর তদারকি করতে লিভিং রুমে এলো, সাঁঝ সেখানে গিয়ে খালাদের পাশে বসে জোর করে আলপনা আঁকার বাহানা করল, যাতে আদিবের নজর পড়ে। আদিব রুমে ঢুকল ঠিকই, কিন্তু তার চোখ শুধু ডালার সংখ্যার দিকে। সে খালাকে উদ্দেশ্য করে বলল, “মেজো খালা, ডালা তো একটা কম লাগছে। আমি একটু বাজারে যাচ্ছি।” যাওয়ার পথে সাঁঝের দিকে তাকিয়ে শুধু একটা সৌজন্যমূলক মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, “কুর্তিটা সুন্দর সাঁঝ।” ব্যস, ওইটুকুই!

মেলবোর্ন ফেরত সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের এই চরম প্রফেশনাল ব্যস্ততা আর পাত্তা না দেওয়ার ভাব দেখে সাঁঝের ইগোতে এবার বড়সড় ধাক্কা লাগল। সে মনে মনে ফুঁসতে লাগল, “এই ছেলের কি কোনো ফিলিংস নেই? নাকি মেলবোর্নের ছেলেরা রোবট হয়?”

গায়ে হলুদের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে সুযোগটা এলো। প্যান্ডেলের এক কোণে, যেখানে আমবাগানের সীমানা শুরু হয়েছে, সেখানে ডেকোরেটরের কিছু বড় বড় কার্টন রাখা ছিল। চারপাশটা তখন তুলনামূলক একটু নিঝুম। আদিব সেখানে একটা কাঠের চেয়ারে বসে অত্যন্ত ক্লান্ত ভঙ্গিতে কপালে হাত দিয়ে তালিকা মেলাচ্ছিল। সাঁঝ নিজের সবটুকু জমানো অভিমান আর চটপটে ভাবটা এক করে ধীর পায়ে কার্টনের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো। “আদিব ভাইয়া! আপনি তো দেখছি একাই পুরো পিলুগ্রাম মাথায় তুলে রেখেছেন। মেলবোর্নের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কি এর চেয়েও কঠিন?”

আদিব খাতা থেকে চোখ তুলে সাঁঝকে দেখে একটু চমকে উঠল, তারপর তার ক্লান্ত মুখে একটা চওড়া হাসি ফুটে উঠল। “আরে সাঁঝ! এসো। বিশ্বাস করো, মেলবোর্নে বড় বড় ব্রিজের ডিজাইন করাও সহজ, কিন্তু এই বিয়েবাড়ির খালা-মামাদের লজিক মেলানো অসম্ভব! জাস্ট এক্সহস্টেড!”

আদিবকে একটু রিল্যাক্স মুডে দেখে সাঁঝের বুকটা হালকা হলো। সে একটু কাছে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলল, “ওখানকার লাইফস্টাইল কেমন ভাইয়া? আমাদের মতো সারাক্ষণ সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারিতে থাকতে হয় না তো?”

“নাহ, ওখানে সবাই স্বাধীন,” আদিব হাসল। “যার যার নিজের মতো লাইফ।”

“দারুণ তো!” সাঁঝ মনে মনে ভাবল, এতক্ষণে একটা ভালো টপিক পাওয়া গেছে। সে চট করে তার পকেট থেকে নতুন আইফোনটা বের করল। চাঁদের আলো আর বিকেলের গোধূলির আলো মিলে চারপাশটা তখন চমৎকার দেখাচ্ছিল। সাঁঝ একটু আদুরে গলায় বলল, “আচ্ছা আদিব ভাইয়া, এই দুই দিনে তো আপনি আমার দিকে তাকানোরই সময় পাননি। একটা মেমোরি তো রাখা চাই। এখানে আলোটা খুব সুন্দর, চলুন একটা সেলফি তুলি?”

আদিব তার হাতঘড়ির দিকে তাকাল, “আচ্ছা দ্রুত নাও, পাঁচ মিনিট পর আবার জেনারেটর চেক করতে হবে।”

আদিব সাঁঝের ঠিক পাশে এসে দাঁড়াল। দুজনের কাঁধ প্রায় স্পর্শ করছে। সাঁঝ স্ক্রিনে আদিব আর নিজের মুখটা ফোকাস করে যেই না ক্যামেরার বাটনটা প্রেস করতে যাবে ঠিক তখনই আমবাগানের কাঁচা রাস্তার ওপর একটা কানফাটানো, তীব্র ব্রেকের শব্দ হলো! একটি বিশাল, কুচকুচে কালো ব্ল্যাক এসইউভি গাড়ি ধুলোর ঝড় উড়িয়ে ঠিক তাদের পায়ের সামনে এসে এমনভাবে থামল যেন আর এক ইঞ্চি এগোলেই একটা অ্যাক্সিডেন্ট হতো! ধুলোয় চারপাশটা এক মুহূর্তের জন্য অন্ধকার হয়ে গেল। গাড়ির দরজাটা প্রচণ্ড শব্দে খুলে গেল। আর গাড়ি থেকে যিনি নামল, তাঁকে দেখামাত্রই সাঁঝের হাতের দামি আইফোনটা মাটিতে পড়তে পড়তে বেঁচে গেল। তার হাতের তালু এক সেকেন্ডে ঠাণ্ডা হয়ে গেল। মীর আরযান শান! তাঁর পরনে অফ-হোয়াইট রঙের একটা সুতি জামদানি পাঞ্জাবি, যার হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত অত্যন্ত নিখুঁতভাবে গুটানো। চোখে সেই চেনা ব্ল্যাক সানগ্লাস। তাঁর ফর্সা মুখটা দুপুরের কড়া রোদ আর রাগে একদম তামাটে হয়ে আছে। তিনি গাড়ি থেকে নেমে এক সেকেন্ডের জন্য সাঁঝ আর আদিবের মধ্যকার সেই কয়েক ইঞ্চির দূরত্বের দিকে তাকালেন। সেই চাহনিতে এত তীব্র এক চাবুকের শাসন আর রাগের স্ফুলিঙ্গ ছিল যে আদিবও কেমন যেন এক অজানা আশঙ্কায় এক কদম পিছিয়ে গেল। সাঁঝের মুখের সব হাসি, মেলবোর্নের স্বপ্ন এক মুহূর্তে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে ভয়ে এবং চরম বিস্ময়ে কাঁপা গলায় বলল, “আরযান ভাইয়া! আপনি? আপনার না মীর এভিয়েশনের জরুরি আন্তর্জাতিক মিটিং ছিল?”

আরযান সানগ্লাসটা খুলে অত্যন্ত ধীরলয়ে শার্টের পকেটে রাখল। তাঁর সেই তীক্ষ্ণ, ধারালো চোখ দুটো এখন সাঁঝের চোখের মণির ওপর স্থির। সে অত্যন্ত মার্জিত কিন্তু বরফশীতল গলায় বলল, “মিটিং বাতিল করা হয়েছে। মীর বাড়ির মেয়েরা ঢাকার বাইরে এসে কার পেছনে দুদিন ধরে চাতক পাখির মতো ঘুরঘুর করছে, কার জন্য লেবুর শরবত বইছে আর কার সাথে আমবাগানের কোনায় সেলফি তুলছে সেই সিকিউরিটি অডিট করাটা মীর এভিয়েশনের মিটিংয়ের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি।” আরযানের এই সরাসরি অ্যাটাকে সাঁঝের মুখটা লাল হয়ে গেল। সে যে দুই দিন ধরে আদিবের পেছনে ঘুরছিল, লোকটা ঢাকায় বসে সেই খবরও পেয়ে গেছে! আদিব পরিস্থিতিটা একটু হালকা করতে এগিয়ে এলো। সে ভদ্রতা খাতিরে হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়িয়ে বলল, “ভাইয়া, আমি আদিব। ছোট খালামণির ননদের….”

আরযান আদিবের বাড়িয়ে দেওয়া হাতের দিকে একবার চাইল, কিন্তু নিজের হাত পকেট থেকে বের করল না। সে কেবল নিজের দীর্ঘ অবয়বটা নিয়ে সোজা আদিবের চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর ও ভারী গলায় বলল, “আমি জানি তুমি কে। মীর বাড়ির সীমানার ভেতরে কার কতটুকু পারমিশন আছে আর কার এক্তিয়ার কতটুকু, সেটা আমি ভালো করেই ম্যাপ করে এসেছি। সাঁঝ, দাদুমণি তোকো ভেতরে ডাকছেন। এখনই যাহ।” সাঁঝের চোখে জল চলে এলো। এই লোকটা ঢাকা থেকে এই পিলুগ্রামেও চলে এসেছে তার স্বাধীনতা ধুলোয় মিশিয়ে দিতে! সে নিজের ভেতরের সবটুকু জেদ এক করে পা ঠুকে বলল, “আমি যাব না! আমি আদিব ভাইয়ার সাথে কথা বলছি!”

আরযান এক কদম এগিয়ে এলো। দুজনের মাঝে এখন মাত্র এক ইঞ্চির দূরত্ব। আরযানের শরীর থেকে বের হওয়া সেই চড়া, দামি ওউড পারফিউমের চেনা ঘ্রাণে সাঁঝের মাথাটা আবার ঝিমঝিম করে উঠল। আরযান অত্যন্ত নিচু, ফিসফিসানি অথচ চূড়ান্ত বিপজ্জনক কণ্ঠে বলল, “যদি নিজে হেঁটে ভেতরে না যাস সাঁঝ, তবে সবার সামনে তোকে কোলে তুলে ভেতরে নিয়ে যেতে আমার এক সেকেন্ডও লাগবে না। মীর আরযানের ডিক্টেশন ভাঙার সাহস এই পিলুগ্রামে অন্তত কারও নেই। চয়েস ইজ ইয়োরস।” আরযানের চোখের সেই তীব্র, পাগলাটে অধিকারবোধ আর গলার ভেতরের নাম না জানা দমবন্ধ করা মায়া দেখে সাঁঝের মেরুদণ্ড দিয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল। সে আর একটা শব্দও উচ্চারণ করার সাহস পেল না। সে আদিবের দিকে একটা চরম অপ্রস্তুত ও করুণ দৃষ্টি দিয়ে তীরের মতো দৌড়ে ভেতরের বাড়ির দিকে চলে গেল। আদিব পুরো ঘটনা দেখে একদম স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আরযান আদিবের দিকে ফিরে অত্যন্ত ঠাণ্ডা গলায় বলল, “মেলবোর্নের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ভালো সাবজেক্ট আদিব। বিয়েবাড়ির জেনারেটর আর ডেকোরেশনের ওখানেই মন দাও। মীর বাড়ির ভেতরের স্ট্রাকচার অনেক বেশি জটিল, এটা হ্যান্ডেল করার মতো ব্যাকআপ তোমার নেই।” কথাটি বলেই আরযান ধীর পায়ে, ভারী কদমে ভেতরের বাড়ির দিকে হেঁটে গেল। আর আমবাগানের এক কোণে দাঁড়িয়ে আদিব শুধু নিজের কপালে জমা ঘাম মুছতে লাগল।

চলবে?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply