Golpo কষ্টের গল্প ডাকপ্রিয়র চিঠি

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৩২


ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৩২

#লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া

৩২

‘আপনি আর একা নন আঙ্কেল। আমি আছি আপনার পাশে। ইনশাআল্লাহ সবসময় থাকব।

মারিদের কথায় হাসানের কান্না জোরালো হলো। মারিদের বুক চিরে বেরিয়ে এল দীর্ঘশ্বাস। কেউ কখনো উনার এতিম মেয়ে নূরজাহানের পাশে দাঁড়ায়নি হাসান ছাড়া। মা, পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, সমাজ—সবার কাছে নূরজাহান শুধু তুচ্ছতাচ্ছিল্য তাচ্ছিল্য উপহাস কিংবা আক্রোশ পেয়েছে। কেউ কখনো নূরজাহানের সম্মানে, ন্যায়ের পক্ষে কথা বলেনি। আজ মারিদ হাসানের দায়িত্ব পালন করেছে। হাসান ভাবুক হয়ে কাঁদছে, মারিদ সান্ত্বনা দিচ্ছে; মকবুল খালেদের পাশ থেকে সরে মারিদের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছিল হাসানকে সান্ত্বনা দিতে। এক লোক ওদের চোখের সামনে এইভাবে কাঁদছে ব্যাপারটা মন্দ দেখায়, ভদ্রতার খাতিরে সে এগোতে গিয়ে কাদামাটি মাখা পিছল উঠানে পা পিছলে ধপাস করে পড়ে যায়। উপস্থিত সবাই এই আবেগঘন মুহূর্ত থেকে তৎক্ষনাৎ বেরিয়ে আসে। খালেদ মকবুলের পাশেই ছিল, সে প্রথমে ‘আরে আরে’ বলে মকবুলকে টেনে তুলতে গিয়ে অসাবধানতায় সেও পড়ে যায় মকবুলের পাশে। হাসিব, রাদিল, মাজিদ তৎক্ষণাৎ এগিয়ে এসে মকবুল ও খালেদকে টেনে তোলে। হাসান মকবুলের পড়ার শব্দ পেয়ে মারিদকে ছেড়ে দেয়। তারানূর আহাজারি করে বলল—

‘হায় হায়, কও দেহি, তোমরা পড়লা কেমনে বাজান? মাজিদ তাড়াতাড়ি মেহমানগোরে লইয়া পুশকুন্নির ঘাটলায় যা। শরীরডার পানি দিয়া ধুইয়া দে। কিগো মা, তুমি আমার লগে ঘরের ভিত্তে আইয়ো।

তারানূর হীরা চৌধুরীকে নিয়ে ঘরের ভিতরে গেলে মাজিদ খালেদ আর মকবুলকে নিয়ে পুকুর ঘাটে যায়। দুজনই পুকুরে নেমেছে গোসল করতে। কাদামাটিতে পড়ে শরীর নোংরা হয়ে গেছে। তাছাড়া সারাদিন দৌড়াদৌড়ি করেও ক্লান্ত, শরীর ঘেমে আছে তাই দুজনই গোসলে নেমে গেছে। মাহবুব মারিদের হাত টেনে পুকুর ঘাটে নামতে চেয়ে বলে—

‘আব্বা, আপনিও আসেন গোসল করবেন। আপনার শরীর নোংরা হয়ে আছে। সারাদিন এই শরীর নিয়ে অনেক দৌড়াদৌড়ি করছেন, আপনার এখন গোসল করা প্রয়োজন। আমি আপনাকে গোসল করাই দিব, আসেন।

মাজিদ অবাক চোখে তাকিয়েছে মাহবুবের কথায়। বাপ-ছেলের মাঝে এত মহব্বতের টান থাকে, সেটা মাজিদ দেখেনি। হাসানকে দেখেছে নূরজাহানের জন্য জীবন বাজি রাখতে, কিন্তু কখনো ছেলেদের জন্য এতটা ভালোবাসা প্রকাশ করেনি হাসান। হাসান সবার মাঝে উপস্থিত, সে বোবার ন্যায় দাঁড়িয়ে। এতক্ষণ মারিদের উপকারে কেঁদেছে, এখন শান্ত। দুচোখে ছাপানো চোখের জল শেষে শান্ত দৃষ্টিতে দেখছে মারিদসহ মারিদের পরিবারকে। আজ এতদিন পর হঠাৎ হাসানের কাছে মারিদকে অপরিচিত লাগছে। হাসানের চেনা-পরিচিত সহজ-সরল টাইপের মারিদ সাহেব আর মনে হচ্ছে না মারিদকে। মারিদ রাতে বিয়ে করল, সকালে বাপকে শহর থেকে নিয়ে আসলো, বিকেলে আসামিদের পুলিশে দিল! পরবর্তী সময়ে মারিদ কী করবে কিংবা হাসানের কাছে কী চাইবে, সেটা নিয়েও হাসান চিন্তিত। মান্নাকে পাঠিয়েছিল সাবান কেস আনতে, সে সেটা নিয়ে পুকুর ঘাটে ফিরে আসে। পাকা ঘাটের সিঁড়িতে সাবান কেসটা রাখে। খালেদ ও মকবুল পুকুরের পানিতে সাঁতার কাটছে। বহুকাল পর তারা পুকুরে নেমেছে, একটু সাঁতার না কাটলেই নয়। মাহবুব মারিদকে টেনে পুকুরঘাটের সিঁড়িতে বসিয়েছে। গায়ের কাদামাটি শুকিয়ে যাওয়া ছেঁড়া শার্ট টেনে খুলতেই মারিদের পিঠে-কাঁধে বেশ কিছু রক্ত জমাটের কালশিটে দাগ দেখতে পায়। মাহবুব দাঁতে দাঁত চেপে মারিদের আঘাতের জায়গায় হাত ছোঁয়ায়। মারিদ বিরক্ত সুরে বলে—

‘ কিছু হয়নি বাবা। আমি ঠিক আছি।

‘ আমরা ওদের আরও কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারি আব্বা।

‘দরকার নেই। আপাতত এতটুকু থাক। প্রয়োজনে পরে দেখা যাবে।

দু’হাতে আঁজলা ভরে মারিদের মাথায় বেশ কয়েক কুশ পানি দেয় মাহবুব। মারিদের পিঠে সাবান ঘষে দেয়। মারিদ হাত-পায়ে হাত ঘষে নেয়, শুধু আহত জায়গাগুলো বাদে। মারিদ বুক পানিতে নেমে প্রথম ডুব দিলে পিছন পিছন মাহবুব পুকুরে লাফিয়ে নেমে মারিদের গলা জড়িয়ে সাঁতার কাটে। মারিদ হেসে ফেলে। সারাদিনের দুশ্চিন্তা ও ক্লান্তি পাশে ফেলে মাহবুবকে কাঁধে নিয়ে বুক পানি থেকে গলা পানিতে নেমে যায়। মাহবুব, মারিদ, খালেদ, মকবুল সকলেই একত্রে সাঁতার প্রতিযোগিতা দেয়। বিশাল বড় পুকুরের একপাশ থেকে অন্য পাশে সাঁতার কাটার প্রতিযোগিতা চারজন। রাদিল পুকুর ঘাটে দাঁড়িয়ে চিল্লিয়ে মামাদের উৎসাহ দিচ্ছে মারিদকে পরাজিত করতে, আর সেই দৃশ্যটা হাতের ফোনের ক্যামেরায় বন্দী করছে। কী মনে করে রাদিল সেই ভিডিও সুখকেও পাঠালো। হাসান মাজিদ পুকুর ঘাটে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখছে। সবার মাঝে কত মিল মহব্বত। অজান্তে তাঁরা প্রতিযোগিতায় আনন্দ পাচ্ছে। পাকঘর থেকে তারানূর ডাকল হাসানকে—

‘ হাসান? বাপজান, এইদিকে আয়।

হাসান পাকঘরে গেলে তারানূর বিচলিত ভঙ্গিতে বললেন—

‘বাজান, ঘরে তো বাজার-সদাই কিচ্ছু নাই। এতগুলা মেহমানরে খাওন দিমু কী?

কাল রাতের ভোগান্তির জন্য হাসান, মাজিদ কেউ আজ বাড়ি থেকে বের হয়নি, আর না ঘরে তেমন রান্নাবান্না হয়েছে। ঘরে অশান্তি থাকলে খাবার কারও মুখে উঠবে না—এটা স্বাভাবিক, কিন্তু ঘরে মেহমান আসলে নিজের খাবারের চিন্তা না করলেও মেহমানের আপ্যায়নের খেয়াল রাখতে হবে। হাসান তারানূরের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা আশনূর আর মাজিদের বউ নদীর দিকে তাকাল। দুজনই চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে। সবাই গোসল করে এসে খেতে চাইবে, কিন্তু ঘরে রান্নার কিছুই নেই। হীরা চৌধুরীকে বসার ঘরে বসানো হয়েছে অনেকক্ষণ হলো, উনাকেও জল-পানি বা নাস্তা তেমন কিচ্ছু দেওয়া হয়নি শুধু চা ছাড়া। হাসান চিন্তিত মুখে কপাল কুঁচকে নদীকে বলল—

‘ঘরে নাস্তা দেওনের মতোও কিচ্ছু নাই বউ?

‘ বিস্কুট, আর গাছের কলা আছে আব্বা। দুপুরে খাওনের সময় বিস্কুট কলা দিলে হইব না খারাপ দেখাইব।

আশেপাশে শাহানা কোথাও নেই। হয়তো ঘরে শুয়ে আছে। সাজিদকেও হাসান দেখেনি আজ সারাদিন। মা-ছেলের কারও পরোয়া হাসান আর করতে চায় না। মাজিদ হাসানের পিছন পিছন এসে সবকিছু শুনে বলে—

‘কেউর টেনশন করন লাগব না। আমি বাজার থেইক্কা খাওন কিন্না লইয়া আইতাছি এক্ষুনি।

হাসান মাজিদকে থামিয়ে বলে—

‘আমাগো গেরামের বাজারে হোটেল নাই, তুই কই থেইক্কা খাওন কিন্না আনবি? হোটেলের খাওন কিন্না আনতে হইলে থানচি সদরে যাইতে হইব। হেতে মেলা সময় লাগবার পারে। যাইতে এক ঘণ্টা, আইতে এক ঘণ্টা—এতক্ষণ মেহমান গুলারে না খাওয়াইয়া কেমনে খালি মুখে বসাই রাখমু? সারাদিন ধইরা হগলের মেলা ঝুট-ঝামেলা আছিল, সবার পেটে ক্ষুধা আছে। গোসল কইরা আইলে খাওন দিতে হইব আগে। এহন বাজারে গেলেও খাওন লইয়া তাড়াতাড়ি আওন যাইব না।

টেনশন আর বিষাদের ছায়া পড়েছে সকলের মুখে। বাজার থেকে খাবার এনে খাওয়াতে যতটা সময় লাগবে, ততক্ষণে ঘরে রান্না করা সম্ভব। আবার বাজার করে রান্না বসাতে বসাতে রাত হয়ে যাবে। অতি টেনশনে সকলের মুখ ছোট হয়ে যাচ্ছে, ঠিক তক্ষুণি সদর দরজা দিয়ে ‘আম্মা আম্মা’ ডেকে দ্রুত পায়ে ঢুকল আলেহা। আলেহা বসার ঘরে হীরাকে চা হাতে বসে থাকতে দেখে দুই-এক সেকেন্ড হাঁটার গতি কমিয়ে দিলেও নূরজাহানের কথা ভেবে তৎক্ষণাৎ দৌড়ায় ভিতরের ঘরে। বসার ঘরের সাথের ঘরটা ভাতঘর। এই ঘরে সবাই একত্রে বসে খায়। মেহমানদের বসার ঘরে বড়ো একটা ডাইনিং টেবিল পাতা হয়েছে সেখানে খেতে দেয় আর ঘরে মানুষ সবাই ভাত ঘরেই বসে খায়। আলেহার গলা পেয়ে রান্নাঘর হতে দৌড়ে আসে সবাই। আলেহা মাজিদ, হাসান, তারানূর, আশনূর, নদী—সকলের দেখা পেয়ে প্রথমে আতঙ্কিত সুরে জিজ্ঞাসা করে নূরজাহানের কথা—

‘আম্মা, আমার নূরজাহান কই? ওহ কেমন আছে?

আশনূর আলেহাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে। ক্ষণিকের জন্য ভুলে যাওয়া বেদনাগুলো তরতর করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। মুহূর্তে সকলের চোখ ভিজে যায়, কিন্তু কেউ শব্দ করে কাঁদছে না। পাশের ঘরে হীরা চৌধুরী বসে আছেন, মেহমানের শব্দ করে কাঁদতে চায় না কেউ। কিন্তু নিরবে চোখের জল সবার পরছে। তারানূর চোখের পানি শাড়ির আঁচলে মুছে ছোট গলায় ফিসফিস করে বলল—

‘নূরজাহান ঘরে ঘুমাইতেছে। ডাক্তার দেখাইছি, ডাক্তার হেরে ঘুমের ঔষধ দিছে। হেইডা খাইয়া ঘুমাইতেছে। তোর আইতে এত দেরি হইল ক্যান?

আলেহা উত্তর দেওয়ার আগে পিছন থেকে শুকনো গঠনের একটা শ্যামবর্ণের মেয়ে কোমর আর দু’হাত মিলিয়ে তিনটা বড় বড় হটপট নিয়ে আলেহাকে ডাকে—

‘খালাম্মা? ও খালাম্মা, এই ডিব্বা গুলা কই রাখমু?

মেয়েটার নাম মৌসুমী। আলেহার সঙ্গে থাকে আলেহার শশুর বাড়িতে থাকে। আলেহা আশনূরের মাথায় হাত বুলিয়ে বুক থেকে উঠায়। মাজিদকে বলে—

‘ যাত বাপ ব্যান গাড়ি থেইক্কা খাবার গুলা নিইয়া আয়। আমাদের বাড়িতে ঝামেলা হইলে ঘরের রান্নাবান্না-খাওন বন্ধ হইয়া যায়, হেই কারণে আমি সকলের জন্য রান্না করে নিয়ে আসছি। নদী, মৌসুমীর থেকে বাক্সগুলো নিয়ে রান্নাঘরে রাখো।

ভয়ংকর লজ্জিত পরিস্থিতি থেকে আলেহা যেন হঠাৎ ফেরেশতার মতো এসে সবাইকে বাঁচিয়ে দিল। সকলেই একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। আলেহা ব্যাপারটা প্রথমে বুঝতে পারেনি। আলেহা হাসানকে প্রশ্ন করে—

‘ভাই, বসার ঘরের মহিলাটা কে? আগে তো কখনো দেখিনি আমাদের বাড়িতে?

হাসান উত্তর দেওয়ার আগে তারানূর উত্তর দেয়—

‘ ওনি হইল নূরজাহানের ফুফুশাশুড়ি। আইজ প্রথম আইছে আমাগো বাড়িতে। নূরজাহানের শশুর, চাচা শশুর, খালা শশুরও আইছে। হোগলে মিল্লা পুকুর ঘাটে গোসল করতাছে এহন।

তারানূরের কথায় মনে হলো আলেহা ভীষণভাবে চমকিয়েছে। স্তব্ধতার নেয় শক খেল যেন। অবাক করা নেত্রে মায়ের দিকে তাকায়, তারপর হাসান। একে একে সকলের মুখের দিকে দৃষ্টি ঘুরাল স্তব্ধতায়—তারানূর কথাটা বলেছে এটা আদৌ সত্য কিনা তা নিশ্চিত হতে সকলের মুখের দিকে তাকিয়েছে আলেহা। এক মুহূর্তের জন্য সকলে চুপ। এই মূহুর্তে সকলের নিশ্চুপতা সম্মতির দেয়াল তৈরি করছে। বিস্ময়ে কম্পিত গলায় আলেহা খুব ধীর গলায় হাসানকে প্রশ্ন করে বলে—

‘নূরজাহানের কার সাথে বিয়ে হয়েছে ভাই?

‘মারিদ সাহেবের লগে।

‘যারা আমাদের বাড়িতে হসপিটালের কাজে এসেছিল তাদের একজনের সঙ্গে হয়েছে?

‘হুম।

‘ ফর্সা লম্বা করে যে ছেলেটা আছে ওর সঙ্গে হয়েছে?

‘হুম।

আলেহার কথা থেমে যায়। আর প্রশ্ন করার সাহস পায়নি। নূরজাহানের অনিশ্চিত গতিবিধি আরও অনিশ্চিত হয়ে গেল। একটা বিয়ের পর আরেকটা বিয়ে! প্রথম বিয়ের কলঙ্কের দাগ মোছা যায়নি এখনো, দ্বিতীয় বিয়েটা কেন ভাগ্য নূরজাহানের কপালে লিখল? চার আঙুলের কপালে কি বিধাতা এক টুকরো সুখ লেখেনি উনার নূরজাহানের জন্য? আর কী চায় নিয়তি নূরজাহানের কাছে? কেন বারবার সুখের নাম করে অসীম কলঙ্কের সাগরে ভাসিয়ে দেয় মেয়েটাকে? এই বিয়ে দীর্ঘকাল কত দিন হবে? দশদিন, বিশদিন, একমাস? নাকি তারও কম?

সকলের খাওয়া-দাওয়া শেষে বসার ঘরে গোল হয়ে সোফায় বসেছে সবাই। রাত তখন দশটার ঘরে। একপাশে মারিদ, রাদিল, মাহবুব, মকবুল, খালেদ ও হীরা চৌধুরী বসা; হাসিব মারিদের পাশে দাঁড়িয়ে। অন্যপাশে সিকদার পরিবার বসা। হাসান, মাজিদ, তারানূর, আশনূর, আলেহা, বসে। নদী ভাতঘরের পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে, কাঁধে ঘুমন্ত ছোট ছেলেটা। শাহানা, সাজিদ দুজনের কেউ উপস্থিত নেই। সবার বৈঠকের উদ্দেশ্য মারিদ আর নূরজাহানের বিয়ে নিয়ে আলোচনা। মাহবুব আবদার জানিয়েছে, মারিদের সঙ্গে নূরজাহানের বিয়েটা যেহেতু হয়েছে, তাঁরা বউ সঙ্গে করে নিয়ে যেতে চায়। মাহবুবের কথাটায় হাসানের পরিবারের সকলেই অবাক হয়েছিল। নূরজাহানের বেশ বদনাম এই গেরামে। নূরজাহানের চরিত্রে দোষ, জাদুকরি, অভিশপ্ত, অপয়া, অলক্ষ্মী—আরও কত কী নামে ডাকে নূরজাহানকে গ্রামের লোকজন। সবচেয়ে বড় কথা, নূরজাহানের আগে একটা বিয়ে হয়েছিল, যদিও ফোনে বিয়ে হয়েছিল, আবার ফোনেই ছাড়াছাড়ি হয়েছে। কাগজে-কলমে কখনো নূরজাহানের বিয়েটা রেজিস্ট্রেশন হয়নি বলে আইনিভাবে নূরজাহানের ডিভোর্সও হয়নি। কিন্তু সমাজ জানে নূরজাহান তালাকপ্রাপ্তা। সবাই ধরে নিয়েছিল মারিদ নূরজাহানকে বাঁচাতে রাতের আঁধারে বিয়ে করেছে, কিন্তু দিনের আলোয় হয়তো ছেড়ে দেবে। কিন্তু মারিদ যে নিজের পরিবার ডেকে নূরজাহানকে বউ করে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেবে, এটা ছিল আকাশছোঁয়া কল্পনা। মারিদ কম-বেশি মানিক সওদাগরের বিষয়টা জানে, কিন্তু নূরজাহানের আগের বিয়ের বিষয়টা হয়তো জানে না। এই মুহূর্তে বলা ঠিক হবে কিনা, তাও বুঝতে পারছে না কেউ। এই পরিস্থিতিতে আপাতত না বলাই ঠিক হবে বলে মনে করলেন হাসান। অন্য এক সময় নূরজাহানের বিয়ের কথাটা মারিদের সঙ্গে ভেঙে নেওয়া যাবে। তাছাড়া হাসান মারিদ সম্পর্কেও তেমন জানে না। হাসান জানত মারিদ সাধারণ ঘরের সাধারণ ছেলে, সে সরকারি চাকরি করে সংসার চালায়। কিন্তু এখন দেখছে মারিদ অসাধারণ ঘরের, ধনী বাবার আদুরে ও ক্ষমতাবান ছেলে। সব জেনেও মারিদের কাছে নূরজাহান ভালো থাকবে কিনা, সেই ভরসাও করতে পারছে না হাসান। থমথমে পরিবেশে সকলেই নিশ্চুপ। হাসান কী বলে, সেই প্রত্যাশায় সকলেই হাসানের মুখের দিকে তাকিয়ে। হাসান বেশ সময় নিয়ে রয়েসয়ে বলতে থাকে—

‘দুইজনের বিয়াডা কী পরিস্থিতিতে হইছে, হেইডা আমাগো আর আপনাগো কারও অজানা না। এই পরিস্থিতিতে আমি মাইয়া আপনাগো বাড়িতে বউ কইরা পাঠানোর লাইগাও ভরসা পাইতাছি না। এমন না যে আমি আপনাগো পোলা মারিদ সাহেবরে অবিশ্বাস করতাছি। আমি হেরে প্রথম চিনি হেই দিন, যেইদিন হে আর হের বোন আমার মাইয়ার জীবন বাঁচাইছিল। হেরপর আমাগো গেরামের আসে হাসপাতালে কাম লইয়া। মাসখানিক সময় হইব হেরে আমি ভালা মানুষ হিসাবে চিনি। মাইয়া বিয়া দিয়া আপনার পোলার হাতে তুইলা দেওনের মতো চেনা আমি হেরে এহোনো চিনি না। আপনার পোলা আমার মাইয়ারে বউ কইরা মাইনা লইছে, এতে আমার আর আমার ঘরের মাইনসের কেউর আপত্তি নাই। মারিদ সাহেব ভালা মানুষ, আমার দেখনে উনারে আমি ভালাই দেখছি। জামাতা হিসাবে আমি হের কাছে নিজের মাইয়া তুইলা দেওনের আগে আমার কিছু সময় লাগব। আমি মাইয়া আপনার পোলার হাতে তুইলা দেওনের আগে কিছুদিন দেখবার চাই আপনার পোলা কতটা বিশ্বস্ত। আপনারা অচেনা শহরের মানুষ। হঠাৎ বিয়াডা মানতে গিয়া আমি আমার মাইয়ারে অচেনা কেউর হাতে তুইলা দিবার পারি না। আমার ভয় দূর হইলে, মারিদ সাহেবের উপর আস্থা অর্জন হইলে, আমি হেইদিন মাইয়া খুশি খুশি আপনাগো হাতে তুইলা দিমু তখন লইয়া যাইয়েন আপনাগো বাড়ির বউ আপনাগো লগে। কিন্তু এর আগ দিয়া আমার মাইয়া আমার ঘরে থাকব, আর মারিদ সাহেব আমার বাড়িতে আওন-যাওন করব ততদিন।

সবার মাঝে নিশ্চুপ নীরবতা। সবাই চুপচাপ শুনেছে হাসানের কথা। মারিদ মাথা নুইয়ে মাহবুবের পাশে বসে চুপচাপ শুনল। এই বিষয়টা প্রথমেই মারিদের মাথায় এসেছিল। আজ সকালে রাদিলকে বিষয়গুলো বলেছিল সে। এখন ঘুরেফিরে হাসানও একই কথা বলল। মকবুল হাসানের কথায় আপত্তি জানিয়ে কিছু বলতে চাইলে মাহবুব মকবুলের হাতটা চেপে থামিয়ে দেয়। হাসানকে বলে—

‘ আচ্ছা ভাইসাব,আপনি যেটা বলবেন সেটাই হবে। আপনি চিন্তা করবেন না আমাদের এতে আপত্তি নেই। আপনি মেয়ে পাঠাবেন শ্বশুরবাড়িতে, আপনার জানা দরকার আছে আপনার মেয়ের জামাই ভালো নাকি খারাপ। সমস্যা নেই ভাইসাব, আপনি সময় নেন। আপনার যখন মনে হবে আমাদের জানাইয়েন, আমরা সসম্মানে আয়োজন করে এসে ছেলের বউকে ঘরে তুলে নিয়ে যাব। বাকি রইল আমার ছেলের বিষয়টা; তাহলে বলব—আমার ছেলে আপনারও ছেলে হয়। আমি ছেলে দিয়ে আপনার মেয়ে নিচ্ছি, আর আপনি মেয়ে দিয়ে আমার ছেলে নিয়েছেন। এখন সে আমার একা ছেলে নয় আপনারও আরেকটা ছেলে হয়। এখন আপনার ছেলে এ বাড়িতে কখন আসবে নাকি যাবে, সেটা আপনাদের বাপ-ছেলের ব্যাপার, এখানে আমার বলার কিছু নেই। আমি আমার মেয়ের টানে অবশ্যই বারবার আপনার দুয়ারে আসব ইনশাআল্লাহ। আজ আমি একা এসেছি, আগামী সপ্তাহে আমার পুরো পরিবার আসবে আমার ছেলের বউকে দেখতে। আপনি যেমন আমাদের বিশ্বাস করতে পারছেন না, আমিও আপনাকে এক বিশাল দায়িত্ব দিয়ে গেলাম। আমাদের অনুপস্থিতিতে যেন আমার বাড়ির বউয়ের কোনো খেয়ানত না হয়। সে আপনার একা মেয়ে ছিল কাল, আজ থেকে সে আপনার মেয়ের পাশাপাশি আমার বাড়ির ইজ্জতও। আমার বাড়ির ইজ্জতের হেফাজতের দায়িত্ব এখন আপনার হাতে দিয়ে যাচ্ছি, যতদিন না আমার বাড়ির ইজ্জত আমি নিয়ে যাচ্ছি ততদিন আপনি হেফাজতে দেখে রাখবেন আশা করছি। নয়তো আমার বাড়ির ইজ্জতের কিছু হলে কৈফত কিন্তু আপনাকেও দিতে হবে ভাইসাব।

হাসান বিষয়গুলো যতটা কঠিনভাবে নিচ্ছিল, বিষয়গুলো যেন ততটাই সহজভাবে খুলে ধরছেন মাহবুব। মাহবুব সবচেয়ে সহজ পথটা হাসানের জন্য খুলে দিচ্ছেন—তাদের চেনার, বিশ্বাস করার। আজ একা হাসান অবাক-বিস্মিত হচ্ছে না, গোটা সিকদার পরিবার বিস্ময়াবিষ্ট হচ্ছে মাহবুবদের কথাবার্তায় ও আচরণে। প্রত্যেকটা মানুষ কত সহজভাবে আন্তরিকতা ও আত্মীয়তার আলিঙ্গন করছে তাদের, যেন তারা বহু পরিচিত মানুষ। হাসান কেমন বোবা-বোকা সেজে মাথা দুলিয়ে মাথা নাড়ায়। মাহবুব চেয়েছিল নূরজাহানের সঙ্গে দেখা করতে, কিন্তু নূরজাহানের অসুস্থতার জন্য রাত হয়ে যাওয়ায় দেখা করেনি। তবে হীরা চৌধুরী বেশ কয়েকবার অসুস্থ নূরজাহানকে দেখে এসেছেন। প্রথম দেখায় নূরজাহানের রূপে বিমোহিত হয়েছেন। বেশ কয়েকবার মাহবুব, মকবুল, খালেদকে নূরজাহানের রুপের প্রশংসাও করেছেন। মাহবুব আশ্বস্ত হয় যে, অন্তত মারিদ নিজের জন্য উত্তম কাউকেই বাছাই করেছে। রাত বাড়তে থাকায় সকলে শুয়ে পড়ার তাগাদা দিল। মাহবুব, মকবুল ও খালেদকে আলাদা ঘরে থাকার জন্য হাসান জায়গা করে দিয়েছিল, কিন্তু ওনারা মারিদ-রাদিলের ঘরে থাকবে বলে জানায়। মাহবুব মারিদের ঘরে শুয়েছে। মকবুল, খালেদ হাসিবের ঘরে শুয়ে পড়ে। হাসিব আপাতত রাদিলের ঘরে থাকছে। আশনূরের ঘরে হীরা চৌধুরীকে থাকার জায়গা করে দেওয়া হয়। নূরজাহানের ঘরের ফ্লোরে আশনূর বিছানা করে থাকবে এবং নূরজাহানের সঙ্গে খাটে আলেহা থাকবে—এমনটাই সিদ্ধান্ত হয়। মেহমান সবাই যার যার ঘরে শুয়ে। আশনূর নদীর সঙ্গে রান্নাঘরের কাজ গোছাচ্ছে। আলেহা তারানূরের সঙ্গে বসার ঘরে বসে মারিদ আর নূরজাহানের বিয়ের বিষয় নিয়েই আলোচনা করছিল। মাজিদ ক্লান্তিতে শুয়ে পড়েছে। রাত প্রায় একটা বাজে। মারিদ ঘুমায়নি। মন ছটফট করছে নূরজাহানকে একপলক দেখার জন্য। কাল রাতে শেষবেলায় একটু করে দেখেছিল, তারপর আর দেখা হয়নি। মারিদ নূরজাহানের জন্য ডাক্তারের ব্যবস্থা করে সেই সকালে বেরিয়েছিল, তারপর আর নূরজাহানকে দেখার সুযোগ হয়নি।

সংকোচবোধে কাউকে বলতেও পারছে না সে যে একটু নূরজাহানের সঙ্গে দেখা করতে চায়। মারিদ ফোনের বাহানায় ঘর থেকে বেরিয়ে হাসানের খোঁজ করে। হাসানকে দেখতে পায় বসার ঘরে তারানূর আর আলেহার সঙ্গে বসে কথা বলছে। মারিদ নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে হালকা গলা ঝাড়ে। হাসান, আলেহা, তারানূর সকলে চমকে তাকিয়ে মারিদকে দেখতে পায়। হাসান কৌতূহলী হয়ে বলে—

‘তুমি এইহানে? কিছু কইবা বাজান?

মারিদ খানিকটা অস্বস্তিবোধ করে নূরজাহানের সঙ্গে দেখা করার বিষয়টা বলতে। এত রাতে নূরজাহানের সঙ্গে মারিদের দেখা করার বিষয়টা সবাই কীভাবে নেয়, সেই বিষয়ে অস্বস্তিবোধ করছে। এখন না দেখা করলে সকালে মারিদ ঢাকা ফিরে যাবে, তখন দেখা করার সুযোগ পাবে না হয়তো। মারিদ বেশ শান্ত স্বরে হাসানকে বলল—

‘ আঙ্কেল, আমি একটু নূরজাহানের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলাম। আপনি যদি অনুমতি দিতেন তাহলে দেখা করতাম।

আলেহা কপাল কুঁচকে মারিদের দিকে তাকায়। আলেহার দৃষ্টি সন্দেহভাজক। হাসান মারিদকে নিষেধ করতে দ্বিধাবোধ করছে। মারিদের সঙ্গে নূরজাহানের বিয়ে হয়েছে, এখন নিষেধ করাটা বেমানান। হাসান দ্বিধায় পড়ে কিছু বলবে, তার আগেই তারানূর বেগম হৈ হৈ করে সম্মতি দিয়ে বলে—

‘ তুমি তোমার বউয়ের লগে দেখা করবা, এইহানে এত অনুমতির কী আছে? যাও যাও, তোমার বউয়ের লগে গিয়া দেখা কইরা আসো। তোমার হক আছে তোমার বউয়ের ভালো-মন্দ দেহনের। তুমি যাও, আমাগো কেউর আপত্তি নাই।

‘জি আচ্ছা!

মারিদ সম্মতি পেয়ে বসার ঘর পেরিয়ে ভাতঘরে যায়। ভাতঘরের বামে যে দরজাটা আছে, ওইটা নূরজাহানের ঘরে যাওয়ার দরজা। মারিদ ভাতঘরে যেতেই নদী আর আশনূরকে দেখে রান্নাঘর গোছাতে। মারিদকে দেখে আশনূর ও নদী দুজনই দ্রুত মাথায় ঘোমটা টানে। মারিদ সেদিকে তাকায়নি। সে নতদৃষ্টিতে নূরজাহানের ঘরের দরজার সামনে দাঁড়ায়। ঘরের টিনের বেড়ায় কয়েকটা টোকা দেয়। নূরজাহানের ঘুম ভেঙেছি কয়েক মিনিট হয়েছে। হঠাৎ দরজা টোকা পড়ায় বালিশের মাথাটা উঁচিয়ে দরজার দিকে তাকায় কে এসেছে দেখতে। ঘরে মানুষ ছাড়া কেউ নূরজাহানের ঘরে আসবে না। মেয়েরা কেউ নূরজাহানের ঘরে আসলে টোকা দেয় না। হাসান মাজিদ ওরা নূরজাহানের ঘরে ঢুকতে দরজায় টোকা দেয়। আজ আবার হীরা চৌধুরীও বেশ কয়েকবার এসেছিল তারানূর সঙ্গে। নূরজাহানের খোঁজ খবর নিয়েছে। মহিলাটির কথাবার্তা নূরজাহানের ভালো লেগেছে কিন্তু অসুস্থতার জন্য নূরজাহান চোখ মেলে দুই মিনিটও তাকিয়ে থাকতে পারিনি। দুই একবার দেখে আবার ঘুমিয়ে পরেছে। এখন কে এসেছে দেখতে নূরজাহান মাথা উঁচিয়ে তাকায়, তক্ষুনি দরজা খোলে প্রবেশ করে মারিদ। মূহুর্তে চোখাচোখি হয়ে যায় দুজনের। মারিদের উপস্থিতি বুঝতে পেরে নূরজাহান গায়ের কাঁথা মাথা অবধি মুড়ি নেয় তৎক্ষণাৎ—যেন সে ঘুমাচ্ছে। বিষয়গুলো চোখের পলকে ঘটলেও মারিদ দেখে ফেলেছে। মারিদ কপাল কুঁচকে ঘরে ঢোকে। নূরজাহান মারিদের উপস্থিতি বুঝে নিজেকে আড়াল করছে , তার মানে নূরজাহান মারিদের সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছে না। মারিদ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নূরজাহানের ঘরটা দেখে। দক্ষিণ পাশে টিনের বেড়ার সঙ্গে লাগিয়ে একটা চার পায়ের খাট। পশ্চিম পাশে পড়ার টেবিল, সেখানে টেবিলভরতি অসংখ্য বই। উত্তর পাশে পুরোনো কাঠের একটা মাঝারি সাইজের ড্রেসিং টেবিল; তাতে রাখা দুটো চিরুনি, একটা প্যারাসুট তেলের বোতল, একটা ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী ক্রিম, একটা ছোট চুড়ির আলনায় কয়েক ডজন চুড়ি। ড্রেসিং টেবিলের পাশেই উত্তর পাশের দরজাটা, যেটা দিয়ে প্রথম চাঁদরাতের দিন নূরজাহানকে মারিদ ডাইরি লেখতে দেখেছিল। পূর্ব পাশে একটা কাঠের আলনা আছে, সেখানে মেয়েলি কাপড় গুছিয়ে রাখা। আলনার পাশে একটা কাঠের জানালা আছে, সেখান হতে মারিদের মেহমান ঘর দেখা যায়। মারিদ নূরজাহানের ঘরে এই প্রথম এসেছে। কাল রাতেও এসেছিল একবার, কিন্তু তখন আতঙ্কে ঘরটা ভালো করে দেখা হয়নি। মারিদ বিছানায় শক্ত হয়ে পড়ে থাকা নূরজাহানের দিকে ঘুরে তাকায়। পাতলা কাঁথার নিচে শক্ত কাঠ হয়ে শুয়ে আছে নূরজাহান, বিন্দু পরিমাণ নড়াচড়ার কোনো আভাস নেই। মারিদ নূরজাহানের পড়ার টেবিলে একটা বই হাতে নেয়, সেটা উল্টেপাল্টে দেখে আবার জায়গায় রেখে দেয়। হঠাৎ মারিদের মাথায় ‘অপরিচিতার’ ডায়েরির কথা আসতে মারিদ তৎক্ষণাৎ নূরজাহানের পড়ার টেবিল খুঁজতে শুরু করে সেই ডাইরি । ভাগ্য ভালো হওয়ায় নূরজাহানের পড়ার টেবিলের ড্রয়ারেই পেয়ে যায় কাঙ্ক্ষিত ডায়েরিটা। মারিদ ডায়েরি হাতে নিয়ে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে নূরজাহানের দিকে তাকায়। নূরজাহানের কোনো হেলদোল দেখতে না পেয়ে মারিদ ডায়েরির পৃষ্ঠা উল্টাতে গিয়ে একত্রে উল্টে যায় বেশ কিছু পৃষ্ঠা। মারিদ বৈদ্যুতিক লাইটের আলোয় দেখতে পায় বেশ কয়েকটি লাইন—

~ আমার কোনো বর্তমান নেই, ভবিষ্যৎও নেই;

আছে অসংখ্য অতীত, যা আমার বর্তমানও ভবিষ্যৎকে ঘিরে অনিশ্চিত করে রেখেছে।

এতটুকু লেখা পড়ে মারিদ কপাল কুঁচকে নেয়।

অপরিচিতা’কে মারিদের বেশ রহস্যময়ী মনে হয়। ফোনেও বেশ অদ্ভুত কথাবার্তা বলত, বাস্তবে আরও অদ্ভুত। নূরজাহান যদি মারিদের ‘অপরিচিতা’ হয়, তাহলে নূরজাহান মারিদকে চিনে ফোনে কথা বলত; আজ যখন মারিদ নূরজাহানের সামনে দাঁড়িয়ে, তখন নূরজাহান কেন মারিদকে না চেনার নাটক করছে? মারিদের অপরিচিতার প্রতি যেমন টান, মায়া ও ভালোবাসা আছে, তার চেয়ে বেশি ক্ষোভ আছে—কেন অপরিচিতা ভালোবাসার কথা বলে হঠাৎ হারিয়ে গেল তা নিয়ে। যদি সেদিন নূরজাহান না মরে, জীবিতই ছিল, তাহলে এতদিন কেন নূরজাহান মারিদের সঙ্গে একটিবারের জন্যও যোগাযোগ করেনি? মারিদের অপরিচিতার প্রতি ক্ষোভ এতটা, যতটা হলে একটা জীবিত মানুষকে ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে। ডায়েরির পাশাপাশি নিচের দুটো লাইনেও চোখ বুলাল মারিদ—

~ আমার শহরে একাকীত্বের বসবাস। আমার ‘আমি’টা ছাড়া কেউ কখনো আমাকে বুঝতে চায়নি।

~ আপনি আমার শেষ ভালোবাসা। শেষ মানুষ, শেষ পৃষ্ঠা। আপনার পর আর লেখা হয়নি, ব্যবসায়ী সাহেব।

মারিদ ঠাস করে ডায়েরি বন্ধ করে নেয়। কয়েক সেকেন্ড আকাশমুখী হয়ে দুচোখ বন্ধ করে রাখে। রাগ, জেদ আর ক্ষোভে মারিদ নূরজাহানের মাথার শিরার কাছে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে মিনিটের পর মিনিট। কয়েক মিনিট কেটে গেলেও রুমে কারও শব্দ না পেয়ে নূরজাহান মনে করে মারিদ চলে গেছে। সামান্য কাঁথা সরিয়ে উঁকি দিতেই ভয়ে চমকে ওঠে মারিদকে মাথার কাছে দেখতে পেয়ে। দ্রুত উঁকি দেওয়া মাথাটা কাঁথার ভেতর ঢুকিয়ে নেয়। মারিদ চোখ-মুখ শক্ত করে হাতের মুঠোয় ডায়েরিটা চেপে ধরে। কয়েক সেকেন্ড যেতেই মারিদ হাতের ডায়েরি দিয়ে ঠাস করে নূরজাহানের মাথায় একটা ভারি মেরে হনহনিয়ে বেরিয়ে যায়। মারিদ নূরজাহানকে বেশ শক্তভাবেই ভারিটা দিয়েছে। মারিদের হাতে ভারি পেয়ে নূরজাহান তৎক্ষণাৎ ককিয়ে ওঠে, তারপরও শব্দ করে না। মারিদ চলে যায়, কিন্তু নূরজাহান তখনও শক্তভাবে বিছানায় পড়ে রইল মিনিটের পর মিনিট।

#চলিত

[ গল্পটা ভালো মন্দ রিভিউ দিবেন অবশ্যই ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply